poet
stringclasses
137 values
category
stringclasses
21 values
poem
stringlengths
9
18.7k
লালন শাহ
মানবতাবাদী
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে ।। লালন কয় জাতের কী রূপ আমি দেখলাম না দুই নজরে। সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে ।।কেউ মালা’য় কেউ তছবি গলায়, তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায় যাওয়া কিম্বা আসার বেলায় জাতের চিহ্ন রয় কার রে সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে ।।যদি ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কি হয় বিধান, বামণ চিনি পৈতা প্রমাণ, বামণি...
লালন শাহ
নীতিমূলক
দিন থাকতে দ্বীনের সাধন কেন জানলে না তুমি কেন জানলে না সময় গেলে সাধন হবে নাজানো না মন খালে বিলে থাকে না মিন জল শুকালে ।। কি হবে আর বাঁধা দিলে মোহনা শুকনা থাকে, মোহনা শুকনা থাকে, সময় গেলে সাধন হবে না সময় গেলে সাধন হবে নাঅসময়ে কৃষি কইরে মিছা মিছি খেইটে মরে গাছ যদি হয় বীজের জোরে ফল ধরে না তাতে ফল ধরে না, সময় গেলে সাধ...
লালন শাহ
চিন্তামূলক
এই মানুষে সেই মানুষ আছে কতো মুনি ঋষি যোগী তপস্বী তারে খুঁজে বেড়াচ্ছে।।জলে যেমন চাঁদ দেখা যায় ধরতে গেলে হাতে কে পায় আলেক মানুষ অমনই সদাই আছে আলেকে বসে।।অচিন দলে বসতি যার দ্বিদল পদ্মে বারাম তার দল নিরূপণ হবে যাহার সে রূপ দেখবে অনাসে।।আমার হলো বিভ্রান্ত মন বাইরে খুঁজি ঘরের ধন সিরাজ সাঁই কয় ঘুরবি লালন আত্মতত্ত্ব না বুঝ...
লালন শাহ
চিন্তামূলক
আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী? ইতরপনা কার্য আমার অহর্নিশি।। জঠর যন্ত্রণা পেয়ে এলাম যে করার দিয়ে রইলাম তা সব ভুলিয়ে ভবে আসি।। চিনলাম না সে গুরু কি ধন জানলাম না তার সেবা সাধন ঘুরতে বুঝি হল রে মন চোরাশি।। গুরু যার থাকে সদয় শমন বলে তার কিসের ভয় লালন বলে, মন তুই আমার করলি দুষি।।
লালন শাহ
মানবতাবাদী
জাত গেলো জাত গেলো বলে এ কি আজব কারখান ! জাত গেলো জাত গেলো বলে… সত্য কাজে কেউ নাই রাজি সবই দেখি তা না না না জাত গেলো জাত গেলো বলে আসবার কালে কি জাত ছিলে এসে তুমি কি জাত নিলে কি জাত হবা যাবার কালে এ কথা ভেবে বল না জাত গেলো জাত গেলো বলে এ কি আজব কারখান ! ব্রাহ্মন চন্ডাল চামার মুচি এক জলেতে সবাই শুচি দেখে শুনে হয় না রুচি য...
লালন শাহ
মানবতাবাদী
তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে ।।একটা পাগলামি করে জাত দেয় সে অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে আবার হরি বলে পড়ছে ঢলে ধূলার মাঝে ।।একটা নারকেলের মালা তাতে জল তোলা ফেলা করঙ্গ সে পাগলের সঙ্গে যাবি পাগল হবি বুঝবি শেষে ।।পাগলের নামটি এমন বলিতে অধীন লালন হয় তরাসে চৈতে নিতে অদ্বৈ পাগল নাম ধরে সে ।।তোরা কেউ যাসনে...
লালন শাহ
চিন্তামূলক
দেখ না মন, ঝকমারি এই দুনিয়াদারী। আচ্ছা মজা কপনি-ধ্বজা উড়ালে ফকিরী।। যা কর তা কর রে মন, তোর পিছের কথা রেখে স্মরণ; বরাবরই (ও তার) পিছে পিছে ঘুরছে শমন, কখন হাতে দিবে দড়ি।। (তখন) দরদের ভাই বন্ধুজনা, সঙ্গে তোমার কেউ যাবে না; মন তোমারি, তারা একা পথে খালি আতে বিদায় দিবে তোমারি।। বড় আশার বাসাখানি কোথায় পড়ে রবে মন তোর ঠি...
লালন শাহ
ভক্তিমূলক
বাড়ির কাছে আরশী নগর (একঘর) সেথা পড়শী বসত করে- আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।। গেরাম বেড়ে অগাধ পানি নাই কিনারা নাই তরণী পারে, বাঞ্ছা করি দেখব তারে (আমি) কেমনে সেথা যাই রে।। কি বলব পড়শীর কথা, হস্ত পদ স্কন্ধ মাথা নাই-রে ক্ষণেক থাকে শূণ্যের উপর (ওসে) ক্ষণেক ভাসে নীরে।। পড়শী যদি আমায় ছুঁতো, যম যাতনা সকল যেতো দূরে। সে আর ...
লালন শাহ
মানবতাবাদী
(ভবে) মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার নদী কিংবা বিল-বাঁওড়-খাল সর্বস্থলে একই এক জল।।একা মেরে সাঁই হেরে সর্ব ঠাঁই ।। মানুষে মিশিয়া হয় বিধান তার মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার…নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে, আকার সাকার হইল সে ।। দিব্যজ্ঞানী হয় তবে জানতে পায় ।। কলি যুগে হলেন মানুষ-অবতার মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার ভবে মানুষ গুরু নিষ...
লালন শাহ
চিন্তামূলক
অনায়াসে দেখতে পাবি কোনখানে সাঁইর বারামখানা। আপন ঘরের খবর লে না। অনায়াসে দেখতে পাবি কোনখানে সাঁইর বারামখানা।।আমি কোমল ফোটা কারে বলি কোন মোকাম তার কোথায় গলি ।। সেইখানে পইড়ে ফুলি মধু খায় সে অলি জনা।।সুখ্য জ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য সাধক এর উপলক্ষ ।। অপরূপ তার বৃক্ষ দেখলে চক্ষের পাপ থাকে না।।শুষ্ক নদীর শুষ্ক সরোবর তিলে তিলে...
লালন শাহ
চিন্তামূলক
আমার আপন খবর আপনার হয় না। সে যে আপনারে চিনলে পরে, যায় অচেনারে চেনা।।সাঁই নিকট থেকে দূরে দেখায় যেমন কেশের আড়ে পাহাড় লুকায়, দেখ আ। আমি ঢাকা দিল্লী হাতড়ে ফিরি আমার কোলের ঘোটত যায় না।।সে যে আত্মারূপে কর্তাহরি, মনে নিষ্ঠা হলেই মিলবে তারি ঠিকানা। আর বেদ-বেদান্ত পড়বে যত বাড়বে তত লখ্‌না।।আমি আমি কে বলে মন, যে জানে তা...
লালন শাহ
চিন্তামূলক
কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা হাওয়া দমে দেখ তারে আসল বেনা।।বিনা তেলে জ্বলে বাতি দেখতে যেমন মুক্তা মতি জলময় তার চতুর্ভিতি মধ্যে খানা।।তিল পরিমাণ জায়গা সে যে হদ্দরূপ তাহার মাঝে কালায় শোনে আঁধলায় দেখে নেংড়ার নাচনা।।যে গঠিল এ রঙমহল না জানি তার রূপটি কেমন। সিরাজ সাঁই কয় নাইরে লালন তার তুলনা।।
লালন শাহ
চিন্তামূলক
আপনার আপনি মন না জান ঠিকানা । পরের অন্তরে কোটি সমুদ্দুর কীসে যাবে জানা ।।পর বলতে পরমেশ্বর আত্মরূপে করে বিহার দ্বিদলে বারামখানা । শতদল সহস্রদলে অনন্ত করুণা ।।কেশের আড়েতে যৈছে পাহাড় লুকায়ে আছে দর্শন হল না । হেঁট নয়ন যার, নিকটে তার সিদ্ধ হয় কামনা ।।সিরাজ সাঁই বলে রে লালন গুরুপদে ডুবে আপন আত্মার ভেদ করলে না । আত্মা আর...
লালন শাহ
ভক্তিমূলক
ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফান্দ পেতে। সে কি সামান্য চোর ধরবি কোনা-কাঞ্চিতে।। পাতালে চোরের বহর দেখায় আসমানের উপর তিন তারে করেছে খবর হাওয়ার মূল ধরতে তাতে।।১ কোথা ঘর কি বাসনা কে জানে ঠিক ঠিকানা হাওয়ায় তার বারামখানা শুভ শুভ যোগমতে।।২ চোর ধরে রাখবি যদি হৃদ-গারদ কর গে খাঁটি লালন কয়, নাটিখুঁটি থাকতে কি সে দেয় ছুঁতে।।
লালন শাহ
চিন্তামূলক
মন তুই করলি একি ইতরপনা। দুগ্ধেতে যেমন রে তোর মিশলো চোনা।।শুদ্ধ রাগে থাকতে যদি হাতে পেতে অটলনিধি বলি মন তাই নিরবধি বাগ মানে না।।কী বৈদিকে ঘিরলো হৃদয় হ’ল না সুরাগের উদয় নয়ন থাকিতে সদাই হ’লি কানা।।বাপের ধন তোর খেল সর্পে জ্ঞানচক্ষু নাই দেখবি কবে লালন বলে হিসাবকালে যাবে জানা।।
লালন শাহ
চিন্তামূলক
এসব দেখি কানার হাট বাজার বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা আর এক কানা মন আমার।।পণ্ডিত কানা অহংকারে মাতবর কানা চোগলখোরে। সাধু কানা অন বিচারে আন্দাজে এক খুঁটি গেড়ে, চেনে না সীমানা কার।।এক কানা কয় আর এক কানারে চল এবার ভবপারে। নিজে কানা পথ চেনে না পরকে ডাকে বারে বার।।কানায় কানায় উলামিলা বোবাতে খায় রসগোল্লা। লালন তেমনি মদনা কা...
লালন শাহ
ভক্তিমূলক
মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের সনে।।চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী।হব বলে চরণদাসী তা হয় না কপাল গুণে।।মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন লুকালে না পায় অন্বেষণ। কালারে হারায়ে তেমন ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।।ঐ রূপ যখন স্মরণ হয় থাকে না লোকলজ্জার ভয়। লালন ফকির ভেবে বলে সদাই ও প্রেম যে করে সেই জানে।।আরও পড়ুন… লালন ফকির এর ...
লালন শাহ
মানবতাবাদী
আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে দেখ না রে মন চেয়ে। দেশ-দেশান্তর দৌড়ে এবার মরিস্‌ কেন হাঁপিয়ে।। করে অতি আজব ভাক্কা গঠেছে সাঁই মানুষ-মক্কা কুদরতি নূর দিয়ে। ও তার চার দ্বারে চার নূরের ইমাম মধ্যে সাঁই বসিয়ে।। মানুষ-মক্কা কুদরতি কাজ উঠছে রে আজগুবি আওয়াজ সাততলা ভেদিয়ে। আছে সিংহ-দরজায় দ্বারী একজন নিদ্রাত্যাগী হয়ে।। দশ-দুয...
লালন শাহ
চিন্তামূলক
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়। ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়।আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা। তার উপরে সদর কোঠা আয়নামহল তায়।খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।কপালের ফ্যার নইলে কি আর পাখিটির এমন ব্যবহার। খাঁচা ভেঙ্গে পাখি আমার কোন বনে পালায়।খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।মন তুই রই...
লালন শাহ
ভক্তিমূলক
আমি অপার হয়ে বসে আছি ও হে দয়াময়, পারে লয়ে যাও আমায়।। আমি একা রইলাম ঘাটে ভানু সে বসিল পাটে- (আমি) তোমা বিনে ঘোর সংকটে না দেখি উপায়।। নাই আমার ভজন-সাধন চিরদিন কুপথে গমন- নাম শুনেছি পতিত-পাবন তাইতে দিই দোহাই।। অগতির না দিলে গতি ঐ নামে রবে অখ্যাতি- লালন কয়, অকুলের পতি কে বলবে তোমায়।।আরও পড়ুন… সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে...
অতুলপ্রসাদ সেন
ভক্তিমূলক
জল বলে চল, মোর সাথে চল তোর আঁখিজল, হবে না বিফল, কখনো হবে না বিফল। চেয়ে দেখ মোর নীল জলে শত চাঁদ করে টল মল। জল বলে চল, মোর সাথে চল। বধু রে আন তরা করি, বধুরে আন তরা করি, কূলে এসে মধু হেসে ভরবে গাগরী, ভরবে প্রেমের হৃদ কলসি, করবে ছল ছল। জল বলে চল, মোর সাথে চল। মোরা বাহিরে চঞ্চল, মোরা অন্তরে অতল, সে অতলে সদা জ্বলে রতন উজল। এ...
অতুলপ্রসাদ সেন
স্বদেশমূলক
বল, বল, বল সবে, শত বীণা-বেণু-রবে, ভারত আবার জগত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে | ধর্মে মহান্ হবে, কর্মে মহান্ হবে, নব দিনমণি উদিবে আবার পুরাতন এ পুরবে! আজও গিরিরাজ রয়েছে প্রহরী, ঘিরি তিনদিক নাচিছে লহরী, যায়নি শুকায়ে গঙ্গা গোদাবরী, এখনও অমৃতবাহিনী | প্রতি প্রান্তর, প্রতি গুহা বন, প্রতি জনপদ, তীর্থ অগণন, কহিছে গৌরব-কাহিনী | বিদুষী...
অতুলপ্রসাদ সেন
স্বদেশমূলক
হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর, হও উন্নত শির, নাহি ভয় | ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান, হও সবে আগুয়ান, সাথে আছে ভগবান,—হবে জয় | নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান্ ; দেখিয়া ভারেতে মহা-জাতির উত্থান—জগজন মানিবে বিস্ময়! তেত্রিশ কোটি মোরা নহি কভু ক্ষীণ, হতে পারি দীন, তবু ...
অতুলপ্রসাদ সেন
চিন্তামূলক
নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন, তুই সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন। মূঢ় মন, সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন। নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন। লাগে নি যার পায়ে ধুলি, কি নিবি তার চরণ ধুলি, নয়রে সোনায়, বনের কাঠেই হয় রে চন্দন। মূঢ় মন, হয় রে চন্দন। নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন। এ মোধন মায়ের মতন, দুঃখীটুতেই...
অতুলপ্রসাদ সেন
ভক্তিমূলক
ওগো নিঠুর দরদী, ও কি খেলছ অনুক্ষণ। তোমার কাঁটায় ভরা বন, তোমার প্রেমে ভরা মন, মিছে খাও কাঁটার ব্যথা, সহিতে না পার তা আমার আঁখিজল, ওগো আমার আঁখিজল তোমায় করেগো চঞ্চল তাই নাই বুঝি বিফল আমার অশ্রু বরিশন। ওগো নিঠুর দরদী। ডাকিলে কও না কথা, কি নিঠুর নিরবতা। আবার ফিরে চাও, তুমি আবার ফিরে চাও, বল ওগো শুনে যাও তোমার সাথে আছে আমার...
অতুলপ্রসাদ সেন
স্বদেশমূলক
মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা! তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালোবাসা!কি যাদু বাংলা গানে! গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে, গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা!বিদ্যাপতি, চণ্ডী, গোবিন্‌, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন- ঐ ফুলেরই মধুর রসে, বাঁধলো সুখে মধুর বাসা!বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আনলো মালা জগৎ জিনে! তোমার চর...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
হেঁটে হেঁটে আমি কি এখন খুব ক্লান্ত? কায়ক্লোশ পা দুটোকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্যে কী একটা গান গায় বৃক্ষতলে গোধূলিতে। এ পথের রেখা ধরে ইতিহাস আর আমি হেঁটে যাচ্ছি। একটি পাখির কলস্বর দিগন্তের চিবুকে বিস্ময় জাগিয়ে কেমন উড়ে যায়, যেন টুক্‌রো মেঘ; দেখ, এবার আমার সত্যিকার লেখার সময় এল। এতকাল শুরু গোলকধাঁধায় ঘুরে কেটেছে সময়।প্রকৃত আ...
শামসুর রাহমান
সনেট
মাত্র দু’বছর আগে আমাদের এই পরিচয় অকস্মাৎ এ শহরে বিলম্বিত গোধূলি বেলায়। আমরা দু’জন একই ঘাটে মহাকালের খেলায় মিলিত হয়েছি, আমাদের হৃদয়ের পরিণয় বহু যুগ আগেই হয়েছে বীথিকায় মনে হয় সম্পূর্ণ গান্ধর্ব মতে। কদমতলার স্মৃতি আজো রূপালি মাছের মতো ভেসে ওঠে। বাজো, বাঁশি বাজো, উঠুক পায়ের মল নেচে আজ এ শহরময়।গৌরী, তুমি আধুনিকা; উন্নত মানে...
শামসুর রাহমান
রূপক
(দান্তের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা পূর্বক) মোল্লা-পুরুত এখনো রটায় স্বর্গলোকের বিজ্ঞাপন। নানা মুনি তার নকশা আঁকেন, ব্যাখ্যা করেন বিজ্ঞজন।দৈব দয়ায় একদিন ঠিক পৌঁছে গেলাম স্বর্গলোকে। স্বর্গতো নয়, আমার শহর দেখতে পেলাম চর্মচোখে।সেখানে ও লোক রাস্তা খুঁড়ছে, মন্ত্রী হচ্ছে, কিনছে নাম। চৈত্রদুপুর পুড়ছে সেখানে, গলছে রাতের মধ্য যাম।ইলেকট...
শামসুর রাহমান
সনেট
যখন সে লেখে তার ধমনীতে নেচে নেচে মেশে গোলাপের পাপড়ি একরাশ, টেবিলের গ্রীবা ঘেঁষে জেগে ওঠে বহুবর্ণ অশ্বপাল কেশর দুলিয়ে, দেবদুত মাঝে সাজে দ্যায় তার মাথাটা বুলিয়ে। যখন সে লেখে, দ্যাখে তার শৈশবের খড়স্তূপে খরগোশ নাকের ডগা থেকে ঝাড়ে খড়কুটো চুপে এবং আলেখ্যবৎ আস্তাবলে সহিস ঘুমায়। যখন সে লেখে, দ্যাখে তার পদাবলী উড়ে যায়,একজন তরুণ...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
আমাদের দু’জনের মধ্যে যেন কবরের মতো কিছু আছে, বুঝি তাই অন্তহীন বিচ্ছিন্নতা নিয়ে দু’জন দু’দিকে থাকি। শুকনো ওষ্ঠে পানি ঝরবার অনেক আগেই বেলা যায়, বেলা যায়। তবুও তোমার প্রতি যাই বেলাশেষে, যেমন নিঃসঙ্গ বেদুইন ব্যাকুল প্রবেশ করে মরুদ্যানে। আমি বালির ভেতর থেকে ঝরণার বদলে বেনামি কংকাল তুলে আমি আর প্রিয় কোনো গান হঠাৎ গাইতে গিয়ে ...
শামসুর রাহমান
সনেট
তোমার সান্নিধ্যে আমি, হা কপাল, কখনো পারি না ছুটে যেতে ইচ্ছেমতো। অথচ আমার মধ্যে রোজ একটি ঈগল দূর তোমার আসমানের খোঁজ নেয়ার তৃষ্ণায় ডানা ঝাপটায়। হায়, মনোলীনা কী করে হৃদয় পাবো বলো তোমার শরীর বিনা? প্রত্যহ সযত্নে তুমি চুল বাঁধো, কারো সাজগোজে, এখন তা-নয় কিছুতেই আমার দৃষ্টির ভোজ। পড়ে আছি রুক্ষ একা, সঙ্গী শুধু মর্চে-পড়া বাণী।ত...
শামসুর রাহমান
শোকমূলক
(খন্দকার মজহারুল করিম স্বরণে)কেন তুমি হুট করে এত প্রিয় এই আসরের আকর্ষণ ছেড়ে চলে গেলে? কেন গেলে? তোমার তো ছিলো না বিতৃষ্ণা, যতদূর জানি, স্বদেশের নদী, মাঠ, গ্রামগঞ্জ, শহরের ঘরবাড়ি, রাজপথ, অলিগলি আর দীপ্ত জনসভা আর জনতা-শোভিত দীর্ঘ মিছিলের প্রতি।সংসার সুখেরই ছিলো; ছিলো না কি? জীবনসঙ্গিনী আর প্রিয় দু’টি সন্তানের সঙ্গ তুমি উ...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
মজুরের ঘামের ফোঁটার মতো সকালবেলার আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে আমার ঘরে। টেবিলে আর কে, নারায়ণের আত্মকথা ‘আমার দিনগুলি’ যেটি গত রাতে পড়ে শেষ করেছি। আমার কবিতা খাতা একটি অসমাপ্ত কবিতা বুকে ধারণ করে প্রতীক্ষায় আছে আমার কলমের আঁচড়ের। কবিতাটি লতিয়ে উঠেছে তোমাকে ঘিরে। কি আশ্চর্য, আজকাল আমার প্রায় প্রতিটি কবিতা জুড়ে তোমারই আসা-যাওয়...
শামসুর রাহমান
সনেট
তোমার ভয়ের কথা বলেছ আমাকে বহুবার কখনো গল্পের ছলে, কখনো বা ভয়ে কেঁপে উঠে; হঠাৎ নিশুত রাতে ঘুম ভেঙে গেলে দ্যাখো ছুটে আসে শত সরীসৃপ তোমার দিকেই দুর্নিবার বেগে, ভীতসন্ত্রস্ত তোমার কাছে সে বেডকভার অজগর হয়ে যায় এবং দর্পণে ওঠে ফুটে খুব ভয়ঙ্কর মুখ কারো, যেন সে সম্ভ্রম লুটে নেবে কিংবা খুনী রূপে চকিতে ছোরায় দেবে ধার।রাত্তিরে তোম...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
কখনও-সখনও পারবে না যেতে একা যদি বলি, প্রকৃত বন্ধুর কথা অত্যন্ত বিরল এমন সুন্দর এই গলিতে আমাকে হেঁটে যেতে দ্যাখে প্রায়শই তারা কিংবা তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা প্রায়শ দেখতে পেয়ে কেউ-কেউ হেসে সালাম করেন। কেউ ঠোঁটে খেলিয়ে মুচকি হাসি দ্রুত চলে যান যে যার গন্তব্যে আর আমি কিছু মনে না করেই হেঁটে যেতে থাকি কোনও বন্ধুর বাসায়।যদি বলি ...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
সীসার মতো আকাশ বিনত, গাছগুলি স্থাপত্য, তরতাজা রৌদ্রর রঙে অকস্মাৎ ধরেছে জং; ক’দিন ইঁদুরগুলোর জোটে নি এক কণা খাদ্য, বাঁধানো কবরগুলোয় মস্ত ফাটল।পেঁচা মূক, স্থবির; শ্মশান পেরিয়ে সৌন্দর্য ব্যান্ডেজ বাঁধা পা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিরুদ্দেশ যাত্রায় লীন। একজন কবির বুক বুলেটে ঝাঁঝরা করে উল্লাসে মত্ত ওরা। ঘাসবঞ্চিত মাটি সন্তানহার...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
হে বান্ধব, এই যে এখানে তুমি এক কোণে ব’সে প্রত্যহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা দেয়ালের কিংবা বাইরের কোনও গাছ অথবা প্রশান্ত আকাশের দিকে দৃষ্টি মেলে দিয়ে কাটাও সময় তাতে তোমার কী লাভ হয়, বলবে কি?প্রশ্ন করে করে ক্লান্ত হয়ে গেছি, তবু আজ অব্দি পাইনি উত্তর, শুধু তুমি ঠোঁটে হাসি খেলিয়ে তাকাও এই উৎসুক ব্যক্তির দিকে আর এলেবেলে কী-যে বলো, ...
শামসুর রাহমান
ভক্তিমূলক
[মতিউল ইসলামকে স্মরণে রেখে]বার্ধক্যের ভগ্ন স্বর, মাঝে-মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কখনো আবার পিত্তশূল, আর কখনো-বা মনোভার নিয়ে কাটিয়েছো বেলা। কখনো কি হয়েছে সংশিত সাধ ভেলা ভাসাতে অলক্ষ্যে রাতে তিতাসের জলে? কিংবা ঘুম ভেঙে গেলে কোকিলের আহ্বানে নিঝুম হয়েছে কি মনে পৃথিবীকে বড় বেশি? হঠাৎ গোপনে খুলেছিলে কবিতার ধূলিম্লান খাতা? কত কথা দিয়েছ...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
আমরা দু’জন ছিলাম দু’দিকের যাত্রী, অথচ তড়িঘড়ি উঠে পড়ি বেঠিক ট্রেনের এক্‌ ভুল কম্পার্টমেন্টে। যখন ভুল বুঝতে পারলাম, তখন ট্রেন বেশ জোরে চলতে শুরু করেছে। আমরা পরস্পরের দিকে ঘনঘন তাকাচ্ছিলাম, যেন দূরের দু’টি গ্রহ। ট্রেন যখনই একটি ইস্টিশানকে ছোঁয় গাঢ় অন্তরঙ্গতায়, ভাবি এখানে নেমে পড়ব। অথচ নামা হয় না। আমাদের দুজনের মধ্যে কোনও ...
শামসুর রাহমান
রূপক
জাভেদ, তোমার কথা বেশ কিছুদিন ধরে আমি ভাবছি প্রত্যহ। কবে কোন্‌ সালে কোন্‌ সে শ্রীহীন পাড়ায় জন্মেছো তুমি, কী যে নাম সে বিদ্যালয়ের, ছিমছাম সেনার কদমছাঁট চুলের মতন ঘাসময় অনুপম উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে যার পড়েছিল তোমার প্রথম পদচ্ছাপ, কবে বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে কতিপয় পুস্তকের জ্ঞানগাম্যি চেখে নিয়েছিলে সডিগ্রী বিদায়, তারপর জুটিয়ে মাঝা...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
স্বপ্নগুলো অবিন্যস্ত টেবিলে টুকরো টুকরো জ্যোৎস্না; জ্যোৎস্নায় উড়ে এসে পড়ে পোড়া ঘরের ছাই। ধুলোবালি খিলখিলিয়ে হেসে ঢেকে দেয় তাকে, যে সবেমাত্র তার স্বপ্নগুলোকে গুছিয়ে রাখছিল চায়ের পেয়ালায়; সে এখন পুরনো কালের বিকৃত মূর্তির মতো।এখানে প্রতি মিনিটে জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার প্রেত, লহমায় বেড়ে উঠে গিলে ফেলছে ঘড়ির মিনিট এবং সেকেন্...
শামসুর রাহমান
সনেট
হৃদয় নিঃসঙ্গ চিল হয়ে কেঁদেছে ক’দিন তার খবর রাখেনি কেউ। শূন্যতায় বেড়িয়েছি ভেসে, যেন আমি কাটা ঘুড়ি, অনেক কষ্টেও মৃদু হেসে সহজে নিয়েছি মেনে সামাজিকতার অত্যাচার। আমাকে নিষণ্ন পেয়ে গৌরী প্রশ্ন করে, ‘কবি তুমি এমন নিষ্পৃহ কেন আজকাল, এমন শীতল উচ্চারণে, আচরণে? আমি কি ঢেলেছি ঠাণ্ডা জল তোমার উদ্দীপনায়? ভাবাচ্ছে সন্ত্রন্ত জন্মভূমি...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
জীবন কেটেই গেল প্রায়, তবু এই স্বদেশের রৌদ্র ছায়া, জ্যোৎস্নাধারা, বুড়িগঙ্গা, মেঘনা নদীর তীর, আপনজনের মধুর সংসর্গ ছেড়ে যাওয়ার ভাবনা কখনও দিইনি ঠাঁই এমনকি মনের গহন কন্দরেও। কারও সাতে-পাঁচে নেই আমি, কখনও দিইনি ছাই কারও বাড়া ভাতে, শুধু একাকী নিজের ঘরে লিখেছি কবিতা।আমার অনেক প্রিয়জন উচ্চাশায় মজে জ্বলজ্বলে এক জীবনের সন্ধ্যানে...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
একটি গাছের হাত অভিবাদনের ভঙ্গিতে আমার দিকে উঠে আসে; তাকে কিছু কথা বলতে গিয়েও থেমে যাই। হাত নাড়া দেখি, দূরে পাথরের বুকে জলরেখা ফোটে, তবু গলে না হৃদয় মানুষের। বীণার ধ্বনিকে বোবা করে এখন প্রধান হয়ে ওঠে অস্ত্রের ঝংকার, চারা গাছের পাতারা ছোরার আদলে বাড়ে। এক পাল জন্তু সগৌরবে হেঁটে যায় বিপুল আঁধারে, একদা যাদের নাম মানুষ বলেই ...
শামসুর রাহমান
সনেট
কর্ণমূল থেকে খুলে যে ফুল আমাকে দিয়েছিলে একঘর অতিথির দৃষ্টি থেকে দূরে বারান্দায়, এখনো সুগন্ধ তার জীবিত আমার চেতনায়। যখন নিমগ্ন থাকি ফাইলের ধূসর নিখিলে, অথবা কাজের ফাঁকে চোখ রাখি আকাশের নীলে, উড়ন্ত পাখির প্রতি, অকস্মাৎ মনে পড়ে যায় তোমার সে পুষ্পদান কোলাহলময় নিরালায় এবং সুরভি মিলে থাকে মধ্যমিলে, অন্ত্যমিলে।সে ফুলে শুকিয়ে ...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
কত না জায়গায় চলে যাই, কত বেগানা শহরে, শহরতলীতে ঘুরি, অথচ যাই না দীর্ঘকাল পিতৃপুরুষের গ্রামে। সেখানে ঘুমন্ত পিতামহ, মাতামহ এবং আমার পিতা, স্বল্পায়ু আত্মজ, আরো অনেকেই পারিবারিক কবরস্থানে। ভাবি, কবরের স্তব্ধতাকে প্রায়শই ঈষৎ বিব্রত করে ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর আন্ধারকে বুঝি চম্‌কিয়ে দেয় জোনাকির দল, ঘাসগুলো দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে।কোনো কো...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
মাঝে-মধ্যে দূরে যাওয়া ভালো ভেবে মনস্থির করি একটি ব্রিজের কাছে সাবলীলভাবে চলে যাবো তুমি আর আমি ধুলিময় পথ হেঁটে একদিন। মেঘার্ত দুপুরে সেই ব্রিজটির কাছে গিয়ে দেখি- সমুখেই তৃণভূমি, একটি স্বপ্নিল ঝিল বেঁকে গেছে দূরে, বুঝি ছুঁতে চায় কোথাও কাউকে আর তিনটি বাছুর মাঠে দৌড়ায়, লাফায় কখনো বা। ট্র্যাক্টর মাঠের স্বপ্নে তুলে তীব্র ঢেউ...
শামসুর রাহমান
সনেট
একটি বাদামি ঘোড়া সঙ্গীহীন অপরাহ্নে এসে পড়েছে চওড়া পথে শহরের। মাংসের ভিতর তার জীবনের মর্মমূল যেন করে থরথর অবিরত; ট্রাফিক দ্বীপের ঘাস গাঢ় স্বপ্নাবেশে খাচ্ছে সে নিঝুম আস্তে সুস্থে, প্রায় তার ল্যাজ ঘেঁষে একটি মোটরকার ছুটে যায় অকস্মাৎ খর গতিতে এবং দূরে একজন বামন লজঝড় গাড়ি ঠেলে কোত্থেকে আওয়াজ আসে ভেসে সর্বনেশে।এসব কিছুই তাকে...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
এখনো আমার নামে কোনো গেরেপ্‌তারী পরোয়ানা নেই, আমি অপরাধী তার কোনো সাক্ষী-সাবুদ কোথাও কখনো পাবে না খুঁজে কেউ। তবু কেন হাতকড়া, কয়েদখানার কালো শিক চোখে ভেসে ওঠে বারবার। চারপাশে শুনি কত চোখে ভেসে ওঠে বারবার। চারপাশে শুনি কত গুঞ্জরণ, মনে হয় যেন সবাই আমাকে নিয়ে নানা কথা বলাবলি করে আমার আড়ালে-আবডালে। তাহলে কি হাড়কাঠে গলা দিয়ে ...
শামসুর রাহমান
সনেট
সাধক যেমন ধ্যানে জপেন নিয়ত পুণ্যশ্লোক, আমার হৃদয়ও তেম্‌নি বার-বার করে উচ্চারণ তোমার মধুর নাম। ঘরে ভ্রমরের গুঞ্জরণ, বাইরে পাখির শিস, হাওকেয়ার বিলাপ, যাই হোক- সবই তো বিশেষ ধ্বনি, সুর বলে কোনো কোনো লোক। শুধু সুর এসব তাদের কাছে। কিন্তু বলে মন, আমার বিস্মিত মন কী তন্ময় যখন তখন- সেই সুর তোমারই নামের ধ্বনি, ধ্বনির কোরক।আমার শ...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
আজকাল মাঝে মাঝে সকালে কি সাঁঝে আমাকে ঘিরে বেহাগের করুণ সুরের মতো বাজে তোমার নালিশ। আমার কথা না কি এখন আগেকার মতো তোমার হৃদয়ে সরোবর তৈরি করতে পারে না, পারে না লাল নীল পদ্ম ফোটাতে হাওয়ায় ঈষৎ দুলে-ওঠা মানস সরোবরে আমার কথার মুখ এখন তোমাকে লতাগুল্ম, ফুল, ফলমূল, আর রঙ বেরঙের পাখির গানে গুঞ্জরিত দ্বীপে পৌঁছে দিতে না পারার ব্য...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
যে আমার সহচর আমি এক কংকালকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটি, প্রাণ খুলে কথা বলি পরস্পর। বুরুশ চালাই তার চূলে, বুলোই সযত্নে মুখে পাউডার, দর্জির দোকানে নিয়ে তাকে ট্রাউজার, শার্ট, কোট ইত্যাদি বানিয়ে ভদ্রতাকে সঙ্গীর ধাতস্থ করি; দু’ বেলা এগিয়ে দিই নিজে প্রত্যহ যা খাই তাই। কখনো বৃষ্টিতে বেশি ভিজে এলে ঘরে মাথাটা মুছিয়ে তপ্ত চায়ের পেয়ালা রাখ...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
কাউকে কিছু না বলে কখন যে ফাল্গুন হঠাৎ সটকে পড়েছে। এখন তো বাংলাদেশ চৈত্রের চিৎকার পাতার আড়ালে, শ্রমিকের পাতের গরম ভাতে, নিউজপ্রিন্টের ভাঁজে ভাঁজে পঙ্গু প্রেমিকের হাহাকারে, নিশাচর কুকুরের চোখে, চন্দ্রাহত হা ভাতে বস্তির অরক্ষিতা তরুণীর যৌবনের উদগ্র চিতায়।মুংকের চিত্রের চিৎকারের মতো একটি চিৎকার, চরাচরব্যাপী, ইদানীং এ শহরে ...
শামসুর রাহমান
সনেট
প্রতিদিন ভিড় ঠেলে পথ চলি, দেখি সবখানে দলাদলি, মরমুখো সব দল, খুন খারাবির জন্যে তৈরী সর্বক্ষণ অনেকেই, শান্তির দাবির যেন মূল্য নেই কোনো। মোহময় শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর চৌদিক, অতিকায় জন্তু বিধ্বস্ত উদ্যানে ভীষণ চঞ্চল, অন্ধ ওরা আর জন্মেই বধির- তাহলে কোন্‌ দলে ভিড়ে ঢেকে নেবো মাথা শিরস্ত্রাণে?আমার শিবির নেই কোনো, আমি অত্যস্ত এক...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
অমন তাকাও যদি একবিন্দু অনন্তের মতো চোখ মেলে, আমি বারবার তোমার দিকেই ছুটে আসবো প্রত্যহ।যেখানে তোমার দৃষ্টি নেই, তোমার পায়ের ছাপ পড়ে না যেখানে কেনোদিন সেখানে কী করে থাকি? তোমাকে দেখার জন্যে আমি যশের মুকুট ছুঁড়ে দেবো ধূলায় হেলায়, তাকাবো না ফিরে ভুলে কস্মিনকালেও আর। মেনে নেবো হার, এই খর মধ্যাহ্নেই হয়ে যাবো স্বেচ্ছায় সূর্যা...
শামসুর রাহমান
রূপক
এই যে কবি ভর দুপুরে হন্তদন্ত হয়ে এখন যাচ্ছো কোথায় কোন্‌ ঠিকানা লক্ষ্য ক’রে? উশকো খুশকো ঢেউ-খেলানো লম্বা চুলের নিচে আছে মস্ত দামি মগজ বটে, সেখানে এক ফুল-বাগানে গানের পাখি সৃষ্টি করে সুরের আলো।হায়রে কবি, ধুলোয় তোমার পাঞ্জাবি আর পায়জামাটা ধূসর হলো, তবু হাঁটা থামছে না যে। আর কতটা পথ তোমাকে হাঁটতে হবে? দুপুরটি কি বিকেল হবে?...
শামসুর রাহমান
স্বদেশমূলক
‘এসো সখি’বলে বহু যুবরাজ তোমাকে সর্বদা’ তেপান্তরে, নদীতীরে, কাশবনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছায়াচ্ছন্ন শাল তাল তমালের ভিড়ে টেনে এনে মধ্যদিনে শুনিয়েছে রাখালের বেণু। বড়ো বেশি জলজ কণিকা ফুসফুসে জমেছিলো বলে তুমি ভুগেছো সর্দিতে খুব, এত ছিঁচকাঁদুনে হয়েছো আদরিণী কাব্যলক্ষ্মী আমাদের, এত আলুথালু!তোমাকে বালিকা ভেবে অনেক চটুল মান্যবর অক্লান্...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
নির্জন গুহায় থাকি হাঁটু মুড়ে, কখনো নিদ্রায় অভিভূত। আলো নেই কোনোখানে, বেরুতে পারি না, পাছে ওরা শিকারি কুকুরগুলো আমার পেছনে ভীষণ লেলিয়ে দেয়। আমার রক্তের ধারা বয়ে গেলে ওরা হো হো হেসে আর কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে দশদিক আনন্দ ধ্বনিতে ভরে দেবে। পড়ে আছি এক কোণে অসহায়; ভাবনার ভেলা পারাপার করে এই দুঃখিত আমাকে। গুহাগাত্রে হিজিবিজিছায়াগ...
শামসুর রাহমান
সনেট
কখন মিটিঙ ভেঙে গ্যাছে, মিটে গ্যাছে বেচা-কেনা সকল দোকানপাটে, ফলের বাজার শূন্য; ঘরে ফিরি দীর্ঘ পথ হেঁটে একা-একা, বুকের ভেতরে কী একটা কষ্টবোধ, ভিড়ে কাউকে যায় না চেনা। পাঁশুটে জ্যোস্নায় দেখি মৃতের মিছিল। তাকাবে না ফিরে ওরা, মনে হয়, কপ্সিমকালেও; চরাচরে আর কোন টান নেই জেনেই বুঝি বা এ শহরে নির্বিকার হেঁটে চলে, দেবে না চুকিয়ে ...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
না, আমি ভাস্কর নই, রোজ তাল তাল কাদামাটি নিয়ে মূর্তি গড়ি না, অথবা পাথরের স্তব্ধতায় পারি না জাগাতে কোনোক্রমে মৃত্যুঞ্জয় ধ্বনি, হায়, প্রতিমার। আমার আঙুলে নয় দীপ্র জাদুকাঠি, স্পর্শে যার দেয়াল চকিতে যাবে ছেয়ে কিছু খাঁটি অজর ফ্রেস্কোয় কিংবা জাগবে জোয়ার সাহারায়, অথবা উঠবে গড়ে মরুদ্যান; আমিতো ভূতল আস্তানায় একা ছন্দমিল খুঁজে খন...
শামসুর রাহমান
সনেট
কবীর চৌধুরী ঠিকই বলেছেন, জ্বলছে স্বদেশ- প্রায় প্রতিদিন মরে লোক গুলি খেয়ে খোলা পথে, পুলিশের জুলুমে জর্জর দেশবাসী, কোনো মতে দিন কাটে প্রতিবাদী নেতাদের প্রত্যহ অশেষ ঝুঁকিতে এবং অনেকেই হচ্ছেন আটক। বেশ আছেন আনন্দে মেতে নারী নীরো, বাজাচ্ছেন বাঁশি মসনদে বসে, ঠোঁটে তার খেলে যায় ক্রূর হাসি ক্ষণে ক্ষণে, পারিষদবর্গ তার কাছে সুখবর...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
“না, আমি কস্মিনকালে তোমার এ নৈঃসঙ্গ্য ঘোচাতে পারবো না”, বলে তুমি সেই ছোট ঘরটি গোছাতে মন দিলে। এটা-সেটা নেড়ে চেড়ে তুলে নিলে দুল বালিশের নিচে থেকে, পরলে আবার। এলোচুল সহযে বিন্যস্ত হলো; পরিচিত গন্ধমাখা ঘরে বিধ্বস্ত স্নায়ূর রাজ্য, বন্দী আমি ভয়ের নিগড়ে!বুঝি তাই অকস্মাৎ বুকে টেনে নিলাম তোমাকে সংক্রামক হতাশায়। বললামঃ “হত্যা ক...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম এই শহরের অখ্যাত গলির এক মাটির ঘরে; এতকাল পরেও হঠাৎ যখন আমার হাত নিজের অজান্তেই নাকের কাছে এসে যায়, একটা মন-কেমন করা সোঁদা গন্ধ পাই। যে ঘরে প্রথম চোখ মেলেছিলাম কার্তিকের রৌদ্রে, সে-ঘরে পড়ত একটা গেয়ারা গাছের ছায়া, সে ছায়া এখনও ঘন হয়ে আছে আমার চোখে। এখনও পেয়ারা গাছের আনন্দিত সবুজ পাতাগুলি মর্মরিত আমার...
শামসুর রাহমান
সনেট
আমি তো ছিলাম ভস্মরাশি হয়ে গৌরববিহীন অন্ধকারে সুনসান এলাকায় অনেক বছর। আমার ওপর বয়ে গ্যাছে কত যে বৈশাখী ঝড়, তুহিন বাতাস তীক্ষ্ম ছুঁয়েছে আমাকে রাত্রিদিন। তবুও নিস্পন্দ একা ছিলাম নিয়ত গমগীন্‌ অগ্নিদগ্ধ বেহালার ভস্মের মতন স্তব্ধতায়; করেনি আমার প্রতি দৃষ্টিপাত কেউ, বেলা যায় বলে আমি করেছি চিৎকার, তবু ছিলো উদাসীনপ্রতিবেশ সারাক...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
ঢের পথ হেঁটে আখেরে আঁধারে জনহীন স্থানে এক কৃষ্ণকায় দালানের কাছে এসে থামতেই অকস্মাৎ বড় বেশি কুচকুচে কালো রুমে দরজার বুক খুলে গেল।শূন্য, অতিশয় ছমছমে ঘরে অকস্মাৎ চার দেয়ালের বুক চিরে রক্তধারা বইতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে ক’জন অদেখা যুবতীর কান্নায় চৌদিক বুকফাটা মাতমের ডেরা হয়!শোণিতের ধারাময় অন্ধকার ঘর থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরুবার স্...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
যখন আমার কেউ থাকে না, তখনও সে থাকে। সকল সময় ওর ঠোঁটে শরতের রোদ্দুরের মতো হাসি জড়ানো। ওর ঘন কালো চুলের বিন্যাস কখনো বিপর্যস্ত; শরীরের ঢেউ স্বপ্নের নক্‌শা আঁকে অবিরত সন্ধ্যার আবছা স্বপ্নাভায়, রাত্রির স্তব্ধতায়। তার কাছে যেন আমি প্রার্থনা করি ভালোবাসবার অবসর এবং অমিতরায়ের ধরনে তার কানে কানে বলি, আমার ভালোবাসা নয় ঘড়ার জল, ...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
আমার এই পুরোনো ঘরের ভেতরে আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে বাইরে। পাখিটাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে আমি রোজকার মতো আজো চোখ কচলাতে কচলাতে জেগে উঠলাম। তাকালাম চাদ্দিকে, একটা প্রত্যাশা নিয়ে, না আমি আমার সেই আকাঙ্ক্ষিত সূর্যোদয় ধারে কাছে কোথাও দেখতে পেলাম না।আজ একথা আমার কাছে আমার হাতের রেখার মতোই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, তুমি মিথ্যা বলেছিলে, জা...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
মাথার ভেতর এক ঝাঁক ছোট পাখি বেশ কিছু দিন থেকে কিচিরমিচির করে চলেছে হামেশা; শুধু রাত্রিবেলা গাঢ় ঘুমে হয়তো-বা নিঝুম নিশ্চুপ থাকে,-অনুমান করি। এভাবেই অস্বস্তিতে কাটছে জীবন। কে আমাকে বলে দেবে হায়, এই উপদ্রুত মাথায় ঝিঁঝির একটানা ধ্বনি কবে হবে শেষ। আজ এটা, কাল সেটা আছে তো লেগেই যেমন কৌতুকপ্রিয় বালকেরা বেড়ালের লেজে ভারি ঘণ্টা...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
যদি বলি কবিতার দিকে মুখ রেখে কাটিয়েছি কতকাল, মিথ্যা বলা হবে? যে কোনো ছুতোয় তার বুকে ঝুঁকে থাকি অপলক, বসি গিয়ে বৃক্ষচূড়ে কপোত-কপোত যথা-মাথায় থাকুন মাইকেল- তার প্রতি ভালবাসা মুদ্রিত করেছি সারাবেলা। কপোতাক্ষ নদীটির তীরে বসে মনে হয়, হায়, প্রকৃত কবিতা আজও আমার নিকট থেকে দূরে সরে আছে পর্দানশিনের লাস্যে; আমার ব্যথিত হৃদয়ের চি...
শামসুর রাহমান
সনেট
হে আমার বাল্যকাল তুমি সে কেমন মাল্যদান দেখেছিলে খুব বিস্ফারিত চোখে শহুরে সন্ধ্যায়? সে মালার ফুলগুলি স্মৃতির মতন ভেসে যায় মনোজ তীর্থের তীরে, যেন বা পাপড়িরা অফুরান- শতাব্দী শতাব্দী ধরে ঝরে যাবে, বেদনার্ত গান গাইবে জীবন জুড়ে। পথচারী যখন হারায় দিকচিহ্ন, এবং স্মৃতির সঙ্গে বিষণ্ণ ছায়ায় কথোপকথন করে, পথ হয়ে আরো সুনসান।সে পথ পত...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
ফুলকে সুন্দর বলা হয়, পাখিকেও, নক্ষত্রের নদীর রূপের খ্যাতি আছে যার পর্বতমালার সৌন্দর্য কীর্তিত বিশ্বময়। তুমি বস্তুজগতের অন্তর্গত, প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশিনী, কিন্তু তোমার এবং তার সুষমায় পার্থক্য অনেক। তোমাকে সুন্দরী বলা চলে, অন্তত আমি তো তাই বলি; চোখ মুখ, চুল গ্রীবা অথবা চিবুক -সবকিছু যেন সমন্বিত ইন্দ্রজাল বাস্তবিক।অথচ...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
এখন রোদের যৌবনের তাপ নেই, এটাই তো অনিবার্য পড়ন্ত বেলায়। প্রত্যুষের আনকোরা ক্ষণে মাথা ক’রে হেঁটে চলা দীর্ঘকাল ক্লান্তিকেই করে আলিঙ্গন, জানা আছে যুগ যুগান্তের পথচারীদের। এই যে পথিক আমি হেঁটেছি বিস্তর, সে-তো গোধূলি বেলায় পৌঁছে গেছে।এ চলার পথে কত প্রিয় মুখ থুবড়ে পড়েছে দিগ্ধিদিক, বেদনার্ত দাঁড়িয়েছি ক্ষণকাল, ফের অন্বিষ্টের প...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
বিস্মৃতির ডোবায় আমাকে ছুঁড়ে দিয়ে নিদ্বির্ধায় সে কি আজ তারাভরা আকাশকে শোভা দ্যাখে, নেয় গোলাপের ঘ্রাণ কিংবা অন্য কারো আলিঙ্গনে ধরা দেয় বারবার? না কি শোনে রাতে আমজাদ খাঁর দরবারী, গাছের সবুজে আর গেরুয়া মাটিতে বৃষ্টিপাত? বিছানায় নিঃসঙ্গতা ঘুমায় আমার পাশে আ জপায় আমাকে অন্ধকারে, সে তোমাকে হেলায় ফেলেছে মুছে দ্রুত জলছবির মতন।মন...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
কোথায় ভাসাব ভেলা? দূরন্ত জলের ধ্বনি শুনে কত বেলা গেল, তবুও আপন মাটির বিরাগ মূর্ত, ঠাঁই নেই ভাই প্রাণের পাড়ায় তাই জানি না কখন কে হারায়। ভয়ে চোখে চোখ রাখি, হাঁটুর বিবরে ঢাকি মুখ, বাঁচার ভাবনা ক্লান্ত হয়ে ফেরে মনে। যাবো না যেখানে কোনোদিন স্বপ্ন তার তেড়ে আসে কুকুরের মতো, মাচার সংসারে রাতে (নিজেকে শুনিয়ে বলি) যতটুকু পারো দে...
শামসুর রাহমান
সনেট
একটি দোতলা ফ্ল্যাটে লকলকে খরার দুপুরে কিঞ্চিৎ ছায়ার লোভে দেয় হানা। পয়লা বৈশাখে। ছিলাম আমরা বসে মুখোমুখি নতুনের ডাকে অনেকেই বহির্মুখী। বৈশাখী মেলায় যে রোদ্দুর ছিলো, তারই আভা বুকে নিয়ে, বলো কতদূর শৈশবের টলটলে পুকুর আমার বলে কাকে তোমার দু’চোখে পাই, কী খেয়ালে তুমি স্তব্ধতাকে হঠাৎ দুলিয়ে ফ্ল্যাটে হও পুরোনো গানের সুর।যখন তোম...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
বাসী বিছনায় আরো কিছুক্ষণ জাগরণে কাটিয়ে সফেদ-কালো স্বপ্নগাঁথা মনে, বাথরুমে দু’দিনের দাড়ি কামিয়ে, বেসিনে মুখ ধুয়ে ভোরবেলা আটটা বত্রিশে (পুরনো টাইমপিস সাক্ষী) না-লেখা অস্পষ্ট গুঞ্জরণ নিয়ে যাই খাবার টেবিলে, টোস্ট, ডিম, মধু জিভে ছড়ায় নিবিড় স্বাদ। প্লেট, কাপ এবং চামচ বেজে ওঠে ঐকতানে, হঠাৎ তোমার হাসির প্রপাত ছোঁয় আমাকে, অথচ ত...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
তিনি, অকৃতদার প্রৌঢ় অধ্যাপক, কির্কেগার্ডের ‘আইদার অর’ গ্রন্থে নিমগ্ন সেই কখন থেকে। দুপুর মিশে গেছে বিকেলে। টেবিলে চা জুড়িয়ে পানি। তশতরিতে একটি করুণ টোস্ট বিস্কুট ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে অধ্যাপকের দিকে। তিনি, নিঃসঙ্গ পাঠক, বই থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জানলার বাইরে তাকান। হলদে বিকেল হেলান দিয়েছে আকাশে। অধ্যাপকের মনে হলো কী এক ধূসর...
শামসুর রাহমান
সনেট
এই তার বাসগৃহ ছন্নছাড়া বাগানের ধারে অনেক বছর ধরে রয়েছে দাঁড়িয়ে রৌদ্রজলে। এখানে সুন্দর তার হস্তস্পর্শ যার করতলে রেখে যায় আগোচরে, তাকে আজো তো বনবাদাড়ে দেখা যায়, হাতে লাঠি, পিঠে বোঝাই সুদূর পাহাড়ে জনহীন নদীতীরে হাঁটে সে একাকী, পুনরায় ফিরে আসে একজন ব্যথিত কবির আস্তানায়, মানে সে বাসায় যার সত্তা লগ্ন বেহালার তারে।সে তার নিজে...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
জাহান্নাম নাকি? নিষ্ঠুরতা বশম্বদ ভয়ানক উৎপীড়কের, লন্ডভন্ড চতুর্দিক, পশুপাখি ফুড়িং, মৌমাছি পোড়ে দাবানলে, অসুরের নখ মাটি আঁচড়াচ্ছে জোরে, এখন উদ্ধারকল্পে ডাকি কাকে? দাউ দাউ বনভূমি। ডান দিকে সাপ ছোটে, বাম দিকে সন্ত্রস্ত নেউল, নেকড়েরা অকস্মাৎ মেষপাল, বৃক্ষগুলি জ্বলন্ত পাথরে মাথা কোটে। পালাতে চাই না, শাপশান্ত স্থগিত থাক আজ, ...
শামসুর রাহমান
রূপক
তুইও যাচ্ছিস চ’লে ক্রমশ যাচ্ছিস চ’লে কেমন জগতে। তোর জগতের কোনো সুস্পষ্ট ভূগোল কোনোমতে ত্রঁকে দিতে পারলেও হয়তো বা হতো বোঝাপড়া বড়ো জোর নিজের মনের সঙ্গে। কাফকা অনধিগম্য তোর, ভূতলবাসীর আর্ত অস্তিত্বের উপাখ্যান ওরে তোর তো জানার কথা নয়, তবু কেন কোন সে বিপাকে, ঘোরে ক্রমশ যাচ্ছিস চ’লে অমন জগতে? কোন মন্ত্র করেছে দখল তোকে, কার ষ...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
রাজরাজড়াকে হাসানোর ক্ষমতা আমার নেই, হীরে-জহরত ঝলসিত মহিলার কোলজোড়া জুলজুলে দৃষ্টি নিয়ে মোলায়েম থাবা নাচানোর, বারংবার গলার রঙিন ঘুন্টি দোলানোর শিল্প আমি আয়ত্তে আনিনি। বিশাল প্রাসাদে একা দিনরাত্রি অনেক বছর কাটায় যে লোক তার মতো হয়ে গেছি, বলা যায়- খাপছাড়া, অবসাদপ্রস্ত, ছায়াবিলাসে আশিরপদনখ নিমজ্জিত, বড় বেশি প্রতিধ্বনিময় এ আ...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
থমকে থেকো না; আর কতকাল এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে? এগিয়ে যাও। পেছনে হটতে চাও বুঝি? এখন সে পথ বন্ধ; প্রখর দুপুর বিকেলের সঙ্গে ঢলাঢলি শুরু করে দিয়েছে সে কবে, দেখতেই পাচ্ছো। এবার ঝাড়া দিয়ে ওঠো, নয়তো অন্ধকার অচিরে করবে গ্রাস তোমাকেই। তখন অরণ্যে একা-একা কেঁদে বেড়ালেও কেউ করবে না খোঁজ।যদি ভাবো, সময় তোমার মুঠোয় থাকবে বন্দী সারাক্ষণ,...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
চা খেতে-সংবাদপত্র পড়ি।স্থুলাক্ষরের হেডলাইন সন্ত্রাসীর মতো চোখ রাঙিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে আমাকে তাড়া করে, আমার দিকে উঁচিয়ে ধরে স্টেনগান। বিপন্ন উদ্বাস্তুর মতো ব’সে থাকি খোলা আকাশের নিচে, ভূমিকম্পে ধসে-পড়া আমার হাত একটি অস্পষ্টস্মৃত কাহিনীর সূচনা এবং সমাপ্তি।বার্ধক্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে একটু জিরিয়ে নেব, স্বপ্নের ডানার নিচে নিদ্রাশ...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
কবিতা লিখতে গিয়ে প্রায়শ হোঁচট খাই আজ, ধন্দ লাগে বার বার, আর অমাবস্যা নামে খাতার পাতায় যখন তখন, তুমি সাক্ষী। কী ক’রে ফিরিয়ে আনি পূর্ণিমাকে? জানি না সে মন্ত্র, শুধু ক্ষ্যাপা বাউলের মতো ঘুরি গেরুয়া রঙের লুপ্ত লিরিকের পথে। অন্ধত্ব আসন্ন জেনে আলোর ঝর্ণায় স্নান করি অবিরাম।বাগানের ফুল ছেঁড়া হচ্ছে অবিরত, মাস্তানের মরশুম চতুর্দ...
শামসুর রাহমান
সনেট
যখন শুধাও তুমি, ‘হে বন্ধু কেমন আছো’, আমি কী দেবো উত্তর ভেবে পাই না কিছুই। প্রশ্ন খুব শাদাসিধে, তবু থাকি নিরুত্তর; যিনি অত্নর্যামী তিনিই জানেন শুধু কী রকম আছে এ বেকুর দুঃখজাগানিয়া জনশূন্য ধুধু চরে। এ কেমন দীর্ঘ স্থায়ী পরবাস নিজেরই ভেতর? দীর্ঘ বেলা কাটে জন্মান্ধের মতো। সমাধি ফলক, ঝাউবন, উন্মাদ আশ্রয়, শূন্য ঘর চেতনায় করে ...
শামসুর রাহমান
সনেট
ক্ষমাহীন নিষেধের বেয়নেট উদ্যত চৌদিকে এবং ডাইনে বাঁয়ে কাঁটাতার, যেন বর্ধমান ফণিমনসার বন। ব্যক্তিগত নিবাসসমূহ গিসগিসে গোয়েন্দার অবাধ আস্তানা, শিরস্ত্রাণ- নিয়ন্ত্রিত জীবনের, কিছু গনতান্ত্রিক বিকার এখনো গোলাপ চায় এ মড়কে। মৃত্যুভয় ফিকে হ’য়ে এলে আমাদের প্রিয় লুম্পেন ইচ্ছার ব্যূহ হিজড়োর মতন নেচে ওঠে নিরাশ্রিত চমৎকার।প্রধান সড়...
শামসুর রাহমান
সনেট
জমিনের বুক চিরে লাঙলের পৌরুষে কৃষক শস্য তোলে কায়ক্লেশে; রকমারি রঙিন আনাজে ঋদ্ধ করে গৃহকোণ। মাঠ ছেড়ে চ’লে আসে সাঁঝে; কোনো কোনো জ্যোৎস্নারাতে কী ব্যাকুল করে সে পরখ, শোঁকে ফসলের ডগা। কিছুতেই ভাবে না নরক নিজের কুটিরটিকে, বিবির পাশেই শোয়, মাঝে উদোম বাচ্চার ঘুম, সারাদিন হাড়ভাঙা কাজে কাটে, রাতে স্বপ্ন দ্যাখে পঙ্গপাল নামে বেধড়...
শামসুর রাহমান
রূপক
ব্যাপারটা কী ভেবে দেখেছেন একবারও? যতবার যাত্রা শুরু করি, ততবারই পা এসে ঠেকে সর্প কুণ্ডলীর মতো এক কানাগলিতে। এমন হবার কথা নয়, তবু হচ্ছে বারবার একই রকম। কখনো কখনো আমার মনে হয়, বিসমিল্লাতেই গলদ নিশ্চয়; নইলে কেন এই পুনরাবৃত্তির গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খেয়ে মরছি? সত্যি বলতে কি, এই কৃষ্ণপক্ষে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি প্রকৃত পদপ্রদর্শ...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
পর্যটনে কেটেছে সময়; হেঁটে হেঁটে কায়ক্লেশে নিঃসঙ্গ ধূসরপ্রান্তে এসে গেছি। বসে থাকি একা, অতীতের হাত কাঁধে, আমার চোখের জ্যোতি নিভে যেতে চায়। সম্প্রতি টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে নিশুত রাতের গহন বাণী অক্ষরের আড়ম্বরহীন আয়োজন ধরে রাখি। প্রাতঃকালে আকর্ষণ কমে রচিত বাক্যের প্রতি। যেন আমি সম্পর্ক-রহিত কবিতার সঙ্গে, ছন্নছাড়া আচরণে মেত...
শামসুর রাহমান
প্রেমমূলক
হর পরহেজগার মুসলমানের কণ্ঠে প্রায় প্রতিক্ষণ উচ্চারিত হয় আল্লা-রসুলের নাম, ভক্তিরসে নিমজ্জিত হিন্দু হরে কৃষ্ণ হরে রাম, দুর্গা দুর্গা জপেন সর্বদা, নিবেদিত ভক্তপ্রাণ খৃস্টান গির্জায় কিংবা ঘরে যীশু আর মাতা মেরী উচ্চারণে, স্তবে অনলস। কৃচ্ছ্রনিষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষু বুদ্ধের উদ্দেশে ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ মন্ত্র আওড়ান পবিত্রতা ধ্যান...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
সকালে ফাউস্ট পড়লাম, কিছুক্ষণ তরতাজা সংবাদপত্রও বটে, সদ্য-দেখা যুদ্ধার্ত পোলিশ ফিল্মের নানান শট মনে পড়ে। করি ঘষামাজা পঙক্তিমালা কবিতায়, জানালায় মেফিস্টোফিলিস হাসে, পা দোলায় ঘন ঘন, তার উত্তোলিত ভুরু সর্বক্ষণ জপে মৃত্যু, কখনো বা হঠাৎ দাঁড়িয়ে আমাকে শোনায় তত্ত্ব রাশি রাশি। ভেনাসের ঊরু অকস্মাৎ উদ্ভাসিত কিংবা প্ল্যাটো দিলেন ব...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খানকি মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাওআবে, কোন্ মামদির পো সামনে খাড়ায়? যা কিনার, দেহস না হপায় রাস্তায় আমি নামছি, লৌড় দে; না অইলে হো...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
চমৎকার পাখি পুষি, নিজে স্বপ্নপোষ্য হয়ে আছি আজ অব্দি, মাঝে-মধ্যে গান ধরি, শব্দ গাঁথি কিছু আমার ভেতরে যে নিমগ্ন কর্মচারী মাথা নিচু ক’রে থাকে তার মেদমজ্জা চাটে পুপ্ত নীল মাছি। অলপ্পেয়ে পদাবলী একটি মনের কাছাকাছি পৌঁছুতে চেয়েও কায়ক্লেশে ঝরে যায় অন্তরালে, একটি দীপ্তশ্রী মুখ সরে যায়, এ মুখ বাড়ালে আমার সর্বস্ব গেছে তবু এই পৃথি...
শামসুর রাহমান
সনেট
আমার সুপ্রিয়া মুখ ভার করে আছে, বুকে তার কান্না ঠেলে ঠেলে ওঠে নিশিদিন, অব্যক্ত আক্রোশে ফেটে যেতে চায় বুক, কখনো হঠাৎ রুদ্র রোষে জ্বলে ওঠে। অসহায় চোখে দ্যাখে হয়েছে উজাড় কোনো কোনো শান্ত গ্রাম গুলির ধমকে, হাহাকার শোনা যায় দিকে দিকে, যে রকম দূর একাত্তরে উঠত মাতম এই দুখিনী বাংলায় ঘরে ঘরে; নির্যাতনে কম দড় নয় পুলিশ ও বিডিআর।সরক...
শামসুর রাহমান
চিন্তামূলক
হঠাৎ পৃথিবীটাকে কেমন আলাদা মনে হয় বালকের। ভেণ্ডারের কাছ থেকে তৃষ্ণার্ত দুপুরে কিনেছে আইসক্রিম ছোট মাটির কলস ভেঙে জমানো পয়সা বের করে। পৌরপথে হেঁটে-হেঁটে বালক আইসক্রিম করছে লেহন; রূপকথা থেকে এক রাজা এসেছেন এ শহরে, মনে হলো তার; কিন্তু কী বিস্ময়, সে ব্যতীত কেউ তাকে ঠিক লক্ষ করছে না, তাঁর পোশাকের বাহার ভীষণ ব্যর্থ সাধারণ পো...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
হঠাৎ কোত্থেকে বলা নেই কওয়া নেই অসংখ্য শকুন উড়ে এসে জুড়ে বসলো বস্তির খুব কাছে। পুরো জায়গা কালো আসমানের বিরাট এক অংশ হয়ে প্রতিভাত সব পথিকের দৃষ্টিতে। একজন বুড়োসুড়ো লোক টলতে টলতে ভুলক্রমে প্রায় শকুনের ঝাঁকের গা ঘেঁসে হেঁটে যাওয়ার ক্ষণে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো মাটিতে। অবসন্ন, প্রায়-অচেতন বৃদ্ধটিকে ছেঁকে ধরলো শকুনের পাল। ওদের হি...
শামসুর রাহমান
সনেট
হেঁটে হেঁটে বেশ কিছুদূর এসে আজ মনে হয়- এই যে এতটা পথ পেরিয়ে এলাম কত আলো, কত অন্ধকার খেলা করেছে আমার সঙ্গে। ভালো, মন্দ এসে ঘিরেছে আমাকে আর ক্রূর দ্বন্দ্বময় অন্তরের ইতিহাস রয়ে যাবে অজানা নিশ্চয়। যদি নগ্নতায় উদ্ভাসিত হতো অন্তর্লোক, তবে অনেকে আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতো নীরবে, কেউ কেউ দিতো টিটকিরি দিব্যি রাজপথময়।আমরা এমন য...
শামসুর রাহমান
মানবতাবাদী
রক্তচক্ষু রাম বলে রহিমকে, ‘এই দ্যাখ আমার রামদা, তোকে বলি দেবো’ রহিম পাকিয়ে চোখ বলে রামকে, ‘বেদ্বীন, এই তলোয়ার দিকে তোকে টুক্‌রো টুক্‌রো করে কুত্তাকে খাওয়াবো’। অনন্তর রামদা এবং তলোয়ারে কী ভীষণ ঠোকাঠুকি।একজন প্রশান্ত মানুষ, অস্ত্রহীন, ছুটে এসে দাঁড়লেন দু’জনের মাঝখানে, কণ্ঠে তার অনাবিল মৈত্রীর দোহাই। দু’দিকেই দুই অস্ত্র দ...
শামসুর রাহমান
সনেট
তোমার কি মনে পড়ে আলোকিত ঘরে সন্ধেবেলা তুমি খুব রেগে গিয়েছিলে, যেন অন্তরাল থেকে ভীষণ বিকারী কেউ চোখে লালসার রঙ মেখে তোমাকে দেখেছে ফেলে গগ্ন? অথচ আমার খেলা বুঝতে পারোনি তুমি; চুপিসারে ছিপছিপে ভেলা ভাসিয়েছিলাম আমি আটপৌরে বাস্তবকে ঢেকে একটি স্বপ্নের মসলিনে; আমার ভেতরে পেকে উঠেছিলো কামফল উজিয়ে সকল অবহেলা।রাত বাড়ে, তোমার ক্র...