content stringlengths 0 129k |
|---|
এখন প্রশ্ন এই, যদি ইহা সত্য হয়, যদি সেই শুদ্ধস্বরূপ অনন্ত আত্মা এই-সকলের ভিতর প্রবিষ্ট হইয়া থাকেন, তবে তিনি কেন সুখদুঃখ ভোগ করেন, কেন তিনি অপবিত্র হইয়া দুঃখভোগ করেন? |
১ কঠ উপ., ২/১/১৪ |
২ ঐ., ২/২/২ |
৩ ঐ., ২/২/৯-১০ |
উপনিষদ্ বলেন, তিনি দুঃখ অনুভব করেন না |
সূর্যো যথা সর্বলোকস্য চক্ষুর্ন লিপ্যতে চাক্ষুষৈর্বাহ্যদোষৈঃ |
একস্তথা সর্বভূতান্তরাত্মা ন লিপ্যতে লোকদুঃখেন বাহ্যঃ |
- সর্বলোকের চক্ষুস্বরূপ সূর্য যেমন চক্ষুগ্রাহ্য বাহ্য অশুচি বস্তুর সহিত লিপ্ত হন না, তেমনি একমাত্র সর্বভূতান্তরাত্মা সংসারের দুঃখের সহিত লিপ্ত হন না, কারণ তিনি আবার জগতের অতীত |
আমার এমন রোগ থাকিতে পারে, যাহাতে আমি সবই পীতবর্ণ দেখি, কিন্তু তাহাতে সূর্যের কিছুই হয় না |
একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা একং রূপং বহুধা যঃ করোতি |
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরাস্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষাম্ |
- যিনি এক, সকলের নিয়ন্তা এবং সর্বভূতের অন্তরাত্মা; যিনি স্বকীয় এক রূপকে বহুপ্রকার করেন, তাঁহাকে যে-জ্ঞানিগণ নিজেদের মধ্যে দর্শন করেন, তাঁহাদেরই নিত্য সুখ, অন্যের নহে |
নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানামেকো বহূনাং যো বিদধাতি কামান্ |
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধেরাস্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্ |
- যিনি অনিত্য বস্তুসমূহের মধ্যে নিত্য, যিনি চেতনাবানদিগের মধ্যে চেতন, যিনি এক হইয়াও বহু জীবের কাম্যবস্তুসকল বিধান করিতেছেন, তাঁহাকে যে জ্ঞানিগণ আত্মস্বরূপে দর্শন করেন, তাঁহাদেরই নিত্য শান্তি, অপরের নহে |
বাহ্য জগতে তাঁহাকে কোথায় পাওয়া যাইবে? সূর্য চন্দ্র বা তারায় তাঁহাকে কিরূপে পাইবে? |
ন তত্র সূর্যোভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ |
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্ব মদং বিভাতি |
- সেখানে সূর্য, চন্দ্র, তারকা সব নিষ্প্রভ, বিদ্যুৎসমূহও প্রকাশ পায় না, এ অগ্নি সেখানে কোথায়? তাঁহারই আলোতে সকলে আলোকিত, তাঁহারই দীপ্তিতে সবকিছু দীপ্তি পাইতেছে |
১ কঠ উপ., ২/২/১১ |
২ ঐ., ২/২/১২ |
৩ ঐ., ২/২/১৩ |
৪ ঐ., ২/২/১৫ |
'উর্ধ্বমূলোহবাক্শাখ এষোহশ্বত্থঃ সনাতনঃ |
তদেব শুক্রং তদ্ ব্রহ্ম তদেবা-মৃতমুচ্যতে |
তস্মিঁল্লোকাঃ শ্রিতাঃ সর্বে তদু নাত্যেতি কশ্চন |
এতদ্বৈ তৎ |
'১ - ঊর্ধ্বমূল ও নিম্নগামী শাখা সহ এই চিরন্তন অশ্বত্থবৃক্ষ অর্থাৎ সংসারবৃক্ষ রহিয়াছে |
তিনিই উজ্জ্বল, তিনিই ব্রহ্ম, তিনিই অমৃতরূপ উক্ত হন |
সমুদয় লোক তাঁহাতে আশ্রিত হইয়া রহিয়াছে |
কেহই তাঁহাকে অতিক্রম করিতে পারে না |
ইনিই সেই আত্মা |
বেদের ব্রাহ্মণভাগে নানাবিধ স্বর্গের কথা আছে |
উপনিষদের মত এই যে, এই স্বর্গে যাইবার বাসনা ত্যাগ করিতে হইবে |
ইন্দ্রলোকে, বরুণলোকে যাইলেই যে ব্রহ্মদর্শন হয়, তাহা নহে, বরং এই আত্মার ভিতরেই ব্রহ্মদর্শন সুস্পষ্টরূপে হইয়া থাকে |
'যথাদর্শে তথাত্মনি যথা স্বপ্নে তথা পিতৃলোকে |
যথাপ্সু পরীব দদৃশে তথা গন্ধর্বলোকে ছায়াতপয়োরিব ব্রহ্মলোকে |
'২ - যেমন আরশিতে মানুষ আপনার প্রতিবিম্ব পরিষ্কাররূপে দেখিতে পাই, তেমনি আত্মাতে ব্রহ্মদর্শন হয় |
যেমন স্বপ্নে আপনাকে অস্পষ্টরূপে অনুভব করা যায়, তেমনি পিতৃলোকে ব্রহ্মদর্শন হয় |
যেমন জলে লোকে আপনার রূপ দর্শন করে, তেমনি গন্ধর্বলোকে ব্রহ্মদর্শন হয় |
যেমন আলোক ও ছায়া পরস্পর পৃথক্, সেইরূপ ব্রহ্মলোকে ব্রহ্ম ও জগতের পার্থক্য স্পষ্ট উপলব্ধি হয় |
কিন্তু তথাপি পূর্ণরূপে ব্রহ্মদর্শন হয় না |
অতএব বেদান্ত বলে, আমাদের নিজ আত্মাই সর্বোচ্চ স্বর্গ, মানবত্মাই পূজার সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির, সর্বপ্রকার স্বর্গ হইতে শ্রেষ্ঠ, কারণ এই আত্মার মধ্যে যেভাবে সেই সত্যকে সুস্পষ্ট অনুভব করা যায়, আর কোথাও তত স্পষ্ট অনুভব হয় না |
এক স্থান হইতে স্থানান্তরে গেলেই যে এই আত্মদর্শন সম্বন্ধে বিশেষ কিছু সাহায্য হয়, তাহা নহে |
ভারতবর্ষে যখন ছিলাম, তখন মনে হইত, কোন গুহায় বাস করিলে হয়তো খুব স্পষ্ট ব্রহ্মানুভূতি হইবে; দেখিলাম, তাহা নহে |
তারপর ভাবিলাম, হয়তো বনে গেলে সুবিধা হইবে, তারপর কাশীর কথা মনে হইল |
সব স্থানই একরূপ, কারণ আমরা নিজেরাই নিজেদের জগৎ গঠন করিয়া লই |
যদি আমি অসাধু হই, সমুদয় জগৎ আমার পক্ষে মন্দ বলিয়া মনে হইবে |
উপনিষদ্ ইহাই বলেন |
১ কঠ উপ., ২/৩/১ |
২ ঐ., ২/৩/৫ |
আর সেই একই নিয়ম সর্বত্র খাটিবে |
যদি এখানে আমার মৃত্যু হয় এবং যদি স্বর্গে যাই, সেখানেও এখানকারই মতো দেখিব |
যতক্ষণ না তুমি পবিত্র হইতেছ, ততক্ষন গুহা অরণ্য বারাণসী অথবা স্বর্গে যাওয়ায় বিশেষ কিছু লাভ নাই; আর যদি তোমার চিত্তদর্পণকে নির্মল করিতে পারো, তবে যেখানেই থাকো না কেন, তুমি প্রকৃত সত্য অনুভব করিবে |
অতএব এখানে ওখানে যাওয়া বৃথা শক্তিক্ষয় মাত্র - সেই শক্তি যদি চিত্তদর্পণের নির্মলতা-সাধনে ব্যয়িত হয়, তবেই ঠিক হয় |
নিম্নলিখিত শ্লোকে আবার ঐভাব বর্ণিত হইয়াছে : |
ন সন্দশে তিষ্ঠতি রূপমস্য, ন চক্ষুষা পশ্যতি কশ্চনৈনম্ |
হৃদা মনীষা মনসাভিক৯প্তো ষ এতদ্বিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি |
- ইঁহার রূপ দর্শনের বিষয় হয় না |
কেহ তাঁহাকে চক্ষুদ্বারা দেখিতে পায় না |
হৃদয়, সংশয়রহিত বুদ্ধি এবং মনন দ্বারা তিনি প্রকাশিত হন |
যাঁহারা এই আত্মাকে জানেন, তাঁহারা অমর হন |
যাঁহারা আমার রাজযোগের বক্তৃতাগুলি শুনিয়াছেন, তাঁহাদিগের অবগতির জন্য বলিতেছি, সে-যোগ জ্ঞানযোগ হইতে কিছু ভিন্ন রকমের |
জ্ঞানযোগের লক্ষণ এইরূপ কথিত হইয়াছে : |
যদা পঞ্চাবতিষ্ঠন্তে জ্ঞানানি মনসা সহ |
বুদ্ধিশ্চ ন বিচেষ্টতি তামাহুঃ পরমাং গতিম্ |
- যখন ইন্দ্রিয়গুলি - পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় সংযত হয়, মানুষ যখন ঐগুলিকে নিজের দাসের মতো করিয়া রাখে, যখন উহারা আর মনকে চঞ্চল করিতে পারে না, তখনই যোগী পরমগতি লাভ করেন |
যদা সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ |
অথ মর্ত্যোহমৃতো ভতত্যত্র ব্রহ্ম সমশ্নুতে |
যদা সর্বে প্রভিদ্যন্তে হৃদয়স্যেহ গ্রন্থয়ঃ |
অথ মর্ত্যোহমৃতো ভবত্যেতাবদ্ধ্যনুশসনম্ |
- যে-সকল কামনা মর্ত্যজীবের হৃদয়কে আশ্রয় করিয়া আছে, সেই সমুদয় যখন বিনষ্ট হয়, তখন মর্ত্য অমর হয় এবং এখানেই ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হয় |
যখন ইহলোকে হৃদয়ের গ্রন্থিসমূহ ছিন্ন হয়, তখন মর্ত্য অমর হয় - এইমাত্র উপদেশ |
১ কঠ উপ., ২/৩/৯ |
২ ঐ., ২/৩/১০ |
৩ ঐ., ২/৩/১৪-১৫ |
সাধারণতঃ লোকে বলিয়া থাকে বেদান্ত, শুধু বেদান্ত কেন, ভারতীয় সকল দর্শন ও ধর্মপ্রণালীই এই জগৎ ছাড়িয়া উহার বাহিরে যাইতে বলিতেছে |
কিন্তু পূর্বোক্ত শ্লোকদ্বয় হইতেই প্রমাণিত হইবে যে, আমাদের দার্শনিকগণ স্বর্গ অথবা আর কোথাও যাইতে চাহিতেন না, বরং তাঁহারা বলেন, স্বর্গের ভোগ ও সুখ-দুঃখ ক্ষণস্থায়ী |
যতদিন আমরা দুর্বল থাকিব, ততদিন আমাদিগকে স্বর্গ-নরকে ঘুরিতেই হইবে, কিন্তু বস্তুতঃ আত্মাই একমাত্র সত্য |
তাঁহারা ইহাও বলেন, আত্মহত্যা দ্বারা এই জন্মমৃত্যুপ্রবাহ অতিক্রম করা যায় না |
তবে অবশ্য প্রকৃত পথ পাওয়া বড় কঠিন |
পাশ্চাত্যদিগের ন্যায় হিন্দুরাও সব হাতে-কলমে করিতে চান; তবে জীবন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পৃথক্ |
পাশ্চাত্যগণ বলেন : বেশ ভাল একখানি বাড়ি কর, উত্তম খাদ্য ও পরিচ্ছদ সংগ্রহ কর, বিজ্ঞানের চর্চা কর, বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতি কর |
এইগুলি করিবার সময় তাঁহারা খুব কাজের লোক |
কিন্তু হিন্দুরা বলেন, জ্ঞান-অর্থে আত্মজ্ঞান - তাঁহারা সেই আত্মজ্ঞানের আনন্দে বিভোর হইয়া থাকিতে চাহেন |
আমেরিকায় একজন বিখ্যাত অজ্ঞেয়বাদী বক্তা১ আছেন - তিনি খুব ভালো লোক এবং সুবক্তা |
তিনি ধর্ম সম্বন্ধে একটি বক্তৃতা দেন; তাহাতে তিনি বলেন, ধর্মের কোন প্রয়োজন নাই, পরলোক লইয়া মাথা ঘামাইবার আমাদের কিছুমাত্র আবশ্যকতা নাই |
তাঁহার মত বুঝাইবার জন্য তিনি এই উপামাটি প্রয়োগ করিয়াছিলেন : জগৎরূপ এই কমলালেবুটি আমাদের সম্মুখে রহিয়াছে, উহার সব রসটা আমরা বাহির করিয়া লইতে চাই |
আমার সঙ্গে তাঁহার একবারমাত্র সাক্ষাৎ হয় |
আমি তাঁহাকে বলি, আমিও আপনার সঙ্গে একমত, আমারও নিকট একটি ফল রহিয়াছে - আমিও ইহার রসটুকু সব খাইতে চাই |
তবে আমাদের মতভেদ কেবল ঐ ফলটি কি, এই লইয়া |
আপনি উহাকে কমলালেবু মনে করিতেছেন - আমি ভাবিতেছি আম |
আপনি মনে করেন, জগতে আসিয়া খাইতে পরিতে পাইলেই যথেষ্ট হইল এবং কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব জানিতে পারিলেই চূড়ান্ত হইল; কিন্তু আপনার বলিবার কোনই অধিকার নাই যে, উহা ছাড়া মানুষের আর কিছু কর্তব্য নাই |
আমার পক্ষে ঐ ধারণা একেবারে কিছুই নয় |
১ . |
আপেল ভূমিতে কিরূপে পড়ে, অথবা বৈদ্যুতিক প্রবাহ কিরূপে স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, যদি কেবল এইটুকু জানাই জীবনের একমাত্র কাজ হয়, তবে তো আমি এখনই আত্মহত্যা করি |
আমার সংকল্প - সকল বস্তুর মর্মস্থল অনুসন্ধান করিব - জীবনের প্রকৃত রহস্য কি, তাহা জানিব |
তোমরা প্রাণের ভিন্ন ভিন্ন বিকাশের আলোচনা কর, আমি প্রাণের স্বরূপ জানিতে চাই |
আমার দর্শন বলে - জগৎ ও জীবনের সমুদয় রহস্যই জানিতে হইবে - স্বর্গ নরক প্রভৃতি কুসংস্কার দূর করিয়া দিতে হইবে, যদিও এই পৃথিবীর মতো ঐগুলির ব্যাবহারিক সত্তা রহিয়াছে |
আমি এই আত্মার অন্তরাত্মাকে জানিব - উহার প্রকৃত স্বরূপ জানিব - উহা কি, তাহা জানিব; শুধু উহা কিভাবে কাজ করিতেছে এবং উহার প্রকাশ কি, তাহা জানিলেই আমার তৃপ্তি হইবে না |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.