content stringlengths 0 129k |
|---|
পুলকিত হই, শিহরিত হই |
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয় |
সেদিনকে আমরা বলি স্বাধীনতা দিবস |
এরপর দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ হয় |
মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয়ী হই |
আর এ জন্য ১৬ ডিসেম্বর আমাদের মহান বিজয়ের দিন, . এ দিনটির জন্য সমস্ত বাংলাদেশীর এক সুদীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিল |
অপেক্ষার দীর্ঘ রজনী শেষে আমরা খুঁজে পাই উদ্ভাসিত শুভ্র সকাল |
বিজয়ের মাস এলেই তাই আমরা নতুন করে ভাবি |
কী ভাবি আমরা? |
চোখ-কান খোলা বাংলাদেশী মাত্রই ডিসেম্বর বিজয়ের দিনটি পালনের আগে ভাবেন- এক. আমরা কি চূড়ান্ত বিজয় পেয়েছি? দুই. কখনো আমরা খুঁজে পাবো প্রকৃত বিজয়? তিন. বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা কী? চার. শিশু-কিশোর হিসেবে চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য আমাদের কি কিছু করার আছে? আজ আমরা সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজব এবার |
আমরা কি চূড়ান্ত বিজয় পেয়েছি? |
এ প্রশ্নের সত্যিকার উত্তর- না |
আমরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি, পেয়েছি লাল-সবুজের এক মহিমান্বিত পতাকা, পেয়েছি একটি জাতীয়সঙ্গীত, পেয়েছি একটি সুন্দর সংসদ, একদল স্বাধীনতাপ্রেমিক মানুষ |
কিন্তু কেবল এটিই ছিল না আমাদের চাওয়া-পাওয়া |
আমরা চেয়েছিলাম প্রকৃত স্বাধীনতা |
মানুষের মতপ্রকাশের, অধিকারের, আনন্দ প্রকাশের |
বেঁচে থাকার এবং আত্মমর্যাদাপূর্ণ জীবনের স্বাধীনতা |
কিন্তু বিজয়ের ৪২টি বছর পরও আমাদের সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি |
আজ আবার তাকাই বিবর্ণ বাংলাদেশের দিকে |
স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ বাক, ব্যক্তি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত |
সরকার জনগণের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে |
নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করছে |
সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না |
সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিজিবিরা হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে ফালানীর ঝুলানো লাশ |
প্রতিবাদ করতে পারেনি বিএসএফের হত্যাকাণ্ডের |
আর তারাই কি না পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে প্রতিবাদী বাংলাদেশের মা-বোনদের, বাবা-ভাইদের |
এটাই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা |
বেশি দামে কেনা, কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা |
আমরা যেন বিদেশী বর্গির থাবা থেকে মুক্ত-স্বাধীন হয়ে আরেক দল বাংলাভাষী বর্গির দখলে চলে গেছি |
নতুন স্বৈরাচার আমাদের চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে |
বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতা কী? |
প্রথমত: যারাই বাংলাদেশের ক্ষমতার যান তারাই যেন সবাই অতীত ভুলে যান |
স্বাধীনতার পর ক্ষমতায় ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান |
১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় ছিলেন |
তার দলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে তিনি এ দেশটা চালান |
কিন্তু বেশি দিন যেতে না যেতেই দেশের সকল দল নিষিদ্ধ করেন |
সকল পত্রিকা বন্ধ করে চারটি মাত্র সরকারি পত্রিকা চালু রাখেন |
একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেন |
দেশের মানুষ অত্যাচারের স্টিম রোলার থেকে বাঁচার জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকে |
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এভাবেই নষ্ট হয় বাংলাদেশে |
প্রতিক্রিয়া হিসেবে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট রাতে সামরিক অভ্যুত্থানের শিকার হয়ে সপরিবারে জীবন দেন দেশের স্বাধীনতার নেতা |
নন্দিত নেতা থেকে নিন্দিত হয়ে তিনি বিদায় নেন |
দ্বিতীয়ত : গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারেনি এখানে |
'৭৫ এর পটপরিবর্তনের পর '৭৭-এ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেন |
কিন্তু ১৯৮১ সালে এই জননন্দিত শাসককে হত্যা করে বিভ্রান্ত সেনা কর্মবিভাগ |
১৯৮৯ সালের ২৪ মার্চ বন্দুকের নলের মুখে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন স্বৈরাচারী শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ |
৯ বছরের দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মুখে এরশাদের পতন হয় |
১৯৯১ সালের ডিসেম্বর |
এরপর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা চালু হয় |
কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে পরপর তিনটি নির্বাচন হয় |
যে নির্বাচনের ফলাফল সবাই মেনে নেয় |
আন্তর্জাতিক বিশ্বও স্বীকৃতি প্রদান করে |
কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয় বর্তমান সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংবিধানে পরিবর্তন আনেন এবং আদালতের মাধ্যমে তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে রায় আদায় করে নেন |
এভাবে তীব্রভাবে ব্যাহত হয় আমাদের গণতান্ত্রিক ধারা এবং নষ্ট হয়ে যায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি |
আমরা এখন সহাবস্থানের পরিবর্তে দূরত্বে বিশ্বাসী, সহিষ্ণুতার বদলে অসহিষ্ণুতার অনুসারী |
শান্তিপূর্ণ মতবিরোধের পরিবর্তে সন্ত্রাস ও সঙ্ঘাতের রাজনীতিতে অভ্যস্ত |
এভাবে কখনোই এগোতে পারবে না আমাদের প্রিয় স্বদেশ, সুজলা-সুফলা শস্য- শ্যামলা বাংলাদেশ |
তৃতীয়ত : দেশপ্রেমের বড় অভাব |
স্বাধীন বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় অভাব দেশপ্রেমের, দেশপ্রেমিক মানুষের |
বক্তৃতায় সবাই বলে, 'ব্যক্তির চেয়ে দেশ বড়, দলের চেয়ে দেশ বড় |
' কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সবাই এ কথা বেমালুম ভুলে যায় |
সরকারি কর্মকর্তারা আছেন দেশের স্বার্থ বিক্রি করে, ঘুষের টাকায় ভাগ্য গড়ার তালে |
রাজনীতিকরা আছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার ধান্ধায় |
জনগণের স্বার্থের চাইতে নিজেদেন পকেট ও ক্ষমতার চেয়ার তাদের কাছে অনেক প্রিয় |
ব্যবসায়ীরা আছেন মানুষের পকেট ডাকাতি করে মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত |
আমাদের না আছে দেশপ্রেমিক অভিভাবক, অধ্যবসায়ী ছাত্র, যতœবান শিক্ষক, উদার রাজনীতিক, সজ্জন ব্যবসায়ী, সৎ সরকারি কর্মকর্তা, সাহসী আইন প্রয়োগকারী |
ফলে দেশ ওপরের দিকে না গিয়ে ছুটছে গভীর খাদের দিকে |
চতুর্থত : কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না |
বলা হয়, 'ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না |
' আর তাই বাংলাদেশে একই ভুলের বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে |
যে ভুল করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, সেই একই ভুল বারবার করছেন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা |
যে ভুল করেছিলেন জিয়াউর রহমান সেই একই ভুল করেছেন বেগম খালেদা জিয়া |
শাসক হিসেবে কেউই কারো ভুল থেকে শিক্ষা নেননি |
এর বড় কারণ হলো আমাদের জন্য উন্নত ও সঠিক ইতিহাস লেখার ও সবাইকে জানানোর ব্যবস্থা নেই |
আমাদের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের কোনো শেষ নেই |
পঞ্চমত : শিশুদের জন্য নেই কোনো পরিকল্পনা |
দুঃখজনক হলেও সত্যি কথা এটি |
আমাদের শিশুদের জন্য কোনো সঠিক সুস্থ পরিকল্পনা নেই |
তাদেরকে সুস্থ দেহ, সুন্দর মন আর উন্নত চরিত্র দিয়ে গড়ে তোলার আয়োজনের অভাব |
পাঠ্যবইসহ পাঠ্যক্রম আর খেলাধুলার আয়োজন পর্যাপ্ত নয় |
ফলে শিশু-কিশোররা সত্যি সত্যি সব দিক মিলিয়ে স্বপ্নের শিশু হিসেবে গড়ে উঠতে পারছে না |
কখন খুঁজে পাবো প্রকৃত বিজয়? |
চাই একটি সুন্দর বসুন্ধরা আর চাই একদল সৎ নাগরিক |
বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে সবার আগে |
এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে হবে |
পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে |
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে |
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলীসহ প্রধান প্রধান নদীর পাড় দখলমুক্ত করতে হবে |
জলাশয় বন্ধ করে যত্রতত্র আবাসন গড়ার নামে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা চলবে না |
আবার হাসিতে ভরে তুলতে হবে কৃষকের মুখ |
সোনালি আঁশ পাটের বাজার ফিরিয়ে আনতে হবে |
এভাবে বাঁচাতে হবে ধরণী-পৃথিবীকে |
এ কাজ করতে হলে লাগবে একদল সৎ নাগরিক |
সৎ নাগরিক, সাহসী মানুষ আর দেশপ্রেমিকের অভাব আজ সর্বত্র |
কাজটি করতে হবে সবাইকে |
এটি কারো একার কাজ নয় |
সরকার-বিরোধী দল-সাধারণ মানুষ, প্রশাসন-ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে হাতে হাত মিলিয়ে কাজটি করতে হবে |
কারণ বাংলাদেশ বাঁচলেই আমরা বাঁচব |
ডিজিটাল পদ্ধতিতে সুইচ টিপলেই এ কাজ হয়ে যাবে না |
আমার সন্তান যেন বাঁচে দুধে-ভাতে |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.