content
stringlengths
0
129k
থানার সামনে বিক্ষোভ চলা কালে, এক দল যুবক, যাদের মুসলমান বলে মনে করা হচ্ছে, তারা গলি দুর্গা মন্দিরের সামনে জড়ো হয়
মন্দিরটি ছোট
সেটি গুপ্তর বাড়ির উল্টোদিকে লাল কুয়ার একটা সরু গলির মধ্যে অবস্থিত
মন্দিরের প্রবেশদ্বারে বেশ কিছু দেবতার বিগ্রহ আছে
মন্দিরটি আর পাঁচটা মন্দিরের মত নয়
সেখানে বিগ্রহ গলি দুর্গা মন্দিরের গলির দেওয়ালের গায়ে সারিবদ্ধভাবে লাগানো থাকে
"রাত ১২.৩০ নাগাদ, কিছু লোক মন্দিরের বাইরে জড়ো হয়, এবং মূর্তিগুলি লক্ষ করে পাথর ছুঁড়তে থাকে," বলেন গলি দুর্গা মন্দির গলির এক বাসিন্দা
অন্য এক বিচলিত বাসিন্দা বলেন, "তারা সবাই মুসলমান যুবক ছিল
মন্দিরে আগুনও ধরিয়ে দেয় তারা
যখন পোড়া অংশগুলি দেখতে চাওয়া হয়, তাঁরা বলেন, "আমরা তো এখানেই ছিলাম
আমরা তো সবই দেখেছি
প্রমাণের কি প্রয়োজন?"
স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের উদ্যোগে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি স্থাপন হয়
কিছু মুসলমান ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরটি পুনর্গঠন করার খরচা মেটানোর প্রস্তাবও দেন
কিন্তু মন্দিরের গলিতে বসবাসকারী হিন্দুরা সন্তুষ্ট হন না
যে যাই বলুক, আমরা এখানে সংখ্যালঘু
ওরা এসে মন্দির আক্রমণ করে
আমাদের আক্রমণ করা থেকে ওদের কে রুখবে? আমরা তাদের কাউকে আক্রমণ করিনি
তাহলে ওরা কেন মন্দিরে এলো?" জানতে চান ওই গলির এক বাসিন্দা
মন্দিরটির একটি অংশের দিকে মুখ-করা একটি মাত্র সিসিটিভি ক্যামেরা সেদিনকার ঘটনার ছবি তোলে
বুম সেই ফুটেজ হাতে পায়
সিসিটিভি ফুটেজটিতে রাত ১২.৪০-এর ঘটনা ধরা ছিল
তাতে কিছু লোককে ঢিল ছুঁড়তে দেখা যায়
ফুটেজে মন্দিরটি দেখা যাচ্ছিল না
চৌরি বাজারের গলি দুর্গা মন্দিরের বিগ্রহদের পাথর ছোঁড়ার সিসিটিভি ফুটেজ
যারা ঢিল ছুঁড়ছিল, স্থানীয় মানুষরা তাদের সনাক্ত করতে পারেনি
হাউজ কাজি পুলিশ অবশ্য চার জন নাবালক সহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে
তাদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা ও মন্দিরের ক্ষতিসাধন করার অভিযোগ আনা হয়
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকার করে পুলিশ
হিন্দু বাসিন্দাদের কাছে পাঠানো হয় ভুয়ো মেসেজ
রাত দুটো নাগাদ, ওই এলাকার হিন্দুদের কাছে একটি মেসেজ পৌঁছেতে থাকে
তাতে বলা হয়, "মুসলমানরা হিন্দু মহিলাদের আক্রমণ করেছে
তারা একটি মন্দিরও ভেঙ্গেছে
আর হিন্দু নেতারা ঘুমিয়ে আছেন
বুম কয়েকটি ভাইরাল-হওয়া মেসেজ দেখার সুযোগ পায়
হাউজ কাজি এলাকায় হিন্দুদের পাঠানো ভাইরাল বার্তা
এরপর আরও দুটি উস্কানিমূলক মেসেজ আসতে থাকে
তাতে বলা হয় ছোরা আর বন্দুক নিয়ে মুসলমানরা এলাকার হিন্দুদের আক্রমণ করেছে
ভুয়ো বার্তার দাবি এলাকার মসজিদ আক্রান্ত
সকাল ৪.০০ (১ জুলাই) নাগাদ স্থানীয় মুসলমানদের কাছে পৌঁছতে থাকে একটা মেসেজ
তাতে বলা হল ফাতেহপুরি আর লাল মসজিদের ওপর পাথর ছোঁড়া হয়েছে
দুটি মসজিদই মন্দিরটি থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে হবে
মসজিদে পাথর ছোঁড়া হয়েছে দাবি করা মেসেজ
"স্কুলগুলি শীঘ্রই বন্ধ হয়ে যায়
আমরা আমাদের বাচ্চাদের বাইরে পাঠাতে পারিনি
তাই সারাদিন তারা ওই মেসেজগুলি দেখতে থাকে আর রাগে ফুসতে থাকে," বলেন মন্দির গলির কাছে এক হার্ডওয়ার দোকানের মালিক
"হ্যাঁ, একটি মারামারি হয়েছিল ঠিকই
কিন্তু তারা যে হিন্দু আর মুসলমান, সে বিষয়টা এত বড় করে দেখা হল কেন? সেটাকে শহরে ঘটা আর পাঁচটা ঝগড়ার মতোই দেখা হল না কেন?" জানতে চান তিনি
মন্দিরে আক্রমণের পর হাউজ কাজিতে অবস্থার অবনতি হয়
পুলিশ অতিরিক্ত বাহিনী চেয়ে পাঠায়
এবং সিআরপিএফ ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স এলাকায় ঘাঁটি গাড়ে
বুম যখন হাউজ কাজিতে যায়, তখন সেখানকার দোকানগুলির সামনে সিআরপিএফ, র‍্যাফ ও দিল্লি পুলিশের সদস্যরা পাহারা দিচ্ছিলেন
হাউজ কাজির প্রবেশ মুখে সিআরপিএফ-এর দুটি গাড়ি মোতায়েন করা ছিল
স্থানীয় যুবকদের তাৎক্ষণিক তথ্য যাচাই
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মধ্যেও, কিছু স্থানীয় যুবক উদ্যোগী হয়ে মিথ্যে ভাইরাল মেসেজগুলি খন্ডন করার ব্যাপারে তৎপর হন
আবু সুফিয়ান, যিনি 'পুরানি দিল্লি ওয়ালোঁ কি বাতেঁ' (পুরনো দিল্লিওয়ালাদের কথা) নামের এক ফেসবুক গ্রুপ তৈরি করেছেন, তিনি এক তাৎক্ষণিক তথ্য-যাচাই দলের নেতৃত্ব দেন
সুফিয়ান বলেন, "আমি এলাকার বাসিন্দা
এখানে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা বেশি
কিন্তু জায়গাটি শান্তিপূর্ণ
এখানে লোকে একসঙ্গে কাজকর্ম করে
এমনকি একে অপরের উৎসবেও অংশ নেয়
এটি খুবই ঐতিহ্যবাহী এলাকা
কিন্তু এখন এটিকে লোকে জানছে হিন্দু-মুসলমানের মারামারির জায়গা হিসেবে
একটি মসজিদে পাথর ছোঁড়া হয়েছে, এমন একটা মেসেজ পাওয়া মাত্রই সুফিয়ান ও 'ইটিভি ভারত'-এর সাংবাদিক মহম্মদ রহিম বেরিয়ে পড়েন
সুফিয়ান বলেন, "আমি ফতেপুরি মসজিদে যাই
কিন্তু মেসেজে যেমনটা দাবি করা হয়েছিল, তেমন কিছুই ঘটেনি
আমি মসজিদের ইমামের সঙ্গে কথা বলি
উনি বলেন, মেসেজটা তিনিও পেয়েছেন
সুফিয়া বুমকে একটি খবরের কাগজের ক্লিপিং দেখান
তাতে বলা হয়, "একটি হিন্দু পরিবারের মারের ফলে, ২০ বছরের এক মুসলমান যুবক মারা গেছে"
সুফিয়াঁ বলেন যে, ক্লিপিংটি 'হিন্দুস্তান টাইমস'এর ২ জুলাই প্রকাশিত একটি লেখার
তাঁর এলাকার গন্ডগোলের রিপোর্ট বেরয় কাগজটিতে
"খবরটি ওই কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা হয়
বাকি অংশ ছাপা হয় অন্য একটি পাতায়
প্রথম পাতায় খবরটি শেষে হয় এই ভাবে, "পুলিশ বলে যে, সোমবার ১২.৩০ নাগাদ এলাকায় কথা ছড়ায় যে, একজন..."
খবরের বাকি অংশটা ছাপা হয় অন্য পাতায়
সেখানে সেই অসমাপ্ত অংশটার শিরোনাম দেওয়া হয় স্রেফ 'সংঘর্ষ'
এবং ওই অংশটি শুরু হয় এভাবে: "২০ বছরের একজন মুসলমান যুবক মারা যান একটি হিন্দু পরিবারের মারের ফলে
" সুফিয়ান বলেন সংবাদের ওই ক্লিপটা ভাইরাল হয়
ক্যাপশনে দাবি করা হয়, হিন্দুরা মুসলমানদের মেরে ফেলছে
সুফিয়া বলেন, "খবরের প্রথম দিকের দুটি শব্দ - 'কথা ছড়ায়' - যা প্রমাণ করে যে গুজবের দ্বারা চালিত হয়েই মুসলমানরা থানার সামনে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, সেই দুটি শব্দ ভাইরাল ক্লিপ থেকে বাদ যায়
মানে, ওই সংঘর্ষ সম্পর্কে একটা সঠিক খবরকে ভুয়ো খবর আর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াতে ব্যবহার করা হয়
হিন্দুস্তান টাইমসের একটি খবরের স্ক্রিনশট
ভুয়ো খবর ছড়াতে বিভ্রান্তিকরভাবে যেটিকে ব্যবহার করা হয়
বুম হিন্দুস্তান টাইমসের বৈদ্যুতিন সংস্করণটি খুলে দেখে
তা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সুফিয়ার কথা ঠিক
ওই প্রকাশিত খবরের প্রথম অনুচ্ছেদে যা লেখা হয়, তার পূর্ণ বয়ানটি হল: "পুলিশ বলে, সোমবার ১২.৩০ নাগাদ, এলাকায় কথা ছড়ায় যে এক ২০ বছরের মুসলমান যুবক মারা যায় একটি হিন্দু পরিবারের মারের কারণে
এর প্রতিক্রিয়ায়, পুলিশ বলে, লোকে সেখানকার একটি মন্দিরে ভাঙচুর চালায় এবং মূর্তিগুলি অপবিত্র করে
এর ফলে, অন্য একটি দল সেখানে হাজির হয়, এবং যারা মন্দির ভাঙ্গছিল বলে ধারণা, তাদের তাড়া করে ও তাদের ওপর চড়াও হয়
(বাঁ দিকে) হিন্দুস্তান টাইমসের প্রথম পাতায় ছাপা খবরের প্রথম অংশ, এবং (ডানদিকে) ছয়ের পাতার বাকী খবরের অংশ
যে মসজিদগুলি আক্রান্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল, সুফিয়া ও রহিম দুদিন ধরে সেখানে যান
এবং তাঁরা ভিডিও পোস্ট করে জানাতে থাকেন যে, সেরকম কোনও ঘটনাই ঘটেনি
নীচে ফেসবুকে পোস্ট-করা 'পুরানি দিল্লিওয়ালোঁ কি বাতেঁ'- এর ভিডিও
এটিতে লাল মসজিদে আক্রমণ হওয়ার দাবি খারিজ করা হয়েছে
ভুয়ো খবর এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল) মন্দীপ সিং রণধাওয়া, সে কথা উড়িয়ে দেন
বুমকে উনি বলেন, "এলাকা এখন শান্ত
কোনও সমস্যা নেই
কোনও মেসেজ চালাচালি হচ্ছে না
হাউজ কাজির জীবনযাত্রা এখন স্বাভাবিক
দোকানপাট খুলেছে