content stringlengths 0 129k |
|---|
কিন্তু ইংরেজরা তাঁর এই আপত্তিকে অগ্রাহ্য করায় দুর্গটি দখল করতে বাধ্য হন নবাব সিরাজ |
এ সময় জন জেপানিয়াহ হলওয়েল নামের এক ধূর্ত ইংরেজ 'কোলকাতার অন্ধকূপ হত্যা' নামের একটি আষাঢ়ে গল্প বানিয়ে নবাবকে গণহত্যাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন |
এই গাঁজাখুরি কাহিনিতে বলা হয় যে, ১৪৬ জন ইংরেজকে ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের একটি গর্তে রাখায় তারা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে |
হলওয়েল নিজে ওই ঘটনায় বেঁচে যান বলে দাবি করেন |
গবেষক ও ঐতিহাসিকরা এই কাহিনিকে একটি পুরোপুরি মিথ্যা কাহিনি হিসেবে অস্বীকার করে আসছেন |
ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর লেখা ' ' নামক বইয়ে অন্ধকূপ হত্যা বা 'ব্ল্যাক হোল স্টোরি'-কে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন |
ব্রিটিশ পণ্ডিত ও গবেষক জে.এইচ লিটলও ' ' - ' বা 'অন্ধকূপ হত্যা-হলওয়েলের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন' শীর্ষক প্রবন্ধে হলওয়েলের বর্ণিত এই কাহিনিকে 'বড় ধরনের ধোঁকা' বলে মন্তব্য করেছেন |
ভারতবর্ষে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে ও এই লক্ষ্যে ব্রিটেনের লোকদের খেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই এই কাহিনি রচনা করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি |
আলীবর্দী খাঁর পর তাঁর দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে বসেন |
তখন তাঁর বয়স মাত্র ২২ বা মতান্তরে ১৮ বছর |
ইংরেজ ছাড়াও তরুণ নবাবের শত্রু ছিলেন রাজ সিংহাসনের জন্য লালায়িত সেনাপতি মীর জাফর ও সিরাজ-উদ-দৌলার খালা ঘষেটি বেগম |
ইংরেজরা তাদের সাথে যোগাযোগ করে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা পাকাপোক্ত করে |
ষড়যন্ত্র কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে 'এজেন্ট' নিযুক্ত করেন |
এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক যে মীর জাফর, তা আঁচ করতে পেরে নবাব তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আব্দুল হাদিকে সেনাপতি করেন |
কিন্তু কূটচালে পারদর্শী মীর জাফর পবিত্র কুরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করায় নবাবের মন গলে যায় এবং মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি পদে পুনর্বহাল করেন |
সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের মতে, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য 'কাল' হয়ে দাঁড়ায় |
ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার, বিদ্রোহী কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় দান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল প্রায় ৮টার দিকে ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় |
মীর মর্দান ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে |
ফলে বাংলার স্বাধীনতা প্রায় দু'শ বছরের জন্য অস্তমিত হয় |
এবং এর মধ্য দিয়ে পতন ঘটে বাংলায় দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা মুসলিম শাসনের |
নবাবের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার বা মতান্তরে এক লাখ সেনা আর ইংরেজদের পক্ষে মাত্র ৩ হাজার সৈন্য |
কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রী মীরজাফর, রায় দুর্লভ ও খাদেম হোসেনের অধীনে নবাব বাহিনীর একটি বিরাট অংশ পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যত কোনো অংশগ্রহণই করেনি |
ঐতিহাসিক ড. রমেশ চন্দ্র লিখেছেন, 'নবাব ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানার পর যদি মীর জাফরকে বন্দী করতেন, তবে অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারী ভয় পেয়ে যেতো এবং ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে পলাশীর যুদ্ধ হতো না |
ঘৃণ্য মীর জাফর পরে কুষ্ঠরোগে মারা যায় |
ইংরেজরা প্রথমদিকে ইয়ার লতিফকে হাত করে তাকে নবাব বানাতে চেয়েছিল |
কিন্তু পরে তারা মীর জাফরকেই তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য বেশি উপযোগী ভেবে তার নেতৃত্বে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে এগিয়ে যায় |
বাংলাপিডিয়ায় পলাশীর যুদ্ধের পটভূমি ও যুদ্ধের বিবরণ সম্পর্কে লেখা হয়েছে : |
'১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে সিরাজ-উদ-দৌলার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নবাব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়ে |
নবীন নবাব প্রথম বারের মতো বাংলায় কোম্পানির অবৈধ কার্যক্রমের তীব্র প্রতিবাদ জানান |
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর তিনটি প্রধান অভিযোগ ছিল : অনুমতি ব্যতীত ফোর্ট উইলিয়ামে প্রাচীর নির্মাণ ও সংস্কার, ব্যক্তিগত অবৈধ ব্যবসা এবং কোম্পানির কর্মচারীদের দ্বারা দস্তকের নির্লজ্জ অপব্যবহারের পাশাপাশি নবাবের অবাধ্য প্রজাদের বেআইনিভাবে আশ্রয় প্রদান |
'উল্লিখিত অভিযোগসমূহের মীমাংসার জন্য পদক্ষেপ নিতে নবাব ব্রিটিশদের আহ্বান জানান এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের জন্য কলকাতায় অনেক প্রতিনিধিদল পাঠান |
নবাব কোম্পানির নিকট কৃষ্ণদাসকে তাঁর হাতে সমর্পণের দাবি করেন এবং নতুন প্রাচীর ভেঙে ফেলতে ও কলকাতার চারদিকের পরিখা ভরাট করতে নির্দেশ দেন |
নবাবের যে বিশেষ দূত এ সকল দাবি সম্বলিত চিঠি নিয়ে কলকাতায় যান ইংরেজরা তাঁকে অপমানিত করে |
'কলকাতার ইংরেজ গভর্নর রজার ড্রেক যে চরম অপমানজনকভাবে নবাবের প্রতিনিধি নারায়ণ সিংহকে বিতাড়িত করে তা সবিস্তার শুনে নবাব অত্যন্ত রাগান্বিত হন |
নবাব তৎক্ষণাৎ কাসিমবাজার কুঠি অবরোধের আদেশ দেন |
কুঠির প্রধান আত্মসমর্পণ করে কিন্তু কলকাতার ইংরেজ গভর্নর অবাধ্যতা ও একগুঁয়েমি প্রদর্শন করেন |
ফলে নবাব কলকাতা অভিযান করে তা দখল করে নেন |
এ পরাজয়ের পর বাংলায় কোম্পানির পুনঃপ্রতিষ্ঠা দুই উপায়ে করা সম্ভবপর ছিল, হয় নবাবের নিকট আত্মসমর্পণ নচেৎ পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বল প্রয়োগ |
বাংলায় যে সকল ব্রিটিশ ছিল তারা অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর জন্য মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জে জরুরি খবর পাঠায় |
সেখান হতে রবার্ট ক্লাইভ ও এডমিরাল ওয়াটসনের অধীনে একদল ব্রিটিশ সৈন্য বাংলায় পাঠানো হয় |
তারা ১৭৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা পুনরুদ্ধার করে এবং নওয়াবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে |
সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের সঙ্গে আলীনগরের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন |
'কিন্তু ইংরেজরা সন্ধির শর্তাদি অগ্রাহ্য করতে থাকায় যুদ্ধের চাপা উত্তেজনা চলতে থাকে |
তারা নওয়াবের প্রতি বিরূপ পারিষদদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় |
মুর্শিদাবাদ দরবারে কিছু প্রভাবশালী অমাত্য নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি যে অসন্তুষ্ট ছিল তা অস্বীকার করা যায় না |
নওয়াবকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে |
তবে ব্রিটিশগণ সক্রিয়ভাবে এ ষড়যন্ত্রে জড়িত না হলে আদৌ কোন পলাশী 'বিপ্লব' সংঘটিত হওয়া সম্ভব হতো কিনা তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার |
'অনেক ঐতিহাসিক যদিও দৃঢ়ভাবে মত পোষণ করেন যে, ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীগণই সহযোগিতা লাভের আশায় পরিকল্পিত 'বিপ্লব' ঘটানোর জন্য ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তবুও দলিলাদির সঠিক ও সতর্ক বিশ্লেষণে সন্দেহাতীত ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ব্রিটিশরাই তাদের পরিকল্পিত 'বিদ্রোহ' বাস্তবায়নের জন্য নওয়াব দরবারের বিরুদ্ধবাদীদের সমর্থন আদায়ের জন্য যোগাযোগ করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে |
'১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ আরম্ভ হয় |
মীর মর্দান, মোহন লাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নব সিং হাজারী প্রমুখের অধীন নওয়াব সেনা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালায়, অন্যদিকে মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভরামের অধীন নওয়াবের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সেনা নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ও পরিস্থিতি অবলোকন করে |
এমনকি বেশ কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধের পরও চূড়ান্ত কিছু ঘটে নি |
ক্লাইভ এমন প্রতিরোধ পাবেন আশা করেন নি এবং এই মর্মে জানা যায় যে, 'দিনে যথাসম্ভব তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে' ক্লাইভ রাতের অন্ধকারে কলকাতা পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছিলেন |
কিন্তু বেলা তিনটার দিকে কামানের গোলা মীর মর্দানকে আঘাত হানে এবং এতে তাঁর মৃত্যু হয় |
'মীর মর্দানের মৃত্যুতে হতভম্ব নওয়াব মীরজাফরকে ডেকে পাঠান এবং তাঁর জীবন ও সম্মান রক্ষার জন্য তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন |
মীরজাফর নওয়াবকে ঐ দিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং পরদিন সকালে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করার পরামর্শ দেয়, আর এ খবর শীঘ্র ক্লাইভের নিকট পৌঁছানো হয় |
পরামর্শমত নওয়াবের সেনানায়কেরা পিছুতে থাকলে ইংরেজ সেনারা নতুন করে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায় এবং ফলে নওয়াব বাহিনী বিশৃঙ্খলভাবে যত্রতত্র পালিয়ে যায় |
অপরাহ্ণ ৫টার দিকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় এবং বিজয়ী ক্লাইভ বীরদর্পে তখনই মুর্শিদাবাদ যাত্রা করেন |
জন উড নামে জনৈক ব্রিটিশ সৈন্য পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিল, তার মতে 'এটাই ছিল সেই বিশিষ্ট ও চূড়ান্ত যুদ্ধ যেখানে কোন ব্যাপক আক্রমণ ছাড়াই রাজ্য জয় করা হয়' |
'ষড়যন্ত্র এবং পরবর্তীকালে 'পলাশী-বিপ্লব' ইংরেজদের দ্বারা শুধু উদ্ভাবিত ও উৎসাহিতই হয়নি, বরং যুদ্ধের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তারা দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের ব্রিটিশ পরিকল্পনা সমর্থন করতে প্রলুব্ধ করে |
সাধারণ ধারণা-ষড়যন্ত্রটি ছিল ভারতজাত, এর পেছনে ব্রিটিশদের পরিকল্পিত কোনো কূটকৌশল ছিল না, ষড়যন্ত্রের মূলে বা এর উত্তরণে তাদের অতি সামান্য ভূমিকা ছিল কিংবা কোনো ভূমিকাই ছিল না, এটি ছিল বাংলার 'অভ্যন্তরীণ সমস্যা' যা 'অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্রিটিশদের জড়ায়' এবং বাংলায় ব্রিটিশ বিজয় ছিল প্রায় সম্পূর্ণ আকস্মিক, এ কথাগুলি এখন ধোপে টেকে না |
ইংরেজরা তাদের ষড়যন্ত্রের জোরে ও সিরাজউদ্দৌলার সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতার দরুণ পলাশীতে বিজয়ী হয় |
নবাবের পরাজয় ছিল রাজনৈতিক, সামরিক নয় |
পলাশীর বিপর্যয়ের ফলে গোটা ভারতবর্ষে ব্রিটেনের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয় |
ভারতে নানা সময়ে ব্রিটেনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ এবং শত্রুতামূলক নানা নীতির কারণে কোটি কোটি বাঙালিসহ অন্তত দশ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যাদের সিংহভাগই মুসলমান |
দেশীয় শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজ-ব্যবস্থারও হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি |
বিশেষ করে, মুসলমানরা হয়ে পড়ে সবচেয়ে দরিদ্র ও অনগ্রসর |
অথচ তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহর বাংলার মুর্শিদাবাদসহ ভারতের নানা শহরের সম্পদ লুট করে ইংরেজরা সংগ্রহ করেছে তাদের দেশকে সম্পদশালী করার নানা উপাদান |
দুইশো বছরের এই ইংরেজ-শাসনে বাংলা তথা ভারত উপমহাদেশে হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজের উত্থানে এবং ইংরেজদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিজয় অভিযান বাংলার মুসলমানদের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে তা শোধরিয়ে নেয়া আজও সম্ভব হয়নি |
শোধরিয়ে নেয়া কবে যে সম্ভব হবে বা আদৌ হবে কি না, তা ভবিষ্যতই জানে |
যুগবার্তা ডেস্কঃ বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে টেলিফোনে জানতে চাইলাম, আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে আপনারা যাচ্ছেন কি না? বললেন, 'বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বিষয়টি সন্ধ্যা নাগাদ জানাবেন আশা করছি |
' আমাকে একটুও অবাক না করে তিনি বললেন, জ্যেষ্ঠ নেতারা এই আমন্ত্রণের বিষয়ে খুবই ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন |
কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন তিনি |
বেগম খালেদা জিয়ার সামনে আবারও একটি বিরাট সুযোগ এসেছে |
তাঁর উচিত হবে মির্জা ফখরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে উপস্থিত হওয়া |
মধ্যম সারির কোনো প্রতিনিধি পাঠিয়ে দায় সারার সময় এটা নয় |
অবশ্য কোনো প্রতিনিধি না পাঠানো হবে গণতন্ত্রবিরুদ্ধ, এমনকি আত্মঘাতী |
বিএনপিকে ভাবতে হবে সামনে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব |
সুতরাং আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার যেকোনো প্রক্রিয়ায় বিএনপির উচিত হবে সম্পৃক্ত হওয়া |
আর জাতীয় রাজনীতি কোনো কালেই কোনো দেশেই কখনোই বদ্ধ জলাশয় হওয়ার নয় |
এটা অন্তর্গতভাবে পরস্পরবিরোধী এবং প্রধানত কম যুক্তিসংগত |
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নৈশভোজের আমন্ত্রণ গ্রহণ না করা, টেলিফোনে বাদানুবাদ করা, আরাফাতের বিয়োগান্তক মৃত্যুর পরে শেখ হাসিনাকে প্রধান ফটক থেকে বিদায় দেওয়া এবং সর্বোপরি ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করা, এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে অনেক বিতর্ক দেখেছে জনগণ |
এবং এর বেশির ভাগ সম্পর্কেই বিএনপির মধ্যে প্রবল মত হলো, শেখ হাসিনা তাঁর নৈশভোজ কিংবা আরাফাতের মৃত্যুর পরে দেখা করার বিষয়ে 'আন্তরিক' ছিলেন না |
রাজনীতি ছিল তাঁর মুখ্য |
এই মতের প্রবক্তারা অবশ্য অস্বীকার করতে পারেন না যে, সেই কথিতমতে লোকদেখানো রাজনীতি শেখ হাসিনাকে কিছু সুবিধা দেওয়া ছাড়া অন্তত বেকায়দায় ফেলেনি |
বিএনপি বিব্রত হয়েছে |
উন্নত গণতন্ত্রেও কিন্তু লোকদেখানো রাজনীতিরও একটা মূল্য আছে |
হিলারি-ট্রাম্প টিভি বিতর্কের শেষ পর্বটিতে তিক্ততা এত বেশি মাত্রায় তীব্রতা পেয়েছিল যে, সেটা শুধু একটা বিচ্যুতি ঘটিয়েছে |
তাঁরা এদিন করমর্দন করেননি |
কিন্তু এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়নি যে তাঁরা টিভি বিতর্ক বয়কট করবেন |
নারী-বিষয়ক টেপ-গেট কেলেঙ্কারির পরে ট্রাম্পের 'রিয়েলিটি শো' আরও উপভোগ্য হয়েছে |
কিন্তু মাইক বন্ধ বা লাইভ সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটেনি |
ট্রাম্প-হিলারির মধ্যকার যে 'ব্যক্তিগত বিদ্বেষ' সারা বিশ্ব দেখেছে, সেটা কি একেবারেই প্রকৃত বাস্তবতা? আমার কিন্তু তাতে সন্দেহ আছে |
দুই প্রার্থীর বাগাড়ম্বরের অনেক উপাদানই লোকদেখানো |
প্রথম দুই পর্বে উভয়ে উভয়ের প্রতি উদ্ভাসিত হাসিমুখে করমর্দন করেছেন |
সেটা কি লোকদেখানো ছিল না? কিন্তু সেটা তাঁরা যে করতে পেরেছেন, তাতে আমেরিকান গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ম্লান হয়নি, উজ্জ্বল হয়েছে |
আমি জানি, বাংলাদেশ রাজনীতির ধর্ম ও সংস্কৃতি খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ সমর্থন করে না |
সারা বিশ্ব থেকে ৫৫ জন অতিথি আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আসবেন |
কিন্তু এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম যে খালেদা জিয়া গেলে তিনিই হয়ে উঠবেন মিডিয়ার প্রধান আকর্ষণ, সেটাই হবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মূল খবর |
কারও ঘোষণার দরকার নেই, তিনি অঘোষিত প্রধান অতিথি বা মধ্যমণি গণ্য হবেন! আর তাঁকে বক্তৃতা দিতে দেখা গেলে তো গিনেস বুকে নতুন এন্ট্রি যুক্ত হবে! |
জানি এটা হবে না |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.