content stringlengths 0 129k |
|---|
আমাদের দু'জনার নানী বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরার পূর্ব নাওডোবায়, উত্তর-দক্ষিণে দুই পুকুর আর পূর্ব-পশ্চিমে চার ঘর বেষ্টিত একই উঠোনে |
দু'জনার সম্পর্কের বিষয়ে সবাই জানে |
আমার নানী আমার ভবঘুরে জীবন মাটির ঘরের মুলি বাঁশের বেড়ায় বাঁধার জন্য শীতকালের সময়টাকেই বেছে নিয়েছে |
দুই নানীর বকা খেতে খেতে শীতের এক বিকালে 'কবুল' করে কাঁশ আর নাড়া দিয়ে নতুন ছাউনি করা ধঞ্চে-পাটখড়ী বেড়ার মাঝে মুলিবাঁশের দরজা ঠেলে দুজনে ঢুকলাম |
ঢুকলাম না বলে, বলা যেতে পারে, দুই নানী ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং বলে দিয়েছে, এই শীতেই যেন, নাতির গন্ধ পাওয়া যায়, আচারের ব্যবস্থা তারাই করবে |
আসলে আমার ভবঘুরে, বাউল জীবন নিয়ে আমার নানী বড়ই উদ্বিগ্ন ছিল |
কত তাবিচ কবচ যে আমার হাত-গলা-মাজায় দিয়েছে--তা গুনে শেষ করা যাবে না |
মসজিদের হুজুর আর মাজারের খাদেমের পানি পড়া আর নাই বললাম |
শুনেছি, হিন্দু পাড়ার শিব-কালী মন্দিরের ঠাকুরের দেওয়া তাবিজ, পানি পড়াও নানী আমায় দিয়েছে |
বনজঙ্গলে ঘুরি বলে, শ্মশান-জঙ্গলের শিব-মা কালী যেন, আমায় রক্ষা করে |
প্রকৃতির বিশাল অথচ ক্ষূদ্র অংশ বীনা, তার কাছ থেকে ছুটে চলি অন্য প্রকৃতিতে, আবার ফিরে আসি তার কাছে |
বিনা বাঁধায়, সহজেই বিনাকে পেয়েছি বলে, নাকি, ভবঘুরের সূতার টানে আস্তে আস্তে বীনা প্রকৃতির গদ্য আমার কাছে ফুরিয়ে যেতে থাকে; আমি আরো গভীর গদ্যে হারিয়ে যেতে থাকি |
হাইস্কুল পর্যন্ত লেখাপড়া জানা, কর্মঠ, গল্পপটু, গাতক, বই পড়ুয়া--সাথীদের কাছে আমি ইত্যাদি গুনে পরিচিত |
তাই ওরা, যে যেখানে, যতদূরে, যে কাজেই যায় আমাকে স্মরণ করতে ভুল করে না |
আমিও জায়গা পছন্দ হলে ওদের সাথে যে কোন কাজে চলে যাই |
সালাম, বাবুল, শম্ভু, দুলাল--এদের সাথে শীতের রাতে বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম জঙ্গলের বনপথে |
পদ্মা নদীর শাখা বেস্টিত বিশাল জঙ্গলের মহল |
ঘাস, বাঁশ, গাছ ইত্যাদি কাটতে হবে--তুলতে হবে বড় বড় নৌকায় |
নির্জন, ভীতিকর জায়গা |
সারি সারি শাল-গজারী গাছ, নদীর কাছে ঝাউবন, কাঁশচর |
কাঁশ, বাঁশ আর খড়ঘেরা দু'একটা ঘর--বনের ভিতর মাঝে মাঝে দেখা যায় |
দু'একটা জনবিরল বন্য গ্রাম আর ছোট ছোট টিলা আছে আশেপাশে |
শীতের বিকাল |
ঘন ছায়া পড়েছে বিস্তীর্ণ জঙ্গলে |
বনের মাথায় উঁচু গাছের পাতায় পাতায় অল্প অল্প কুয়াশা জমেছে |
নির্জন শীতের সন্ধ্যা |
কোথা থেকে মটর শাকের সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে |
বিশাল আকৃতির বট আর ভেটকী গাছ--জড়াজড়ি করে আছে, গভীর আলিঙ্গনে |
শত শত লতাগুল্মের গাছ বিশাল বটগাছকে জড়িয়ে আছে |
ডালে ডালে পাখির বাসা |
শীতের তীব্রতা আস্তে আস্তে বাড়ছে, এ বনপথে |
পাখির বাচ্চারা এখন বেশী চেঁচামেচি করছে--হয়তো ক্ষুধায়, হয়তো পিতা-মাতার দেরীতে ফেরা অথবা না ফেরার কারণে; কারণ কিছু পাখি শিকারী সারাদিন বনে ঘুরাফেরা করে |
মা-বাবার পালকের উষ্ণতা বড় বেশী প্রয়োজন এই শীতে কারণ বাচ্চা পাখির পালক পূর্ণভাবে গজিয়ে ওঠে না |
শীতকালে দিন নয় থেকে দশ ঘন্টা |
প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতেই সময় ফুরিয়ে যায় |
নদীর কাছে দীর্ঘ বনঝাউ, কাঁশবনের মাঝে সারি সারি গজারি, বাবলা, বন্য কাঁটা বাঁশ, বেত ঝোপ |
সন্ধ্যায় বাতাসে বন্যপুষ্প ও তৃণগুল্মোর সুগন্ধ, পাখির কিচিরমিচির ডাক, বনের ডোবার অগভীর জলে ফুটন্ত লিলি ফুল--বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে দেয় |
শীতকালে আমাদের অঞ্চলে লিলি ফুল হেমন্ত কালে দেখা যায় |
নির্জন আকাশতলে দিগন্তব্যাপী জোৎস্না রাতে বনপুষ্পের সুবাশ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, শীতের মধ্যে শিয়ালের পাক্কা হুয়া ডাক--রাত্রির পরিবেশে আমাকে যে কোথায় নিয়ে যায় |
নির্ঘুমে আমরা সবাই |
বিড়ি-সিগারেটের ফাঁকে গাছ ও ঘাস কাটার হিসাব শেষ করে বনের শুকনো ডাল-পাতা জ্বালিয়ে, আগুনের চারিদিকে পাটি, গামছা বিছায়ে বসে শীতের গান আর সেই সাথে বনমুরগী, বনহাঁস অথবা বনজলের মাছ পুড়াইয়া ভাত অথবা মুড়ী-পিয়াজ-তেল দিয়ে খাওয়া |
আহা! সে কি স্বাদ, কি শান্তি এই ঘন কুয়াশা রাত্রিতে |
মনে হয়, পিকনিক অথবা মাসুদ রানা সিরিজের কোন কাহিনীর নির্জন দ্বীপের ছবি |
রাতের শীত বাড়লে অথবা শীতের ভোরে ধনে পাতার ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়া |
শীতের পার্বণের কত স্বাদ নিয়েছি কত সাথীদের বাড়ী গিয়ে; অন্যের ক্ষেত থেকে পিয়াজ তুলে আনতে গিয়ে ধরাও পড়েছি |
গ্রামে থাকলে মা হয়তো শুঁটকী, মটরশুটি, শীম, আলু, ধনে পাতার ভর্তা দিয়ে চিতের পিঠায় মেখে দিত |
মায়ের কথা মনে হলে শীত যেন, আরো বেড়ে যায় |
পূরাণের গঙ্গা (পদ্মা নদী) দেবী যে, মা-বাবা সহ সবাইকে নিয়ে গেছে, দূরে থাকলে--তা মনে হয় না |
বরং মনে হয়, বাড়ি গেলেই মাকে দেখতে পাব |
উদীয়মান চন্দ্রের গোলাকার বৃত্তের নিচের পরিধি যেন বাঁশের চিকন পাতা ছোঁয়া দিয়ে যায় |
আগুনের কাছে থাকলে শান্তি, দূরে গেলেই কনকনে শীত |
মনে পড়ে, উত্তরবঙ্গের পথে--এখানকার মত ওখানেও খড়ের ঘর; তার মেঝে জমির সাথে সমতল; ঘরের বেড়া শুকনো ঘাস, পাটখড়ি, বনঝাউয়ের ডাল-পাতা; কোথাও কোথাও কাঠ, বাঁশ, বনঝাউয়ের সরু সরু গুঁড়ির বেড়া; তার উপর মাটি দিয়ে লেপা |
এখনো সেই ঘরের কাটাখড়, অর্ধকাচা ঘাস, মুলি বাঁশের গন্ধ নাকে ভেসে আসে |
শীতের রাতের গরুর গাড়ীতে যাত্রার কথা ভাবলে হাত পা গুটিয়ে আসে |
জামা-কাপড়-কম্বল সব ঠান্ডায় বরফ হয়ে যায় |
শুয়ে থাকা পাশে শীত কম থাকলেও অন্য পাশে কাত হয়ে শুতে গেলে মনে হয়, মাঘ মাসের জলডোবায় ডুব দিয়েছি |
শেয়ার করুনঃ |
পছন্দ করুন |
পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন |
শাশ্বত স্বপন এর ব্লগ | ৬ টি মন্তব্য | ১৩২২ বার পঠিত | ট্যাগঃ শিক্ষা, ভ্রমনকাহিনী, ভালোবাসা, গল্প, আত্মজীবনী, সমসাময়িক, স্মৃতিচারণ |
বিষণ্ণ বাউন্ডুলে | ডিসেম্বর ২১, ২০১২ - ১০:৩২ অপরাহ্ন |
প্রকৃতি নিয়ে আপনার বর্ণনাভঙ্গি বেশ ভাল লাগে |
সাথেই আছি |
শাশ্বত স্বপন | ডিসেম্বর ২২, ২০১২ - ৮:৫৯ অপরাহ্ন |
গতিশীল জীবনে কেউ আজকাল প্রকৃতি পড়তে চায় না কিন্ত প্রকৃতি দেখতে চায় |
এই ব্লগে ছবি যোগ হয় না |
তাই প্রকৃতির ছবি সাথে দিতে পারছি না |
গল্প, উপন্যাসও পড়তে চায় না |
সবাই স্বল্প সময়ের খিস্তি খেউর,হিউমার পছন্দ করে |
বাবুই পাখির বাসা দেখতে সবাই পছন্দ করে, বেশী ভাবতেও চায় না, ঐ রকম করে গড়ার কথা চিন্তাও করে না |
অথচ কে না জানে, স্বপ্ন--পথ ও পথিক হয়... |
মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়, তার আশার সমান বড় করে................ |
বিষণ্ণ বাউন্ডুলে | ডিসেম্বর ২৭, ২০১২ - ৮:৪২ অপরাহ্ন |
কে বলে ছবি যোগ করা যায় না! |
এই লেখা টা পড়ে নিন |
://..//437 |
নিভৃত স্বপ্নচারী | ডিসেম্বর ২২, ২০১২ - ৯:০০ অপরাহ্ন |
ভাল লাগলো ঝরা পাতার গান |
শাশ্বত স্বপন | ডিসেম্বর ২২, ২০১২ - ৯:২৪ অপরাহ্ন |
তানবীরা | জানুয়ারী ২, ২০১৩ - ১১:২১ অপরাহ্ন |
চমৎকার! অপূর্ব! অসাধারণ! |
প্রকৃতি নিয়ে আপনার বর্ণনাভঙ্গি বেশ ভাল লাগে |
সাথেই আছি |
মন্তব্য করুন |
ই-মেইল (গোপন থাকবে): * |
(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা |
মন্তব্য: * |
- . |
: <> <> <> <> <> <> <> <> <> <> <> <> <> <> <> < /> <> <> |
. |
. |
পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন |
. |
বন্ধুর কথা |
নিজের সম্পর্কে |
বাংলা সাহিত্য আমার খুব ভাল লাগে |
আমি এখানে লেখতে চাই |
সম্পূর্ণ প্রোফাইল |
সাম্প্রতিক মন্তব্য |
বই মেলায় আসুন--আমার বই কিনুন... - নিভৃত স্বপ্নচারী |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.