content
stringlengths 0
129k
|
|---|
হঠাৎ দেখলাম কেউ একজন খুব দ্রুত মেইন গেইটের পকেট গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো
|
ছায়া ছায়া নারীমূর্তী! আকৃতিতে নওরিনের মতই
|
নারীমূর্তীটি বাইরে বেরিয়েই খুব দ্রুত হাটতে শুরু করলো
|
কাছাকাছি আসতেই আমি দেখলাম যে, এটা নওরিন
|
আধো আলোয় মনে হলো, আজ সে প্রসাধন বেশিই করেছে! এই প্রসাধনের জন্যই কি তার এত দেরী হলো? তাহলে সে ফোন ধরলো না কেন? অথবা, ফোনেই তো বলতে পারতো যে, 'আপনি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন'
|
নওরিন খুব দ্রুত হাটছে
|
ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছে দৌড়াতে পারলে ও আরো বেশি খুশী হতো! ওর সাথে তাল মিলাতে আমিও দ্রুত হাটতে লাগলাম
|
কিছুদূর গিয়ে ও তিন রাস্তার মোড়ে এসে বামে ঘুরে আরেকটি রাস্তায় ঢুকে পড়লো
|
এবার সে হাটার গতি কমালো
|
আমি বললাম, "কেমন আছো নওরিন?" আমার অজান্তেই আমার কন্ঠস্বরে সোহাগ ঝরে পড়লো! নওরিন এবার কথা বলতে শুরু করলো,
|
নওরিন: বুঝলেন এই বিল্ডিংটাতে আমরা অনেকদিন যাবৎ আছি
|
আমি ছোটবেলা থেকেই এখানে থাকি
|
আমাদের নিজস্ব এ্যাপার্টমেন্ট
|
এই বিল্ডিং-এ যারা থাকে তারা সবাই নিজ নিজ ফ্লাটের মালিক
|
এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, সবাই সবার আত্মীয়ের মত হয়ে গিয়েছি
|
তাছাড়া তিনটা ফ্লাটে আবার আমাদের আত্মীয়রাই থাকে
|
আমি: ও আচ্ছা!
|
দেরী হওয়ার জন্য ওকে ভর্ৎসনা করা যেত, এ্যাট লিস্ট জিজ্ঞেস করা যেত যে, কেন দেরী হলো
|
কিন্তু আমার মন সেটা চাইলো না
|
এটাও একটা হিউম্যান সাইকোলজি, যার জন্য মন পোড়ে তার অপেক্ষা করতে করতে মেজাজ চড়ে যায়, কিন্তু তাকে দেখলেই আবার মন খুশী হয়ে যায়, অপেক্ষার সব যন্ত্রণা ভুলে যায় মন! তখন হয়তো সঙ্গসুখটাই সব ভুলিয়ে দেয়!
|
নওরিন আবারো বললো, "আমার দেরী হলো বলে কিছু মনে করবেন না
|
আমি সিঁড়ি ভেঙে নামছিলাম, তিনতলায় আসতে ফ্লাটের দরজা খোলা দেখতে পেলাম, ঐ ফ্লাটের আঙ্কেলের কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম বসার ঘরে
|
লোকজন ছিলো বোধহয়
|
এমন হতে পারে যে, দরজা দিয়ে তাকালে তিনি সরাসরি আমাকে দেখতে পাবেন
|
আমি সেটা চাচ্ছিলাম না
|
আঙ্কেল আমাকে ছোটবেলা থেকেই চেনেন
|
আমার বিবাহজনিত দুর্ঘটনাটা তো সবারই জানা
|
আজ এই লক-ডাউনের মধ্যে এই সন্ধ্যায় বাইরে বেরুতে দেখলে, পরে নানান প্রশ্ন করতে পারেন
|
তাই সিঁড়ির ঐ জায়গাটায় আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম
|
আপনার কল মোবাইলে বাজছিলো, তাও আমি ধরতে পারিনি
|
এতক্ষণে রহস্য ভেদ হলো! আমি বললাম, "চলো তাহলে
|
নওরিন: কোথায় যাবেন?
|
আমি: তুমি না কোথায় বসতে চাইলে?
|
নওরিন: হ্যাঁ, 'সাউথ পোল' ক্যাফেতে
|
আমি: কোথায় এটা
|
নওরিন: সামনে চলুন
|
এবার নওরিন মোড় ঘুরে এ্যাভিনিউতে উঠে গেলো
|
এই এ্যাভিনিউ-এর দুইপাশে চওড়া পরিচ্ছন্ন ফুটপাত আছে
|
হাটতে কোন সমস্যা নাই
|
আমি ওর পাশে পাশে হাটছিলাম
|
পথে লোকজন প্রায় নাই
|
মাঝে মাঝে কিছু গাড়ী ছুটে ছুটে যাচ্ছিলো
|
এ্যাভিনিউ-এর দুইপাশের মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিংগুলোর ঝলমলে আলো আর জ্বলছে না
|
লক-ডাইনের কারণে অল্প কিছু টিমটিমে আলো জ্বলছে
|
তবে ল্যাম্পপোস্টগুলোতে আলোকসজ্জার ছটা রয়েছে যাথারীতি! এরা বোধহয় মহামারীর দীপাবলী!
|
সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে অভিজাত এলাকার অব্যস্ত এ্যাভিনিউ, টিমটিমে আলো জ্বলা আপাতঃ জৌলুস হারানো বৃহদাকার দুঃখী বাহারী দালানের সারি, মহামারীর দীপাবলী, এ্যাভিনিউ-এর ফাঁকা ফুটপাত, আর সেই ফুটপাতে মন খুলে গল্প করতে করতে হেটে যাওয়া দুজন নারী-পুরুষ! কোন সৃজনশীল চিত্রকর দৃশ্যটা দেখতে পেলে নির্ঘাত তৈলচিত্রে ফুটিয়ে তুলতো
|
কোন কবি দেখতে পেলে, কবিতা না লিখে পারতো না!
|
আঁধারে ওর মুখশ্রী খুব ভালো দেখা যাচ্ছিলো না
|
একটি ল্যাম্পপোস্টের কাছাকাছি আসতে সোডিয়াম লাইটের সুতীব্র আলোয় আমি আরেকবার ওর মুখের দিকে চাইলাম
|
কি সুশ্রী ও নিষ্পাপ একটি মুখাবয়ব! তখন আমার মনে হয়েছিলো যে, নওরিন কড়া মেকআপ করেছে
|
এখন দেখলাম, না, একদম না, হালকা প্রসাধন
|
আসলে ওর রূপই ওর প্রসাধন! আমার বুকের ভিতর একটা দীর্ঘশ্বাস চাপলো, এত চমৎকার একটা স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারে, এ কোন নিঠুর স্বামী?!
|
আমি: নওরিন, তুমি তো এই এলাকায় ছোটবেলা থেকেই আছো
|
আমি ছোটবেলায় থাকতাম দক্ষিণ ঢাকায়
|
তবে এখানে আমি মাঝে মাঝে আসতাম
|
তাই এই এলাকার সাথে আমারও ছেলেবেলার স্মৃতি বিজড়িত
|
সব চাইতে ইন্টারেস্টিং স্মৃতি হলো, আমি যখন বিদেশে যাই
|
সেটা খুব অল্প বয়সে ছিলো
|
আমি ভিসা নিতে এই এলাকায় এসেছিলাম
|
আমার বড় বোন, আমাকে গাড়ীতে করে নামিয়ে দিয়ে গেলেন
|
আমাকে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "এদিকে কেন এসেছিস?" আমি আসলে জানতাম যে আমার ভিসা হয়ে গেছে
|
কিন্তু আমি উনাকে কিছু বলিনি
|
নওরিন: কেন বলেননি?
|
আমি: আমি একটা নীতি মেনে চলি
|
কোন কিছু চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বলিনা
|
নওরিন: ইন্টারেস্টিং!
|
আমি: এ্যাম্বেসীতে গিয়ে আমি পাসপোর্ট-টা তুললাম
|
ভিসার পাতা দেখে নিশ্চিত হলাম
|
তারপর বাসায় ফিরে গিয়ে সবাইকে দেখালাম
|
নওরিন: তারপর আপনার বড় বোন কি বললেন?
|
আমি: তিনি খুশী হওয়ার পাশাপাশি কিছুটা ক্ষেপেছিলেনও
|
বললেন, "তুই জানতি অথচ কিছু বললিও না?" আমি বলেছিলাম, টেলিফোনে শুনেছি, ওটার কি নিশ্চয়তা আছে? নিজ চোখে দেখে তখন বিশ্বাস করলাম
|
নওরিন: বেশ ইন্টারেস্টিং ঘটনা তো!
|
আমি: এই এলাকাটা ঐ কারণে বেশি মনে পড়ে
|
পাসপোর্ট-ভিসা হাতে পাওয়ার পর আমি কি করলাম জানো?
|
নওরিন: কি করলেন?
|
আমি: কোন যানবাহনে চড়লাম না
|
প্রথমে এই এলাকার রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় হাটলাম
|
মোটামুটি পরিচ্ছন্ন চওড়া পথঘাট, বাগান সম্বলিত প্রতিটি বাড়ী, আমার ভালোই লাগতো
|
তারপর হেটে হেটেই অতদূরে আমাদের নিজস্ব বাড়ীতে গেলাম
|
নওরিন: আমারও ছেলেবেলার স্মৃতি আছে দক্ষিণ ঢাকায়
|
আমি: তাই? কোথায়?
|
নওরিন: পহেলা বৈশাখে পুরাতন যাদুঘর এলাকায় যেতাম
|
আব্বা পরিবারের সবাইকে নিয়ে যেতেন
|
আমি: পুরাতন যাদুঘর? তোমার মনে আছে?
|
নওরিন: (অবাক হয়ে) হ্যাঁ
|
ঐ যে শাহবাগ এলাকায়
|
আমি: আরে না না
|
ওটা তো নতুন যাদুঘর
|
পুরাতন যাদুঘর ভিন্ন জায়গায় ছিলো
|
নওরিন: আরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির কাছে
|
ঐ যে গম্বুজগুলো এরকম এরকম
|
ও হাত দিয়ে কিছু অর্ধবৃত্ত দেখালো
|
আমি: ঠিকই আছে
|
ওটাই নতুন যাদুঘর
|
আর্কিটেক্ট মঈনুল-এর করা
|
ঐ যে মঈনুল, যে কিনা সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ-এর স্থপতি
|
আর পুরাতন যাদুঘর ছিলো অন্য জায়গায়, যতদূর মনে পড়ে লাল রঙের ছোট্ট একটা দালান
|
নওরিন আমার দিকে তাকালো
|
এ পর্যায়ে আমার মনে হলো
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.