content stringlengths 0 129k |
|---|
এসির ঠান্ডা বাতাসেও দরদর করে ঘামছেন |
বিশ্রী রকমের যানজটে আটকে আছে সব পথঘাট |
মতিঝিল থেকে বারিধারার লাইফটাইম হাসপাতাল যেন যোজন যোজন দূর |
দুহাতে দুই ফোনে সমানে ডায়াল করতে থাকেন সেকান্দার সাহেব |
কললিস্ট থেকে বউ, আম্মা, ফারুক, সৌমিক-সব নাম্বারে ডায়াল করেন |
কারওটা ব্যস্ত, কারও ফোনে 'দুঃখিত এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না' |
অজানা আশঙ্কায় কুঁকড়ে ওঠেন |
বুকের ভেতর কেমন জানি করে ওঠে |
ডায়াল চাপতে থাকেন পাগলের মতো |
খুব ইচ্ছে হচ্ছে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিতে দামি স্মার্টফোন দুটো |
অর্থহীন মনে হচ্ছে দুনিয়াটাকে |
ব্যবসা, জরুরি মিটিং, রপ্তানি অর্ডার-কত কিছুই মাথা থেকে উবে যাচ্ছে ধোঁয়া হয়ে, ঠিক বুঝতে পারছেন সেকান্দার সাহেব |
বুকের চিনচিনে ব্যথাটা বাড়তে থাকে |
দ্রুত হাতব্যাগ হাতড়ে জিবের নিচে স্প্রে করেন |
পথ যেন আর ফুরোয় না |
লাইফটাইম হাসপাতালে এসে যখন পৌঁছান সেকান্দার সাহেব, সন্ধ্যা গড়িয়ে আঁধার নেমেছে |
বারিধারার অত্যাধুনিক এই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে কতগুলো নির্বাক মুখ |
শঙ্কাচ্ছন্ন এই মানুষগুলোকে বড় অচেনা মনে হতে থাকে সেকান্দার সাহেবের |
ছুটে এসে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন শ্যামলী নাসরীন |
কী হয়েছে আমার উমামার? অপারেশন থিয়েটারের সামনের লনেই সংজ্ঞা হারান সেকান্দার সাহেব |
বেলা ঠিক দুটোয় স্কুল ছুটি হয় উমামার |
গুলশানের বাসা থেকে আনা-নেওয়া করে প্রায় দেড় যুগের বিশ্বস্ত গাড়িচালক কবির |
নিয়ম করে সকাল ৮টায় বের হয় |
দুটোয় বেরিয়ে কোনো দিন তিনটা বা সাড়ে তিনটায় বাসায় ফেরে |
বেশির ভাগ দিন মেয়েকে স্কুলে দিয়ে নিজের কাজে বেরিয়ে পড়েন শ্যামলী নাসরীন |
ইহান ধানমন্ডির ম্যাপল লিফ এ পড়ে |
তাকে নিয়েও ব্যস্ততা কম যায় না শ্যামলী নাসরীনের |
ব্যবসার কারণে সেকান্দার খুব ব্যস্ত থাকেন বলে এই আনা-নেওয়ার কাজটা হয় স্ত্রী, না হয় ড্রাইভার কবিরকে দিয়ে করান |
স্কলাসটিকার প্লে গ্রুপে মর্নিং শিফটের সবার প্রিয় মুখ উমামা |
ক্লাসের আর দশজন স্কুলড্রেসের বাচ্চাদের থেকে সহজেই খুঁজে নেওয়া যায় তাকে |
কালো জ্বলজ্বলে বড় চোখ |
মাথার বড় চুলের ঝুঁটি |
হাসি ঝুলে থাকা মুখ |
ক্লাসটিচারদেরও খুব প্রিয় আর আদরের উমামা |
স্কুল শেষে তাইতো বেশির ভাগ সময়ই কোনো কোনো টিচার গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেন উমামাকে |
দুটোর দশ মিনিট আগে কবিরকে ফোন করেছিলেন শ্যামলী নাসরীন |
আর আড়াইটায় ফোন এল অপরিচিত নম্বর থেকে |
হ্যালো, শ্যামলী নাসরীন বলছেন? |
লাইফটাইম হাসপাতাল থেকে বলছি |
বুকটা ধড়াস করে ওঠে শ্যামলী নাসরীনের |
জি ম্যাডাম, আসলে...খারাপ খবর আছে |
আপনার গাড়িটা খিলক্ষেতে অ্যাকসিডেন্ট করেছিল... |
চারপাশে অন্ধকার দেখতে থাকেন শ্যামলী নাসরীন |
মনে হয়, মাথা ঘুরে এখনই পড়ে যাবেন |
অনেক কষ্টে সামলে নেন নিজেকে |
আপনার ড্রাইভারকে আমরা বাঁচাতে পারিনি |
আপনার মেয়ের ব্যাগে ইমার্জেন্সি নম্বর ছিল আপনার |
সেখান থেকে ফোন করলাম |
প্লিজ, আসুন |
হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেল |
উদ্ভ্রান্তের মতো হাসপাতালে ছুটলেন শ্যামলী নাসরীন |
টানা ৫ ঘণ্টার চেষ্টাতেও বাঁচানো গেল না উমামাকে |
অপারেশন থিয়েটার-ফেরত ডাক্তারদের সিনিয়র মাথা নিচু করে এ কথা বলেই চলে গেলেন |
কেঁদে উঠল আকাশ-বাতাস |
দপ করে যেন আজ নিভে গেল সব আলো |
হাসিমুখগুলো যেন হারিয়ে গেল মেঘেদের দেশে |
চারপাশে শুধু হাহাকার, শূন্যতা |
হাসপাতালের কাচঘেরা দেয়াল ভেদ করে কান্নার ঢেউ এসে মিশে গেল জনসমুদ্রে |
সেই জনসমুদ্রের ভিড়ে ছুটে চলেছেন সেকান্দার সাহেব |
হাতে এক তোড়া ফুল, বুকপকেটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠি |
কিছুতেই ধরতে পারছেন না উমামাকে |
খিলখিলিয়ে হেসে ছুটে চলেছে নগরীর অলিতে-গলিতে |
পেছন পেছন ছুটছেন সেকান্দার সাহেব |
আজ যে উমামার জন্মদিন |
উমামা থাকলে আজ পাঁচে পা দিত |
সেই দুপুরের পর বেরিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে উমামার জন্য জামা কিনেছেন সেকান্দার সাহেব |
ফুল কিনেছেন |
পাঁচ পাউন্ডের কেক কিনেছেন |
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ড্রয়িংরুমে সব সাজিয়েছেন |
মোমবাতি জ্বলেছে |
তারপর ডুকরে কেঁদেছেন |
পরিবারের সবাই কেঁদেছে |
আজ যে বেদনার দিন |
সব হারানোর দিন |
কিন্তু এখন মনটা ভালো সেকান্দার সাহেবের |
উমামা ফিরে এসেছে |
সেই যে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে, কিছুতেই ছাড়ছে না |
আবার নিজেই নেমে সারা ঘর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে |
ঘরের কোণে সযতেœ সাজিয়ে রাখা খেলনাগুলো নিয়ে দুর্বার খেলছে |
বড় ভালো লাগছে সেকান্দার সাহেবের |
এ ভালো লাগার মূল্য যে কতটা, যার ভালো লাগা নেই সেই তো বুঝতে পারে |
রাত ক্রমশ বাড়তে থাকে |
ঝিরিঝিরি বাতাসে হলদে আভায় ছেয়ে ওঠে পুবাকাশ |
টেবিলে মুখ গুঁজে উমামাকে প্রাণভরে দেখতে থাকেন সেকান্দার সাহেব |
উমামা এগিয়ে এসে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে মাথায় |
বাহুতে শক্ত করে মেয়েকে জড়িয়ে রাখেন |
ছোট্ট তুলতুলে মুখে হাত বুলিয়ে দেন |
বহুদিন পর আজ কানায় কানায় ভরে ওঠে সেকান্দার সাহেবের এই বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট |
এত সুখ আর অনাবিল শান্তি যেন এক স্বপ্নের বাগানে ছুটে চলেছেন অবিরাম |
ছোট্ট হাতে বাবার মাথায় বিলি কাটতে থাকে পরি |
সেকান্দার সাহেব তলিয়ে যেতে থাকেন গভীর ঘুমের রাজ্যে |
শেয়ার করুনঃ |
কিছু না থেকে অনেক কিছু |
ঈদুল ফিতর ও আমাদের করণীয় |
. * |
, , . |
চলমান সংখ্যা |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.