content
stringlengths 0
129k
|
|---|
এরপর একে একে সারা বাড়ি জেগে উঠবে
|
অরুণাভ হাসে আমার এই নিজের মতো করে সময় কাটানোর কথায়... "নিজের মতো করেই তো দিন কাটাও তুমি, তোমার তো সারাদিনই 'মি-টাইম' রুপু, এরপরেও আলাদা করে ফাঁকা সময় লাগে নিজের জন্য?" খুঁটিনাটি কাজের ভিড়ে হারিয়ে যায় অরুণাভর খোঁচাটা আর মায়ের খোঁজ নেওয়াই হয় না সারাদিনে
|
অভিমান জমতে দেওয়ার আগেই ডায়াল করি, চেনা নম্বরটা
|
হ্যালো মা! রুপু বলছি...
|
সকাল ৯.০০, ড্রয়িংরুম
|
নীলিমার কথা
|
বয়স বাড়লে বুঝি ঘুম উধাও হয়ে যায়
|
সেই কোন ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায় আজকাল
|
ওসব হেডফোন কানে নিয়ে শুনতে পারি না বাপু, তার চেয়ে ইউটিউবে গান শুনি
|
আলো ফুটলে জানলার পর্দা সরিয়ে মাথার পাশের সঙ্গীকে টেনে নিয়ে দিব্যি সকালের ঘণ্টা দুয়েক কেটে যায়
|
বহুবার পড়া শীর্ষেন্দুর 'মানবজমিন' আবার শুরু করেছি, আজ সত্যিই এই প্রিয় পৃথিবীর গভীর অসুখ
|
কবে যে সেরে উঠবে... যত দিন যাচ্ছে, এই দিন-দুনিয়ার জন্য মায়া বাড়ছেই
|
লাইক-শেয়ার-কমেন্টের দেখনদারির দুনিয়া ছাড়িয়ে আরেকটা পৃথিবী আছে আমাদের চারপাশে, যেটা বড্ড নিজের, অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি; সেই পৃথিবীটার জন্য মায়া হয় আজকাল
|
বেল বাজল, কাজের মেয়েটা এল
|
কাঁচা সবজির বাজারটা ওই করে আনে আবার কেটেকুটেও দিয়ে যাচ্ছে কদিন হল
|
রান্নার মেয়েটা অনেক দূর থেকে আসে বলে ছুটি দিয়ে দিয়েছি
|
পিঙ্কিদের বাড়িটা আমাদের গলির মুখেই তাই রক্ষা, নইলে এই বয়সে আমার একার পক্ষে এতসব সামলানো একরকম অসম্ভব
|
পিঙ্কির বরের চৌরাস্তার মোড়ে তেলেভাজার দোকান, সকালে ডালপুরি, বিকেলে চপ-ঘুগনি... সব বন্ধ
|
পাশের ঘরে একজন নবাবপুত্তুর পিজি থাকে
|
ফিজিক্স অনার্স, সেকেন্ড ইয়ার
|
বেলা দশটার আগে তার ঘুম ভাঙে না আর এই লকডাউন পিরিয়ডে তো বারোটা
|
সারাবছর দুবেলা হোম ডেলিভারিই ভরসা
|
এই দুর্দিনে আমিই বলেছি, আমার কাছে খেয়ে নিতে
|
ঘুম ভেঙেই সোজা দুপুরের খাওয়া, তারপর সারাদুপুর-বিকেল গিটারের টুংটাং
|
বিকেলের চা-টা অবশ্য অর্ণবই করে
|
সঙ্গে গিটার কাঁধে গান
|
শুধু দর্শক বা শ্রোতার ভূমিকাতেই শেষ নয়, একেকদিন সেসব আবার আমায় ভিডিও রেকর্ডও করে দিতে হয়
|
তারপর সেসব আপলোড দেওয়ার পর্ব নিজের টাইমলাইনে, আর পরের গল্প তো সবার জানা... লাইক, শেয়ার, কমেন্ট
|
আর ডাইনিং টেবলে বসে যত বকবক... আমি নাকি তার ওল্ড লেডি ফ্রেন্ড! আশ্চর্য সব মানবজমিন দেখে যাচ্ছি! সবটাই যে মন্দ লাগে, এমনটা নয়
|
তবে, বেশিরভাগই তাল মেলাতে পারি না এই দু-তিন প্রজন্ম পরের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে
|
সেটাই স্বাভাবিক
|
লাইক বেচে এদের দিন কাটে আর যত শেয়ারিং নাকি ওই ভার্চুয়াল দুনিয়ায়
|
বেলা ১২.০০, দোকানঘর
|
প্রবালের কথা
|
...দাদা, মুড়ি আছে?
|
...না বৌদি, মুড়ি তো শেষ
|
পরশু আসার কথা, রবিবার একবার আসুন দেখি
|
...কাল রাত থেকে আবার ছেলেটার পেটখারাপ, সকাল থেকে বারকয়েক বমিও করেছে
|
দুপুরে জলমুড়ি দেওয়া ছাড়া তো কোনও উপায় নেই
|
ঘরে যেটুকু ছিল, তাই দিয়ে রাত থেকে চালিয়েছি, আর একটুও নেই
|
কী করি এখন?
|
...ওহ হো! দাঁড়ান দেখি, একজন হাফকেজির প্যাকেট করে রাখতে বলে গিয়েছে সকালে, এখনই আসার কথা
|
ওখান থেকেই আপনাকে দেওয়া যায় কী না খানিকটা দেখি
|
ছেলেকে সাবধানে রাখুন বৌদি, জ্বর নেই তো গায়ে?
|
...না, জ্বর নেই
|
তবে দুর্বল হয়ে পড়েছে খুব
|
একটা সাদা তেলের প্যাকেট, একটা থিন বিস্কিট, পাঁচফোড়ন, সাদা-কালো দুরকম সরষেই মিশিয়ে দেবেন আর চারটে গরমমশলার প্যাকেট
|
...বাকিগুলো দিচ্ছি কিন্তু গরমমশলা দুটোই আছে, আপনি একটা পাবেন
|
কী করি বলুন, সবাইকেই তো দেখতে হবে
|
লকডাউনের বাজারে মালই তো আসছে না
|
দোকানে পুরনো স্টক করা যা ছিল, তাই দিয়েই চালাচ্ছি
|
কাল-পরশুর মধ্যে তাও শেষ হয়ে যাবে, এর মধ্যে নতুন স্টক না ঢুকলে আমরাও যে কী করব, জানি না
|
ডিস্ট্রিবিউটরের ঘরেও স্টক শেষ বলছে
|
আর কিছু লাগবে আপনার? নইলে সেই রোববার
|
আজকের মতো ঝাঁপ বন্ধ করে এবেলাই বাড়ি
|
কতদিন যে চলবে এই ঝামেলা কে জানে
|
দোকানে স্টক শেষ, ঘরেও তো রসদ সীমিত
|
ডিস্ট্রিবিউটরকে আগাম দেওয়া আছে, নইলে তো মাল দেবে না এই বাজারে
|
পাড়ায় ভ্যানের সব্জিওয়ালারা তো দেড়গুণ দাম নিচ্ছে আনাজপাতির
|
কিচ্ছু করার নেই
|
তাই দিয়েই চালাতে হবে
|
একবেলা দোকান খুলছি বলে সকালে বাজারও যেতে পারছি না
|
হয়তো কিছু কমে পেতাম
|
এভাবেই চালাতে হবে, যা দেখছি
|
দুপুর ৩.০০, ড্রয়িংরুম
|
প্রিয়মের কথা
|
"টু'নাইট অ্যাট টেন লাইভ ফ্রম মাই পারসোন্যাল প্রোফাইল"
|
স্টেটাস দেখে পিং এল...
|
সায়ন্তিকা: আজ কি পুরোটাই?
|
না না, প্রিল্যুড... দেন প্রথম লাইন... তুই 'তাপস নিঃশ্বাস বায়ে', আমি নেক্সট... ইন্টারল্যুড... 'দূর হয়ে যাক' কোরাস... এন্ডিং নোট
|
সায়ন্তিকা: ওকে
|
কাল বাদে পরশু পয়লা বৈশাখ... ইশশ! ব্যান্ড ফেস্টটা পুরো মাঠে মারা গেল
|
সবে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল
|
একটা-দুটো স্পনসরও আসতে শুরু করেছিল
|
বাবির সঙ্গে আজ বিকেলে একটা ভার্চুয়াল জ্যামিং আছে আর তারপর ঠিক দশটায় নিজের প্রোফাইল থেকে লাইভ
|
পয়লার প্রোমো আর কী! সায়ন্তিকাকেও বলা আছে, ও আসবে লাইভে সেম টাইম
|
বাকিটা শুভ দেখছে, আই মিন এডিট পার্টটা
|
আমাদের তো মোবাইল ভরসা, কত আর ভালো হয়
|
ওর ম্যাক আছে, দেখা যাক
|
তিনটে বাজে, এখনও ঘণ্টা দুয়েক সময় আছে
|
পাঁচটার মধ্যে বাকিটা তুলে ফেলতে হবে
|
মা ঘুম থেকে ওঠার আগেই রেকর্ডিংটা শেষ করতে হবে
|
তারপরেই তো শুরু হবে রান্নাঘরে বিভিন্নরকম বাসনের শব্দ
|
রেকর্ডিং-এর তেরোটা বেজে যাবে
|
এত ছোট একটা বাড়ির মধ্যে এতসব হয় নাকি? জনিদের বেশ মজা, ডান্স তো
|
দিব্যি ছাদে গিয়ে ভিডিও করছে
|
আর ও? আজ তিনমাস তিনদিন... একটাও কথা নেই
|
একবারও কেউ কারও স্টেটাস চেক করিনি, যদিও লুকিয়ে প্রোফাইল ঘুরে এসেছি
|
দিব্যি তো আছে আমায় ছাড়াই
|
আমিই শুধু রোজ সকালে নিয়ম করে লাস্ট সিন... চেক করি আর ভাবি কত বদলে গেল মেয়েটা এই তিনমাসেই
|
আমার সঙ্গে কথা বলার সময় ১২টা না বাজতেই ঘুম পেয়ে যেত যার, এখন সে প্রায়দিনই মাঝরাত পর্যন্ত অনলাইন! কোথায় যে আছে এখন... কোথায় এখন বলে, 'ভালোবাসি'... পৃথিবীর না হয় আজ অসুখের সময়, আমার অসুখ তো অনেক আগেই বাসা বেঁধেছে
|
সন্ধ্যা ৭.০০, ড্রয়িংরুম
|
শুভ্রর কথা
|
সারাদিন স্ক্রিনের সামনে টানা বসে থেকে চোখগুলো জ্বালা করছে, মাথাটাও দপদপ করছে
|
খোলা হাওয়া দরকার
|
ছাদে ঘুরে আসা যায় কিন্তু দরজা খুলে বেরোতে গেলেই পারমিতা কিছু না বলে এমন অদ্ভুতভাবে তাকাবে... শিওর ভাববে, রুনার সঙ্গে কথা বলার জন্য আড়াল খুঁজতে যাচ্ছি
|
ওর সন্দেহটাও ভুল নয়, কিন্তু অন্যদিকে তো রুনার বাড়িতেও ওর বর আছে... শ্বশুর-শাশুড়ি... ভরা বাড়ি
|
দু-একবার ফোন করে দেখেছি, কীরকম যেন একগলা অস্বস্তি নিয়ে রুনা ফোন ধরে
|
তাই মেসেজই ভরসা
|
অফিসে যেদিন ইন্দ্রদার কাছে ধরা পড়েছিলাম, ইন্দ্রদা বলেছিল, "এই দু নৌকোয় পা রেখে নৌকো চালানো কিন্তু খুব কঠিন ভায়া
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.