content stringlengths 0 129k |
|---|
পুরনো বাড়িতে যাতায়াতও তার তেমন নেই |
দশ বছর বয়স থেকে সাততলার ফ্ল্যাটের বাকুর বাড়িতে গত বস্ত্র পর্যন্ত কাজ করেছে |
এখন তার বছর কুড়ি বয়স |
আর বাকুর বাড়ি কাজ করার দৌলতেই তার এই চাকরি, পড়াশোনা |
পড়াশোনা করতে যে স্কুলে গেছে, তা নয় |
বাবুর বাড়ির সকলেই তাকে পড়িয়েছে |
লিখতে শিখিয়েছে, পড়তে শিখিয়েছে |
তারপর বাবুর বন্ধু শেয়ালদায় জেরক্সের দোকান খুলল, বাবু বলে কয়ে সেখানে চাকরি জুটিয়ে দিল নীলার |
চাকরিটা যত নীলার কাছে আত্মসম্ভ্রমের তেমনই চাকরি জোটানোর |
প্রক্রিয়া তেমন নয় |
নিজের কাছ থেকে বাবুর বাড়ি কাজ করার অতীত মুছে ফেলতে চায় সে |
সে এখন চাকরি করে |
জেরক্স মেশিন চালায় |
নিজের পয়সায় সুন্দর সুন্দর পোশাক কিনে পরে সে |
আর এই বস্তি থেকে বেরিয়ে ট্রেনে চেপে বসলেই বস্তিটাকে অস্বীকার করে ফেলে নীলা |
আর পাঁচটা ভদ্র ও শিক্ষিত ঘরের কমবয়সী মেয়ের মতোই হয়ে ওঠে |
পোশাকে তাকে তেমনই দেখায় |
চুলে ক্লিপ আঁটার ভেরও |
বাঁ কজিতে ঘড়ি আঁটলে তেমনই দেখায় |
নিজের কোলটুকুতে বাঁ হাতে ধরে রাখা ছোট্ট ব্যাগটাতে তেমনই মানায় |
অন্যদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছে নীলা |
সেই সতর্কতা, সেই পরম অনুভূতি নিয়ে চঞ্চল হয়ে পড়ে নীলা |
আনন্দিত হয়ে থাকে |
তৃপ্তিতে চোখ বুজে আসে, ট্রেনের কারায় |
জেরক্সের দোকানের কর্মব্যস্ততার ভেত্র আত্মমগ্নতার আনন্দ তৈরি করে নীলা |
কাউন্টারের কাছে আয়না আছে |
আয়নার সামনে এগিয়ে এলেই প্রতিবিম্বিত হয় নীলা |
অন্য নীলা সেখানে ফুটে ওঠে |
অন্য নীলা সেখানেই ফুটে উঠুক, কল্পনা করে সে |
চমৎকার লাগে এ সব কিছু |
তার এ কাজের যে দীর্ঘ সময়, তাতে বস্তি তার মন থেকে সরে যায় |
সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত জেরক্স দোকানে কেটে যায় তার |
যখন ছুটি হয়, ফেরার সময় মনে পড়ে সে কোথায় থাকে |
তখন সে তার বস্তির ঘরে ফেরার জন্য অস্থির |
বিশ্রামের জন্য শরীর ও মনের ওপর ফড়িং এসে বসে যেন |
আর রাত যত এগিয়ে আসে ততই বস্তির মেয়ে হয়ে ওঠে নীলা |
ততই সে সমস্ত ধোঁয়া-ধুলোকালি চেঁচামেচি দুর্গন্ধ সমস্ত কিছুর অপেক্ষায় অস্থির হয়ে পড়ে |
যতক্ষণ না পৌঁছচ্ছে ততক্ষণ শান্তি নেই |
সারাক্ষণই ট্রেনের জানালায় অস্থিরতার চোখ ছুঁয়ে যায় |
সকালে বেরোবার সময় আবার অন্য মন |
হয়ে ওঠে নীলার |
বস্তি থেকে বেরোবার অস্থিরতা |
বেরোবার সময়টাও দ্রুত চলে আসে |
সকাল হয়ে উঠলেই বেরোবার সময় নিকট হয়ে ওঠে |
আর বেরিয়ে পড়তে পারলে বাঁচেও যেন |
নীলা তখন ট্রেনের কামরায় বসা শিক্ষিত ঘরের মেয়ের মতো মন নিয়ে খেলে |
বস্তিকে অস্বীকার করে বেরিয়ে আসে |
অথচ ছুটির দিনে, বস্তিতেই থাকতে চায় সে |
আর ভোলার কাছে গিয়ে বসতে চায় |
ছুটির দিন না কাটার সংকটে ভোলাকেই প্রয়োজনীয় মনে করে সে |
এই বস্তি থেকেই ভোলাকে সংগ্রহ করে সে |
মেলামেশা করতে আনন্দও পায় |
এক্ষেত্রে বাবুর বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার কথা ভাবে না সে |
বরং অস্বস্তি |
বস্তিতে থাকার ভের এক স্বাধীনতা খুঁজে পায় সে, এক নিজস্বতার পরিতৃপ্তি |
ছোট বয়স থেকে বাবুর বাড়িতে থেকে এসেছে সে |
বাবুর বাড়ির ভাল পরিবেশে ভাল খাবার-দাবার খেয়ে থাকার পর যখন কাজ ছেড়ে বস্তির বাড়িতে ফিরে আসে, বস্তির এই পরিবেশেই শান্তি খুঁজে পায় |
মাঝে মাঝেই চলে আসতে হত |
এই রকম বিপরীত যাপন নিয়ে সে বড় হয়েছে |
বস্তিকে অস্বীকার করার কিছু নেই নীলার |
তার যাপনের নানাকিছুতে জড়িয়ে থাকে |
ভাল লাগার মধ্যে মেখে যায় |
ভোলার জন্য আর অন্য কোনও দিনগুলোতে তেমন অস্থিরতা থাকে না |
রব্বিারে ছুটি কাটানোর সংকটে ভোলা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে |
ভোলা ও নীলার ছুটি যেন সমার্থক |
এই ঘরে একা একা কী করবে সে? পাশে আর একটা ঘর আছে |
ভাইপো ভাইঝিরা ও দিদির দুই ছেলে ও ঘরে ঘুমোচ্ছে বা খেলছে |
ওরা এভাবেই থাকতে অভ্যস্ত |
হয়ে পড়েছে |
ওঘরেই রান্না খাওয়ার আয়োজন |
একচিলতে ঘর |
বাবুদের বাড়িতে মা দিদি-বৌদি ঠিকে কাজ করে |
ফাঁকে ফাঁকে কেউ আসে |
ও ঘরেই তখন ফেরে |
বাচ্চারা তাদের পর্যায়ক্রমে সঙ্গে পায় |
কেউ এসে খেতে দেয় |
কেউ স্নান করায় |
কেউ এসে ঘুম পাড়ায় |
মা চার বাড়ির কাজ করে |
বৌদি পাঁচটা বাড়িতে |
দিদি চার বাড়িতে কাজ করে |
এই বস্তির কাছেই সমস্ত বাড়িগুলো |
বাবু দিদিরা বস্তির গা ঘেঁষে রাস্তা দিয়ে রিক্সা করে বাসস্টপে যায়, ফিরে আসে |
কোনটা ফ্ল্যাট বাড়ি, কোনটা নিজের বাড়ি, কোনটা ভাড়াবাড়ি |
বাড়ির দাদা-বৌদি দুজনেই হয়তো চাকরি করে |
ভাল খায়, ভাল কথা বলে |
ফোন, মোটর সাইকেল কিংবা নিজস্ব গাড়ি আছে |
কোনও বাবু মদ খেয়ে রাতে মাতলামি করে |
ঝগড়া চ্যাঁচামেচি হয় খুব |
সে সব জীবনের কথা জানে, স্বভাব জানে নীলা |
নিয়মনীতি-আদবকায়দা জেনেছে |
ওসব বাড়িরই একজন হয়ে থেকেছে |
কিন্তু তার থেকে বেরিয়ে এসেই হাঁফ ছেড়েছে |
সে বুঝেছে ও জীবন তার নয় |
বরং বস্তির হই-চই নানাকিছু সাধারণ মাতামাতিতে বেশি প্রাণচঞ্চল হতে পেরেছে সে |
আর তার বয়সী মেয়েরা বাবুর বাড়িতেই কাজ করে, সে করে জেরক্সের দোকানে চাকরি, তার এই গৌরব নিয়েও বস্তির থেকে আলাদা কিছু নয় |
বস্তি থেকে বেরিয়ে পড়লে যদিও অন্যরকম হয়ে যায় মন তার |
তা গা থেকে বস্তি মুছে যায় |
সেও মুছে ফেলতে চায় |
সে স্বপ্নযাপন বা মিথ্যাপন, সেই আনন্দ নিয়ে এখন আজকের এই ছুটির দিনে আনন্দিত হতে পারে না |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.