content
stringlengths
0
129k
যদিও এই আন্দোলনে তার দলের সাপোর্ট তিনি নিরঙ্কুশভাবে পাননি
মাওলানা ভাসানী পল্টনের জনসভায় ইসলামী রিপাবলিকের বিরোধিতা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন
একইসঙ্গে কেন্দ্রে এবং পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসীন হওয়ায় আওয়ামী লীগ অল্প সময়ের সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে
কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনামল শান্তিপূর্ণ হতে পারেনি
কেন্দ্রে ও প্রদেশে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকার গৃহীত বিভিন্ন নীতির প্রশ্নে পার্টির অভ্যন্তরে কোন্দল দেখা দেয়
আওয়ামী লীগ গঠিত হওয়ার সময় থেকেই অনেক বামপন্থী নেতা-কর্মী এই পার্টিতে ঢুকে পড়ে
পার্টির এই অংশ ভাসানীর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র করার বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা শুরু করে
মাওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে সমালোচনা করে বলেন যে, "আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে যে পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করেছে তা পার্টির মেনিফেস্টো বিরোধী
এভাবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দুটি ভিন্নমতালম্বী গ্রুপের সৃষ্টি হয়
এই মতবিরোধ শক্তিশালী হয় ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের কাগমারী সম্মেলনে
কাগমারী সম্মেলনে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়
৮ ফেব্রুয়ারি ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়
এই সভায় ভাসানী বক্তৃতা করেন
বক্তৃতায় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে তিনি বলেন, পূর্ববাংলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী তাদের সালামুন আলাইকুম জানাতে বাধ্য হবে
এই সালাম নিয়ে আমাদের দেশে জনপ্রিয় কথা চালু আছে ভাসানী নাকি পাকিস্তানী শাসকদের সালাম দিয়ে বিদায় জানিয়েছেন
আসলে এই কথাটি তিনি বাঙালি ও নিজ দলের নেতা সোহরাওয়ার্দিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন
এই কথাটি যখন তিনি বলেন তখন পাকিস্তান কেন্দ্রের সরকারে ছিল আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগই পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল
ভাসানী ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহরাওয়ার্দি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী
পূর্ব পাকিস্তান শোষিত হচ্ছে এটা হচ্ছে ভাসানীর রাজনৈতিক মিথ্যে কথা
সে এর মাধ্যমে সমস্ত বাঙালি বিশেষত আওয়ামীলীগের লোকদেরকে সোহরাওয়ার্দির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিতে চেয়েছিলো
মূলত কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান
এই চুক্তিতে চীন নাখোশ হয়েছে
চীনের খুশি বা অখুশিই ভাসানীর খুশি বা অখুশি
পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের ব্যাপারেও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ভাসানীর মতবিরোধ দেখা দেয়
প্রস্তাবিত পাকিস্তান সংবিধানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভাসানী তীব্র প্রতিবাদ করেন
সোহরাওয়ার্দী পৃথক নির্বাচনের পক্ষপাতি ছিলেন
ইসলামিক রিপাবলিকের ব্যাপারেও ভাসানীর আপত্তি ছিলো
এতে সংখ্যালঘুদের অধিকারহরণ হবে বলে তিনি মনে করতেন
ভাসানী তাঁর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘেঁষা বৈদেশিক নীতিরও বিরোধিতা করেন
তিনি চেয়েছিলেন চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে
ভাসানী কাগমারি সম্মেলন করেছে মূলত চীনের চাপে
কাগমারি সম্মেলনের পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি ভাসানী বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই কথা বলতে থাকেন দলের ডানপন্থী ও উদারপন্থীরা
অনেকটা কোণঠাসা ভাসানী মাসখানেক পরে ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন সোহরাওয়ার্দীর চুক্তি বাতিলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
একই বছর ২৫ জুলাই ভাসানীর নেতৃত্বে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' (ন্যাপ) গঠিত হয়
ন্যাপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাসানী প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং এরপর থেকে সবসময় বাম ধারার রাজনীতির সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন
এজন্য তাকে তার বিরোধীরা উপহাস করে লাল মাওলানা বলতো
ন্যাপ গঠনের পর প্রাদেশিক পরিষদের ২৮ জন সদস্য আওয়ামী লীগ থেকে সরে এসে ন্যাপে যোগ দেন
১৯৬৩-র মার্চ মাসে ভাসানী আইয়ুব খানের সাথে সাক্ষাত করেন
একই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের বিপ্লব দিবস-এর উৎসবে যোগদানের জন্য ঢাকা ত্যাগ করেন এবং চীনে সাত সপ্তাহ অবস্থান করেন
তিনি আইয়ুব ও চীনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হন
১৯৬৪-র ২৯ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পুনরুজ্জীবিত করে দলের সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং একই বছর ২১ জুলাই সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ) গঠনে ভূমিকা পালন করেন
ভাসানী ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর সাথে যুক্ত থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করেন ও আইয়ুবকে জিতিয়ে দেন
১৯৬৫-র ১৭ জুলাই আইয়ুব খানের চীন ঘেঁষা পররাষ্ট্র নীতির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন
৬০ দশকে সারা পৃথিবীর সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়
পাকিস্তানেও তার ব্যতিক্রম হয় না
১৯৬৭ সালের কাউন্সিল অধিবেশনের পূর্বে মস্কোপন্থী নেতারা বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা চালায়
তাই মশিউর রহমান যাদু মিয়ার পরামর্শে রংপুরে কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করা হয়
১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর রংপুরে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনের পর দেশিয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রশ্নে ন্যাপ চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে
চীনপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন মওলানা ভাসানী এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন সীমান্ত প্রদেশের আবদুল ওয়ালী খান
পূর্ব পাকিস্তান ওয়ালী ন্যাপের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ
এ অংশ বাংলায় মোজাফফর ন্যাপ নামেও পরিচিত হয়
১৯৬৭ সালে ভুট্টোর নেতৃত্বে ও রাজনৈতিক জোট পিডিএমের নেতৃত্বে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়
১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে সেই আন্দোলন জমে উঠে
তখন ভাসানী শেখ মুজিবকে মুক্ত করার ইস্যু নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন শুরু করেন
আইয়ুব শেখ মুজিবকে মুক্তি দিল ও আগরতলা মামলা থেকে অব্যাহতি দিল
এবার ভাসানী আর শেখ মুজিব মিলে আইয়ুবের পক্ষে ভূমিকা রাখে
মূলত শেখ মুজিবকে ছাড়ার এটাই কারণ ছিল
১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন
বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনা করার জন্য তিনি ২৬ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেছিলেন
তিনি চেয়েছেন যেন আন্দোলনকারী সব দল তার সাথে আলোচনায় বসে
২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে আইয়ুব খান
শেখ মুজিবসহ ৩৪ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়
২৩ তারিখ গণসংবর্ধনা দেওয়া হয় শেখ মুজিবকে
সেখানে তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়
সারা ঢাকা শহরে আনন্দ মিছিল করে ছাত্রলীগ
রণক্ষেত্র ঢাকা থেকে উৎসবের ঢাকায় পরিণত হয়
মুজিব তার জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান
বক্তৃতায় শেখ মুজিব সব বিরোধী দলকে শান্ত থাকার জন্য আহবান করেন এবং প্রেসিডেন্টের সাথে গোল টেবিল আলোচনায় যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান
তিনি আইয়ুবের প্রতি আস্থা রাখার জন্য আওয়ামী লীগসহ সব বিরোধী দলকে আহ্বান জানান
মুজিবের মুক্তির পর রাওয়ালপিন্ডি থেকে উড়ে আসেন জুলফিকার আলী ভুট্টো
তিনি ভাসানী ও মুজিবের সাথে বৈঠক করেন
ধারণা করা হয় তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন
কিন্তু ঢাকায় আর কেউ আইয়ুব বিরুদ্ধে আন্দোলন করেনি
না মুজিব না ভাসানী
ভুট্টোর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানে তীব্র আন্দোলন চলতে থাকে
এমতাবস্থায় আইয়ুব খানের ওপর সেনাবাহিনীর চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে
অবশেষে ২৫ মার্চ আইয়ুব খান সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করেন
এরপর ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে নির্বাচনের ঘোষণা দিলে ভাসানী নির্বাচন থেকে মানুষকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন
তিনি বাংলাদেশকে একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন
তিনি বুঝতে পেরেছেন পাকিস্তানের সাথে থেকে এই দেশকে কম্যুনিস্ট বানানো যাবে না
নির্বাচিত শাসক ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করার দাবী দৃঢ় হবে না তাই তিনি আওয়াজ তুললেন, ভোটের বাক্সে লাথি মারো বাংলাদেশ স্বাধীন করো
কিন্তু এদেশের মানুষ তার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে উল্টো তাকেই লাথি মেরে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিল
তার দল ন্যাপ এই ইস্যুতে দুইভাগ হয়ে যায়
বাংলার জনগণ আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়
এরপরে তো ৭১ এর যুদ্ধ শুরু হলো
ভাসানী এই সময় থেকে মূলত দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়
তিনি পাকিস্তানকে ভাঙতে চেয়েছেন কিন্তু তার গুরু অর্থাৎ চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাকে এই কাজে বাধা দিয়েছে
চীন ও পাকিস্তান তখন টেকনিক্যালি মিত্র ছিল কারণ উভয়ের শত্রু ভারত
একাত্তরের সময় থেকে ভাসানী বিভ্রান্ত ছিল সিদ্ধান্ত নিয়ে
তার অনুসারীর অনেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য করে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে
কেউ কেউ আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রেখেছে
ভাসানী ভারতে অবস্থান করেছেন
ভারত মাওবাদী হিসেবে তাকে প্রথমে বন্দি পরে ছেড়ে দিয়ে কড়া নজরদারীর মধ্যে রেখেছিলো
যুদ্ধের পরে দেশে ফিরে নানান সময়ে নানান আন্দোলন করেছিলেন
১৯৭২-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক হক-কথা প্রকাশ করেন
১৯৭৪-এর ৮ এপ্রিল হুকুমতে রাব্বানিয়া সমিতি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন
একই বছর জুন মাসে তিনি মুজিবের শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে টাঙ্গাইলের সন্তোষে গৃহবন্দি হন