content stringlengths 0 129k |
|---|
উচ্চশিক্ষা : |
১৮৯৩ সালে স্কচ মিশন স্কুল কলেজে উন্নীত হলে ইকবাল এখানে এফ. এ. শ্রেণীতে ভর্তি হন |
১৮৯৫ সালে অনুষ্ঠিত এফ.এ. পরীক্ষাতেও তিনি প্রথম বিভাগে পাস করেন এবং যথারীতি বৃত্তিসহ স্বর্ণপদক লাভ করেন |
১৮৯৫ সালে তিনি শিয়ালকোট হতে লাহোরে এসে লাহোর সরকারী কলেজে বি.এ ভর্তি হন |
১৮৯৭ সালে তিনি আরবী ও ইংরেজিতে সমগ্র পাঞ্জাবে প্রথম স্থান নিয়ে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন |
যে কারণে তিনি এবার দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেন |
এরপর ১৮৯৯ সালে দর্শনশাস্ত্রে এম.এ পাস করেন |
সাথে সাথে তিনি লাহোর ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক নিযুক্ত হন |
এর কিছুদিন পরই তিনি লাহোর সরকারী কলেজ ও ইসলামিয়া কলেজের ইংরেজি ও দর্শনশাস্ত্রের খন্ডকালীন সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন |
এ সময়ে উর্দু ভাষায় অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁর সর্বপ্রথম বই লিখেন |
১৯০৫ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য লন্ডন গমন করেন |
কিন্তু সেখানে না থেকে তিনি জার্মানী যান |
জার্মানীর মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারস্যের দর্শন শাস্ত্র বিষয়ক থিসিস লিখে ১৯০৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন |
এরপরের বছর লিংকন ইন হতে ব্যারিস্টারী পাস করেন |
১৯০৮ সালের ২৭ শে জুলাই তিনি দেশে ফিরে এলে লাহোরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁকে বিপুলভাবে সংবর্ধিত করেন |
তিনি লাহোরে ফিরে স্বপদে পুনর্বহাল হন এবং সরকারের অনুমতিক্রমে আইনব্যবসা শুরু করেন |
এর বছর দেড়েক পর লাহোর সরকারি কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্থায়ীভাবে তিনি আইনব্যবসা শুরু করেন |
সাহিত্য প্রতিভা : |
ছাত্রাবস্থায় ১৮৯৬ সালে শিয়ালকোটের এক কবিতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর কবি প্রতিভার বিকাশ লাভ করতে শুরু করে |
এরপর তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখে হায়দারাবাদের প্রখ্যাত কবি দাগের নিকট পাঠিয়ে দেন সংশোধনের জন্য |
কবি দাগ কিশোর কবির এ কবিতাগুলি পেয়ে মনোযোগ সহকারে পড়েন ও চমৎকার একটি মন্তব্য লিখে পাঠান |
কবি দাগ লিখেছিলেন, 'এ কবিতাগুলি সংশোধন করার কোন দরকার নেই |
এগুলো কবির স্বচ্ছ মনের সার্থক, সুন্দর ও অনবদ্য ভাব প্রকাশের পরিচয় দিচ্ছে |
' কবি ইকবাল এ চিঠি পেয়ে তো খুব উৎসাহ পেলেন |
তাঁরপর হতে চললো তাঁর বিরামহীন কাব্যসাধনা |
এরপর ১৯০০ সালে তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত আঞ্জুমানে হিমায়েতে ইসলাম-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় জীবনের প্রথম জনসমক্ষে তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'নালা ইয়াতীম' বা অনাথের আর্তনাদ পাঠ করেন |
কবিতাটি পড়ার পর চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যায় |
মানে কবিতাটি এত জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটি ছাপা হয় এবং এর প্রতিটি কপি সে সময় চার টাকা দামে বিক্রি হয় |
বিক্রয়লব্ধ প্রচুর পরিমাণ টাকা ইয়াতিমদের সাহায্যার্থে চাঁদা হিসেবে গৃহীত হয় |
১৯০১ সালে তিনি ছোটদের জন্য লেখেন-মাকড়সা ও মাছি, পর্বত ও কাঠবিড়ালি, শিশুর প্রার্থনা, সহানুভূতি, পাখীর নালিশ, মায়ের স্বপ্ন প্রভৃতি কবিতা |
এরপর তিনি দু'হাতে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন |
তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ছিল, 'স্বদেশপ্রেম, মুসলিম উম্মাহর প্রতি মমত্ববোধ, ইসলামের শ্বাশত আদর্শে তাওহীদভিত্তিক বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, জাতির উত্থান-পতন, দলীয় কলহ ও অন্তর্দ্বন্ধ নিরসন প্রভৃতি বিষয় কবিতায় স্থান পেতো |
ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে তিনি বেলালী সুরে আহবান জানাতেন ক্লান্তিহীনভাবে |
স্বকীয় আদর্শের সন্ধানে যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে তোলাই তাঁর লক্ষ্য ছিল |
তাঁর কাব্যে এ ধরনের চিরন্তন আবেদন থাকার কারণে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই সারা বিশ্বে খ্যাতি লাভ করতে সক্ষম হন |
নানামুখি প্রতিভার অধিকারী এ মহান ব্যক্তিত্ব তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সর্বমহল হতে অকুন্ঠ সম্মান অর্জন করেন |
মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের একজন হিন্দু অধ্যাপক বলেছিলেন, "মুসলমানগণ ইকবালকে লক্ষবার তাঁদের সম্পদ বলে দাবি করতে পারেন |
কিন্তু তিনি কোন ধর্ম বা শ্রেণীবিশেষের সম্পদ নন-তিনি একান্তভাবে আমাদেরও |
১৯০১ সালে 'হিমালাহ' নামক কবিতাটি তৎকালীন সময়ের উর্দু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকা 'মাখযানে' ছাপা হয় |
এটিই পত্রিকায় প্রকাশিত কবির প্রথম কবিতা |
মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে তিনি এসময় অনেকগুলো পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন |
১৯০৩ সালে লাহোর হতে অর্থনীতির ওপর তাঁর প্রথম পুস্তক 'আল ইলমুল ইকতেসাদ' প্রকাশিত হয় |
১৯২৪ সালে 'বাঙ্গেদারা' বা ঘন্টাধ্বনি নামক তাঁর বিখ্যাত কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয় |
এ পর্যন্ত এ গ্রন্থটির বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে |
১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'আসরার-ই-খুদী' বা ব্যক্তিত্বের গূঢ় রহস্য |
এ কাব্যগ্রন্থটি ১৯২০ সালে ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হয় |
সাথে সাথে সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে মহাকবি ও বিশ্বকবি আল্লামা ইকবালের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে |
১৯৪৫ সালে 'আসরার-ই-খুদী' বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হয় |
বিশ্বের বহু ভাষায় এ কাব্যগ্রন্থটি অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে |
১৯১১ ও ১৯১২ সালে পঠিত তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কবিতা 'শিকওয়াহ' বা অভিযোগ ও 'জওয়াব-ই-শিকওয়াহ' বা অভিযোগের জবাব উর্দু ভাষায় রচিত |
এ দীর্ঘ দুটি কবিতার কাব্যগ্রন্থ দু'টির বাংলা ভাষায় একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে |
১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় ফারসী ভাষায় রচিত 'পায়গাম-ই-মাশরিক' প্রাচ্যের বাণী কাব্যগ্রন্থটি |
গ্রন্থটি আরবী, ইংরেজী, তুর্কী, জার্মান ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয় |
১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয় ফারসী ভাষায় 'রামূয-ই-বেখুদী' বা আত্মবিলোপের গুঢ়তত্ত্ব কাব্যগ্রন্থটি |
মূলত এ গ্রন্থটি 'আসরারে খুদী'র দ্বিতীয়াংশ |
শুনলে আশ্চর্য হতে হয় যে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এ গ্রন্থটির ৮৪ তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে |
তাঁর 'বালে জিবরীল' বা জিবরাঈলের ডানা উর্দু ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে |
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় 'দরবারে কালীম' (মুসা আ. কে নিয়ে) কাব্যগ্রন্থটি |
উর্দু ভাষায় রচিত এ কাব্যগ্রন্থটি আরবী ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েও প্রকাশিত হয় |
এর আগে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর 'যাবুরে আজম' কাব্যগ্রন্থটি |
১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয় ফারসী ভাষায় রচিত 'জাবীদ নামা' বা অমর লিপি কাব্যগ্রন্থটি |
এমনিভাবে একের পর এক তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় |
তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থগুলি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে অসংখ্য সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে |
সম্ভবত তিনি প্রাচ্যের সেই ভাগ্যবান কবি ব্যক্তিত্ব যার রচনা এত ব্যাপকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে |
সত্যিই যদি বিশ্বকবি বিশেষণে কাউকে বিশেষিত করতেই হয় তবে সে সম্মানের অধিকারী নিঃসন্দেহে কবি আল্লামা ইকবাল |
কবি নিজেও ছিলেন বহু ভাষাবিদ পন্ডিত |
তিনি উর্দু, ফারসী, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় লেখনি চালিয়েছেন |
রাজনীতিতে কবি : |
আল্লামা ইকবাল নিছক খেয়ালের বশে কবিতা লিখতেন না |
তাঁর কবিতাই ছিল মানবতাবাদী ও রাজনীতির অংশ |
তাঁর সীমানা ভাঙার বিপ্লবের বাণী ধ্বনিত হতো কবিতায় |
১৯২৬ সালে তিনি পাঞ্জাব আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন |
১৯৩০ সালে নির্বাচিত হন মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে |
সেই থেকে তিনি হিন্দুস্তানের মুসলিমদের প্রতিনিধি হিসেবে ইংরেজদের সাথে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নিতেন |
এসব বৈঠকে তিনি ভারতীয় মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন দাবি দাওয়া পেশ করেন |
মুসলিম লীগের এলাহাবাদ অধিবেশনে ১৯৩০ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমি চাই যে-পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান একটি রাষ্ট্রে পরিণত হউক |
পৃথিবীর এই অংশে বৃটিশ সাম্রাজ্যের ভিতরে হোক বা বাইরে হউক-অন্ততপক্ষে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে একটি মুসলিম রাষ্ট্র সংগঠনই আমার মতে মুসলমানদের শেষ নিয়তি |
' এই মত অনুযায়ীই পরবর্তীকালে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মলাভ করে |
এ জন্য তাঁকে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার বলা হয় |
যদিও কবি মুসলিম লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন কিন্তু তিনি যেভাবে ও যে চরিত্রের ইসলামী আন্দোলন চেয়েছিলেন সেটা মুসলিম লীগ ধারণ করতে পারে নি |
তাই তিনি একজন ইসলামী নেতা ও প্রোপার ইসলামী দল খুঁজতে থাকেন |
এর মধ্যে হায়দরাবাদ থেকে সাইয়েদ আবু আ'লা মওদূদী নামের এক যুবক ১৯৩২ সাল থেকে তরজুমানুল কুরআন নামের একটি পত্রিকা চালু করেছেন |
আল্লামা ইকবাল এই পত্রিকা পড়েন |
তিনি তর্জুমানুল কুরআন ও মাওলানা মওদূদীর ভক্ত হয়ে ওঠেন |
মাওলানা মওদূদীকে তিনি মুসলিম জাতির ভবিষ্যত নেতা হিসেবে বিবেচনা করতে থাকেন |
তিনি মাওলানা মওদূদীকে মদদ দিতে থাকেন |
এদিকে পাঞ্জাবের চৌধুরি নিয়াজ আলী খান তার বিপুল সম্পত্তি দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করতে চেয়েছিলেন |
এজন্য তিনি তার বন্ধুদের সাথে অনেক আলোচনা করেছেন |
তারা সবাই তাকে আল্লামা ইকবালের কাছে যেতে বলেছেন |
তিনি আল্লামা ইকবালের সাথে দেখা করে তার ইচ্ছে ও পরিকল্পনার কথা জানান |
আল্লামা ইকবালের কাছে নিয়াজ আলী খান আসলে তিনি মাওলানা মওদূদীকে দেখিয়ে দেন |
মাওলানা মওদূদী কারো চাকুরি বা অনুগ্রহে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন |
কারণ এতে স্বাধীন সত্ত্বা থাকে না |
ফরমায়েশি কাজ করতে হয় |
তাই মওদূদী নিয়াজ আলী খানের সম্পত্তি নিতে অস্বীকার করেন |
অবশেষে নিয়াজ আলী খানের অনুরোধে আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদূদীকে পত্র লিখে পাঞ্জাবে আসতে বলেন |
১৯৩৮ সালে চিঠিটি নিয়াজ আলী খান নিজেই দিল্লী গিয়ে মাওলানার হাতে দেন |
আল্লামা ইকবালের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি মাওলানাকে চিঠি দেয়ায় মাওলানা হতবাক হয়ে যান |
আল্লামা তাকে হায়দারাবাদ পরিত্যাগ করে পাঞ্জাবে চলে আসার আহ্বান জানান |
মাওলানা মওদূদী কিছুদিন পরে আল্লামা ইকবালের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.