content stringlengths 0 129k |
|---|
এখন অনেক দিন বের হয়েছে |
আমরা কি শুধু ভ্যালেন্টাইন ডেতে বেশি প্রেম করি |
বাবা দিবসে কি বাবাকে বেশি ভালোবাসি |
এগুলো পুরোপুরি বাণিজ্যিক বিষয় |
এ দিনগুলো উপলক্ষ করে একশ্রেণির মানুষের কিছু মুনাফা হয় |
আমার কাছে জন্মদিন নিয়ে বিশেষ ভাবনার মতো কিছু নেই |
আমি প্রতিদিনই বাঁচি |
প্রতিদিনের কথাই চিন্তা করি |
আপনি একবার লিখেছেন- 'ভীরু তারাই যারা মৃত্যুকে মূল্যবান মনে করে, আর সাহসীরা তার উল্টো' |
জীবন তো সত্যিই মূল্যবান কিন্তু প্রকৃত অর্থে জীবন সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? |
জীবনের তো অনেক দিক আছে |
আমরা যদি একজন ভীরু মানুষের দিকে তাকাই তবে আমরা কী দেখি |
তার কাছেও তো জীবন অনেক মূল্যবান |
ভীরু ভাববে আহা জীবন চলে যাচ্ছে বা চলে যাবে |
কিন্তু একজন সাহসী লোক জীবনকে মূল্যবান ভাববে না |
তার কাছে জীবন হবে স্বাভাবিক বিষয় |
সে ভাববে জীবন তো চলেই যাবে একদিন |
জীবনের তো অনেক ধাপ আছে |
শিশুকাল যাকে আমরা শৈশব বলি, কিশোর ও যৌবনকাল, শেষে বার্ধক্য বা প্রবীণকাল |
জীবনের এ ধাপগুলো সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? |
আসলে শৈশব যে কত মূল্যবান আমরা তা শেষ জীবনে এসে বুঝি |
প্রায়ই বলি শৈশব কত ভালো ছিল |
আবার কৈশোরের কথা বলতে গিয়ে অনেক বিষয় বলার চেষ্টা করি |
যৌবনকালের বেলাও তাই বৃদ্ধকালে এসে আমরা পেছনের কথা ভাবি এবং মৃত্যুর জন্যও অপেক্ষা করি |
আসলে মানুষের জীবনের প্রতিটা ধাপই সমান সুন্দর |
প্রতিটি ধাপই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ |
৭৯ বছর আপনি অতিক্রম করেছেন |
দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে অনেক শ্রম দিতে হয়েছে, কষ্ট করতে হয়েছে |
আপনার চলার পথের কষ্টকর বিষয়গুলো যদি বলতেন? |
আসলে আমি এমন একজন মানুষ, আমি দুঃখের কথা, বঞ্চনার কথা মোটেও মনে রাখি না |
সর্বক্ষণ আমার মনে সব আনন্দের কথা জেগে ওঠে |
কবে কোথায় কষ্ট করেছি |
কার কাছে লাঞ্ছিত হয়েছি |
এসব মনে নেই |
মনে করেই বা কী লাভ |
তবে ভালো মন্দ যাই হোক না কেন আমার জীবন খুব আনন্দে কেটেছে |
আপনার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ মাত্র একটি |
আর কবিতা লিখছেন না কেন? |
কবিতা হচ্ছে জ্বলে উঠা হৃদয়ের একটি বিষয় |
কবিতা মূলত যৌবনের |
আমার ধারণা, যৌবনে যারা ভালো কবিতা লিখে যেতে পারেন তারাই কেবল শেষ অবধি কবিতা লিখে যান |
আমার যৌবনকালে কবিতা খুব একটা লিখতাম না |
যাই লিখেছি তাও খুব যে খারাপ তাও নয় |
আবার খুব ভালো কবি ছিলাম তাও না |
আপনার জীবনের অতৃপ্তি বা অপ্রাপ্তি কী? |
জীবনে কার না অতৃপ্তি বা অপ্রাপ্তি থাকে |
আমরা সব সময় আমাদের স্বপ্নের চেয়ে ছোট |
পৃথিবীর সব মানুষই প্রচণ্ড অতৃপ্তি বা অপ্রাপ্তিতে বাঁচে |
আমারও কিছু কিছু জায়গায় অতৃপ্তি আছে |
অপ্রাপ্তিও আছে |
লেখালেখির জায়গাতে আমার অতৃপ্তি আছে |
আমার ধারণা আমি লেখক হয়ে জন্মেছি |
লিখতে আমি অসম্ভব আনন্দ পাই |
কিন্তু এ আনন্দ আমি পরিপূর্ণভাবে পাইনি |
আর এ আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করলে হয়তো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাদ দিতে হতো |
এটা কি খুব তৃপ্তির ব্যাপার হতো? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র করে সমাজের জন্য তো কিছু করতে পেরেছি যার জন্য হয়তো লেখালেখির ব্যাপারে অতৃপ্তি থেকে যাবে |
তবে এখন আমি আবার লেখালেখি করব বলে ভাবছি |
অনেকেই মনে করেন আপনি লেখালেখিতে নয় বরং বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র সৃষ্টি করে অথবা একজন বাচিক শিল্পী হিসেবে অনেক বেশি জনপ্রিয় |
আপনি কি তাই মনে করেন? |
মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিঃসন্দেহে একজন বড় কবি |
আমার মনে হয় বছরে শতাধিক লোকও তার বই পড়েন না |
বরীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই বা কয়জন পড়েন? তার বই হয়তো মানুষ কেনে |
ঘরে সাজিয়ে রাখে |
কিন্তু কতজনে পড়ে? বড় লেখা-সেরা লেখা সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, বড় লেখকেরা হচ্ছেন একেকজন শ্রদ্ধেয় 'শব' |
মানুষ তাদের শ্রদ্ধা করেন, সম্মান প্রদর্শন করেন কিন্তু স্পর্শ করেন না |
আবার যারা জনপ্রিয় লেখক তাদের ওপর, তাদের লেখার ওপর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েন |
কিন্তু কিছু দিন পর তারাও হারিয়ে যান |
যেমন আমাদের তারকারা |
কিছু দিন পর দেখা যায় যে আর নেই |
তবে প্রতিভা চিরকালই তারকা থাকে |
সুতরাং জনপ্রিয়তা নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত নই |
আপনার একটি কবিতা আছে 'সাতাশ বছরের কবিতা' এ কবিতায় আপনি জীবনের অনেক অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেছেন |
এবং আপনি সাতাশ বছরেরই প্রার্থনা করেছেন |
এ কবিতার ব্যাখ্যা জানতে চাই? |
সাতাশ বছর পীড়ার বয়স / চোখের কালো কালশিরার বয়স |
সাতাশ বছর চুটিয়ে রটায়/ সোনালী শরৎ শীতরে কোঠায় |
সাতাশ বছর জীবনের জ্বর/ তবুও প্রার্থনা সাতাশ বছর... |
২৫ বছর হচ্ছে রক্তিম যৌবনের কাল |
২৬ ও ২৭ পূর্ণাঙ্গ যৌবনের একটি বিশেষ সময় |
এটি আমি তখন উপলব্ধি করতে পেরেছি |
এখন হয়তো করি না |
তবুও আমি ২৭ বছরকে কবিতার মাধ্যমে প্রার্থনা করেছি |
কারণ এটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলে আমার মনে হয় |
আপনি তো যন্ত্রণা নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বাঙালিদের নির্মম হত্যার প্রতিবাদ স্বরূপ |
এখন তো আমরা প্রতিনিয়ত হত্যা, গুম ও নির্যাতন দেখতে পাই কিন্তু প্রতিবাদী কোনো কবিতা দেখতে বা পড়তে পাই না... |
আসলে তখন তো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জন্য সবাইকে জাগানোর জন্য লেখা |
চলো সবাই... |
আর তখন একটি উদ্দেশ্য ছিল |
আর এখন যে নৈরাশ্য দেখতে পাই এতে আমরা জাগরণের অর্থ হারিয়ে ফেলেছি |
আমরা এমনভাবে ভেঙে গিয়েছি যে মনে হচ্ছে জাগরণের কোনো অর্থ নেই |
হয়তো আমার শক্তি দিয়ে অথবা সবার শক্তি দিয়ে আর কিছু হবে না এ ভাবনায় আমরা হয়তো ভেঙে পড়েছি |
এটি একদিনে হয়নি |
গত চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ধীরে ধীরে হয়েছে |
আমরা স্বাধীনতার যুদ্ধে যে শক্তির বলে জেগে উঠেছিলাম সে শক্তির পতন ঘটেছে |
এর অর্থ এ নয় যে আমরা শেষ হয়ে গেছি বা যাচ্ছি |
নামছি তবে আরও ওঠার জন্যই |
কারণ রাত্রির শেষ মুহূর্তটা কিন্তু প্রভাতের খুব কাছাকাছি |
সব মিলিয়ে এটাই বলতে চাই, উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে মানব জাতি এগিয়ে যাবে সামনের দিকে |
আমরাও এগিয়ে যাব |
ইতিহাস থেকে জেনেছি |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.