content
stringlengths
0
129k
শীত-গ্রীষ্ম যাই থাকুক, আকাশে ভরাট চাঁদ দেখা দিলে তার মনে জোগার গোনের চুনকুড়ির মতো উথালি-পাতালি শুরু হয়
মনের ভেতর ঢেউ ভাঙে
তখন তাকে দড়িতে বেঁধেও ঘরে আটকে রাখা দায়
কী যে হয় তার, জিনটা তার ওপর ভর করে বুঝি, মালকোচা মেরে উদোম গায়ে পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায় আর গান গায়
গাঁয়ের মানুষের কাছে তো অমাবস্যা-পূর্ণিমা সমান
ঘুটঘুটে অমাবস্যা হোক অথবা ফকফকে পূর্ণিমা, রাত আটটার পর কে আর জেগে থাকে? ঘুমের ভেতর তো আর অমাবস্যা-পূর্ণিমার কথা খেয়ালে থাকে না
রাত এগারোটা বা বারোটায়, অথবা তিনটায়ও হতে পারে, যখন বাদার নৈঃশব্দ চারদিক ছেয়ে ফেলে, ছেরুর গান শুনে তাদের মনে পড়ে আজ চান্নিরাত
চান্নিরাতে ছেরু গলা ছেড়ে গায়
উত্তরে কে গায়? কে আবার, ছেরু পাগলা
দক্ষিণে কে গায়? ছেরু পাগলা ছাড়া আর কে! পুবে-পশ্চিমে কার গলা শোনা যায়? ছেরুর, কোবাদ মাঝির বেটা ছেরু পাগলার
গান গাইতে গাইতে পথ ঘাট প্রান্তর ঘুরে বেড়ায় ছেরু
এখন মুকনোলির প্রান্তরে তো তখন গোনের দিঘির পাড়ে
খানিক পর আবার চুনকুড়ির তীরে
তার গান শুনে কেউ হাসে, 'ওই ছেরু পাগলা গায়
' কেউ মন খারাপ করে, 'আহ্ রে বেচারা! কত যে দুঃখ তার মনে!'
কে জানে কী দুঃখ ছেরুর মনে
কাউকে তো কোনোদিন তার দুঃখের কথা বলেনি
মনের দুঃখ মনে চেপে রেখে পথে-প্রান্তরে ঘোরে
অর্থবিত্ত কম নয় তার বাপের
এককালে মাঝি ছিল, পরে বিদেশ গিয়ে টাকাপয়সা কামায়
ছেরু বাপের খায় আর সৌখিনতা করে বেড়ায়
হাতে সিকোফাইভ ঘড়ি, গলায় সোনার চেইন, পায়ে চামড়ার জুতো
প্যান্টও পরে মাঝেমধ্যে
শহুরে সাজার অবিরাম কসরত
কিন্তু যতই চেষ্টা করুক গেঁয়ো ভাবটা তার চেহারা থেকে যায় না
তবু তার জন্য গরানপুর-হরিনগরের কত মেয়ে একপায়ে খাড়া! অথচ সে কাউকে পাত্তাই দেয় না
খানবাড়ির মহসিন খানের মেয়ে সুরাইয়া তো বেশরমের মতো একবার তাকে বলেই বসল, 'আমারে তুমি বে করবা ছেরু ভাই?' ছেরু তো মহা খাপ্পা, 'এক থাপ্পড়ে দাঁত ফিলে দ্যাবো বেশরম কোথাকার
দাঁড়া, তোর বাপের কাচে আমি যদি নালিশ না করিচি!'
নালিশ সে করেনি, এমন তুচ্ছ বিষয়ে নালিশ সে করতও না―নালিশ করার কথা বলে নিজের দেমাগটা ঝেড়েছে মাত্র
তার ওপর শোধ নিতেই হয়ত সুরাইয়া লজিং মাস্টারের সঙ্গে প্রেম করে পালিয়ে যায়
পরে যখন শোয়ামিকে নিয়ে সুরাইয়া বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে, একদিন খানবাড়ির চৌরাস্তার মোড়ে ছেরুর পথ আগলে কী অপমানটাই না করল, 'দেমাগ তো খুব দ্যাখাইচ ছেরু ভাই
এখন দ্যাখো, আমার বিএ পাস বর তোমার মতন মূর্খের সঙ্গে কথাও বলবে না
অপমান গায়ে মাখল না ছেরু, হাসতে হাসতে বলল, 'তুই যে আমারে ভালোবাসতিস সে-কথা যদি তোর বরকে বইলে দেই?'
সে বছর, ছেরুর বয়স তখন একুশ কি বাইশ, চুনকুড়ির চর দখলকে কেন্দ্র করে তুমুল লাঠালাঠি হলো
একপক্ষে ছবেদালি মোড়লের ফুফাতো ভাই মোবারক, অন্যপক্ষে খানবাড়ির জাবেদ খানের চাচাতো ভাই মহসিন খান
বুকে-পিঠে প্রতিপক্ষের ধারালো ছেনির পাঁচ পাঁচটা কোপ খেল মোবারক, ভাগ্য ভালো, তবু বেঁচে গেল
শোধ নিতে গরানপুর-হরিনগরের পঞ্চাশজনকে আসামি করে থানায় সে হাফ-মার্ডার মামলা দায়ের করল
ছেরু ঘটনার আগে-পিছে ছিল না, অথচ এজাহারে কিনা তার নাম ১৩ নম্বরে!
গ্রেফতার এড়াতে ছেরু আশ্রয় নিল গরানপুরে
গরানপুরে পুলিশ আসে না তা নয়, আসে
তবে হরিনগর থেকে ভাঙাচোরা রাস্তার পাঁক-কাদা মাড়িয়ে আসতে আসতে সারা গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ে
ততক্ষণে আসামিরা ডিঙিতে চড়ে চুনকুড়ি পার হয়ে খুব সহজেই জঙ্গলে ঢুকে পড়তে পারে
নদীপথেও পুলিশ আসে বটে, তবে কালে-ভদ্রে
ফলে আত্মগোপনের জন্য গরানপুর মোটামুটি নিরাপদ
মণ্ডলবাড়ির বৈঠকখানাটা মেলা দিন ধরে খালি
একসময় বিপিন থাকত
মণ্ডলবাড়ির মাহিন্দার ছিল সে
বিয়ে করার পর পোষাচ্ছিল না বলে বাওয়ালির পেশা ধরেছে
কেশব মাস্টারকে অনুরোধ করল ছেরুর বাপ, 'ঝামেলাডা মিটতি বেশি সময় লাগবে না মাস্টার, কটা দিন ছাইলেডারে তোমার বোঠেকখানায় থাকতি দ্যাও
মাস্টার তো দয়ার সাগর, অনুরোধ তিনি ফেলেন কী করে
থাকতে তো দিলেনই, কাঁথা-বালিশ আর একটা টেমিও দিলেন
সারাদিন ছেরু যেখানেই থাকুক, রাতে কেউ না দেখে মতো টুপ করে মণ্ডলবাড়ির বৈঠকখানার দরজাটা খুলে চুপচাপ শুয়ে পড়ে
আটটা-নয়টার আগে তো তার ভোর হয় না
বিছানা ছেড়ে কুয়োতলায় গিয়ে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে চুনকুড়ির আড়ায় উঠে এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে কাউকে না দেখলে সোজা উত্তরে অথবা দক্ষিণে হাঁটা ধরে
তখন তাকে দেখে কে বলবে রাতটা সে মণ্ডলবাড়ির বৈঠকখানায় কাটিয়েছে?
আত্মগোপনের সাত মাসে নমিতার সঙ্গে তার বেশ ক'বার দেখা হয়েছে, কথাও হয়েছে দু-চারবার
প্রথম দেখাতেই নমিতার সৌন্দর্যের প্রতি সে দুর্বল হয়ে পড়েছিল
তারপর যতবারই দেখা হয়েছে সামনে দাঁড়িয়ে একবারও ঠিকমতো কথা বলতে পারেনি
প্রতিবারই একটা আড়ষ্টতা তাকে জড়িয়ে ধরেছে
সবসময় নমিতার কথা ভাবত বলেই হয়ত রাতে প্রায়ই তার ঘুম ভাঙত অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে
কোনো কোনো স্বপ্ন ছিল এমন - নমিতার বাঁহাতের কব্জিটা তার মুঠোয় ধরে দুজন খাল-জঙ্গল পেরিয়ে এক অচেনা গাঁয়ের উদ্দেশে হাঁটছে
হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের সীমানা শেষ হয়ে শুরু হয় অকূল সাগর
অথবা দেখত, গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে বাদা থেকে হেঁসো হাতে বেরিয়ে অনন্ত মণ্ডল তাকে ধাওয়া করছে
প্রাণভয়ে সে ছুটতে থাকে
ছুটতে ছুটতে পেছনে ফিরে দেখে চুনকুড়ির আড়ায় দাঁড়িয়ে নমিতা হাসতে হাসতে কুটিপাটি খাচ্ছে
কত দিন ভেবেছে এসব স্বপ্নের কথা নমিতাকে বলবে
কিন্তু বলা কি এত সহজ! নমিতাকে একা পাবে কোথায়? পেলেও এসব কথা কি মুখে বলে দেয়ার মতো? বলতে হয় পত্র লিখে, মনের মাধুরী মিশিয়ে
ছেরু তো নিরক্ষর, পত্র সে লিখবে কেমন করে
অতএব মনের কথা মনে চাপা দিয়ে রাখা ছাড়া উপায় কী
সে-রাতে পূর্ণিমার মায়াবী চাঁদ আসমান জমিন ধুয়ে দিচ্ছে
রাত তখন আট কি সাড়ে আটটা
ছেরু একাকী চুনকুড়ির তীরে গোলপাতার মুড়াটার কাছে বসে গান ধরেছে, 'প্রেম করেছেন আইয়ুব নবী...তার প্রেমে রহিমা বিবি গো...
' গানের অন্য কথাগুলো যেমন তেমন, 'নবী' আর 'গো' বলে যখন সে টান মারে, মোল্লেপাড়া তো বটেই, গরানপুরের শেষ সীমানায় গিয়ে পৌঁছায় তার সুর
আইয়ুব নবী আর রহিমা বিবির প্রেমকাহিনির মিষ্টিমধুর সুর শুনে বুঝি নমিতার মনটা আনচান করে ওঠে
দীপিকাকে বলে, 'যাবি দীপু গাঙের চরে?' দীপিকা তো এমনিতেই নাচুনে বুড়ি, সে কি আর দেরি করে! বই-খাতা ফেলে বড়দির আগেই সে গোলপাতার মুড়টার কাছে হাজির
ছেরুর মন তো তখন চান্নির সঙ্গে আসমান জমিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে
তার মনে হতেই পারে তার গান শুনতেই হয়ত বাদা থেকে নিবারণ সাধকের পোষা কোনো পরি এসে সামনে দাঁড়িয়েছে
গান থামিয়ে সে নামিতার মুখের দিকে তাকায়
সত্যি তাকে পরির মতোই লাগে
দুধসাদা চাঁদের আলোয় তার দাঁতগুলো আরো সাদা দেখায়
সে বলে, 'গাও না ছেরুদা, তোমার গলা তো ভারি সুন্দর
কী বলতে কী বলে বসল ছেরু, 'তুমি বল্লি তো আমি এই ভরা গাঙ সাঁতরে বাদায় উঠতি পারি
নমিতার হাসি থামে না, 'সত্যি? তা দেখি কেরাম তোমার বাহাদুরি
সত্যি সত্যি বুঝি জিন ভর করল ছেরুর ওপর, গেঞ্জিটা খুলে উদোম হয়ে মালকোচা মেরে সে জোগার গোনের ভরা গাঙে ঝাঁপ দিল
নমিতা আঁতকে ওঠে জিবে কামড় দিল, 'হায় হায় ছেরুদা, তুমি পাগল হুয়ে গিলে নাকি?'
আবেগের উচ্ছ্বাসে আসলেই বুঝি পাগল হয়ে গেল ছেরু
এই পাগলামি তাকে বিপদের মুখে নিয়ে গেল
নমিতা দেখল ছেরু আর সাঁতরাতে পারছে না, উল্টো সাঁতার কেটে কূলে ভেড়ার চেষ্টা করছে
কয়েক মুহূর্ত
হঠাৎ তার আর্তনাদ শোনা গেল - নিল রে...!
সাপিনীর মতো এই চুনকুড়ির জলে মানুষকে কে নেয়, বুঝতে দেরি হয় না নমিতার
দীপিকা ভয়ে বড়দিকে জড়িয়ে ধরে, আর নমিতা বিড়বিড় করে বনদুর্গার নাম জপে
ভরা গাঙে খলবলানি শুরু হয়
ছেরুর বুকে দুরন্ত সাহস
যে কথা সে নমিতাকে দিয়েছে, আজরাইলকে হারিয়ে তা পালন করবেই
গাজী পীরের নাম স্মরণ করে শুরু করল সে মরণপণ লড়াই
বুভুক্ষু কামোটের মুখ থেকে ডান পা-টা একটানে ছাড়িয়ে আবার উল্টো সাঁতার দিল
কিন্তু একবার ধরলে কামোট কি এত সহজে ছাড়ে? মুহূর্তে ছেরুর বাঁহাতের কব্জিটা কামড়ে ধরল
ছেরু আবার আর্তনাদ করে উঠল
তার মনে হলো, অনন্ত মণ্ডল যেন কামোটের রূপ ধরে তার ধারালো হেঁসোর কোপ মারল কব্জিটায়