content stringlengths 0 129k |
|---|
শরীর সব শক্তি বাঁহাতে জড়ো করে জোরসে টান মারল ছেরু |
জয় তার হলো বটে, কামোট তাকে ছেড়ে দিল, কিন্তু তার কব্জিটা থেকে গেল দাঁতাল কামোটের ভয়ংকর মুখে |
নিশ্চয়ই সে-রাতে তার ওপর বাদার কোনো জিন-পরি ভর করেছিল |
নইলে কেউ এভাবে ভরা গাঙে ঝাঁপ দেয়! কামোটের কবল থেকে সে বেঁচে গেল, কিন্তু জিনের আসর তাকে ছাড়ল না |
মাঝে ক'মাস জিনটা তাকে ছেড়ে গিয়েছিল |
মুসলমানের সঙ্গে নমিতার বিয়ে হওয়ার খবরটা যেদিন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল তার কদিন পরই জিনটা আবার তার ওপর সওয়ার হলো |
শীত এলে জিনটা তাকে ক্ষেপিয়ে তোলে, প্রতি জ্যোৎস্নার রাতে ঘর থেকে তাকে পথে-প্রান্তরে টেনে আনে |
গান তো সে গায় না, গায় জিনটা |
নইলে ছেরু পাগলার গলা এত মধুর হয় কী করে! |
মাঝেমধ্যে, ছেরুর মাথা বেশি খারাপ থাকলে, দা-বটি নিয়ে সামনে যাকে পায় তাকে তাড়া করে |
একবার মাজেদ গাইনকে তাড়া করেছিল |
অজানা কারণে এই লোকটাকে সে সহ্য করতে পারে না |
দেখামাত্র গালাগাল শুরু করে দেবে, অথবা হাতের কাছে যা পাবে তা নিয়ে ধাওয়া দেবে |
সেদিন হরিনগর বাজার থেকে ধাওয়া দিল |
মাজেদ হাসে আর ধায়, ধায় আর হাসে |
সে বুঝি মজাই পায় |
গরানপুর বাজারে ফেলুর দোকানের সামনে এসে মাজেদ থামে |
ছেরুও আর আগায় না, বকাবকি করতে করতে প্রান্তরের পথ ধরে আবার হরিনগরের দিকে হাঁটা ধরে |
সে-রাতে, কেশব মাস্টার যে-রাতে গুম হলেন, সাঁঝের পরপরই ছেরু ঘর ছাড়ল |
মুকনোলির প্রান্তরের অন্ধকার ধুয়ে দিচ্ছে চাঁদের আলো |
প্রান্তরজুড়ে অপার্থিব মায়া খেলা করছে |
প্রান্তরের পথ ধরে চাঁদের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে গান গায় |
সে হাঁটলে চাঁদটাও হাঁটে, সে থমকে দাঁড়ালে চাঁদটাও থমকে দাঁড়ায়, সে দৌড়ালে চাঁদটাও দৌড়ায় |
ভারি তো অবাক কা-! চাঁদটাকে পেছনে ফেলতে সে উত্তরে হাঁটা ধরল, অথচ চাঁদটাও কিনা তার পাছে পাছে হাঁটা ধরল! আবার সে দক্ষিণে হাঁটা ধরে, তবু চাঁদ তার সঙ্গ ছাড়ে না |
চাঁদটাকে ধরতে সে পুবদিকে হাঁটা ধরল, অমনি চাঁদটা টুপ করে তার মাথার ওপর উঠে বসল |
দক্ষিণে আলাউদ্দিনের টিনের চালে চাঁদের আলো ঝলসে পড়ছে |
ছেরু সেদিকে হাঁটা ধরল |
চাঁদটাও গড়াতে লাগল সেদিকে |
কিছুদূর গেলে চুনকুড়ি থেকে অজগরের মতো উঠে আসা খালটা তার পথ আগলে দাঁড়াল |
অগত্যা বাঁয়ে ঘুরে সে পুবে মাজেদ গাইনের বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল |
চাঁদটা তখন আকাশের গায়ে সেঁটে আছে |
মাজেদ গাইনের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল ছেরু |
গাছগাছড়ার কারণে চাঁদটা আর দেখা যায় না |
মাজেদের ঘরে মানুষের ফিসফাস আওয়াজ শোনা যায় |
মাজেদ বুঝি তার বউয়ের সঙ্গে সুখবিছানায়! কিন্তু সারা বাড়িতে বিড়ির গন্ধ কেন? মাজেদকে তো ছেরু কোনোদিন বিড়ি টানতে দেখেনি |
বিড়ির বদলে সে দাঁতে গুল মাজে |
কে জানে, আত্মীয়-স্বজন কেউ হয়ত বেড়াতে এসেছে - ছেরু ভাবে |
চুনকুড়ির আড়ায় উঠে এলো ছেরু |
চাঁদটা আবার স্পষ্ট হলো |
চাঁদের আলো গায়ে মাখতে মাখতে উত্তরে গিয়ে ছেরু চুনকুড়ির চরে নামল |
গোলপাতার মুড়াটার কাছে এসে একবার ম-লবাড়ির দিকে তাকাল |
সারা বাড়ি নীরব, গাছবিরিক্ষির পাতটি পর্যন্ত নড়ছে না |
রাত প্রায় দশটা পর্যন্ত বাবার অপেক্ষায় জেগে ছিল তাপসী |
চারুবালা সন্ধ্যার পর এক দফা ঘুমিয়ে নিয়েছে, নয়টার দিকে উঠে খেয়েদেয়ে আবার শুয়ে পড়েছে |
মায়ের সঙ্গে গোপেশও ঘুমায় |
তাপসী জানালার কাছে বসে হারিকেনের আলোয় 'শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু' বইটার পাতা ওল্টায় |
বাবার আলমিরা থেকে কদিন আগে বইটি নামিয়েছে |
তিরিশ পাতা পর্যন্ত পড়ে ফেলেছে এরই মধ্যে |
টানছেও বটে বইটা তাকে |
কী সুন্দর লেখা, 'দর্পহারী ঈশ্বর সর্বদাই অহংকারীকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে থাকেন |
কলাবর্তী বৃক্ষ আর মানুষ সর্বদা নত হয়ে থাকে |
বাণ, বেণ, হৈহয়, নহুষ, রাবণ, কংস এরা নিজেদের মহাশক্তিশালী বলে অহংকার করত বলেই ঈশ্বর কেমন করে তাদের অহংকার চূর্ণ করেছেন?' |
পড়তে পড়তে চোখের সামনে তার বাবার মুখটা ভেসে ওঠে |
পণ্ডিত বাবা তার, কত কিছু জানেন, জীবনভর কত বই পড়েছেন, অথচ কত বিনয়ী, কত নরম |
সহজে কারো সঙ্গে বিবাদে জড়ান না, বড়জোর তর্ক-বাহাস |
কেউ তাকে গালি দিলেও এক নিমেষে তা হজম করে ফেলেন |
বাবাকে সে এমনই দেখেছে সারাজীবন |
কিন্তু তার কষ্ট লাগে শেষ বয়সে বাবার ধর্মান্তরে |
কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল বাবা? এ কারণে মাঝেমধ্যে রাগ ওঠে তার |
তবে বেশিক্ষণ থাকে না, বাবার সরল মুখটা দেখলে রাগ-ক্ষোভ সব উবে যায় |
সে পড়ছে, কিন্তু তার কান দুটো খাড়া |
বাতাসে একবার পাতা নড়লে সচকিত হয়ে ওঠে |
এই বুঝি বাবা এলো! বৈঠকখানার দিকে কান পেতে রাখে |
না, বৈঠকখানার দরজার খোলার শব্দ শোনা যায় না |
একবার সে বৈঠকখানা ঘুরে এলো |
বাইরে থেকে দরজার শিকল টানা দেখে আড়ায় গিয়ে দাঁড়াল |
হাঁটু মুড়ে বসে দূরে নজর ফেলে দেখল কারো পা দেখা যায় কিনা |
চাঁদের আলোয় দক্ষিণে যতদূর চোখ গেল, মনে হলো, একটা পোয়াতি দুধরাজ চিৎ হয়ে শুয়ে আছে |
গায়ে শিউরানি উঠল তার, দ্রুত ঘরে ফিরে দরজায় ছিটকিনি দিল |
বাইরে একটা কাক ডেকে উঠল কয়েকবার |
সন্ধ্যায় ঠাকুরঘরের চালে বসে যে কাকটা কা-কা করছিল সেটা হবে বুঝি |
ঢিল মেরে কাকটাকে তখন সে তাড়িয়ে দিয়েছিল |
খানিক পর আবার এসে ডাকতে শুরু করল |
তখন থেকেই কী এক উদ্বেগ তাকে ঘিরে ধরে |
উদ্বেগটা এখনো গলার কাছে আটকে আছে |
বাবার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে তার চোখ ভারী হয়ে আসে, বালিশটা টেনে মায়ের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ে |
খানিকক্ষণ গোলপাতার মুড়াটার কাছে বসে থেকে ফের আড়ায় উঠে দক্ষিণে হাঁটা ধরল ছেরু |
গরানপুর জামে মসজিদের পুবে নদীর আঘাটে, দেখতে পেল সে, গাছগাছড়ার আড়ালে নোঙর করা নৌকার গলুইর ওপর মানুষের আবছায়া |
চমকে উঠল সে |
এত রাতে কোনো মানুষ তো পাহারাদারের মতো এমন সতর্ক ভঙ্গিতে নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয় |
পুলিশ-বিডিআর কি না! কে জানে, হয়ত পিটেলবাবু তার দলবল নিয়ে টহলে বেরিয়েছে |
নাকি মোছলেম তালুকদারের গ্যাং গ্রামে হানা দিল! খটকা লাগে তার |
তালুকদারের গ্যাং হলে তো আর রক্ষা নেই, এত রাতে তাকে একা পেলে ধরে নিয়ে যাবে নিশ্চিত |
বৈঠা বাওয়ার জন্য তো তাদের লোক দরকার |
তাকে ধরে নিয়ে বৈঠা হাতে গলুইতে বসিয়ে দিলে তার তো কিছু করার থাকবে না |
সে বৈঠা বাইবে না বলে গোঁ ধরবে? তাহলে তো এক লহমায় তার মুণ্ডুটা কামোট-কুমিরের পেটে গিয়ে পড়বে |
জোর কদমে মসজিদের খোলা বারান্দায় ঢুকে পাকা মেঝেয় বসে পড়ল ছেরু |
বারান্দার চারদিকে হাঁটুসমান উঁচু পাকা বাউন্ডারির কারণে তাকে রাস্তা থেকে সহজে ঠাওর করা মুশকিল |
তার বুকে ধপধপ শব্দ ওঠে |
বাদার বাঘ যেন তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে |
শিকারির মতো সে চুপ করে বসে থাকে |
একটা হেঁসোর অভাববোধ করে খুব |
একটা হেঁসো থাকলে খুব ভালো হতো |
সামনে যে আসত এক কোপে তার মুণ্ডুটা নামিয়ে দিত |
রাস্তায় পায়ের আওয়াজ পেয়ে সে মাথা উঁচিয়ে কেশব মাস্টারকে দেখতে পায় |
গায়ে খদ্দেরের পাঞ্জাবি, পরনে ঢোলা পায়জামা, বগলে চাতা আর কাঁধে ঝোলানো পাটের ব্যাগটা দেখে সহজেই তাকে চেনা যায় |
মসজিদ পেরিয়ে মাস্টার আড়ায় উঠলে পরে দক্ষিণে 'কুউ' শব্দটি শোনা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে কুকুর ডেকে ওঠে |
তারপরের ঘটনা তো তার চোখের সামনেই ঘটতে থাকে, চাঁদের আলোয় সে সবকিছু ঠাওর করতে পারে |
পরদিন ঠিক দুপুরে জিনটা বুঝি সওয়ার হলো তার ঘাড়ে, কোরবানির গরু জবাইয়ের একটা লম্বা ছুরি হাতে সে আলাউদ্দিনকে ধাওয়া করল |
ধাওয়া করতে করতে গরানপুরের সীমানা ছাড়িয়ে মীরগাঙের চরে তুলল |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.