content
stringlengths
0
129k
ন্যাশনাল কল সেন্টার ৩৩৩ | স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ | আইইডিসিআর ১০৬৫৫ | বিশেষজ্ঞ হেলথ লাইন ০৯৬১১৬৭৭৭৭৭ | সূত্র - আইইডিসিআর | স্পন্সর - একতা হোস্ট
আঞ্চলিক সংবাদ
মতামত ও বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক
শিল্প ও সংস্কৃতি
তথ্য প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
একটি প্রায় বিস্মৃত গণহত্যার কথাঃ বিপ্লব রহমান
মতামত ও বিশ্লেষণ
একটি প্রায় বিস্মৃত গণহত্যার কথাঃ বিপ্লব রহমান
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৬
ন' সাঙ যেবার এই জাগান ছাড়ি/ ইদু আগং মুই জনমান ধরি/ এই জাগান রইয়েদে মর মনান জুড়ি ...চাকমা গান... এই জায়গা ছেড়ে আমি যাবো না/ এখানেই জন্ম জন্মান্তর থেকে আমি আছি/ এই জায়গা আমার মন জুড়ে রয়েছে
চাকমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব বিঝু'র আমন্ত্রণে বিশাল দলবলসহ যাওয়া হয়েছে খাগড়াছড়ি
সেটি ১৯৯২ সালের ১১ এপ্রিলের কথা
পাহাড় তখন দারুণ অশান্ত, যুদ্ধ-বিক্ষুব্ধ
ঢাকা থেকে লক্কর-ঝক্কর বাস 'ডলফিন' পৌঁছেছে সেখানে বিকেল নাগাদ
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) ছেলেমেয়েরা গাদা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেছেন অতিথিবর্গকে
দলনেতা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (প্রয়াত), অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ব্যরিস্টার সারা হোসেন প্রমুখ
অতিথিদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে জেলা সার্কিট হাউজে
রাতে সেখানে পাত পড়েছে পোলাও-মাংস ইত্যাদির
কিছু বুঝে ওঠার আগেই এমনি করে আহার-ব্যাঞ্জনে মত্ত হওয়া এই লেখক কাম সাংবাদিকের রীতি বিরুদ্ধ
তাই সিগারেট বিরতিতে স্থানটি 'রেকি' করতে বের হওয়া গেলো
সার্কিট হাউজের বারান্দায় দেখা মেলে একজন হত-বিহ্বল পাহাড়ি লোককে এক গামলা মুড়ি খেতে
তার কোলে একরত্তি একটি দুধের শিশু
লোকটিকে ক্লান্তি আর অজানা এক অনুভূতি তাকে ঘিরে রেখেছে বলে মনে হয়
সে যত না মুড়ি খায়, তার চেয়েও বেশী পানি খায় ঢক ঢক করে
কোলের শিশুটিকেও পানি খাওয়ায় কয়েকবার
তার পরিচর্যা করছিলেন যে সব ছেলে-মেয়েরা তাদের কাছ থেকে জানা গেলো, এই ভাগ্যহতের বেদনা দায়ক ইতিকথা
আগের দিন ১০ এপ্রিল জেলার পানছড়ির দুর্গম পাহাড়ি জনপদ লোগাং-এ ঘটে গেছে দুঃখজনক এক গণহত্যা
তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনা বাহিনী ও বাঙালি সেটেলাররা পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে
মেশিন গানের গুলি আর সেটেলারদের দা'য়ের কোপে কতজন পাহাড়ি প্রাণ হারিয়েছে, কেউ সঠিক কিছু বলতে পারছে না
এই লোকটি হচ্ছেন লোগাং গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শি; সেখান থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া সৌভাগ্যবানদের একজন
দ্রুত নোট প্যাড বের করে টুকে নেওয়া হয় নাম বিস্তৃত পাহাড়ির চাকমা ভাষার ভাষ্য
এনালগ ইয়াশিকা ক্যামেরায় তোলা হয় তার দু-একটি সাদাকালো ছবি
তিনি এই লেখককে জানান, তাদের গ্রামে আক্রমণ হতেই শিশুটিকে কোলে করে দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল ভেঙে প্রায় ৩০ কিলিমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি প্রথমে পৌঁছান জেলা সদরে
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নেতারা সার্কিট হাউজে আছেন - এই খবর শুনে তিনি আসেন সেখানে
অনর্গল চাকমা ভাষায় লোকটি শুধু একটা কথাই বলেন, বাবারা আমাকে একটু আশ্রয় দাও! চিদরেরা (সেনা বাহিনী) আমার কথা জানতে পারলে হয়তো আমাকেও মেরে ফেলবে!
ছাত্র নেতারা নিজেদের মধ্যে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেন, পিসিপি'র কাছে ভাষ্য দেওয়ার 'অপরাধে' লোকটিকে নিরাপত্তা বাহিনী হয়তো ছেড়ে কথা বলবে না
তাই দ্রুত তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কোনো একটি নিরাপদ আশ্রয়ে
পিসিপি নেতারা জানান, এরই মধ্যে সেনা বাহিনী লোগাং গণহত্যার দায় গেরিলা গ্রুপ শান্তি বাহিনীর ওপর চাপিয়েছে
সেদিনই রাতে স্থানীয় সংবাদদাতার বরাত দিয়ে বিবিসি'র রেডিও খবরে প্রচার করা হয়, লোগাং-এ শান্তিবাহিনীর হামলায় নাকি ১৩ জন নিহত হয়েছে!
এই লেখকের রাত কাটে বর্ষিয়ান পাহাড়ি নেতা অনন্ত মাস্টার তথা রামগড়ের স্কুল শিক্ষক অনন্ত বিহারী খীসার (অখন্ড পিসিপি'র সাবেক নেতা, বর্তমানে শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট- ইউপিডিএফ'র সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসার বাবা) নারানখাইয়ার বাসায়
পরদিন ১২ এপ্রিল ছিলো ফুল বিঝু
খুব ভোরে নাস্তার টেবিলে অনন্ত মাস্টার সুন্দর করে বুঝিয়ে বলছিলেন চাকমাদের চৈত্র সংক্রান্তির তিন দিনের বিঝু উৎসব-ফুল বিঝু, মূল বিঝু ও গইজ্যাপইজ্যা বিঝুর কথা
এমন সময় কোথা থেকে যেনো একদল পাহাড়ি শিশু-কিশোর কিচির-মিচির করতে করতে হাজির হয় সেখানে
ঝুপ ঝুপ করে তারা অনন্ত মাস্টারকে ফুল বিঝুর প্রণাম করে
'বাঙাল' অতিথির দিকে ওরা ফিরেও তাকায় না
সার্কিট হাউজে এসে শোনা গেলো, ইলিয়াস ভাই, আনু ভাই, সারা আপা - সকলে পিসিপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ওই সকালেই লোগাং যাওয়া হবে
সরেজমিনে দেখা হবে সেখানে আসলে কী ঘটেছে
দলে যোগ দেন পাহাড়ি গজদন্ত-কারুশিল্পী বিজয় কেতন চাকমা
কয়েকটি ভাঙাচোরা জিপে (স্থানীয় নাম- চাঁদের গাড়ি) করে রওনা দেওয়া হয় গণহত্যাস্থল লোগাঙের উদ্দেশ্যে
পথে পথে চলে নিরাপত্তা তল্লাসী, জেরা, তালিকা নির্মাণ- ইত্যাদি
লোগাঙের আগেই চাঁদের গাড়িগুলোকে আটকে দেওয়া হয় পানছড়ি বাজার সংলগ্ন সেনা চেকপোস্টে
সেখানে হাজির হন ৩৩ নম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোন কমান্ডার মেজর খালিদ রেজা
তিনি তখন পানছড়ির ক্যাম্পের দায়িত্বে
লোগাং যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্নে তুমুল তর্কাতর্কি বাধে দুপক্ষের মধ্যে
মেজর খালিদের কথা একটাই, লোগাঙে যাওয়া নাকি নিরাপদ নয়
যে কোনো মুহূর্তে সেখানে নাকি 'শান্তিবাহিনী'আবারও পাল্টা হামলা করতে পারে
তাছাড়া তার সন্দেহ, এই দলটি হয়তো শান্তিবাহিনীর আমন্ত্রণে লোগাং যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি এসেছে
তাই লোগাং 'অঘটনের' জন্য পরোক্ষভাবে দলটিও হয়তো দায়ী
নইলে ঘটনার পর পরই তারা সেখানে হাজির হলো কেনো? বিঝু-টিঝু আসলে নাকি ফালতু অজুহাত!
তর্কাতর্কির সময় পিসিপি'র নেতা (বর্তমানে ইউপিডিএফের দলছুট নেতা, সুইজারল্যান্ডে প্রবাসী) সঞ্চয় চাকমাকে দেখা যায়, সেনা চেক পোস্টের কাছেই একজন পাহাড়ি লোকের সঙ্গে কথা বলতে
লোকটির পিঠে এক টুকরো কাপড়ে বাধা ছোট্ট একটি শিশু
তার হাত ধরে আছে আরেকটি আরেকটি শিশু
তার সর্বাঙ্গে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের ছোপ ছোপ ছিট!
লোকটি কথা বলছিলেন ফিসফিসিয়ে
সেখানে উপস্থিত হতেই তার কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায়
পরিস্থিতি বুঝে সঞ্চয়কে ক্যামেরা দিয়ে বলা হয়, তার একটি ফটো তুলে রাখতে
আর লোকটির ভাষ্য সবই যেনো সঞ্চয় নোট করে রাখে
পরে জানা যায়, তিনিও লোগাং গণহত্যার আরেক প্রত্যদর্শি
সামান্য এক গ্রাম্য কোন্দালকে উপলক্ষ করে সেটেলার ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন একসঙ্গে কেরোসিন দিয়ে আগুন ধরায় লোগাং গ্রামে
নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন গুলি চালায়, আর সেটেলাররা কসাইয়ের মতো দা দিয়ে কুপিয়ে কাটে নিরাপরাধ পাহাড়িদের
প্রাণে বেঁচে যাওয়া লোকটির চোখের সামনেই কুপিয়ে খুন করা হয় তার স্ত্রী ও এক শিশুকে
কোনো রকমে গহিন জঙ্গলে শিশু দুটিকে নিয়ে লুকিয়ে থেকে প্রাণে রক্ষা পান তিনি
জঙ্গলে পালানোর সময়ে বুনো কাঁটার আঘাতে তার ছড়ে যায় সর্বাঙ্গ
গত দুদিন তাদের দানা-পানি কিছুই জোটেনি!
সঞ্চয় তাকে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে খাবার কিনে বাচ্চাদের খাওয়াতে বলেন
তাকে পরামর্শ দেন, অন্য কোনো পাহাড়ি গ্রামে আপাতত লুকিয়ে থাকতে
সেনা বাধার মুখে সেদিন লোগাং যাওয়া সম্ভব হয়নি
তবে খবংপুইজ্জা নামক পাহাড়ি গ্রামে রাতে দেখা হয় লোগাং গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শি আরো কয়েকজনের সঙ্গে
এদের মধ্যে চন্দ্র সাগর চাকমা নামে এক কিশোর রয়েছে; তার মা-বাবা, ভাই -বোন সবাইকে কুপিয়ে হত্যা করেছে সেটেলার বাঙালিরা
কিশোরটি জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থেকে দূর থেকে প্রত্যক্ষ করে এই বেদনাদায়ক নৃশংস দৃশ্য
তার পরিবারের মধ্যে একমাত্র সে-ই প্রাণে বেঁচে আছে
রাতে 'ইয়ং স্টার' ক্লাবে ছাত্র নেতা প্রধীর তালুকদার (সাবেক পিসিপি ও শান্তি বাহিনীর নেতা) দাদা কাপড়ে মুড়িয়ে নিয়ে আসেন আগুনে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া এক শিশুর কংকাল
লোগাং হত্যাযজ্ঞ এই নাম না জানা অবোধ শিশুটিকেও রেহাই দেয়নি
পরে ঢাকায় ফিরে 'পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ: শোকার্ত লোগাং' শীর্ষক দুই পর্বের সচিত্র প্রতিবেদন লেখা হয় সাপ্তাহিক 'প্রিয় প্রজন্মে'
তখন এর সম্পাদক ছিলেন ফজলুল বারী, বর্তমানে প্রবাসী
ওই প্রতিবেদনটিতে হামলার শিকার লোগাং গ্রামবাসী, স্থানীয় একজন স্কুল শিক্ষিকা, পানছড়ি হেলথ কমপ্লেক্সের সরকারি চিকিৎসক, খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি আহত কয়েকজনসহ অন্তত ১০ জন প্রত্যদর্শিকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়, লোগাং গণহত্যার লোমহর্ষক সব তথ্য
এতে বলা হয়, পাহাড়ের অসুস্থ রাজনীতি এই একটি গণহত্যাতেই কেড়ে নিয়েছে অন্তত ২০০ জন নিরপরাধ পাহাড়ির জীবন
নিখোঁজ ও আহতদের একটি আনুমানিক সংখ্যাও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনটিতে
পাশাপাশি দেওয়া হয় স্থানীয় প্রশাসন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্য
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরই পরেই সে সময় ফজলুল বারী ভাইয়ের ওপর উর্দ্ধতন মহলের চাপ আসে
জানা যায়, 'প্রিয় প্রজন্মের' কোনো সংখ্যাই যেনো সাধারণ পাঠকের হাতে না পৌঁছে, সে জন্য সেনা সদস্যরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সব কয়েকটি কপি কিনে ফেলেছিলো
তবে পাহাড়ি বন্ধুরা প্রতিবেদনটি ফটোকপি করে নিজস্ব উদ্যোগে পাহাড়ে বিলি করেন; এভাবে তারা প্রচার করেন ওই প্রতিবেদনটি
এই কাজ করতে গিয়ে সে সময় পিসিপি নেতা সঞ্চয় চাকমা 'শান্তিবাহিনী' অভিযোগে প্রথমবারের মতো গ্রেফতারও হন
তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ছাত্র
জনতার আলো, নজরুল ইসলাম তোফা: সারা বিশ্বের মুসলমানদের ধর্মীয় এবং জাতীয় উৎসব ঈদুল ফিতর
এই দিনটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ এবং মহিমায় অনন্য
মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার শেষেই শাওয়ালের 'বাঁকা চাঁদ' নিয়ে আসে পরম আনন্দ ও খুশির ঈদ