content
stringlengths
0
129k
কলেজে আমার গানের অভিজ্ঞতা প্রথম দিকে খুব একটা সুখকর ছিলনা
ক্লাশ সেভেন এ প্রথম যে ট্যালেন্ট শো হয়, সেখানে আমাকে দিয়ে দুইটি সিনেমার গান গাওয়ানো হয়
গাওয়ানো হয় এজন্য বলছি, যে ক্লাশ সেভেনে আমাদের কোন কাজেই নিজেদের কোন নিয়ন্ত্রন থাকেনা
আর তাই, ইংরেজীর মোস্তাফিজুর রহমান স্যারের সিলেক্ট করা "ছুটির ঘন্টা" ছবির - "এক দিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবো..." এবং "ভেজা চোখ" ছবির - "তুইতো কাল চলে যাবি আমাকে ছেড়ে..." গান দুটি গাইতে হয়েছিলো
এই গান দুটি গাওয়ার পর থেকে ভেবেছিলাম আর কক্ষনো গান গাবোনা...... এত গান থাকতে শেষ পর্যন্ত কিনা সিনেমার গান.........!!!!!
কিছুদিন পরে আন্তঃ হাউস সঙ্গীত প্রতিযোগীতা
আবার আমার ডাক পড়লো
আমি রীতিমত শংকিত
আবার কি গান ধরিয়ে দেয়...
দুরু দুরু বুকে হাউস অফিসে ঢুকলাম
আমাদের আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফ্টসের ওয়াহিদুজ্জামান স্যার খুব ভালো গান গাইতেন
তিনি আমাদের ডেকে বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন গান ভাগ করে দিচ্ছিলেন
২টি ইভেন্ট ছাড়া সবাই সব গান নেবার পরে জুনিয়র মোস্ট হিসেবে আমি আর আমার ক্লাসমেট মেহেদী মাহবুব এর দিকে স্যার দৃষ্টি দিলেন
বলা বাহুল্য, যে দুইটি ইভেন্টের গান কেউ গাইতে চাইতো না সেই দুইটি ইভেন্টই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো
আমি মনে মনে মহা বিরক্ত এবং শংকিত
মাহবুব কে স্যার ধরিয়ে দিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীত আর আমার জন্য বরাদ্দ করলেন পল্লী গীতি
কি আর বলবো
আশা ছিলো আধুনিক বা পপ কিংবা ব্যান্ডের গান গাইব
কিন্তু ওই ইভেন্টগুলো যে সিনিয়রদের ইভেন্ট...
এরপর থেকে আমার জন্য কলেজে পল্লী গীতি আজীবনের জন্য বরাদ্দ হয়ে গেল
কলেজে সবার মধ্যেই একটা ভাব ছিল তখন, গান যদি গাইতেই হয় তাহলে আধুনিক বা ব্যান্ডের গান গাইব, পল্লী গীতির মতো আনস্মার্ট গান কেন গাইব? কিন্তু সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যাই হোক না কেন, ক্লাশ সেভেনে একবার পল্লী গীতির যে সিল আমার কপালে লেগেছে, তা খোলার মত স্মার্ট ভাগ্য আমার আর হয়নি
সে কারনেই, যে কোন প্রোগ্রামে আমি ছিলাম সকল শিল্পীদের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস
কারন, পল্লী গীতি মানেই হলো আহসান, আর তার অর্থ দাড়াচ্ছে, আহসান থাকা মানেই তাদের আর আন স্মার্ট গান গাইতে হবেনা
অবশেষে একে একে "আমার প্রাণের প্রাণ পাখি..." , "আমার হাড় কালা করলাম রে..." কিংবা "ও রসের কালিয়া..." এর মত গান নিয়ে আমি আনস্মার্ট ই রয়ে গেলাম
এখানেই শেষ নয়
এমন কি ১৯৯৪ সালে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে অনুষ্ঠিত আন্তঃ ক্যাডেট কলেজ সঙ্গীত প্রতিযোগীতায় ও আমার জন্য বরাদ্দ হলো পল্লী গীতি ও লালন গীতি
এমনিতেই আনস্মার্ট গানের আনস্মার্ট গায়ক, তার উপর আবার ১০ ক্যাডেট কলেজের বাঘা বাঘা সব শিল্পী
সব মিলিয়ে আমি খুবই মনমরা
এরমধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কলেজের গায়কের সম্পর্কে মন্তব্য শুনে আমার মনে হচ্ছিল, কোন দুঃখে আমি এই প্রতিযোগীতায় এসেছিলাম আল্লাহ জানে
এর চেয়ে কলেজে নিজেদের মাঝে ২/৪ টা আনস্মার্ট গান গেয়ে মান ইজ্জত নিয়ে তো ভালই ছিলাম
কে যেন এসে বললো, "এই মাত্র কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজের অমুকের পল্লীগীতি শুনে আসলাম...যা গাইল...এক কথায় অসাধারন...
" আরেকজন কে যেন বললো, "ময়মসিংহের রুশদা তো এসেছেই পল্লীগীতিতে ফার্ষ্ট হবার জন্য
ওর গান একবার কেউ শুনলে ওয়ান মোর না বলে কেউ থাকতেই পারবেনা
" আমাকে পুরো হতাশায় ডুবিয়েছিলেন ভুগোলের ফয়জুল হাসান স্যার, যিনি এই প্রতিযোগীতার জাস্ট কিছুদিন আগে আমাদের কলেজ থেকে পোস্টিং হয়ে ঝিনাইদহ জয়েন করেছেন
স্যার আমার গান কলেজে অনেক শুনেছেন
সেই স্যারই যখন কথা প্রসঙ্গে বললেন, "ঝিনাইদহের সাদাত পল্লীগীতি তে ফার্স্ট তো হবেই, ও যদি রেকর্ড হাইয়েষ্ট মার্কস পায় তো তিনি অবাক হবেন না
" আমার তখনকার মানসিক অবস্থা বলে বোঝাতে পারবনা
যাই হোক আমার দুই যন্ত্রী- হারমোনিয়াম বাদক নুরুজ্জামান (যে বর্তমানে পেশায় ডাক্তার হলেও প্রায়ই আর টিভিতে খবর পড়ে) আর তবলচি যোবায়েদ (ও যে বর্তমানে কোথায় আছে আমি জানিনা) আমাকে সমান হারে উৎসাহ দিয়ে যেতে থাকল
অবশেষে আমার ইভেন্টের দিন এল
সন্ধ্যায় আমরা ১০ ক্যাডেট কলেজের সবাই অডিটরিয়ামে হাজির হলাম
প্রতিযোগীতা শুরু হল
আমার বুক দুরু দুরু
মনে মনে শুধু এই টুকু প্রার্থনা, আমি লাস্ট হই তাতে অসুবিধা নাই কিন্তু কোনভাবেই যেন গান গেয়ে হাসির পাত্রে পরিণত না হই
এর মধ্যে কে যেন এসে বলল, "খবরদার গান গাইবার সময় একদম উপরে গ্যালারীর দিকে তাকাবিনা
" আমি বললাম কেন? তার উত্তর, "তাকালে তোমার আর গান গাইতে হবেনা"
মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝলাম না
একেতো গানের টেনশন, তার উপরে এটা আবার কি বলে গেল
হঠাত করেই আমার নাম ঘোষনা করা হলো
স্টেজে গিয়ে অডিটরিয়াম ভর্তি ১০ কলেজের দর্শক দেখে ভীষন পানি খেতে ইচ্ছে করছিল
কিন্তু ততক্ষনে আমার দুই যন্ত্রী তাদের বাজনা বাজানো শুরু করে দিয়েছে
হঠাত মনে হলো, "আচ্ছা আমাকে উপরে তাকাতে মানা করেছিল কেন?" যেই ভাবা সেই কাজ
মানুষ কে যে কাজটা করতে বারন করা হয়, মানুষ সেই কাজটাই যেমন বেশী করে, আমি ও তার ব্যতিক্রম হইনি
উপরের গ্যালারীতে তাকালাম
দেখলাম ময়মনসিংহের মেয়েদের অন্যান্য কলেজের ক্যাডেটদের থেকে আলাদা রাখার জন্য গ্যালারীতে বসিয়েছে
আর তারা তাদের কলেজের প্রতিযোগীর ভাল ফলাফলের জন্য এবং অন্যান্য কলেজের প্রতিযোগীরা যেন ভাল গাইতে না পারে তার জন্য যা যা করনীয় আছে তাদের সাধ্যের মাঝে সব ই করে যাচ্ছে
কোন সিনিয়র জুনিয়র মানামানি নাই
আমি একবার তাকাতেই বুঝে গেলাম আমাকে কেন মানা করা হয়েছিল
চোখ নামিয়ে নিয়ে গান শুরু করলাম
বিচারক ছিলেন চট্টগ্রাম বেতারের তিনজন নাম করা শিল্পী
কি গাইলাম, তা খেয়াল নেই
তবে ফলাফল যখন দেয়া হল, তা আমি বিশ্বাস করতে পারিনি
সম্ভবত আমার সঙ্গীত জীবনের সেরা অর্জন ছিল এটি
ছোট একটা ঘটনার কথা বর্ণনা করে আমার লেখাটি শেষ করব
কলেজে যখন আমি আনস্মার্ট গানের আনস্মার্ট গায়ক হিসেবে মোটামুটি স্বীকৃত নিজের ইমেজ বদলানোর জন্য আমি আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম
স্যারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিলাম যাতে আমাকে পল্লীগীতি ব্যতীত অন্য কোন গান গাইতে দেন
কিন্তু প্রতিটি বারই আমি নিরাশ হচ্ছিলাম
হঠাত করেই বিধাতা মনে হল আমার প্রতি সদয় হলেন
মিউজিক ক্লাবের ইনচার্জ তখন ফয়জুল হাসান স্যার
তিনি হঠাত করেই আমাকে অন্য টাইপের একটা গান গাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন
আমি তো মহা খুশী
অবশেষে আমার ইমেজ বদলানোর সুযোগ এলো
অনুষ্ঠানের দুইদিন আগে স্যার আমাকে সম্পূর্ণ নতুন একটা গান দিলেন, যা আমি কখনোই গাইনি, এমন কি শুনিওনি
যাইহোক, আমি তাতেও খুশী
স্যার বেশ কয়েকবার আমাকে প্র্যাকটিস করালেন এবং যখন তিনি সন্তুষ্ট হলেন, তখন ছেড়ে দিলেন আমাকে
অনুষ্ঠানের দিন আমি ষ্টেজ এ ঢুকলাম
মুখে মিটিমিটি হাসি
সবাইকে আজ দেখিয়ে দেব একটা ভাব
মিউজিক শুরু হল
আমি ভাবছি সবাই আজ আমাকে নতুন ধারার গায়ক হিসেবে দেখবে
অনেকেই আমার গান শুনে অবাক হবে...বাহবা দিবে...
হঠাত আমার যন্ত্রী'র ঈশারায় আমি সম্বিত হলাম, হায় হায়, আমার তো যখন গান ধরার কথা তখন গান না ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি, নতুন ধারার গায়ক হবার লোভে আমার সব মিউজিক জ্ঞান যেন লোপ পেল...যন্ত্রী ব্যাপারটা কভার দেবার জন্য মিউজিক রিপিট করল,
আমি আরো একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম যেটা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ
আমি গানের সুর ভুলে গেছি এবং কোনভাবেই সুর মনে করতে পারছিনা
ঘোরের মধ্যে কিভাবে যেন হঠাত এ গান শুরু করলাম
স্যার হতবাক...আমার যন্ত্রীরা মনে হয় যেন হোচট খেল...দর্শকদের অভিব্যক্তি টা যেন কেমন ঠেকলো...
হঠাত আমি আবিষ্কার করলাম, হারমোনিয়ামের সুর একদিকে, আমার গলার সুর আরেক দিকে এবং সম্পুর্ণ নতুন এক সুরে আমি গানটি শুরু করেছি
হঠাত আবিষ্কার করলাম, অডিটরিয়ামের সবাই ভীষন হাসাহাসি করছে
যা তা হাসাহাসি না
একদম হেসে লুটোপুটি অবস্থা
একবার শুধু কল্পনা করুন, "অডিটরিয়াম ভর্তি দর্শক আপনার গান শুনে হেসে খুন"
এই ঘটনার পরে আমি আর কোনদিন কলেজে নতুন ইমেজের গায়ক হবার চেষ্টা করিনি
সময় অনেক পেরিয়ে গেছে
একটা সময় আমি অনুভব করলাম, সেই আনস্মার্ট গান গুলিই আমার মাঝে সুরের নেশা জাগিয়ে তুলেছে
রক্তের প্রতিটি কণিকায় সুর ছড়িয়ে দিয়েছে
আর্মিতে এসে আমি পুরোদস্তুর আধুনিক ঘরানার গায়কে পরিণত হয়েছি
মন্চ, রেডিও এবং টেলিভিশন মিলিয়ে অনেক প্রোগ্রামে গান করেছি
কিন্তু ভুলতে পারিনি দুইটি ঘটনা
এক, আমার সেই ইমেজ বদলানোর প্রচেষ্টা
আর দুই, আন্তঃ ক্যাডেট কলেজ সঙ্গীত প্রতিযোগীতায় পল্লীগীতি'র স্বর্ণ পদকটি আমার করে নেয়া
গান আমার জীবনে এখন এক অপরিহার্য উপাদান