content
stringlengths
0
129k
তুমি কত পাইছো?
'আমি? এই দেখো আমি কতো পাইছি
আমি ১০এ ১০ পাইছি
আবার স্যার আমাকে ভেরিগুড দিছে
জাবিরের বাবা ছেলের বাহাদুরি দেখে খুশি
ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু খায় আর বলে 'ভেরি গুড!...ইউ আর ভেরি গুড
কিন্তু আজাদ কম পারে বলে ওকে নিয়ে হাসি ঠাট্টাতো করা যাবে না
ক্লাসের সবাই এক সমান পাবে না
কেউ বেশি পাবে, কেউ কম পাবে
কেউ পড়ালেখায় ভালো হবে, কেউ হয়তো অন্য কাজে ভালো হবে
সবাইকে ক্লাসে ফার্স্টবয় হতে হবে এমন নয়
শুধু ফার্স্টবয় বা ভালো ছাত্ররাই সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পড়ালেখায় ভালো নয় কিংবা পড়ালেখা শিখতেই পারেনি এমন মানুষও সমাজের জন্য অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে
'তুমি কী বোঝাচ্ছ ছেলেকে এসব?' জাবিরের মা এসে ওর বাবাকে ফোড়ন কাটে
'এসব বললে তোমার ছেলেকি ক্লাসে ভালো করার চেষ্টা করবে?'
'তাহলে তুমি বলো, ছেলেকে কী বলা উচিত? লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়ায় চড়ে সে? এটা বলবো? আমিতো লেখাপড়া শিখেছি
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছি, ভালো রেজাল্ট করেছি
আমার গাড়ি কই?
'তাই বলে তুমি কি ছেলেকে লেখাপড়া শেখাতে চাও না?'
'সে কথা আমি কখন বললাম? আমিতো বললাম, কেউ লেখাপড়ায় খারাপ হলেই তাকে নিয়ে হাসার কিছু নেই
সে জীবনের অন্য কোনও কিছুতে ভালোও করতে পারে
সমাজের অন্য কোনও কাজে সে লাগতে পারে
সমাজে প্রতিটি মানুষই গুরুত্বপূর্ণ
আমরা শুধু মেধাবীদের গুরুত্ব দেই, আই মিন ভালো রেজাল্ট, ভালো পড়ালেখা করা মানুষদের গুরুত্ব দেই, কিন্তু সমাজের জন্য কি শুধু তাদেরই কন্ট্রিবিউশন আছে? অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মানুষদের কন্ট্রিবিউশন নেই? তাদের নিয়ে হাসাহাসি করা, তাদেরকে তাচ্ছিল্যভাবে দেখা কি ঠিক?'
জাবিরের আম্মু সাদিয়া লাবণ্য বলে 'না তা কেন হবে?'
'তাইতো হচ্ছে
এই যে ভালো ছাত্ররা, মেধাবী ছাত্ররা
কিসের জোরে ভালোছাত্র
ভালো পড়ার কারণে নাকি ভালোভাবে শিক্ষা অর্জনের কারণে?'
'আজকে দেখো যারা এ প্লাস পায়, সবাইকে মিষ্টি খাওয়ায়, সেই ছেলেটা ধরে নিচ্ছি অনেক ভালো শিখেছে, কিন্তু সে ই যখন তার ফেল করা বন্ধুটাকে লজ্জা দেয়, কিরে ফেলটু বলে ঠাট্টা করে, তার মনে আঘাত দেয়, তখনকি আমরা দাবি করতে পারি যে ছেলেটা ভালো জ্ঞান বা শিক্ষা পেয়েছে? আসল কথা হচ্ছে কে কতো নাম্বার পেয়েছে? অথচ সেটা লক্ষ্য হওয়া উচিত...
লক্ষ্য হওয়া উচিত এইসব পড়ালেখার মধ্য দিয়ে কে কতো বেশি জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছে, তার লব্ধ জ্ঞান শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগিয়েছে, সেটাই বিবেচ্য হওয়া উচিত
'বুঝছি তুমি চাও না তোমার ছেলে ভালো রেজাল্ট করুক
'নিশ্চয়ই চাই
কিন্তু সে ভালো করবে বলে যে খারাপ করবে, তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবে এই শিক্ষা আমি আমার ছেলেকে দিতে পারবো না
এবার জাবির একটু চেঁচিয়েই ওঠে; বলে বাবা মা তোমরা কি এটা জানো না যে বাচ্চাদের সামনে বাবা মার ঝগড়া করতে হয় না!
ওর বাবা-মা দু'জনেই লজ্জা পেয়ে যায়, আর স্যরি বলে নিজেদের মধ্যকার তর্ক বন্ধ করে
জাবিরের বাবা বলে স্যরি বাবা! তোমার মা হঠাৎ করে আমার মাথাটা গরম করে দিল, তাই আমার মেজাজটা একটু চড়ে গিয়েছিল
জাবিরের মা বলে, তোমারতো এমনিতেই মাথা গরম থাকে
আমি কিছু বললেই মেজাজ গরম করো
ছেলে বললো, মানে তোমরা আবার শুরু করছো?
স্যরি স্যরি বাবা...স্যরি স্যরি ...
এরকম ঝগড়া ওর বাবা-মার মধ্যে প্রায়ই হয়
আবার থেমেও যায়
যখন ঝগড়া থামে তখন জাবিরের মনে হয় ওর বাবা-মার মতো ভালো মানুষ আর পৃথিবীতে হয় না
কিন্তু মাঝে মাঝে এমন ঝগড়া বাধে যে জাবিরের তখন মনে হয়, এনারা ওর বাবা-মাই নয়
ও একদিন তাশফিয়াকে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা তোর মা কি তোর বাবার সাথে ঝগড়া করে?
হ্যাঁ করে শুধু ঝগড়া করে না, দুজনে মারামারিও করে
বলিস কি? কী সাঙ্ঘাতিক! মারামারি করে?
হ্যাঁ, করেতো
কিভাবে মারামারি করে?
বাবা মাকে পাঙ্খার (হাতপাখার) ডাঁট দিয়ে মারে, আর মা বিছানা ঝারার ঝাড়ু দিয়ে মারে
ছি ছি ছি, এসব কী বলিস তুই? তোর বাবা-মা এতো খারাপ?
তোর বাবা-মা বুঝি ভালো? তোর বাবা-মাও খারাপ
এবার তাশফিয়া আর জাবিরের মধ্যেই ঝগড়া লেগে যায়
বড়রা ছুটে এসে সেই ঝগড়া থামায়
অথচ বড়রা জানে না তাদের নিয়েই এই ঝগড়া
বড়রা জানে না তাদের কারণেই ছোটরা ঝগড়া বিবাদ শেখে
বড়রা শুধু ছোটদের শিক্ষা দিতে চেষ্টা করে, কিন্তু নিজেরা শিখতে চেষ্টা করে না
তাই যতই পরিশ্রম করা হোক স্কুল-প্রাইভেট-কোচিং এর পেছনে তাতে রেজাল্ট ভালো হয় কিন্তু সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে ক'জন?
যেদিন তাশফিয়ার সাথে ঝগড়া হয়, সেদিন জাবিরকে একা স্কুলে যেতে হয়
আজাদের সাথে যেতে ওর ভালো লাগে না
আজাদ দুষ্টামি করে ওর কানে টোকা দেয়
জাবির ব্যথা পায় কিন্তু আজাদ যেহেতু বড় এবং মোটাসোটা তাই ওকে ও কিছু বলতে পারে না
ওর বাবা আজাদকে বকে দিয়েছে তারপর ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করে খাইয়েছে
বলেছে তুইতো আর ওকে মারবিই না বরং কেউ যদি ওকে কিছু বলে তুই দেখবি, পারবি না? আজাদ বলে পারবো আংকেল
জাবিরকে কেউ কিছু বললে আমি আছি
কিন্তু তবু জাবিরের বিশ্বাস হয় না
যেদিন তাশফিয়া ওকে রেখে স্কুলে যায়, সেদিন জাবিরের খুব মন খারাপ হয়
ও বোঝে ঝগড়া করাটা মোটেও ঠিক না
আর করবে না
কিন্তু দেখা যায় আবার আমকুড়ানো নিয়ে অথবা খেলা নিয়ে দু'জনের ঝগড়া লেগেই যায়
মাঝে মাঝে মারামারিও হয়
তাশফিয়া জাবিরের আম্মুকে এসে নালিশ দেয়, তাশফিয়ার সামনেই ওর মা ওকে বকে দেয়
কিন্তু এই নালিশ যদি জাবিরের বাবার কানে যায় তাহলে খবর আছে
সে জাবিরকে ধরে বলবে তাশফিয়া তোমাকে ও কয়টা মারছে, তুমিও সেই কয়টা মারো
তাশফিয়ার লজ্জা লাগে এভাবে মারতে
ও হেসে ফেলে
আর জাবির লজ্জায় লাল হয়ে যায়
তারপর দু'জনে যখন আড়ালে গিয়ে বলাবলি করে, দেখছিস আমার আব্বু কতো খারাপ
আচ্ছা তুই চান্স পেলি কিন্তু আমাকে মারলি না ক্যান?
ধুর পাগল এভাবে মারা যায়? ঝগড়ার সময় মারা কোনও ব্যাপার না, কিন্তু কেউ ধরলো আর আমি মারলাম, তাও আবার সবার সামনে...এটা আবার হয় নাকি?
মারিসনিতো, তাইলে এখন আমি আবার তোকে মারি?
মেরে দেখ, এবার তোরে আমি মেরে কী করি দ্যাখ
তারপর দু'জনেই আবার হাসিতে গড়াগড়ি খায়
দু'জনে একসাথে স্কুলে যায়
কিন্তু আজাদকে জাবির কিছুতেই মেনে নিতে পারে না
ও একটা গবেট
ক্লাসে পড়া পারে না
ও বড় ডোরেমনের জিয়ানের মতো বিরক্তিকর
জাবির আজাদকে নিয়ে এসবই ভাবে
ক্লাসে ওর বন্ধু সিয়াম
সিয়াম চায় জাবির সবসময় ওর পাশে বসুক
সিয়াম আগে এলে জাবিরের জন্য সিট রেখে দেয়
জাবির স্কুলে কিছু খেলে সিয়ামকে সাথে নিয়ে খায়
মাঝে মাঝে তাশফিয়া ভাগ বসায়
কিন্তু আজাদকে ভাগ দিতে চায় না
আজাদকে ওর বাবা কেন যে সেদিন মিষ্টি খাওয়ালো আর এতো ভালোই বা জানে কেন, সেটা জাবির বুঝতেই পারে না
ও একদিন ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করে, বাবা তুমি আজাদকে এতো প্রশ্রয় দেও কেন? তুমি জানো ও কতো খারাপ?
ওর বাবা বিরক্ত হয়ে বলে, কারও সম্পর্কে বাজে কথা বলবে না, বাজে চিন্তা করবে না
একটা ছেলে ক্লাসে পড়া পারে না বলে ও খুব খারাপ, এই চিন্তা তোমার মাথায় কে ঢুকিয়েছে?...
জাবির ভয়ে চুপসে যায়