content stringlengths 0 129k |
|---|
তারপরও নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যদিয়ে সোনাপাচাকারীরা তাদের পাচার কাজ চালিয়েই যাচ্ছে |
যার ফলে বিমানবন্দরে সোনা জব্দের ঘটনা অনেকটা নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে |
সূত্র মতে জানা গেছে, এ যাবত বিমানবন্দরে আটক করা সোনার কোনো মামলার বিচারসম্পন্ন হওয়ার নজির দিতে পারেনি আদালত ও পুলিশ |
সংশ্লিষ্টরা শুধু মামলা দায়ের করেই খালাস |
এর অধিকাংশই চার্জশীট হলেও আদালতে বিচার প্রক্রিয়াসম্পন্ন হওয়ার নজির নেই |
যারা ধরা পড়েছেন তাদের বেশিরভাগই জামিনে বের হয়ে ফের পাচার কাজে লিপ্ত হচ্ছেন |
বিমানবন্দরে যে পরিমাণ সোনা ধরা পড়েছে ; তা চোরাচালানের দশ ভাগের এক ভাগ |
সোনা আসে কীভাবে : স্ক্যানার এড়াতে ব্যবহার হয় অভিনব নানা পদ্ধতি |
পায়ুদ্বারে লুকিয়ে সোনাপাচার |
পাচার ব্যাগ-সুটকেসের হাতলে লুকিয়ে |
এলইডি টিভির স্পিকারের নীচে লুকিয়ে পাচার |
বিমানের সিটের সাইড প্যানেলে লুকিয়ে স্মাগলিং |
শৌচালয়ের ডাস্টবিন দিয়ে পাচার |
তদন্তকারীরা বলছেন, বিমানবন্দরের সংস্থার কেউ না কেউ এই চোরাচালান কাজের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এভাবে সোনা পাচার সম্ভব নয় |
অপরাধের পরিসংখ্যানও সেই তত্ত্বই সমর্থন করছে |
এদিকে প্রতিবেশি দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নীল নকশায়, ভারতের প্রবেশদ্বার কলকাতা |
তার ভৌগলিক গুরুত্ব দিল্লির থেকেও বেশি |
বাংলাদেশ ও দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সরাসরি বিমান যোগাযোগ রয়েছে কলকাতার |
গত কয়েক বছর ধরে কলকাতা দিয়ে সোনা ঢুকেছে সবচেয়ে বেশি |
২০১৩-১৪ সালে দমদমে ধরা পড়ে ১শ' ১৩ কেজি সোনা |
২০১৫ সালে উদ্ধার হয়েছে ১শ' ৪৭ সোনা কেজি |
গত তিন বছরে কলকাতার নেতাজী সুভাষ বিমান বন্দরে মোট ৭শ ৩৯ কেজি সোনা ধরা পড়েছে |
ভারতের অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোনোভাবে এই পাচার ঠেকানো যাবে না |
এর শেষ নেই |
কারণ, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, ব্যাঙ্কিংয়ের যুগেও, ভারতবাসীর সঞ্চয়ের মৌলিক পদ্ধতি এখনও সোনা |
যা প্রতিদিন বাড়াচ্ছে চাহিদা |
যেই চাহিদা জোগাচ্ছে সোনা পাচারকারীরা |
সোনা পাচারে কারা জড়িত বা কারা এসব চালান আনছে: এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল হোতা বা ক্যারিয়ার ধরা পড়ছে না |
যে কজন ধরা পড়ছে তারাও সোনার মালিক নয় |
ওরা পেশাদার ক্যারিয়ার বা বহনকারী |
ওরা শুধু স্টেশন টু স্টেশন ক্যারিয়ার |
এ ব্যবসা করে তারা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পেয়ে যায় |
দুবাই থেকে সোনা কেনার টাকাও পাচার করা হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে |
এদিকে খোদ গোয়েন্দাদের প্রশ্ন, বিমানের টয়লেট বা দেয়াল কেটে ভেতরে সোনা লুকানোর সাথে বিমানের লোকজন জড়িত |
কোনো সাধারণ যাত্রীর পক্ষে এই টেকনিক্যাল কাজ করা সম্ভব নয় |
উড়োজাহাজ যখন হ্যাঙ্গারে নেয়া হয় তখনই এ সোনা বের করে নেয়া হয় বড় চালানগুলো |
যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যেতেই পারে |
বিমানের হ্যাঙ্গারে কর্মরত এক শ্রেণীর মেকানিক ও ক্লিনার ফ্লাইটের ভেতরে যাতায়াতে সুযোগ পায় |
তারা যে কোনো অজুহাতে ফ্লাইটে প্রবেশের দরুন টয়লেটের ভেতর থেকে সোনা সরানোর সুযোগ পায় |
তাদের সাথে কেবিন ক্রুরা থাকতে পারে |
এছাড়াও রয়েছে সিভিল অ্যাভিয়েশনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট |
যারা বড় ধরনের সোনাপাচারের জড়িয়ে পড়ে |
তবে, সোনাপাচারের এ অবৈধ চক্র বা সিন্ডিকেটকে রুখে দিতে কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিয়ে বিমানবন্দরে সক্রিয় রয়েছে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক |
তিনি বলেন, কাউকেই কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হবে না |
সোনা কেন পাচার হয়: ঢাকার স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের সোনার দোকানগুলোতে যেসব সোনা দেখা যায়, তার প্রায় সবই চোরাই পথে আসা |
তবে বাংলাদেশে সোনার বাজার খুব ছোট |
সেই তুলনায় প্রতিবেশী ভারতে সোনার বাজার অনেক বড় |
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য বলছে, ভারতের বার্ষিক সোনার চাহিদা প্রায় দেড় শ টন |
ভারতের চাহিদার সোনার একটি বড় অংশই যায় চোরাই পথে |
ভারতে প্রতি এক ভরি (১১.৬৬ গ্রাম) সোনা আমদানির শুল্ক চার হাজার রুপি (৪ হাজার ৮০০ টাকা |
বাংলাদেশে শুল্ক ভরিতে তিন হাজার টাকা |
এই শুল্ক কর ফাঁকি দিতেই সোনা চোরাচালান হয় |
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগারওয়ালা গণমাধ্যমকে বলেন, সোনা চোরাচালানিরা নিরাপদ রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছেন |
সমিতির তথ্যমতে, দেশে ১৫ হাজার জুয়েলার্সের দোকান আছে |
এতে বছরে ৭ হাজার কেজির মতো সোনার চাহিদা রয়েছে |
প্রবাসীদের ব্যাগেজে আনা সোনা ও পুরোনো সোনা দিয়ে বাংলাদেশের বাজার চলে |
কীভাবে সোনা আসে: একাধিক শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে সোনার বড় চালান নির্বিঘ্নে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যায় |
এ কাজে সহায়তা করেন শুল্ক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও বিমানের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা |
১০ তোলা ওজনের একেকটি সোনার বার বিমানবন্দর থেকে বাইরে এনে দিলে চোরাচালানিদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পান তারা |
দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিমানের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সোনা পরিবহনে সহায়তা করেন |
বাহকদের হাতে সোনা ধরিয়ে দেন দুবাইয়ে অবস্থানরত চক্রের প্রধানেরা |
বাহক সেই সোনা বিমানের আসনের নিচে, শৌচাগারে বা অন্য কোনো স্থানে লুকিয়ে রেখে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন |
পরে বিমানবন্দরে কর্মরত লোকজন নিজ দায়িত্বে সেই সোনা বের করে বাইরে নিয়ে আসেন |
মানি এক্সচেঞ্জের মালিকেরা সোনা হাতবদলে মধ্যস্থতা করে কমিশন পান, আবার তারা কখনো কখনো টাকা বিনিয়োগও করেন |
কারা সোনা আনেন: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, সোনা চোরাচালানের আটটি মামলা তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে |
বিভিন্ন সময় পুলিশের তদন্তে যাঁদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যের নামও আছে |
পুলিশ জানায়, ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শৌচাগার থেকে সাড়ে ১৩ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেফতার করা আসামি দেব কুমার দাসের জবানবন্দিতে সোনা চোরাচালানে আওয়ামী লীগের সাবেক এক সংসদ সদস্যেও নাম নাম উঠে আসে |
সোনা চোরাচালানের একাধিক মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত দ্য ঢাকা মানি এক্সচেঞ্জারের মালিক নবী নেওয়াজ খান সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে |
নবী নেওয়াজ খানের খোঁজে তার প্রতিষ্ঠান পুরানা পল্টনের সাব্বির টাওয়ারে গেলে মানি এক্সচেঞ্জারটি বন্ধ পাওয়া যায় |
পাশের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জসিমউদ্দিন বলেন, নবী নেওয়াজ এখন আর আসেন না |
সোনা চোরাচালানে রাজধানীর ভাই ভাই মানি এক্সচেঞ্জের মিজানুর রহমান ও প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের মালিক জাহাঙ্গীর দুটি চক্রের প্রধান বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে |
দিলকুশায় ভাই ভাই মানি এক্সচেঞ্জে গেলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বলেন, মিজান একসময় মুদ্রা লেনদেনে দালালি (ব্রোকারি) করতেন |
পরে তাকে মানি এক্সচেঞ্জের পরিচালক করা হয় |
তিনি আর এখন এই প্রতিষ্ঠানে নেই |
মিরপুর ১০ নম্বরের প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন সোনা চোরাচালানে জড়িত বলে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে |
জাহাঙ্গীর হোসেনের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, কয়েক বছর আগে সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের দুই কর্মচারীকে গ্রেফতার করে |
ওই ঘটনার পর প্যারামাউন্ট মানি এক্সচেঞ্জের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন বিদেশে পালিয়ে যান |
একটি চক্রের প্রধান সোনা ব্যবসায়ী দেব কুমার দাসকে গ্রেফতার করা হয়েছিল |
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দেব কুমার দাস নিউমার্কেট-সংলগ্ন চাঁদনি চকে তার রুপার দোকান রয়েছে বলে দাবি করেছিলেন |
তবে চাঁদনি চকে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি |
অন্য একটি চক্রের প্রধান এস কে মোহাম্মদ আলী সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করতেন বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে |
তার খোঁজে পুরানা পল্টনের বহুতল আবাসিক ভবনের 'ঠিকানা'য় গেলে নিরাপত্তাকর্মী সবুজ মিয়া বলেন, মোহাম্মদ আলীর পরিবার এখন আর এই বাসায় থাকে না |
সোনা চোরাচালানের দুটি চক্রের প্রধান উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক হারুন অর রশীদ সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করতেন |
উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের কুশল টাওয়ারের নিচতলায় ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের নাম পরিবর্তন করে ফারহান ট্রেডার্স রাখা হয়েছে |
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী বলেন, সোনা চোরাচালানিতে গ্রেফতার হওয়ার কিছুদিন পর তিনি জামিনে বেরিয়ে এসে বিমানের টিকিট বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন |
অবশ্য হারুন অর রশীদ দাবি করেন, 'আমি সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নই |
আমি মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসা করতাম, এ কারণে বিমানের কর্মকর্তাসহ অনেকেই বিদেশি মুদ্রা কিনতে আসতেন |
' |
ডিবি পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে, একটি চক্রের প্রধান মাসুদ করিম দুবাইয়ে থাকার সময় সোনা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন |
পরে দেশে ফিরে তার অপর দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে সোনা চোরাচালান চক্র গড়ে তোলেন |
গত ২২ অক্টোবর ৪৫টি ও ২১ অক্টোবর ৬০টি সোনার বার নিয়ে এসেছেন তারা |
দুবাই ছাড়াও মাসকট, জেদ্দা ও কুয়ালালামপুর থেকে তিনি সোনা আনতেন |
সোনা চোরাচালান কেন বন্ধ হচ্ছে না, জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, গত চার বছরে মণের পর মণ সোনা আটক করে বাজেয়াপ্ত করায় চোরাচালানিরা দুর্বল হয়ে পড়ছে |
তবে সোনা চোরাচালান মামলায় সাজার পরিমাণ কম |
এ কারণে মামলায় কেউ ভয় পান না, চোরাচালানও বন্ধ হয় না |
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এম এ হান্নান আজাদ বলেন, ভারতীয় সোনা ব্যবসায়ীরা সোনা চোরাচালানে বিনিয়োগ করেন |
সরকার সহনীয় মাত্রায় কর নিয়ে সোনার আমদানি নীতিমালা করলে সোনা চোরাচালান অনেকটা বন্ধ হবে |
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা বলেন, সোনা চোরাচালান মামলাগুলোর দ্রুত অভিযোগপত্র দিতে হবে |
এসব মামলার বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে সোনা চোরাচালান কমে আসবে |
, , , , . |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.