content stringlengths 0 209k |
|---|
গড়িতে আমি, গাড়ির চালক, আমার তিনজন সহকর্মী এবং আইগেরিম ওসিপোভা |
আইগেরিম কত্থক নৃত্যশিল্পী |
তিনি থাকেন কাজাকিস্তানের উত্তর দিকে অবস্থিত আর্কালিক শহরে |
তিনি আমাদের আমন্ত্রণ করেছেন তাঁর স্কুল, নটরাজ ডান্স একাডেমিতে, নাচ-গান-যোগা ওয়ার্কশপ করানোর জন্য |
আমরা, কাজাকিস্তানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে চাকরী করি |
আমি নাচ শেখাই, একজন মিউজিক শেখান, একজন যোগা শেখান এবং আরেকজন আমাদের ডিরেক্টর |
এই আমাদের টিম |
আমরা থাকি কাজাকিস্তানের রাজধানী আস্তানা শহরে, যার নাম বদলে ২০১৯'শে রাখা হয়েছে নূর-সুলতান |
চাকরী সুত্রে ২০১৮ থেকে ২০২০ এই দু'বছর আমি কাজাকিস্তানে কাটিয়েছি |
ওয়ার্কশপ, সেমিনার বা পারফরম্যান্সের জন্য বিভিন্ন শহরে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে এই দুবছরে |
আর্কালিক শহরে গিয়েছি দু'বার |
প্রথমবার মে ২০১৮'তে, আরেকবার ফেব্রুয়ারি ২০১৯ |
দু'বারই, কাজের ফাঁকে একদিন ঘন্টাখানেক সময় বার করে আইগেরিম শহর ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন আমাদের |
এই গাড়ি যাত্রা, ফেব্রুয়ারী ২০১৯ সালের কথা |
তাপমাত্রা মাইনাস তিরিশ ডিগ্রির কাছাকাছি |
গাড়ির ভেতর টের পাওয়া যাচ্ছে না |
ধূ-ধূ প্রান্তরে হঠাৎ কিছু গাছ আর ইলেকট্রিক পোল দৃশ্যমান |
সব কিছুই শুধু সাদা-কালো আকৃতি |
গাড়ি এসে থামলো |
কিছু দূরে রাশিয়ানে লেখা 'আর্কালিক',শহরের চিহ্নক আর পাশে একটা মিউরালের মতো |
গাড়ি থেকে নামতেই, হাঁটু অবধি বুটটা ঢুকে গেলো বরফে |
তবে এ বরফ নুনের মতো, খাস্তা, গুঁড়ো-গুঁড়ো |
হাঁটতে অত অসুবিধে হয় না, পড়ে গেলে ব্যাথা লাগার তত ভয় নেই |
ভিজে কাঁচের মতো যখন হয়ে যায় বরফ, তখনি বিপদ |
ততদিনে, কলকাতায় জন্মে-বড় হওয়া নাচের দিদিমণি, বরফে হাঁটা সম্পর্কে কিছুটা অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছে! ফলে সদর্পে এগিয়ে গিয়ে ছবি তোলা আর সবার সঙ্গে গল্প হল কিছুক্ষণ |
তারপর আবার গাড়ি চলতে শুরু করল |
বাইরের মাইনাস তিরিশ থেকে গাড়ির ভেতরের হিটার - তাপমাত্রা্র এই হঠাৎ পরিবর্তনে, জুতোয় লেগে থাকা বরফ গলে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে চলা আর ভুরুর ওপর জমে থাকা বরফ গলে সারা চোখ-মুখ বেয়ে জল নামা - এই দুটো বিকট জিনিসে আমি কিছুতেই ধাতস্ত হতে পারিনি দু'বছরে |
চোখ মুছতে মুছতেই চোখে পড়ল দূরে একটা মসজিদ |
গাড়ি থামানো হল |
কিন্তু মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া গেল না কারন পরিত্যক্ত ঐ মসজিদের চারদিকে জমে থাকা একরাশ ভগ্নাবশেষ আর হাঁটুসমান বরফ সব কিছু মিলিয়ে পথটা খুব সুবিধের নয় |
এই মসজিদটার মেরামতের কাজ বন্ধ দীর্ঘদিন |
শীতের জন্য কাজ করা আরো বেশ কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে |
আসার পথে, শহরের মধ্যে একটা মসজিদে আমরা গেছিলাম |
অনেকগুলো ছোট-ছোট ঘর |
একতলার হলঘরে আমরা কিছুক্ষণ বসেছিলাম |
মাথার ওপর ঝাড়বাতি |
মেঝেতে বেছানো বিশাল কার্পেট |
তার মধ্যে অপূর্ব সব নক্সা |
কিছুটা যেন খুব চেনা, যেন পুরোনো দিল্লির কথা মনে করায়, ঠিক যেমন মেয়েদের কানের রূপোর দুলের ডিসাইন একদম কাশ্মিরী গয়নার মতো |
বইয়ের আলমারিতে রাখা কোরান আর নানারকম 'কিতাব' |
হ্যাঁ, ওরা বইকে কাজাক ভাষায় বলে কিতাব |
কয়েকজন আমায় দেখে এগিয়ে দিল কিছু বাক্স |
আমি ইশারায় জিগেস করলাম কি আছে? বলল, 'ইত্তর' আর 'সুরমা' |
দেওয়ালে সুন্দর কারুকার্য করা 'আয়না' (কাজাক ভাষায় ব্যাবহার হয় এই শব্দগুলো) |
কিন্তু রাস্তার ধারের সেই মসজিদে এরম কোনো আয়নাওয়ালা ঘর ছিল কিনা তা আর জানা হল না |
আবার গাড়ি চলল |
কিছুটা এগিয়েই চোখে পড়ল উঁচু-উঁচু পাহাড়ের মত |
সেগলো হল জমা করা বক্সাইটের ঢিপি |
আর্কালিক বক্সাইট এবং এলিউমিনিয়ামের জন্য বিখ্যাত |
সোভিয়েত যুগে প্রচুর কারখানা তৈরী হয় এই শহরে |
আর্কালিক ছাড়াও রাশিয়া থেকে অনেক লোক আসত কারখানায় কাজ করতে |
সোভিয়েতকালে,আর্কালিক ছিল মহাকাশচারীদের বিচরণভূমি |
সোভিয়েত স্পেস প্রোগ্রামের কেন্দ্রীয় শহর বাইকোনূরে যাবার পথে, মহাকাশচারীরা প্রথমে নামতেন মধ্য কাজাকিস্তানের বিস্তীর্ণ স্টেপস বা তৃণভূমিতে, তারপর আসতেন আর্কালিক শহরে |
'তখন রমরমা ছিল এ শহরে, এখন সব শেষ |
দেখবেন শহরে ফিরে কি হাল |
' বলতে বলতে আইগেরিম কিছুটা উদাস হয়ে গেলেন |
এই হাল ঠিক কিরম তার কিছুটা আঁচ আমি পেয়েছিলাম, প্রথমবার আর্কালিক গিয়ে, অর্থাৎ ২০১৮'র মে মাসে |
মেয়রের অফিস, সরকারী দপ্তর, ইউনিভার্সিটি, হাসপাতাল, টেলিফোন ভবন এ'সব গুরত্বপূর্ণ বিল্ডিং চত্বর, অর্থাৎ সিটিসেন্টার পেরোলেই সারিবদ্ধ এপার্টমেন্ট, যার এক তলায় দোকান - সবজি, ওষুধ, জেরক্স-প্রিন্ট ইত্যাদি পাওয়া যায় |
শীতকালে বিকেল পাঁচটার মধ্যে সব দোকান-বাজার বন্ধ হয়ে যায় |
সিনেমা হল বলতে আলাদা কিছু নেই |
একটা হল আছে যেখানে এখন ভ্যারাইটি শো হয় যেমন - ম্যাজিক, স্কুলের বাচ্চাদের অনুষ্ঠান, কারুর জন্মদিনের উৎসব ইত্যাদি |
সিটি সেন্টারের দপ্তরের চারপাশে বিশাল চাতালের কিছু অংশে স্মৃতিসৌধ বানানো |
কোথাও কাজাক বিপ্লবীদের, কোথাও রূশ বিপ্লবের স্থপতিদের সৌধ, আবার কোথাও সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে নিহতদের স্মৃতিসৌধ |
সেই সিটি সেন্টারেই রয়েছে সুসজ্জিত পার্ক |
সেখানে গরমকালে নানারকম অনুষ্ঠান হয়, মেলা হয়, বাচ্চারা খেলা করা, লোকজন বেড়াতে বেরোয় |
গরমকালে আলোও থাকে প্রায় রাত নটা অবধি |
কিন্তু এই যে বলছি লোক, এরা কারা কিরকম? আর্কালিকের জনসংখ্যা খুব বেশি হলে এখন ২০-২৫ হাজার |
কেউই আর থাকতে চায় না এই শহরে |
আইগেরিম বারবার এই কথা বলে চলেন |
ঐ সারিবদ্ধ এপার্টমেন্টের অধিকাংশ খালি |
এমনকি কিছু পাড়া আছে, যেখানে লোকে সকালেও যেতে ভয় পায় |
পরিত্যক্ত |
আমি প্রথমবার আর্কালিক গিয়ে ওরম কয়েকটা পাড়া দেখেছিলাম |
সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে যাওয়ার পর, অনেক রাশিয়ান ফিরে গেছেন রাশিয়াতে |
একে-একে কারখানা প্রায় সব বন্ধ হয়ে গেছে |
এখন টিমটিম করে যেকটা আছে সেগুলোর অবস্থা ভালো নয় |
তরুণ প্রজন্মের লোক খুব কম |
সবাই আলমাটি (কাজাকিস্তানের আগের রাজধানী) বা বর্তমান রাজধানী র্নূর-সুলতান চলে যায় |
বেশিরভাগই চায় এমেরিকা, রাশিয়া বা জার্মানি চলে যেতে |
আর্কালিককে বলা হয়, 'গোস্ট সিটি' (ভূতের শহর), ডিপ্রেসেড সিটি (বিষাদগ্রস্থ শহর) |
'আমার নাচ শেখাবার জন্য যুবা ছাত্র-ছাত্রী পাওয়াই যায় না |
এদিকে কত বুড়-বুড়িরা শিখতে চায়...' বলতে বলতে আইগেরিম খুব হাসলেন |
আমিও হাসলাম, তবে কিরম যেন একটা অসাড় বোধ করলাম ভেতরে |
গাড়ি থামল |
স্টপ এয়ারপোর্ট |
কিন্তু বিমানবন্দরের কোনো চিহ্ন নেই |
বরফের স্তূপের মাঝে একফালি ঘর |
কয়েক ফুট দূরে লেভেল ক্রসিং-এর ভাঙ্গা একটা অংশ |
ব্যস |
ঐ ঘর থেকে একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এসে দূর থেকেই হাত নাড়লেন |
তাঁর কাছ অবধি আর পৌঁছতে পারিনি আমরা, কারন সেখানে ছিল ইয়া মস্ত তিনটে কুকুর |
আমাদের এক পাও তারা এগোতে দিল না |
গাড়িচালক বললেন যে ওই বৃদ্ধা পাহারা দেন |
ওঁর ছেলে থাকলে সে কুকুর সামাল দিত |
ছেলে এসে মাকে নিয়ে যায় বিকেল হওয়ার আগে |
আবার পরের দিন সকালে মাকে পৌঁছে দেয় এই ঘরটিতে |
তাদের বাড়ি এখান থেকে খুব দূর নয় |
গাড়িচালকের কথা রাশিয়ান থেকে আইগেরিম যখন ইংরেজিতে বুঝিয়ে আমাদের বলছেন, আমরা অপার বিস্ময় চারদিক দেখছি আর ভাবছি, আদিগন্তবিস্তৃত বরফের মধ্যে বসে কি পাহারা দেন উনি? সোভিয়েতযুগে এটাই ছিল মূল বিমানবন্দর |
এই রাস্তা দিয়ে বেশ কয়েক ঘন্টা ড্রাইভ করলেই দেশের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় অন্য দেশে |
অনেকের ধারনা এই পথ দিয়েই বেআইনিভাবে লোকজন যাতায়াত করে |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.