content
stringlengths
0
129k
তিনি ছিলেন নির্ভীক সাংবাদিকতার কিংবদন্তী পুরুষ, আধুনিক সংবাদপত্রের রূপকার, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা
'রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি', 'রাজনৈতিক মঞ্চ' আর 'রঙ্গমঞ্চ' শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা সহজ ভাষায় তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেন
নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে তিনি কখনো আপস করেননি
দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তাঁর সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার
১৯৬৯ সালের এই দিনে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ক্ষণজন্মা এই সাংবাদিক
ভাগ্য-বিড়ম্বিত বাঙালি জাতির জীবন-সংগ্রাম, অস্তিত্ব-আত্মমর্যাদা এবং আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রেরণা প্রদানকারী শক্তির উত্স হয়ে উঠেছিলেন তিনি এবং তার প্রকাশিত সংবাদপত্র 'দৈনিক ইত্তেফাক'
তাঁর সংগ্রামদীপ্ত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাংলার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধ জড়িয়ে ছিল
এ দেশে সাংবাদিকতার জগতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া একটি অবিস্মরণীয় নাম
'মোসাফির' ছদ্মনামে তাঁর 'রাজনৈতিক মঞ্চ' কলামে নির্ভীক সত্য ভাষণ, অনন্য রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা এবং গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হূদয়ে তিনি অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন
মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র একজন সাংবাদিক ছিলেন না বরং সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন
তাঁর আপসহীন মনোভাবের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা বার বার তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে
'দৈনিক ইত্তেফাকে'র ওপর বার বার নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে 'দৈনিক ইত্তেফাক' এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে তিনি সত্য প্রকাশ করেছেন
একসময় তদানীন্তন পাকিস্তান সামরিক সরকার দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়
সে সময় সরকারের সঙ্গে আপস করলে তিনি ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন
কিন্তু তিনি এবং তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিক শ্রেণী জনমানুষের সংবাদপত্রের প্রতি যে বিশ্বাস তার সঙ্গে আপস করেননি
তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন
সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন উদার গণতন্ত্রের ধারক
একজন রাজনীতিমনস্ক সাংবাদিক হয়েও তাঁর রাজনৈতিক কোন উচ্চাভিলাষ ছিল না, ছিল না ব্যক্তিগত কোন লোভ
এ কারণেই সত্ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সত্য কথা বলার সাহস দেখাতে পারতেন
জেল-জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং সরকারের অসহযোগিতাকে মোকাবেলা করে, নীতির প্রশ্নে অবিচল থেকে তাকে মানুষের অধিকারের কথা বলতে হয়েছে
তিনি যেমন বাংলা সাংবাদিকতা জগতে পথ প্রদর্শক, তেমনই রাজনীতিতেও
রাজনৈতিক জগতে তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য
ঘনিষ্ঠ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল মানিক মিয়ার
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'আমার মানিক ভাই' শিরোনামে এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, '... আমার ব্যক্তিগত জীবনে মানিক ভাই'র প্রভাব যে কত গভীর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়
১৯৪৩ সাল থেকে তাঁর সাথে আমার পরিচয়
সে পরিচয়ের পর থেকে সারাটা জীবন আমরা দু'ভাই একসাথে জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম করেছি
... একটা বিষয়ে আমরা উভয়ই একমত ছিলাম এবং তা হল, বাংলার স্বাধীনতা
স্বাধীনতা ভিন্ন বাঙালীর মুক্তি নেই, এ বিষয়ে আমাদের মাঝে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ ছিল না
আর ছিল না বলেই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও দু'জন দু'ফ্রন্টে থেকে কাজ করেছি
আমি কাজ করেছি মাঠে-ময়দানে আর মানিক ভাই তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে
শোষণ-বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে তাঁর কলম ছিল সোচ্চার
পাকিস্তানী আমলে সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলীকে উপজীব্য করে তিনি যেসব ক্ষুরধার নিবন্ধ, কলাম লিখেছেন সেসব লেখনী আজকের বাংলাদেশেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক
শুধু সাংবাদিক কিংবা রাজনীতির পথপ্রদর্শকই নন মানুষ হিসাবেই তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী
তাঁর সংস্পর্শে যিনি একবার এসেছেন তিনি তাঁর সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন
তেমনি তাঁর সহানুভূতিশীল হূদয় ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ আজো মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়
সংক্ষিপ্ত জীবনী
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জন্ম ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামে
তাঁর বাবার নাম মুসলেম উদ্দিন মিয়া
শৈশবেই মানিক মিয়ার মা মারা যান
গ্রামের পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলে মানিক মিয়ার শিক্ষা জীবনের শুরু
সেখানে কিছুদিন পড়ার পর তিনি ভর্তি হন ভাণ্ডারিয়া হাইস্কুলে
ভাণ্ডারিয়া স্কুলে মানিক মিয়া অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন
তারপর চলে যান পিরোজপুর জেলা সরকারি হাইস্কুলে
সেখান থেকেই তিনি কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পাস করেন
১৯৩৫ সালে মানিক মিয়া ডিস্টিংশনসহ বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন
পড়াশোনা শেষ করে তিনি পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে চাকরি শুরু করেন
পিরোজপুর জেলা সিভিল কোর্টে কর্মরত থাকাবস্থায় ১৯৩৭ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার অন্তর্গত গোয়ালদি গ্রামের অভিজাত পরিবারের খোন্দকার আবুল হাসান সাহেবের কন্যা মাজেদা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি
এসময় তিনি তত্কালীন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহ্?রাওয়ার্দীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান
সোহরাওয়ার্দী সাহেবের আহ্বানে কোর্টের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি যোগ দেন তদানীন্তন বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে বরিশাল জেলার জনসংযোগ অফিসার হিসেবে
কিছুদিন পর সে চাকরি ছেড়ে তিনি কলকাতার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অফিস সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন
এসময় ১৯৪৬ সালে আবুল মনসুর আহমেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'দৈনিক ইত্তেহাদ'
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে 'দৈনিক ইত্তেহাদ'-এর পরিচালনা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন
এ পত্রিকার সাথে মানিক মিয়া মাত্র দেড় বছর যুক্ত ছিলেন
'৪৭-এর দেশ বিভাগের পর কিছুদিন কলকাতায় অবস্থান করে মানিক মিয়া তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন
১৯৪৯ সালে জন্ম হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের
১৯৫১ সাল থেকে তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন
১৯৫৩ সালে তাঁর সম্পাদনায় 'সাপ্তাহিক ইত্তেফাক' 'দৈনিক ইত্তেফাক'-এ রূপান্তরিত হয়
পরবর্তীকালে দৈনিক ইত্তেফাক আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
সামরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ১৯৫৯ সালে তিনি এক বছর জেল খাটেন
১৯৬৬ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন
এ সময় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা নিষিদ্ধ এবং নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়
এর ফলে তার প্রতিষ্ঠিত অন্য দুটি পত্রিকা ঢাকা টাইমস ও পূর্বাণী বন্ধ হয়ে যায়
গণআন্দোলনের মুখে সরকার ইত্তেফাকের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়
ফলে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত হয়
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচি
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে আজ রবিবার সকাল সাতটা থেকে মরহুমের আজিমপুর কবরস্থানের মাজারে কোরআনখানি ও বেলা ১০টায় মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে
এছাড়া দৈনিক ইত্তেফাকের কাজলারপাড়ের অফিসে সকাল আটটা থেকে কোরআনখানি ও বাদ জোহর মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে
আজ রবিবার মরহুমের জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এতিমখানায় কাঙ্গালী ভোজের আয়োজন করেছেন
মরহুম মানিক মিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেনের ধানমন্ডির বাসভবনে কোরআনখানি ও এতিমখানায় তবারক বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে
মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠা কন্যা মরহুমা আখতারুন্নাহার বেবীর বাসভবনে বাদ এশা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে
জাতীয় পার্টি-জেপি'র কর্মসূচি
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে জাতীয় পার্টি-জেপি'র পক্ষ হতে আজ রবিবার সকাল সাড়ে ৯টায় আজিমপুরে মরহুমের মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ এবং পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হবে
সেই সঙ্গে বিকাল সাড়ে ৩টায় ডিপ্লে¬ামা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কর্মময় জীবনের উপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে
সভায় শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক মন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমানসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন
আলোচনা সভায় দলীয় নেতাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে উপস্থিত থাকার জন্য দলের মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম অনুরোধ জানিয়েছেন
মানিক মিয়াকে নিয়ে চারপাতার বিশেষ আয়োজন 'প্রজন্মের চোখে মানিক মিয়া' পড়ুন ২১ থেকে ২৪ পৃষ্ঠা
" পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ "
এই পাতার আরো খবর -
বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখা হচ্ছে
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৪ আর বাকি ১১ দিন
স্ত্রী কন্যাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা
অবশেষে ফেরত দিল বিজিবি সদস্যের লাশ
গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে দ্রুত নির্বাচন চাই
বজ্রপাতে ৯ জন নিহত
পাবনায় ৩ আওয়ামী লীগ কর্মী খুন
স্বাধীনতা অর্জনে মানিক মিয়ার ভূমিকা ছিল অপরিসীম
দাবি না মানলে ৮ জুন থেকে সিএনজি স্টেশনে ধর্মঘট
বিজিবি সদস্য হত্যার বিচার ও গুলিবর্ষণের তদন্ত দাবি
মতিঝিলে ঠিকাদার খুনে গ্রেফতার নেই মামলা দায়ের
তারেককে 'ছাগল' ও 'পিগমি' বললেন মতিয়া চৌধুরী
এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. নূরুল মোমেনের ইন্তেকাল
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা কাজী আমিনুল হকের ইন্তেকাল
দু'বছর পর বিদ্যুত্ খাতে অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন পড়বে না
শোক সংবাদ