content
stringlengths
0
129k
এটা ঠিক, ভোটযন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রয়োজন গণতন্ত্রের স্বার্থেই
কিন্তু তার চাইতে এতটুকু কম দরকারি নয় যন্ত্রের উপরে জনগণের আস্থা, বিশ্বাস
ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে নাগরিক-সংশয় গণতন্ত্রে অভিপ্রেত নয়
কিন্তু সাধারণ মানুষ তো আর ইভিএম যন্ত্রগুলোর পেট কেটে তার অ্যানাটমি বোঝার সুযোগ পাবেন না
তাদের নির্ভর করতে হবে বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপরেই
আমাদের দেশে তেমন বিশ্বাসী বিশেষজ্ঞরও অভাব রয়েছে
বিভিন্ন সময়ে যারা আঙুল তুলেছেন এই বোবা ভোটযন্ত্রের সততা আর বিশ্বাসযোগ্যতায়, তাদের মধ্যে রয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতা, এমনকি আছেন দস্তুর মতো আইটি বিশেষজ্ঞও
দোষ অবশ্য যন্ত্রের নয়, যন্ত্র যারা চালায়, যাদের কথায় চালায়, তাদের
কিন্তু তাদের মনোভাব বদল করবে কে? তবে কি হানাহানি মারামারি, খুনোখুনি, 'মানি না, মানব না'-র পাশাপাশি কাগজের ব্যালটে ষোলো কোটি ভোটারের ভোটপ্রক্রিয়া চলতে থাকবে? আর 'ডিজিটাল বাংলাদেশে' সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের সঙ্গে ইভিএমে ভোটগ্রহণও কেবল প্রশ্ন হয়েই থাকবে?
আমরা দলাদলি নিয়ে যখন ব্যস্ত, দেশের একজন প্রধান নেত্রীর জীবন-মৃত্যু নিয়ে নানাবিধ গুজব নিয়ে মত্ত তখন উন্নত বিশ্বে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে
একটা উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে
বিটকয়েন এবং সার্বিকভাবে ক্রিপ্টোমুদ্রা নিয়ে বিপুল বিতর্ক দুনিয়াজুড়ে
সে পরিসরে না ঢুকেও নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, বিটকয়েনের চলমান ইতিবৃত্ত দুনিয়াকে দিয়েছে অন্য এক বলিষ্ঠ উত্তরাধিকার
তা হলো 'ব্লকচেইন প্রযুক্তি', যার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বিটকয়েনের বিজ্ঞান এবং নিরাপত্তার চক্রব্যূহ
ব্লকচেইন যেন লেজার বা খেরোর খাতা, যার তথ্যগুলো জমা রয়েছে গাদা গাদা ব্লকের মধ্যে
একটা ব্লক তথ্যে পূর্ণ হয়ে গেলে, তা জুড়ে দেয়া হয় আগের ব্লকগুলোর সঙ্গে
শিকলের মতো, প্রায় অচ্ছেদ্য এক বন্ধনে
ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে জমা হওয়া তথ্যের প্রায় অলঙ্ঘনীয় নিরাপত্তার কারণেই এর বিপুল ব্যবহার শুরু হয়েছে জমি নিবন্ধনে, শেয়ার বাজারের কেনাবেচায়, ব্যাংকের বিবিধ কাজকর্মে, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে
ভোটপ্রক্রিয়াতেও
ইতোমধ্যেই ভোটের কাজে ব্লকচেইনের ব্যবহার হয়েছে নানা দেশে
২০২০-র আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্প-বাইডেনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের উত্তেজনার আবহে অনেকেই খেয়াল করেননি, সে দেশের উটাহ () রাজ্যের উটাহ কাউন্টিতে ভোট হয়েছিল 'ভোটস' নামের ভোটিং অ্যাপের সাহায্যে, ব্লকচেইন-ভিত্তিক প্রযুক্তির প্রয়োগে
এটা সম্ভব হয়েছে কারণ আমেরিকার বিভিন্ন অংশে ভোট হয় স্থানীয় নিয়মে
তার অনেক আগে, সেই ২০১৪-তেই, ডেনমার্কের রাজনৈতিক দল 'লিবারাল অ্যালায়েন্স' তাদের দলীয় নির্বাচনে ব্যবহার করেছে এই প্রযুক্তি
ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে প্রথম রাষ্ট্রীয় ভোট অবশ্য হয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনে, ২০১৮-তে
পরবর্তীকালে ব্লকচেইনের সাহায্যে ভোট নেয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে জাপানের সুকুবা শহরের ভোটে, ২০১৯-এ মস্কোর সিটি কাউন্সিলের ভোটে, ২০২০-এ রাশিয়ার সংবিধান সংশোধনের গণভোটে, এই সেপ্টেম্বরের রাশিয়ার পার্লামেন্টের নির্বাচনেও
প্রাচীন গ্রিসে মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরোকে ব্যবহার করা হতো ব্যালট হিসেবে
সেখান থেকে শুরু করে ইভিএম পর্যন্ত এসেই তো এই বিবর্তন থেমে যেতে পারে না
পরের ধাপে ব্লকচেইনের সার্বিক ব্যবহার তাই এক প্রকার নিশ্চিত
তবে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের আগে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা-সমালোচনা, বাদানুবাদ হবেই
রাশিয়া বা আমেরিকায় ব্লকচেইন প্রয়োগে কিছু দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল
বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে আরও উন্নত করতে চাইবেন এর প্রয়োগ-পদ্ধতি
আশা করা যায়, যথেষ্ট নিরাপদ হবে ভবিষ্যৎ ব্লকচেইন ভোটিং
গণতন্ত্রে ভোটযন্ত্রের প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা যতটা দরকারি, তার চাইতে এতটুকু কম প্রয়োজনীয় নয় জনগণের মনে প্রত্যয় জাগানো যে, ভোট এবং তার গণনা নিরপেক্ষভাবেই হয়েছে
প্রযুক্তি যাচাই করে বিশ্বাসের আবহ বিস্তারের মূল দায়িত্ব অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের
অগণিত সাধারণ মানুষ তো প্রযুক্তি বোঝেন না
যে-সব বিশেষজ্ঞ ইভিএম-এর অ্যানাটমি বোঝেন, ব্লকচেইনের উন্নততর প্রযুক্তি হয়তো তাদেরও অনেকের আয়ত্তের বাইরে
তাতে অবশ্য বিশেষ সমস্যা নেই
সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদরা ব্লকচেইন-ভোটিংকে সার্টিফিকেট দেবেন, প্রতিষ্ঠান একে ভরসাযোগ্য মনে করে তবেই এর প্রয়োগে উদ্যোগী হবে
প্রচারের মাধ্যমে জনগণের মনে এই যান্ত্রিক ভোটযন্ত্র সম্পর্কে প্রত্যয় জাগানোর চেষ্টাও হবে
তবু, ইভিএম বা ব্লক-চেইন পদ্ধতিতে ভোট হওয়ার পর কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা যে ভবিষ্যতে, বিশেষত ভোটে হারার পরে নতুন ভোটযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না, তার গ্যারান্টি কে দেবে?
তাই ইভিএম হোক বা ব্লকচেইন-ভিত্তিক ভোটযন্ত্র, কিংবা ভবিষ্যতের অনাগত কোনো প্রযুক্তি, ভোটের ক্ষেত্রে কাগজের বিস্ময়কর ক্ষমতার বন্ধনের সঙ্গে ভোটযন্ত্রকে কুস্তি চালিয়ে যেতেই হবে
আমাদের লড়াইটা অবশ্য আরও অনেক পুরোনো, যা অন্তত ২০ বছর আগে শেষ হওয়ার কথা ছিল অর্থাৎ অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ভোটের আয়োজন নিশ্চিত করা
যা আপাত-অবাস্তব, অসম্ভব, অথচ অনিবার্য এক লড়াই
লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক ছাত্রনেতা
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
'অন্তর মম বিকশিত করো'
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত
শেয়ার করুন
জ্ঞানের বাতিঘর আপনি অনির্বাণ!
নাসির আহমেদ
১ ডিসেম্বর, ২০২১ ১৬:৫৪
লিংকডইনে শেয়ার করুন
ইমেইল করুন
ওয়াটসঅ্যাপে শেয়ার করুন
ব্লগস্পটে শেয়ার করুন
আজীবন প্রগতিশীল আর মুক্তচিন্তার ধারক, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের প্রবক্তা এই শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে সমার্থক বিবেচনা করেছেন সব সময়
'জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি'র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত
বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রেখে যাবার জন্য জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি অসামান্য ভূমিকা পালন করে চলেছে
মৃত্যু জীবনের এক অনিবার্য অধ্যায়
নশ্বর জীবন থেকে অবিনশ্বর জগতে আমাদের যেতেই হয়
অলঙ্ঘনীয় মৃত্যুর সত্য জেনেও মন কিছুতেই মেনে নিতে চায় না মৃত্যু
তবু চলে যেতে হয়, চলে যেতে দিতে হয়
এই নির্মম সত্য ভাবতে গেলে বিষণ্নতায় মন মেঘলা হয়ে যায়
মৃত্যু হচ্ছে চলমান জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার আরেক নাম
কিন্তু মানব জীবনের অনিবার্য এই নিয়তির মুখোমুখি হয়ে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে যাবার পরেও কেউ কেউ মানুষের মনে বেঁচে থাকেন অনেক বছর, যদি তিনি হন চিরস্মরণীয় ব্যক্তি
কথাগুলো মনে এলো জাতীয় অধ্যাপক, ভাষাসংগ্রামী ডক্টর রফিকুল ইসলামের প্রয়াণে
তিনি ব্যাক্তিগতভাবে আমার মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অগণিত শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক
কিন্তু দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে এই জাতীয় অধ্যাপক পরম শ্রদ্ধার মানুষ
তিনি শিক্ষকদের শিক্ষক
তার চলে যাওয়া আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনসহ অগণিত সচেতন মানুষের মনে বিষাদের কালি ছড়িয়ে দিয়েছে
বয়সের বিবেচনায় ৮৭ বছর মোটামুটি দীর্ঘায়ুই বলা যায়
তারপরও মনে হয় আহা যদি আরও কিছুদিন স্যার আমাদের মাঝে থাকতেন! এই আক্ষেপ এ কারণেই যে তিনি সাধারণ কোনো মানুষ নন
সৃজনে-মননে, পেশায় তিনি আমাদের জাতীয় জীবনের বাতিঘরতুল্য এক জ্ঞানতাপস
বাংলা ভাষা সাহিত্য ছিল তার জ্ঞানের মূল বিষয়
ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবে তার সুনাম দুই বাংলাতেই সমান বিস্তৃত
ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে তার একাধিক বই রয়েছে
'ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধাবলী' গ্রন্থটি পড়লে এ বিষয়ে তার জ্ঞানের গভীরতা এবং অধ্যয়নের বহুমাত্রিকতা যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন ভাষা এবং ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে
বাংলা ভাষা শুধু নয়, বিশ্বের অপরাপর ভাষাগোষ্ঠীর বিবর্তন এবং বাংলার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্ধারণে কৌতূহল ছিল তার অপরিসীম
গবেষক হিসেবে তিনি অসাধারণ নিষ্ঠাবান ছিলেন
শিক্ষক হিসেবে অসামান্য স্মার্ট ছিলেন তিনি
কোনোদিন কাগজ দেখে পড়াননি
বাংলা ভাষার ক্রমবিবর্তনের বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর আন্তঃসম্পর্কের বিষয় ছিল তার নখদর্পণে
তার আরেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান নজরুল গবেষণা
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি আজীবন গবেষণার বিষয় করে রেখেছিলেন
আমাদের ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা ঐতিহাসিক
বায়ান্নো সালের মহান ভাষা আন্দোলনের বহু মূল্যবান আলোকচিত্র ধারণ করেছেন তার নিজের ক্যামেরায়, যা একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক দলিল বলে বিবেচিত হতে পারে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে তার কাজ পথিকৃতের
'বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম', 'বীরের এই রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা' এসব গ্রন্থ তারই স্বাক্ষর বহন করে
পরের বইটি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে লেখা
ডক্টর রফিকুল ইসলাম শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ওপরে প্রথম গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন
মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিষয়ে তার যে গবেষণামূলক রচনা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে যেসব লেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পূর্বাপর ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল বিবেচিত হতে পারে
মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন, শেরেবাংলা নগর ঢাকার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তার উপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়
সেসব অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন
বাংলা ভাষার ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষক হিসেবে তার যেমন ভূমিকা উজ্জ্বল, তেমনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করেও তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে গেছেন
ঢাকা গবেষণায়ও রয়েছে স্মরণীয় ভূমিকা
তার লেখা 'ঢাকার কথা' 'ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার' উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে
এছাড়াও 'বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ', 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর' এসব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আকর গ্রন্থ