content stringlengths 0 129k |
|---|
ইংল্যান্ডের লোকদের মতো গোমড়ামুখো অসভ্য নয় |
এটা আমি লক্ষ্য করেছি স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড বা ওয়েলস-এর লোকেরা ইংল্যান্ডের লোকদের সব সময় অসভ্য আর গোমড়ামুখো বলে |
ইংল্যান্ডের লোকেরা তাদের বলে অমার্জিত গেঁয়ো |
কারও সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করাটা যদিও অভদ্রতা তবু আলফ্রেড এত সরলভাবে কথাটা বললো যে ওকে কিছু বলতে পারলাম না |
আলফ্রেড বললল, লন্ডনে তোমার কে আছে? |
মা আর সৎ বাবা |
তুমি কি ওদের সঙ্গে থাকো? |
আমি মাথা নেড়ে সায় জানালাম |
আলফ্রেড বললো, তোমার বাবা নিশ্চয় খুব ভালো লোক |
এসব ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের বোর্ডিং-এ পাঠিয়ে দেয়া হয় |
আমার সৎ বাবা ঠিক বাবার মতো নয়, আমার বন্ধুর মতো |
আমাকে ও খুব ভালোবাসে |
তুমিও নিশ্চয় ওকে খুব ভালোবাসো? |
হাঁ, ভালোবাসি |
ভালোবাসা একতরফা হয় না |
তুমি ভাগ্যবান নিক |
তোমার সৎ বাবাও খুব ভাগ্যবান-তোমার মতো ছেলে পেয়েছে |
তোমার নিজের কথা বলো |
বাড়িতে কে কে আছে তোমার? |
আলফ্রেড ওয়েলস-এর বাসিন্দা বলেই ওকে এভাবে প্রশ্ন করেছিলাম |
নইলে এটা নিতান্তই অ-ইংরেজসুলভ প্রশ্ন, যা কোনো দ্ৰ ইংরেজ কাউকে করবে না |
ওয়েলস-এর বাড়িতে আমি একা থাকি |
আলফ্রেড-এর মুখের হাসিতে কিছুটা বিষণ্ণতা মেশানো ছিলো |
তোমার স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে নেই? |
স্ত্রী মারা গেছে |
দুই ছেলে আছে, এক ছেলে লন্ডনে, আরেক ছেলে আছে |
ব্রাসেলস এ |
লন্ডনে তোমার ছেলের সঙ্গে থাকে না কেন তুমি? |
একটু বিরক্ত হয়ে আলফ্রেড বললো, ও এক ইংরেজ মেয়ে বিয়ে করেছে |
জানোই তো ইংরেজরা স্বাধীনভাবে থাকতে পছন্দ করে |
আলফ্রেডের কথা শুনে ওর জন্য ভারি মায়া হলো |
বললাম, আমাদের বাংলাদেশে, শুধু বাংলাদেশে নয়, এশিয়ার অনেক দেশে বাবা মা বুড়ো হলে ছেলেদের সঙ্গে থাকে |
ছেলের বউ বুড়ো বাবা মার যত্ন নেয় |
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলফ্রেড বললো, আমি জানি নিক |
রবার্ট যদি ওয়েলস এর মেয়ে বিয়ে করতো তা হলে আমরা একসঙ্গে থাকতে পারতাম |
এ্যান একেবারে খাঁটি ইংরেজ |
ও এসব পছন্দ করে না |
শুধু মেয়ের দোষ দিও না |
তোমার ছেলেও নিশ্চয় এর জন্য দায়ী? |
তা তো বটেই! বলে আলফ্রেড চুপ করে রইলো |
আধ ঘণ্টা পর কটনউড স্টেশন এসে ট্রেন থামলো |
ছোট্ট পাহাড়ি জনপদের ভেতর নিরিবিলি স্টেশন-যেমনটি আমি চেয়েছিলাম |
আলফ্রেড ওর চেহারা থেকে বিষণ্ণতার কালো ছায়া সরিয়ে ফেলে ব্যস্ত গলায় বললো, জলদি নেমে পড়ো নিক |
ট্রেন এখানে মাত্র এক মিনিটের জন্য থামে |
মাত্র আমরা দুজনই ছিলাম কটনউডের যাত্রী |
প্লাটফর্মে নামতেই হুশ করে ট্রেনটা ছুটে গেলো |
অদ্ভুত এক নিরবতা আমাদের চারপাশে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে গেলো |
স্টেশনের এক পাশে লোকালয় অন্যদিকে ধু ধু মাঠ |
বেশ দূরে মাঠে একটা গরু হাম্বা বলে ডাকলো |
একটা দুটো পাখির ডাক শোনা গেলো |
আলফ্রেড উত্তর দিকে আঙুল তুলে দেখালো, ওই যে পাহাড়টা দেখছো, ওটার আড়ালে সেই দুৰ্গটা রয়েছে |
আগে চলো এক কাপ চা খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিই |
আমার ফ্লাস্কটাও ভরিয়ে নেবো |
তারপর দুর্গ অভিযানে বেরোনো যাবে |
আলফ্রেডের কথা শুনে মনে হলো, একটু চা হলে ভালোই লাগবে |
ওর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম স্টেশন থেকে |
স্টেশনের কাছাকাছি রাস্তার দুপাশে কয়েকটা পাকা বাড়ি, ছোট দুটো ডিপার্টমেন্ট শপ, পাশে ক্যাফেও রয়েছে |
ক্যাফেতে ঢুকে আলফ্রেড চায়ের অর্ডার দিলো |
বললো, আর কিছু খাবে? |
আমি মাথা নাড়লাম-না ধন্যবাদ, তুমি ইচ্ছে করলে নিতে পারো |
আলফ্রেড বললো, আমার মতো বুড়োদের অনেক হিসেব করে চলতে হয় |
আমি একটার আগে কিছু খাবো না |
এখন মাত্র এগারোটা দশ |
চা খেয়ে দুজন বেরিয়ে পড়লাম দুর্গের পথে |
পাহাড়ি উঁচুনিচু রাস্তা, পাথরে বাঁধানো |
দুপাশে বেশির ভাগ গাছেই পাতা নেই, যেগুলোতে আছে তাও বিবর্ণ, বসন্তের জন্য অপেক্ষা করছে |
বসন্তের শুরুতে গাছে গাছে রঙের বন্যা বয়ে যায় |
কোনো কোনো গাছ রোজ রঙ বদলায় |
বনের ভেতর রঙের ফোয়ারা ছোটে |
চারদিক ঠাণ্ডা, সুনসান |
মাঝে মাঝে কনকনে বাতাস বয়ে যাচ্ছিলো. গাছের শুকনো পাতায় ছোট ছোট ঘূর্ণি তুলে |
শীতকালে এসব জায়গায় কোনো পাখি থাকে না |
তখনও বরফ পড়েনি বলে পাহাড়ের বনে একটা দুটো পাখি উড়তে দেখা গেলো |
আলফ্রেড বললো, বহু বছর পর ইংল্যান্ডের আবহাওয়া আমাদের ওয়েলস-এর মতো মনোরম মনে হচ্ছে |
তার মানে তুমি বলতে চাইছো ক্রিসমাসে তোমাদের ওখানে বরফ পড়ে না? |
মাঝে মাঝে পড়ে |
তবে ইংল্যান্ডের মতো নোংরা ময়লা বৃষ্টি থাকে না |
শীতের শুরুতে এখানকার মতো জঘন্য আবহাওয়া কোথাও খুঁজে পাবে না |
কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য আবহাওয়া একটা জনপ্রিয় বিষয় |
তা সে ইংল্যান্ডেরই হোক কিংবা স্কটল্যান্ডের কি ওয়েলস-এর, তাতে কিছু যায় আসে না |
আলফ্রেডের সঙ্গে কটনউডের পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে ভালোই লাগছিলো |
ও এক মনে ওয়েলস-এর প্রকৃতির বর্ণনা দিচ্ছিলো |
কোন ঋতুতে কী রকম দেখায় গড়গড় বলে যাচ্ছিলো |
বুড়ো কথা বলার সঙ্গী পেয়ে ভেতরের সব উচ্ছ্বাস উজাড় করে দিচ্ছে |
মানুষ কী নিঃসঙ্গ! আমাকে না পেলে ও নিশ্চয় একা একা হেঁটে বেড়াতো কটনউডের রাস্তায়, নইলে পাব-এ কিংবা রেস্তোরাঁয় বসে ঝিমাতো |
নিজের কথা মনে হলো |
আমি আলফ্রেডকে নিঃসঙ্গ ভাবছি, আমি নিজেও কি নিঃসঙ্গ নই? দিব্যেন্দুকে ভেবেছিলাম আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু |
কাল ওর কথা শুনে মনে হলো না ও আমার মতো ভাবে |
শীলা, জেন, ভিকি-সবারই নিজেদের আলাদা জগৎ আছে |
ওরা কোথায় গেছে আমি জানি না |
জানাবার দরকারও মনে করেনি ওরা |
ওদের কারও সঙ্গে দেখা হলে এভাবে অচেনা জায়গায় ঘুরতে আসতাম না |
আলফ্রেডের সঙ্গে দেখা না হলে আমাকেও কটনউড না হলে অন্য কোথাও একা একা হাঁটতে হতো |
আলফ্রেড কথা থামিয়ে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করছিলো-সত্যি দারুণ না! হ্যাঁ সত্যিই দারুণ |
ওয়েলেস-এর সব কিছুই দারুণ চমৎকার |
এ বিষয়ে ওর সঙ্গে একটু পরপরই আমাকে একমত হতে হচ্ছিলো |
মনে মনে বললাম, আলফ্রেড তুমি মানুষটাও চমৎকার |
কটনউডের দুর্গটা খুব বড় নয় |
কাছে না এলে বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এখানে এত পুরোনো একটা দুর্গ আছে |
দুর্গ দেখতে এসে লক্ষ্য করলাম এখানে কোনো গাইড নেই, পাহারাদার নেই, আশেপাশে লোকজনের কোনো চিহ্ন নেই |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.