content
stringlengths
0
129k
গত রাতে ইরফান ডালপট্টি, হেমেন্দ্র দাস রোড, রূপচাঁদ লেন, সূত্রাপুর বাজার, গেন্ডারিয়া আর ফরাশগঞ্জের লোকজনদেরও মিটিং-এ ডেকেছিলো
বেশির ভাগই ছিলো তরুণ, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র
কয়েকজন সবে চাকরিতে ঢুকেছে
শুধু পিন্টু আর ডালপট্টির সোহরাব ছিলো স্কুলের ছাত্র
মিটিং-এ ঠিক হয়েছে সবাই গ্রুপ ভাগ করে রাত জেগে পালা করে পাড়া পাহারা দেবে
কোথাও হামলা হলে সবাই মিলে শ্লোগান দেবে-জাগো জাগো বাঙ্গালী জাগো
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের আগে এ শ্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান বৌদ্ধ-খৃষ্টান সবাই একজোট হয়েছিলো
হামলাকারীদের যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে
গলির মুখের বাড়িগুলোর ছাদে মেয়েরা ইটের টুকরো, গরম পানি, শুকনো মরিচের গুড়ো নিয়ে তৈরি থাকবে
ছেলেরা থাকবে লাঠি হাতে
কারও যদি বন্দুক থাকে সেটাও তৈরি রাখতে হবে
মোট কথা এ এলাকায় কোনো অবস্থায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি বা মন্দিরে কাউকে হামলা করতে দেয়া হবে না
সকালে নাশতা খেয়েই পিন্টু ছুটলো
রতনদের বাড়িতে
পাড়ার অন্য হিন্দুরা সব চৌধুরী ভিলায় আশ্রয় নিয়েছে
তাদের বাড়ির লোহার ফটকের বাইরে চারজন বন্দুকধারী পুলিশ পাহারা দিচ্ছে
শুধু রতনরা নিজেদের বাড়িতে আছে
রতনদের বাড়ি গিয়ে পিন্টু দেখলো ওর বাবা, বড়দা কেউ কাজে যায়নি
রতন ভেতরের বারান্দায় বসেছিলো
পিন্টু ওকে জিজ্ঞেস করলো, নাশতা করেছিস?
রতন মাথা নাড়লো
ওর মা জানতে চাইলেন, তপতী আর কেতকী কেমন আছে বাবা?
এ পাড়ায় কোনো গুন্ডা বদমাশকে আমরা ঢুকতে দেবো না
রতনের বড়দা বললে, পাড়ায় না হয় কেউ এলো না
কাজে বেরোবার সাহসও তো পাচ্ছি না
রতনের বাবা বললেন, কথা নেই বার্তা নেই পাশের বাড়ির ছেলেটা সকালে ইনকেলাব পত্রিকাটা দিয়ে গেছে পড়ার জন্য
পড়তে গিয়ে হাত পা সব হিম হয়ে গেছে
মনে হচ্ছে বাংলাদেশের একজন হিন্দুও আস্ত থাকবে না
গত রাতে ইরফান যেভাবে বলেছিলো-গম্ভীর হয়ে পিন্টু বললো, দু একদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে কাকাবাবু
রতনের ঠাকুরমা ভাঙা গলায় বললেন, তাই যেন হয় বাছা
রতনের মাকে পিন্টু জিজ্ঞেস করলো, কাকিমা, বাজার থেকে কিছু আনতে হবে?
বাজার করে কী হবে বাবা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রতনের মা বললেন, আলু ভাতে ফুটিয়ে রাখবো, কারও ইচ্ছে হলে খাবে
রতনদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিলো বাড়ির কেউ বুঝি কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে
পিন্টু আর কোনো কথা না বলে চলে এলো
ভেবেছিলো রতন ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেবে, কিন্তু ও এলো না
বারান্দায় খামের গায়ে হেলান দিয়ে যেভাবে বসেছিলো সেভাবেই বসে রইলো। পিন্টু বাইরে এসে বললো, রতন দরজাটা বন্ধ কর
বাড়িতে না গিয়ে পিন্টু সোজা সূত্রাপুর বাজারে এলো
লক্ষ্য করলে বেশ কয়েকটা দোকান বন্ধ
কয়েকজন পরিচিত মাছওয়ালাকেও দেখতে পেলো না
মুদি দোকান থেকে একটা ব্যাগ কিনে দুসের মুগডাল এক কেজি তেল কিনলো
তরকারির বাজারে গিয়ে দু কেজি করে আলু, সিম আর ফুলকপি কিনলো
মাছের বাজারে গিয়ে এক কুড়ি শিং আর মাগুর মাছ কিনলো
এ রকম অবস্থা কদিন চলবে কে বলতে পারে! রতনরা বাজারে যেতে পারবে না, ঘর থেকে বেরোতে পারবে না-শেষে কি ওরা না খেয়ে মরবে?
বাজার নিয়ে পিন্টু আবার রতনদের বাড়ি এলো
বাজারের থলেটা রতনের মার হাতে দিয়ে বললো, কাকিমা, কোনো কিছুর দরকার হলে রতনকে বলবেন আমাকে খবর দিতে
পাড়ার ভেতর কোনো ভয় নেই
রতনের মা শুকনো গলায় বললেন বটে-এসব কেন আনতে গেলে, কিন্তু তিনি ভালো করেই জানেন ঘরে কয়েক সের চাল ছাড়া খাবার কিছুই নেই
পিন্টু চলে যাওয়ার পর ভাবছিলেন ওকে দিয়ে সের দুই আলু পটল আনিয়ে নিলে ভালো হতো
ছেলেটার জন্য গভীর মমতায় তার বুক ভরে গেলো
যাবার সময় পিন্টু রতনকে বললো, আমি একটু স্কুলের দিকে যাব
তুই দুপুরে একবার আসিস
বাড়িতে মাকে বলে পিন্টু হাঁটতে হাঁটতে লক্ষীবাজারের দিকে গেলো
পথে ঋষিকেশ দাস রোডে একটা মিষ্টির দোকান লুট হতে দেখলো
বেশি নয় দশ বারো জন লোক লাঠি, রড, হকি ষ্টিক হাতে দোকানের কাঠের ঝাঁপ ভেঙে ফেলেছে
কয়েকজনের মুখে দাড়ি, মারমুখী চেহারা
দোকান ভাঙার পর একজন ক্যাশ বাক্স নিয়ে দৌড় দিলো আর রাস্তার টোকাইরা আঁপিয়ে পড়লো শো কেসে সাজিয়ে রাখা মিষ্টির ওপর
বোধহয় কাল বিকেলে বানানো হয়েছে, প্রায় সবগুলো থালাই ভরা ছিলো নানা রঙের মিষ্টিতে
অল্প দূরে তামাশা দেখার জন্য তোকজন ভিড় করেছে
দূরে মোড়ের কাছে দুটো পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে
এদিকে যে এত হল্লা হচ্ছে, সেদিকে ওদের নজরই নেই
নিজের ওপরই প্রচন্ড রাগ হলো পিন্টুর
চোখের সামনে এমন একটা অন্যায় ঘটনা দেখেও ওর করার কিছু নেই
সবাই মিলে বাধা দিলে দোকান লুট করতে আসা শয়তানগুলো ঠিকই পালিয়ে যেতো
কেউ কিছু বললো না
বরং কয়েকজনের চেহারা দেখে মনে হলো এতে ওরা খুশি হয়েছে
দ্রুত পা চালিয়ে ওখান থেকে সরে এলো পিন্টু
নিজেকেই ওর অপরাধী মনে হচ্ছিলো
সোহরাওয়ার্দী কলেজ পেরিয়ে নন্দলাল দত্ত লেনের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো পিন্টু
পরনে পায়জামা পাঞ্জাবি, হাতে বাজারের খালি ব্যাগ, গলির মুখে দাঁড়িয়ে ভীত সন্ত্রস্ত মুখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন বুড়ো নলিনী স্যার
গলি পেরিয়ে লক্ষীবাজারের বড় রাস্তায় নামার সাহস পাচ্ছিলেন না তিনি
স্কুলের শুরু থেকে গত দশ বছর যাকে ধূতি পাঞ্জাবি ছাড়া দেখেনি, যার চেহারায় সারাক্ষণ কর্তৃত্বপূর্ণ একটা রাগী ভাব ফুটে থাকে, তাকে ভীত অসহায় অবস্থায় এরকম পোষাকে দেখে পিন্টুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো
কোথায় কারা কোন বাবরী মসজিদ ভেঙেছে তার জন্য নলিনী স্যারের এ অবস্থা কেন হবে এর কোনো কারণ খুঁজে পেলো না ও
কাছে এসে নরম গলায় প্রশ্ন করলো, স্যার, আপনি কি বাজারে যাচ্ছেন?
চমকে উঠে পিন্টুর দিকে তাকালেন নলিনী স্যার
যেন অকূল সমুদ্রে ডুবতে গিয়ে একটা শক্ত অবলম্বন খুঁজে পেলেন
ভাঙা গলায় বললেন, হ্যাঁ বাবা
ওদিকে শুনছি লুটপাট আর আগুন লাগানো শুরু হয়ে গেছে
ঘরে এক মুঠো চাল নেই
পিন্টু ওঁর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বললো, স্যার আপনি বাড়ি যান
আমি চাল নিয়ে আসছি
নলিনী স্যার ওর হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, বাবা, পারলে এক সের আলুও এনো
কথা না বাড়িয়ে পিন্টু একটা রিকশা ডেকে রায় সাহেবের বাজারে এলো
এ বাজারের অবস্থাও সূত্রাপুর বাজারের মতো
অনেকগুলো মুদির দোকান বন্ধ
মাছের বাজারও বেশ ফাঁকা
জেলেদের ভেতর এখনও হিন্দুর সংখ্যা কম নয়
রতনদের জন্য যে রকম বাজার করেছিলো, নলিনী স্যারের জন্যেও সে রকম করলো পিন্টু
স্যারের বাড়িতে ও আগেও কয়েকবার গেছে
বাড়িতে স্যারের স্ত্রী, পিসিমা, এক বিধবা বোন আর দুই মেয়ে আছে
বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে শুধু তিনি
স্যারের একটাই ছেলে, বিয়ে করে কানাডায় আছে
বাপের কোনো খোঁজ খবর নেয় না
বেতনের টাকায় সংসারের খরচ চলে না বলে স্যার বাড়িতে কোচিং ক্লাস করেন
বাজার থেকে বেরিয়ে পিন্টু রিকশায় উঠতে যাবে এমন সময় দেখলো রড আর লাঠি হাতে কতগুলো লোক হই হই করে নবাবপুরের দিকে ছুটে যাচ্ছে
বেশির ভাগই লুঙ্গি পরা
কারো গায়ে সুয়েটার, কারও গায়ে চাদর
ওদের সামনে পায়জামা আর লম্বা কোর্তা পরা দুই কালো দাড়িওয়ালা লোক ছিলোবোঝা যায় এরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে
মারমুখী মিছিলের শেষে কয়েকটা টোকাইও দৌড়াচ্ছে
পিন্টু জানে নবাবপুরে হিন্দুদের বেশ কিছু দোকান আছে