content stringlengths 0 129k |
|---|
ওদের ক্লাসে পড়ে দীপক, নবাবপুরে ওদের বিরাট ওষুধের দোকান |
তাছাড়া মরণাদের মিষ্টির দোকান, গন্ধবণিকদের পসারির দোকান, ঘোষদের দুধের আড়ত, পদ্মনিধি প্রেস,সবই নবাবপুরে |
লাঠি আর রড হাতে লোকগুলোর লক্ষ্য যে এসব দোকান, বুঝতে কারও অসুবিধে হওয়ার কথা নয় |
ব্যাগ ভর্তি জিনিসপত্র দেখে নলিনী স্যার অবাক হয়ে বললেন, হারে এত সব কেনার টাকা কোথায় পেলি? |
টাকা আমার কাছে ছিলো স্যার |
নিশ্চয় বাড়ির টাকা! কত খরছ হয়েছে বল, আমি দিয়ে দিচ্ছি |
বাড়ির টাকা না স্যার |
এটা আমার নিজের কামাই করা টাকা |
তুই কোত্থেকে টাকা কামাই করলি? |
আমি সূত্রাপুর ক্লাবে ফুটবল খেলে পেয়েছি স্যার |
আপনার কাছ থেকে টাকা নিতে পারবো না |
তা হয় না-পিন্টু |
তুই কেন আমার জন্য এতগুলো টাকা খরচ করবি? |
স্যার, আমাদের মতো গাধা পিটিয়ে আপনি মানুষ করেছেন |
সারা জীবনই আমাদের দিয়ে এসেছেন |
ক্লাসে আপনিই বলেন শিক্ষক পিতার তুল্য |
ছেলে হয়ে এটুকুও কি করতে পারবো না? |
নলিনী স্যার পিন্টুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ |
খেলাধুলোর ব্যাপারে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই বলে পিন্টুকে কখনও আলাদা ভাবে তিনি দেখেননি |
ক্লাসের অন্য সব ছেলের মতোই ওকে জানেন |
ও কার ছেলে, কোথায় থাকে তাও তিনি জানেন না |
তাঁর নিজের ছেলে তাকে ভুলে গেছে আর এমন ঘোর বিপদের দিন কোন বাড়ির ছেলে এসে আপনজনের মতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, ভাবতে গিয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো |
ধরা গলায় বললেন, পিন্টু, চারদিকে এত অন্যায়, অবিচার দেখে মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম |
তোকে দেখে মনে হচ্ছে এখনো পৃথিবীর সবটুকু পাপে ভরে যায় নি |
তোকে আমি প্রাণভরে আর্শীবাদ করছি বাবা, জীবনে তুই অনেক বড় হবি |
স্যারের কথা শুনে পিন্টুর কান্না পেলো |
তাঁর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বললো, স্যার, আপনার আর্শীবাদের চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! |
কোনো কথা না বলে বুড়ো সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ নলিনী ভট্টাচার্য বিধর্মী ছেলেটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলেন |
যে কজনকে খবর দেয়া সম্ভব হয়েছে সবাইকে নিয়ে বিকেলে পিন্টুদের ছাদে জরুরী বৈঠকে বসলো ইরফান |
রতনদের বাসায় গিয়ে ওকে আর স্বপনকে ও নিজেই নিয়ে এসেছে |
বলেছে, মার খাওয়ার ভয়ে তোরা ঘরে কেন লুকিয়ে থাকবি? কেউ মারতে এলে রুখে দাঁড়াতে হয় |
সরকারদের বড় ছেলে বাসব ইরফানদের বয়সী, সেও এসেছে বৈঠকে |
পিন্টু গুণে দেখলো সব মিলিয়ে পনেরো জন |
দুটো বড় চাদর বিছিয়েছিলো ছাদে |
তাতেও সবার জায়গা হয়নি |
রতন বসেছে পাচিলের গায়ে হেলান দিয়ে |
ইরফান বললো, আমি আজ শহরে বেরিয়েছিলাম |
অবস্থা ভালো নয় |
গুণ্ডারা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হামলা করেছে |
অনেকগুলো দোকান ভেঙে লুটপাট করেছে |
পিন্টু বললো, ঋষিকেশ দাস রোডে মিষ্টির দোকান আমার চোখের সামনে লুট হয়েছে |
বাসব বললো, নগেন বাবু খবর পেয়েছেন আজ রাতে নাকি সূত্রাপুর বাজার লুট হবে |
ইরফান বললো, আমাদের সব রকম খারাপ পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে হবে |
আমি সূত্রাপুরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে কথা বলেছি |
ওদের কমিটিতে আওয়ামী লীগ, জাসদ, বাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি-সব দলেরই ছেলেরা আছে |
বাজার পাহারা দেয়ার দায়িত্ব ওরা নিয়েছে |
আমরা পাড়ায় পাড়ায় কাল রাতের মতো পাহারা দেবো |
লক্ষ্য রাখতে হবে বাবরী মসজিদ ভাঙার কথা বলে কেউ যেন উত্তেজনা ছড়াতে না পারে |
আমাদের বলতে হবে বাংলাদেশের হিন্দুরা বাবরী মসজিদ ভাঙেনি |
একাত্তরে সালে আমরা মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান সবাই মিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি |
দেশের জন্য হিন্দু, মুসলমান সবাই জীবন দিয়েছে |
সবার এদেশে থাকার সমান অধিকার আছে |
ধর্মের নামে যারা নিরীহ মানুষের ওপর হামলা করে, জিনিসপত্র লুট করে, দোকান-পাট, মন্দির, মসজিদ ভেঙে ফেলে, ঘর বাড়িতে আগুন দেয় তারা হিন্দুও না মুসলমানও না, তারা অসভ্য জানোয়ার |
তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে |
সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে ইরফানের কথা শুনছিলো |
হঠাৎ দূরে লোকজনের হইচই আর শ্লোগানের শব্দ শোনা গেলো |
সবাই কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলো |
সামনের রাস্তায় কয়েকটা দোকান ঝটপট করে ঝাঁপ নামিয়ে দিলো |
দূরে ডালপট্টির ওদিক থেকে দাড়িওয়ালা মোল্লাদের মিছিল আসছিলো |
শ্লোগান দিচ্ছে, নারায়ে তকবির......, একটা একটা মালাউন ধর, সকাল বিকাল নাশতা কর |
ভারতের দালালেরা, হুশিয়ার সাবধান |
হিন্দু যদি বাঁচতে চাও, বাংলা ছেড়ে ভারত যাও |
শ্লোগানের কথা শুনে রতনের বুক কেঁপে উঠলো |
ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো |
বললো, সবাই লাঠি নে |
আমরাও মিছিল বের করবো |
পিন্টুদের ছাদে আগের দিন সন্ধ্যায় সূত্রাপুর বাজার থেকে এক মণ গজারির লাঠি এনে রাখা হয়েছিলো |
ইরফানের বলার সঙ্গে সঙ্গে সবাই লাঠি হাতে নিয়ে নিচে নামলো |
কয়েকজন দুই হাতে দুই লাঠি নিয়েছে |
রাস্তায় নেমেই ইরফান শ্লোগান দিলো, হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই |
অন্যরা বললো, ভাইয়ে ভাইয়ে ভেদ নাই |
শ্লোগানের শব্দ শুনে চৌধুরী ভিলা থেকে কয়েকজন যুবক বেরিয়ে এলো |
ইরফান মিছিল নিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে গলা ফাটিয়ে শ্লোগান দিলো-মন্দির মসজিদ ভাঙে যারা, অন্যরা বললো, সব ধর্মের শক্র তারা |
ইরফান বললো, তুমি কে আমি কে, সবাই বললো, বাঙ্গালী, বাঙ্গালী |
ইরফান বললো, জামাত শিবির রাজাকার |
অন্যেরা বললো, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড় |
ইরফান বললো, তোমার আমার ঠিকানা |
সবাই বললো, পদ্মা মেঘনা, যমুনা |
মিছিল নিয়ে ইরফান এগিয়ে গেলো ডালপট্টির দিকে |
উল্টো দিক থেকে আসা দাড়িওয়ালাদের মিছিল ইরফানদের দেখে থমকে দাঁড়ালো |
রূপচাঁদ লেনের মাহবুব ছিলো ইরফানদের মিছিলে |
ও নিয়মিত নির্মূল কমিটির মিটিঙ মিছিলে যায় |
ইরফানকে বললো, রাজাকার গুলারে একটা ধাওয়া দেই |
ইরফান ভাই |
আমি শ্লোগান দিমু |
সবাই খালি কইবা জবাই কর |
মাহবুব মিছিলের মাঝখান থেকেই চেঁচিয়ে বললো, এই-ই জামাত ধর |
সবাই বললো, জবাই কর |
মাহবুব লাঠি উঁচিয়ে সামনের দিকে ছুটলো |
এরপর ইরফানদের মিছিলের সবাই-জামাত ধর জবাই কর, শিবির ধর জবাই কর, গোলাম ধর জবাই কর, আযম ধর জবাই কর, আবার জামাত ধর জবাই কর....... বলতে বলতে ডালপট্টির দিকে দৌড়ালো |
ইরফানকে এলাকার সবাই চেনে |
ওদের দৌড়াতে দেখে সামনে থেকে লোকজন সরে গেলো |
কেউ মিছিলে জুটে গেলো, অনেকে রাস্তার দু পাশে দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে ওদের উৎসাহিত করলো |
পিন্টু আর রতন আগে কখনও মিছিলে যায়নি |
একুশে ফেব্রুয়ারিতে ওরা প্রভাতফেরি করে বটে, কিন্তু সেখানে গান হয়, শ্লোগান হয় না |
ওরা দুজন এমনিতেই উত্তেজিত ছিলো |
মাহবুবের জবাই করার শ্লোগান ওদের আরও উত্তেজিত করলো |
পিন্টুর মনে হলো,যারা নিরীহ মানুষকে খুন করতে পারে, গরিব মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে পারে, তাদের ধরতে পারলে লাঠির বাড়ি মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়া উচিৎ |
ডালপট্টির মোড়ে থমকে দাঁড়ানো মোল্লাদের মিছিলটা উল্টোদিক থেকে লাঠি হাতে ভয়ঙ্কর রাগী মিছিল আসতে দেখে রণে ভঙ্গ দিলো |
যে যেদিকে পারলো চোখের পলকে হাওয়া হয়ে গেলো |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.