content stringlengths 0 129k |
|---|
উদ্যানের গেট পেরিয়ে তুলনামূলক একটা নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো দু'জন |
তখন সমুদ্রের তল ছুঁয়ে অকস্মাৎ ভেসে ওঠা ডলফিনের কুচকুচে গা বেয়ে যেনো ঝরছিলো সজীবতা |
সাদা বসনে আদৃত প্রেমিক পুরুষের কাশফুল প্রেমের শুভ্রতায় যেনো ম্লান হয়ে এলো নিয়নের ঝকঝকে আলো |
নিরবতা ভেঙ্গে বেজে ওঠলো মুঠোফোনে শুনা চিরচেনা সেই সুর - |
-কেমন আছেন আপনি? |
বিনয়াবনত কণ্ঠে অনামিকা জবাব দিলো, জ্বী ভালো |
যতটা সুন্দর ভেবেছিলাম তারচেয়ে অনেক বেশী সুন্দর আপনি |
- আপনার বাড়ী কি শহরের কাছেই? |
- তেমন কাছে বলা যাবে না, তবে বাসে এলে আধঘন্টা সময় লাগে |
- এলকার নামটা জানি কি বলেছিলেন? |
- শ্যামলপুর |
- এখন কি বাড়ী ফিরে যাবেন? |
- জ্বী, চলুন না কোথাও বসা যাক্ ; আকুতি ভরা আবদার নিবাসের |
- বাসায় ফ্লেক্সির কথা বলে বের হয়েছি, আমাকে এখুনি যেতে হবে বলে এই প্রথম নিবাসের চোখের দিকে তাকালো অনামিকা |
যেনো কয়েক সেকেন্ডে মেঘ ভেদে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো |
- আপনার বাসায় এখন কে কে আছে? |
- মা আর একমাত্র সন্তান |
প্লিজ আমি চলে যাই? |
- ওকে ভালো থাকবেন, পরে কথা হবে বলে উপায়ন্তরহীন নিবাস বাধ্য হয়ে বিদায় দিলো অনামিকাকে |
সালাম দিয়ে অনামিকা দ্রুতপায়ে পার্ক থেকে বেরিয়ে এলো |
সর্বোচ্চ দশমিনিটের এই দেখা নিবাসের ভেতর যন্ত্রণার একটা ক্ষত তৈরী করেছিলো যা অনামিকা জেনেছিলো দীর্ঘ কয়েক বছর পর |
অনামিকার জন্ম ফরিদপুরের মাদারিপুরে |
দেখতে আহামরি সুন্দরী না হলেও |
এ পর্যন্ত যেই তাকে দেখেছে, প্রথম দেখাতেই পছন্দ করেছে |
হেসে খেলেই কেটে গেছে শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলো |
বাঁধ সাধলো যৌবন |
তারুণ্যের ঝাঁঝালো দিনগুলোতেই প্রেমের ফাঁদে পা দিয়েছিলো অনামিকা |
স্বপ্ন গড়ার দিন থেকেই শুরু হলো স্বপ্ন ভাঙ্গনের |
গায়ের সহজ সরল আবহে বেড়ে ওঠা অনামিকা হঠাৎ একদিন ভালোবাসার মানুষটার কাছে প্রতারিত হয়ে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নেয় |
উদ্দেশ্য সবার সামনে থেকে পালিয়ে বাঁচা |
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার |
কয়েক মাসের মধ্যে কর্মস্থলেই এক সহকর্মীর সাথে পারিবারিক ভাবে কমিউনিটি সেন্টারে ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো তার |
এইবার সে অতীত ভুলে বর্তমানকে ঘিরেই বাঁচার অনেকটা প্রস্তুতি ভেতর থেকে নিয়ে নিলো |
মনে মনে ভাবলো সমস্ত যন্ত্রণার লাঘব করে ভেঙ্গে পরা স্বপ্নটাকে যত্ন দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করে তুলবে এই মানুষটাই যার হাত ধরে জীবনের পথ চলা শুরু হয়েছে |
বিশ্বাস আর নির্ভরতা সে তার মাঝেই খুঁজতে থাকলো |
এখানেও বিধি বাম |
প্রতিনিয়ত বিরুদ্ধ পরিবেশের সাথে একা যুদ্ধ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছিলো অনামিকা |
যাকে আকড়ে ধরে তার বাঁচার কথা, চোখ বন্ধ করলেই সেই মানুষটাকে তার কাছে অভ্যাগত ছাড়া কিছুই মনে হয় না |
এভাবেই কয়েক বছর কেটে যাবার পর নিজের মধ্যে আরো একটি জীবনের অস্তিত্ব অনুভব করলো সে |
নির্দিষ্ট সময়ের পর অনামিকা হলো এক কন্যা সন্তানের মা |
মনে হয়েছিলো এবার বোধহয় একটু নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচা যাবে |
যাকে অভ্যাগত মনে হয় সে সত্যি সত্যিই আপন হয়ে উঠবে |
কিন্তু নাহ্, সন্তান যখন ঘুমিয়ে যায় তখন নির্ঘুম চোখে আকাশের পানে চেয়ে ঝলমলে তারাদের মাঝে আশ্রয় খুঁজতে হয় তাকে |
নিঃসঙ্গতায় পারদ ঢেলে আঁধার তাকে টেনে নিয়ে চলে আরও গহীন থেকে সীমাহীন গহীনে |
এভাবেই দিন কাটতে লাগলো তার |
অনামিকার স্বামী পরিবারের কথায় সিদ্ধান্ত নিলো দেশের বাইরে চলে যাবে |
স্ত্রী হয়েও এইসব তার সময়মতো জানার অধিকার বা উপায় কোনটাই ছিলো না |
ঘনিয়ে এলো সেই দিন, অতিথি পাখি এবার সত্যি সত্যিই উড়াল দিলো সুদূর সাইপ্রাসে |
সেসময় গ্রামে হাতে গুণা কয়েকজনের হাতে ফোন ছিলো |
বেশীরভাগ মানুষকেই কথা বলতে হতো দোকানে গিয়ে |
কলরেট ছিলো প্রতি মিনিট সাত টাকা |
সময়টা ছিলো ২০০৩-২০০৪ সাল |
সবাই যখন অতিথি পাখির সাথে কথা বলতো, আড়ালে দাঁড়িয়ে চোখ ভিজে উঠতো অনামিকার |
মনে হতো এবার হয়তো তার কথা বলবে, কিন্তু নাহ্ |
সবার কথা শেষ হলে মুঠোফোনটা কাজের ছেলেটাকে দিয়ে দোকানে পাঠিয়ে দেয়া হতো |
একদিন কী ভেবে জানি না অনামিকার ননাস (স্বামীর বড় বোন) সবার কথা শেষ হলে বলছিলো তার ভাইকে, "কিরে অনামিকার সাথে একবার কথা বল্ " |
পরক্ষণেই ছোট ভাগ্নিটা মোবাইলটা এনে অনামিকার হাতে দিলো |
হ্যালো, কেমন আছো? |
ভালো, তুমি কেমন আছো? |
তারপর নিবিড় নিরবতা আর কিছুটা চোখের জলে ভেসে গেলো তিরিশটি সেকেন্ড |
সেই সাড়ে তিনটাকায় কেনা তিরিশ মিনিটের যে ক্ষতটা বুকের মধ্যে হয়েছিলো, সময়ে অসময়ে এখনো তার থেকে রক্ত ঝরে |
এভাবেই একটু একটু করে অনামিকা হয়ে ওঠে এক অদৃশ্যমান পাথুরে মানবী |
সময়ের সাথে সাথে সন্তানও বড় হতে লাগলো |
অনামিকা সন্তান নিয়ে চলে আসে কর্মস্থল নেত্রকোণাতে |
এর আগে তাকে বদলী করা হয়েছিলো হাতিয়াতে |
অনেক কষ্টে, চেষ্টা-তদবীর করে সেই বদলী ফেরানো হয় |
ছোট চাকরীর কারণে যখন তখন বাইরে থাকতে হয় অনামিকাকে |
সন্তান, সংসার, চাকরী একা সামলানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে |
তাই সে বাড়ী থেকে কিছু সময়ের জন্য নিজের মাকে বাসায় নিয়ে আসে |
সুজয়া তার কলিগ সেই সাথে ভালো বন্ধুও |
কারণ একি কর্মস্থলে কাজের সুবাদে দু'জন একই মালিকের বাসায় ভাড়া থাকে |
তবে আলাদা আলাদা রুমে |
অনামিকার রুম ২টি |
একটিতে তার মা, অন্যটিতে তারা মা-মেয়ে |
একদিন বাজারের এক দোকানে গিয়ে অনামিকা তার স্বামীকে ফোন করলো সুজয়া পাশেই বসা |
দু'জনের মধ্যে কিছু কথা কাটাকাটি হয় |
একপর্যায়ে অনামিকা লাউডস্পিকারের ভলিয়ম বাড়িয়ে দেয়, তারপর যা শুনছিলো সুজয়া |
নিজের কানে না শুনলে হয়তো কোনদিনও তার বিশ্বাস হতো না |
এভাবেই অনামিকার ভাঙ্গা জীবনে একদিকে নিঃসঙ্গতা , অন্যদিকে নিজের দায় একা নিজেকেই বয়ে বেড়াতে হচ্ছিলো |
সুজয়া অনামিকার মুখের দিকে তাকায় আর ওর জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার মাঝেই সে যেনো নিজেকে দেখতে পায় |
অপমান, অবহেলা আর অবিচার যখন সীমা ছাড়িয়ে গেলো তখনি সে সবার কথার অবাধ্য হয়ে, এক যুগেরও বেশী সময় সংসার করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় |
এবং একসময় আইনিভাবে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায় |
সেই থেকে আলো আঁধারের পথে একমাত্র সন্তানের হাত ধরে তার নিঃসীম দিনাতিপাত |
সুজয়ার লেখার হাতটা একসময় মুটামুটি ভালোই ছিলো |
চর্চার অভাবে আর সময়ের ব্যবধানে তাতেও এখন জং ধরে গেছে |
সে ও অনেকটা জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়ে সবার কাছ হতে নিজেকে আড়াল করে চলতে পারলেই বরং বাঁচে |
আজ অনামিকার কথা রাখতে গিয়েই তাকে জীবনের গল্পটা লিখতে হচ্ছে |
আর লিখতে গিয়ে আজ এত বছর পর বড় অদ্ভূতভাবে সে লক্ষ করলো অনামিকার গল্পের পরতে পরতে যেনো লুকিয়ে আছে তার জীবনের বেদনাক্লিষ্ট সেইসব দিনগুলোও |
আর সেই কারণেই হয়তো এমন কঠিন কাজটা সে শত ব্যস্ততার মাঝেও করে যেতে পারছে অনায়াসে |
#বাইরে থেকে যতটা হাসিখুশী বা পরিপূর্ণ মনে হয় অনামিকাকে, ভেতর থেকে সে ততটাই নিঃস্ব এবং রিক্ত |
আগের চাকরীটা ছেড়ে নতুন আরেকটি প্রতিষ্ঠানে জয়েন করেছে সে |
কর্মস্থল গাজিপুর শহরে |
এই শহরে আসলেও নিবাস তার পিছু ছাড়ে নি |
কিন্তু অনামিকা কিছুতেই নিবাসের কথা রাখতে পারছিলো না |
এরই মধ্যে সে একটা এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনে ফেসবুক একাউন্ট ওপেন করেছে |
যতটা মনে পড়ে নিবাসেই তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিয়েছিলো |
তারপর তাদের কথা চলতে থাকে মেসেঞ্জারে |
আর নিবাস নেট বন্ধ পেলে নাম্বারে মেসেজ করতো নইলে কল্ করতো |
প্রতিবারেই তার কথা একটাই "আইলাভইউ" |
কতশতবার যে বলেছে তার কোন হিসেব নেই |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.