content stringlengths 0 129k |
|---|
আমি প্রেমিক |
এমনকি এখন যখন আমার নাতনিও প্রেমে পড়ার বয়সে এসে উপনীত, তখনো আমার প্রেম-তৃষ্ণা নিবৃত্ত হয়নি |
তাই আমি যে প্রেমের কবিতা লিখব, তা খুবই স্বাভাবিক |
আমার প্রেমের উৎ স আমি নিজেই |
উৎ স আমার বোধ, অভিজ্ঞতা |
প্রশ্ন: সাম্প্রতিক সময়ে খণ্ড কবিতার বদলে সিরিজ কবিতার প্রতি আপনার আগ্রহ লক্ষণীয় |
তবে শুধু প্রেমকে ভিত্তিভূমে রেখে একসঙ্গে এত কবিতার জন্ম বিস্ময়কর মনে হয় |
আপনার কী মত? |
সৈয়দ হক: বিস্ময়কর হচ্ছে, এখনো আমি নতুন নতুন ধারণা পাই |
এখনো আমি ২০ বছরের সবুজ তরুণ |
বাংলা কবিতা এখন এক কানাগলিতে এসে ঠেকেছে |
আমি মনে করি, দীর্ঘ কবিতার বিস্তৃত পরিসরে কবিতাকে ছড়িয়ে দিতে হয় |
একটি বিষয়কে অনেক আলোয় দেখতে হয় |
ভাস্কর্যকে যেমন নানা কোণ থেকে দেখা লাগে |
ভাস্কর্যের কোনো সম্মুখ নেই, পশ্চাৎ নেই - সবটাই প্রদর্শ্য |
বাংলা কবিতাকে এমনই নানা কোণ থেকে দেখা দরকার |
নানা আঙ্গিকে কাজ করা দরকার |
খণ্ড কবিতায় আমরা প্রচুর সময় দিয়েছি |
এখন প্রয়োজন দীর্ঘ ক্যানভাসে কাজ করা |
মরচে পড়া আঙ্গিক, তেতো হওয়া ভাষাকে পরিত্যাগ করে নতুন কবিতা কাঠামোর জন্ম দিতে হবে |
রবীন্দ্রনাথ এক জীবনে চার লাইনের কবিতা যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন ৪০০ লাইনের কবিতা |
নাট্যকাব্য-কাব্যনাট্য কত কিছু! হালকা প্রেমের কবিতা যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন 'তারকার আত্মহত্যা'র মতো কবিতা |
প্রশ্ন: ভালোবাসার রাতের উৎ সর্গপত্রে আপনি লিখেছেন? |
'আমার পায়ে বরফ ভেঙে চলার তুমি পথ |
ব্যপ্ত আমার সমতলের তুমিই পর্বত |
বোঝা যায় অজস্র পর্যটন শেষে কবি তাঁর তীর্থের সন্ধান পেয়েছেন |
সৈয়দ হক: পর্যটন তো বটেই |
কতগুলো বৈপরীত্যে পর্যটন |
আলো-অন্ধকার, পাহাড়-সমতল, পৌষ-বৈশাখ মিলিয়ে প্রেমের পূর্ণাঙ্গ রূপ আস্বাদনের অর্থে যদি বলি, তবে আমার তীর্থসন্ধান এখনো চলছে |
প্রশ্ন: ভালোবাসার রাতের ২২তম কবিতায় দেখছি অনন্তকাল কবির কাছে এক মুহূর্ত বলে প্রতিভাত |
আবার আরেকটি কবিতায় দেখছি প্রেমের মৌসুমে 'তখন' হয়ে যায় 'এখন' এবং 'এখন' হয়ে যায় 'তখন' |
প্রেম তবে কবিকে কালাকালহীন করে তোলে? |
সৈয়দ হক: নিশ্চয়ই |
প্রেমের প্রধান কাজ হচ্ছে কালচিহ্ন মুছে দেওয়া |
পিকাসোকে তাঁর ৭০ বছর বয়সে প্রেমে পড়তে দেখব |
প্রকৃত প্রেমে পতিত হলে ব্যক্তি স্বয়ং ভুলে যায় কোন কালে তার বাস |
প্রশ্ন: এক কবিতায় দেখা যাচ্ছে আপনার নারী প্রণতির ফুল চায় না |
চায় তাকে নিবেদিত পদাবলি |
বাস্তবেও কি তা-ই? |
সৈয়দ হক: 'দেওয়া-নেওয়া' কথাগুলো বহু ব্যবহূত হলেও হালকা নয় |
পারিতোষিক তো দিতে হয় প্রেমাস্পদকে |
প্রেমের ক্ষেত্রে কী পাওয়া গেল, তা বড় নয় |
কী দিতে পারছি তা-ই বড় হয়ে প্রতিভাত হয় |
প্রেমের ভেতরে শ্রদ্ধা আছে, স্নেহ, মায়া, মমতা, বন্ধুত্ব আছে |
প্রেম এসবের মিলিত রসায়ন |
শুধু দেহজ ব্যাপারে আবদ্ধ প্রেম পানসে হতে বাধ্য |
প্রশ্ন: আরেকটি কবিতায় আছে 'হূদয়-দেশে হূদয়ের দরজা এখনো খোলেনি' |
একে শুধু ব্যক্তিগত প্রেম-অপ্রেম হিসেবে নয় বরং আমরা কি বর্তমান হূদয়হীন সময় হিসেবেও ভাবতে পারি? |
সৈয়দ হক: অবশ্যই |
প্রেম হচ্ছে সে ধরনের উপভোগ, যা আমাকে উত্তোলিত করবে |
মানুষ প্রেমে পড়লে উত্তোলিত হয়, দৈর্ঘ্যে বাড়ে |
আমি আমার প্রেমের কবিতায় বারবার সে সর্বজনীন বিস্তারের কথা বলে আসছি |
আমি হূদয়হীন যুগে বসে আমাদের হূদয়ের দরজা খুলে যাওয়ার প্রতীক্ষায় থাকি |
প্রশ্ন: কবিতাগুলো ঢাকা, কক্সবাজার, সিলেট, চট্টগ্রাম, লন্ডন, দুবাই, নিউইয়র্কে লেখা |
দেশ-দেশান্তরে প্রেম আপনাকে তা হলে মুহুর্মুহু তাড়িয়ে বেড়ায়? |
সৈয়দ হক: আমি সব সময় লিখি |
ভ্রমণকালেও |
ভ্রমণও আমার প্রেম |
সেই ১৯৫৩ সালে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় কবিতা লেখার শুরু |
তার পর থেকে আমি সব সময় লিখি |
দেশ-দেশান্তরে কবিতাও আমার সঙ্গে চলে |
আমার কবিতার অনিবার্য বিষয় প্রেমও থাকে করোটিতে আমার ভ্রমণসঙ্গী হয়ে |
প্রশ্ন: 'তুমি-আমি'কেন্দ্রিক প্রেম পঙিক্তমালায় বাংলা কবিতা জীর্ণ |
আমরা কি প্রেমের কবিতায় নতুন কোনো মাত্রা পেতে পারি না? |
সৈয়দ হক: ভেবে দেখা উচিত |
আমি শুধু কবিতায় নয়, নৃত্যে, সংগীতে, চিত্রকলায় - সব শিল্পমাধ্যমে নিরীক্ষাকে গুরুত্ব দিই |
নতুন কিছুর জন্য দরজা খোলা রাখতে হবে |
প্রশ্ন: এক বিষয়ে বহু কবিতা রচনার ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করেন কি? |
সৈয়দ হক: আমি সচেতন থাকি |
সচেতনভাবে বলতে পারি আমি পুনরাবৃত্তি করিনি |
আমি বরং নিত্য পরিব্রাজক এবং সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রে সেটাই স্বাভাবিক |
নতুন সময়, নতুন পরিবেশ, নতুন সংকট, নতুন অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে নবায়ন করতে হয় |
প্রশ্ন: আপনি কবি |
ভাষামাধ্যমে প্রকাশ করেন অন্তরের সংবেদ |
আপনার কাছে কাব্যভাষা কি কবির অন্তর্গত আবেগ পুরোপুরি প্রকাশক্ষম? |
সৈয়দ হক: ভাষা তো বাহন মাত্র |
আমি ভাষাকে নিজস্ব অধিগত করতে চাই |
একদিকে ভাষা ভীষণ বলিবর্দ, অন্যদিকে আমার ভাবনাসমুদয় ভাষা সব সময় ধরতে পারে বলে মনে হয় না |
কবিকে অনবরত ভাষার সে রহস্য নিয়ে কাজ করতে হয় |
জয়নুল আবেদিন একদা আমাকে বললেন, 'এই যে গাছের সারির সবুজটি যতই আকাশের দিকে যাচ্ছে ততই নীল হয়ে যাচ্ছে |
' তো সাধারণ চোখে তা ধরা পড়ে না |
শিল্পীর চোখে রঙের এই রূপান্তর যেমন ধরা দেয়, কবির কাছেও তার ব্যবহার্য ভাষা নানা মাত্রায় ধরা দেয় |
ভাষার সীমাবদ্ধতা হয়তো কবিই দূর করতে পারেন তাঁর অনুভবের গাঢ়তার দ্বারা |
প্রশ্ন: 'তবুও শেষ আমার নয় |
তোমার উদ্দেশ ' |
প্রেমের দিকে আপনার পরিব্রাজনের তা হলে কোনো শেষ নেই? |
সৈয়দ হক: আসলেই শেষ নেই |
প্রতিদিনই নতুনভাবে এই পরিব্রাজন শুরু হচ্ছে |
কিন্তু কোথায় যে এর শেষ, তা বোধ হয় মানবজন্মে ঠাহর করা অসম্ভব |
নয়টি বোন ছিলেন, তাঁহারা ছন্দের দেবী |
গানের ছন্দ, কবিতার ছন্দ, নৃত্যের ছন্দ, সঙ্গীতের ছন্দ - সকলরকম ছন্দকলায় তাঁহাদের সমান কেহই ছিল না |
তাঁহাদেরই একজন, দেবরাজ জুপিটারের পুত্র আপোলোকে বিবাহ করেন |
আপোলো ছিলেন সৌন্দর্যের দেবতা, শিল্প ও সঙ্গীতের দেবতা |
তিনি যখন বীণা বাজাইয়া গান করিতেন তখন দেবতারা পর্যন্ত অবাক হইয়া শুনিতেন |
এমন বাপ-মায়ের ছেলে অর্ফিয়ুস যে গান-বাজনায় অসাধারণ ওস্তাদ হইবেন, সে আর আশ্চর্য কি? অর্ফিয়ুসের গুণের কথা দেশ-বিদেশ রটিয়া গেল - স্বয়ং আপোলো খুশী হইয়া তাঁহাকে নিজের বীণাটি দিয়া ফেলিলেন |
পাহাড়ে পর্বতে বনে জঙ্গলে অর্ফিয়ুস বীণা বাজাইয়া ফিরিতেন আর সমস্ত পৃথিবী স্তব্ধ হইয়া তাহা শুনিত |
অর্ফিয়ুসের বীণার সুরে আকাশ যখন ভরিয়া উঠিত, তখন সুরের আনন্দে গাছে গাছে ফুল ফুটিত, সমুদ্রের কোলাহল থামিয়া যাইত, বনের পশু হিংসা ভুলিয়া অবাক হইয়া পড়িয়া থাকিত |
এই রকমে দেশে দেশে বীণা বাজাইয়া অর্ফিয়ুস ফিরিতেছেন এমন সময় একদিন ইউরিডিস নামে এক আশ্চর্য সুন্দরী মেয়ে তাঁহার বীণার সুরে মোহিত হইয়া দেখিতে আসিলেন, কে এমন সুন্দর বাজায় |
ইউরিডিসকে দেখিবামাত্র অর্ফিয়ুসের মন প্রফুল্ল হইয়া উঠিল, তাঁহার আনন্দ বীণার ঝঙ্কারে ঝঙ্কারে আকাশকে মাতাইয়া তুলিল |
তন্ময় হইয়া সঙ্গীত শুনিতে শুনিতে ইউরিডিসের মন একেবারে গলিয়া গেল |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.