id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
1529
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
অঞ্জলিতে ছেলেবেলা
|
চিন্তামূলক
|
এই তো আমার অঞ্জলিতেই মস্ত পুকুর,
কেউ আচম্কা ছুঁড়লে ঢেলা
দেখতে থাকি কেমন করে প্রকাশ্য হয়
খুব নগণ্য ছেলেবেলা।
দর্পণে মুখ লগ্ন রেখে ছোট্ট খুকুর
এখন দিব্যি কাটে সময়।
কাটুক, এখন হাওয়ায় উড়ছে অনভ্যস্ত শাড়ির আঁচল,
অঞ্জলিতে টলটলে জল।
পৌঢ় বোঝে পৌঢ়তা কী, বৃদ্ধ বোঝে
বয়স বলতে কী ঝামেলা,
কিন্তু খুকু, এখন তুমি এতই অল্পবয়স্ক যে,
তোমার উপলব্ধিতে নেই ছেলেবেলা।
যখন থাকবে, তখন তুমি অনেক বড়,
কিন্তু, তখন আর-এক শীতে
নজর করলে দেখতে পাবে, কেমনতরো
জলের বর্ণ পালটে গেছে অঞ্জলিতে।
কেউ বলে জল, কেউ-বা স্মৃতি, কেউ-বা সময়,
কেউ আচম্কা ছুঁড়লে ঢেলা
হঠাৎ যেন একটু-একটু প্রকাশ্য হয়
খুব নগণ্য ছেলেবেলা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1567
|
1268
|
জীবনানন্দ দাশ
|
স্মৃতি
|
চিন্তামূলক
|
থমথমে রাত,- আমার পাশে বসল অতিথি,-
বললে,- আমি অতীত ক্ষুধা,-তোমার অতীত স্মৃতি!
-যে দিনগুলো সাঙ্গ হ’ল ঝড়বাদলের জলে,
শুষে গেল মেরুর হিমে,- মরুর অনলে,
ছায়ার মতো মিশেছিলাম আমি তাদের সনে;
তারা কোথায়?-বন্দি স্মৃতিই কাঁদছে তোমার মনে!
কাঁদছে তোমার মনের খাকে,- চাপা ছাইয়ের তলে,
কাঁদছে তোমার স্যাঁতস্যাঁতে শ্বাস-ভিজা চোখের জলে,
কাঁদছে তোমার মূক মমতার রিক্ত পাথার ব্যেপে,
তোমার বুকের খাড়ার কোপে,- খুনের বিষে ক্ষেপে!
আজকে রাতে কোন্ সে সুদূর ডাক দিয়েছে তারে,-
থাকবে না সে ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে!
মুক্তি আমি দিলেম তারে,-উল্লাসেতে দুলে
স্মৃতি আমার পালিয়ে গেল বুকের কপাট খুলে
নবালোকে,-নবীন উষার নহবতের মাঝে।
ঘুমিয়েছিলাম,- দোরে আমার কার করাঘাত বাজে!
-আবার আমায় ডাকলে কেন স্বপনঘোরের থেকে!
ওই লোকালোক-শৈলচূড়ায় চরণখানা রেখে
রয়েছিলাম মেঘের রাঙা মুখের পানে চেয়ে,
কোথার থেকে এলে তুমি হিমসরণি বেয়ে!
ঝিম্ঝিমে চোখ,- জটা তোমার ভাসছে হাওয়ার ঝড়ে,
শ্মশানশিঙা বাজল তোমার প্রেতের গলার স্বরে!
আমার চোখের তারার সনে- তোমার আঁখির তারা
মিলে গেল,-তোমার মাঝে আবার হলেম হারা!
-হারিয়ে গেলাম ত্রিশূলমূলে,- শিবের দেউলদ্বারে;
কাঁদছে স্মৃতি-কে দেবে গো-মুক্তি দেবে তারে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/920
|
1900
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
সূর্য ও সময়
|
চিন্তামূলক
|
হয়তো সূর্যের দোষে আমাদের রক্ত আর ততখানি অগ্নিবর্ণ নয়।
নিমের পাতার মতো নুয়ে গেছে হাত আর হাড়
কবে কবে কমণ্ডলু ভরে গেছে কার্তিকের হিমে, হাহাকারে।
যে-সব পাখিরা আগে মারা গেছে আকাশের আলোর উঠোনে ধান খুঁটে
সেই সব পাখিদের পালকের শতচ্ছিন্ন আঁশ
সেই সব পাখিদের দুবেলার কথাবার্তা, দুঃখ, দীর্ঘশ্বাস
বাতাসের ভিড় ঠেলে এখন ক্রমশ এসে আমাদেরই কাছে ঠাঁই চায়।
সবই কি সূর্যের দোষে? সময়েরও বহু দোষ ছিল।
সময়ের এক চোখে ছানি ছিল অবিবেচনার
জিরাফের গলা নিয়ে সে শুধু দেখেছে দীর্ঘ অট্টালিকা, কুতুবমিনার
দেখেছে জাহাজ শুধু, জাহাজের মাস্থলের কারা কারা মেসো পিসে খুড়ো
দেখেনি ধুলো বা বালি, ভাঙা টালি, কাঁথা-কানি, খড়, খুদ-কুঁড়ো
দেখেনি খালের পাড়ে, ঝোপে-ঝাড়ে, ছেঁড়া মাদুরিতে
আরও কি কি রয়ে গেছে, আরো কারা ঊর্ধ্বমুখী সূর্যমুখী হতে চেয়েছিল
কালবৈশাখীর ক্রদ্ধ বিরুদ্ধতা ঠেলে।
সময়েরই দোষে
আমাদের বজ্র থেকে সমস্ত আগুন খসে গেল
যে রকম বাগানের ইচ্ছে ছিল পাথরের, কাঁকরের বর্বরতা ভেঙে
যে রকম সাঁতারের ইচেছ ছিল জলে স্থলে সপ্তর্ষিমণ্ডলে
ক্রমে ক্রমে সূর্য ম্লান
ক্রমে ক্রমে সময়ের সমস্ত খিলান
পোকার জটিল গর্তে, ঘুণে, ঘুনে জীর্ণ হল বলে
সোজা ঘাড়ে শাল ফেলে সে রকম হাঁটা চলা বাকী হয়ে গেল।
আবার এমনও হতে পারে
আমাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত আলিঙ্গন, অঙ্গীকার, উষ্ণতার তাপ
কিছুই পায়নি বলে সূর্য ও সময়
প্রতিদিন নিজেদের সমুজ্জল প্রতিভাকে ক্ষয় করে করে,
বেদগানে যে রকম শোনা গিয়েছিল, তত অগ্নিবর্ণ নয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1263
|
4659
|
শামসুর রাহমান
|
গগদ্য সনেট_ ১২
|
চিন্তামূলক
|
হায়রে মন, না জেনে আমি, আপন খবর
তালাশ করি চেতন গুরু; আন্ধারে হোঁচট খেতে-খেতে
জনমভর দেখলাম না লালনেরে। হঠাৎ
কীসের ঝলক দিলো দিলে, শুনি গাঢ় মেঘের
আড়াল থেকে লালন কয়, ‘পাঠাস নাই তুই আমার
নামে পত্র কোনো; অনেককাল হেলার কাদায়
রেখেছিস ফেলে। কোতায় পাবো অচিন ডাকটিকিট?
কোথায় তেমন নীল ডাকরাক্স? কোথায় আপনি সাঁই?দোতারায় আলো-কুসুম ফুটিয়ে লালন
বলেন উদাস কণ্ঠস্বরে, ‘ফোটাতে চাস আনন্দকুসুম
শূন্য ডালে? তবে কেন একলা এলি আমার সন্ধানে জেল্লা-অলা
পোশাক পরে? হৃদয়রতন কোথায় রেখে এসেছিস কোন্
ঝরা পাতাদের কবরে? গৌরীকে ফেলে এসে সামান্যে
তারার হাটে, ওরে ক্ষ্যাপা, তুই অসামান্যের সুর বাজাবি?’
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/godyo-sonet-12/
|
3006
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গিন্নির কানে শোনা ঘটে অতি সহজেই
|
হাস্যরসাত্মক
|
গিন্নির কানে শোনা ঘটে অতি সহজেই
“গিনি সোনা এনে দেব’ কানে কানে কহ যেই।
না হলে তোমারি কানে দুর্গ্রহ টেনে আনে,
অনেক কঠিন শোনা– চুপ করে রহ যেই।’ (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ginni-kane-shona-ghote-oti-sohojei/
|
2735
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমি বদল করেছি আমার বাসা
|
ভক্তিমূলক
|
শ্রীমতী রানী দেবী কল্যাণীয়াসু ১
আমি বদল করেছি আমার বাসা।
দুটিমাত্র ছোটো ঘর আমার আশ্রয়।
ছোটো ঘরই আমার মনের মতো।
তার কারণ বলি তোমাকে।
বড়ো ঘর বড়োর ভান করে মাত্র,
আসল বড়োকে বাইরে ঠেকিয়ে রাখে অবজ্ঞায়।
আমার ছোটো ঘর বড়োর ভান করে না।
অসীমের প্রতিযোগিতার স্পর্ধা তার নেই
ধনী ঘরের মূঢ় ছেলের মতো।
আকাশের শখ ঘরে মেটাতে চাইনে;
তাকে পেতে চাই তার স্বস্থানে,
পেতে চাই বাইরে পূর্ণভাবে।
বেশ লাগছে।
দূর আমার কাছেই এসেছে।
জানলার পাশেই বসে বসে ভাবি--
দূর ব'লে যে পদার্থ সে সুন্দর।
মনে ভাবি সুন্দরের মধ্যেই দূর।
পরিচয়ের সীমার মধ্যে থেকেও
সুন্দর যায় সব সীমাকে এড়িয়ে।
প্রয়োজনের সঙ্গে লেগে থেকেও থাকে আলগা,
প্রতিদিনের মাঝখানে থেকেও সে চিরদিনের।
মনে পড়ে এক দিন মাঠ বেয়ে চলেছিলেম
পালকিতে অপরাহ্নে;
কাহার ছিল আটজন।
তার মধ্যে একজনকে দেখলেম
যেন কালো পাথরে কাটা দেবতার মূর্তি;
আপন কর্মের অপমানকে প্রতিপদে সে চলছিল পেরিয়ে
ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে পাখি যেমন যায় উড়ে।
দেবতা তার সৌন্দর্যে তাকে দিয়েছেন সুদূরতার সম্মান।
এই দূর আকাশ সকল মানুষেরই অন্তরতম;
জানলা বন্ধ, দেখতে পাইনে।
বিষয়ীর সংসার, আসক্তি তার প্রাচীর,
যাকে চায় তাকে রুদ্ধ করে কাছের বন্ধনে।
ভুলে যায় আসক্তি নষ্ট করে প্রেমকে,
আগাছা যেমন ফসলকে মারে চেপে।
আমি লিখি কবিতা, আঁকি ছবি।
দূরকে নিয়ে সেই আমার খেলা;
দূরকে সাজাই নানা সাজে,
আকাশের কবি যেমন দিগন্তকে সাজায়
সকালে সন্ধ্যায়।
কিছু কাজ করি তাতে লাভ নেই, তাতে লোভ নেই,
তাতে আমি নেই।
যে কাজে আছে দূরের ব্যাপ্তি
তাতে প্রতিমুহূর্তে আছে আমার মহাকাশ।
এই সঙ্গে দেখি মৃত্যুর মধুর রূপ, স্তব্ধ নিঃশব্দ সুদূর,
জীবনের চারদিকে নিস্তরঙ্গ মহাসমুদ্র;
সকল সুন্দরের মধ্যে আছে তার আসন, তার মুক্তি। ২
অন্য কথা পরে হবে।
গোড়াতেই বলে রাখি তুমি চা পাঠিয়েছ, পেয়েছি।
এতদিন খবর দিইনি সেটা আমার স্বভাবের বিশেষত্ব।
যেমন আমার ছবি আঁকা, চিঠি লেখাও তেমনি।
ঘটনার ডাকপিওনগিরি করে না সে।
নিজেরই সংবাদ সে নিজে।
জগতে রূপের আনাগোনা চলছে,
সেই সঙ্গে আমার ছবিও এক-একটি রূপ,
অজানা থেকে বেরিয়ে আসছে জানার দ্বারে।
সে প্রতিরূপ নয়।
মনের মধ্যে ভাঙাগড়া কত, কতই জোড়াতাড়া;
কিছু বা তার ঘনিয়ে ওঠে ভাবে,
কিছু বা তার ফুটে ওঠে চিত্রে;
এতদিন এই সব আকাশবিহারীদের ধরেছি কথার ফাঁদে।
মন তখন বাতাসে ছিল কান পেতে,
যে ভাব ধ্বনি খোঁজে তারি খোঁজে।
আজকাল আছে সে চোখ মেলে।
রেখার বিশ্বে খোলা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে, দেখবে ব'লে।
সে তাকায়, আর বলে, দেখলেম।
সংসারটা আকারের মহাযাত্রা।
কোন্ চির-জাগরূকের সামনে দিয়ে চলেছে,
তিনিও নীরবে বলছেন, দেখলেম।
আদি যুগে রঙ্গমঞ্চের সম্মুখে সংকেত এল,
"খোলো আবরণ।"
বাষ্পের যবনিকা গেল উঠে,
রূপের নটীরা এল বাহির হয়ে;
ইন্দ্রের সহস্র চক্ষু, তিনি দেখলেন।
তাঁর দেখা আর তাঁর সৃষ্টি একই।
চিত্রকর তিনি।
তাঁর দেখার মহোৎসব দেশে দেশে কালে কালে। ৩
অসীম আকাশে কালের তরী চলেছে
রেখার যাত্রী নিয়ে,
অন্ধকারের ভূমিকায় তাদের কেবল
আকারের নৃত্য;
নির্বাক অসীমের বাণী
বাক্যহীন সীমার ভাষায়, অন্তহীন ইঙ্গিতে।--
অমিতার আনন্দসম্পদ
ডালিতে সাজিয়ে নিয়ে চলেছে সুমিতা,
সে ভাব নয়, সে চিন্তা নয়, বাক্য নয়,
শুধু রূপ, আলো দিয়ে গড়া।
আজ আদিসৃষ্টির প্রথম মুহূর্তের ধ্বনি
পৌঁছল আমার চিত্তে,--
যে ধ্বনি অনাদি রাত্রির যবনিকা সরিয়ে দিয়ে
বলেছিল, "দেখো।"
এতকাল নিভৃতে
আপনি যা বলেছি আপনি তাই শুনেছি,
সেখান থেকে এলেম আর-এক নিভৃতে,
এখানে আপনি যা আঁকছি, দেখছি তাই আপনি।
সমস্ত বিশ্ব জুড়ে দেবতার দেখবার আসন,
আমিও বসেছি তাঁরই পাদপীঠে,
রচনা করছি দেখা।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ame-budal-karase-amar-basa/
|
190
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
অঘ্রানের সওগাত
|
প্রকৃতিমূলক
|
ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?
নবীন ধানের আঘ্রানে আজি অঘ্রান হ'ল মাৎ।
'গিন্নি-পাগল' চা'লের ফিরনী
তশতরী ভ'রে নবীনা গিন্নী
হাসিতে হাসিতে দিতেছে স্বামীরে, খুশীতে কাঁপিছে হাত।
শিরনী রাঁধেন বড় বিবি, বাড়ী গন্ধে তেলেসমাত!মিঞা ও বিবিতে বড় ভাব আজি খামারে ধরে না ধান।
বিছানা করিতে ছোট বিবি রাতে চাপা সুরে গাহে গান!
'শাশবিবি' কন, 'আহা, আসে নাই
কতদিন হ'ল মেজলা জামাই।'
ছোট মেয়ে কয়, 'আম্মা গো, রোজ কাঁদে মেজো বুবুজান!'
দলিজের পান সাজিয়া সাজিয়া সেজো-বিবি লবেজান!হল্লা করিয়া ফিরিছে পারার দস্যি ছেলের দল!
ময়নামতীর শাড়ী-পরা মেয়ে গয়নাতে ঝলমল!
নতুন পৈঁচি বাজুবন্দ প'রে
চাষা-বৌ কথা কয় না গুমোরে,
জারী গান আর গাজীর গানেতে সারা গ্রাম চঞ্চল!
বৌ করে পিঠা 'পুর'-দেওয়া মিঠা, দেখে জিভে সরে জল!মাঠের সাগরে জোয়ারের পরে লেগেছে ভাটির টান।
রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশীতে ঝুরিছে আমন ধান!
কৃষক-কন্ঠে ভাটিয়ালী সুর
রোয়ে রোয়ে মরে বিদায়-বিধুর!
ধান ভানে বৌ, দুলে দুলে ওঠে রূপ-তরঙ্গে বান!
বধূর পায়ের পরশে পেয়েছে কাঠের ঢেঁকিও প্রান!হেমন্ত-গায় হেলান দিয়ে গো রৌদ্র পোহায় শীত!
কিরণ-ধারায় ঝরিয়া পড়িছে সূর্য - আলো-সরিৎ!
দিগন্তে যেন তুর্কী-কুমারী
কুয়াশা-নেকাব রেখেছে উতারি'!
চাঁদের প্রদীপ জ্বালাইয়া নিশি জাগিছে একা নিশীথ,
নতুনের পথ চেয়ে চেয়ে হ'ল হরিৎ পাতারা পীত!নবীনের লাল ঝান্ডা উড়ায়ে আসিতেছে কিশলয়,
রক্ত নিশান নহে যে রে ওরা রিক্ত শাখার জয়!
'মুজদা' এনেছে অগ্রহায়ণ-
আসে নৌরোজ খোল গো তোরণ,
গোলা ভ'র রাখ সারা বছরের হাসি-ভরা সঞ্চয়।
বাসি বিছানায় জাগিতেছে শিশু সুন্দর নির্ভয়!
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/oghraner-swogat/
|
1807
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
কোন্ কথা মন্ত্র হবে
|
চিন্তামূলক
|
কোন কথা মন্ত্র হবে কেউ তা জানে না।
তবু তো ঘুমের কাছে বেচে দিতে পার না সিন্দুক।
কঠিন মৃগয়া ছেড়ে বিছানার বালিশে-তোশকে
লুকোতে পার না ধনুর্বাণ।
যেহেতু নিয়েছ বেছে ব্যাধের ভূমিকা
তোমাকে তো যেতে হবে দুর্গমের গৃঢ় অভ্যন্তরে
সময়ের শতজট, ভূল-হাতছানি ভেদ করে।
যে কোনো তপস্যা চায়
নতজানু শুচিতা ও শ্রম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1189
|
976
|
জীবনানন্দ দাশ
|
কখন সোনার রোদ নিভে গেছে
|
সনেট
|
কখন সোনার রোদ নিভে গেছে — অবিরল শুপুরির সারি
আঁধারে যেতেছে ডুবে — প্রান্তরের পার থেকে গরম বাতাস
ক্ষুধিত চিলের মতো চৈত্রের এ অন্ধকার ফেলিতেছে শ্বাস;
কোন চৈত্রে চলে গেছে সেই মেয়ে — আসিবে না করে গেছে আড়ি :
ক্ষীরুই গাছের পাশে একাকী দাঁড়ায়ে আজ বলিতে কি পারি
কোথাও সে নাই এই পৃথিবীতে তাহার শরীর থেকে শ্বাস
ঝরে গেছে বলে তারে ভুলে গেছে নক্ষত্রের অসীম আকাশ,
কোথাও সে নাই আর — পাব নাকো তারে কোনো পৃথিবী নিঙাড়ি?এই মাঠে — এই ঘাসে ফল্সা এ-ক্ষীরুয়ে যে গন্ধ লেগে আছে
আজও তার যখন তুলিতে যাই ঢেঁকিশাক — দুপুরের রোদে
সর্ষের ক্ষেতের দিকে চেয়ে থাকি — অঘ্রাণে যে ধান ঝরিয়াছে
তাহার দু-এক গুচ্ছ তুলে নিই, চেয়ে দেখি নির্জন আমোদে
পৃথিবীর রাঙা রোদে চড়িতেছে আকাঙ্ক্ষায় চিনিচাঁপা গাছে —
জানি সে আমার কাছে আছে আজো — আজো সে আমার কাছে কাছে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kokhon-sonar-rod-nobhe-gese/
|
2748
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আরো আঘাত সইবে আমার
|
ভক্তিমূলক
|
আরো আঘাত সইবে আমার
সইবে আমারো,
আরো কঠিন সুরে জীবনতারে ঝংকারো।
যে রাগ জাগাও আমার প্রাণে
বাজে নি তা চরমতানে,
নিঠুর মূর্ছনায় সে গানে
মূর্তি সঞ্চারো।লাগে না গো কেবল যেন
কোমল করুণা,
মৃদু সুরের খেলায় এ প্রাণ
ব্যর্থ কোরো না।
জ্বলে উঠুক সকল হুতাশ,
গর্জি উঠুক সকল বাতাস,
জাগিয়ে দিয়ে সকল আকাশ
পূর্ণতা বিস্তারো।৪ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aro-aghat-soibe-amar/
|
2048
|
মহাদেব সাহা
|
অস্তমিত কালের গৌরব
|
চিন্তামূলক
|
কেমন উদ্ভট উল্টোপাল্টা হাওয়া,
যেন ঝরে যায় সব মানবিক মূল্যবোধ, ইতিহাসের
স্বর্ণাক্ষরে লেখা একেকটি পাতা।
এ কী দৈত্যপুরী থেকে যুদ্ধ জয় করে ফিরে-আসা
লালকমল ও নীলকমলের মুখ
অকষ্মাৎ ভীষণ পান্ডুর বর্ণ হয়ে ওঠে
হঠাৎ গোলাপচারাগুলো এ কী ঢলে পড়ে,
জুই আর চন্দ্রমল্লিকার বন
এ কেমন ছেয়ে যায় ফণিমনসার ঝাড়ে;
কবিতার প্রিয় পান্ডুলিপি জুড়ে
হঠাৎ কেমন ধূসর কুয়াশা নেমে আসে,
প্রেমিকার উষ্ণ হাত মনে হয় যেন নিরুত্তাপ, অনুভূতিহীন
এ কী শীমপ্রাসাদে আবার জমে বরফের স্তুপ;
আর তাতে ঢাকা পড়ে যায় মানুষের
আশা ও স্বপ্নের মুখ, ধসে পড়ে
তার সব মহিমা ও কীর্তির মিনার।
বিশ শতকের এই গোধূলিবেলায় এ কেমন এলোমেলো ধূলিঝড়
এ কেমন সমস্ত আকাশ ছেয়ে কালো মেঘের আঁধার
কিছুই পড়ে না চোখে, কোনো আলো,
কোনে উজ্জ্বলতা-
মনে হয় বুখি এই গোধূলিতে অস্তমিত কালের গৌরব।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/365
|
2559
|
রফিক আজাদ
|
নত হও, কুর্নিশ করো
|
মানবতাবাদী
|
হে কলম, উদ্ধত হ’য়ো না, নত হও, নত হতে শেখো,
তোমার উদ্ধত আচরনে চেয়ে দ্যাখো, কী যে দু:খ
পেয়েছেন ভদ্রমহোদয়গণ,অতএব, নত হও, বিনীত ভঙিতে করজোড়ে
ক্ষমা চাও, পায়ে পড়ো, বলো: কদ্যপি এমনটি হবে না, স্যার,
বলো: মধ্যবিত্ত হে বাঙালী ভদ্রমহোদয়গণ,
এবারকার মতো ক্ষমা করে দিন…হে আমার প্রিয় বলপেন, দ্যাখো , চোখ তুলে তোমার সামনে
কেমন সুন্দর সুবেশ পরিপাটি ভদ্রলোক খুব অভিমানে
ফুলো-গালে দাঁড়িয়ে আছেন
তোমার অভদ্র আচরনে, উচ্চারণ-অযোগ্য তোমার শব্দ-
ব্যবহারে বড়োই আহত, সুরুচিতে তার দারুন লেগেছে
তোমার ঐ অপ্রিয় কথন,
ওরা কী ক’রে সইবেন বলো,
অতএব, গড় হও, কুর্নিশ করো মধ্যবিত্ত সুরুচিকে:
তারাই তো শাসন করছেন তোমার দেশ, তোমার কাল
বলতে গেলে ওরাই তো দেশকাল; বলো হে কলম, হে বলপেন, হে আমার বর্বর প্রকাশ-ভঙিমা-
এই নাকে খত দিচ্ছি আর কখনো গালমন্দ পারবো না,
আপনাদের ভন্ডামিকে শ্রদ্ধা করতে শিখবো,
আপনাদের অপমান হজম করার অপরিসীম ক্ষমতাকে সম্মান করবো,
আর কোনোদিন এমনটি হবে না, হে মহামান্য মধ্যবিত্ত রুচিবোধ,
আপনাদের মতো সব অপমান হজম ক’রে এখন থেকে,
নাইট সয়েল বানিয়ে ফেলে দেবো শরীরের বাইরে-
হে বন্য লেখনী, হে অমোচনীয় কালি, হে ইতর বলপেন,
নত হও, নত হতে শেখো…
শান্ত হও, ভদ্র হও ভদ্রলোকদের মতো
আড়াল করতে শেখো অপ্রিয় সত্যকে,
প্রিয় মিথ্যা বলা শিখে নাও, বিক্রি করে দাও তোমার বিবেক-
উচ্চারন কোরো না এমন শব্দ, যা শুনে আহত হবেন তাঁরা-
নত হও, নত হ’তে শেখো;
তোমার পেছনে রয়েছে যে পবিত্র বর্বর মন ও মস্তিস্ক
তাকে অনুগত দাসে পরিণত হ’তে বলো,
হে আমার অবাধ্য কলম, ক্রোধ সংবরণ করো,
ভদ্রলোকের মতো লেখো, ভদ্রলোকদের দ্বারে ধর্না দিও-
শিখে নাও সাজানো-গোছানো প্রভুপ্রিয় বাক্যাবলি…হে অনার্য লেখনী আমার, সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দাও,
বলো, মহোদয়, গরীব চাষার ছেলে আমি
বেয়াদবি হয়ে গেছে মাফ ক’রে দিন,
ঘুমের ব্যাঘাত হয় আপনাদের এমন কর্মটি আর
কক্ষনো ভুলেও করবো না ..হে আমার ককর্শ কলম, ভদ্র হও, সুমসৃণ হও-
এতোদিন ধ’রে এতো যে শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ
সমস্ত সমাজ তোমাকে দিলো, সব ব্যর্থ হ’য়ে গ্যালো?
এতোটা বছর তোমাকে যে র্যাঁদা মারা হলো
তবে তা কিসের জন্যে
তোমার অভদ্র আচরণ সহ্য করবার জন্যে?
এই চমৎকার সমাজ ও সময়ের যোগ্য হ’য়ে ওঠো,
ভোঁতা হ’তে শেখো,
হে অপ্রিয় উচ্চারণ, বোবা হয়ে যাও, কালা হ’য়ে যাও-
প্রতবাদ কোরো না;
মেনে নাও সবকিছু, মেনে নিতে শেখো,
মেরুদন্ড বাঁকা ক’রে ফ্যালো,
সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আর চেষ্টা পর্যন্ত কোরো না,
হে কলম, হে প্রিয় বলপেন, নত হও
নম্র হ’তে শেখো আর স্বভাব পাল্টাও-
যেমন চলছে তেমনটি চলতে দাও,
খবর্দার প্রতিবাদ করবে না,
কাপ করতে ব্লা হ’লে রা’টি কাড়বে না –হে অমোচনীয় কালিভরা প্রিয় কলম আমার,
বড় বাড় বেড়েছে তোমার আজকাল,
গত দশ বছরে তোমার আচরণ হয়েছে আপত্তিকর,
আগে তো এমন তুমি কখনো ছিলে না,
চমৎকার ছেলেমানুষি স্বভাব ছিলো;
সামান্য জৈন্তা ছিলো তোমার লেখায়,
সবাই তো মিষ্টি হেসে মেনে নিয়েছিলো,
ভালোই তো ছিলো সেটা,
হঠাৎ কেন যে হ’লো তোমার দুর্মতি
ক্ষুধা পেলে ভাত চাও,হওয়া-খাওয়া পছন্দ করো না,
শ্যামল বাংলাদেশে কর্মে মরুভূমি বিস্তারিত
হচ্ছে ব’লে চীৎকার করো,
পদ্য লেখা ভুলে গিয়ে প্রতিবাদ লেখো-
এমনটি চলবে না, আর চলতে দেয়া যায় না…হে কলম, এইবার নত হও, নতজানু হও,
শিখে নাও শিক্ষিত শিম্পানজিদের আচরন-বিধি,
অতএব, নত হও, নত হ’তে শেখো, নতজানু হও।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1609.html
|
1083
|
জীবনানন্দ দাশ
|
পঁচিশ বছর পরে (মাঠের গল্প)
|
প্রকৃতিমূলক
|
শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে-
বলিলামঃ ‘ একদিন এমন সময়
আবার আসিও তুমি- আসিবার ইচ্ছা যদি হয়;
পঁচিশ বছর পরে ।‘
এই ব’লে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে;
তারপর, কতবার চাঁদ আর তারা,
মাঠে- মাঠে মরে গেল, ইঁদুর – পেঁচারা
জ্যোৎস্নায় ধানক্ষেত খুঁজে
এল-গেল ! – চোখ বুজে
কতবার ডানে আর বাঁয়ে
পড়িল ঘুমায়ে
কত- কেউ !- রহিলাম জেগে
আমি একা- নক্ষত্র যে বেগে
ছুটিছে আকাশ,
তার চেয়ে আগে চ’লে আসে
যদিও সময়,-
পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয় !-
তারপর- একদিন
আবার হলদে তৃণ
ভ’রে আছে মাঠে –
পাতায় , শুকনো ডাঁটে
ভাসিছে কুয়াশা
দিকে- দিকে, - চড়ুয়ের ভাঙা বাসা
শিশিরে গিয়েছে ভিজে, - পথের উপর
পাখির ডিমের খোলা , ঠাণ্ডা – কড়কড় !
শসাফুল , - দু-একটা নষ্ট শাদা শসা,-
মাকড়ের ছেঁড়া জাল, - শুকনো মাকড়সা
লতায়- পাতায়;-
ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে পথ চেনা যায়;
দেখা যায় কয়েকটা তারা
হিম আকাশের গায়,- ইঁদুর – পেঁচারা
ঘুরে যায় মাঠে – মাঠে , ক্ষুদ খেয়ে ওদের পিপাসা আজো মেটে,
পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে !
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/872
|
475
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
যুগান্তরের গান
|
স্বদেশমূলক
|
বলো ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ
নবযুগ ওই এল ওই
এল ওই রক্ত-যুগান্তর রে।
বলো জয় সত্যের জয়
আসে ভৈরব-বরাভয়
শোনো অভয় ওই রথ-ঘর্ঘর রে॥
রে বধির! শোন পেতে কান
ওঠে ওই কোন্ মহা-গান
হাঁকছে বিষাণ ডাকছে ভগবান রে।
জগতে জাগল সাড়া
জেগে ওঠ উঠে দাঁড়া
ভাঙ পাহারা মায়ার কারা-ঘর রে।
যা আছে যাক না চুলায়
নেমে পড় পথের ধুলায়
নিশান দুলায় ওই প্রলয়ের ঝড় রে।
সে ঝড়ের ঝাপটা লেগে
ভীম আবেগে উঠনু জেগে
পাষাণ ভেঙে প্রাণ-ঝরা নির্ঝর রে।
ভুলেছি পর ও আপন
ছিঁড়েছি ঘরের বাঁধন
স্বদেশ স্বজন স্বদেশ মোদের ঘর রে।
যারা ভাই বদ্ধ কুয়ায়
খেয়ে মার জীবন গোঁয়ায়
তাদের শোনাই প্রাণ-জাগা মন্তর রে।
ঝড়ের ঝাঁটার ঝাণ্ডার নেড়ে
মাভৈঃ-বাণীর ডঙ্কা মেরে
শঙ্কা ছেড়ে হাঁক প্রলয়ংকর রে।
তোদের ওই চরণ-চাপে
যেন ভাই মরণ কাঁপে,
মিথ্যা পাপের কণ্ঠ চেপে ধর রে।
শোনা তোর বুক-ভরা গান,
জাগা ফের দেশ-জোড়া প্রাণ,
যে বলিদান প্রাণ ও আত্মপর রে॥
মোরা ভাই বাউল চারণ,
মানি না শাসন বারণ
জীবন মরণ মোদের অনুচর রে।
দেখে ওই ভয়ের ফাঁসি
হাসি জোর জয়ের হাসি,
অ-বিনাশী নাইকো মোদের ডর রে!
গেয়ে যাই গান গেয়ে যাই,
মরা-প্রাণ উটকে দেখাই
ছাই-চাপা ভাই অগ্নি ভয়ংকর রে॥
খুঁড়ব কবর তুড়ব শ্মশান
মড়ার হাড়ে নাচাব প্রাণ
আনব বিধান নিদান কালের বর রে।
শুধু এই ভরসা রাখিস
মরিসনি ভিরমি গেছিস
ওই শুনেছিস ভারত-বিধির স্বর রে।
ধর হাত ওঠ রে আবার
দুর্যোগের রাত্রি কাবার,
ওই হাসে মা-র মূর্তি মনোহর রে॥(বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/jugantorer-gan/
|
2905
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কালো মেঘ আকাশের তারাদের ঢেকে
|
নীতিমূলক
|
কালো মেঘ আকাশের তারাদের ঢেকে
মনে ভাবে, জিত হল তার।
মেঘ কোথা মিলে যায় চিহ্ন নাহি রেখে,
তারাগুলি রহে নির্বিকার। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kalo-megh-akasher-tarader-dheke/
|
4844
|
শামসুর রাহমান
|
দুপুর, তুমি এবং পাখি
|
প্রেমমূলক
|
দুপুরটার যেন গায়ে হলুদ আজ। আমি জানি, একটু পরেই তুমি
নরম পায়ে তোমাদের দোলনায় ছায়াটে বারান্দায় এসে বসবে।
দৃষ্টি ছড়িয়ে দেবে সামনের দিকে, চোখে পড়বে একটি কি দু’টি
ছুটন্ত মোটারকার, রিক্শা। কোনও কোনও পথচারীও হবেন দৃশ্যমান।
এরই মধ্যে হয়তো আমার কথা ভাববে তুমি দূরের গাছটির প্রতি
মনোযোগী হয়ে। হয়তো তোমার কোনও বান্ধবীকে আজ টেলিফোন
না করার লজ্জা তোমাকে খানিক বিব্রত করবে, একটু পরে চোখ
ফেরাতেই তুমি হঠাৎ আবিষ্কার করবে তোমার খুব কাছে একটি পাখিকে।
তোমাকে আমার একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্যে পাখিকে জানিয়েছিলাম।
বিনীত অনুরোধ। ওকে বলেছি, ‘তোমাদের কথা এত লিখেছি, তার
বিনিময়ে তুমি কি আমার দয়িতার কাছে বয়ে নিয়ে যাবে না একটি
বার্তা?’ আমার কণ্ঠস্বরে আকুলতা পাঠ করে পাখি তার পাখা ছড়িয়ে
দেয় আমার সামনে। আমি প্রসারিত পাখায় লিখলাম, ‘আজ সন্ধ্যায়
এসো, প্রতীক্ষায় থাকব। তুমি এখন নিশ্চয় পড়ে উঠতে পেরেছ বিহঙ্গবাহিত
লিপি। মনে-মনে বলছ, ‘কবির আদিখ্যেতা দেখে বাঁচিনে; টেলিফোন না
করে পাখির পালকে খবর পাঠিয়েছেন। এক সময় বার্তাবাহক পক্ষীটিকে
তুমি আদর বুলোতে থাকবে। সেই স্পর্শ আমাকেই প্রজ্বলিত করবে আর
আমি লেখার টেবিলে বসে একটি প্রেমের কবিতা লেখার জন্যে শব্দের
ঝর্ণাধারাকে ডেকে আনব খাতায় পাতায়, ভাসব আনন্দ-প্লাবনে। (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dupur-tumi-ebong-pakhi/
|
4118
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
আমি আজ ক্লান্ত
|
প্রেমমূলক
|
চারিদিকে শুধু কষ্ট আর কষ্ট
আমি আর পারছিনা
কষ্টের ভারে আমি আজ ক্লান্ত।
হাজার ফুলের গন্ধ
চাঁদের সেই হাসি মাখা মুখ
কিছুই যেন আজ
আমাকে করতে পারছেনা শান্ত
কারন আমি আর পারছি না
কষ্টের ভারে আমি আজ ক্লান্ত।
ভোরবেলা পাখিদের গান
নিশি রাতে বাঁশিওয়ালার সেই তান
ভাটির টানে মাঝিদের গান
সবই যেন আজ বন্ধ
গাছের পাতায় নেই কোন নাড়া
নদীতে নেই সেই কলকল শব্দ
সবই যেন আজ স্তব্দ
কারন আমি আর পারছিনা
কষ্টের ভারে আমি আজ ক্লান্ত।
আকাশে মেঘের ভার
বাতাসে ঝড়ের শব্দ
সাগরে উঠেছে ঢেউ
হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না কেউ
আমি এখন কি করে হব শান্ত
কারন আমি আর পারছিনা
কষ্টের ভারে আমি আজ ক্লান্ত।
বিকেল বেলা মাঠের ধারে
সহপাঠীদের উল্লাস
বৃষ্টি ভেজা সবুজ ঘাসে
কাক শালিকের পাখা মেলে বিচরণ
সন্ধার আগে পশ্চিম আকাশে
গোধূলি লগন
উঠানে বসে গায়ের বধূদের
উকুন মারা, আর খেক শিয়ালের গল্প
সবই যেন আজ একেবারে বন্ধ
কারন আমি আর পারছিনা
কষ্টের ভারে আমি আজ ক্লান্ত।
সবাই বলে আর একটু ধৈর্য ধর
আর একটু অপেক্ষা কর
এক সময় হবেই হবে তুমি শান্ত।
যেদিন মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পরবে
যেদিন পায়ের উপর উল্কা পিন্ড পরবে
আমি সেদিন ঠিকই হব শান্ত
আর সেদিনই কেটে যাবে আমার
জীবনের সকল ভারাক্রান্ত
কারন আমি আর পারছিনা
কষ্টের ভারে আমি আজ ক্লান্ত।।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2172.html
|
3386
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
পাড়ায় আছে ক্লাব
|
চিন্তামূলক
|
পাড়ায় আছে ক্লাব,
আমার একতলার ঘরখানা
দিয়েছি ওদের ছেড়ে।
কাগজে পেয়েছি প্রশংসাবাদ,
ওরা মীটিং করে আমাকে পরিয়েছে মালা।
আজ আট বছর থেকে
শূন্য আমার ঘর।
আপিস থেকে ফিরে এসে দেখি
সে ঘরের একটা ভাগে
টেবিলে পা তুলে
কেউ পড়ছে খবরের কাগজ,
কেউ খেলছে তাস,
কেউ করছে তুমুল তর্ক।
তামাকের ধোঁয়ায়
ঘনিয়ে ওঠে বদ্ধ হাওয়া,
ছাইদানিতে জমতে থাকে,
ছাই, দেশলাইকাঠি,
পোড়া সিগারেটের টুকরো।
এই প্রচুর পরিমাণ ঘোলা আলাপের
গোলামাল দিয়ে
দিনের পর দিন
আমার সন্ধ্যার শূন্যতা দিই ভরে।
আবার রাত্তির দশটার পরে
খালি হয়ে যায়
উপুড়-করা একটা উচ্ছিষ্ট অবকাশ।
বাইরে থেকে আসে ট্র৻ামের শব্দ,
কোনোদিন আপন মনে শুনি
গ্রামোফোনের গান,
যে কয়টা রেকর্ড আছে
ঘুরে ফিরে তারি আবৃত্তি।
আজ ওরা কেউ আসে নি;
গেছে হাবড়া স্টেশনে
অভ্যর্থনায়;
কে সদ্য এনেছে
সমুদ্রপারের হাততালি
আপন নামটার সঙ্গে বেঁধে।
নিবিয়ে দিয়েছি বাতি।
যাকে বলে "আজকাল'
অনেকদিন পরে
সেই আজকালটা, সেই প্রতিদিনের নকীব
আজ নেই সন্ধ্যায় আমার ঘরে।
আটবছর আগে
এখানে ছিল হাওয়ায়-ছড়ানো যে স্পর্শ,
চুলের যে অস্পষ্ট গন্ধ,
তারি একটা বেদনা লাগল
ঘরের সব কিছুতেই।
যেন কী শুনব বলে
রইল কান পাতা;
সেই ফুলকাটা ঢাকাওয়ালা
পুরোনো খালি চৌকিটা
যেন পেয়েছে কার খবর।
পিতামহের আমলের
পুরোনো মুচকুন্দ গাছ
দাঁড়িয়ে আছে জানলার সামনে
কৃষ্ণ রাতের অন্ধকারে।
রাস্তার ওপারের বাড়ি
আর এই গাছের মধ্যে যেটুকু আকাশ আছে
সেখানে দেখা যায়
জ্বলজ্বল করছে একটি তারা।
তাকিয়ে রইলেম তার দিকে চেয়ে,
টনটন করে বুকের ভিতরটা।
যুগল জীবনের জোয়ার জলে
কত সন্ধ্যায় দুলেছে ঐ তারার ছায়া।
অনেক কথার মধ্যে
মনে পড়ছে ছোট্ট একটি কথা।
সেদিন সকালে
কাগজ পড়া হয়নি কাজের ভিড়ে;
সন্ধ্যেবেলায় সেটা নিয়ে
বসেছি এই ঘরেতেই,
এই জানলার পাশে
এই কেদারায়।
চুপি চুপি সে এল পিছনে
কাগজখানা দ্রুত কেড়ে নিল হাত থেকে।
চলল কাড়াকাড়ি
উচ্চ হাসির কলরোলে।
উদ্ধার করলুম লুঠের জিনিস,
স্পর্ধা করে আবার বসলুম পড়তে।
হঠাৎ সে নিবিয়ে দিল আলো।
আমার সেদিনকার
সেই হার-মানা অন্ধকার
আজ আমাকে সর্বাঙ্গে ধরেছে ঘিরে,
যেমন করে সে আমাকে ঘিরেছিল
দুয়ো-দেওয়া নীরব হাসিতে ভরা
বিজয়ী তার দুই বাহু দিয়ে,
সেদিনকার সেই আলো-নেবা নির্জনে।
হঠাৎ ঝরঝরিয়ে উঠল হাওয়া
গাছের ডালে ডালে,
জানলাটা উঠল শব্দ করে,
দরজার কাছের পর্দাটা
উড়ে বেড়াতে লাগল অস্থির হয়ে।
আমি বলে উঠলেম,
"ওগো, আজ তোমার ঘরে তুমি এসেছ কি
মরণলোক থেকে
তোমার বাদামি রঙের শাড়িখানি পরে?"
একটা নিঃশ্বাস লাগল আমার গায়ে,
শুনলেম অশ্রুতবাণী,
"কার কাছে আসব?"
আমি বললেম,
"দেখতে কি পেলে না আমাকে?"
শুনলেম,
"পৃথিবীতে এসে
যাকে জেনেছিলেম একান্তই,
সেই আমার চিরকিশোর বঁধু
তাকে তো আর পাইনে দেখতে
এই ঘরে।"
শুধালেম, "সে কি নেই কোথাও?"
মৃদু শান্তসুরে বললে,
"সে আছে সেইখানেই
যেখানে আছি আমি।
আর কোথাও না।"
দরজার কাছে শুনলেম উত্তেজিত কলরব,
হাবড়া স্টেশন থেকে
ওরা ফিরেছে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/paray-achha-kalab/
|
4556
|
শামসুর রাহমান
|
কবির জীবন
|
সনেট
|
কবির জীবন নয় পুষ্পছাওয়া পথ, পেরেকের
মতো কাঁটা সর্বত্র ছড়ানো, এমনকি অগ্নিময়
পথ অতিক্রম করে তাকে বহুদূর যেতে হয়
বিপদের সঙ্গে লড়ে, অন্তহীন কায়ক্লেশ, ঢের
মনোকষ্ট সয়ে, সাপ ফুঁসে ওঠে গহন বনের
ছায়াচ্ছন্ন ছমছমে পথে আর ক্ষণে ক্ষণে ভয়
সমুখে হাজির হয় নানা রূপে। এ বিপত্তি জয়
করতে ব্যর্থ হলে তাকে টেনে নেবে কালি পাতালের।এঁদো ডোবা প্রায় ফুসফুস, মেটে রঙ কফ, জ্বর,
উচ্চ রক্তচাপ, স্মৃতিবিভ্রম ইত্যাদি নিয়ে কবি
খাতাকে পরাবে রত্নহার বারবার, এ প্রত্যাশা
অনেকের; ব্যর্থ হোক সব নিন্দুকের বাক্যঝড়
উপেক্ষায়, প্রশংসায় নির্বিকার আঁকবে সে ছবি,
অর্ফিউস-এর ছিন্ন মস্তকের গান হবে ভাষা। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobir-jibon/
|
1185
|
জীবনানন্দ দাশ
|
রাত্রি (আলোপৃথিবী)
|
প্রেমমূলক
|
অইখানে কিছু আগে- বিরাট প্রাসাদে- এক কোণে
জ্ব'লে যেতেছিল ধীরে এক্সটেন্শন্ লেকচারের আলো।
এখন দেয়ালে রাত- তেমন ততটা কিছু নয়;
পথে পথে গ্যাসলাইট র'য়েছে ঝাঁঝালো
এখনো সূর্যের তেজ উপসংহারের মত জেগে।
এখনো টঙ্গে চ'ড়ে উপরের শেলফের থেকে
বই কি বিবর্ণ কীট- ধুলো- মাকড়সা বার হবে
দোকানের সেলস্ম্যান চুপে ভেবে দেখে।
এখনো নামেনি সেই নির্জন রিকশগুলো- নিয়ন্তার মত,
সমূহ ভীড়ের চাপে র'য়েছে হারায়ে।
অজস্র গলির পথে একটি মানুষ
যুগপৎ র'য়েছে দাঁড়ায়ে;
পৃথিবীর সকলের হৃদয়ের প্রতীকের মত;
এই রাত থেকে আরো অধিক গভীরতর রাতে
কলুটোলা- পাথুরিয়াঘাটা- মির্জাপুরে
এসপ্লানেডের ফুটপাতে
মালাঙ্গা লেনের পথে- ক্রিক রো'তে
ককবার্ন লেনের ভিতরে
এক জোড়া শিঙ যদি দেখা দেয় লোকটার টাকে-
পরচুলা চুরি ক'রে নিয়ে গেছে তবে যাদুকর।
এখানে রাত্রির পারে তোমার নিকট থেকে আমি
চ'লে গেলে
চ'লে যাব;-
পৃথিবীর কাছ থেকে নয়;
রাত্রি এই সারারাত জীবনের সকল বিষয়
হয়ে আছে।
তিত্তিরাজ গাছ থেকে শিশির নীরবে
ঝরে যায়;
ডানার আঘাতে যায় কাকদম্পতীর;
হলুদ খড়ের পরে ঝ'রে পড়ে আবার শিশির
হাওয়ার গুঁড়ির মত।
কোথায় হারায়ে তুমি গিয়েছ কখন।
মাথার উপরে সব নক্ষত্রেরা ছুরির মত বিচক্ষণ
সময়ের সূতো কেটে- অবিরাম সময়ের সূতো কেটে ফেলে
আমার চোখের পরে রাত্রির প্রাঞ্জলতা ঢেলে;
কোথাও বাতাবী উষ্ণ হয়ে ওঠে- ঘুরে যায় মাকরসাপোকার লাটিম,
ভাঁড় হাসে,- সম্রাজ্ঞীর অবয়ব হয়ে থাকে হিম;
নদীরা শিশুর মত- শিশুরা নদীর মত দূর;
স্বর্গের কিনারে গিয়ে ভিড় আর ভিখিরির নীল আলো করে টিমটিম।
শিশুর কপাল থেকে বেজে ওঠে নরকের বিচিত্র ডিন্ডিম।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ratrii/
|
5052
|
শামসুর রাহমান
|
ব্যবধান
|
প্রেমমূলক
|
একদা আমাকে তুমি দিয়েছিলে ঠাঁই মমতায়।
আমিও তোমাকে
দিনের সোনালী ছটা রাত্রির মায়াবী কত নিমগ্ন প্রহর
করেছি অর্পণ। আজ আমি তোমার সান্নিধ্য থেকে দূরে
পড়ে আছি অসহায়। তুমি ডাকলেও
পারি না নিকটে যেতে। আমাদের মাঝখানে মরু
শত মরীচিকা আর অজস্র নিশীর্ণ হাড় নিয়ে
ব্যাপ্ত রাত্রিদিন, মাঝে মাঝে
তোমার আভাস পাই অগণিত ওষ্ঠে। বেলা যায়,
বেলা যায়, সময় আমাকে দেয় প্রবীণের সাজ।যদি কাছে যাই কোনোদিন মনের খেয়ালে, তবে সত্যি
বলো,
সুদূরের সেই
যুবাকে পাবে কি খঁজে এই ভাঙাচোরা মুখচ্ছদে? দেখ
আমি
কী রকম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
ভিজছি বৃষ্টিতে ক্রমাগত। শুষে নেয়
মেদমজ্জাজলের দংশন। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/byabodhan/
|
5312
|
শামসুর রাহমান
|
স্বগত ভাষণ
|
রূপক
|
আমার মাথার ক্ষত দ্যাখে লোকে ফুলের মতন
উন্মীলিত প্রতিদিন, আমি বিশ শতকের যিশু।
আমার চৌদিকে দেখি ক্রুশকাঠ নিয়ে যাচ্ছে বয়ে
মুখ বুজে কয়েকটি শীর্ণ শব, তারাই আবার
জ্বলজ্বলে রাত্রির দোকানে এসে কয় খিলি পান
কিনে দলছাড়া হয় অথবা প্রচণ্ড ক্ষোভে মেতে
নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে তোলে তারার কবর
দেখতে চায় না চাঁদ ভেসে যাক অবারিত নীলে।আমার মাথাটা যেন বহ্নিমান একটি শহর
যেখানে মানুষ, যান, বিজ্ঞাপন, রেডিওর গান,
ভিখিরির চ্যাঁচামেচি, বেশ্যার বেহায়া অনুরাগ,
কানাঘুষো, নামহীন মৃত শিশু আবর্তিত শুধু।আমাকে শাসায় ভাগ্য সারাক্ষণ, বাগে পেয়ে যদি
টিট করে দেয় ঈর্ষাতুর দেবদূত দুঃস্বপ্নের
মুখোশ দেখিয়ে তবে কী মজা লুটবে অন্ধকারে
আমার দুর্দশা দেখে নোনাধরা চারটি দেয়াল!ক্লান্ত হয়ে স্বপ্ন দেখি পেরিয়ে হুলুদ মরুভূমি
একটি বিকট সিংহ আত্মাটাকে নেড়ে-চেড়ে শেষে
ছুড়ে ফেলে দিয়ে জীর্ণ জঞ্জালে নিঃশব্দে চলে গেছে।
হয়তো রোচেনি মুখে, কিংবা যেটা যোগ্য কুকুরের
কী করে বসাবে ভাগ তাতে অরণ্যের অধীশ্বর?
নিজের ছায়াকে দেখি হেঁটে যায় দূরে, আমি তার
অনুগামী। কয়েকটি প্রবঞ্চক স্বর গান হয়ে
মিশে যায় কঙ্কালের মতন বৃক্ষের অন্তরালেতিনটি ডাইনী বুড়ি দূরের আকাশ থেকে সাদা
চাঁদটাকে উপড়ে এনে, গুঁড়ো করে পাচনের সাথে
মিশিয়ে বিকৃত শব্দে টেনে নিয়ে তৃষিত জঠরে
বলে তারা কেন বৃথা করো তুমি নিজেরই মৃগায়?
মাথার ক্ষতের ঘ্রাণে জেগে দেখি ঘরের দেয়ালে
অলীক ফুলের নকশা, চতুর্দিকে যৌবনের রঙ
নিয়েছে জড়তা শুষে। শরীর চিৎকারে দীর্ণ হয়
আমি কি এখনও যুবা আলোকিত আয়ুর ভূগোলে? (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sogoto-vashon/
|
2434
|
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
|
ঝাপসা
|
রূপক
|
মেয়েটার নাম হল হাফসা
যখনই ছবি তোলে, ছবি ওঠে আবছা।
ক্যামেরাটা ঠিক আছে
হাফসা মেয়েটাই আসলে বেশ ঝাপসা।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/2036
|
5612
|
সুকুমার রায়
|
ছুটি (ঘুচবে জ্বালা)
|
ছড়া
|
ঘুচবে জ্বালা পুঁথির পালা ভাবছি সারাক্ষণ-
পোড়া স্কুলের পড়ার পরে আর কি বসে মন ?
দশটা থেকেই নষ্ট খেলা, ঘণ্টা হতেই শুরু
প্রাণটা করে 'পালাই পালাই' মনটা উড়ু উড়ু-
পড়ার কথা খাতায়, পাতায়, মাথায় নাহি ঢোকে !
মন চলে না- মুখ চলে যায় আবোলতাবোল ব'কে !
কানটা ঘোরে কোন্ মুলুকে হুঁশ থাকে না তার,
এ কান দিয়ে ঢুকলে কথা, ও কান দিয়ে পার ।
চোখ থাকে না আর কিছুতেই, কেবল দেখে ঘড়ি ;
বোর্ডে আঁকা অঙ্ক ঠেকে আঁচড়কাটা খড়ি ।
কল্পনাটা স্বপ্নে চ'ড়ে ছুটছে মাঠে ঘাটে-
আর কি রে মন বাঁধন মানে ? ফিরতে কি চায় পাঠে ?
পড়ার চাপে ছট্ফটিয়ে আর কিরে দিন চলে ?
ঝুপ্ ক'রে মন ঝাঁপ দিয়ে পড়্ ছুটির বন্যাজলে ।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/chuti-ghuchbey-jala/
|
2392
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
শ্রীপঞ্চমী
|
সনেট
|
নহে দিন দূরে, দেবি যবে ভূভারতে
বিসর্জ্জিব ভূভারত, বিস্মৃতির জলে,
ও তব ধবল মূর্ত্তি সুদল কমলে ;—
কিন্তু চিরস্থায়ী পূজা তোমার জগতে !
মনোরূপ-পদ্ম যিনি রোপিলা কৌশলে
এ মানব-দেহ-সরে, তাঁর ইচ্ছামতে
সে কুসুমে বাস তব, যথা মরকতে
কিম্বা পদ্মরাগে জ্যোতিঃ নিত্য ঝলঝলে !
কবির হৃদয়-বনে যে ফুল ফুটিবে,
সে ফুল-অঞ্জলি লোক ও রাঙা চরণে
পরম-ভকতি-ভাবে চিরকাল দিবে
দশ দিশে, যত দিন এ মর ভবনে
মনঃ-পদ্ম ফোটে, পূজা, তুমি, মা, পাইবে !—
কি কাজ মাটির দেহে তবে, সনাতনে ?
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/shripanchami/
|
770
|
জসীম উদ্দীন
|
আমার বাড়ি
|
প্রেমমূলক
|
আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।
শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা,
গামছা-বাঁধা দই।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
শুয়ো আঁচল পাতি,
গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস
করব সারা রাতি।
চাঁদমুখে তোর চাঁদের চুমো
মাখিয়ে দেব সুখে
তারা ফুলের মালা গাঁথি,
জড়িয়ে দেব বুকে।
গাই দোহনের শব্দ শুনি
জেগো সকাল বেলা,
সারাটা দিন তোমায় লয়ে
করব আমি খেলা।
আমার বাড়ি ডালিম গাছে
ডালিম ফুলের হাসি,
কাজলা দীঘির কাজল জলে
কাঁসগুলি যায় ভাসি।
আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
এই বরাবর পথ,
মৌরী ফুলের গন্ধ শুঁকে
থামিও তব রথ।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/189.html
|
1686
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
শব্দের পাথরে
|
রূপক
|
জলের উপরে ঘুরে ঘুরে
জলের উপরে ঘুরে ঘুরে
ছোঁ মেরে মাছরাঙা ফের ফিরে গেল বৃক্ষের শাখায়।
ঠোঁটের ভিতরে তার ছোট্ট একটা মাছ ছিল।
কে জানে মাছরাঙা খুব সুখী কি না।
রোদ্দুরে ভীষণ পুড়ে পুড়ে
রোদ্দুরে ভীষণ পুড়ে পুড়ে
সন্ধ্যায় অনন্তলাল ফিরেছে অভ্যস্ত বিছানায়।
মস্তিষ্কে তখনও তার রূপকথার গাছ ছিল;
গাছের উপরে ছিল হিরামন পাখি।
কে জানে অনন্তলাল সুখী কি না।
শব্দের পাথরে মাথা খুঁড়ে
শব্দের পাথরে মাথা খুঁড়ে
কেউ কি কখনও মাছ, বৃক্ষ কিংবা পাখির কঙ্কাল পেয়ে যায়?
ভাবতেই ভীষণ হাসি পাচ্ছিল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1673
|
131
|
আল মাহমুদ
|
পাখির কথায় পাখা মেললাম
|
রূপক
|
ভয়ের ডানায় বাতাস লেগেছে মুখে
শীতল সবুজ থরথর করে বুকে
কাঁপছে আত্মা, আত্মার পাখি এক
‘ঝাপটানি তুলে নিজের কথাই লেখ’
পাখির কথায় পাখা মেললাম নীলে
নীল এসে বুঝি আমাকেই ফেলে গিলে
নীল ছাড়া দেখি চারিদিকে কিছু নেই
তুমি ছাড়া, তুমি-তুমি পুরাতন সেই।
চির পুরাতন কিন্তু নতুন তোমার চোখের তারা
আমাকে কেবল ইশারায় করে প্রান্তরে দিশেহারা
তবুও তো আমি এখনো তোমার ছায়া
খুঁজে ফিরি আর ভাবি অলৌকিক মায়া
মুক্তির গান গাইবে এমন কবি কই এই দেশে?
কবিতার পরে কবিতাই থাকে স্বপ্নকে ভালোবেসে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3723.html
|
2920
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কুসুমের শোভা
|
রূপক
|
কুসুমের শোভা
কুসুমের অবসানে
মধুরস হয়ে
লুকায় ফলের প্রাণে (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kushumer-shova/
|
3172
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমায় চিনি বলে আমি করেছি গরব
|
প্রেমমূলক
|
তোমায় চিনি বলে আমি করেছি গরব
লোকের মাঝে;
মোর আঁকা পটে দেখেছে তোমায়
অনেকে অনেক সাজে।
কত জনে এসে মোরে ডেকে কয়
“কে গো সে’, শুধায় তব পরিচয়–
“কে গো সে।’
তখন কী কই, নাহি আসে বাণী,
আমি শুধু বলি,”কী জানি! কী জানি!’
তুমি শুনে হাস, তারা দুষে মোরে
কী দোষে।তোমার অনেক কাহিনী গাহিয়াছি আমি
অনেক গানে।
গোপন বারতা লুকায়ে রাখিতে
পারি নি আপন প্রাণে।
কত জন মোরে ডাকিয়া কয়েছে,
“যা গাহিছ তার অর্থ রয়েছে
কিছু কি।’
তখন কী কই, নাহি আসে বাণী,
আমি শুধু বলি,”অর্থ কী জানি!’
তারা হেসে যায়,তুমি হাস বসে
মুচুকি।তোমায় জানি না চিনি না এ কথা বলো তো
কেমনে বলি।
খনে খনে তুমি উঁকি মারি চাও,
খনে খনে যাও ছলি।
জ্যোৎস্নানিশীথে পূর্ণ শশীতে
দেখেছি তোমার ঘোমটা খসিতে,
আঁখির পলকে পেয়েছি তোমায়
লখিতে।
বক্ষ সহসা উঠিয়াছে দুলি,
অকারণে আঁখি উঠেছে আকুলি,
বুঝেছি হৃদয়ে ফেলেছ চরণ
চকিতে।তোমায় খনে খনে আমি বাঁধিতে চেয়েছি
কথার ডোরে।
চিরকাল-তরে গানের সুরেতে
রাখিতে চেয়েছি ধরে।
সোনার ছন্দে পাতিয়াছি ফাঁদ,
বাঁশিতে ভরেছি কোমল নিখাদ,
তবু সংশয় জাগে ধরা তুমি
দিলে কি!
কাজ নাই,তুমি যা খুশি তা করো–
ধরা না’ই দাও মোর মন হরো,
চিনি বা না চিনি প্রাণ উঠে যেন
পুলকি। (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomai-chini-bole-ami-korechi-gorbo/
|
3445
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রভেদ
|
ভক্তিমূলক
|
তোমাতে আমাতে আছে তো প্রভেদ
জানি তা বন্ধু, জানি,
বিচ্ছেদ তবু অন্তরে নাহি মানি।
এক জ্যোৎস্নায় জেগেছি দুজনে
সারারাত-জাগা পাখির কূজনে,
একই বসন্তে দোঁহাকার মনে
দিয়েছে আপন বাণী।তুমি চেয়ে আছ আলোকের পানে,
পশ্চাতে মোর মুখ--
অন্তরে তবু গোপন মিলনসুখ।
প্রবল প্রবাহে যৌবনবান
ভাসায়েছে দুটি দোলায়িত প্রাণ,
নিমেষে দোঁহারে করেছে সমান
একই আবর্তে টানি।সোনার বর্ণ মহিমা তোমার
বিশ্বের মনোহর,
আমি অবনত পাণ্ডুর কলেবর।
উদাস বাতাসে পরান কাঁপায়ে
অগৌরবের শরম ছাপায়ে
আমারে তোমার বসাইল বাঁয়ে,
একাসনে দিল আনি।
নবারুণরাগে রাঙা হয়ে গেল
কালো ভেদরেখাখানি।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pubat/
|
5579
|
সুকুমার রায়
|
একুশে আইন
|
ছড়া
|
শিবঠাকুরের আপন দেশে ,
আইন কানুন সর্বনেশে!
কেউ যদি যায় পিছলে প'ড়ে,
প্যায়দা এসে পাক্ড়ে ধরে ,
কাজির কাছে হয় বিচার-
একুশ টাকা দন্ড তার।।
সেথায় সন্ধে ছটার আগে
হাঁচতে হলে টিকিট লাগে
হাঁচলে পরে বিন্ টিকিটে
দম্দমাদম্ লাগায় পিঠে ,
কোটাল এসে নস্যি ঝাড়ে-
একুশ দফা হাচিয়ে মারে।।
কারুর যদি দাতটি নড়ে,
চার্টি টাকা মাশুল ধরে ,
কারুর যদি গোঁফ গজায় ,
একশো আনা ট্যাক্সো চায়-
খুঁচিয়ে পিঠে গুঁজিয়ে ঘাড়,
সেলাম ঠোকায় একুশ বার।।
চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়
এদিক্ ওদিক্ ডাইনে বাঁয়,
রাজার কাছে খবর ছোটে,
পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে ,
দুপুরে রোদে ঘামিয়ে তায়-
একুশ হাতা জল গেলায়।।
যে সব লোকে পদ্য লেখে,
তাদের ধরে খাঁচায় রেখে,
কানের কাছে নানান্ সুরে
নামতা শোনায় একশো উড়ে,
সামনে রেখে মুদীর খাতা-
হিসেব কষায় একুশ পাতা।।
হঠাৎ সেথায় রাত দুপুরে
নাক ডাকালে ঘুমের ঘোরে,
অম্নি তেড়ে মাথায় ঘষে,
গোবর গুলে বেলের কষে,
একুশটি পাক ঘুরিয়ে তাকে-
একুশ ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখে।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/516
|
4427
|
শামসুর রাহমান
|
ঈষৎ কম্পনে
|
রূপক
|
নিদ্রার স্থাপত্যে ধীরে হাত রাখে স্বপ্ন, রেশমের
স্বরে কথা বলে, আমি পড়ার টেবিলে-
রাখা মধ্যযুগের কাব্যের ছন্দমিল
আর ব্যালাডের সঙ্গে কথা বলি, নিজের সঙ্গেও মাঝে-সাঝে।আমি গুটি কয় তাজা রুটি, এক পাত্র মদ আর
বাগানের গোলাপকে সুখস্বপ্ন দেখাতে চেয়েছি
বার বার; হাতের দশটি আঙুলকে
নিভৃতে বানাই মরূদ্যান, পায়ের গোড়ালি হয় ঝর্ণাধারা।সন্ধ্যাকে পেছনে রেখে শ্রান্ত মুসাফির চলে আসে
সরাইখানায়, দু’ভুরুর মাঝখানে চাঁদ ওঠে,
যেন ছদ্মবেশী ক্ষত। নিজেকে মানিয়ে নেয় পোকামাকড়ের
পছন্দের ডেরায়, পতঙ্গ পুড়ে যায় অগ্নিশিখা ভালোবেসে।নির্বাসিত রাজপুরষের মতো একা-একটা ঘুরি,
কখনো-বা ভুল পড়ে চলে যাই। বিশ্বস্ততা কাঁটার মুকুট
পরে হাঁটে কায়ক্লেশে, শতাব্দী পেছনে পড়ে থাকে;
স্মৃতি যেন উটের পায়ের চিহ্ন মরুর বালিতে।প্রতীক্ষার সময় ফুরায়; যার উপস্থিতি এখনো কুয়াশাবৃত,
তার কণ্ঠস্বর অতীতের শ্লোক আওড়ায়।
কিছুই পড়ে না মনে, জানি না চোখের পাতা কেন এই মূঢ়
বেঁচে-থাকা ধরে রাখে ঈষৎ কম্পনে? (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ishot-kompone/
|
5335
|
শামসুর রাহমান
|
হরিণী-কবিতা
|
প্রেমমূলক
|
সুন্দরবনের রোদ-চকচকে হিরণ পয়েন্টে যে হরিণী
জলপানে মগ্ন সেই কবে, পুনরায়
যেন সে বিদ্যচ্চমক কবিতার রাজধানীতে সকালবেলা;
এ-ও এক খেলা তার শহরকে জড়িয়ে শরীরে।অনির্বচনীয় রূপ নিয়ে একগা হরিণী যায়
কবি সম্মেলনে হেঁটে যায় সাবলীল, মহিমার
ছটা তার সত্তা থেকে বিচ্ছুরিত; হঠাৎ উধাও।
এদিক ওদিক খুঁজি, বুক চিরে ট্রেন দূরগামী, চতুর্দিকে
সুচতুর শিকারীর ফাঁদ পাতে বন্দুকের ট্রিগারে আঙুল
রেখে ঘোরে ইতস্ততঃ। হরিণীর কোথায় তেমন বর্ম যাতে
সহজে পিছলে যাবে ঝাঁক গুলী?
ওদের সকল তাক যাক ফস্কে যাক।
অকস্মাৎ হরিণীকে দেখি উত্তাপ উপেক্ষা ক’রে
চলেছে ব্যানার ছুঁয়ে কবির মিছিলে, গায়ে তার
বাংলার মখমলী গাঢ় সবুজিমা, এমন সুন্দর টিপ
কোথায় সে পেলো? কাঁচপোকা
ব’সে আছে মসৃণ কপালে?
গলায় নিবিড় লগ্ন নক্ষত্রের মালা,
দু’চোখে বিলীয়মান স্বপ্নের অস্পষ্ট দীর্ঘশ্বাস,
যেন সে লাফিয়ে ওঠা শিখা, প্রতিবাদে
স্পন্দিত সৌন্দর্য ক্ষণে ক্ষণে,
চম্কে তাকায় রৌদ্রে স্নাতা। অদূরে দাঁড়িয়ে দেখি
তাকে, দেখে সে-ও, পরস্পর চোখাচোখি, বুঝি এক
মধুর মালিন্যহীন গোপন দাঁতাত।জানি আজ প্রকৃতির অভিষেক হবে তার হাতে
আবার নতুন ক’রে। চলায় ছিলো না দ্বিধা, পথে
পুলিশের ভ্যান,
তবু দৃক্পাতহীন চলেছি সম্মুখে, তার গায়ে
আঁচড় লাগলে কোনো আমার হৃদয়
বিষম আহত হবে, অশ্রু হ’য়ে ঝরবে শোণিত
সারাক্ষণ, চাই না কখনো তার সৌন্দর্য ভুলেও
অন্ধকার মর্গে যাক। সে থাকুক বেঁচে রোদবৃষ্টি বুকে নিয়ে
দীর্ঘজীবী কবিতার মতো সজীব, নিটোল। নিত্যদিন
আমার জীবদ্দশায় হোক সে অধিক বন্দনীয়।হরিণী অক্ষরবৃত্তে এগোয় মঞ্চের দিকে, মাইক্রোফোনের
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ে। শব্দাবলী থেকে
যন্ত্রনা গিয়েছে ঝ’রে, পথকষ্ট মুছে গেছে, লুপ্ত স্বেদমুক্তো;
কবিতা পাঠের কালে নিজেই কবিতা হ’য়ে জ্বলে
সুবিশাল সমাবেশে পিন-পড়া স্তব্ধতায়। হ্রদের পানির
মতো স্বচ্ছ বাক্য রাত্তিরে লতিয়ে ওঠে, আখেরে চকিতে
কখন যে নেমে আসে, চ’লে যায়, ‘হরিণী-কবিতা’
ব’লে আর্তনাদ করি, তাকায় না ফিরে। আমি কুকুরের মতো
কী ব্যাকুল চুমো খাই চিহ্নহীন পদাচিহ্নে তার। একা-একা
যতি, ছেদ, পর্বসহ তাকেই মুখস্থ করা নিয়তি আমার।
কে ডাকে আমাকে মধ্যরাতে? কে এক অকালমৃত কবি
লেখার টেবিল থেকে ওঠে এস যেন
শয্যা ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে ডেকে নেন কাছে।মুখ তাঁর, মনে পড়ে, ‘ক্লেদজ কুসুম’ গ্রন্থটির
অন্তর্গত; ব্যথিত ফ্যাকাশে। স্থির হও, বসো তুমি
এখানে চেয়ারে, লেখো একটি সনেট
নিষাদে, নির্বেদে ভরপুর। যাকে চাও
সে হরিণী নাকি অমল কবিতা, সে তোমার
কোনোদিন হবে কিনা ভেবে কষ্টে বিবর্ণ হয়ো না।
আমার মতোই, হাতে তুলে নাও এখুনি কলম;
থাকবো না বেশিক্ষণ, ঢুকবো কফিনে পুনরায়,
‘বিদায়, বিদায়’ ব’লে তিনি ঘন কুয়াশায় ট’লে ট’লে
মিশে যান। নির্ঘুম, স্তম্ভিত ব’সে থাকি
কিছুক্ষণ বড় একা। কবিতা-হরিণী ধরা দিয়ে চ’লে যায়। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/horini-kobita/
|
467
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
মোমতাজ মোমতাজ
|
প্রেমমূলক
|
মোমতাজ! মোমতাজ! তোমার তাজমহল
(যেন) বৃন্দাবনের একমুঠো প্রেম,
ফিরদৌসের একমুঠো প্রেম,
আজো করে ঝলমল।কত সম্রাট হল ধূলি স্মৃতির গোরস্থানে
পৃথিবী ভুলিতে নারে প্রেমিক শাহ্জাহানে
শ্বেত মর্মরে সেই বিরহীর ক্রন্দন মর্মর
গুঞ্জরে অবিরল।কেমনে জানিল শাহ্জাহান, প্রেম পৃথিবীতে মরে যায়!
(তাই) পাষাণ প্রেমের স্মৃতি রেখে গেল পাষাণে লিখিয়া হায়?
(যেন) তাজের পাষাণ অঞ্জলি লয়ে নিঠুর বিধাতা পানে
অতৃপ্ত প্রেম বিরহী-আত্মা আজো অভিযোগ হানে
(বুঝি) সেই লাজে বালুকায় মুখ লুকাইতে চায়
শীর্ণা যমুনা জল।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/momtaj-momtaj/
|
5735
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
আমিও ছিলাম
|
প্রেমমূলক
|
পাঁচজনে বলে পাঁচ কথা, আমি নিজেকে এখনো চিনি না
চেয়েছিলাম তো সকালবেলার শুদ্ধ মানুষ হতে
দশ দিকে চেয়ে আলোর আকাশে আয়নায় মুখ দেখা
আমিও ছিলাম, আমিও ছিলম, এই সুখে নিশ্বাস
জনি না কোথায় ভূল হয়ে যায়, ছায়া পড়ে ঘোর বনে
ঝড়ে বৃষ্টিতে পায়ে পায়ে হেঁটে যাকে মনে করি বন্ধু
সে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়, চোখে অচেনা মতন ভ্রূকুটি
নেশায় রক্ত উম্মাদ হয়, তছনছ করি নারীকে
অস্তিত্বের সীমানা ছাড়িয়ে জেগে ওঠে সঙহার
আঁধার সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে চোখ জ্বালা করে ওঠে।
চেয়েছিলাম তো সকালবেলার শুদ্ধ মানুষ হতে
বারবার সব ভুল হয়ে যায় এত বিপরীত স্রোত
বুকের মধ্যে পুবল নিদাঘ, পশ্চিমে হেলে মাথা
আমিও ছিলাম, আমিও ছিলাম, কান্নার মতো শোনায়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1785
|
3093
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জানি জানি কোন্ আদি কাল হতে
|
ভক্তিমূলক
|
জানি জানি কোন্ আদি কাল হতে
ভাসালে আমারে জীবনের স্রোতে,
সহসা হে প্রিয়, কত গৃহে পথে
রেখে গেছ প্রাণে কত হরষন।
কতবার তুমি মেঘের আড়ালে
এমনি মধুর হাসিয়া দাঁড়ালে,
অরুণ-কিরণে চরণ বাড়ালে,
ললাটে রাখিলে শুভ পরশন।সঞ্চিত হয়ে আছে এই চোখে
কত কালে কালে কত লোকে লোকে
কত নব নব আলোকে আলোকে
অরূপের কত রূপদরশন।
কত যুগে যুগে কেহ নাহি জানে
ভরিয়া ভরিয়া উঠেছে পরানে
কত সুখে দুখে কত প্রেমে গানে
অমৃতের কত রসবরষন।বোলপুর, ১০ ভাদ্র, ১৩১৬
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jani-jani-kon-adi-kal-hote/
|
3773
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু
|
ভক্তিমূলক
|
যদি তোমার দেখা না পাই, প্রভু,
এবার এ জীবনে
তবে তোমায় আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
এ সংসারের হাটে
আমার যতই দিবস কাটে,
আমার যতই দু হাত ভরে ওঠে ধনে,
তবু কিছুই আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
যদি অলস ভরে
আমি পথের পরে
যদি ধুলায় শয়ন পাতি সযতনে,
যেন সকল পথই বাকি আছে
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
যতই উঠে হাসি,
ঘরে যতই বাজে বাঁশি,
ওগো, যতই গৃহ সাজাই আয়োজনে,
যেন তোমায় ঘরে হয় নি আনা
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/455
|
5192
|
শামসুর রাহমান
|
রেনেসাঁস
|
সনেট
|
চকচকে তেজী এক ঘোড়ার মতোন রেনেসাঁস
প্রবল ঝলসে ওঠে চেতনায়। ক্ষিপ্ত তরবারি,
রৌদ্রস্নাত রণতরী, তরঙ্গে তরঙ্গে নৃত্যপর,
জ্বলন্ত গমের ক্ষেত, আদিগন্ত কালো মহামারী,
অলিন্দে রহস্যময়ী কেউ, দিকে দিকে প্রতিদিন
ভ্রাম্যমাণ অশ্বরোহী, মাঝিমাল্লা স্মৃতিতে ভাস্বর।
জেল্লাদার ট্রফি, অসিচালনা অথবা বল্লমের
খেলা-কোনো কিছু নয়, সেকালে মেধার উল্লাসএখনো আমাকে টানে। তোমার উদ্দেশে কতিপয়
চতুর্দশপদী লিখে, নিশীথের শেষ প্রহরের
ক্ষয়িষ্ণু বাতির দিকে চোখ রেখে শুভ্র সূর্যোদয়
আকণ্ঠ করবো পান, মড়কের প্রতি উদাসীন
অশ্বারূঢ় নাইটের মতো যাবো। সভ্যতার বিভা
উঠবে চমকে জ্যোৎস্নালোকে, জ্বলবে ঘোড়ার গ্রীবা। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/renesans/
|
5227
|
শামসুর রাহমান
|
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাথা
|
মানবতাবাদী
|
শুভার্থীরা হামেশা আমার উদ্দেশে এইমতো
নসিহত বর্ষণ করেন, ‘মাথা গরম কোরো না হে,
যা দিনকাল পড়েছে,
একটু সামলে সুমলে চলো।
এমন কি যিনি আমার হৃদয়ে
হাল্কা সুমা রঙের ম্যাক্সি-পরা
শরীর এলিয়ে হাই তোলেন বিকেলবেলা,
পছন্দ করেন ঘাসফড়িং, সরোবর এবং
প্রবাল সিঁড়ির স্বপ্ন দেখতে,
তিনিও নিত্য আমাকে পরামর্শ দেন
অগ্নিবলয়ের পাশ কাটিয়ে
কুলফি বরফের মতো কবিতা লিখতে।
কারণ, যার মাথা গরম,
সে নিজে পোড়ে সর্বক্ষণ
আর যারা তার কাছের মানুষ,
তারাও পুড়তে থাকে, যেন চিতার কাঠ।
ঠাণ্ডা মাথায় যারা কাজ করে,
তাদের তরক্কির রোশনিতে
পাড়ার পাঁচজনের চোখ যায় ধাঁধিয়ে।
সফল আমলারা উপর-অলাদের
সঙ্গে আমড়াগাছি করে
এত উঁচুতে উঠে যান যে,
হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারেন
আকাশ, হেঁটে যেতে পারেন
সুদূর মেঘের গালিচায়; কেননা,
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাদের মাথা।
আর যারা খুন করে ঠাণ্ডা মাথায়,
তাদের বিজয় রথের গতি রোধ করবে,
এমন সাধ্যি কার?মাথা ঠাণ্ডা রাখতে যাদের জুড়ি নেই,
তারপর হরতালের সময় হয়
নানা ফন্দিফিকির এঁকে
অফিসে ছোটে,
নয় ভিসিআরে ফিল্ম দেখে আয়েসী
সময় কাটায়, হরতালীদের
মুণ্ডুপাত করে অষ্টপ্রহর, ব্রিজ কিংবা
তিন তাসের খেলায় মাতে,
অথবা আজ্ঞাবহ আদূরে কণ্ঠে ইনিয়েয় বিনিয়ে
কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে রুটিন মাফিক
নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি আর
স্বাধীনতা দিবসকে ডেকে নিয়ে যায়
নামী দামী নারী-পুরুষ শোভিত বঙ্গভবনের
দরবারে, বসায় শানদার সোফা এবং চেয়ারে।শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যাদের মাথা,
তারা কখনো ক্ষুদিরাম হয়ে
ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ায় না
স্বাধীনতার প্রত্যুষের মতো
মুখমণ্ডল নিয়ে।
মর্চে পড়া সমাজের হাহাকারে ওদের
হৃদয় এতটুকু কেঁপে ওঠে না।
দেশ যখন উত্তপ্ত তামার মতো,
তখন তারা আসাদ হতে পারে না,
হতে জানে না নূর হোসেন।ভাগ্যিস্, এই পোড়া দেশের
সব্বার মাথা এখনো একেবারে
ঠাণ্ডা হয়ে যায় নি
হিমাগারে সংরক্ষিত শবের মতো। (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shitatop-niontrito-matha/
|
5391
|
শ্রীজাত
|
স্বপ্ন
|
চিন্তামূলক
|
বিকেলবেলা বাড়ি থাকাও পাপ
বাইরে হাওয়া, ঘরে নতুন টিউব
মাথায় বাজে একলা ডায়াল টোনগ্যাসের দাম বাড়ছে, প্রেম নেই,
দুটো প্রাচীন টিউশানি হারালাম
তবু আমায় চিনছে এতজন…একেকদিন বাড়ি ফেরার পথে
একেকদিন, সত্যি মনে হয়
আমি বোধহয়… আমি বোধহয় ক্লোন !এখন আমার স্বপ্ন বলতে শুধু
পাড়ার ছোট ছেলেমেয়ের হাতে
নানা রঙের মুখোশ বিতরণ
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4/
|
861
|
জসীম উদ্দীন
|
বঙ্গ-বন্ধু
|
ভক্তিমূলক
|
মুজিবর রহমান।
ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে,
জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞঝা-অশনি বেয়ে ।
বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা-মার।
হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যে অঙ্গার ;
দিনে দিনে হয়ে বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে,
দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান ছিল প্রকাশের মুখে ;
তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি
ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি।
মুজিবর রহমান।
তব অশ্বেরে মোদের রক্তে করায়েছি পূত-স্নান।
পীড়িত-জনের নিশ্বাস তারে দিয়েছে চলার গতি,
বুলেটে নিহত শহীদেরা তার অঙ্গে দিয়েছে জ্যেতি।
দুর্ভিক্ষের দানব তাহারে অদম্য বল,
জঠরে জঠরে অনাহার-জ্বালা করে তারে চঞ্চল।
শত ক্ষতে লেখা অমর কাব্য হাসপাতালের ঘরে,
মুর্হুমুহু যে ধবনিত হইছে তোমার পথের পরে।
মায়ের বুকের ভায়ের বুকের বোনের বুকের জ্বালা,
তব সম্মুখ পথে পথে আজ দেখায়ে চলিছে আলা।
জীবন দানের প্রতিজ্ঞা লয়ে লক্ষ সেনানী পাছে,
তোমার হুকুম তামিলের লাগি সাথে তব চলিয়াছে।
রাজভয় আর কারাশৃঙ্কল হেলায় করেছ জয়।
ফাঁসির মঞ্চে-মহত্ব তব কখনো হয়নি ক্ষয়।
বাঙলাদেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রমুর্ত রাজ,
প্রতি বাঙালীর হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার তক্ত-তাজ।
তোমার একটি আঙ্গুল হেলনে অচল যে সরকার।
অফিসে অফিসে তালা লেগে গেছে-স্তব্ধ হুকুমদার।
এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী-জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।
সেনাবাহিনীর অশ্বে চড়িয়া দম্ভ-স্ফীত ত্রাস,
কামান গোলার বুলেটের জোরে হানে বিষাক্ত শ্বাস।
তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালীর মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।
ধন্য এ কবি ধন্য এ যুগে রয়েছে জীবন লয়ে,
সম্মুখে তার মহাগৌরবে ইতিহাস চলে বয়ে।
ভুলিব না সেই মহিমার দিন, ভাষার আন্দোলনে ।
বুরেটের ভয় তুচ্ছ করিয়া ছেলেরা দাঁড়াল রণে ।
বরকত আর জব্বার আর সালাম পথের মাঝে,
পড়ে বলে গেলো, “আমরা চলিনু ভাইরা আসিও পাছে।”
উত্তর তার দিয়েছে বাঙালী, জানুয়ারী সত্তরে,
ঘরের বাহির হইল ছেলেরা বুলেটের মহা-ঝড়ে।
পথে পথে তারা লিখিল লেখন বুকের রক্ত দিয়ে,
লক্ষ লক্ষ ছুটিল বাঙালী সেই বাণী ফুকারিয়ে।
মরিবার সে কি উন্মাদনা যে, ভয় পালাইল ভয়ে,
পাগলের মত ছোট নর-নারী মৃত্যুরে হাতে লয়ে।
আরো একদিন ধন্য হইনু সে মহাদৃশ্য হেরি,
দিকে দিগনে- বাজিল যেদিন বাঙালীর জয়ভেরী।
মহাহুঙ্কারে কংস-কারার ভাঙিয়া পাষাণ দ্বার,
বঙ্গ-বঙ্গ শেখ মুজিবেরে করিয়া আনিল বার।
আরো একদিন ধন্য হইব, ধন-ধান্যেতে ভরা,
জ্ঞানে-গরিমায় হাসিবে এদেশ সীমিত-বসুন্ধরা।
মাঠের পাত্রে ফসলেরা আসি ঋতুর বসনে শোভি,
বরণে সুবাসে আঁকিয়া যাইবে নকসী-কাঁথার ছবি।
মানুষ মানুষ রহিবে না ভেদ, সকলে সকলকার,
এক সাথে ভাগ করিয়া খাইবে সম্পদ যত মার।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর রুপালীর তার পরে,
পরাণ ভুলানো ভাটিয়ালী সুর বাজিবে বিশ্বভরে।
আম-কাঁঠালের ছায়ায় শীতল কুটিরগুলির তলে,
সুখ যে আসিয়া গড়াগড়ি করি খেলাইবে কুতুহলে।
আরো একদিন ধন্য হইব চির-নির্ভীকভাবে,
আমাদরে জাতি নেতার পাগড়ি ধরিয়া জবাব চাবে,
“কোন অধিকারে জাতির স্বার্থ করিয়াছ বিক্রয়?”
আমার এদেশ হয় যেন সদা সেইরুপ নির্ভয়।
১৬ই মার্চ, ১৯৭১ সন
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/493
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.