id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
4192
লালন শাহ
সময় গেলে সাধন হবে না
নীতিমূলক
দিন থাকতে দ্বীনের সাধন কেন জানলে না তুমি কেন জানলে না সময় গেলে সাধন হবে নাজানো না মন খালে বিলে থাকে না মিন জল শুকালে ।। কি হবে আর বাঁধা দিলে মোহনা শুকনা থাকে, মোহনা শুকনা থাকে, সময় গেলে সাধন হবে না সময় গেলে সাধন হবে নাঅসময়ে কৃষি কইরে মিছা মিছি খেইটে মরে গাছ যদি হয় বীজের জোরে ফল ধরে না তাতে ফল ধরে না, সময় গেলে সাধন হবে না ।।অমাবস্যায় পূর্নিমা হয় মহা জোগ সে দিনের উদয় ।। লালোন বলে তাহার সময় দনডোমো রয় না, দনডোমো রয় না,দনডোমো রয় না সময় গেলে সাধন হবে নাদিন থাকতে দ্বীনের সাধন কেন জানলে না তুমি কেন জানলে না সময় গেলে সাধোন হবে নাআরও পড়ুন… তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে – লালন শাহ
http://kobita.banglakosh.com/archives/4423.html
5117
শামসুর রাহমান
মিলনের মুখ
স্বদেশমূলক
গুলিবিদ্ধ শহর করছে অশ্রুপাত অবিরত, কেননা মিলন নেই। দিন দুপুরেই নরকের শিকারী কুকুর তার বুকে বসিয়েছে দাঁত, বড় নিঝুম স্থাপত্য আজ মিলনের প্রতিবাদী মুখ।মিছিলে আসার আগে মায়ের স্নেহের ছায়া থেকে তাড়াতাড়ি সরে এসে, স্ত্রীর প্রতি হাত নেড়ে, চুমো খেয়ে শিশুকন্যাটিকে নেমেছিল পথে শুভ্রতায় শহরের বন্দীদশা ঘোচাবার দুর্নিবার টানে।এ শহর ছিল শৃঙ্খলিত, ভয়ংকর শৃঙ্খলিত প্রতিটি মানুষ, ঘরদোর, গাছপালা পশুপাখি; শেকল ভাঙার গানে কণ্ঠ মেলাতে মিলন নিজে আগুন-ঝরানো গান হয়েছিল তপ্তজনপথে।অকস্মাৎ আকাশে কে যেন দিল ঢেলে কালো কালি, দুপুর সন্ধ্যার সাজ প’রে বিধবার মতো চোখ মেলে চেয়ে থাকে আর আঁচলে সংগ্রামী স্মৃতি জ্বলে, মিলনের মুখে বৃষ্টি নয়, বাংলার অশ্রু ঝরে।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/miloner-mukh/
564
কাজী নজরুল ইসলাম
হোলি
ভক্তিমূলক
আয় লো সই খেলব খেলা ফাগের ফাজিল পিচকিরিতে। আজ শ্যামে জোর করব ঘায়েল হোরির সুরের গিটকিরিতে। বসন ভূষণ ফেল লো খুলে, দে দোল দে দোদুল দুলে, কর লালে লাল কালার কালো আবির হাসির টিটকিরিতে॥(পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/holi/
2791
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎসর্গ (আরোগ্য)
চিন্তামূলক
কল্যাণীয় শ্রীসুরেন্দ্রনাথ করবহু লোক এসেছিল জীবনের প্রথম প্রভাতে — কেহ বা খেলার সাথী, কেহ কৌতূহলী, কেহ কাজে সঙ্গ দিতে, কেহ দিতে বাধা। আজ যারা কাছে আছ এ নিঃস্ব প্রহরে, পরিশ্রান্ত প্রদোষের অবসন্ন নিস্তেজ আলোয় তোমরা আপন দীপ আনিয়াছ হাতে, খেয়া ছাড়িবার আগে তীরের বিদায়স্পর্শ দিতে। তোমরা পথিকবন্ধু, যেমন রাত্রির তারা অন্ধকারে লুপ্তপথ যাত্রীর শেষের ক্লিষ্ট ক্ষণে।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/utshorgo/
864
জসীম উদ্‌দীন
বাঁশরী আমার হারায়ে গিয়েছে
রূপক
বাঁশরী আমার হারায়ে গিয়েছে বালুর চরে, কেমনে ফিরিব গোধন লইয়া গাঁয়ের ঘরে। কোমল তৃণের পরশ লাগিয়া, পায়ের নুপুর পড়িয়াছে খসিয়া। চলিতে চরণ ওঠে না বাজিয়া তেমন করে। কোথায় খেলার সাথীরা আমার কোথায় ধেনু, সাঝেঁর হিয়ায় রাঙিয়া উঠিছে গোখুর-রেণু। ফোটা সরিষার পাঁপড়ির ভরে চরো মাঠখানি কাঁপে থরে থরে। সাঁঝের শিশির দুচরণ ধরে কাঁদিয়া ঝরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/802
1485
নির্মলেন্দু গুণ
তোমার চোখ এতো লাল কেন
প্রেমমূলক
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক, শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য। বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত। আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা নিয়ে কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না। আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে। আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুকঃ আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন লাগবে কিনা, পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও একটা তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা। এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি। আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন ভেতর থেকে আমার ঘরের দরোজা খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক। কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করুকঃ "তোমার চোখ এতো লাল কেন?"
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/tomar-chak-eto-lal-keno/
5135
শামসুর রাহমান
ম্লান হয়ে যাই
প্রেমমূলক
খুব ভোরে জেগে উঠে দেখি চেনা সুন্দর পৃথিবী আমার দিকেই গাঢ় মমতায় তাকিয়ে রয়েছে; গাছ, লাল গোলাপ কাছের নার্সারির, খোলা পথ নীলকণ্ঠ, ভাসমান মেঘ শুভেচ্ছা জানায়, ভাবি- আজ তুমি প্রিয়তমা, সুস্থ থাকবে, আনন্দে ভরে রইবে তোমার মন। কেননা আবার কাল রাতে দেখা হলো আমাদের। দুপুরে তোমার সঙ্গে কথা বলে কণ্ঠস্বর শুনে তোমাকে নীরোগ জানলাম।এমত ধারণা হলো, আমার গভীর ভালোবাসা তোমার শরীর থেকে সহজে ফেলেছে মুছে সব যন্ত্রণা, মনের ক্লেশ। এ ধারণা আমার গর্বের ঝুঁটিকে অধিক দীপ্ত করে তোলে। অথচ সন্ধ্যায় তোমার মধুর কণ্ঠে ফুটে ওঠে অসুখের স্বর- ব্যর্থতা আমাকে করে গ্রাস, বড়ো ম্লান হয়ে যাই।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/mlan-hoye-jai/
207
কাজী নজরুল ইসলাম
আঁধারে
রূপক
অমানিশায় আসে আঁধার তেপান্তরের মাঠে; স্তব্ধ ভয়ে পথিক ভাবে,– কেমনে রাত কাটে! ওই যে ডাকে হুতোম-পেঁচা, বাতাস করে শাঁ শাঁ! মেঘে ঢাকা অচিন মুলুক; কোথায় রে কার বাসা? গা ছুঁয়ে যায় কালিয়ে শীতে শূন্য পথের জু জু– আঁধার ঘোরে জীবন-খেলার নূতন পালা রুজু।   (ঝড় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/adhare/
4489
শামসুর রাহমান
একটি ভ্রূণের উক্তি
মানবতাবাদী
নারীদেহ লোলুপ পুরুষ বারবার তোকে তার শয্যায় নিয়েছে; তুই ভ্রষ্টা না কি ক্ষণিক প্রেমিকা- এই বিচারের ভার নিতে পারব না। কেন তুই হে নিঠুরা আমাকে কুরিয়ে ফেলে দিলি সার্জনের ক্লিনিকে গোপনে? তোর নিজস্ব গুহায় ক্রমান্বয়ে আমাকে সপ্রাণ বেড়ে উঠতে দিলি না? মা বলার সাধ অঙ্কুরেই নষ্ট, আলো অন্ধকার আর বুক ধুক ধুক করা খেলা নিয়ে হৈ হৈ জানতেই দিলি না।আমার তো বড়ো সাধ ছিল তোর গুহামুখ ঠেলে এই রৌদ্রছায়াময় পৃথিবীতে বেরিয়ে আসার সুতীব্র ঘোষণা দিয়ে। এ দুনিয়া কী-যে অপরূপ শোভাময়, প্রাণের আনন্দমেলা চতুর্দিকে; সত্য আছে দুঃখশোক, তবু কী-যে ভালো লাগে বেঁচে থাকা; সবাই নির্দয় নয়, নয় শুধু ভ্রূণ হত্যাকারী।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-vruner-ukti/
871
জসীম উদ্‌দীন
বেদের বেসাতি
কাহিনীকাব্য
প্রভাত না হতে সারা গাঁওখানি কিল বিল করি ভরিল বেদের দলে, বেলোয়ারী চুড়ি চিনের সিদুর, রঙিন খেলনা হাঁকিয়া হাঁকিয়া চলে। ছোট ছোট ছেলে আর যত মেয়ে আগে পিছে ধায় আড়াআড়ি করি ডাকে, এ বলে এ বাড়ি, সে বলে ও বাড়ি, ঘিরিয়াছে যেন মধুর মাছির চাকে। কেউ কিনিয়াছে নতুন ঝাঁজর, সবারে দেখায়ে গুমরে ফেলায় পা; কাঁচা পিতলের নোলক পরিয়া, ছোট মেয়েটির সোহাগ যে ধরে না। দিদির আঁচল জড়ায়ে ধরিয়া ছোট ভাই তার কাঁদিয়া কাটিয়া কয়, “তুই চুড়ি নিলি আর মোর হাত খালি রবে বুঝি ? কক্ষনো হবে নয়।” “বেটা ছেলে বুঝি চুড়ি পরে কেউ ? তার চেয়ে আয় ডালিমের ফুল ছিঁড়ে. কাঁচা গাব ছেঁচে আঠা জড়াইয়া ঘরে বসে তোর সাজাই কপালটিরে।” দস্যি ছেলে সে মানে না বারণ, বেদেনীরে দিয়ে তিন তিন সের ধান, কি ছাতার এক টিন দিয়ে গড়া বাঁশী কিনে তার রাখিতে যে হয় মান। মেঝো বউ আজ গুমর করেছে, শাশুড়ী কিনেছে ছোট ননদীর চুড়ি, বড় বউ ডালে ফোড়ৎ যে দিতে মিছেমিছি দেয় লঙ্কা-মরিচ ছুঁড়ি। সেজো বউ তার হাতের কাঁকন ভাঙিয়া ফেলেছে ঝাড়িতে ঝাড়িতে ধান, মন কসাকসি, দর কসাকসি করিয়া বৃদ্ধা শাশুড়ী যে লবেজান। এমনি করিয়া পাড়ায় পাড়ায় মিলন-কলহ জাগাইয়া ঘরে ঘরে, চলে পথে পথে বেদে দলে দলে কোলাহলে গাঁও ওলট পালট করে। ইলি মিলি কিলি কথা কয় তারা রঙ-বেরঙের বসন উড়ায়ে বায়ে, ইন্দ্রজেলের জালখানি যেন বেয়ে যায় তারা গাঁও হতে আর গাঁয়ে। এ বাড়ি-ও বাড়ি-সে বাড়ি ছাড়িতে হেলাভরে তারা ছড়াইয়া যেন চলে, হাতে হাতে চুড়ি, কপালে সিঁদুর, কানে কানে দুল, পুঁতির মালা যে গলে। নাকে নাক-ছাবি, পায়েতে ঝাঁজর- ঘরে ঘরে যেন জাগায়ে মহোৎসব, গ্রাম-পথখানি রঙিন করিয়া চলে হেলে দুলে, বেদে-বেদেনীরা সব। “দুপুর বেলায় কে এলো বাদিয়া দুপুরের রোদে নাহিয়া ঘামের জলে, ননদীলো, তারে ডেকে নিয়ে আয়, বসিবারে বল কদম গাছের তলে।” “কদমের ডাল ফোটা ফুল-ভারে হেলিয়া পড়েছে সারাটি হালট ভরে।” “ননদীলো, তারে ডেকে নিয়ে আয়, বসিবার বল বড় মন্টব ঘরে।” “মন্টব ঘরে মস্ত যে মেঝে এখানে সেখানে ইঁদুরে তুলেছে মাটি।” “ননদীলো”, তারে বসিবারে বল উঠানের ধারে বিছায়ে শীতলপাটী।” “শোন, শোন ওহে নতুন বাদিয়া, রঙিন ঝাঁপির ঢাকনি খুলিয়া দাও, দেখাও, দেখাও মনের মতন সুতা সিন্দুর তুমি কি আনিয়াছাও। দেশাল সিঁদুর চাইনাক আমি কোটায় ভরা চিনের সিঁদুর চাই, দেশাল সিঁদুর খস্ খস্ করে, সীথায় পরিয়া কোন সুখ নাহি পাই। দেশাল সোন্দা নাহি চাহি আমি গায়ে মাখিবার দেশাল মেথি না চাহি, দেশাল সোন্দা মেখে মেখে আমি গরম ছুটিয়া ঘামজলে অবগাহি।” “তোমার লাগিয়া এনেছি কন্যা, রাম-লক্ষ্মণ দুগাছি হাতের শাঁখা, চীন দেশ হতে এনেছি সিঁদুর তোমার রঙিন মুখের মমতা মাখা।” “কি দাম তোমার রাম-লক্ষ্মণ শঙ্খের লাগে, সিঁদুরে কি দাম লাগে, বেগানা দেশের নতুন বাদিয়া সত্য করিয়া কহগো আমার আগে।” “আমার শাঁখার কোন দাম নাই, ওই দুটি হাতে পরাইয়া দিব বলে, বাদিয়ার ঝালি মাথায় লইয়া দেশে দেশে ফিরি কাঁদিয়া নয়ন-জলে। সিঁদুর আমার ধন্য হইবে, ওই ভালে যদি পরাইয়া দিতে পারি, বিগানা দেশের বাদিয়ার লাগি এতটুকু দয়া কর তুমি ভিন-নারী।” “ননদীলো, তুই উঠান হইতে চলে যেতে বল বিদেশী এ বাদিয়ারে। আর বলে দেলো, ওসব দিয়ে সে সাজায় যেন গো আপনার অবলারে।” “কাজল বরণ কন্যালো তুমি, ভিন-দেশী আমি, মোর কথা নাহি ধর, যাহা মনে লয় দিও দাম পরে আগে তুমি মোর শাঁখা-সিঁদুর পর।” “বিদেশী বাদিয়া নায়ে সাথে থাক, পসরা লইয়া ফের তুমি দেশে দেশে। এ কেমন শাঁখা পরাইছ মোরে, কাদিঁয়া কাঁদিয়া নয়নের জলে ভেসে? সীথায় সিঁদুর পরাইতে তুমি, সিঁদুরের গুঁড়ো ভিজালে চোখের জলে। ননদীলো, তুই একটু ওধারে ঘুরে আয়, আমি শুনে আসি, ও কি বলে।” “কাজল বরণ কণ্যালো তুমি, আর কোন কথা শুধায়ো না আজ মোরে, সোঁতের শেহলা হইয়া যে আমি দেশে দেশে ফিরি, কি হবে খবর করে। নাহি মাতা আর নাহি পিতা মোর আপন বলিতে নাহি বান্ধব জন, চলি দেশে দেশে পসরা বহিয়া সাথে সাথে চলে বুক-ভরা ক্রদন। সুখে থাক তুমি, সুখে থাক মেয়ে- সীথায় তোমার হাসে সিঁদুরের হাসি, পরাণ তোমর ভরুক লইয়া, স্বামীর সোহাগ আর ভালবাসাবাসি।” “কে তুমি, কে তুমি ? সোজন ! সোজন! যাও-যাও-তুমি। এক্ষুণি চলে যাও। আর কোনদিন ভ্রমেও কখনো উড়ানখালীতে বাড়ায়ো না তব পাও। ভুলে গেছি আমি, সব ভুলে গেছি সোজন বলিয়া কে ছিল কোথায় কবে, ভ্রমেও কখনো মনের কিনারে অনিনাক তারে আজিকার এই ভবে। এই খুলে দিনু শঙ্খ তোমার কৌটায় ভরা সিন্দুর নিয়ে যাও, কালকে সকালে নাহি দেখি যেন কুমার নদীতে তোমার বেদের নাও।” “দুলী-দুলী-তুমি এও পার আজ ! বুক-খুলে দেখ, শুধু ক্ষত আর ক্ষত, এতটুকু ঠাঁই পাবেনাক সেথা একটি নখের আঁচড় দেবার মত।” “সে-সব জানিয়া মোর কিবা হবে ? এমন আলাপ পর-পুরুষের সনে, যেবা নারী করে, শত বৎসর জ্বলিয়া পুড়িয়া মরে নরকের কোণে। যাও-তুমি যাও এখনি চলিয়া তব সনে মোর আছিল যে পরিচয়, এ খবর যেন জগতের আর কখনো কোথাও কেহ নাহি জানি লয়।” “কেহ জানিবে না, মোর এ হিয়ার চির কুহেলিয়া গহন বনের তলে, সে সব যে আমি লুকায়ে রেখেছি জিয়ায়ে দুখের শাঙনের মেঘ-জলে। তুমি শুধু ওই শাঁখা সিন্দুর হাসিমুখে আজ অঙ্গে পরিয়া যাও। জনমের শেষ চলে যাই আমি গাঙে ভাসাইয়া আমার বেদের নাও।” “এই আশা লয়ে আসিয়াছ তুমি, ভাবিয়াছ, আমি কুলটা নারীর পারা, তোমার হাতের শাঁখা-সিন্দুরে মজাইব মোর স্বাসীর বংশধারা ?” “দুলী ! দুলী ! মোরে আরো ব্যথা দাও- কঠিন আঘাত-দাও-দাও আরো-আরো, ভেঙ্গে যাক বুক-ভেঙে যাক মন, আকাশ হইতে বাজেরে আনিয়া ছাড়। তোমারি লাগিয়া স্বজন ছাড়িয়া ভাই বান্ধব ছাড়ি মাতাপিতা মোর, বনের পশুর সঙ্গে ফিরেছি লুকায়ে রয়েছি খুঁড়িয়া মড়ার গোর। তোমারি লাগিয়া দশের সামনে আপনার ঘাড়ে লয়ে সব অপরাধ, সাতটি বছর কঠিন জেলের ঘানি টানিলাম না করিয়া প্রতিবাদ।” “যাও-তুমি যাও, ও সব বলিয়া কেন মিছেমিছি চাহ মোরে ভুলাইতে, আসমান-সম পতির গরব, আসিও না তাহে এতটুকু কালি দিতে। সেদিনের কথা ভুলে গেছি আমি, একটু দাঁড়াও ভাল কথা হল মনে- তুমি দিয়েছিলে বাঁক-খাড়ু পার, নথ দিয়েছিলে পরিতে নাকের সনে। এতদিনও তাহা রেখেছিনু আমি কপালের জোরে দেখা যদি হল আজ, ফিরাইয়া তবে নিয়ে যাও তুমি- দিয়েছিলে মোরে অতীতের যত সাজ। আর এক কথা-তোমার গলায় গামছায় আমি দিয়েছিনু আঁকি ফুল, সে গামছা মোর ফিরাইয়া দিও, লোকে দেখে যদি, করিবারে পারে ভুল। গোড়ায়ের ধারে যেখানে আমরা বাঁধিয়াছিলাম দুইজনে ছোট ঘর, মোদের সে গত জীবনের ছবি, আঁকিয়াছিলাম তাহার বেড়ার পর। সেই সব ছবি আজো যদি থাকে, আর তুমি যদি যাও কভু সেই দেশে ; সব ছবিগুলি মুছিয়া ফেলিবে, মিথ্যা রটাতে পারে কেহ দেখে এসে। সবই যদি আজ ভুলিয়া গিয়াছি, কি হবে রাখিয়া অতীতের সব চিন, স্মরণের পথে এসে মাঝে মাঝে- জীবনেরে এরা করিবারে পারে হীন ।” “দুলী, দুলী, তুমি ! এমনি নিঠুর ! ইহা ছাড়া আর কোন কথা বলে মোরে- জীবনের এই শেষ সীমানায় দিতে পারিতে না আজিকে বিদায় করে? ভুলে যে গিয়েছ, ভালই করেছ, - আমার দুখের এতটুকু ভাগী হয়ে, জনমের শেষ বিদায় করিতে পারিতে না মোরে দুটি ভাল কথা কয়ে ? আমি ত কিছুই চাহিতে আসিনি! আকাশ হইতে যার শিরে বাজ পড়ে, তুমি ত মানুষ, দেবের সাধ্য, আছে কি তাহার এতটুকু কিছু করে ? ললাটের লেখা বহিয়া যে আমি সায়রে ভাসিনু আপন করম লায়ে ; তারে এত ব্যথা দিয়ে আজি তুমি কি সুখ পাইলে, যাও-যাও মোরে কয়ে। কি করেছি আমি, সেই অন্যায় তোমার জীবনে কি এমন ঘোরতর। মরা কাষ্টেতে আগুন ফুঁকিয়া- কি সুখেতে বল হাসে তব অন্তর ? দুলী ! দুলী ! দুলী ! বল তুমি মোরে, কি লইয়া আজ ফিরে যাব শেষদিনে। এমনি নিঠুর স্বার্থ পরের রুপ দিয়ে হায় তোমারে লইয়া চিনে ? এই জীবনেরো আসিবে সেদিন মাটির ধরায় শেষ নিশ্বাস ছাড়ি, চিরবন্দী এ খাঁচার পাখিটি পালাইয়া যাবে শুণ্যে মেলিয়া পাড়ি। সে সময় মোর কি করে কাটিবে, মনে হবে যবে সারটি জনম হায় কঠিন কঠোর মিথ্যার পাছে ঘুরিয়া ঘুরিয়া খোয়ায়েছি আপনায়। হায়, হায়, আমি তোমারে খুঁজিয়া বাদিয়ার বেশে কেন ভাসিলাম জলে, কেন তরী মোর ডুবিয়া গেল না ঝড়িয়া রাতের তরঙ্গ হিল্লোলে ? কেন বা তোমারে খুঁজিয়া পাইনু, এ জীবনে যদি ব্যথার নাহিক শেষ পথ কেন মোর ফুরাইয়া গেল নাহি পৌঁছিতে মরণের কালো দেশ। পীর-আউলিয়া, কে আছ কোথায় তারে দিব আমি সকল সালাম ভার, যাহার আশীষে ভুলে যেতে পারি সকল ঘটনা আজিকার দিনটার। এ জীবনে কত করিয়াছি ভুল। এমন হয় না ? সে ভুলের পথ পরে, আজিকার দিন তেমনি করিয়া চলে যায় চির ভুল ভরা পথ ধরে। দুলী-দুলী আমি সব ভুলে যাব কোন অপরাধ রাখিব না মনে প্রাণে ; এই বর দাও, ভাবিবারে পারি তব সন্ধান মেলে নাই কোনখানে। ভাটীয়াল সোঁতে পাল তুলে দিয়ে আবার ভাসিবে মোর বাদিয়ার তরী, যাবে দেশে দেশে ঘাট হতে ঘাটে, ফিরিবে সে একা দুলীর তালাশ করি। বনের পাখিরে ডাকি সে শুধাবে, কোন দেশে আছে সোনার দুলীর ঘরম, দুরের আকাশ সুদুরে মিলাবে আয়নার মত সাদা সে জলের পর। চির একাকীয়া সেই নদী পথ, সরু জল রেখা থামে নাই কোনখানে ; তাহারি উপরে ভাসিবে আমার বিরহী বাদিয়া, বন্ধুর সন্ধানে। হায়, হায় আজ কেন দেখা হল কেন হল পুন তব সনে পরিচয় ? একটি ক্ষণের ঘটনা চলিল সারাটি জনম করিবারে বিষময় ।’ “নিজের কথাই ভাবিলে সোজন, মোর কথা আজ ? না-না- কাজ নাই বলে সকলি যখন শেষ করিয়াছি- কি হইবে আর পুরান সে কাদা ডলে। ওই বুঝি মোর স্বামী এলো ঘরে, এক্ষুনি তুমি চলে যাও নিজ পথে, তোমাতে-আমাতে ছিল পরিচয়- ইহা যেন কেহ নাহি জানে কোনমতে। আর যদি পার, আশিস করিও আমার স্বামীর সোহাগ আদর দিয়ে, এমনি করিয়া মুছে ফেলি যেন, যে সব কাহিনী তোমারে আমারে নিয়ে ।” “যেয়ো না-যেয়ো না শুধু একবার আঁখি ফিরাইয়া দেখে যাও মোর পানে, আগুন জ্বেলেছ যে গহন বনে, সে পুড়িছে আজ কি ব্যথা লইয়া প্রাণে? ধরায় লুটায়ে কাঁদিল সোজন, কেউ ফিরিল না, মুছাতে তাহার দুখ ; কোন সে সুধার সায়রে নাহিয়া জুড়াবে সে তার অনল পোড়া এ বুক ? জ্বলে তার জ্বালা খর দুপুরের রবি-রশ্মির তীব্র নিশাস ছাড়ি, জ্বলে-জ্বলে জ্বালা কারবালা পথে, দমকা বাতাসে তপ্ত বালুকা নাড়ি। জ্বলে-জ্বলে জ্বালা খর অশনীর ঘোর গরজনে পিঙ্গল মেঘে মেঘে, জ্বলে-জ্বলে জ্বালা মহাজলধীর জঠরে জঠরে ক্ষিপ্ত ঊর্মি বেগে। জ্বলে-জ্বলে জ্বালা গিরিকন্দরে শ্মশানে শ্মশানে জ্বলে জ্বালা চিতাভরে ; তার চেয়ে জ্বালা-জ্বলে জ্বলে জ্বলে হতাশ বুকের মথিত নিশাস পরে । জ্বালা-জ্বলে জ্বালা শত শিখা মেলি, পোড়ে জলবায়ু-পোড়ে প্রান্তর-বন ; আরো জ্বলে জ্বালা শত রবি সম, দাহ করে শুধু পোড়ায় না তবু মন। পোড়ে ভালবাসা-পোড়ে পরিণয় পোড়ে জাতিকুল-পোড়ে দেহ আশা ভাষা, পুড়িয়া পুড়িয়া বেঁচে থাকে মন, সাক্ষী হইয়া চিতায় বাঁধিয়া বাসা। জ্বলে-জ্বলে জ্বালা-হতাশ বুকের দীর্ঘনিশাস রহিয়া রহিয়া জ্বলে ; জড়ায়ে জড়ায়ে বেঘুম রাতের সীমারেখাহীন আন্ধার অঞ্চলে। হায়-হায়-সে যে কিজ দিয়ে নিবাবে কারে দেখাইবে কাহারে কহিবে ডাকি, বুক ভরি তার কি অনল জ্বালা শত শিখা মেলি জ্বলিতেছে থাকি থাকি। অনেক কষ্টে মাথার পসরা মাথায় লইয়া টলিতে টলিতে হায়, চলিল সোজন সমুখের পানে চরণ ফেলিয়া বাঁকা বন-পথ ছায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/762
4494
শামসুর রাহমান
একটি সামান্য সংলাপ
রূপক
‘আচ্ছা জনাব, আপনি তো হামেশা মেঘের মুলুকে থাকেন, তাই না?’‘মাফ করবেন জনাব, প্রায়শ এই অধম জমিনেই থাকে, কী রোদে, কী বৃষ্টিতে; তবে হ্যাঁ, সত্যি বলতে কি, কালেভদ্রে মেঘলোকে কী করে যে চলে যাই, জানি না নিজেই।‘‘মাফ করবেন, আমি ভাই অতসর বুঝি না। লোকে বলে, তাঁরাও উঁচু কিসিমের মানুষ, ইয়া মোটা মোটা কেতাব লিখেছেন গহীন রাতের চেরাগ জ্বেলে বিস্তর। তাঁদের কথা তো বানের পানিতে ভাসাতে পারি না, মগজের খাস কামরায় জীইয়ে রাখি।‘‘নয়, নয়, কস্মিনকালেও নয়। তাঁদের কথামালা ধোঁয়ায় মিলিয়ে দেয়ার মতো নয়, তাঁরা যা বলেন তা বাজারের বেজায় কিমতি জিনিশ। আমাদের মানে আমরা যারা মাঝে মাঝে মেঘে ভাসি, নীলিমায় সাঁতার কাটি, ফুটফুটে তারা ছুঁয়ে দেখি, তাঁদের নোস্‌খা ঠিক হজম হয় না, হড়হড়িয়ে বমি করে ফেলি অশ্লীল বেয়াদবের মতো। আচ্ছা চলি, মাটিতে বহুদিন পা রেখে চলাফেরা করেছি, বিস্তর হোঁচটও জুটেছে। এখন খানিক দূরে, মানে মেঘকন্যার চুমো খেতে যাই, ভাই। গুড বাই।‘   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-samanyo-songlap/
503
কাজী নজরুল ইসলাম
শাখ-ই-নবাত
মানবতাবাদী
[‘শাখ-ই-নবাত’ বুলবুল-ই-শিরাজ কবি হাফিজের মানসীপ্রিয়া ছিলেন।]শাখ-ই-নবাত শাখ-ই-নবাত! মিষ্টি রসাল ‘ইক্ষু-শাখা’। বুলবুলিরে গান শেখাল তোমার আঁখি সুরমা-মাখা। বুলবুল-ই-শিরাজ হল গো হাফিজ গেয়ে তোমার স্তুতি, আদর করে ‘শাখ-ই-নবাত’ নাম দিল তাই তোমার তুতি। তার আদরের নাম নিয়ে আজ তুমি নিখিল-গরবিনি, তোমার কবির চেয়ে তোমায় কবির গানে অধিক চিনি। মধুর চেয়ে মধুরতর হল তোমার বঁধুর গীতি, তোমার রস-সুধা পিয়ে, তাহার সে-গান তোমার স্মৃতি। তোমার কবির – তোমার তুতির ঠোঁট ভিজালে শহদ দিয়ে, নিখিল হিয়া সরস হল তোমার শিরিন সে রস পিয়ে। কল্পনারই রঙিন পাখায় ইরান দেশে উড়ে চলি, অনেক শত বছর পিছের আঁকাবাঁকা অনেক গলি – তোমার সাথে প্রথম দেখা কবির যেদিন গোধূলিতে, আঙুর-খেতে গান ধরেছে, কুলায়-ভোলা বুলবুলিতে। দাঁড়িয়েছিলে একাকিনী ‘রোকনাবাদের নহর’ তীরে, রঙিন ছিল আকাশ যেন কুসুম-ভরা ডালিম-শাখা তোমার চোখের কোনায় ছিল আকাশ-ছানা কাজল আঁকা। সন্ধ্যা ছিল বন্দি তোমার খোঁপায়, বেণির বন্ধনীতে ; তরুণ হিয়ার শরম ছিল জমাট বেঁধে বুকের ভিতে! সোনার কিরণ পড়েছিল তোমার দেহের দেউল চূড়ে, ডাঁসা আঙুর ভেবে এল মউ-পিয়াসি ভ্রমর উড়ে। তিল হয়ে সে রইল বসে তোমার গালের গুলদানিতে, লহর বয়ে গেল সুখে রোকনাবাদের নীল পানিতে। চাঁদ তখনও লুকিয়ে ছিল তোমার চিবুক গালের টোলে, অস্তরবির লাগল গো রং শূন্য তোমার সিঁথির কোলে। ওপারেতে একলা তুমি নহর-তীরে লহর তোলো, এপারেতে বাজল বাঁশি, ‘এসেছি গো নয়ন খোলো!’… … … তুললে নয়ন এপার পানে – মেলল কি দল নার্গিস তার? দুটি কালো কাজল আখর – আকাশ ভুবন রঙিন বিথার! কালো দুটি চোখের তারা, দুটি আখর, নয়কো বেশি ; হয়তো ‘প্রিয়া’, কিংবা ‘বঁধু’ – তারও অধিক মেশামেশি! কী জানি কী ছিল লেখা – তরুণ ইরান-কবিই জানে, সাধা বাঁশি বেসুর বোলে সেদিন প্রথম কবির কানে। কবির সুখের দিনের রবি অস্ত গেল সেদিন হতে, ঘিরল চাঁদের স্বপন-মায়া মনের বনের কুঞ্জপথে। হয়তো তুমি শোননি আর বাঁশুরিয়ার বংশীধ্বনি, স্বপন-সম বিদায় তাহার স্বপন-সম আগমনি। রোকনাবাদের নহর নীরের সকল লহর কবির বুকে, ঢেউ তোলে গো সেদিন হতে রাত্রি দিবা গভীর দুখে। সেই যে দুটি কাজল হরফ দুটি কালো আঁখির পাতে, তাই নিয়ে সে গান রচে তার ; সুরের নেশায় বিশ্ব মাতে! অরুণ আঁখি তন্বী সাকি পাত্র এবং শারাব ভুলে, চেয়ে থাকে কবির মুখে করুণ তাহার নয়ন তুলে। শারাব হাতে সাকির কোলে শিরাজ কবির রঙিন নেশা যায় গো টুটে ক্ষণে ক্ষণে – মদ মনে হয় অশ্রু মেশা।অধর-কোণে হাসির ফালি ঈদের পহিল চাঁদের মতো – উঠেই ডুবে যায় নিমেষে, সুর যেন তার হৃদয়-ক্ষত। এপার ঘুরে কবির সে গান ফুলের বাসে দখিন হাওয়ায় কেঁদে ফিরেছিল কি গো তোমার কানন-কুঞ্জ ছায়ায়? যার তরে সে গান রচিল, তারই শোনা রইল বাকি? শুনল শুধু নিমেষ-সুখের শারাব-সাথি বে-দিল্ সাকি?শাখ-ই-নবাত! শাখ-ই-নবাত! পায়নি তুতি তোমার শাখা, উধাও হল তাইতে গো তার উদাস বাণী হতাশ-মাখা। অনেক সাকির আঁখির লেখা, অনেক শারাব পাত্র-ভরা, অনেক লালা নার্গিস গুল বুলবুলিস্তান গোলাব-ঝোরা ব্যর্থ হল, মিটল না গো শিরাজ কবির বুকের তৃষা, হয়তো আখের শাখায় ছিল সুধার সাথে বিষও মিশা! নইলে এ গান গাইত কে আর, বইত না এ সুরধুনী; তোমার হয়ে আমরা নিখিল বিরহীরা সে গান শুনি। আঙুর-লতায় গোটা আঙুর ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুবারি, শিরাজ-কবির সাকির শারাব রঙিন হল তাই নিঙাড়ি। তোমায় আড়াল করার ছলে সাকির লাগি যে গান রচে, তাতেই তোমায় পড়ায় মনে, শুনে সাকি অশ্রু মোছে! তোমার চেয়ে মোদের অনেক নসিব ভালো, হায় ইরানি! শুনলে নাকো তোমায় নিয়ে রচা তোমার কবির বাণী। তোমার কবির রচা গানে মোদের প্রিয়ার মান ভাঙাতে তোমার কথা পড়ে মনে, অশ্রু ঘনায় নয়ন-পাতে!ঘুমায় হাফিজ ‘হাফেজিয়া’য়, ঘুমাও তুমি নহর-পারে, দিওয়ানার সে দিওয়ান-গীতি একলা জাগে কবর-ধারে। তেমনি আজও আঙুর-খেতে গেয়ে বেড়ায় বুলবুলিরা, তুতির ঠোঁটে মিষ্টি ঠেকে তেমনি আজও চিনির সিরা। তেমনি আজও জাগে সাকি পাত্র হাতে পানশালাতে – তেমনি করে সুরমা-লেখা লেখে ডাগর নয়ন-পাতে। তেমনি যখন গুলজার হয় শারাব-খানা, ‘মুশায়েরা’, মনে পড়ে রোকনাবাদের কুটির তোমার পাহাড়-ঘেরা। গোধূলি সে লগ্ন আসে, সন্ধ্যা আসে ডালিম-ফুলি, ইরান মুলুক বিরান ঠেকে, নাই সেই গান, সেই বুলবুলি। হাফেজিয়ায় কাঁদন ওঠে আজও যেন সন্ধ্যা প্রভাত – ‘কোথায় আমার গোপন প্রিয়া কোথায় কোথায় শাখ-ই-নবাত!’ দন্তে কেটে খেজুর-মেতি আপেল-শাখায় অঙ্গ রেখে হয়তো আজও দাঁড়াও এসে পেশোয়াজে নীল আকাশ মেখে, শারাব-খানায় গজল শোনো তোমার কবির বন্দনা-গান; তেমনি করে সূর্য ডোবে, নহর- নীরে বহে তুফান। অথবা তা শোন না গো, শুনিবে না কোনো কালেই; জীবনে যে এল না তা কোনো লোকের কোথাও সে নাই!অসীম যেন জিজ্ঞাসা ওই ইরান-মরুর মরীচিকা, জ্বালনি কি শিরাজ-কবির লোকে তোমার প্রদীপ-শিখা? বিদায় সেদিন নিল কবি শূন্য শারাব পাত্র করে, নিঙ্‌ড়ে অধর দাওনি সুধা তৃষিত কবির তৃষ্ণা হরে! পাঁচশো বছর খুঁজেছে গো, তেমনি আজও খুঁজে ফিরে কবির গীতি তেমনি তোমায় রোকনাবাদের নহর-তীরে!(শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/shakh-e-nobat/
1029
জীবনানন্দ দাশ
জয়জয়ন্তীর সূর্য
চিন্তামূলক
কোনো দিন নগরীর শীতের প্রথম কুয়াশায় কোনো দিন হেমন্তের শালিখের রঙে ম্লান মাঠের বিকেলে হয়তো বা চৈত্রের বাতাসে চিন্তার সংবেগ এসে মানুষের প্রাণে হাত রাখে; তাহাকে থামায়ে রাখে। সে চিন্তার প্রাণ সাম্রাজ্যের উত্থানের পতনের বিবর্ণ সন্তান হ'য়েও যা কিছু শুভ্র র'য়ে গেছে আজ, সেই সোম-সুপর্ণের থেকে এই সূর্যের আকাশে- সে-রকম জীবনের উত্তরাধিকার নিয়ে আসে। কোথাও রৌদ্রের নাম- অন্নের নারীর নাম ভালো ক'রে বুঝে নিতে গেলে নিয়মের নিগড়ের হাত এসে ফেঁদে মানুষকে যে আবেগে যতোদিন বেঁধে রেখে দেয়, যতোদিন আকাশকে জীবনের নীল মরুভূমি মনে হয় যতোদিন শূন্যতার ষোলকলা পূর্ণ হ'য়ে- তবে বন্দরে সৌধের উর্দ্ধে চাঁদের পরিধি মনে হবে;- ততোদিন পৃথিবীর কবি আমি- অকবির অবলেশ আমি ভয় পেয়ে দেখি- সূর্য উঠে; ভয় পেয়ে দেখি- অস্তগামী। যে-সমাজ নেই তবু র'য়ে গেছে, সেখানে কায়েমী মরুকে নদীর মতো মনে ভেবে অনুপম সাঁকো আজীবন গ'ড়ে তবু আমাদের প্রাণে প্রীতি নেই- প্রেম আসে নাকো। কোথাও নিয়তিহীন নিত্য নরনারীদের খুঁজে ইতিহাস হয়তো ক্রান্তির শব্দ শোনে, পিছে টানে অনন্ত গণনাকাল সৃষ্টি ক'রে চলে; কেবলি ব্যক্তির মৃত্যু-গণনাবিহীন হ'য়ে প'ড়ে থাকে জেনে নিয়ে -তবে তাহাদের দলে ভিড়ে কিছু নেই- তবু সেই মহাবাহিনির মতো হ'তে হবে?সংকল্পের সকল সময় শূন্য মনে হয়। তবুও তো ভোর আসে- হঠাৎ উৎসের মতো; আন্তরিকভাবে; জীবনধারণ ছেপে নয়- তবু জীবনের মতন প্রভাবে; মরুর বালির চেয়ে মিল মনে হয় বালিছুট সূর্যের বিস্ময়। মহিয়ান কিছু এই শতাব্দীতে আছে, -আরো এসে যেতে পারে; মহান সাগর গ্রাম নগর নিরুপম নদী- যদিও কাহারো প্রাণে আজ রাত স্বাভাবিক মানুষের মতো ঘুম নেই, তবু এই দ্বীপ, দেশ, ভয়, অভিসন্ধানের অন্ধকারে ঘুরে সসাগরা পৃথিবীর আজ এই মরণের কালিমাকে ক্ষমা করা যাবে; অনুভব করা যাবে স্মরণের পথ ধ'রে চলে; কাজ ক'রে ভুল হ'লে, রক্ত হ'লে মানুষের অপরাধ ম্যামথের নয় কতো শত রূপান্তর ভেঙে জয়জয়ন্তীর সূর্য পেতে হলে। ---------------------------------------------------- গ্রন্থ: বেলা অবেলা কালবেলা
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/joyjoyontir-surjo/
3841
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লজ্জা
প্রেমমূলক
আমার হৃদয় প্রাণ সকলই করেছি দান, কেবল শরমখানি রেখেছি। চাহিয়া নিজের পানে নিশিদিন সাবধানে সযতনে আপনারে ঢেকেছি। হে বঁধু, এ স্বচ্ছ বাস করে মোরে পরিহাস, সতত রাখিতে নারি ধরিয়া– চাহিয়া আঁখির কোণে তুমি হাস মনে মনে, আমি তাই লাজে যাই মরিয়া। দক্ষিণপবনভরে অঞ্চল উড়িয়া পড়ে কখন্‌ যে নাহি পারি লখিতে। পুলকব্যাকুল হিয়া অঙ্গে উঠে বিকশিয়া, আবার চেতনা হয় চকিতে। বদ্ধ গৃহে করি বাস রুদ্ধ যবে হয় শ্বাস আধেক বসনবন্ধ খুলিয়া বসি গিয়া বাতায়নে, সুখসন্ধ্যাসমীরণে ক্ষণতরে আপনারে ভুলিয়া। পূর্ণচন্দ্রকররাশি মূর্ছাতুর পড়ে আসি এই নবযৌবনের মুকুলে, অঙ্গ মোর ভালোবেসে ঢেকে দেয় মৃদু হেসে আপনার লাবণ্যের দুকূলে– মুখে বক্ষে কেশপাশে ফিরে বায়ু খেলা-আশে, কুসুমের গন্ধ ভাসে গগনে– হেনকালে তুমি এলে মনে হয় স্বপ্ন ব’লে, কিছু আর নাহি থাকে স্মরণে। থাক্‌ বঁধু, দাও ছেড়ে, ওটুকু নিয়ো না কেড়ে, এ শরম দাও মোরে রাখিতে– সকলের অবশেষ এইটুকু লাজলেশ আপনারে আধখানি ঢাকিতে। ছলছল-দু’নয়ান করিয়ো না অভিমান, আমিও যে কত নিশি কেঁদেছি; বুঝাতে পারি নে যেন সব দিয়ে তবু কেন সবটুকু লাজ দিয়ে বেঁধেছি– কেন যে তোমার কাছে একটু গোপন আছে, একটু রয়েছি মুখ হেলায়ে। এ নহে গো অবিশ্বাস– নহে সখা, পরিহাস, নহে নহে ছলনার খেলা এ। বসন্তনিশীথে বঁধু, লহ গন্ধ, লহ মধু, সোহাগে মুখের পানে তাকিয়ো। দিয়ো দোল আশে-পাশে, কোয়ো কথা মৃদু ভাষে– শুধু এর বৃন্তটুকু রাখিয়ো। সেটুকুতে ভর করি এমন মাধুরী ধরি তোমাপানে আছি আমি ফুটিয়া, এমন মোহনভঙ্গে আমার সকল অঙ্গে নবীন লাবণ্য যায় লুটিয়া– এমন সকল বেলা পবনে চঞ্চল খেলা, বসন্তকুসুম-মেলা দুধারি। শুন বঁধু, শুন তবে, সকলই তোমার হবে, কেবল শরম থাক্‌ আমারি।
http://kobita.banglakosh.com/archives/422.html
2691
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপনারে নিবেদন
নীতিমূলক
আপনারে নিবেদন সত্য হয়ে পূর্ণ হয় যবে সুন্দর তখনি মূর্তি লভে।  (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/apnare-nibedon/
5582
সুকুমার রায়
কলিকাতা কোথা রে
হাস্যরসাত্মক
গিরিধি আরামপুরী, দেহ মন চিৎপাত, খেয়ে শুয়ে হু হু করে কেটে যায় দিনরাত; হৈ চৈ হাঙ্গামা হুড়োতাড়া হেথা নাই; মাস বার তারিখের কোন কিছু ল্যাঠা নেই; খিদে পেলে তেড়ে খাও, ঘুম পেলে ঘুমিও- মোট কথা, কি আরাম, বুঝলে না তুমিও ! ভুলেই গেছিনু কোথা এই ধরা মাঝেতে আছে যে শহর এক কলকাতা নামেতে- হেন কালে চেয়ে দেখি চিঠি এক সমুখে, চায়েতে অমুক দিন ভোজ দেয় অমুকে । 'কোথায়? কোথায়?' বলে মন ওঠে লাফিয়ে তাড়াতাড়ি চিঠিখানা তেড়ে ধরি চাপিয়ে, ঠিকানাটা চেয়ে দেখি নীচু পানে ওধারে লেখা আছে 'কলিকাতা' - সে আবার কোথারে ! স্মৃতি কয় 'কলিকাতা ' রোস দেখি; তাই ত , কোথায় শুনেছি যেন , মনে ঠিক নাই ত, বেগতিক শুধালেম সাধুরাম ধোপারে ; সে কহিল, হলে হবে উশ্রীর ওপারে। ওপারের জেলেবুড়ো মাথা নেড়ে কয় সে , 'হেন নাম শুনি নাই আমার এ বয়সে ।' তারপরে পুছিলাম সরকারী মজুরে তামাম মুলুক সে ত বাৎলায় 'হুজুরে' বেঙাবাদ বরাকর , ইদিকে পচম্বা , উদিকে পরেশনাথ ,পাড়ি দাও লম্বা ; সব তার সড়গড় নেই কোন ভুল তায় - 'কুলিকাতা কাঁহা' বলি সেও মাথা চুলকায় ! অবশেষে নিরুপায় মাথা যায় ঘুলিয়ে ' 'টাইম টেবিল' খুলি দেখি চোখ বুলয়ে । সেথায় পাটনা পুরী গয়া গোমো মাল্‌দ বজবজ দমদম হাওড়া ও শ্যালদ - ইত্যাদি কত নাম চেয়ে দেখি সামনেই তার মাঝে কোন খানে কলিকাতা নাম নেই !! -সব ফাঁকি বুজ্‌রুকী রসিকতা -চেষ্টা ! উদ্দেশে 'শালা ' বলি গাল দিনু শেষটা।- সহসা স্মৃতিতে যেন লাগিল কি ফুৎকার উদিল কুমড়া হেন চাঁদপানা মুখ কার! আশে পাশে ঢিপি ঢুপি পাহাড়ে পুঞ্জ, মুখ চাঁচা ময়দান, মাঝে কিবা কুঞ্জ ! সে শোভা স্মরণে ঝরে নয়নের ঝরনা ; গৃহিনীরে কহি 'প্রিয়ে !মারা যাই ধর না । তার পরে দেখি ঘরে অতি ঘোর অনাচার - রাখে না কো কেউ কোন তারিখের সমাচার ! তখনি আনিয়া পাঁজি দেখা গেল গণিয়া, চায়ের সময় এল একেবারে ঘনিয়া ! হায়রে সময় নেই, মন কাদে হতাশে- কোথায় চায়ের মেলা! মুখশশী কোথা সে ! স্বপন শূকায়ে যায় আধারিয়া নয়নে , কবিতায় গলি তাই গাহি শোক শয়নে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/519
5057
শামসুর রাহমান
ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুঁকছে
চিন্তামূলক
মাথার ভেতর এক ঝাঁক ছোট পাখি বেশ কিছু দিন থেকে কিচিরমিচির করে চলেছে হামেশা; শুধু রাত্রিবেলা গাঢ় ঘুমে হয়তো-বা নিঝুম নিশ্চুপ থাকে,-অনুমান করি। এভাবেই অস্বস্তিতে কাটছে জীবন। কে আমাকে বলে দেবে হায়, এই উপদ্রুত মাথায় ঝিঁঝির একটানা ধ্বনি কবে হবে শেষ। আজ এটা, কাল সেটা আছে তো লেগেই যেমন কৌতুকপ্রিয় বালকেরা বেড়ালের লেজে ভারি ঘণ্টা বেঁধে দেয়। অকস্মাৎ চোখে পড়ে দূরে ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো ক’রে ধুঁকছে ভীষণ, যেন এই মুহূর্তেই মৃত্তিকায় খসে পড়ে যাবে। অকস্মাৎ অকারণ কার স্মৃতি প্রস্ফুটিত হৃদয়ে বিধ্বস্ত বাগানে?কোনও কোনও দিন একা ছোট ঘরে এক কোণে ব’সে গোধূলি-বেলায় দরবেশী মন নিয়ে কেবলি ভাবতে থাকি,- আকাশ পাতাল এক হয়ে যায়, কখন যে নিজেকে দেখতে পাই ভ্রাম্যমাণ নিঃসঙ্গ পথিক, হেঁটে হেঁটে পেরিয়ে চলেছি মাঠ, নদীতীর, উপত্যকা, উজাড় নগর, কখনও-বা যত্রতত্র কঙ্কালের ঢিবি চোখে পড়ে। কবেকার এইসব মূক গল্পময় ঢিবি, প্রশ্ন ছুড়ে দিই স্তব্ধ, দূর আকাশের দিকে আর ধিক্কারে রক্তাক্ত করি নিজের স্মৃতিকে! হাঁটতে হাঁটতে ধ্যানী আমি থেমে যাই। কী আশ্চর্য, চোখে পড়ে কবেকার সুদূরের দাস-নেতা স্পার্টাকাস তার উৎপীড়িত অথচ সুদৃঢ় সেনাদের চাবুকের প্রহার-লাঞ্ছিত শরীরের গৌরবপ্রদীপ্ত অরুণিমা নিয়ে দাঁড়ালেন আমার সম্মুখে, দীপ্তকণ্ঠে শোনলেন আশ্বাসের শুভবাণী; আমি তার পৌরুষের অনন্য কান্তিতে প্রজ্বলিত হতেই গেলেন মিশে নক্ষত্রের অনাদি জগতে। পিপাসায় ভীষণ শুকিয়ে আসে জিভ, শিশিরের প্রত্যাশায় শূন্যে দৃষ্টি মেলি।আচমকা মনে হয়, বিভ্রম আমাকে শুধু অর্থহীনতার ধোঁয়াশায় টেনে নিচ্ছে, নিরুত্তর জিজ্ঞাসার হামলায় রক্তাক্ত, বিহ্বলবোধ, অসহায় আমি ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে থাকি পানীয়ের ফতুর গেলাশে অন্তহীন। কে আমাকে বলে দেবে গলাভর্তি অত্যাচারী বালি আর কাঁটা থেকে মুক্তি পাওয়ার কসরৎ ঘোর অবেলায়? এক্ষুণি শিখিয়ে দেবে কোন্‌ জাদুবলে? চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে শ্বাপদ ছিঁড়ে খেতে আমাকে মেটাতে ক্ষুধা।এখন সহজে কেউ করে না বিশ্বাস কাউকেই। প্রত্যেকের দুটি চোখ সন্দেহের ধূম্রজালে আচ্ছন্ন এবং সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় মনে জাগে আশঙ্কা, হয়তো কেউ অকস্মাৎ ঠেলে ফেলে দেবে বিশ হাত নিচে। সে মুহূর্তে অন্য কারও অন্তরাত্মা ঘেমে ঘেমে কাদাময় হয় বুলেটের বৃষ্টির আচ্ছন্নতায় ডুবে বিলুপ্তির হিম ভয়ে।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/vangachora-chad-mukh-kalo-kore-dhukche/
1571
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
কিছু-বা কল্পনা
চিন্তামূলক
প্রত্যেকটা প্রসাদ কিছু শূন্যতা রচনা করে যায়, আলোকিত মঞ্চের পিছনে থাকে অন্ধকার, ট্রেন চলে যাবার পরে প্ল্যাটফর্মটা আবার খাঁখাঁ করতে থাকে, নিঃশব্দে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে খোলা জানালায় চক্ষু রাখে মালবাবুর বউ, এই ছোট্ট শহর ছেড়ে তার কখনও দিল্লি বা লখনউ যাওয়া হয়নি। খানিকটা এগিয়েছিল, তারপর–কে জানে কেন–এগোয়নি জেলা-বোর্ডের রাস্তাটা, ছায়ায়-ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে লোকটা গিয়ে ঠাঠা- রোদ্দুরের মধ্যে নেমে পড়ে, চক্রাকারে ঘুরতে-ঘুরতে কিছু-একটা নির্ভুল তাক করে নেমে আসে চিল। চার-পাঁচ দশক ধরে এই সমস্ত দৃশ্যের মিছিল দেখে যাচ্ছে কবি। কিছু দেখছে, কিছু-বা-কল্পনা করছে। তার বাগানের সমস্ত করবী সাদা নয়, কিছু হলদে, কিছু লাল। সে তার সকাল থেকে কিছু ফুল কুড়িয়ে আস্তেসুস্থে হেঁটে চলে যায় পড়ন্ত সূর্যের দিকে। আমরা তার যাওয়া দেখতে থাকি। রৌদ্র নেই, এখন ছায়ায় তার পাকা চুলের মধ্যে খেলা করছে বিকেলের হাওয়া।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1579
2774
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইদিলপুরেতে বাস নরহরি শর্মা
ছড়া
ইদিলপুরেতে বাস নরহরি শর্মা, হঠাৎ খেয়াল গেল যাবেই সে বর্মা। দেখবে-শুনবে কে যে তাই নিয়ে ভাবনা, রাঁধবে বাড়বে, দেবে গোরুটাকে জাবনা– সহধর্মিণী নেই, খোঁজে সহধর্মা। গেল তাই খণ্ডালা, গেল তাই অণ্ডালে, মহা রেগে গাল দেয় রেলগাড়ি-চণ্ডালে, সাথি খুঁজে সে বেচারা কী গলদ্‌ঘর্মা– বিস্তর ভেবে শেষে গেল সে কোডর্মা।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/idilpurete-bas-norhori-shorma/
2732
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি চঞ্চল হে
প্রেমমূলক
আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসি। দিন চলে যায়, আমি আনমনে তারি আশা চেয়ে থাকি বাতায়নে, ওগো প্রাণে মনে আমি যে তাহার পরশ পাবার প্রয়াসী। আমি সুদূরের পিয়াসি। ওগো সুদূর,বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি। মোর ডানা নাই, আছি এক ঠাঁই, সে কথা যে যাই পাসরি।আমি উৎসুক হে, হে সুদূর, আমি প্রবাসী। তুমি দুর্লভ দুরাশার মতো কী কথা আমায় শুনাও সতত। তব ভাষা শুনে তোমারে হৃদয় জেনেছে তাহার স্বভাষী। হে সুদূর,আমি প্রবাসী। ওগো সুদূর,বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি। নাহি জানি পথ, নাহি মোর রথ সে কথা যে যাই পাসরি। ‘আমি উন্মনা হে, হে সুদূর,আমি উদাসী। রৌদ্র-মাখানো অলস বেলায় তরুমর্মরে, ছায়ার খেলায়, কী মুরতি তব নীলাকাশশায়ী নয়নে উঠে গো আভাসি। হে সুদূর,আমি উদাসী। ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর, তুমি যে বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি। কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার সে কথা যে যাই পাসরি।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ami-chonchol-he/
805
জসীম উদ্‌দীন
জেলে গাঙে মাছ ধরিতে যায়
গীতিগাথা
জেলে গাঙে মাছ ধরিতে যায়, পদ্মা নদীর উজান বাঁকে ছোট্ট ডিঙি নায়। পদ্মা নদী কাটাল ভারী, চাক্কুতে যায় কাটা, তারির পরে জেলের তরী করে উজান+ভাঁটা। জলের উপর শ্যাওলা ভাসে, স্রোতের ফুলও ভাসে, তারির পরে জেলের তরী ফুলেল পালে হাসে; তারি সাথে ভাসায় জেলে ভাটীর সুরে গান, জেলেনী তার হয়ত তাহার সাথেই ভেসে যান। জেলে গাঙে মাছ ধরিতে যায়, জেলেনী বউ জাল যে বুনায় বসে ঘরের ছায়। সূতোর পরে সুতো দিয়ে বুনোয় দীঘল জাল, তারির সাথে বুনিয়ে চলে দীঘল মনের হাল। জেলে তাহার নেই যে ঘরে, ভোরের কোকিল ডাকে জেলেনী বউ আপন মনে জাল বুনাতেই থাকে। জেলে গেছে মাছ ধরিতে হায়, পূব কোণেতে মেঘের গায়ে চক্কর দিয়ে যায়। বাও ডাকিল, ঢেউঁ হাঁকিল তল তলা নাওখানি, জেলেনী বউ ঘরের থেকে সেঁচছে তাহার পানি। বৈষম শাপট! জেলের কুঁড়ে ভাঙবে যে এই বেলা গাঙের থেকে দিচ্ছে জেলে বৈঠাতে তার পেলা। গাঙে কাঁপে জেলের তরী, ঘরে জেলের প্রিয়া, মধ্যে তারি আসন-যাওন করছে জেলের হিয়া। জেলে ভাবে ঘরের কথা, বউ যে জেলের তরী, এরি মধ্যে ঝড় পাগেলা কোথায় যে যায় সরি। লাভের মাঝে হাজরা তলা দুগ্ধেতে যায় ভাসি, গঙ্গা দেবীর কপাল ভালো পূজায় উঠেন হাসি! জেলে গেছে মাছ ধরিতে বাঁকে, জেলেনী বোর মন ভালো না বলতে নারে কাকে! জাল বুনিতে ভুল হয়ে যায়, সূতো কেবল ছেঁড়ে জেলে বাঁকের বগীলা তার মন নিয়েছে কেড়ে। জলের ঘাটে কলস তাহার ভরেও নাহি ভরে, ইচ্ছা করে কলসীটিরে বাঁধি মাথার কেশে, ভাসিয়ে দেয় জেলে তাহার রয় যে বে গান দেশে। জেলে বাঁকে মাছ ধরিতে যায়, কূল হারা সেই গাঙে কাহার কুল লইয়া হায়! অথই নদীর অথই পানি জালে না পায় তাল অথই মনের ব্যথা জেলের তার চেয়ে জঞ্জাল। কত নদী পেরিয়ে এলো ততই নদী ছাড়ি, ব্যথার নদী উথল পাথল জমছেনাক পাড়ি। মাটির মায়া কাটালো যে ভাটীর সুরে হায়, কেন তাহার পরাণ টানে সুদূর ভাটী গাঁয়!
https://banglarkobita.com/poem/famous/764
5848
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
মৃত্যুদণ্ড
শোকমূলক
একটা চিল ডেকে উঠলো দুপুর বেলা বেজে উঠলো, বিদায়, চতুর্দিকে প্রতিধ্বনি, বিদায় বিদায়, বিদায়! ট্রামলাইনে রৌদ্র জ্বলে, গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েছিলাম আমি হঠাৎ যেন এই পৃথিবী ডেকে দেখালো আমায় কাঁটা-বেধাঁনো নগ্ন একটি বুক; রূপ গেল সব রূপান্তরে আকাশ হল স্মৃতি ঘুমের মধ্যে ঘুমন্ত এক চোখের রশ্মি দেখে অন্ধকারে মুখ লুকালো একটি অন্ধকার। হঠাৎ যেন বাতাস মেঘ রৌদ্র বৃষ্টি এবং গলির মোড়ের ঐ বাড়িটা, একটি-দুটি পাখি চলতি ট্রামের অচেনা চোখ, প্রসেশনের নত মুখের শোভা সমস্বরে ডেকে বললো, তোমায় চিরকালের বিদায় দিলাম, চিরকালের বিদায় দিলাম, বিদায়; চতুর্দিকে প্রতিধ্বনি, বিদায়, বিদায় বিদায়।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1899
3646
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভক্তিভাজন
নীতিমূলক
রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম। পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/voktivajon/
2455
মোহাম্মদ কামাল
বাঙালি রক্তের মত লাল-1 -
স্বদেশমূলক
কুড়ালের ছায়া দুলে উঠে যদি বলে যায় আর ফাল্গুনে পলাশ না ফোটে, শিমুল নাফোটে, না ফোটে ডালিম উস্কানির আলো কোন লাল ফুল! দীর্ঘদেহী কুড়ালের ছায়া দুলে ওঠে বাঙলায়.. ইতিহাস আছে, কোন কুড়াল শাসন ভীত ইতিহাস? বাঙালি রক্তের মত লাল ফুল ফুটবেই অনন্ত ফাল্গুন.
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/12/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf-%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a4-%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b2-1-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%be/
4599
শামসুর রাহমান
কী তবে আমার কাজ
মানবতাবাদী
কী তবে আমার কাজ? কেউ বলে, ময়দানে গিয়ে স্টেজে উঠে আগুন-ঝরানো, জনতা-জাগানো বক্তৃতায় মেতে ওঠো। কেউ বলে, যত পারো লিফলেট লিখে সর্বত্র ছড়াও।এইসব পরামর্শ শুনে শুনে দু’বেলা কানের পর্দা ফেটে যেতে চায়! উত্তেজক মিছিলে প্রায়শ সোৎসাহে সামিল হয়ে স্লোগান ছড়ালে হবে কি সার্থক এই মানব জীবন শান্তশিষ্ট এ বান্দার?বস্তুত এসব কাজে দক্ষতা দেখানো, বাহবা কুড়ানো ক্ষণে ক্ষণে সাধ্যাতীত আমার, বরং এর চেয়ে ঢের ভালো নিজ ঘরে বসে কোনও কবিতার ধ্যানে কিছু সময় কাটিয়ে লিখে ওঠা। সে-কবিতা যদি মানুষকে দিন বদলের কাজে প্রেরণা জোগায় বহুবার, তাহ’লে জীবন এই নগণ্য আমার সার্থকতা পেয়ে যাবে, অন্তরালে ধন্য হবে কবি।  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ki-tobe-amar-kaj/
3105
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনে তব প্রভাত এল
চিন্তামূলক
জীবনে তব প্রভাত এল নব-অরুণকান্তি। তোমারে ঘেরি মেলিয়া থাক শিশিরে-ধোওয়া শান্তি। মাধুরী তব মধ্যদিনে শক্তিরূপ ধরি কর্মপটু কল্যাণের করুক দূর ক্লান্তি।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jibone-tobo-provat-elo/
4876
শামসুর রাহমান
না জানি কোন্‌ বিপদ
মানবতাবাদী
আমি কি হারিয়ে ফেলে পথ এসেছি এখানে এই জনহীন প্রায় অবাস্তব জায়গায়? চারদিকে দৃষ্টি মেলে দেখতে পাচ্ছি না মানব-সন্তান, পশুপাখি কাউকেই, এমনকি গাছপালা, হ্রদ তা-ও নেই।হঠাৎ কোত্থেকে এক অর্ধনগ্ন পুরুষ নাচতে শুরু করে এবং নিমেষে জায়গাটা অপার্থিব মনে হলো আর আমি ডানা মেলে উড়ে যেতে-যেতে মেঘে মিশে যেতে থাকি। পাখি হয়ে গেছি ভেবে পক্ষী-সমাজের রীতি, নীতি মেনে নিতে থাকি।আমাকে কে যেন বলে কানে কানে, ‘তুমি এ কার নির্দেশে মানবের রীতি-নীতি বিসর্জন দিয়ে উড়ে যাচ্ছো দিব্যি মনের খেয়ালে মেঘলোকে? ডানা খসে যাচ্ছে অতি দ্রুত, এখন আমি কি পতনের ধ্বংসকণা হয়ে যাবো?২ আমি কি তোমার দোরে গিয়ে কড়া নেড়ে নেড়ে শুধু ক্লান্ত হয়েই নিজ বাসগৃহে ফিরে এসে, হায়, হাতে তুলে নেবো কবিতার বই! তার মুখ যদি দেখতে পেতাম, যদি তার কথা শুনতে পেতাম, যদি তার দু’টি মায়াবী নয়ন আমার চোখের ধূসর মরুতে দিতো ঢেলে সুধা, আমার হৃদয় হয়ে যেতো এক পুষ্পবাগান!গৃহিণী আমার পাশে এসে শোয়, নানা কাজে খুব ক্লান্ত শরীরে ঘুম এসে চুমো খায় তার চোখে। কবিতার বই বুকে রেখে আমি দেখতে না-পাওয়া দয়িতার কথা ভাবতে গিয়েই কবিতার কিছু পঙ্‌ক্তি আমার মনের রুক্ষ বাগানে চকিতে ফুল হয়ে ফোটে।৩ অনেকটা পথ আমাকে হেঁটে যেতেই হবে, এই সত্য রৌদ্রের মতো ঝলমল করে বুঝিয়ে দিচ্ছে আমাকে। দৃষ্টি দূরে প্রসারিত করে খানিক ভাবলেই বুঝতে পারছি, আমার এ ভ্রমণ তেমন সহজ হবে না। এই তো ইতিমধ্যেই পায়ে ফোস্কা পড়েছে। ক্ষণে ক্ষণে মনে হচ্ছে, একটু বসে জিরিয়ে নিলে মন্দ হতো না। পরমুহূর্তেই মনে হলো, এই অবেলায় এখানে থামলে কে জানে কোন্‌ বিপদ লাফিয়ে পড়বে পথিকের ওপর। তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতেই কয়েকটি পাথর আমার দিকে ধেয়ে আসে। থমকে দাঁড়াতেই যেন কার কান্নার রোল আমাকে ভয়ার্ত করে তোলে। এমন ডুকরে ডুকরে কে কাঁদছে? সে কেন আসছে না আমার দিকে নির্ভয়ে?৪ আমাকে কোথায় তুমি কোন্‌ পথে নিয়ে যাবো পারবো কি সহজে বুঝতে? ভুল পথে চলে যাওয়া মুশকিল নয় বটে, তা বলে কি থাকবো অনড়? যেতে হবে বহুদূরে উজিয়ে সকল বাধা, পথ চেয়ে রয়েছে অনেকে। ডাক দিয়ে যাবো জোরে ডানে বামে সবদিকে, শুনুক, নাই-বা শুনুক কেউ।৫ এই যে আখেরে এই ঘোর অন্ধকারে এসে গেছি জনহীনতায়, ক্রমাগত ও রাম, রহিম, বলো ভাইসব, কোথায় তোমরা? আমাকে আশ্বস্ত করো বজ্রধ্বনি ছড়িয়ে চৌদিকে। সেই কবে থেকে এই ধ্বনি শোনার আশায় আছি দিনরাত জেগে আর আঁকছি কত না ছবি কাঠ-কয়লায় দেয়ালে দেয়ালে। আমাদের অনেক সাথির রক্তে-লেখা ইতিহাস হচ্ছে না কি উচ্চারিত রাজপথে, বস্তিতে বস্তিতে, ছাত্রাবাসে? দিকে দিকে জয়ধ্বনি শোনার আশায় এ বাংলার বৃদ্ধ, প্রৌঢ়, যুবক, যুবতী কান পেতে রয়েছে সর্বদা আর কাঙ্ঘিত সেদিন দিকে দিকে উড়বে গৌরবে আমাদের প্রাণপ্রিয় জাতীয় পতাকা আর জনগণ গড়বে নতুন ইতিহাস।  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/na-jani-kon-bipod/
201
কাজী নজরুল ইসলাম
অভিযান
মানবতাবাদী
নতুন পথের যাত্রা-পথিক চালাও অভিযান ! উচ্চ কণ্ঠে উচ্চার আজ - “মানুষ মহীয়ান !” চারদিকে আজ ভীরুর মেলা , খেলবি কে আর নতুন খেলা ? জোয়ার জলে ভাসিয়ে ভেলা বাইবি কি উজান ? পাতাল ফেড়ে চলবি মাতাল স্বর্গে দিবি টান্ ।। সরল সাজের নাইরে সময় বেরিয়ে তোরা আয় , আজ বিপদের পরশ নেব নাঙ্গা আদুল গায় । আসবে রণ-সজ্জা করে , সেই আশায়ই রইলি সবে ! রাত পোহাবে প্রভাত হবে গাইবে পাখি গান । আয় বেরিয়, সেই প্রভাতে ধরবি যারা তান ।। আঁধার ঘোরে আত্নঘাতী যাত্র-পথিক সব এ উহারে হানছে আঘাত করছে কলরব ! অভিযানে বীর সেনাদল ! জ্বালাও মশাল, চল্ আগে চল্ । কুচকাওয়াজের বাজাও মাদল , গাও প্রভাতের গান ! ঊষার দ্বারে পৌছে গাবি ‘জয় নব উত্থান !’
https://banglarkobita.com/poem/famous/162
3100
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন যখন শুকায়ে যায়
ভক্তিমূলক
জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো। সকল মাধুরী লুকায়ে যায়, গীতসুধারসে এসো।কর্ম যখন প্রবল-আকার গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার, হৃদয়প্রান্তে হে নীরব নাথ, শান্তচরণে এসো।আপনারে যবে করিয়া কৃপণ কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন, দুয়ার খুলিয়া হে উদার নাথ, রাজ-সমারোহে এসো।বাসনা যখন বিপুল ধুলায় অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায় ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র, রুদ্র আলোকে এসো।২৮ চৈত্র, ১৩১৬ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jibon-jokhon-shukaye-jay/
2279
মহাদেব সাহা
স্বপ্নপ্রোথিত সত্তা
চিন্তামূলক
আমার স্বপ্নকে কারা রাত্রিদিন এমন পাহারা দিয়ে ফেরে মনে হচ্ছে এই একগুচ্ছ স্বপ্নকে নিয়ে তারা অধিক চিন্তিত শলা-পরামর্শে ব্যস্ত, গেরিলারও চেয়ে বেশি ভীত আমার স্বপ্নকে নিয়ে তারা; মাইনেরও চেয়ে বেশি ক্ষতিকর একগুচ্ছ সোনালি স্বপ্নের ডালপালা তাই তারা সর্বদা শঙ্কিত এই বক্ষলগ্ন স্বর্ণচাঁপাগুলিকে নিয়েই। তারাও কি জানে এই স্বপ্নগুচ্ছ হয়তো একদা নকশীকাঁথার মতো দেশজুড়ে আঁকবে একটি নাম, তৃণগুল্ম ধীরে ধীরে হবে সেই স্বপ্নের আহার মেঘে মেঘে নবীন মল্লার বুনে দিয়ে আসবে গোপনে নক্ষত্রপুঞ্জের খোলা বিশাল তোরণ অনায়াসে করবে রচনা, আমার স্বপ্নকে তাই রাত্রিদিন এমন করছে কেউ তাড়া মাঝে মাঝে হঠাৎ চড়াও হয়ে করছে প্রবল আক্রমণ আমার স্বপ্নকে নিয়ে মনে হয় ওরা আজ সর্বাধিক ভীত। ওরাও কি জানে এই স্বপ্নের ভিতর রাবণের মৃত্যুবরণ লুক্কায়িত আছে এই শাদামাঠা স্বপ্নের ভিতরে জ্যোতিমৃয় ভবিষ্যৎ আছে মুখ গুঁজে কি রঙমহল, মিনার, গম্বুজ, পাথরের প্রাণবন্ত পাখি প্রজ্বলিত প্রকোষ্ঠে কোথাও দাউ দাউ দরুণ আগুন এই স্বপ্নের ভিতরে কী যে রৌদ্রকরোজ্জ্বল সবুজাভ দিন আর কি জেনেছে তাও? তাই আমার স্বপ্নের পিছে লেলিয়ে দিয়েছে এতো সশস্ত্র প্রহরী বুটের আওয়াজ ঘন ঘন কানে এলে যাতে এই স্বপ্ন অন্তর্হিত হয়; কিন্তু ওরা তো জানে না এই স্বপ্নকে আমি কতোদিন শত্রু ছাউনির পাশে রেখে কতোদিন সশব্দ কামানের মুখে ফেলে কতোদিন যুদ্ধের মহড়া দিয়ে তাকে করেছি প্রস্তত এতোখানি। আমার স্বপ্ন তো আজ নিজেই সইতে পারে সব শোকাবহ ঘটনার বেগ, বিদ্যুৎ কি অগ্নির ছোবল আমার স্বপ্নের মধ্যে কখন ঢুকেছে এই বিশাল বেদনা তাই তাকে দিয়েছে ব্যঞ্জনা সেই একটি নামের স্বপ্নেরও অধিক সেই স্বপ্নভেদী নাম, স্বপ্ন ভেদ করে আমার হৃদয়ও ভেদ করে সেই মৌন মগ্ন এপিটাফ!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1354
3562
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাহির হতে বহিয়া আনি
চিন্তামূলক
বাহির হতে বহিয়া আনি সুখের উপাদান। আপনা-মাঝে আনন্দের আপনি সমাধান।    (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bahir-hote-bohia-ani/
5893
সুবোধ সরকার
চোখের
মানবতাবাদী
মানুষের চোখ থেহে গড়িয়ে পড়া চোখের জল ভালো লাগে না আমার সবচেয়ে বড় অপচয়ের নাম চোখের জল অসহ্য, সরিয়ে নাও তোমার চোখ, আমি তাকাব নাখেতে দিতে না পেরে বাবা চলে গেলেন, মেঘলা আকাশ মায়ের চোখ ফেটে সারাদিন শুধু জল নয় যেন একজন নারী গলে গলে বেরিয়ে আসত । পাঁচ বছর বাদে ভাইকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ মা, আমার অসহ্য লাগে চোখের জল । চুপ করো ।চোখের জলে লাগল জোয়ার, কথাটা দারুণ কিন্তু মানে কি ? একটা মানুষ চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ায় দেয়াল থেকে হাতে তুলে নেয় টাঙ্গি তারপর তুলে ধরে আকাশের দিকে আকাশে কে থাকে ? ভগবান ? পরিষ্কার একটা কথা বলি শোনো : তুমি গরিব তোমার জন্য কোন ভগবান নেই শনি পুজো না করে সেই টাকায় কনডোম্ কেনো রাসকেল । রাতারাতি ভারতবর্ষ পাল্টে যাবে ।চোখের জলে কিছু হয় না একটা জাতি উঠে দাঁড়ায় তিনটি কারণে : মাথার জোরে, গায়ের জোরে, মনের জোরে । তোমরা যারা ভালো করে খেতে পাও না তাঁদের চোখে এতো জল আসে কি করে ?মাকেও দেখতাম যেটুকু খাবার জুটতো ভাইবোনদের খাইয়ে নিজে চাঁচি মুখে দিয়ে বাসন মাজতে মাজতে কাঁদতেন গরিবের কি চোখের জল বেশি হয় ?চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া চোখের জল সহ্য করতে পারি না আমি বাইপাসের ধারে একটা নগ্ন মেয়ের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল গালে গাল থেকে একটা বিন্দু গিয়ে পড়ল স্তনের বোঁটায় আমি অবচেতনের ঐশ্বর্য লিখতে আসিনি আমার জামাটা খুলে তাঁকে দিই, বলি ওঠো একটা কুলাঙ্গার তোমাকে ভালবেসে ফেলে চলে গেছে তার জন্য তোমার জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে না ।একটা জাতি উঠে দাঁড়ায় একটা মানুষ উঠে দাঁড়ায় পরিষ্কার তিনটি কারণে দরকার যেকোনো একটা জোর হয় গায়ের নয় মাথার নয় মনের । তাজ বেঙ্গলের উল্টোদিকে, মাঝরাত্রে, একটি বালক হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে এই শালা কাঁদছিস কেন রে ? ছুটে গিয়ে ভেতরে ঢুকে কামড়ে দিতে পারছিস না ?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9a%e0%a7%8b%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%b2-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7-%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0/
4475
শামসুর রাহমান
একটি গাধাকে দেখি
রূপক
একটি গাধাকে আমি প্রতিদিন দেখি আশে পাশে, শহরে নিঃসঙ্গ ভিড়ে,আমার সান্নিধ্যে দেখি রোজ আওলাদ হোসেন লেনের মোড়ে, বাবুর বাজারে, ইসলামপুরে, বঙ্গবন্ধু অ্যাভেন্যুর ফুটপাথে, সিদ্ধেশ্বরী, পলাশী বেইলী রোডে, বুড়িগঙ্গা নদীটির তীরে মিটফোর্ড হাসপাতালের কাছে, ধানমন্ডি লেকের ওপারে। হঠাৎ কখনো রমনা পার্কে তার দেখা পাওয়া যায়, একটি গাধার সঙ্গে ঘুরে ফিরে দেখা হয় প্রত্যহ আমার।তাকে দেখে মনে হয়, যেন দার্শনিক, অস্তিত্ব কি অনস্তিত্ব নিয়ে চিন্তাবিষ্ট খুব চলেছেন একা, তাবৎ বস্তুর প্রতি বড়ো উদাসীন; এবং কর্তব্যাক্লান্ত ট্রাফিক পুলিশ, ক্রুশচিহ্ন আইল্যান্ডে, বেলা অবেলায় তাকে ঈষৎ মুচকি হেসে পথ ছেড়ে দ্যায় বার বার।গাধাটির কথা বলিহারি, কিছুই দেখে না যেন চোখ মেলে, পথ হাঁটে একা-একা, বিস্তর ধূলায় আরবী রেখার মতো নক্‌শা তৈরী ক’রে অচেতনভাবে। কাকে বলে আয়কর ফাঁকি দেয়া, সুরক্ষিত বাক্সের ভেতর থেকে ব্যালট পেপার চুরি আর টিকিটবিহীন রেল ভ্রমণের সাধ মেটানো, বস্তুত জানে না সে। কখনো ঘেসেড়া ডাকে, খচ্চরের ভিড় লুব্ধতায় তার খুব অন্তরঙ্গ হ’তে চায়। মনে পড়ে রজকের পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো বহুদিন, আজ রজকের ঘাট থেকে দূরে, বহুদূরে চলে এসেছে সে, স্মৃতি ছেঁড়া দূববার মতন ওড়ে, মাঝে মাঝে অপরাহ্নে ঘাসের সৌন্দর্য দেখে ভালো লাগে তার। কৃপাপ্রার্থী নয় কারো, তবু বিশ্বাসঘাতকতার চুমো নিয়ে গালে গূঢ় ডুমুর ফুলের কাছে কামগন্ধহীন রজকিনী প্রেম চায়।তাঁর চক্ষুদ্বয়ে দ্বিপ্রহরে চিলডাকা আকাশের প্রতিধ্বনি, কবিতার লাইনের মতো অনুকরণকাতর অবরুদ্ধ নগরীর শব্দাবলী, দূর অনার্য রাত্রির জ্যোৎস্না-বিহ্বলতা, মায়া কাননের ফুল, পরীর দেশের রহস্যময়তা আর নিগৃহীত কোবিদের মেধার রোদ্দুর মাথার ভেতরে তার এজমালী তত্ত্বের তথ্যের দীপাবলী, আত্তারের সহজিয়া গল্প ছলে সুসমাচারের স্নিগ্ধ কোমল গান্ধার।আসিসির সন্ত ফ্রান্সিসের মতো নিজেকে অভুক্ত রেখে কৃশ হয়, হাঁটে চরাচরব্যাপী ঝড়ে, বৃষ্টিপাতে আর তুষামৌলির দিকে দৃষ্টি রেখে পর্বতারোহণে মাতে, সঙ্গীহীনতায় নিজের সঙ্গেই কথা বলে বারংবার। মুখমন্ডলের রুক্ষতা ক্রমশ বাড়ে, দাঁতে ক্ষয়, পায়ে মস্ত ক্ষত, শুধু চক্ষুদ্বয় তার সন্তের চোখের মতো বড়ো জ্বলজ্বলে- যা উপোসে, কায়ক্লেশে, ক্রমাগত উর্ধ্বারোহণে এমন হয়।কুষ্ঠরোগীদের ক্ষতে হাত রাখে, চুমো খায় গলিত ললাটে দ্বিধাহীন বারংবার, যাত্রা করে দুর্ভিক্ষের প্রতি, মড়কের প্রতি, নানাদেশী শীর্ণ উদ্বাস্তুর প্রতি, বিকলাঙ্গ শিশুদের প্রতি, অন্ধের শিবিরে আর মৃত্যুপথযাত্রী জীর্ণ পতিতার প্রতি, যোজন যোজনব্যাপী কাঁটাতর, নিযাতিত রাজবন্দীদের প্রতি, যাত্রা করে বধ্যভূমি আর ফাঁসির মঞ্চের প্রতি। এবং প্রকৃত পরী তার পদ্মপাতা-কানে চুমো খায়, কোজাগরী পূর্ণিমায়, ব্যাকুল সে খোঁজে সেই চুম্বনের মানে।   (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekti-gadhake-dekhi/
4515
শামসুর রাহমান
এমন বর্ষার দিনে
প্রেমমূলক
চল্লিশটি বর্ষার সজল স্পর্শ তোমাকে আকুল করে আজো, আজো দেখি তুমি জানালার কাছ ঘেঁষে বাইরে তাকিয়ে আষাঢ়ের জলধারা দ্যাখো খুব মুগ্ধাবেশে; মনে হয়, আষাঢ় তোমার মন আর হৃদয় শ্রাবণ। তুমি এই তো সেদিন ঘন কালো মেঘদল দেখে, শুনে বৃষ্টির জলতরঙ্গ বল্‌লে নিবিড় মেদুর স্বরে, ‘এ বৃষ্টি আমার, এই বর্ষা আমাকে সস্নেহে তার দীর্ঘ আঙুলে ছুঁয়ে যায়।এখন দেখছি আমি কবেকার তোমার আঠারো বছরকে চুমো খাচ্ছে আনন্দে নিভৃতে খোলা ছাদে কাঁচের গুঁড়োর মতো বৃষ্টি। বাদল দিনের ফুল কদমের বুনো ঘ্রাণে শিহরিত তুমি ক্ষণে ক্ষণে। এমন বর্ষার দিনে তোমার কি সাধ জাগে কেউ নিরিবিলি টেলিফোনে ‘রাধা’ ব’লে ডাকুক তোমাকে?  (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/emon-borshar-dine/
5795
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
দ্বারভাঙা জেলার রমণী
রূপক
হাওড়া ব্রীজের রেলিং ধরে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল দ্বারভাঙা জেলা থেকে আসা টাট্‌কা রমনী ব্রীজের অনেক নিচে জল, সেখানে কোনো ছায়া পড়ে না কিন্তু বিশাল এক ভগবতী কুয়াশা কলকাতার উপদ্রুত অঞ্চল থেকে গড়িয়ে এসে সভ্যতার ভূমধ্য অরিন্দে এসে দাঁড়ালো সমস্ত আকাশ থেকে খসে পড়লো ইতিহাসের পাপমোচানবারী বিষণ্ণতা ক্রমে সব দৃশ্য, পথ ও মানুষ মুছে যায়, কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু রইলো সেই লাল ফুল-ছাপ শাড়ি জড়ানো মূর্তি রেখা ও আয়তনের শুভবিবাহমূলক একটি উদাসীন ছবি- আকস্মাৎ ঘুরে গাঁড়ালো সে, সেই প্রধানা মচকা মাগি, গোঠের মল ঝামড়ে মোষ তাড়ানোর ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলো, ইঃ রে-রে-রে-রে- মুঠো পিছলোনো স্তনের সূর্যমুখী লঙ্কার মতো বোঁটায় ধাক্কা মারলো কুয়াশা পাছার বিপুল দেলানিতে কেঁপে উঠলো নাদব্রহ্ম অ্যাক্রোপলিসের থামের মতো উরুতের মাঝখানে ভাটফুলে গন্ধ মাখা যোনির কাছে থেমে রইলো কাতর হওয়া ডৌল হাত তুলে সে আবার চেঁচিয়ে উঠলো, ইঃ রে-রে-রে-রে- তখন সর্বনাশের কাছে সৃষ্টি হাঁটু গেড়ে বসে আছে তখন বিষণ্নতার কাছে অবিশ্বাস তার আত্মার মুক্তিমূল্য পেয়ে গেছে… সব ধ্বংসের পর শুধু দ্বারভাঙা জেলার সেই রমণীই সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো কেননা ‌ঐ মুহূর্তে সে মোষ তাড়ানোর স্বপ্নে দেখছিল।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1866
392
কাজী নজরুল ইসলাম
প্রতিবেশিনী
প্রেমমূলক
আমার ঘরের পাশ দিয়ে সে চলত নিতুই সকাল-সাঁঝে। আর এ পথে চলবে না সে সেই ব্যথা হায় বক্ষে বাজে।আমার দ্বারের কাছটিতে তার ফুটত লালী গালের টোলে, টলত চরণ, চাউনি বিবশ কাঁপত নয়ন-পাতার কোলে – কুঁড়ি যেমন প্রথম খোলো গো! কেউ কখনও কইনি কথা, কেবল নিবিড় নীরবতা সুর বাজাত অনাহতা গোপন মরম-বীণার মাঝে। মূক পথের আজ বুক ফেটে যায় স্মরি তারই পায়ের পরশ বুক-খসা তার আঁচর-চুমু, রঙিন ধুলো পাংশু হল, ঘাস শুকাল যেচে বাচাল জোড়-পায়েলার রুমঝুমু!আজও আমার কাটবে গো দিন রোজই যেমন কাটত বেলা, একলা বসে শূন্য ঘরে – তেমনি ঘাটে ভাসবে ভেলা – অবহেলা হেলাফেলায় গো! শুধু সে আর তেমন কর মন রবে না নেশায় ভরে আসার আশায় সে কার তরে সজাগ হয়ে সকল কাজে।ডুকরে কাঁদে মন-কপোতী – ‘কোথায় সাথির কূজন বাজে? সে পা-র ভাষা কোথায় রাজে?’(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/protibeshini/
5619
সুকুমার রায়
ট্যাঁশ গরু
হাস্যরসাত্মক
ট্যাঁশ্ গরু গরু নয়, আসলেতে পাখি সে; যার খুশি দেখে এস হারুদের আফিসে। চোখ দুটি ঢুলু ঢুলু, মুখখান মস্ত, ফিট্‌ফাট্ কালোচুলে টেরিকাটা চোস্ত। তিন-বাঁকা শিং তার ল্যাজখানি প্যাঁচান- একটুকু ছোঁও যদি, বাপরে কি চ্যাঁচান! লট্খটে হাড়গোড় খট্‌খট্ ন'ড়ে যায়, ধম্‌কালে ল্যাগ্‌ব্যাগ চমকিয়ে প'ড়ে যায়। বর্ণিতে রূপ গুণ সাধ্য কি কবিতার, চেহারার কি বাহার- ঐ দেখ ছবি তার। ট্যাঁশ্ গরু খাবি খায় ঠ্যাস্ দিয়ে দেয়ালে, মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলে না জানি কি খেয়ালে ; মাঝে মাঝে তেড়ে ওঠে, মাঝে মাঝে রেগে যায়, মাঝে মাঝে কুপোকাৎ দাঁতে দাঁত লেগে যায়।খায় না সে দানাপানি- ঘাস পাতা বিচালি খায় না সে ছোলা ছাতু ময়দা কি পিঠালি; রুচি নাই আমিষেতে, রুচি নাই পায়েসে সাবানের সুপ আর মোমবাতি খায় সে। আর কিছু খেলে তার কাশি ওঠে খক্‌খক্, সারা গায়ে ঘিন্ ঘিন্ ঠ্যাং কাঁপে ঠক্‌ঠক্। একদিন খেয়েছিল ন্যাকড়ার ফালি সে- তিন মাস আধমরা শুয়েছিল বালিশে। কারো যদি শখ্ থাকে ট্যাঁশ গরু কিনতে , সস্তায় দিতে পারি,দেখ ভেবে চিন্তে।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/tyash-goru/
5259
শামসুর রাহমান
সন্ধ্যাভাষা
সনেট
নও বিদেশিনী, বাংলাই বলো, তবু মাঝে মাঝে বুঝি না তোমার ভাষা পুরোপুরি, ফলে বেশ ভুল বোঝাবুঝি হয়, যেন জমে মনে, অন্তর্গত ফুল কেমন মুষঢ়ে পড়ে এবং বসে না মন কাজে। কখনো কখনো এরকম হয় ভোরে কিংবা সাঁঝে কয়লার গুঁড়ো আর ধুলোবালি ছায়ায় পুতুল হয়ে আসে, চিকচিকে মরীচিকা এবং অকূল দরিয়া আছড়ে পড়ে, ভ্রান্তির অর্কেস্ট্রা তীব্র বাজে।প্রজাপতি আর জোনাকিরা দলে দলে আজকাল আমার চৌদিকে গড়ে পাঁচিল, নির্বিঘ্নে থাকে, বলে- ‘যাকে ভালোবাসো, কখনো সে কথার অস্পষ্ট জাল ছড়িয়ে প্রয়োগ করে সান্ধ্যভাষা কড়ি ও কোমলে, আত্মহননের অন্ধ ইচ্ছেটাকে দূরে রাখবার শিল্প জানে। ধোঁয়াশা সরাতে চাই তোমার ভাষার।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sondhyavasha/
1496
নির্মলেন্দু গুণ
পৌত্তলিক
প্রেমমূলক
যখন আমি তোমার মুখের দিকে তাকাই, মনে হয় দুটি শিল্পিত হাতের দশটি আঙ্গুল চীনামাটির ফ্লাওয়ার-ভাসের মতো আদর করে ধরে রেখেছে তোমার গৌরবর্ণ স্নিগ্ধ মুখখানি। সেই কবে একদিন সুদূর শৈশবে মাটির প্রতিমা দেখে মুগ্ধ হয়েছিল চোখ; তারপর তুমি, মাটির বদলে মাংস, কল্পনার বদলে বাস্তব, পৌত্তলিক রক্ত তবু তোমাকে প্রতিমা ভেবে সুখী। তুমি কি শেষে আমাকে উন্মাদ করে দেবে?
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/pouttolick/
2696
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আবার এরা ঘিরেছে মোর মন
ভক্তিমূলক
আবার এরা ঘিরেছে মোর মন। আবার চোখে নামে যে আবরণ। আবার এ যে নানা কথাই জমে, চিত্ত আমার নানা দিকেই ভ্রমে, দাহ আবার বেড়ে ওঠে ক্রমে, আবার এ যে হারাই শ্রীচরণ।তব নীরব বাণী হৃদয়তলে ডোবে না যেন লোকের কোলাহলে। সবার মাঝে আমার সাথে থাকো, আমায় সদা তোমার মাঝে ঢাকো, নিয়ত মোর চেতনা-‘পরে রাখো আলোকে-ভরা উদার ত্রিভুবন।১৬ ভাদ্র, ১৩১৬ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/abar-era-ghireche-mor-mon/
2028
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
প্রকৃতিমূলক
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল। কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।। শীতল বাতাস বয় জুড়ায় শরীর। পাতায়-পাতায় পড়ে নিশির শিশির।। ফুটিল মালতী ফুল সৌরভ ছুটিল। পরিমল লোভে অলি আসিয়া জুটিল ॥গগনে উঠিল রবি সোনার বরণ। আলোক পাইয়া লোক পুলকিত মন ॥ রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে। শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে ॥ উঠ শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ। আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ ॥
http://kobita.banglakosh.com/archives/4145.html
5249
শামসুর রাহমান
সংবাদপত্রে কোনো একটি ছবি দেখে
মানবতাবাদী
তুমি ও ঘুমিয়ে ছিলে ছোট খাটে, পাছে ঘুম-দ্বীপে ঝড় ওঠে, পাছে বানচাল হয় চাঁদের মতোই স্বপ্নের মোহন নৌকো, হাঙরের দাঁত ছিঁড়ে ফেলে শান্তির রুপালি মাছ কিংবা অপদেবতার ক্রূর দৃষ্টি পড়ে কচি মুখে, ঘুমের মোমের ডানা পুড়ে হয় ছাই, পাছে ভয় পাও তাই মায়ের প্রার্থনা একা ঘরে সারাক্ষণ ছিল জেগে তোমার শয্যার চতুষ্পার্শ্বে; উদ্ভিদের মতো তুমি ঘুমে ভাসমান।কে এক ভীষণ দৈত্য তোমার ঘুমের দ্বীপটিকে অকস্মাৎ দিল নেড়ে প্রাণপণে, অভ্রের প্রাসাদ হলো গুঁড়ে, বিচূর্ণিত প্রবালের সিঁড়ি। সান্তিয়াগো উঠলো নড়েঃ দরদালানের ভিতে কে বলবে আজ কী ঘুণ লুকিয়ে ছিল? এবং তোমাকে কী আক্রোশে স্বপ্ন দেখে দুঃস্বপ্নের গোলকধাঁধায় দিলো ছুঁড়ে! সান্তিয়াগো, যেন সে তাসের ঘর, এক ফুঁয়ে হলো আস্তাকুঁড়; শহরের কণ্ঠ হলো তীব্র হাহাকার।তোমার বিভ্রান্ত চোখ কী যেন খুঁজছে প্রতিক্ষণ, কাকে খোঁজো ধ্বংসস্তূপে? মাকে? নাকি বিমর্ষ পিতাকে- যিনি রোজ শূন্য ঘরে বাজাতেন রাত্তিতে বেহালা, বিকেলে তোমার ছোট হাত ধরে নিজেরই বাগানে বেড়াতেন অন্য মনে, শুনতেন পাতার মর্মর।মাঝে মাঝে “দ্যাখো চেয়ে কী সুন্দর পাখি, ওরা ডালে শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখে,” বলে যিনি সূর্যাস্তের দিকে দু’চোখ দিতেন মেলে-বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে খোঁজো তাঁকে?সেখানে যেও না আর। কেউ নেই, কিছু নেই, কালো একটি বেড়াল শুধু বসে আছে হলুদ জজ্ঞালে। ছেঁড়া কাগজের টুকরো উড়ে এসে তোমার পায়ের কাছে থামে। না, সেখানে নেই কোনো রঙিন পুতুল- যা আছে দেখলে বড়ো ভয় পাবে, যেও না সেখানে। কে এক বর্বর তার সর্বনাশা খেলার নেশায় ভেঙেছে তোমার শান্ত খেলাঘর। হে দুঃস্বপ্নচারিণী আমার হৃদয় হলো তোমাদের বিধ্বস্ত শহর!   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/songbadpotre-kono-ekti-chobi-dekhe/
5464
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ছাড়পত্র
মানবতাবাদী
যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে তার মুখে খবর পেলুম: সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার জন্মমাত্র সুতীব্র চীৎকারে। খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত উত্তোলিত, উদ্ভাসিত কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়। সে ভাষা বোঝে না কেউ, কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার। আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা পেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগের- পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর অস্পষ্ট কুয়াশাভরা চোখে। এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে। চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য ক'রে যাব আমি- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। অবশেষে সব কাজ সেরে, আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে করে যাব আশীর্বাদ, তারপর হব ইতিহাস।।
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/charptrro/
2569
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অক্ষমতা
চিন্তামূলক
এ যেন রে অভিশপ্ত প্রেতের পিপাসা — সলিল রয়েছে প'ড়ে, শুধু দেহ নাই। এ কেবল হৃদয়ের দুর্বল দুরাশা সাধের বস্তুর মাঝে করে চাই - চাই। দুটি চরণেতে বেঁধে ফুলের শৃঙ্খল কেবল পথের পানে চেয়ে বসে থাকা! মানবজীবন যেন সকলি নিষ্ফল — বিশ্ব যেন চিত্রপট, আমি যেন আঁকা! চিরদিন বুভুক্ষিত প্রাণহুতাশন আমারে করিছে ছাই প্রতি পলে পলে, মহত্ত্বের আশা শুধু ভারের মতন আমারে ডুবায়ে দেয় জড়ত্বের তলে। কোথা সংসারের কাজে জাগ্রত হৃদয়! কোথা রে সাহস মোর অস্থিমজ্জাময়!
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/okkhomota/
65
আবিদ আনোয়ার
কার্যকারণ
চিন্তামূলক
নিজেরই দুধের ভাণ্ডে মাঝেমাঝে লাথি মারে ছৈরতের গাই-- কারণ খোঁজো না যদি আকষ্মাৎ কোথাও পালাই ।আমি এক পক্ষিণীকে চিনি যে তার খয়েরি ডিমে ক'সপ্তাহ তা দিয়েছে প্রায় প্রতিদিনই, তারপর হঠাৎ উধাও-- পড়ে আছে খড়কুটো, তুলার বলের মতো অর্ধস্ফূট একজোড়া ছাও ।কী এমন হয়েছিলো? বড়জোর এই বলা যায়: হয়তো আকাশ তাকে ডেকেছিলো মৌন ইশারায়!আমাকেও যেতে হবে, হয় যদি হোক পরপারে-- আমি ফের জন্ম নেবো অন্য কোনো সুতীব্র চিৎকারে ।
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/karjokaron/
3885
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শেষ হিসাব
রূপক
চেনাশোনার সাঁঝবেলাতে শুনতে আমি চাই-- পথে পথে চলার পালা লাগল কেমন, ভাই। দুর্গম পথ ছিল ঘরেই, বাইরে বিরাট পথ-- তেপান্তরের মাঠ কোথা-বা, কোথা-বা পর্বত। কোথা-বা সে চড়াই উঁচু, কোথা-বা উতরাই, কোথা-বা পথ নাই। মাঝে-মাঝে জুটল অনেক ভালো-- অনেক ছিল বিকট মন্দ, অনেক কুশ্রী কালো। ফিরেছিলে আপন মনের গোপন অলিগলি, পরের মনের বাহির-দ্বারে পেতেছে অঞ্জলি। আশাপথের রেখা বেয়ে কতই এলে গেলে, পাওনা ব'লে যা পেয়েছ অর্থ কি তার পেলে। অনেক কেঁদে-কেটে ভিক্ষার ধন জুটিয়েছিলে অনেক রাস্তা হেঁটে। পথের মধ্যে লুঠেল দস্যু দিয়েছিল হানা, উজাড় করে নিয়েছিল ছিন্ন ঝুলিখানা। অতি কঠিন আঘাত তারা লাগিয়েছিল বুকে-- ভেবেছিলুম, চিহ্ন নিয়ে সে সব গেছে চুকে। হাটে-বাটে মধুর যাহা পেয়েছিলুম খুঁজি, মনে ছিল, যত্নের ধন তাই রয়েছে পুঁজি। হায় রে ভাগ্য, খোলো তোমার ঝুলি। তাকিয়ে দেখো, জমিয়েছিলে ধূলি। নিষ্ঠুর যে ব্যর্থকে সে করে যে বর্জিত, দৃঢ় কঠোর মুষ্টিতলে রাখে সে অর্জিত নিত্যকালের রতন-কণ্ঠহার; চিরমূল্য দেয় সে তারে দারুণ বেদনার। আর যা-কিছু জুটেছিল না চাহিতেই পাওয়া-- আজকে তারা ঝুলিতে নেই, রাত্রিদিনের হাওয়া ভরল তারাই, দিল তারা পথে চলার মানে, রইল তারাই একতারাতে তোমার গানে গানে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shas-hesab/
2063
মহাদেব সাহা
আমার সজল চোখ বুঝলে না
মানবতাবাদী
তোমরা কেউ আমার সজল চোখ বুঝলে না, বুঝলে পেরেক বুঝলে ডলার-পাউণ্ড, বিমানবন্দুর, যুদ্ধজাহাজ তোমরা কেউ একটি খোঁপা-খোলা মেঘ বুঝলে না, বুঝলে রক্ত বুঝলে ছুরি, বুঝলে দংশন, তোমরা কেউ বন্ধুর পবিত্র মুখ বুঝলে না, বুঝলে হিংসা বুঝলে রাত্রি, বুঝলে অন্ধকার, বুঝলে ছোবল; তোমরা কেউ আমার সজল চোখ বুঝলে না, বুঝলে আঘাত তোমরা কেউ বন্ধুর কোমল বুক বুঝলে না, বুকে মাটির ঘ্রাণ বুঝলে না, বুঝলে অস্ত্র; তোমরা কেউ বুঝলে না, বুঝলে না, বুঝলে না। তোমরা একটি বকুলফুল বুঝলে না, কেনইবা কাঁদবে? তোমরা একটি শস্যক্ষেত্র বুঝলে না, কেনইবা দাঁড়াবে? তোমরা একটি মানুষ বুঝলে না, কেনইবা নত হবে? তোমরা বুঝলে না মায়ের চোখের অশ্রু, পিতার বুকের দুঃখ বুঝলে না শেশব, বাউল, ভাটিয়ালি তোমরা বুঝলে না, এসব কিছুই বুঝলে না। গ্রামের মেঠো পথ, ফুলের গন্ধ, ঝিঁঝির ডাক তোমরা কোনোদিন বুঝলে না, বুঝলে না নদরি গান, পাতার শব্দ বুঝলে না সজনে ডাঁটা, পুঁইশাক, কুমড়োলতা তোমরা হৃদয় বুঝলে না, বুঝলে লোহার আড়ত, তোমরা কিছু বুঝলে না, কিছু বুঝলে না, কিছু বুঝলে না শুধু বুঝলে চোরাগোপ্তা, বুঝলে রক্তপাত।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1365
5277
শামসুর রাহমান
সামান্যই পুঁজি
মানবতাবাদী
গর্ব করবার মতো কিছু নয়, সামান্যই পুঁজি। রোদ আনতে চাঁদিনী ফুরায়; তার চুলে, নাভিমূলে বৃষ্টি মেখে দিলে প্রাণে বয়ে যায় খরার পবন। বাড়ির সম্মুখে সন্তর্পণে পদচ্ছাপ রেখে গেলে কোমল হরিণ কোনো বাজে না গভীর রাতে বাঁশি। অভ্র দিয়ে শান্তির কুটির বানানোর বাসনায় কামলার মতো খাটি সারাদিন, তবু অসমাপ্ত দেয়ালে গজায় বুনো ঘাস। কবে থেকে ব’সে আছি নতমুখে, মহাজন তাগাদা শোনায়, নিদ্রাছুট নিশীথে আমাকে ঠোকরাতে থাকে অশান্তির পাখি।  (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/samannoi-puji/
493
কাজী নজরুল ইসলাম
রুবাইয়াত-ই- হাফিজ- ৭
ভক্তিমূলক
আমার সকল ধ্যানে জ্ঞানে, বিচিত্র সে সুরে সুরে গাহি তোমার বন্দনা গান, রাজাধিরাজ, নিখিল জুড়ে! কী বলেছে তোমার কাছে মিথ্যা ক'রে আমার নামে হিংসুকেরা,- ডাকলে না আজ, তাইতে আমায় তোমার পুরে!!
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rubaiyat-e-hafiz-7/
380
কাজী নজরুল ইসলাম
পাপড়ি-খোলা
প্রেমমূলক
রেশমি চুড়ির শিঞ্জিনীতে রিমঝিমিয়ে মরমকথা পথের মাঝে চমকে কে গো থমকে যায় ওই শরম-নতা। কাঁখচুমা তার কলসি-ঠোঁটে উল্লাসে জল উলসি ওঠে, অঙ্গে নিলাজ পুলক ছোটে বায় যেন হায় নরম লতা। অ-চকিতে পথের মাঝে পথ-ভুলানো পরদেশী কে হানলে দিঠি পিয়াস-জাগা পথবালা এই উর্বশীকে! শূন্য তাহার কন্যা-হিয়া ভরল বধূর বেদন নিয়া, জাগিয়ে গেল পরদেশিয়া বিধুর বধূর মধুর ব্যথা।(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/papri-khela/
4860
শামসুর রাহমান
দোরগোড়া থেকে
সনেট
আমিতো স্বর্গের দীপ্ত দোরগাড়া থেকে ফিরে যাই, ফিরে যাই বারবার এবং আমার পুণ্যফল শূন্য বলে চতুর্দিক থেকে ক্ষিপ্ত প্রেতের দঙ্গল তেড়ে আসে হৈ-হৈ, বলে সমস্বরে, তোর নেই ঠাঁই অমরায়, তুই যা গন্ধুকে, আগুনের বাজখাই আঁচ তোকে নিত্য দগ্ধ করুক, তুই যা। বেদখল হয়েছে আমার মরুদ্যান আর এখন সম্বল শুধু আত্মাভস্মকারী তৃষ্ণা, প্রতারক রোশনাই।হাঁটছি তামাটে পথে, পথ দীর্ঘ মনে হয়, মনে হয় মাঝে-মাঝে বৃষ্টি নামে, শুষ্ক ওষ্ঠে ঝরে উৎফুল্ল স্বেহার্দ্রে বিন্দু, পর মুহূর্তেই পথময় রৌদ্রের বৃশ্চিক ক্রীড়াপরায়ণ, ধু ধু অন্ধকার দেখি চরাচরে, দেখি কোথাও দরজা নেই, তার অমন পুষ্পিত অবয়ব চলে যায় অগোচরে।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dorgora-theke/
3994
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্নেহগ্রাস
সনেট
অন্ধ মোহবন্ধ তব দাও মুক্ত করি— রেখো না বসায়ে দ্বারে জাগ্রত প্রহরী হে জননী, আপনার স্নেহ-কারাগারে সন্তানেরে চিরজন্ম বন্দী রাখিবারে। বেষ্টন করিয়া তারে আগ্রহ-পরশে, জীর্ণ করি দিয়া তারে লালনের রসে, মনুষ্যত্ব-স্বাধীনতা করিয়া শোষণ আপন ক্ষুধিত চিত্ত করিবে পোষণ? দীর্ঘ গর্ভবাস হতে জন্ম দিলে যার স্নেহগর্ভে গ্রাসিয়া কি রাখিবে আবার? চলিবে সে এ সংসারে তব পিছু-পিছু? সে কি শুধু অংশ তব, আর নহে কিছু? নিজের সে, বিশ্বের সে, বিশ্বদেবতার— সন্তান নহে, গো মাতঃ, সম্পত্তি তোমার। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/snehogras/
4888
শামসুর রাহমান
নিজের নিকট থেকে
চিন্তামূলক
নিজের নিকট থেকে বহুদূরে চলে যেতে চাই- দিনের আড়ালে, রাত্রির ওপরে ভেসে ভেসে যতদূর যাওয়া যায় ততদূর চলে যেতে চাই। এ শহরে ঘরে কিংবা বাইরে কোথাও বলো না থাকতে কেউ আমাকে, এক্ষুণি আসবাব, বইপত্র, লেখার টেবিল আর কবিতার খাতা তছনছ করে চলে যেতে চাই অতিদূরে পথরেখা ধরে একা একা!আমি কি অজ্ঞাতবাসে যাবো সবকিছু ফেলে টেলে? বন্ধুবান্ধবের মুখ, চিরচেনা আপন গলির মোড়, ভাঙ্গা বাড়ি, স্বরণের অভ্যন্তরে সারি সারি গাছ, কিছুই আমাকে ধরে রাখতে পারে না, পারলেও আমি নিজের নিকট থেকে দূরে চলে যাবো, তাকাবো না ফিরে, আমি, বলে দিচ্ছি, চলে যাবোই এখন।বিভ্রম আমাকে কিছুকাল ঘুরিয়েছে পথে পথে, বুঝতে পারিনি কবে স্বপ্নের মতোন এক মোহন উদ্যান কাঁটাবন হয়ে গেছে এবং অতিথিবৃন্দ ভোজসভায় হঠাৎ অজস্র কংকাল হলো, বিকৃত আয়নার ছবির মতোইদৃশ্যাবলী চতুর্দিকে। চলে যেতে দাও, এরকম দৃশ্য দেখে ঝিমোতে ঝিমোতে প্রায় উন্মাদের মতো পারবো নাচেচিয়ে উঠতে কোনোদিন মানুষের মধ্যে, আমি বরং মাটির নিচে নিজেকে আড়াল করে প্রহর কাটাবো। প্রত্যহ মেঝেতে দেখি শক্ত, মৃত পাখি পড়ে আছে,- আমি চলে যাবো। চেতনায় কৃষ্ণপক্ষ নেমে আসে বারংবার বাদুড়ের মতো, আমি চলে যাবো। আমার আনন্দ একজন অকস্মাৎ এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়েছে,- আমি চলে যাবো। আমার সুখের নৌকো নিমজ্জিত ঘোর কালো গহন নদীতে, আমি চলে যাবো। যে পাখি গাইতো গান নিরিবিলি হৃদয়ে আমার তার বুক একজন তীক্ষ্ণ নখে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলেছে বেবাক, আমি চলে যাবো। নিজের নিকট থেকে বহুদূরে চলে যাবো দুঃখিত, একাকী।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nijer-nikot-theke/
1077
জীবনানন্দ দাশ
নিরালোক
চিন্তামূলক
একবার নক্ষত্রের দিকে চাই — একবার প্রান্তরের দিকে আমি অনিমিখে। ধানের ক্ষেতের গন্ধ মুছে গেছে কবে জীবনের থেকে যেন; প্রান্তরের মতন নীরবে বিচ্ছিন্ন খড়ের বোঝা বুকে নিয়ে ঘুম পায় তার; নক্ষত্রেরা বাতি জ্বেলে জ্বেলে — জ্বেলে — ‘নিভে গেলে — নিভে গেলে?’ বলে তারে জাগায় আবার;জাগায় আবার। বিক্ষত খড়ের বোঝা বুকে নিয়ে — বুকে নিয়ে ঘুম পায় তার, ঘুম পায় তার।অনেক নক্ষত্রে ভরে গেছে এই সন্ধ্যার আকাশ — এই রাতের আকাশ; এইখানে ফাল্গুনের ছায়া-মাখা ঘাসে শুয়ে আছি; এখন মরণ ভালো — শরীরে লাগিয়া রবে এই সব ঘাস; অনেক নক্ষত্র রবে চিরকাল যেন কাছাকাছি।কে যেন উঠিল হেঁচে–হামিদের মরখুটে কানা ঘোড়া বুঝি! সারা দিন গাড়ি টানা হল ঢের — ছুটি পেয়ে জ্যোৎস্নায় নিজ মনে খেয়ে যায় ঘাস; যেন কোনো ব্যথা নাই? পৃথিবীতে — আমি কেন তবে মৃত্যু খুঁজি? ‘কেন মৃত্যু খোঁজো তুমি?’ চাপা ঠোঁটে বলে দূর কৌতুকী আকাশ।ঝাউফুলে ঘাস ভরে — এখানে ঝাউয়ের নিচে শুয়ে আছি ঘাসের উপরে; কাশ আর চোরকাঁটা ছেড়ে দিয়ে ফড়িং চলিয়া গেছে ঘরে। সন্ধ্যার নক্ষত্র, তুমি বলো দেখি কোন্‌ পথে কোন্‌ ঘরে যাব! কোথায় উদ্যম নাই, কোথায় আবেগ নাই — চিন্তা স্বপ্ন ভুলে গিয়ে শান্তি আমি পাব? রাতের নক্ষত্র, তুমি বলো দেখি কোন্‌ পথে যাব?‘তোমারই নিজের ঘরে চলে যাও’ — বলিল নক্ষত্র চুপে হেসে– ‘অথবা ঘাসের ’পরে শুয়ে থাকো আমার মুখের রূপ ঠায় ভালোবেসে; অথবা তাকায়ে দ্যাখো গরুর গাড়িটি ধীরে চ’লে যায় অন্ধকারে সোনালি খড়ের বোঝা বুকে; পিছে তার সাপের খোলস, নালা খলখল অন্ধকার — শান্তি তার রয়েছে সমুখে; চলে যায় চুপে চুপে সোনালি খড়ের বোঝা বুকে– যদিও মরেছে ঢের গন্ধর্ব, কিন্নর, যক্ষ, –তবু তার মৃত্যু নাই মুখে।’
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/niralok/
879
জসীম উদ্‌দীন
যাব আমি তোমার দেশে
স্বদেশমূলক
পল্লী-দুলাল, যাব আমি-যাব আমি তোমার দেশে, আকাশ যাহার বনের শীষে দিক-হারা মাঠ চরণ ঘেঁষে। দূর দেশীয়া মেঘ-কনেরা মাথায় লয়ে জলের ঝারি, দাঁড়ায় যাহার কোলটি ঘেঁষে বিজলী-পেড়ে আঁচল নাড়ি। বেতস কেয়ার মাথায় যেথায় ডাহুক ডাকে বনের ছায়ায়, পল্লী-দুলাল ভাইগো আমার, যাব আমি যাব সেথায়। তোমার দেশে যাব আমি, দিঘল বাঁকা পন্থখানি, ধান কাউনের খেতের ভেতর সরু সূতোর আঁচল টানি; গিয়াছে হে হাবা মেয়ের এলোমাথার সিঁথীর মত কোথাও সিধে, কোথায় বাঁকা, গরুর পায়ের রেখায় ক্ষত; গাজনতলির মাঠ পেরিয়ে, শিমূলতলীর বনের বাঁয়ে, কোথাও গায়ে রোদ মাখিয়া, ঘুম-ঘুমায়ে গাছের ছায়ে। তাহার পরে মুঠি মুঠি ছড়িয়ে দিয়ে কদম-কলি, কোথাও মেলে বনের লতা গ্রাম্য মেয়ে যায় যে চলি; সে পথ দিয়ে যাব আমি পল্লী-দুলাল তোমার দেশে, নাম-না জানা ফুলের সুবাস বাতাসেতে আসবে ভেসে। তোমার দেশে যাব আমি, পাড়ার যত দস্যি ছেলে, তাদের সাথে দল বাঁধিয়া হেথায় সেথায় ফিরব খেলে। থল-দীঘিতে সাঁতার কেটে আনব তুলে রক্ত-কমল, শাপলা লতায় জড়িয়ে চরণ ঢেউ এর সাথে খাব যে দোল। হিজল ঝরা জলের সাথে গায়ের বরণ রঙিন হবে, দীঘির জলে খেলবে লহর মোদের লীলাকালোসবে। তোমার দেশে যাব আমি পল্লী-দুলাল ভাইগো সোনার, সেথায় পথে ফেলতে চরণ লাগবে পরশ এই মাটি-মার! ডাকব সেথা পাখির ডাকে, ভাব করিব শাখীর সনে, অজান ফুলের রূপ দেখিয়া মানব তারে বিয়ের কনে; চলতে পথে ময়না কাঁটায় উত্তরীয় জড়িয়ে যাবে, অঢেল মাটির হোঁচট লেগে আঁচল হতে ফুল ছড়াবে। পল্লী-দুলাল, যাব আমি-যাব আমি তোমার দেশে, তোমার কাঁধে হাত রাখিয়া-ফিরবো মোরা উদাস বেশে। বনের পাতার ফাঁকে ফাঁকে দেখব মোরা সাঁঝ বাগানে, ফুল ফুটেছে হাজার রঙের মেঘ তুলিকার নিখুঁত টানে। গাছের শাখা দুলিয়ে আমি পাড়ব সে ফুল মনের আশে, উত্তরীয় ছড়িয়ে তুমি দাঁড়িয়ে থেকো বনের পাশে। যে ঘাটেতে ভরবে কলস গাঁয়ের বিভোল পল্লীবালা, সেই ঘাটেরি এক ধারেতে আসবো রেখে ফুলের মালা; দীঘির জলে ঘট বুড়াতে পথে পাওয়া মালাখানি, কুড়িয়ে নিয়ে ভাববে ইহা রাখিয়া গেছে কেউ না জানি। চেনে না তার হাতের মালা হয়তবা সে পরবে গলে, আমরা দুজন থাকব বসে ঢেউ দোলা সেই দীঘির কোলে। চার পাশেতে বনের সারি এলিয়ে শাখার কুন্তল-ভার, দীঘির জলে ঢেউ গণিবে ফুল শুঁকিবে পদ্ম-পাতার। বনের মাঝে ডাকবে ডাহুক, ফিরবে ঘুঘু আপন বাসে, দিনের পিদিম ঢুলবে ঘুমে রাত-জাগা কোন্ ফুলের বাসে। চার ধারেতে বন জুড়িয়া রাতের আঁধার বাঁধবে বেড়া, সেই কুহেলীর কালো কারায় দীঘির জলও পড়বে ঘেরা। সেই আঁধারে পাখায় ধরে চামচিকারা উচ্চে উঠি, দিকে দিকে দিগনে-রে ছড়িয়ে দেবে মুঠি মুঠি। তখন সেথা থাকবে না কেউ, সুদূর বনের গহন কোণে, কানাকুয়া ডাকবে শুধু পহরের পর পহর গণে। সেই নিরালার বুকটি চিরে পল্লী দুলাল আমরা দুজন, পল্লীমায়ের রূপটি যে কি, করব মোরা তার অন্বেষণ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/780
338
কাজী নজরুল ইসলাম
তুমি আমার সকালবেলার সুর
প্রেমমূলক
তুমি আমার সকালবেলার সুর বিদায় আলোয় উদাস করা অশ্রুভারাতুর।ভোরের তারার মতো তোমার সজল চাওয়ায় ভালোবাসা চেয়ে সে যে কান্না পাওয়ায় রাত্রিশেষের চাঁদ তুমি গো, বিদায়বিধুর।তুমি আমার ভোরের ঝরা ফুল শিশির নাওয়া শুভ্রশুচি পূজারিণীতুল।অরুণ তুমি তরুণ তুমি করুণ তারও চেয়ে হাসির দেশে তুমি যেন বিষাদ লোকের মেয়ে তুমি ইন্দ্রসভার মৌনবীণা নীরবনিঠুর।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/tumi-amar-sokalbelar-shur/
1017
জীবনানন্দ দাশ
ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন
সনেট
ঘুমায়ে পড়িব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে; তখনো যৌবন প্রাণে লেগে আছে হয়তো বা — আমার তরুণ দিন তখনো হয়নি শেষ- সেই ভালো — ঘুম আসে-বাংলার তৃণ আমার বুকের নিচে চোখ বুজে-বাংলার আমের পাতাতে কাঁচপোকা ঘুমায়েছে — আমিও ঘুমায়ে রবো তাহাদের সাথে, ঘুমাব প্রাণের সাধে এই মাঠে — এই ঘাসে — কথাভাষাহীন আমার প্রাণের গল্প ধীরে-ধীরে যাবে-অনেক নবীন নতুন উৎসব রবে উজানের-জীবনের মধুর আঘাতেতোমাদের ব্যস্ত মনে; — তবুও, কিশোর, তুমি নখের আঁচড়ে যখন এ ঘাস ছিঁড়ে চলে যাবে — যখন মানিকমালা ভোরে লাল-লাল বটফল কামরাঙা কুড়াতে আসিবে এই পথে– যখন হলুদ বোঁটা শেফালি কোনো এক নরম শরতে ঝরিয়ে ঘাসের পরে, — শালিখ খঞ্জনা আজ কতো দূরে ওড়ে– কতোখানি রোদ-মেঘ — টের পাবে শুয়ে শুয়ে মরণের ঘোরে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ghmaye-poribo-aami-ekdin/
1276
জীবনানন্দ দাশ
হায় পাখি একদিন কালীদহে ছিল না কি
সনেট
হায় পাখি, একদিন কালীদহে ছিল না কি – দহের বাতাসে আষাঢ়ের দু’পহরে কলরব কর নি কি এই বাংলায়! আজ সারাদিন এই বাদলের কোলাহলে মেঘের ছায়ায় চাঁদ সদাগর: তার মধুকর ডিঙাটির কথা মনে আসে, কালীদহে কবে তারা পড়েছিলো একদিন ঝড়ের আকাশে,- সেদিনো অসংখ্য পাখি উড়েছিলো না কি কালো বাতাসের গায়, আজ সারাদিন এই বাদলের জলে ধলেশ্বরীর চরায় গাংশালিখের ঝাঁক, মনে হয়, যেন সেই কালীদহে ভাসে;এই সব পাখিগুলো কিছুতেই আজিকার নয় যেন-নয়- এ নদীও ধলেশ্বরী নয় যেন-এ আকাশ নয় আজিকার: ফণীমনসার বনে মনসা রয়েছে নাকি? আছে; মনে হয়, এ নদী কি কালীদহ নয়? আহা, ঐ ঘাটে এলানো খোঁপার সনকার মুখ আমি দেখি না কি? বিষন্ন মলিন ক্লান- কি যে সত্য সব; তোমার এ স্বপ্ন সত্য, মনসা বলিয়া গেল নিজে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/hai-pakhi-ekdin-kaliidohe-chilo-ki-na/
3799
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যেদিন চৈতন্য মোর মুক্তি পেল লুপ্তিগুহা হতে
মানবতাবাদী
যেদিন চৈতন্য মোর মুক্তি পেল লুপ্তিগুহা হতে নিয়ে এল দুঃসহ বিস্ময়ঝড়ে দারুণ দুর্যোগে কোন্‌ নরকাগ্নিগিরিগহ্বরের তটে; তপ্তধূমে গর্জি উঠি ফুঁসিছে সে মানুষের তীব্র অপমান, অমঙ্গলধ্বনি তার কম্পান্বিত করে ধরাতল, কালিমা মাখায় বায়ুস্তরে। দেখিলাম একালের আত্মঘাতী মূঢ় উন্মত্ততা, দেখিনু সর্বাঙ্গে তার বিকৃতির কদর্য বিদ্রূপ। একদিকে স্পর্ধিত ক্রূরতা, মত্ততার নির্লজ্জ হুংকার, অন্যদিকে ভীরুতার দ্বিধাগ্রস্ত চরণ-বিক্ষেপ, বক্ষে আলিঙ্গিয়া ধরি কৃপণের সতর্ক সম্বল; সন্ত্রস্ত প্রাণীর মতো ক্ষণিক গর্জন অন্তে ক্ষীণস্বরে তখনি জানায় নিরাপদ নীরব নম্রতা। রাষ্ট্রপতি যত আছেপ্রৌঢ় প্রতাপের, মন্ত্রসভাতলে আদেশ নির্দেশ রেখেছে নিষ্পিষ্ট করি রুদ্ধ ওষ্ঠ অধরের চাপে সংশয়ে সংকোচে। এদিকে দানব-পক্ষী ক্ষুব্ধশূন্যে উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে বৈতরণী নদী পার হতে যন্ত্রপক্ষ হুংকারিয়া নরমাংসক্ষুধিত শকুনি, আকাশেরে করিল অশুচি। মহাকাল-সিংহাসনে সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে, কণ্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী কুৎসিত বিভৎসা পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন নিত্যকাল র’বে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের হৃৎস্পন্দনে, রুদ্ধকণ্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে।   (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jedin-choitonyo-mor-mukti-pelo-luptiguha-hote/
4552
শামসুর রাহমান
কবির অশ্রুর চেয়ে দামী
প্রেমমূলক
আমি কি অজ্ঞাতবাসে আছি? এ-রকম থেকে যাবো গোপনীয় মনোকষ্টে ডুবে বহুদিন দলছাড়া? কীট-পতঙ্গের সঙ্গে উচ্চারণহীন মেলামেশা, বিষণ্ণ বিকেলে হ্রদে ভাসমান প্রেমিকের জামা, আর ঊর্ণাজালের মতই ঝোপঝাড়ে তেজী আলো, মাথার ওপর উড্ডয়নপরায়ণ একা দীর্ঘপদী পাখি- ভাবি আজো নিসর্গের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে অটুট। গোধুলিতে খোলামেলা ঢিবির ওপরে ব’সে দেখি জীবনের ঢ্যাঙা ছিরি!জীবন আমার হাতে কোন সে ঠিকানা গুঁজে দিয়ে দেখিয়েছে খোলা পথ; পথে তৃণ ছিলো, কাঁটাঝোপ ছিলো, ছিলো সাঁকো, হরিণের লাফ ছিলো, উজ্জ্বল সাপের হিস্‌হিস্‌ ছিলো, কিছু কাটাকুটি, কিছু ভুল ছিলো- ভাবতে-ভাবতে হাঁটি, কায়ক্লেশে হাঁটি, কখনো নিঝুম ব’সে থাকি পথপ্রান্তে, ক্ষয়ে-যাওয়া দাঁতে ছায়া চিবোতে-চিবোতে দিন যায়। দিন যায়, কখনো-কখনো খুব সহজে যায় না। কোনো-কোনো ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই কষ্ট পাই, বিষণ্ণতা ব্যেপে আসে শ্রাবণের মেঘের ধরনে, উদ্যানের পাশে কী এক সৌন্দর্য ফৌত হয়ে প’ড়ে থাকে, মনে হয় পুরোনো কবর থেকে কোনো পূর্বপুরুষ আমার বেরিয়ে এলেন পৌরপথে, প্রতিকার চেয়ে-চেয়ে পুনরায় ত্বক-মাংস তাঁর খ’সে যায়, খ’সে যায়, বুঁজে আসে কবরের চোখ। দিন খুব দীর্ঘ লাগে, দীর্ঘশ্বাসে-দীর্ঘশ্বাসে প্রহর উদাস।মাঝরাতে যখন ভীষণ একা আমি, যখন আমার চোখে ঘুম নেই একরত্তি, আমি বিপর্যস্ত বিছানায় প’ড়ে আছি ক্রশের ধরেন, তখন অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে কে এক নৃমুন্ডধারী অশ্ব এসে বলেঃ শোনো হে তোমার নিজের শহরে আজ আমাদের রাজ পাকাপোক্ত হলো; দ্যাখো চেয়ে আমাদের সংকেতবহুল পোস্টারে-পোস্টারে ছেয়ে গ্যাছে শহরের প্রতিটি দেয়াল আর ছায়া-কেবিনেটে জ্যোতিশ্চক্রগুলি নৃত্যপর, কবিসংঘ এই অশ্ব সমাজের, মানে আমাদের সমর্থনে দিনরাত্রি বেহাল কাটায় দীর্ঘ স্তোত্র রচনায়।তোমার শহরে, শোনো, একটিও ভিক্ষুক নেই আর। হাসপাতালের সব বেড খালি, কেননা এখন আর রোগী নেই কেউ। পাগলাগারদও আজ বাশিন্দাবিহীন, অতিশয় পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোকগুলো কুচকাওয়াজের ঢঙে দিব্যে হেঁটে যায় নতুন মুদ্রার মতো চকচকে রাস্তায়-রাস্তায়! বাছা-বাছা যুক্তিবাদী রাজনীতিবিদ পরিবর্তনের গূঢ় পতাকা পকেটে পুরে নব্য খোয়ারিতে ছায়াস্নিগ্ধ বনভোজনের চমৎকার মানুসরুটি খেয়ে দাঁত খুঁটছেন ঘন-ঘন আর মাঝে-মাঝে দরাজ গলায় গান ধরেন পার্টিতে ফের অকস্মাৎ ঘুমিয়ে পড়েন প্রতারক জ্যোৎস্নার কার্পেটে।ফলস্‌ ত্র্যালার্ম শুনে ভয় পেও না বেহুদা, ছুটে যেও না বাইরে, চোখ-কান বুঁজে প’ড়ে থেকো নিজস্ব শয্যায় বিপদকে গ্রেপ্তার করেছি আমরা, বিপুল ধ্বংসকে পাঠিয়েছি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, তোমার নিজের শহরকে খলখলে রক্ষিতার মতো সাজিয়ে দিয়েছি আপাদমস্তক অহংকারী অলংকারে।আমার ব্যর্থতা কবরখানার হল্‌দে ঘাসে নাঙা সন্ন্যাসীর মতো শুয়ে থাকে সাবলীল, আমার ব্যর্থতা ফণিমনসার মতো তীক্ষ্ম অহংকারে রৌদ্রজ্যোৎস্না পোহার নিয়ত, আমার ব্যর্থতা টাওয়ারের প্রতি বাড়িয়ে দু’হাত ধুলোয় গড়াতে থাকে কখনো-বা শিস দিতে-দিতে চলে যায় নিরুদ্দেশে, বেকার যুবার মতো ছেঁড়া জুতো পায়ে পথে-পথে ঘোরে, সর্বস্বান্ত নবাবের মতো চেয়ে থাকে সূর্যাস্তের দিকে বড়ো উদাসীন, গলির দোকান থেকে সিগারেট কেনে ধারে আর আমার ব্যর্থতা ব্যর্থ কবির ধরনে খুব হিজিবিজি কাটাকুটির অরণ্যময় কালো খাতা খুলে ব’সে থাকে, সিগারেট ঠোঁটে, ছাই ঝ’রে যায়, শুধু ছাই ঝ’রে যায়।এইসব কথা লিখে অধিক রাত্তিরে কবি ধূসর বালিশে মুখ চেপে কাঁদে, রক্তে মাংসে হাড়ে ও মজ্জায় ঝরে কান্না ঝরে অবিরল। কবির অশ্রুর চেয়ে দামী মায়াময় অন্য কিছু আছে কি জগতে?   (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobir-oshrur-cheye-dami/
3343
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পউষের পাতা-ঝরা তপোবনে
চিন্তামূলক
পউষের পাতা-ঝরা তপোবনে আজি কী কারণে টলিয়া পড়িল আসি বসন্তের মাতাল বাতাস; নাই লজ্জা, নাই ত্রাস, আকাশে ছড়ায় উচ্চহাস চঞ্চলিয়া শীতের প্রহর শিশির-মন্থর। বহুদিনকার ভুলে-যাওয়া যৌবন আমার সহসা কী মনে ক'রে পত্র তার পাঠায়েছে মোরে উচ্ছৃঙ্খল বসন্তের হাতে অকস্মাৎ সংগীতের ইঙ্গিতের সাথে। লিখেছে সে-- আছি আমি অনন্তের দেশে যৌবন তোমার চিরদিনকার। গলে মোর মন্দারের মালা, পীত মোর উত্তরীয় দূর বনান্তের গন্ধ-ঢালা। বিরহী তোমার লাগি আছি জাগি দক্ষিণ-বাতাসে ফাল্গুনের নিশ্বাসে নিশ্বাসে। আছি জাগি চক্ষে চক্ষে হাসিতে হাসিতে কত মধু মধ্যাহ্নের বাঁশিতে বাঁশিতে। লিখেছে সে-- এসো এসো চলে এসো বয়সের জীর্ণ পথশেষে, মরণের সিংহদ্বার হয়ে এসো পার; ফেলে এসো ক্লান্ত পুষ্পহার। ঝরে পড়ে ফোটা ফুল, খসে পড়ে জীর্ণ পত্রভার, স্বপ্ন যায় টুটে, ছিন্ন আশা ধূলিতলে পড়ে লুটে। শুধু আমি যৌবন তোমার চিরদিনকার, ফিরে ফিরে মোর সাথে দেখা তব হবে বারম্বার জীবনের এপার ওপার। সুরুল, ২৩ পৌষ, ১৩২১
https://banglarkobita.com/poem/famous/1925
4912
শামসুর রাহমান
পরা বাক্‌ পেতে চায়
রূপক
নাছোড় ভাদুরে বৃষ্টি ভোরবেলা আমাকে দেবে না বারান্দায় যেতে আজ। এবং তুমিও, হে অচেনা, আসো না ছাদে, আঁচ করি, সঙ্গে নিয়ে সহচরী! বেশ কিছুদিন থেকে তোমার অমন রমনীয় উপস্থিতি বস্তুত পাচ্ছি না টের। প্রীতি নিও অবচেতনায়, শুভেচ্ছাও বটে, দূর থেকে, যখন উঠবে ডেকে পাখি সেই গাছে, যা দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে, যার পাতার আড়ালে তুমি আর তোমার সঙ্গিনী হেঁটে বেড়াও প্রত্যহ, বলা যায়, হাত ধরে, তোমাদের অশ্রুত কথায় সাগ্রহে যে-কথা শুনি, তার সঙ্গে মিশ আছে লতাপাতা, হ্রদের জলের আর নীলিমার।এই তো সেদিন, মনে পড়ে, গোধূলিতে তিনজন পুরুষ দাঁড়িয়ে ছিল, যেন-বা আদায় করে নিতে যুক্তি তর্কে কিছু কথা তোমার নিকট থেকে, পাশে দাঁড়ানো বিহবল সহচরী, তুমি হাতে মুখ ঢেকে হতাশ্বাসে, মনে হলো,বসে ছিলে, আবছা সিঁড়ির ধাপে, খোলা দীর্ঘ চুল, আকাশের নীলে উড্ডীন পাখির ঝাঁক নীড়ে ফেরার দুর্মর টানে। সেই দৃশ্য অন্তর্গত গহন তিমিরে ঋত্বিকের স্মরণীয় শটের মতোই গেঁথে আছে, বৃষ্টি ঝরে খোলা বারান্দায়, ছাদে, মধ্যবর্তী গাছে। হৃদয়ের আলতামিরায় অগ্নি জ্বলে, স্মরণাতীতের প্রতিচ্ছবি পরা বাক্‌ পেতে চায়।   (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pora-bah-pete-chay/
996
জীবনানন্দ দাশ
কোথাও দেখি নি
সনেট
কোথাও দেখি নি, আহা, এমন বিজন ঘাস — প্রান্তরের পারে নরম বিমর্ষ চোখে চেয়ে আছে– নীল বুকে আছে তাহাদের গঙ্গাফরিঙের নীড়,কাঁচপোকা, প্রজাপতি শ্যামাপোকা ঢের, হিজলের ক্লান্ত পাতা– বটের অজস্র ফল ঝরে বারে বারে তাহাদের শ্যাম বুকে–পাড়াগাঁর কিশোরেরা যখন কান্তারে বেতের নরম ফল, নাটা ফক খেতে আসে,ধুন্দুল বীজের খোঁজ করে ঘাসে ঘাসে– বক তাহা জানে নাকো, পায় নাকো টের শালিখ, খন্জনা তাহা– লক্ষ লক্ষ ঘাস এই নদীর দু-ধারেনরম কান্তারে এই পাড়াগাঁর বুকে শুয়ে সে কোন দিনের কথা ভাবে; তখন এ জলসিড়ি শুকায় নি, মজে নি আকাশ, বল্লাল সেনের ঘোড়া– ঘোড়ার কেশর ঘেরা ঘুঙুর জিনের শব্দ হত এই পথে–আরো আগে রাজপুত্র কত দিন রাশ টেনে টেনে এই পথে– কি যেন খুঁজেছে আহা, হয়েছে উদাস; আজ আর খোঁজাখুজি নাই কিছু–নাটা ফলে মিটিতেছে আশ-
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/kothao-dekhi-ni/
1982
বিষ্ণু দে
অন্ধকারে আর
প্রেমমূলক
অন্ধকারে আর রেখো না ভয়, আমার হাতে ঢাকো তোমার মুখ দু-চোখে দিয়ে দাও দুঃখ সুখ, দু-বাহু ঘিরে গড়ো তোমার জয়, আমার তালে গাঁথো তোমার লয় | অসহ আলো আজ ঘৃণায় দগ্ধ, দূষিত দিনে আর নেইকো রুচি, অন্ধকারই একমাত্র শুচি,প্রেমের নহবত ঘৃণায় স্তব্ ধ | আমার হাতে ঢাকো তোমার মুখ ||
http://kobita.banglakosh.com/archives/4119.html
4298
শামসুর রাহমান
অথচ বেলা-অবেলায়
চিন্তামূলক
রাতে চাঁদটা হঠাৎ যেন বেজায় বেঁকে বসল। বলা যেতে পারে, মেজাজ তার হয়তো অকারণেই বিগড়ে গেছে। হয়তো এখনই সে ছিটকে মিলিয়ে যাবে জলের ঢেউয়ে।হঠাৎ আকাশটাকে কেন যেন বেখাপ্পা ঠেকছে। বস্তুত যেন আকাশকে কেউ ভীষণ চড় কষিয়ে তার সৌন্দর্যকে নির্দয়ের ধরনে ধ্বংস করে ফেলেছে। যে-জলাশয় আমার অনেক সময়কে সাজিয়ে দিয়েছে বিচিত্র সব চিত্রের আবদানে তার এই বর্তমান চেহারা কেন জানি আমি কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারছি না। কোনও মুহূর্তেই। এই জলাশয় ছুঁতে পারছি না কিছুতে।তবু কেন যেন আমি প্রায়শ এই জলাশয়ের কাছে চলে যাই কখনও ভোরবেলা, কখনওবা জ্যোৎস্নারাতে; কখনও কখনও ছুঁই তার করুণ জলরাশি। কিছুতেই তার আকর্ষণ পুরোপুরি ছুড়তে পারি না বাতিলের নর্দমায়। এত অপছন্দের পরেও তার দিকেই তাকাই তাকে এত আকর্ষণীয় কেন যে মনে হয়!ভাবি কখনও আর যাব না কিছুতেই সেই বিচ্ছিরি জলাশয়ের কাছে নষ্ট করতে সময়। কী লাভ ক্ষণে-ক্ষণে বেহায়া ব্যাঙের লাফ দেখে, পচা জলরাশির দুর্গন্ধ শোঁকা? প্রতিজ্ঞা করি কখনও এদিকে পা ফেলব না কিছুতে, অথচ বেলা অবেলায় চ’লে আসি; শুনি বাঁকা হাসি!   (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/othocho-bela-obelai/
162
আহসান হাবীব
মেঘনা পাড়ের ছেলে
প্রকৃতিমূলক
আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে আমি মেঘনা নদীর নেয়ে। মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে তালের নৌকা বেয়ে আমি বেড়াই হেসে খেলে- আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে। মেঘনা নদীর নেয়ে আমি মেঘনা পাড়ে বাড়ি ইচ্ছে হ’লেই এপার থেকে ওপারে দেই পাড়ি। তালে তালে তালের নৌকা দু’হাতে যাই বেয়ে আমি মেঘনা নদীর নেয়ে। পাহাড় সমান ঢেউয়ের বুকে নৌকো আমার ভাসে মেঘমুলুকের পাহাড় থেকে ঝড়ের ঝাপটা আসে- মাথার ওপর মুচকি হাসে বিজলি নামের মেয়ে আমি মেঘনা নদীর নেয়ে। আমার ঢেউয়ের সঙ্গে গলাগলি ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা ঝড়ের সঙ্গে লড়াই ক’রে কাটাই সারাবেলা। দেশ থেকে যাই দেশান্তরে মনের নৌকা বেয়ে- আমি মেঘনা নদীর ছেলে আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3809.html
5676
সুকুমার রায়
মহাভারতঃ আদিপর্ব
কাহিনীকাব্য
কুরুকুলে পিতামহ ভীষ্মমহাশয় ভুবন বিজয়ী বীর, শুন পরিচয়- শান্তনু রাজার পুত্র নাম সত্যব্রত জগতে সার্থক নাম সত্যে অনুরত। স্বয়ং জননী গঙ্গা বর দিলা তাঁরে- নিজ ইচ্ছা বিনা বীর না মরে সংসারে। বুদ্বিভ্রংশ ঘটে হায় শান্তনু রাজার, বিবাহের লাগি বুড়া করে আবদার। মৎস্যরাজকন্যা আছে নামে সত্যবতী, তারে দেখি শান্তনুর লুপ্ত হল মতি। মৎস্যরাজ কহে, 'রাজা, কর অবধান, কিসের আশায় কহ করি কন্যাদান? সত্যব্রত জ্যেষ্ঠ সেই রাজ্য অধিকারী, আমার নাতিরা হবে তার আজ্ঞাচারি, রাজমাতা কভু নাহি হবে সত্যবতী, তেঁই এ বিবাহ- কথা অনুচিত অতি।' ভগ্ন মনে হস্তিনায় ফিরিল শান্তনু অনাহারে অনিদ্রয় জীর্ন তার তনু। মন্ত্রী মুখে সত্যব্রত শুনি সব কথা মৎস্যরাজপুরে গিয়া কহিল বারতা- রাজ্যে মম সাধ নাহি, করি অঙ্গীকার জন্মিলে তোমার নাতি রাজ্য হবে তার।' রাজা কহে, 'সাধুতুমি, সত্য তব বাণী, তোমার সন্তান হতে তবু ভয় মানি। কে জানে ভবিষ্যকথা, দৈবগতিধারা- প্রতিবাদী হয় যদি রাজ্যলাভে তারা?' সত্যব্রত কহে, 'শুন প্রতিজ্ঞা আমার, বংশ না রহিবে মম পৃথিবী মাঝার। সাক্ষী রহ চন্দ্র সূর্য লোকে লোকান্তরে এই জন্মে সত্যব্রত বিবাহ না করে।' শুনিয়া অদ্ভুত বাণী ধন্য কহে লোকে, স্বর্গ হতে পুষ্পধারা ঝরিল পলকে। সেই হতে সত্যব্রত খ্যাত চরাচরে ভীষণ প্রতিজ্ঞাবলে ভীষ্ম নাম ধরে। ঘুচিল সকল বাধা, আনন্দিত চিতে সত্যবতী রাণী হয় হস্তিনাপুরীতে। ক্রমে হলে বর্ষ গত শান্তনুর ঘরে জন্ম নিল নব শিশু, সবে সমাদরে। রাখিল বিচিত্রবীর্য নামটি তাহার শান্তনু মরিল তারে দিয়া রাজ্যভার। অকালে বিচিত্রবীর্য মুদিলেন আঁখি পাণ্ডু আর ধৃতরাষ্ট্র দুই পুত্র রাখি।। হস্তিরায় চন্দ্রবংশ কুরুরাজকুল রাজত্ব করেন সুখে বিক্রমে অতুল। সেই কুলে জন্মি তবু দৈববশে হায় অন্ধ বলি ধৃতরাস্ট্র রাজ্য নাহি পায়। কনিষ্ঠ তাহার পাণ্ডু, রাজত্ব সে করে, পাঁচটি সন্তান তার দেবতার বরে। জ্যেষ্ঠপুত্র যুধিষ্ঠির ধীর শান্ত মন 'সাক্ষাৎ ধর্মের পুত্র' কহে সর্বজন। দ্বিতীয় সে মহাবলী ভীম নাম ধরে, পবন সমান তেজ পবনের বরে। তৃতীয় অর্জুন বীর, ইন্দ্রের কৃপায় রুপেগুণে শৌর্যেবীর্যে অতুল ধরায়। এই তিন সহোদর কুন্তীর কুমার, বিমাতা আছেন মাদ্রী দুই পুত্র তাঁর- নকুল ও সহদেব সুজন সুশীল এক সাথে পাঁচজনে বাড়ে তিল তিল। অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র শতপুত্র তার, অভিমানী দুর্যোধন জ্যেষ্ঠ সবাকার। পাণ্ডবেরা পাঁচ ভাই নষ্ট হয় কিসে, এই চিন্তা করে দুষ্ট জ্বলি হিংসাবিষে। হেনকালে সর্বজনে ভাসাইয়া শোকে মাদ্রীসহ পান্ডরাজা যায় পরলোকে। 'পান্ডু গেল', মনে মনে ভাবে দুর্যোধন, এই বারে যুধিষ্ঠির পাবে সিংহাসন! ইচ্ছা হয় এই দণ্ডে গিয়া তারে মারি- ভীমের ভয়েতে কিছু করিতে না পারি। আমার কৌশলে পাকে ভীম যদি মরে অনায়াসে যুধিষ্ঠিরে মারি তারপরে।' কুচক্র করিয়া তবে দুষ্ট দুর্যোধন নদীতীরে উৎসবের করে আয়োজন- একশত পাঁচ ভাই মিলি একসাথে আমোদ আহ্লাদে ভোজে মহানন্দে মাতে। হেন ফাঁকে দুর্যোধন পরম যতনে বিষের মিষ্টান্ন দেয় ভীমের বদনে। অচেতন হল ভীম বিষের নেশায়, সুযোগ বুঝিয়া দুষ্ট ধরিল তাহায়, গোপনে নদীর জলে দিল ভাসাইয়া, কেহ না জানিল কিছু উৎসবে মাতিয়া।। এদিকে নদীর জলে ডুবিয়া অতল তলে ভীমের অবশ দেহে ,কেমনে জানে না কেহ, কোথায় ঠেকিল শেষে বাসুকী নাগের দেশে। ভীমের বিশাল চাপে নাগের বসতি কাঁপে দেহ ভারে কত মরে, কত পলাইল ডরে , কত নাগ দলে বলে ভীমেরে মারিতে চলে দংশিয়া ভীমের গায় মহাবিষ ঢালে তায়। অদ্ভুত ঘটিল তাহে ভীম চক্ষু মেলি চাহে , বিষে হয় বিষক্ষয় মুহুর্তে চেতনা হয়, দেখে ভীম চারিপাশে নাগেরা ঘেরিয়া আসে দেখিয়া ভীষণ রাগে ধরি শত শত নাগে চূর্ণ করে বাহুবলে, মহাভয়ে নাগে দলে ছুটে যায় হাহাকরে বাসুকী রাজার দ্বারে। বাসুকী কহেন, 'শোন আর ভয় নাহি কোন, তুষি তারে সুবচনে আন হেথা সযতনে।' রাজার আদেশে তবে আবার ফিরিয়া সবে করে গিয়া নিবেদন বাসুকীর নিমন্ত্রণ ! শুনি ভীম কুতুহলে রাজার পুরীতে চলে , সেথায় ভরিয়া প্রাণ ,করিয়া অমৃত পান বিষের যাতনা আর কিছু না রহিল তার , মহাঘুমে ভরপুর সব ক্লান্তি হল দুর তখন বাসুকী তারে স্নেহভরে বারে বারে আশিস করিয়া তায় পাঠাইল হস্তিনায় । সেথা ভাই চারিজনে আছে শোকাকুল মনে কুন্তীর নয়নজল ঝরে সেথা অবিরল , মগন গভীর দুখে ফিরে সবে ম্লান মুখে । হেন কালে হারানিধি সহসা মিলালো বিধি বিষাদ হইল দুর জাগিল হস্তিনাপুর , উলসিত কলরবে আনন্দে মাতিল সবে।।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/mohabharot-adiporbo/
4799
শামসুর রাহমান
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা
স্বদেশমূলক
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ? আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ? তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো, সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর। তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো দানবের মত চিৎকার করতে করতে তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, ছাত্রাবাস বস্তি উজাড হলো। রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র। তুমি আসবে ব’লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম। তুমি আসবে ব’লে, বিধ্বস্ত পাডায় প্রভূর বাস্তুভিটার ভগ্নস্তূপে দাঁডিয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর। তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা, অবুঝ শিশু হামাগুডি দিলো পিতামাতার লাশের উপর। তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ? আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ? স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুডো উদাস দাওয়ায় ব’সে আছেন – তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নডছে চুল। স্বাধীনতা, তোমার জন্যে মোল্লাবাডির এক বিধবা দাঁডিয়ে আছে নডবডে খুঁটি ধ’রে দগ্ধ ঘরের। স্বাধীনতা, তোমার জন্যে হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে বসে আছে পথের ধারে। তোমার জন্যে, সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক, কেষ্ট দাস, জেলেপাডার সবচেয়ে সাহসী লোকটা, মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি, গাজী গাজী ব’লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝডে রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস এখন পোকার দখলে আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুডে বেডানো সেই তেজী তরুণ যার পদভারে একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ’তে চলেছে – সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে, মতুন নিশান উডিয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক এই বাংলায় তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/591
1501
নির্মলেন্দু গুণ
বসন্ত
প্রকৃতিমূলক
হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্র-সঙ্গীতে যতো আছে, হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে বনের কুসুমগুলি ঘিরে । আকাশে মেলিয়া আঁখি তবুও ফুটেছে জবা,–দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে, তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্তপথিক ।এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরণ, মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে মৃত্তিকার বুকে নিমজ্জিত হতে চায় । হায় কী আনন্দ জাগানিয়া ।এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতোই ফেরাই চোখ, যতোই এড়াতে চাই তাকে দেখি সে অনতিক্রম্য । বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্য খানি নবীন পল্ববে, ফুলে ফুলে । বুঝি আমাকেও শেষে গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে ।আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরুপ তাহার, সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6/
3844
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লুকায়ে আছেন যিনি
চিন্তামূলক
লুকায়ে আছেন যিনি জগতের মাঝে আমি তাঁরে প্রকাশিব সংসারের কাজে।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/lukae-achen-jini/
5226
শামসুর রাহমান
শীতরাত্রির সংলাপ
প্রকৃতিমূলক
যে-রাত্রির পাস্টেরনাক দেখেছেন সাদা প্রান্তরের বরফের স্তূপে, নেকড়ের ক্ষুধিত চিৎকারে ছেঁড়া শূন্যতায়, সে-রাত্রি দেখিনি আমি এবং এখানে আমাদের ফটকে জমে না। অজস্র তুষার আর বরফ চিবানো আধ-পাগলা মেয়ে বাগানের ভাঙা বেড়াটার ধারে অথচ চৌকাঠে মুচ্‌কি হেসে দাঁড়ায় না এসে সিল্কের রুমাল-বাঁধা চুলে খোলা পায়। একদার কুয়াশায় লীন কোনো পৌষের হিমেল রাত আজও অস্তিত্বের গির্জের চূড়োয় ঝরায় শিশির কণা মনে পড়ে সেই ছোট ঘরে প্রথম প্রহরে তুমি পড়ছিলে ডাক্তার জিভাগো একা, গায়ে পাৎলা কোট, নামহীন দূরত্বে আসীনা- তখন তোমাকে সহজেই ভাবা যেত বিদেশিনী, বলেও ছিলাম তাই। আর সেইক্ষণে অকস্মাৎ নরম কাগজ থেকে লাফিয়ে বেরিয়ে এলো পাস্টেরনাকের সাদা রাত্রি, যেন পড়ল ছড়িয়ে সবখানে, উদ্ভাসিত আমাদের সত্তার জটিল গাছপালা। বলেছিলে ‘শীতের প্রখর রাত্রি দিয়েছে নামিয়ে আমাদের অন্ধখার হা-খোলা কবরে। হয়তো চাঁদের প্রেত খানা-খন্দে উঁকি দেবে ক্ষণকাল, ক্ষণকাল গোপনে রাত্রির কানে দুল হয়ে থাকবে ঝুলে ক’টি চামচিকে তৃতীয় প্রহরে। রাত্রিভর হিম হাওয়া বয়ে যায় রক্তের ফেনিল হ্রদে আর বারবার কেঁপে ওঠে অস্তিত্বের প্রচ্ছন্ন কংকাল।আমি তার উত্তরে বলেছি এই দাঁতে-দাঁতে লাগা নীল জীবনকে তাপ দেবে বসন্তের উদার জ্বালানি। দ্যাখো চেয়ে সৌন্দর্যের গাঢ় স্তবে মুখর রহস্যময় নিঃসঙ্গ মানুষ।   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shitratrir-songlap/
2614
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অবসান
চিন্তামূলক
জানি দিন অবসান হবে, জানি তবু কিছু বাকি রবে। রজনীতে ঘুমহারা পাখি এক সুরে গাহিবে একাকী- যে শুনিবে, সে রহিবে জাগি সে জানিবে, তারি নীড়হারা স্বপন খুঁজিছে সেই তারা যেথা প্রাণ হয়েছে বিবাগী। কিছু পরে করে যাবে চুপ ছায়াঘন স্বপনের রূপ। ঝরে যাবে আকাশকুসুম, তখন কূজনহীন ঘুম এক হবে রাত্রির সাথে। যে-গান স্বপনে নিল বাসা তার ক্ষীণ গুঞ্জন-ভাষা শেষ হবে সব-শেষ রাতে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/yabusan/
3462
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রার্থনা -খেয়া
ভক্তিমূলক
আমি বিকাব না কিছুতে আর আপনারে। আমি দাঁড়াতে চাই সভার তলে সবার সাথে এক সারে। সকালবেলার আলোর মাঝে মলিন যেন না হই লাজে, আলো যেন পশিতে পায় মনের মধ্যে একবারে। বিকাব না, বিকাব না আপনারে। আমি বিশ্ব-সাথে রব সহজ বিশ্বাসে। আমি আকাশ হতে বাতাস নেব প্রাণের মধ্যে নিশ্বাসে। পেয়ে ধরার মাটির স্নেহ পুণ্য হবে সর্ব দেহ, গাছের শাখা উঠবে দুলে আমার মনের উল্লাসে। বিশ্বে রব সহজ সুখে বিশ্বাসে। আমি সবায় দেখে খুশি হব অন্তরে। কিছু বেসুর যেন বাজে না আর আমার বীণা-যন্তরে। যাহাই আছে নয়ন ভরি সবই যেন গ্রহণ করি, চিত্তে নামে আকাশ-গলা আনন্দিত মন্ত্র রে। সবায় দেখে তৃপ্ত রব অন্তরে।
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be/
1022
জীবনানন্দ দাশ
চাঁদিনীতে
প্রেমমূলক
বেবিলোন কোথা হারায়ে গিয়েছে,-মিশর-‘অসুর’ কুয়াশাকালো; চাঁদ জেগে আছে আজো অপলক,- মেঘের পালকে ঢালিছে আলো! সে যে জানে কত পাথারের কথা,- কত ভাঙা হাট মাঠের স্মৃতি! কত যুগ কত যুগান্তরের সে ছিল জ্যোৎস্না, শুক্লাতিথি! হয়তো সেদিনো আমাদেরি মতো পিলুবারোয়াঁর বাঁশিটি নিয়া ঘাসের ফরাশে বসিত এমনি দূর পরদেশী প্রিয় ও প্রিয়া! হয়তো তাহারা আমাদেরই মতো মধু-উৎসবে উঠিত মেতে চাঁদের আলোয় চাঁদমারী জুড়ে,- সবুজ চরায়,- সবজি ক্ষেতে! হয়তো তাহার দুপুর- যামিনী বালুর জাজিমে সাগরতীরে চাঁদের আলোয় দিগদিগন্তে চকোরের মতো চরিত ফিরে ! হয়তো তাহারা মদঘূর্ণনে নাচিত কাঞ্চীবাধঁন খুলে এম্নি কোন এক চাঁদের আলোয়,-মরু- ‘ওয়েসিসে’ তরুর মূলে! বীর যুবাদল শত্রুর সনে বহুদিনব্যাপী রণের শেষে এম্নি কোন এক চাঁদিনীবেলায় দাঁড়াত নগরীতোরণে এসে! কুমারীর ভিড় আসিত ছুটিয়া, প্রণয়ীর গ্রীবা জড়ায়ে নিয়া হেঁটে যেত তারা জোড়ায় জোড়ায় ছায়াবীথিকার পথটি দিয়া! তাদের পায়ের আঙুলের ঘায়ে খড়- খড় পাতা উঠিত বাজি, তাদের শিয়রে দুলিত জ্যোৎস্না- চাঁচর চিকন পত্ররাজি! দখিনা উঠিত মর্মরি মধুবনানীর লতা-পল্লব ঘিরে, চপল মেয়েরা উঠিত হাসিয়া,-‘এল বল্লভ,-এল রে ফিরে!’ -তুমি ঢুলে যেতে, দশমীর চাঁদ তাহাদের শিরে সারাটি নিশি, নয়নে তাদের দুলে যেতে তুমি,-চাঁদিনী-শরাব,- সুরার শিশি! সেদিনো এম্নি মেঘের আসরে জ্বলছে পরীর বাসরবাতি, হয়তো সেদিনো ফুটেছে মোতিয়া,-ঝরেছে চন্দ্রমল্লীপাঁতি! হয়তো সেদিনো নেশাখোর মাছি গুমরিয়া গেছে আঙুরবনে, হয়তো সেদিনো আপেলের ফুল কেপেঁছে আঢুল হাওয়ার সনে! হয়তো সেদিনো এলাচির বন আতরের শিশি দিয়েছে ঢেলে, হয়তো আলেয়া গেছে ভিজা মাঠে এমনি ভূতুরে প্রদীপ জ্বেলে ! হয়তো সেদিনো ডেকেছে পাপিয়া কাঁপিয়া কাঁপিয়া ‘সরো’র শাখে, হয়তো সেদিনো পাড়ার নাগরী ফিরেছে এমনি গাগরি কাঁখে! হয়তো সেদিনো পানসী দুলায়ে গেছে মাঝি বাকাঁ ঢেউটি বেয়ে, হয়তো সেদিনো মেঘের শকুনডানায় গেছিল আকাশ ছেয়ে! হয়তো সেদিনো মানিকজোড়ের মরা পাখাটির ঠিকানা মেগে অসীম আকাশে ঘুরেছে পাখিনী ছট্‌ফট্‌ দুটি পাখার বেগে! হয়তো সেদিনো খুর খুর ক’রে খরগোশছানা গিয়েছে ঘুরে ঘন-মেহগিনি- টার্পিন- তলে- বালির জর্দা বিছানা ফুঁড়ে! হয়তো সেদিনো জানালার নীল জাফরির পাশে একেলা বসি মনের হরিনী হেরেছে তোমারে-বনের পারের ডাগর শশী! শুক্লা একাদশীর নিশীথে মণিহরমের তোরণে গিয়া পারাবত-দূত পাঠায়ে দিয়েছে প্রিয়ের তরেতে হয়তো প্রিয়ো! অলিভকুঞ্জে হা হা ক’রে হাওয়া কেঁদেছে কাতর যামিনী ভরি! ঘাসের শাটিনে আলোর ঝালরে ‘মার্টিল’ পাতা প’ড়েছে ঝরি! ‘উইলো’র বন উঠেছে ফুঁপায়ে,-‘ইউ’ তরুশাখা গিয়েছে ভেঙে, তরুনীর দুধ-ধবধবে বুকে সাপিনীর দাঁত উঠেছে রেঙে! কোন্‌ গ্রীস,- কোন্‌ কার্থেজ, রোম, ‘ত্রুবেদু’র- যুগ কোন,- চাঁদের আলোয় স্মৃতির কবর- সফরে বেড়ায় মন! জানি না তো কিছু,-মনে হয় শুধু এম্নি তুহিন চাঁদের নিচে কত দিকে দিকে-কত কালে কালে হ’য়ে গেছে কত কী যে! কত যে শ্মশান,-মশান কত যে,-কত যে কামনা- পিপাস-আশা অস্তচাঁদের আকাশে বেঁধেছে আরব-উপন্যাসের বাসা!
https://banglarkobita.com/poem/famous/917
3074
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মকথা
ছড়া
খোকা মাকে শুধায় ডেকে — ‘ এলেম আমি কোথা থেকে , কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে । ' মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে — ‘ ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে । ছিলি আমার পুতুল - খেলায় , প্রভাতে শিবপূজার বেলায় তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি । তুই আমার ঠাকুরের সনে ছিলি পূজার সিংহাসনে , তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি । আমার চিরকালের আশায় , আমার সকল ভালোবাসায় , আমার মায়ের দিদিমায়ের পরানে — পুরানো এই মোদের ঘরে গৃহদেবীর কোলের ‘পরে যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে । যৌবনেতে যখন হিয়া উঠেছিল প্রস্ফুটিয়া , তুই ছিলি সৌরভের মতো মিলায়ে , আমার তরুণ অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে ছিলি সঙ্গে সঙ্গে তোর লাবণ্য কোমলতা বিলায়ে । সব দেবতার আদরের ধন নিত্যকালের তুই পুরাতন , তুই প্রভাতের আলোর সমবয়সী — তুই জগতের স্বপ্ন হতে এসেছিস আনন্দ - স্রোতে নূতন হয়ে আমার বুকে বিলসি । নির্নিমেষে তোমায় হেরে তোর রহস্য বুঝি নে রে , সবার ছিলি আমার হলি কেমনে । ওই দেহে এই দেহ চুমি মায়ের খোকা হয়ে তুমি মধুর হেসে দেখা দিলে ভুবনে । হারাই হারাই ভয়ে গো তাই বুকে চেপে রাখতে যে চাই , কেঁদে মরি একটু সরে দাঁড়ালে । জানি না কোন্‌ মায়ায় ফেঁদে বিশ্বের ধন রাখব বেঁধে আমার এ ক্ষীণ বাহু দুটির আড়ালে । '(শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jonmokotha/
3944
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সাত সমুদ্র পারে
ছড়া
দেখছ না কি , নীল মেঘে আজ আকাশ অন্ধকার । সাত সমুদ্র তেরো নদী আজকে হব পার । নাই গোবিন্দ , নাই মুকুন্দ , নাইকো হরিশ খোঁড়া । তাই ভাবি যে কাকে আমি করব আমার ঘোড়া । কাগজ ছিঁড়ে এনেছি এই বাবার খাতা থেকে , নৌকো দে - না বানিয়ে , অমনি দিস , মা , ছবি এঁকে । রাগ করবেন বাবা বুঝি দিল্লি থেকে ফিরে ? ততক্ষণ যে চলে যাব সাত সমুদ্র তীরে । এমনি কি তোর কাজ আছে , মা , কাজ তো রোজই থাকে । বাবার চিঠি এক্‌খুনি কি দিতেই হবে ডাকে ? নাই বা চিঠি ডাকে দিলে আমার কথা রাখো , আজকে না হয় বাবার চিঠি মাসি লিখুন - নাকো ! আমার এ যে দরকারি কাজ বুঝতে পার না কি ? দেরি হলেই একেবারে সব যে হবে ফাঁকি । মেঘ কেটে যেই রোদ উঠবে বৃষ্টি বন্ধ হলে , সাত সমুদ্র তেরো নদী কোথায় যাবে চলে !    (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sat-somudro-pare/
1586
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিরমায়া
প্রেমমূলক
বাহিরে দেখি না, শুধু স্থির জানি ভিতরে কোথাও চৌকাঠে পা রেখে তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ, চিরমায়া। দাঁতে-চাপা অধরে কৌতুক স্থির বিদ্যুতের মতো লগ্ন হয়ে আছে, ভুরু বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বাঁকানো, জ্বলে কোমল আগুন সিঁথি ও ললাটে। স্থির সরসীর মতো দুই চোখে চক্ষু রেখে জগৎ-সংসার অকস্মাৎ তার কার্যকারণের-সূত্রে গাঁথা মাল্যখানিকে ঘোরাতে ভুলে যায়। বাহিরে দেখি না, কিন্তু ভিতরে এখনও ওই মূর্তি জাগিয়ে রেখেছ, চিরমায়া! বুঝি না কী মন্ত্রে তুমি জয়ে-বিপর্যয়ে লগ্ন আজও রয়েছ হৃদয়ে। কী রয়েছে ওই চোখে, অধরে অথবা ওই যুগ্ম ভুরুতে তোমার? প্রত্যাশা, না পরিহাস? নাকি যুদ্ধশেষে ফের যুদ্ধঘোষণার অভিপ্রায়? কিছুই বুঝি না, চিরমায়া, এক অর্থ উদ্ধার না-হতে যেন সহসা আর-এক অর্থ খুলে যায়। বেঁধেছ অলক্ষ্য ডোরে। যে-রকম উড্ডীন পাখীও বস্তুত অরণ্যে বাঁধা, কিংবা দিগ্বিজয়ীও যেমন অদৃশ্য সুতোয় টান পড়বামাত্র তার একমাত্র-নারীর জঙ্ঘা অবলোকনের জন্য বড় ব্যস্ত হয়ে ওঠে, চিরমায়া, আমিও তেমন ফিরি, নতজানু হয়ে নিরীক্ষণ করি ওই জঙ্ঘা ও জঘন, স্তনসন্ধির গোপনে রাখি মুখ। আমিও তেমন বুঝে নিতে চেষ্টা করি দাঁতে-চাপা ওষ্ঠের ইঙ্গিত। এবং দেখি যে, স্থির সরসীর মতো দুই চোখে পলকে পলকে স্বর্গ-মর্ত-পাতালের ছায়া দুলে যায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1564
1956
বিনয় মজুমদার
আমাকে ও মনে রেখো
স্বদেশমূলক
পৃথিবী,সূর্য ও চাঁদ এরা জ্যোতিস্ক এবং আকাশের তারাদের কাছে চলে যাবো । আমাকে ও মনে রেখো পৃথিবীর লোক আমি খুব বেশী দেশে থাকি নি কখনো । আসলে তিনটি মাত্র দেশে আমি থেকেছি,এখন আমি থাকি বঙ্গদেশে,আমাকেও মনে রেখো বঙ্গদেশ তুমি ।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4078.html
3153
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি আছ হিমাচল ভারতের অনন্তসঞ্চিত
সনেট
তুমি আছ হিমাচল ভারতের অনন্তসঞ্চিত তপস্যার মতো। স্তব্ধ ভূমানন্দ যেন রোমাঞ্চিত নিবিড় নিগূঢ়-ভাবের পথশূন্য তোমার নির্জনে, নিষ্কলঙ্ক নীহারের অভ্রভেদী আত্মবিসর্জনে। তোমার সহস্র শৃঙ্গ বাহু তুলি কহিছে নীরবে ঋষির আশ্বাসবাণী, “শুন শুন বিশ্বজন সবে, জেনেছি, জেনেছি আমি।’ যে ওঙ্কার আনন্দ-আলোতে উঠেছিল ভারতের বিরাট গভীর বক্ষ হতে আদি-অন্ত-বিহীনের অখণ্ড অমৃতলোক-পানে, সে আজি উঠিছে বাজি, গিরি, তব বিপুল পাষাণে। একদিন এ ভারতে বনে বনে হোমাগ্নি-আহুতি ভাষাহারা মহাবার্তা প্রকাশিতে করেছে আকূতি, সেই বহ্নিবাণী আজি অচল প্রস্তরশিখারূপে শৃঙ্গে শৃঙ্গে কোন্‌ মন্ত্র উচ্ছ্বাসিছে মেঘধুম্রস্তূপে।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumi-acho-himachol-varoter-onontosonchito/
35
অরুণাভ ঘোষ
শাহবাগ
স্বদেশমূলক
কাঁটাতারের এপার থেকে কতটা দেখা যায়? এক কুড়ি, দুই কুড়ি, তিন কুড়ি – না, আরো বেশী আরো আরো আরো অনেক বেশী, আঙুলের কড়ে ধরেনি সবটা, ওগুলোতো শুধু সংখ্যা – তবে কি দিয়ে মাপা যাবে আবেগ? . ওরা কারা? – দিন নেই রাত নেই ঊষা-গোধুলির পারাপার ভেঙে ঠিক যেন রিলে করে প্রতিদিন জমা হয়? স্মৃতি-সত্তার উন্মেষে ভবিষ্যতের দিকে এগোনোর শপথ নেয়- কারা ওরা? . ওদের কেউ কেউ রফিক, কেউ কেউ বেলাল, কেউ কেউ নীলুফার, অগণিত মুখ, অচেনা নাম – অচেনা হয়েও চেনা – বেহিসেবী, বেপরোয়া, আর কারো কারো নাম উঠে আসে হিসেবের খাতায়- যেমন রাজীব, নীরবে কি যেন লিখে চলেছিল আপন মনে, কি যেন বলতে চেয়েছিল- চোখ রাঙানি, অস্ত্রের শান দমাতে পারেনি তবু, আরো কত রাজীব উঠে এসে দাঁড়ায়- . কে তুমি তরুণ, রোজকার ফেসবুক ছেড়ে, কে তুমি তরুণী, রোজকার প্রসাধন ছেড়ে, কোন সুখে, কোন দুখে, কোন পাপে, কোন পৃথিবীর আশায় এসে দাঁড়াও ওখানে- . ওখানে কি ফুল ফোটে, লাল কৃষ্ণচুড়া? ওখানে কি লাল রং শুধুই রক্ত চায়? ওখানে কি এখনো অনেক রক্তের দাগের ভিতর একটুখানি নীল আকাশ উঁকি দেয় সবার মনে? তবে কেন? তবে কেন? তবে কেন? . এখনো কি ভালবাসায় উপচে পড়েছে অতীতের জমা ক্ষোভ- এখনো কি অতীত, অতীত, অতীত তাড়া করে ফেরে? ওখানে কি এখনো বেঁচে আছে ভালবাসা আমি-তুমির গণ্ডি পেরিয়ে? ওখানেই কি নতুন ভোর হবে কোনো একদিন? সমস্ত পুংতন্ত্র, সব মৌলবাদ, অথবা শরিয়ত ওখানে কি একদিন একে একে ভেঙে পড়ে যাবে তাসের ঘরের মত? মিশে যাবে কি মাটির সাথে কোনদিন না ফেরার অঙ্গীকারে? ধুলো হয়ে উড়ে যাবে কি সব পিছুটান? হয়ে যাবে অবসান একচোখো সব নষ্টামির? . কে তুমি প্রৌঢ় কিসের আশায়, কে তুমি বৃদ্ধ কোন্ ভাবনায়, তবু ফিরে ফিরে আস এখানে? কোন্ যন্ত্রণার এখনো হয়নি অবসান? কোন্ স্মৃতি এখনো সতত বহমান? কিসের আবর্তে এখনো বর্তমান খানখান হয়ে যায় অতীতের তলোয়ারে? কিসের আবর্তে এখনো হতাশার চোরাবালিতেও ফোটে ফুল? . কাঁটাতারের এপার থেকে কতটা দেখা যায়? আমাদের তো সবটুকুই প্রতীকী – হাতেই গোনা যায়, তবু আবেগ – বহতা নদী, মেঘের আনাগোণা- কাঁটাতারের এপারেও আমাকে জাগিয়ে তোলে- শাহবাগ।।
https://banglapoems.wordpress.com/2013/03/12/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%97-%e0%a6%85%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3%e0%a6%be%e0%a6%ad-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
4015
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্রোত
চিন্তামূলক
জগৎ-স্রোতে ভেসে চলো, যে যেথা আছ ভাই! চলেছে যেথা রবি শশী চল্‌ রে সেথা যাই। কোথায় চলে কে জানে তা, কোথায় যাবে শেষে, জগৎ-স্রোত বহে গিয়ে কোন্‌ সাগরে মেশে। অনাদি কাল চলে স্রোত অসীম আকাশেতে, উঠেছে মহা কলরব অসীমে যেতে যেতে। উঠিছে ঢেউ, পড়ে ঢেউ, গনিবে কেবা কত! ভাসিছে শত গ্রহ তারা, ডুবিছে শত শত। ঢেউয়ের ‘পরে খেলা করে আলোকে আঁধারেতে, জলের কোলে লুকাচুরি জীবনে মরণেতে। শতেক কোটি গ্রহ তারা যে স্রোতে তৃণপ্রায় সে স্রোত-মাঝে অবহেলে ঢালিয়া দিব কায়, অসীম কাল ভেসে যাব অসীম আকাশেতে, জগৎ- কলকলরব শুনিব কান পেতে। দেখিব ঢেউ--উঠে ঢেউ, দেখিব মিশে যায়, জীবন-মাঝে উঠে ঢেউ মরণ-গান গায়। দেখিব চেয়ে চারি দিকে, দেখিব তুলে মুখ-- কত-না আশা, কত হাসি, কত-না সুখ দুখ, বিরাগ দ্বেষ ভালোবাসা, কত-না হায়-হায়-- তপন ভাসে, তারা ভাসে, তা’রাও ভেসে যায়। কত-না যায়, কত চায়, কত-না কাঁদে হাসে-- আমি তো শুধু ভেসে যাব, দেখিব চারি পাশে।অবোধ ওরে, কেন মিছে করিস ‘আমি আমি’। উজানে যেতে পারিবি কি সাগরপথগামী? জগৎ-পানে যাবি নে রে, আপনা-পানে যাবি-- সে যে রে মহামরুভূমি, কী জানি কী যে পাবি। মাথায় করে আপনারে, সুখ-দুখের বোঝা, ভাসাতে চাস প্রতিকূলে-- সে তো রে নহে সোজা । অবশ দেহ, ক্ষীণ বল, সঘনে বহে শ্বাস, লইয়া তোর সুখদুখ এখনি পাবি নাশ।জগৎ হয়ে রব আমি, একেলা রহিব না। মরিয়া যাব একা হলে একটি জলকণা। আমার নাহি সুখ দুখ, পরের পানে চাই-- যাহার পানে চেয়ে দেখি তাহাই হয়ে যাই। তপন ভাসে, তারা ভাসে, আমিও যাই ভেসে-- তাদের গানে আমার গান, যেতেছি এক দেশে। প্রভাত সাথে গাহি গান, সাঁঝের সাথে গাই, তারার সাথে উঠি আমি--তারার সাথে যাই। ফুলের সাথে ফুটি আমি, লতার সাথে নাচি, বায়ুর সাথে ঘুরি শুধু ফুলের কাছাকাছি। মায়ের প্রাণে স্নেহ হয়ে শিশুর পানে ধাই, দুখীর সাথে কাঁদি আমি সুখীর সাথে গাই। সবার সাথে আছি আমি, আমার সাথে নাই, জগৎ-স্রোতে দিবানিশি ভাসিয়া চলে যাই।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/srot/
776
জসীম উদ্‌দীন
উড়ানীর চর
প্রকৃতিমূলক
উড়ানীর চর ধূলায় ধূসর যোজন জুড়ি, জলের উপরে ভাসিছে ধবল বালুর পুরী। ঝাঁকে বসে পাখি ঝাঁকে উড়ে যায় শিথিল শেফালি উড়াইয়া বায়; কিসের মায়ায় বাতাসের গায় পালক পাতি; মহা কলতানে বালুয়ার গানে বেড়ায় মাতি। উড়ানীর চরে কৃষাণ-বধূর খড়ের ঘর, ঢাকাই সীমের উড়িছে আঁচল মাথার পর। জাঙলা ভরিয়া লাউ এর লতায় লক্ষ্মী সে যেন দুলিছে দোলায়; ফাল্গুনের হাওয়া কলার পাতায়, নাচিছে ঘুরি; উড়ানী চরের বুকের আঁচল কৃষাণ-পুরি। উড়ানীর চর উড়ে যেতে চায় হাওয়ার টানে; চারিধারে জল করে ছল ছল কি মায়া জানে। ফাগুনের রোদ উড়াইয়া ধূলি, বুকের বসন নিতে চায় খুলি; পদ ধরি জল কলগান তুলি, নূপুর নাড়ে; উড়ানীর চর চিক্ চিক্ করে বালুর হারে। উড়ানীর চরে ছাড়-পাওয়া রোদ সাঁঝের বেলা- বালু লয়ে তার মাখামাখি করি জমায় খেলা। কৃষানী কি বসি সাঁঝের বেলায় মিহি চাল ঝাড়ে মেঘের কুলায়, ফাগের মতন কুঁড়া উঠে যায় আলোক ধারে; কচি ঘাসে তারা জড়াজড়ি করে গাঙের পারে। উড়নীর চরে তৃণের অধরে রাতের রানী, আঁধারের ঢেউ ছোঁয়াইয়া যায় কি মায়া টানি। বিরতী কৃষাণ বাজাইয়া বাঁশী, কাল-রাতে মাখে কাল-ব্যথারাশি; থেকে থেকে চর শিহরিয়া ওঠে, বালুকা উড়ে; উড়ানীর চর ব্যথায় ঘুমায় বাঁশীর সুরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/752
2557
রফিক আজাদ
তোমার কথা ভেবে
প্রেমমূলক
তোমার কথা ভেবে রক্তে ঢেউ ওঠে— তোমাকে সর্বদা ভাবতে ভালো লাগে, আমার পথজুড়ে তোমারই আনাগোনা— তোমাকে মনে এলে রক্তে আজও ওঠে তুমুল তোলপাড় হূদয়ে সর্বদা… হলো না পাশাপাশি বিপুল পথ-হাঁটা, এমন কথা ছিল চলব দুজনেই জীবন-জোড়া পথ যে-পথ দিকহীন মিশেছে সম্মুখে আলোর গহ্বরে…।
http://kobita.banglakosh.com/archives/1621.html
1479
নির্মলেন্দু গুণ
গতকাল
প্রেমমূলক
গতকাল বড়ো ছেলেবেলা ছিল আমাদের চারিধারে, দেয়ালের মতো অনুভূতিমাখা মোম জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে আমারা দেখেছি শিখার ভিতরে মুখ । গতকাল ছিল জীবনের কিছু মরণের মতো সুখ ।গতকাল বড়ো যৌবন ছিল শরীরে শরীর ঢালা, ফুলের বাগান ঢেকে রেখেছিল উদাসীন গাছপালা ।আমরা দু’জনে মাটি খুঁড়ে-খুঁড়ে লুকিয়েছিলাম প্রেম, গতকাল বড় ছেলেবেলা ছিল বুঝিনি কী হারালাম !গতকাল বড়ো এলোমেলো চুলে বাতাস তুলেছে গ্রিবা, চুমু খেয়ে গেছে কৃষ্ণচূড়ার উজ্জ্বল মধুরিমা ।গতকাল বড়ো মুখোমুখি ছিল সারাজীবনের চাওয়া, চোখের নিমিষে চোখের ভিতরে চোখের বাহিরে যাওয়া ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%97%e0%a6%a4%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%81/
5487
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশে
মানবতাবাদী
আমার প্রার্থনা শোনো পঁচিশে বৈশাখ, আর একবার তুমি জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের। হাতাশায় স্তব্ধ বাক্য; ভাষা চাই আমরা নির্বাক, পাঠাব মৈত্রীর বাণী সারা পৃথিবীকে জানি ফের। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে আমাদের ভাষা যাবে শোনা ভেঙে যাবে রুদ্ধশ্বাস নিরুদ্যম সুদীর্ঘ মৌনতা, আমাদের দুঃখসুখে ব্যক্ত হবে প্রত্যেক রচনা। পীড়নের প্রতিবাদে উচ্চারিত হবে সব কথা। আমি দিব্যচক্ষে দেখি অনাগত সে রবীন্দ্রনাথ; দস্যুতায় দৃপ্তকণ্ঠ (বিগত দিনের) ধৈর্যের বাঁধন যার ভাঙে দুঃশাসনের আঘাত, যন্ত্রণায় রুদ্ধবাক, যে যন্ত্রণা সহায়হীনের। বিগত দুর্ভিক্ষে যার উত্তেজিত তিক্ত তীব্র ভাষা মৃত্যুতে ব্যথিত আর লোভের বিরুদ্ধে খরদার, ধ্বংসের প্রান্তরে বসে আনে দৃঢ় অনাহত আশা; তাঁর জন্ম অনিবার্য, তাঁকে ফিরে পাবই আবার। রবীন্দ্রনাথের সেই ভুলে যাওয়া বাণী অকস্মাৎ করে কানাকানি ; 'দামামা ঐ বাজে, দিন বদলের পালা এ ঝড়ো যুগের মাঝে' নিষ্কম্প গাছের পাতা, রুদ্ধশ্বাস অগ্নিগর্ভ দিন, বিষ্ফারিত দৃষ্টি মেলে এ আকাশ, গতিরুদ্ধ রায়ু ; আবিশ্ব জিজ্ঞাসা এক চোখে মুখে ছড়ায় রঙিন সংশয় স্পন্দিত স্বপ্ন, ভীত আশা উচ্চারণহীন মেলে না উত্তর কোনো, সমস্যায় উত্তেজিত স্নায়ু। ইতিহাস মোড় ফেরে পদতলে বিধ্বস্ত বার্লিন , পশ্চিম সীমান্তে শান্তি, দীর্ঘ হয় পৃথিবীর আয়ু, দিকে দিকে জয়ধ্বনি, কাঁপে দিন রক্তাক্ত আভায়। রামরাবণের যুদ্ধে বিক্ষত এ ভারতজটায়ু মৃতপ্রায়, যুদ্ধাহত, পীড়নে-দুর্ভিক্ষে মৌনমূক। পূর্বাঞ্চল দীপ্ত ক'রে বিশ্বজন-সমৃদ্ধ সভায় রবীন্দ্রনাথের বাণী তার দাবি ঘোষণা করুক। এবারে নতুন রূপে দেখা দিক রবীন্দ্রঠাকুর বিপ্লবের স্বপ্ন চোখে কণ্ঠে গণ-সংগীতের সুর; জনতার পাশে পাশে উজ্জ্বল পতাকা নিয়ে হাতে চলুক নিন্দাকে ঠেলে গ্লানি মুছে আঘাতে আঘাতে। যদিও সে অনাগত, তবু যেন শুনি তার ডাক। আমাদেরই মাঝে তাকে জন্ম দাও পঁচিশে বৈশাখ।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1120
1364
তসলিমা নাসরিন
যেও না
প্রেমমূলক
যেও না। আমাকে ছেড়ে তুমি এক পাও কোথাও আর যেও না। গিয়েছো জানি, এখন উঠে এসো। যেখানে শুয়ে আছো, যেখানে তোমাকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে সেখান থেকে লক্ষ্মী মেয়ের মত উঠে এসো। থাকো আমার কাছে, যেও না। কোথাও আর কোনওদিন যেও না। কেউ নিতে চাইলেও যেও না। রঙিন রঙিন লোভ দেখিয়ে কত কেউ বলবে, এসো। সোজা বলে দেবে যাবো না। সারাক্ষণ আমার হাতদুটো ধরে রাখো, সারাক্ষণ শরীর স্পর্শ করে রাখো, কাছে থাকো, চোখের সামনে থাকো, নিঃশ্বাসের সঙ্গে থাকো, মিশে থাকো। আর কোনওদিন কেউ ডাকলেও যেও না। কেউ ভয় দেখালেও না। হেঁচকা টানলেও না। ছিঁড়ে ফেললেও না। যেও না। আমি যেখানে থাকি, সেখানে থাকো, সারাক্ষণ থাকো। আবার যাপন করো জীবন, যেরকম চেয়েছিলে সেরকম জীবন তুমি যাপন করো আবার। হাত ধরো, এই হাত থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি সুখ তুলে নাও। আমাকে বুকে রাখো, আমাকে ছুঁয়ে থাকো, যেও না। তোমাকে ভালোবাসবো আমি, যেও না। তোমাকে খুব খুব ভালোবাসবো, যেও না। কোনওদিন আর কষ্ট দেব না, যেও না। চোখের আড়াল করবো না কোনওদিন, তুমি যেও না। তুমি উঠে এসো, যেখানে ওরা তোমাকে শুইয়ে দিয়েছে, সেখানে আর তুমি শুয়ে থেকো না, তুমি এসো, আমি অপেক্ষা করছি, তুমি এসো। তোমার মুখের ওপর চেপে দেওয়া মাটি সরিয়ে তুমি উঠে এসো, একবার উঠে এসো, একবার শুধু। আমি আর কোনওদিন কোথাও তোমাকে একা একা যেতে দেব না। কথা দিচ্ছি, দেব না। তুমি উঠে এসো। তোমাকে ভালোবাসবো, উঠে এসো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1970
2613
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অবর্জিত
চিন্তামূলক
আমি চলে গেলে ফেলে রেখে যাব পিছু চিরকাল মনে রাখিবে, এমন কিছু, মূঢ়তা করা তা নিয়ে মিথ্যে ভেবে। ধুলোর খাজনা শোধ করে নেবে ধুলো, চুকে গিয়ে তবু বাকি রবে যতগুলো গরজ যাদের তারাই তা খুঁজে নেবে। আমি শুধু ভাবি, নিজেরে কেমনে ক্ষমি-- পুঞ্জ পুঞ্জ বকুনি উঠেছে জমি, কোন্‌ সৎকারে করি তার সদ্‌গতি। কবির গর্ব নেই মোর হেন নয়-- কবির লজ্জা পাশাপাশি তারি রয়, ভারতীর আছে এই দয়া মোর প্রতি। লিখিতে লিখিতে কেবলি গিয়েছি ছেপে, সময় রাখি নি ওজন দেখিতে মেপে, কীর্তি এবং কুকীর্তি গেছে মিশে। ছাপার কালিতে অস্থায়ী হয় স্থায়ী, এ অপরাধের জন্যে যে-জন দায়ী তার বোঝা আজ লঘু করা যায় কিসে। বিপদ ঘটাতে শুধু নেই ছাপাখানা, বিদ্যানুরাগী বন্ধু রয়েছে নানা-- আবর্জনারে বর্জন করি যদি চারি দিক হতে গর্জন করি উঠে, "ঐতিহাসিক সূত্র দিবে কি টুটে, যা ঘটেছে তারে রাখা চাই নিরবধি।" ইতিহাস বুড়ো, বেড়াজাল তার পাতা, সঙ্গে রয়েছে হিসাবের মোটা খাতা-- ধরা যাহা পড়ে ফর্দে সকলি আছে। হয় আর নয়, খোঁজ রাখে শুধু এই, ভালোমন্দর দরদ কিছুই নেই, মূল্যের ভেদ তুল্য তাহার কাছে। বিধাতাপুরুষ ঐতিহাসিক হলে চেহারা লইয়া ঋতুরা পড়িত গোলে, অঘ্রাণ তবে ফাগুন রহিত ব্যেপে। পুরানো পাতারা ঝরিতে যাইত ভুলে, কচি পাতাদের আঁকড়ি রহিত ঝুলে, পুরাণ ধরিত কাব্যের টুঁটি চেপে। জোড়হাত করে আমি বলি, "শোনো কথা, সৃষ্টির কাজে প্রকাশেরি ব্যগ্রতা, ইতিহাসটারে গোপন করে সে রাখে। জীবনলক্ষ্মী মেলিয়া রঙের রেখা ধরার অঙ্গে আঁকিছে পত্রলেখা, ভূতত্ত্ব তার কঙ্কালে ঢাকা থাকে। বিশ্বকবির লেখা যত হয় ছাপা প্রুফ্‌শিটে তার দশগুণ পড়ে চাপা, নব এডিশনে নূতন করিয়া তুলে। দাগি যাহা, যাহে বিকার, যাহাতে ক্ষতি, মমতামাত্র নাহি তো তাহার প্রতি-- বাঁধা নাহি থাকে ভুলে আর নির্ভুলে। সৃষ্টির কাজ লুপ্তির সাথে চলে, ছাপাযন্ত্রের ষড়যন্ত্রের বলে এ বিধান যদি পদে পদে পায় বাধা-- জীর্ণ ছিন্ন মলিনের সাথে গোঁজা কৃপণপাড়ার রাশীকৃত নিয়ে বোঝা সাহিত্য হবে শুধু কি ধোপার গাধা। যাহা কিছু লেখে সেরা নাহি হয় সবি, তা নিয়ে লজ্জা না করুক কোনো কবি-- প্রকৃতির কাজে কত হয় ভুলচুক; কিন্তু, হেয় যা শ্রেয়ের কোঠায় ফেলে তারেও রক্ষা করিবার ভূতে পেলে কালের সভায় কেমনে দেখাবে মুখ। ভাবী কালে মোর কী দান শ্রদ্ধা পাবে, খ্যাতিধারা মোর কত দূর চলে যাবে, সে লাগি চিন্তা করার অর্থ নাহি। বর্তমানের ভরি অর্ঘ্যের ডালি অদেয় যা দিনু মাখায়ে ছাপার কালি তাহারি লাগিয়া মার্জনা আমি চাহি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/yubjetay/
2825
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একা ব’সে সংসারের প্রান্ত-জানালায়
চিন্তামূলক
একা ব’সে সংসারের প্রান্ত-জানালায় দিগন্তের নীলিমায় চোখে পড়ে অনন্তের ভাষা। আলো আসে ছায়ায় জড়িত শিরীষের গাছ হতে শ্যামলের স্নিগ্ধ সখ্য বহি। বাজে মনে– নহে দূর,নহে বহু দূর। পথরেখা লীন হল অস্তগিরিশিখর-আড়ালে, স্তব্ধ আমি দিনান্তের পান্থশালা-দ্বারে, দূরে দীপ্তি দেয় ক্ষণে ক্ষণে শেষতীর্থমন্দিরের চূড়া। সেথা সিংহদ্বারে বাজে দিন-অবসানের রাগিণী যার মূর্ছনায় মেশা এ জন্মের যা-কিছু সুন্দর, স্পর্শ যা করেছে প্রাণ দীর্ঘ যাত্রাপথে পূর্ণতার ইঙ্গিত জানায়ে। বাজে মনে– নহে দূর,নহে বহু দূর।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/eka-bose-songsare-pranto-janalai/
2042
মল্লিকা সেনগুপ্ত
আপনি বলুন, মার্কস
মানবতাবাদী
ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গমবোনা শুরু করেছিল আর্যপুরুষের ক্ষেতে, যে লালন করেছিল শিশু সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে ? আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক, কে শ্রমিক নয় নতুনযন্ত্রের যারা মাসমাইনের কারিগর শুধু তারা শ্রম করে ! শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল সেই শ্রমিকগৃহিণী প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে, খাবার বানায় হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে রাত হলে ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে সেও কি শ্রমিক নয় ! আপনি বলুন মার্কস, শ্রম কাকে বলে ! গৃহশ্রমে মজুরী হয়না বলে মেয়েগুলি শুধু ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে আর কমরেড শুধু যার হাতে কাস্তে হাতুড়ি ! আপনাকে মানায় না এই অবিচার কখনো বিপ্লব হলে পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য হবে শ্রেণীহীন রাস্ট্রহীন আলোপৃথিবীর সেই দেশে আপনি বলুন মার্কস, মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী হবে ?
http://kobita.banglakosh.com/archives/5629.html
242
কাজী নজরুল ইসলাম
আশীর্বাদ
মানবতাবাদী
আপনার ঘরে আছে যে শত্রু তারে আগে করো জয়, ভাঙো সে দেয়াল, প্রদীপের আলো যাহা আগুলিয়া রয়। অনাত্বীয়রে আত্বীয় করো, তোমার বিরাট প্রাণ করে না কো যেন কোনোদিন কোনো মানুষে অসম্মান। সংসারের মিথ্যা বাঁধন ছিন্ন হোক আগে, কবে সে তোমার সকল দেউল রাঙিবে আলোর রাগে।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/asibad/
2062
মহাদেব সাহা
আমার ভেতরে যেন ফুটে উঠি
চিন্তামূলক
স্বপ্নের ভেতর, স্মৃতির ভেতর, এই একার ভেতর আমি অনন্তকাল ডুবে আছি; বার্চবন, স্নেজগাড়ি, দূরের ঘন্টাধ্বনি আমার স্মৃতির মধ্যে তোলপাড় করে ওঠে সুদূর বাতাস, ধূ-ধূ ঝাউবীথি- দেখি সূর্যাস্তের ছায়ার ভেতর আরো অশরীরী নগ্ন নর্তকীরা সব আরো স্বপ্নের ভেতর আরো স্মৃতির ভেতর আরো ছায়ার ভেতর ক্রমাগত ডুব-সাঁতার দিতে দিতে, ডুব-সাঁতার দিতে দিতে এই অপরাহ্নে খুব ক্লান্ত একা একটু বসতি চাই স্থিতি চাই আমি; আমি চাই আমার ভেতরে অপরূপ ম্লান কুয়াশায় যেন ফুটে উঠি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1337
2364
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ময়ূর ও গৌরী
নীতিমূলক
ময়ুর কহিল কাঁদি গেীরীর চরণে, কৈলাস-ভবনে;— “অবধান কর দেবি, আমি ভৃত্য নিত্য সেবি প্রিয়োত্তম সুতে তব এ পৃষ্ঠ-আসনে। রথী যথা দ্রুত রথে, চলেন পবন-পথে দাসের এ পিঠে চড়ি সেনানী সুমতি; তবু, মা গো, আমি দুখী অতি! করি যদি কেকাধ্বনি, ঘৃণায় হাসে অমনি খেচর, ভূচর জন্তু;—মরি, মা, শরমে! ডালে মূঢ় পিক যবে গায় গীত, তার রবে মাতিয়া জগৎ-জন বাখানে অধমে! বিবিধ কুসুম কেশে, সাজি মনোহর বেশে, বরেন বসুধা দেবী যবে ঋতুবরে কোকিল মঙ্গল-ধ্বনি করে। অহরহ কুহুধ্বনি বাজে বনস্থলে; নীরবে থাকি, মা, আমি; রাগে হিয়া জ্বলে! ঘুচাও কলঙ্ক শুভঙ্করি, পুত্রের কিঙ্কর আমি এ মিনতি করি, পা দুখানি ধরি।” উত্তর করিলা গৌরী সুমধুর স্বরে;— “পুত্রের বাহন তুমি খ্যাত চরাচরে, এ আক্ষেপ কর কি কারণে? হে বিহঙ্গ, অঙ্গ-কান্তি ভাবি দেখ মনে! চন্দ্রককলাপে দেখ নিজ পুচ্ছ-দেশে; রাখাল রাজার সম চূড়াখানি কেশে! আখণ্ডল-ধনুর বরণে মণ্ডিলা সু-পুচ্ছ ধাতা তোমার সৃজনে! সদা জ্বলে তব গলে স্বর্ণহার ঝল ঝলে, যাও, বাছা, নাচ গিয়া ঘনের গর্জ্জনে, হরষে সু-পুচ্ছ খুলি শিরে স্বর্ণ-চূড়া তুলি; করগে কেলি ব্রজ-কুঞ্জ-বনে। করতালি ব্রজাঙ্গনা দেবে রঙ্গে বরাঙ্গনা— তোষ গিয়া ময়ূরীরে,প্রেম-আলিঙ্গনে! শুন বাছা, মোর কথা শুন, দিয়াছেন কোন কোন গুণ, দেব সনাতন প্রতি-জনে; সু-কলে কোকিল গায়, বাজ বজ্র-গতি ধায়, অপরূপ রূপ তব, খেদ কি কারণে?”— নিজ অবস্থায় সদা স্থির যার মন, তার হতে সুখীতর অন্য কোন্ জন?
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/moyur-o-gouri/
601
গোলাম মোস্তফা
প্রার্থনা
স্তোত্রমূলক
অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি বিচার দিনের স্বামী। যত গুণগান হে চির মহান তোমারি অন্তর্যামী।দ্যুলোক-ভূলোক সবারে ছাড়িয়া তোমারি চরণে পড়ি লুটাইয়া তোমারি সকাশে যাচি হে শকতি তোমারি করুণাকামী।সরল সঠিক পূণ্য পন্থা মোদের দাও গো বলি, চালাও সে-পথে যে-পথে তোমার প্রিয়জন গেছে চলি।যে-পথে তোমার চির-অভিশাপ যে-পথে ভ্রান্তি, চির-পরিতাপ হে মহাচালক,মোদের কখনও করো না সে পথগামী।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4371.html
2436
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
টেলিফোন
হাস্যরসাত্মক
-হ্যালো, কে বলছ? -আমি। -আমি কে? -আমি রাজিব। -আজিব? -আজিব না রাজিব। র আকার রা জ ইকারে জি- -র আকারে রা, গ ইকারে গি? -না না। গ ইকারে গি না জ ইকারে জি। জিলাপির জি। -খিলাপীর খি? -খিলাপীর খি না, জিলাপীর জি। জ ইকারে জি, ল আকারে লা- -জ ইকারে জি, ম আকারে মা? -না না। ম আকারে মা না। ল আকারে লা। লাটাইয়ের লা।– -ঘাটাইয়ের ঘা? -ঘাটাইয়ের ঘা না। লাটাইয়ের লা। ল আকারে লা, ট আকারে টা- -ল আকারে লা চ আকারে চা? -না না। চ আকারে চা না। ট আকারে টা। টাকুয়ার টা। -মাকুয়ার মা? -মাকুয়ার মা না। টাকুয়ার টা। ট আকারে টা ক উকারে কু- -ট আকারে টা, ল উকারে লু? -না না। ল উকারে লু না। ক উকারে কু। কুমিরের কু। -ভুমিরের ভু? -ভুমিরের ভু না। কুমিরের কু। ক উকারে কু, মু ইকারে মি- -ক উকারে কু, প ইকারে পি? -না না। প ইকারে পি না, ম ইকারে মি। মিছিলের মি। -পিছিলের পি? -পিছিলের পি না। মিছিলের মি। ম ইকারে মি, ছ ইকারে ছি- -ম ইকারে মি, জ ইকারে জি? -না না। জ ইকারে জি না, ছ ইকারে ছি। ছিয়াশির ছি। -তিরাশির তি? (টেলিফোনে কথা বলবে আরো? কী নিয়ে শুরু করেছিল এখন মনে নাই কারো)
https://banglarkobita.com/poem/famous/2039
5394
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
করবী
প্রকৃতিমূলক
দূর হতে আমি গোলাপেরি মত ঠিক তবু আমোদিত করিতে পারিনা দিক।।গোলাপেরি মত অতুলন মম হাসি তুব হায় অলি ফিরে যায় কাছে আসি।।পথের প্রান্তে ফুটে আছি অহরহ গোলাপের মত রচিতে পারি নে মোহ।।ভালোবাসা মোর রাখি নি কাটায় ঘিরে সুলভ প্রেমের দুর্দশা তাই কিরে।।গোলাপের মত কন্টকী নই শুধু তাই কি এ বুকে জমে না গোলাপী মধু।।
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/korobi/
2889
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাঁচা আম
চিন্তামূলক
তিনটে কাঁচা আম পড়ে ছিল গাছতলায় চৈত্রমাসের সকালে মৃদু রোদ্‌দুরে । যখন-দেখলুম অস্থির ব্যগ্রতায় হাত গেল না কুড়িয়ে নিতে । তখন চা খেতে খেতে মনে ভাবলুম , বদল হয়েছে পালের হাওয়া পুব দিকের খেয়ার ঘাট ঝাপসা হয়ে এলে । সেদিন গেছে যেদিন দৈবে-পাওয়া দুটি-একটি কাঁচা আম ছিল আমার সোনার চাবি , খুলে দিত সমস্ত দিনের খুশির গোপন কুঠুরি ; আজ সে তালা নেই , চাবিও লাগে না । গোড়াকার কথাটা বলি । আমার বয়সে এ বাড়িতে যেদিন প্রথম আসছে বউ পরের ঘর থেকে , সেদিন যে-মনটা ছিল নোঙর-ফেলা নৌকো বান ডেকে তাকে দিলে তোলপাড় করে । জীবনের বাঁধা বরাদ্দ ছাপিয়ে দিয়ে এল অদৃষ্টের বদান্যতা । পুরোনো ছেঁড়া আটপৌরে দিনরাত্রিগুলো খসে পড়ল সমস্ত বাড়িটা থেকে । কদিন তিনবেলা রোশনচৌকিতে চার দিকের প্রাত্যহিক ভাষা দিল বদলিয়ে ; ঘরে ঘরে চলল আলোর গোলমাল ঝাড়ে লণ্ঠনে । অত্যন্ত পরিচিতের মাঝখানে ফুটে উঠল অত্যন্ত আশ্চর্য । কে এল রঙিন সাজে সজ্জায় , আলতা-পরা পায়ে পায়ে — ইঙ্গিত করল যে , সে এই সংসারের পরিমিত দামের মানুষ নয় — সেদিন সে ছিল একলা অতুলনীয় । বালকের দৃষ্টিতে এই প্রথম প্রকাশ পেল — জগতে এমন কিছু যাকে দেখা যায় কিন্তু জানা যায় না । বাঁশি থামল , বাণী থামল না — আমাদের বধূ রইল বিস্ময়ের অদৃশ্য রশ্মি দিয়ে ঘেরা । তার ভাব , তার আড়ি , তার খেলাধুলো ননদের সঙ্গে । অনেক সংকোচে অল্প একটু কাছে যেতে চাই , তার ডুরে শাড়িটি মনে ঘুরিয়ে দেয় আবর্ত ; কিন্তু , ভ্রূকুটিতে বুঝতে দেরি হয় না , আমি ছেলেমানুষ , আমি মেয়ে নই , আমি অন্য জাতের । তার বয়স আমার চেয়ে দুই-এক মাসের বড়োই হবে বা ছোটোই হবে । তা হোক , কিন্তু এ কথা মানি , আমরা ভিন্ন মসলায় তৈরি । মন একান্তই চাইত , ওকে কিছু একটা দিয়ে সাঁকো বানিয়ে নিতে । একদিন এই হতভাগা কোথা থেকে পেল কতকগুলো রঙিন পুথি ; ভাবলে , চমক লাগিয়ে দেবে । হেসে উঠল সে ; বলল , “ এগুলো নিয়ে করব কী । ” ইতিহাসের উপেক্ষিত এই-সব ট্র্যাজেডি কোথাও দরদ পায় না , লজ্জার ভারে বালকের সমস্ত দিনরাত্রির দেয় মাথা হেঁট করে । কোন্‌ বিচারক বিচার করবে যে , মূল্য আছে সেই পুঁথিগুলোর । তবু এরই মধ্যে দেখা গেল , শস্তা খাজনা চলে এমন দাবিও আছে ওই উচ্চাসনার — সেখানে ওর পিড়ে পাতা মাটির কাছে । ও ভালোবাসে কাঁচা আম খেতে শুল্পো শাক আর লঙ্কা দিয়ে মিশিয়ে । প্রসাদলাভের একটি ছোট্ট দরজা খোলা আছে আমার মতো ছেলে আর ছেলেমানুষের জন্যেও । গাছে চড়তে ছিল কড়া নিষেধ । হাওয়া দিলেই ছুটে যেতুম বাগানে , দৈবে যদি পাওয়া যেত একটিমাত্র ফল একটুখানি দুর্লভতার আড়াল থেকে , দেখতুম , সে কী শ্যামল , কী নিটোল , কী সুন্দর , প্রকৃতির সে কী আশ্চর্য দান । যে লোভী চিরে চিরে ওকে খায় সে দেখতে পায় নি ওর অপরূপ রূপ ।           একদিন শিলবৃষ্টির মধ্যে আম কুড়িয়ে এনেছিলুম ; ও বলল , “ কে বলেছে তোমাকে আনতে । ” আমি বললুম , “ কেউ না । ” ঝুড়িসুদ্ধ মাটিতে ফেলে চলে গেলুম । আর-একদিন মৌমাছিতে আমাকে দিলে কামড়ে ; সে বললে , “ এমন করে ফল আনতে হবে না । ” চুপ করে রইলুম । বয়স বেড়ে গেল । একদিন সোনার আংটি পেয়েছিলুম ওর কাছ থেকে ; তাতে স্মরণীয় কিছু লেখাও ছিল । স্নান করতে সেটা পড়ে গেল গঙ্গার জলে — খুঁজে পাই নি । এখনো কাঁচা আম পড়ছে খসে খসে গাছের তলায় , বছরের পর বছর । ওকে আর খুঁজে পাবার পথ নেই ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kacha-am/
647
জয় গোস্বামী
কী দুর্গম চাঁদ তোর নৌকার কিনারে গেঁথে আছে
রূপক
কী দুর্গম চাঁদ তোর নৌকার কিনারে গেঁথে আছে! অন্যদিকে কী সুন্দর মাঝি! যার মুখ কঙ্কালের, যার বাহু জং-ধরা লোহার। বল্‌, তোর মাঝিকে বল্‌, শুরু করতে লৌহের প্রহার। অত যে দুর্মূল্য চাঁদ, সেও তো সুলভে ভাঙতে রাজি! খণ্ডে খণ্ডে জলে পড়ছে, জল ছিটকে উঠছে দূরে কাছে… বল তোর ইচ্ছে হয় না সেই দৃশ্যে দাঁড়াতে আবার ওই উল্কাগুলি খেতে জলরাশি সরিয়ে যখন রাক্ষুসে মাছের মুখ ভেসে উঠবে জলদেবতার?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1730
3891
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্বশুরবাড়ির গ্রাম
ছড়া
শ্বশুরবাড়ির গ্রাম, নাম তার কুলকাঁটা, যেতে হবে উপেনের– চাই তাই চুল-ছাঁটা। নাপিত বললে, “কাঁচি খুঁজে যদি পাই বাঁচি– ক্ষুর আছে, একেবারে করে দেব মূল-ছাঁটা। জেনো বাবু, তাহলেই বেঁচে যায় ভুল-ছাঁটা।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shoshurbarir-gram/
3557
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বালক
ছড়া
বয়স তখন ছিল কাঁচা; হালকা দেহখানা ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা। উড়ত পাশের ছাদের থেকে পায়রাগুলোর ঝাঁক, বারান্দাটার রেলিং-'পরে ডাকত এসে কাক। ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত গলির ওপার থেকে, তপসিমাছের ঝুড়ি নিত গামছা দিয়ে ঢেকে। বেহালাটা হেলিয়ে কাঁধে ছাদের 'পরে দাদা, সন্ধ্যাতারার সুরে যেন সুর হত তাঁর সাধা। জুটেছি বৌদিদির কাছে ইংরেজি পাঠ ছেড়ে, মুখখানিতে-ঘের-দেওয়া তাঁর শাড়িটি লালপেড়ে। চুরি ক'রে চাবির গোছা লুকিয়ে ফুলের টবে স্নেহের রাগে রাগিয়ে দিতেম নানান উপদ্রবে। কঙ্কালী চাটুজ্জে হঠাৎ জুটত সন্ধ্যা হলে; বাঁ হাতে তার থেলো হুঁকো, চাদর কাঁধে ঝোলে। দ্রুত লয়ে আউড়ে যেত লবকুশের ছড়া; থাকত আমার খাতা লেখা, পড়ে থাকত পড়া-- মনে মনে ইচ্ছে হত, যদিই কোনো ছলে ভর্তি হওয়া সহজ হত এই পাঁচালির দলে ভাব্‌না মাথায় চাপত নাকো ক্লাসে ওঠার দায়ে, গান শুনিয়ে চলে যেতুম নতুন নতুন গাঁয়ে। স্কুলের ছুটি হয়ে গেলে বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ দেখি, মেঘ নেমেছে ছাদের কাছে ঘেঁষে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, রাস্তা ভাসে জলে, ঐরাবতের শুঁড় দেখা দেয় জল-ঢালা সব নলে। অন্ধকারে শোনা যেত রিম্‌ঝিমিনি ধারা, রাজপুত্র তেপান্তরে কোথা সে পথহারা। ম্যাপে যে-সব পাহাড় জানি, জানি যে-সব গাঙ কুয়েন্‌লুন আর মিসিসিপি ইয়াংসিকিয়াং, জানার সঙ্গে আধেক-জানা, দূরের থেকে শোনা, নানা রঙের নানা সুতোয় সব দিয়ে জাল-বোনা, নানারকম ধ্বনির সঙ্গে নানান চলাফেরা সব দিয়ে এক হালকা জগৎ মন দিয়ে মোর ঘেরা, ভাব্‌নাগুলো তারই মধ্যে ফিরত থাকি থাকি, বানের জলে শ্যাওলা যেমন, মেঘের তলে পাখি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/baluk/
3203
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিক্‌বালা
প্রকৃতিমূলক
দূর আকাশের পথ উঠিছে জলদরথ, নিমেন চাহি দেখে কবি ধরণী নিদ্রিত। অস্ফুট চিত্রের মত নদ নদী পরবত, পৃথিবীর পটে যেন রয়েছে চিত্রিত! সমস্ত পৃথিবী ধরি একটি মুঠায় অনন্ত সুনীল সিন্ধু সুধীরে লুটায়। হাত ধরাধরি করি দিক্‌বালাগণ দাঁড়ায়ে সাগরতীরে ছবির মতন। কেহ বা জলদময় মাখায়ে জোছানা। নীল দিগন্তের কোলে পাতিছে বিছানা। মেখের শয্যায় কেহ ছড়ায়ে কুন্তল নীরবে ঘুমাইতেছে নিদ্রায় বিহ্বল। সাগরতরঙ্গ তার চরণে মিলায়, লইয়া শিথিল কেশ পবন খেলায়। কোন কোন দিক্‌বালা বসি কুতূহলে আকাশের চিত্র আঁকে সাগরের জলে। আঁকিল জলদমালা চন্দ্রগ্রহ তারা, রঞ্জিল সাগর দিয়া জোছনার ধারা। পাপিয়ার ধ্বনি শুনি কেহ হাসিমুখে প্রতিধ্বনিরমণীরে জাগায় কৌতুকে! শুকতারা প্রভাতের ললাটে ফুটিল, পূরবের দিক্‌দেবী জাগিয়া উঠিল। লোহিত কমলকরে পূরবের দ্বার খুলিয়া, সিন্দূর দিল সীমন্তে উষার। মাজি দিয়া উদয়ের কনকসোপান, তপনের সারথিরে করিল আহ্বান। সাগর-ঊর্ম্মির শিরে সোনার চরণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে নেচে গেল দিক্‌বালাগণ। পূরবদিগন্ত-কোলে জলদ ঙ্গছায়ে ধরণীর মুখ হ’তে আঁধার মুছায়ে, বিমল শিশিরজলে ধুইয়া চরণ, নিবিড় কুন্তলে মাখি কনককিরণ, সোনার মেঘের মত আকাশের তলে, কনককমলসম মানসের জলে ভাসিতে লাগিল যত দিক্‌-বালাগণে— উলসিত তনুখানি প্রভাতপবনে। ওই হিমগিরি-’পরে কোন দিক্‌বালা রঞ্জিছে কনককরে নীহারিকামালা! নিভৃতে সরসীজলে করিতেছে স্নান, ভাসিছে কমলবনে কমলবয়ান। তীরে উঠি মালা গাঁথি শিশিরের জলে পরিছে তুষারশুভ্র সুকুমার গলে। ওদিকে দেখেছ ওই সাহারা-প্রান্তরে, মধ্যে দিক্‌দেবী শুভ্র বালুকার ‘পরে। অঙ্গ হতে ছুটিতেছে জ্বলন্ত কিরণ, চাহিতে মুখের পানে ঝলসে নয়ন। আঁকিছে বালুকাপুঞ্জে শত শত রবি, আঁকিছে দিগন্তপটে মরীচিকা-ছবি। অন্য দিকে কাশ্মীরের উপত্যকা-তলে পরি শত বরণের ফুলমালা গলে, শত বিহঙ্গের গান শুনিতে শুনিতে, সরসীলহরীমালা গুনিতে গুনিতে, এলায়ে কোমল তনু কমলকাননে আলসে দিকের বালা মগন স্বপনে। ওই হোথা দিক্‌দেবী বসিয়া হরষে ঘুরায় ঋতুর চক্র মৃদুল পরশে। ফুরায়ে গিয়েছে এবে শীতসমীরণ, বসন্ত পৃথিবীতলে অর্পিবে চরণ। পাখীরে গাহিতে কহি অরণ্যের গান মলয়ের সমীরণে করিয়া আহ্বান বনদেবীদের কাছে কাননে কাননে কহিল ফুটাতে ফুলদিক‍্‌দেবীগণে— বহিল মলয়বায়ু কাননে ফিরিয়া, পাখীরা গাহিল গান কানন ভরিয়া। ফুলবালা-সাথে আসি বনদেবীগণ ধীরে দিক‍্‌দেবীদের বন্দিল চরণ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dikbala/