id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
660
জয় গোস্বামী
ছাই
প্রেমমূলক
ফাল্গুনের ক্ষত, যাও, অন্ধকারে পায়ে কুশ ফুটে তারা চিনে চিনে ফিরে এসো । এরপর ক্ষুদ্ধ হিম শুরু হয়ে যাবে এই শুয়ে থাকো পুরনো মরুতে । সারারাত্রি জেগে তুমি তৈরি করে নেবে না পিদিম ? কারো পা তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে, আজ এই জলে তার একগাছি চুলও যদি ভেসে থাকে নেমে তাই ধরে ধরে তলায় সবুজ দেশ কাকে বলে ‘ছোটকাকী ফিরে এসো ঘরে ?’ কপালে জ্বলন্ত টিকলি, প্রায় সব খুলে রেখে লুকিয়ে সাঁতার সেও তো দিয়েছে আর তেমনই লুকিয়ে তুমি ওই শিরীষের ফাঁক দিয়ে দেখেছিলে সোনামাছ । চলে গেছে বেড়া গায়ে গায়ে ফাল্গুনের ক্ষত যাও অন্ধকারে কুশ ফুটে পায়ে ফিরে এসো ; তারা চিনে চিনে দিন ঠিক করো মাঘের তিরিশে বন্যা বেশি হলে তুমি সেই কবে জেলে নৌকো ও-বাড়ির গেটে বেঁধে দিয়ে এসেছিলে ? মনে করবার আগে দূর থেকে চিতা নদীর ওপারে একা জ্বলে ওঠে । শুকনো পিণ্ডের দলা চেটে পালায় শৃগাল । তুমি চাইছো যে পিদিম আমি তৈরি করেছি তা । বলো কে তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে কবে চুলে তার মেখে দিলে বালি ? পা কিছু পাচ্ছে না, শুধু ঘোলা জল ঘোলা জল, পালাবার সমস্ত প্রণালী বাইরে ফেলে রেখে এসে দেখি আমি, ঘরে নেই কনে ! শয্যায় জ্বলন্ত টিকলি, অন্য কোণে ফুলের মুকুটে সামান্য সিঁদুর চিহ্ন । তবে এতদূর নামা ভুল ? এই রাতে তীরে উঠে তারা দেখে দেখে তাকে খুঁজে দেখো । নয়তো হঠাৎ কি কারণে হিম শুরু হয়ে যাবে বুঝতেও পারবে না । এই মরুর পুরনো খসখসে বাতাস এসে জানাচ্ছে এখন সেই ট্রাইসাইকেল ষোল বাই দুই ডি-তে এ-ঘরে ও-ঘর বেড়াতো যে-ছেলে ভাইকে পা ধরে তুলত জলভর্তি ড্রাম থেকে, তার কথা শোনো আজ এই ফাল্গুনরাতে । কী শুনবে ? দূরে কলাবাগানের ধারে লাল ফ্ল্যাগ নীল ফ্ল্যাগ রুবি ঘোষ ভিকট্রিস্ট্যান্ডে এসো । ওই পারে শ্মশানে ঘুমোচ্ছে লোক, চিতা নেই । এখন নদীর মধ্যে নামা উচিত হবে না, তবু উঁচু থেকে দেখা যাবে জলের তলায় মোরগেরা– তাদের ঠ্যাং বাঁধা, গলা উড়ে গেছে । নিচু ক্লাসে মেয়েটির সাথে তখন সে পোড়াত বাজি, আর কিছুদূরে উঁচু অন্ধকার জেল ককিয়ে উঠতো রাত্রে, এই কথা বুঝিয়ে, যে, এরা নিশ্বাস নেবে না আর । সেই সব দিনেই তো মেয়েটির মুখের ঘামতেল জ্বলেছে লজ্জায়, তুমি সামনে এলে । পাশাপাশি দেখতে না লাফানো শকুন দিনের বেলা ছিঁড়ে নিতো ছেলেদের শব থেকে মাংস আর জামা ? সে-সব ক্ষতেরা নেই । শুধু দাগ খাঁ খাঁ করছে চারদিকের রাতে । মাঠে আসলাম তার কারণ, এইবার তৈরী করেছি পিদিম । এবার দেহের চর্বি ঢেলে দিই ওতে । যতটুকু দাহ্যগুণ এখনো রয়েছে তাও ওই মৃত জ্বলে মেশবার আগেই দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে দি রক্ত হাড় চর্বি শেষবার… পরে যত খুশী ছাই মরুতে উড়ুক, আমি সেটা নিয়ে ভাবছি না হিম ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রফাল্গুনের ক্ষত, যাও, অন্ধকারে পায়ে কুশ ফুটে তারা চিনে চিনে ফিরে এসো । এরপর ক্ষুদ্ধ হিম শুরু হয়ে যাবে এই শুয়ে থাকো পুরনো মরুতে । সারারাত্রি জেগে তুমি তৈরি করে নেবে না পিদিম ? কারো পা তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে, আজ এই জলে তার একগাছি চুলও যদি ভেসে থাকে নেমে তাই ধরে ধরে তলায় সবুজ দেশ কাকে বলে ‘ছোটকাকী ফিরে এসো ঘরে ?’ কপালে জ্বলন্ত টিকলি, প্রায় সব খুলে রেখে লুকিয়ে সাঁতার সেও তো দিয়েছে আর তেমনই লুকিয়ে তুমি ওই শিরীষের ফাঁক দিয়ে দেখেছিলে সোনামাছ । চলে গেছে বেড়া গায়ে গায়ে ফাল্গুনের ক্ষত যাও অন্ধকারে কুশ ফুটে পায়ে ফিরে এসো ; তারা চিনে চিনে দিন ঠিক করো মাঘের তিরিশে বন্যা বেশি হলে তুমি সেই কবে জেলে নৌকো ও-বাড়ির গেটে বেঁধে দিয়ে এসেছিলে ? মনে করবার আগে দূর থেকে চিতা নদীর ওপারে একা জ্বলে ওঠে । শুকনো পিণ্ডের দলা চেটে পালায় শৃগাল । তুমি চাইছো যে পিদিম আমি তৈরি করেছি তা । বলো কে তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে কবে চুলে তার মেখে দিলে বালি ? পা কিছু পাচ্ছে না, শুধু ঘোলা জল ঘোলা জল, পালাবার সমস্ত প্রণালী বাইরে ফেলে রেখে এসে দেখি আমি, ঘরে নেই কনে ! শয্যায় জ্বলন্ত টিকলি, অন্য কোণে ফুলের মুকুটে সামান্য সিঁদুর চিহ্ন । তবে এতদূর নামা ভুল ? এই রাতে তীরে উঠে তারা দেখে দেখে তাকে খুঁজে দেখো । নয়তো হঠাৎ কি কারণে হিম শুরু হয়ে যাবে বুঝতেও পারবে না । এই মরুর পুরনো খসখসে বাতাস এসে জানাচ্ছে এখন সেই ট্রাইসাইকেল ষোল বাই দুই ডি-তে এ-ঘরে ও-ঘর বেড়াতো যে-ছেলে ভাইকে পা ধরে তুলত জলভর্তি ড্রাম থেকে, তার কথা শোনো আজ এই ফাল্গুনরাতে । কী শুনবে ? দূরে কলাবাগানের ধারে লাল ফ্ল্যাগ নীল ফ্ল্যাগ রুবি ঘোষ ভিকট্রিস্ট্যান্ডে এসো । ওই পারে শ্মশানে ঘুমোচ্ছে লোক, চিতা নেই । এখন নদীর মধ্যে নামা উচিত হবে না, তবু উঁচু থেকে দেখা যাবে জলের তলায় মোরগেরা– তাদের ঠ্যাং বাঁধা, গলা উড়ে গেছে । নিচু ক্লাসে মেয়েটির সাথে তখন সে পোড়াত বাজি, আর কিছুদূরে উঁচু অন্ধকার জেল ককিয়ে উঠতো রাত্রে, এই কথা বুঝিয়ে, যে, এরা নিশ্বাস নেবে না আর । সেই সব দিনেই তো মেয়েটির মুখের ঘামতেল জ্বলেছে লজ্জায়, তুমি সামনে এলে । পাশাপাশি দেখতে না লাফানো শকুন দিনের বেলা ছিঁড়ে নিতো ছেলেদের শব থেকে মাংস আর জামা ? সে-সব ক্ষতেরা নেই । শুধু দাগ খাঁ খাঁ করছে চারদিকের রাতে । মাঠে আসলাম তার কারণ, এইবার তৈরী করেছি পিদিম । এবার দেহের চর্বি ঢেলে দিই ওতে । যতটুকু দাহ্যগুণ এখনো রয়েছে তাও ওই মৃত জ্বলে মেশবার আগেই দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে দি রক্ত হাড় চর্বি শেষবার… পরে যত খুশী ছাই মরুতে উড়ুক, আমি সেটা নিয়ে ভাবছি না হিম ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রফাল্গুনের ক্ষত, যাও, অন্ধকারে পায়ে কুশ ফুটে তারা চিনে চিনে ফিরে এসো । এরপর ক্ষুদ্ধ হিম শুরু হয়ে যাবে এই শুয়ে থাকো পুরনো মরুতে । সারারাত্রি জেগে তুমি তৈরি করে নেবে না পিদিম ? কারো পা তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে, আজ এই জলে তার একগাছি চুলও যদি ভেসে থাকে নেমে তাই ধরে ধরে তলায় সবুজ দেশ কাকে বলে ‘ছোটকাকী ফিরে এসো ঘরে ?’ কপালে জ্বলন্ত টিকলি, প্রায় সব খুলে রেখে লুকিয়ে সাঁতার সেও তো দিয়েছে আর তেমনই লুকিয়ে তুমি ওই শিরীষের ফাঁক দিয়ে দেখেছিলে সোনামাছ । চলে গেছে বেড়া গায়ে গায়ে ফাল্গুনের ক্ষত যাও অন্ধকারে কুশ ফুটে পায়ে ফিরে এসো ; তারা চিনে চিনে দিন ঠিক করো মাঘের তিরিশে বন্যা বেশি হলে তুমি সেই কবে জেলে নৌকো ও-বাড়ির গেটে বেঁধে দিয়ে এসেছিলে ? মনে করবার আগে দূর থেকে চিতা নদীর ওপারে একা জ্বলে ওঠে । শুকনো পিণ্ডের দলা চেটে পালায় শৃগাল । তুমি চাইছো যে পিদিম আমি তৈরি করেছি তা । বলো কে তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে কবে চুলে তার মেখে দিলে বালি ? পা কিছু পাচ্ছে না, শুধু ঘোলা জল ঘোলা জল, পালাবার সমস্ত প্রণালী বাইরে ফেলে রেখে এসে দেখি আমি, ঘরে নেই কনে ! শয্যায় জ্বলন্ত টিকলি, অন্য কোণে ফুলের মুকুটে সামান্য সিঁদুর চিহ্ন । তবে এতদূর নামা ভুল ? এই রাতে তীরে উঠে তারা দেখে দেখে তাকে খুঁজে দেখো । নয়তো হঠাৎ কি কারণে হিম শুরু হয়ে যাবে বুঝতেও পারবে না । এই মরুর পুরনো খসখসে বাতাস এসে জানাচ্ছে এখন সেই ট্রাইসাইকেল ষোল বাই দুই ডি-তে এ-ঘরে ও-ঘর বেড়াতো যে-ছেলে ভাইকে পা ধরে তুলত জলভর্তি ড্রাম থেকে, তার কথা শোনো আজ এই ফাল্গুনরাতে । কী শুনবে ? দূরে কলাবাগানের ধারে লাল ফ্ল্যাগ নীল ফ্ল্যাগ রুবি ঘোষ ভিকট্রিস্ট্যান্ডে এসো । ওই পারে শ্মশানে ঘুমোচ্ছে লোক, চিতা নেই । এখন নদীর মধ্যে নামা উচিত হবে না, তবু উঁচু থেকে দেখা যাবে জলের তলায় মোরগেরা– তাদের ঠ্যাং বাঁধা, গলা উড়ে গেছে । নিচু ক্লাসে মেয়েটির সাথে তখন সে পোড়াত বাজি, আর কিছুদূরে উঁচু অন্ধকার জেল ককিয়ে উঠতো রাত্রে, এই কথা বুঝিয়ে, যে, এরা নিশ্বাস নেবে না আর । সেই সব দিনেই তো মেয়েটির মুখের ঘামতেল জ্বলেছে লজ্জায়, তুমি সামনে এলে । পাশাপাশি দেখতে না লাফানো শকুন দিনের বেলা ছিঁড়ে নিতো ছেলেদের শব থেকে মাংস আর জামা ? সে-সব ক্ষতেরা নেই । শুধু দাগ খাঁ খাঁ করছে চারদিকের রাতে । মাঠে আসলাম তার কারণ, এইবার তৈরী করেছি পিদিম । এবার দেহের চর্বি ঢেলে দিই ওতে । যতটুকু দাহ্যগুণ এখনো রয়েছে তাও ওই মৃত জ্বলে মেশবার আগেই দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে দি রক্ত হাড় চর্বি শেষবার… পরে যত খুশী ছাই মরুতে উড়ুক, আমি সেটা নিয়ে ভাবছি না হিম ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রফাল্গুনের ক্ষত, যাও, অন্ধকারে পায়ে কুশ ফুটে তারা চিনে চিনে ফিরে এসো । এরপর ক্ষুদ্ধ হিম শুরু হয়ে যাবে এই শুয়ে থাকো পুরনো মরুতে । সারারাত্রি জেগে তুমি তৈরি করে নেবে না পিদিম ? কারো পা তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে, আজ এই জলে তার একগাছি চুলও যদি ভেসে থাকে নেমে তাই ধরে ধরে তলায় সবুজ দেশ কাকে বলে ‘ছোটকাকী ফিরে এসো ঘরে ?’ কপালে জ্বলন্ত টিকলি, প্রায় সব খুলে রেখে লুকিয়ে সাঁতার সেও তো দিয়েছে আর তেমনই লুকিয়ে তুমি ওই শিরীষের ফাঁক দিয়ে দেখেছিলে সোনামাছ । চলে গেছে বেড়া গায়ে গায়ে ফাল্গুনের ক্ষত যাও অন্ধকারে কুশ ফুটে পায়ে ফিরে এসো ; তারা চিনে চিনে দিন ঠিক করো মাঘের তিরিশে বন্যা বেশি হলে তুমি সেই কবে জেলে নৌকো ও-বাড়ির গেটে বেঁধে দিয়ে এসেছিলে ? মনে করবার আগে দূর থেকে চিতা নদীর ওপারে একা জ্বলে ওঠে । শুকনো পিণ্ডের দলা চেটে পালায় শৃগাল । তুমি চাইছো যে পিদিম আমি তৈরি করেছি তা । বলো কে তীরের বালি মাড়িয়ে দৌড়েছে কবে চুলে তার মেখে দিলে বালি ? পা কিছু পাচ্ছে না, শুধু ঘোলা জল ঘোলা জল, পালাবার সমস্ত প্রণালী বাইরে ফেলে রেখে এসে দেখি আমি, ঘরে নেই কনে ! শয্যায় জ্বলন্ত টিকলি, অন্য কোণে ফুলের মুকুটে সামান্য সিঁদুর চিহ্ন । তবে এতদূর নামা ভুল ? এই রাতে তীরে উঠে তারা দেখে দেখে তাকে খুঁজে দেখো । নয়তো হঠাৎ কি কারণে হিম শুরু হয়ে যাবে বুঝতেও পারবে না । এই মরুর পুরনো খসখসে বাতাস এসে জানাচ্ছে এখন সেই ট্রাইসাইকেল ষোল বাই দুই ডি-তে এ-ঘরে ও-ঘর বেড়াতো যে-ছেলে ভাইকে পা ধরে তুলত জলভর্তি ড্রাম থেকে, তার কথা শোনো আজ এই ফাল্গুনরাতে । কী শুনবে ? দূরে কলাবাগানের ধারে লাল ফ্ল্যাগ নীল ফ্ল্যাগ রুবি ঘোষ ভিকট্রিস্ট্যান্ডে এসো । ওই পারে শ্মশানে ঘুমোচ্ছে লোক, চিতা নেই । এখন নদীর মধ্যে নামা উচিত হবে না, তবু উঁচু থেকে দেখা যাবে জলের তলায় মোরগেরা– তাদের ঠ্যাং বাঁধা, গলা উড়ে গেছে । নিচু ক্লাসে মেয়েটির সাথে তখন সে পোড়াত বাজি, আর কিছুদূরে উঁচু অন্ধকার জেল ককিয়ে উঠতো রাত্রে, এই কথা বুঝিয়ে, যে, এরা নিশ্বাস নেবে না আর । সেই সব দিনেই তো মেয়েটির মুখের ঘামতেল জ্বলেছে লজ্জায়, তুমি সামনে এলে । পাশাপাশি দেখতে না লাফানো শকুন দিনের বেলা ছিঁড়ে নিতো ছেলেদের শব থেকে মাংস আর জামা ? সে-সব ক্ষতেরা নেই । শুধু দাগ খাঁ খাঁ করছে চারদিকের রাতে । মাঠে আসলাম তার কারণ, এইবার তৈরী করেছি পিদিম । এবার দেহের চর্বি ঢেলে দিই ওতে । যতটুকু দাহ্যগুণ এখনো রয়েছে তাও ওই মৃত জ্বলে মেশবার আগেই দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে দি রক্ত হাড় চর্বি শেষবার… পরে যত খুশী ছাই মরুতে উড়ুক, আমি সেটা নিয়ে ভাবছি না হিম ।আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%87-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
1795
পূর্ণেন্দু পত্রী
কয়েকটি জরুরী ঘোষণা
চিন্তামূলক
আগামী চোদ্দ বছর মহিষ কিংবা নেউল রঙের মেঘের মুখদর্শন করব না কেউ। আগামী চোদ্দ বছর আমাদের কবিতা থেকে হিজড়ে-নাচন বৃষ্টির নির্বাসন। স্বেচ্ছাচারী এবং হামলাবাজ হাওয়াকে চোদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছি আমি আর পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় টেলিফোনে ট্রাঙ্কলে রেডিওগ্রামে জানিয়ে দিয়েছি সমস্ত বিক্ষুব্ধ জলস্রোত যেন মাটিতে নাক-খত দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেয় দুর্গত মানুষের কাদা-পায়ে। প্রত্যেক নদীর বাঁধকে বলে দিয়েছি হতে হবে হিমালয়ের কাঁধ সমান প্রত্যেকটা নদীতে হতে হবে পাড়াগার লাজুক বৌ প্রত্যেকটা ব্যারেজকে জননীর গর্ভ। ভবিষ্যতে আর কোনদিন যদি মানুষকে ভাসতে দেখি শিকড়হীন উলঙ্গ আর কোনদিন যদি মানুষের সাজানো-নিকোনো স্বপ্নসাধের ভিতরে ঢুকে পড়ে দুঃস্বপ্নের খল-খল হাসি, আঁকাবাঁকা সাপ, মরা কুকুরের কান্না আর ভাঙা শাঁখা আর কোনদিন যদি মানুষের শ্রেষ্ঠতম সংলাপ হয়ে ওঠে হাহাকার আর কোনদিন যদি মানুষের আলতা সিদুর পরা সতী-লক্ষ্মী গৃহস্থলিকে হেলিকপ্টার থেকে মনে হয় ছেঁড়া-কাঁথা কানির টুকরো আমি বাধ্য হবো সভ্যতার বিরুদ্ধে ফাঁসীর হুকুম দিতে। যতদিন মানুষের গায়ে দুর্দিনের দুর্গন্ধ এবং নষ্ট জলরেখা রোদের কামাই করা চলবে না একনিও। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত আমি দেখে যেতে চাই। সমস্ত পুরুষ সূর্যমুখী, নারীরা ঝুমকো জবা আর শিশুরা কমলা রঙের বোঁটায় শাদা শিউলি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1302
2512
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
বিধি আমায় ভিন্ন জনম দাও
মানবতাবাদী
বিধি আমায় ভিন্ন জনম দাও পশু পাখী বৃক্ষ লতা কীট পতঙ্গ যথা-তথা যা খুশী রূপ দিয়ে আমার এ রূপ কেড়ে নাও অভিশপ্ত মানব-জনম নাও-গো কেড়ে নাও ।। শিশু রাজন হত্যাকারী সবাই মানব জনমধারী মানুষ বড়ই পাপাচারী পোকা-মাকড় বানাও আমায় মেনে নেবো তাও অভিশপ্ত মানব-জনম নাও গো-কেড়ে নাও ।।
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/bidhi-amay-bhinno-jonom-dao/
3398
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুণ্যের হিসাব
সনেট
সাধু যবে স্বর্গে গেল, চিত্রগুপ্তে ডাকি কহিলেন, “আনো মোর পুণ্যের হিসাব।” চিত্রগুপ্ত খাতাখানি সম্মুখেতে রাখি দেখিতে লাগিল তার মুখের কী ভাব। সাধু কহে চমকিয়া, “মহা ভুল এ কী! প্রথমের পাতাগুলো ভরিয়াছ আঁকে, শেষের পাতায় এ যে সব শূন্য দেখি— যতদিন ডুবে ছিনু সংসারের পাঁকে ততদিন এত পুণ্য কোথা হতে আসে!” শুনি কথা চিত্রগুপ্ত মনে মনে হাসে। সাধু মহা রেগে বলে, “যৌবনের পাতে এত পুণ্য কেন লেখ দেবপূজা-খাতে।” চিত্রগুপ্ত হেসে বলে, “বড়ো শক্ত বুঝা। যারে বলে ভালোবাসা, তারে বলে পূজা।”  (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/punnyer-hisab/
4283
শহীদ কাদরী
মাংস, মাংস, মাংস
চিন্তামূলক
আমাকে রাঙাতে পারে তেমন গোলাপ কখনও দেখি না। তবে কাকে, কখন, কোথায় ধরা দেবো? একমাত্র গোধূলি বেলায় সবকিছু বীরাঙ্গনার মতন রাঙা হয়ে যায়। শৈশবও ছিলো না লাল। তবে জানি, দেখেছিও, ছুরির উজ্জ্বলতা থেকে ঝরে পড়ে বিন্দু বিন্দু লাল ফোঁটাতবে হাত রাখবো ছুরির বাঁটে? সবুজ সতেজ- রূপালি রেকাবে রাখা পানের নিপুণ কোনো খিলি নয়, মাংস, মাংস, মাংস… মাংসের ভেতরে শুধু দৃঢ়মুখ সার্জনের রূঢ়তম হাতের মতন খুঁজে নিতে হবে সব জীবনের রাঙা দিনগুলি …
http://kobita.banglakosh.com/archives/4167.html
1148
জীবনানন্দ দাশ
মনোবীজ
প্রেমমূলক
জামিরের ঘন বন অইখানে রচেছিলো কারা? এইখানে লাগে নাই মানুষের হাত। দিনের বেলায় যেই সমারূঢ় চিন্তার আঘাত ইস্পাতের আশা গড়ে- সেই সব সমুজ্জ্বল বিবরণ ছাড়াযেন আর নেই কিছু পৃথিবীতেঃ এই কথা ভেবে যাহারা রয়েছে ঘুমে তুলীর বালিশে মাথা গুঁজে; তাহারা মৃত্যুর পর জামিরের বনে জ্যোৎস্না পাবে নাকো খুঁজে; বধির-ইস্পাত খড়্গ তাহাদের কোলে তুলে নেবে। সেই মুখ এখনও দিনের আলো কোলে নিয়ে করিতেছে খেলাঃ যেন কোনো অসংগতি নেই- সব হালভাঙা জাহাজের মতো সমন্বয় সাগরে অনেক রৌদ্র আছে ব’লে;- পরিব্যস্ত বন্দরের মতো মনে হয় যেন এই পৃথিবীকে;- যেখানে অঙ্কুশ নেই তাকে অবহেলা করিবে সে আজো জানি;- দিনশেষে বাদুড়ের-মতন-সঞ্চারে তারে আমি পাবো নাকো;- এই রাতে পেয়ারার ছায়ার ভিতরে তারে নয়- স্নিগ্ধ সব ধানগন্ধী প্যাঁচাদের প্রেম মনে পড়ে। মৃত্যু এক শান্ত ক্ষেত- সেইখানে পাবো নাকো তারে।পৃথিবীর অলিগলি বেয়ে আমি কত দিন চলিলাম। ঘুমালাম অন্ধকারে যখন বালিশেঃ নোনা ধরে নাকো সেই দেওয়ালের ধূসর পালিশে চন্দ্রমল্লিকার বন দেখিলাম রহিয়াছে জ্যোৎস্নায় মিশে। যেই সব বালিহাঁস ম’রে গেছে পৃথিবীতে শিকারির গুলির আঘাতেঃ বিবর্ণ গম্বুজে এসে জড়ো হয় আকাশের চেয়ে বড়ো রাতে; প্রেমের খাবার নিয়ে ডাকিলাম তারে আমি তবুও সে নামিল না হাতে।পৃথিবীর বেদনার মতো ম্লান দাঁড়ালামঃ হাতে মৃত সূর্যের শিখা; প্রেমের খাবার হাতে ডাকিলাম; অঘ্রাণের মাঠের মৃত্তিকা হ’য়ে গেলো; নাই জ্যোৎস্না- নাই কো মল্লিকা।সেই সব পাখি আর ফুলঃ পৃথিবীর সেই সব মধ্যস্থতা আমার ও সৌন্দর্যের শরীরের সাথে ম্যমির মতনও আজ কোনোদিকে নেই আর; সেই সব শীর্ণ দীর্ঘ মোমবাতি ফুরায়েছে আছে শুধু চিন্তার আভার ব্যবহার। সন্ধ্যা না-আসিতে তাই হৃদয় প্রবেশ করে প্যাগোডার ছায়ার ভিতরে অনেক ধূসর বই নিয়ে।চেয়ে দেখি কোনো-এক আননের গভীর উদয়ঃ সে-আনন পৃথিবীর নয়। দু-চোখ নিমীল তার কিসের সন্ধানে? ‘সোনা- নারী- তিশি- আর ধানে’- বলিল সেঃ ‘কেবল মাটির জন্ম হয়।’ বলিলামঃ ‘তুমিও তো পৃথিবীর নারী, কেমন কুৎসিত যেন,- প্যাগোডার অন্ধকার ছাড়ি শাদা মেঘ-খরশান বাহিরে নদীর পারে দাঁড়াবে কি?’‘শানিত নির্জন নদী’- বলিল সে- ‘তোমারি হৃদয়, যদিও তা পৃথিবীর নাদী- ন্দী নয়ঃ তোমারি চোখের স্বাদে ফুল আর পাতা জাগে না কি? তোমারি পায়ের নিচে মাথা রাখে না কি? বিশুস্ক- ধূসর- ক্রমে-ক্রমে মৃত্তিকার কৃমিদের স্তর যেন তারা; -অপ্সরা –উর্বশী তোমার উৎকৃষ্ট মেঘে ছিলো না কি বসি? ডাইনির মাংসের মতন আজ তার জঙ্ঘা আর স্তন; বাদুড়ের খাদ্যের মতন একদিন হ’য়ে যাবে; যে-সব মাছিরা কালো মাংস খায়- তারে ছিঁড়ে খাবে।’ কান্তারের পথে যেন সৌন্দর্যের ভূতের মতন তাহারে চকিত আমি করিলাম;- রোমাঞ্চিত হ’য়ে তার মন ব’লে গেলোঃ ‘তক্ষিত সৌন্দর্য সব পৃথিবীর উপনীত জাহাজের মাস্তুলের সুদীর্ঘ শরীর নিয়ে আসে একদিন, হে হৃদয়,- একদিন দার্শনিকও হিম হয়- প্রণয়ের সম্রাজ্ঞীরা হবে না মলিন?’ কল্পনার অবিনাশ মহনীয় উদ্‌গিরণ থেকে আসিল সে হৃদয়ের। হাতে হাত রেখে বলিল সে। মনে হ’লো পাণ্ডুলিপি মোমের পিছনে রয়েছে সে। একদিন সমুদ্রের কালো আলোড়নে উপনিষদের শাদা পাতাগুলো ক্রমে ডুবে যাবে; ল্যাম্পের আলো হাতে সেদিন দাঁড়াবে অনেক মেধাবী মুখ স্বপ্নের বন্দরের তীরে, যদিও পৃথিবী আজ সৌন্দর্যেরে ফেলিতেছে ছিঁড়ে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/monobij/
3273
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধ্রুবাণি তস্য নশ্যন্তি
নীতিমূলক
রাত্রে যদি সূর্যশোকে ঝরে অশ্রুধারা সূর্য নাহি ফেরে, শুধু ব্যর্থ হয় তারা।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dhrubani-tosyo-noshyonti/
609
জয় গোস্বামী
অজাতক
শোকমূলক
—- ‘ভিতরে না…ভিতরে না… দেখো সাবধানে…’ —- ‘হ্যাঁ জানি। খেয়াল আছে। দেব না। দিচ্ছি না। ভয় নেই’ দাম্ভিক মেয়েটি ঠিক ওই সময় কত অসহায় আমাকে বিশ্বাস করেছিল।নিজের আনন্দ রাখতে মারের সাবধান রইল না। —- ‘যদি কিছু হয়ে যায়’ —- ‘ও কিছু হবে না।’ —- ‘ঠিক তো?’—- ‘না কিছু হবে না।’ শিকড় উপড়ে তুলতে দেরি হয়েছিল।ভাঙা গর্ভ থেকে টেনে বার করা অসমাপ্ত ফল নার্সিংহোমের নীচে নর্দমার পাশে ব্যান্ডেজ প্লাস্টারভাঙা তুলো রক্ত পলিথিনে মিশে রইল জঞ্জালের মতো…আমার সাহস থাকলে ওর আজকে দশ বছর হত!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র—- ‘ভিতরে না…ভিতরে না… দেখো সাবধানে…’ —- ‘হ্যাঁ জানি। খেয়াল আছে। দেব না। দিচ্ছি না। ভয় নেই’ দাম্ভিক মেয়েটি ঠিক ওই সময় কত অসহায় আমাকে বিশ্বাস করেছিল।নিজের আনন্দ রাখতে মারের সাবধান রইল না। —- ‘যদি কিছু হয়ে যায়’ —- ‘ও কিছু হবে না।’ —- ‘ঠিক তো?’—- ‘না কিছু হবে না।’ শিকড় উপড়ে তুলতে দেরি হয়েছিল।ভাঙা গর্ভ থেকে টেনে বার করা অসমাপ্ত ফল নার্সিংহোমের নীচে নর্দমার পাশে ব্যান্ডেজ প্লাস্টারভাঙা তুলো রক্ত পলিথিনে মিশে রইল জঞ্জালের মতো…আমার সাহস থাকলে ওর আজকে দশ বছর হত!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র—- ‘ভিতরে না…ভিতরে না… দেখো সাবধানে…’ —- ‘হ্যাঁ জানি। খেয়াল আছে। দেব না। দিচ্ছি না। ভয় নেই’ দাম্ভিক মেয়েটি ঠিক ওই সময় কত অসহায় আমাকে বিশ্বাস করেছিল।নিজের আনন্দ রাখতে মারের সাবধান রইল না। —- ‘যদি কিছু হয়ে যায়’ —- ‘ও কিছু হবে না।’ —- ‘ঠিক তো?’—- ‘না কিছু হবে না।’ শিকড় উপড়ে তুলতে দেরি হয়েছিল।ভাঙা গর্ভ থেকে টেনে বার করা অসমাপ্ত ফল নার্সিংহোমের নীচে নর্দমার পাশে ব্যান্ডেজ প্লাস্টারভাঙা তুলো রক্ত পলিথিনে মিশে রইল জঞ্জালের মতো…আমার সাহস থাকলে ওর আজকে দশ বছর হত!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র—- ‘ভিতরে না…ভিতরে না… দেখো সাবধানে…’ —- ‘হ্যাঁ জানি। খেয়াল আছে। দেব না। দিচ্ছি না। ভয় নেই’ দাম্ভিক মেয়েটি ঠিক ওই সময় কত অসহায় আমাকে বিশ্বাস করেছিল।নিজের আনন্দ রাখতে মারের সাবধান রইল না। —- ‘যদি কিছু হয়ে যায়’ —- ‘ও কিছু হবে না।’ —- ‘ঠিক তো?’—- ‘না কিছু হবে না।’ শিকড় উপড়ে তুলতে দেরি হয়েছিল।ভাঙা গর্ভ থেকে টেনে বার করা অসমাপ্ত ফল নার্সিংহোমের নীচে নর্দমার পাশে ব্যান্ডেজ প্লাস্টারভাঙা তুলো রক্ত পলিথিনে মিশে রইল জঞ্জালের মতো…আমার সাহস থাকলে ওর আজকে দশ বছর হত!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%85%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%95-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
3583
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১১
প্রকৃতিমূলক
রবির কিরণ হতে আড়াল করিয়া রেখে মনটি আমার আমি গোলাপে রাখিনু ঢেকে — সে বিছানা সুকোমল , বিমল নীহার চেয়ে , তারি মাঝে মনখানি রাখিলাম লুকাইয়ে । একটি ফুল না নড়ে , একটি পাতা না পড়ে — তবু কেন ঘুমায় না , চমকি চমকি চায় — ঘুম কেন পাখা নেড়ে উড়িয়ে পালিয়ে যায় ? আর কিছু নয় , শুধু গোপনে একটি পাখি কোথা হতে মাঝে মাঝে উঠিতেছে ডাকি ডাকি । ঘুমা তুই , ওই দেখ বাতাস মুদেছে পাখা , রবির কিরণ হতে পাতায় আছিস ঢাকা — ঘুমা তুই , ওই দেখ তো চেয়ে দুরন্ত বায় ঘুমেতে সাগর- ' পরে ঢুলে পড়ে পায় পায় । দুখের কাঁটায় কি রে বিঁধিতেছে কলেবর ? বিষাদের বিষদাঁতে করিছে কি জরজর ? কেন তবে ঘুম তোর ছাড়িয়া গিয়াছে আঁখি ? কে জানে , গোপনে কোথা ডাকিছে একটি পাখি ।শ্যামল কানন এই মোহমন্ত্রজালে ঢাকা , অমৃতমধুর ফল ভরিয়ে রয়েছে শাখা , স্বপনের পাখিগুলি চঞ্চল ডানাটি তুলি উড়িয়া চলিয়া যায় আঁধার প্রান্তর- ' পরে — গাছের শিখর হতে ঘুমের সংগীত ঝরে । নিভৃত কানন- ' পর শুনি না ব্যাধের স্বর , তবে কেন এ হরিণী চমকায় থাকি থাকি । কে জানে , গোপনে কোথা ডাকিছে একটি পাখি ।Swinburne (অনূদিত কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-11/
1931
প্রেমেন্দ্র মিত্র
ফ্যান
মানবতাবাদী
নগরের পথে পথে দেখেছ অদ্ভুত এক জীব ঠিক মানুষের মতো কিংবা ঠিক নয়, যেন তার ব্যঙ্গ-চিত্র বিদ্রূপ-বিকৃত ! তবু তারা নড়ে চড়ে কথা বলে, আর জঞ্জালের মত জমে রাস্তায়-রাস্তায়। উচ্ছিষ্টের আস্তাকূড়ে ব’সে ব’সে ধোঁকে আর ফ্যান চায়।রক্ত নয়, মাংস নয়, নয় কোন পাথরের মতো ঠান্ডা সবুজ কলিজা। মানুষের সত্ ভাই চায় সুধু ফ্যান; তবু যেন সভ্যতার ভাঙেনাকো ধ্যান ! একদিন এরা বুঝি চষেছিল মাটি তারপর ভুলে গেছে পরিপাটি কত-ধানে হয় কত চাল; ভুলে গেছে লাঙলের হাল কাঁধে তুলে নেওয়া যায়। কোনোদিন নিয়েছিল কেউ, জানেনাকো আছে এক সমুদ্রের ঢেউ পাহাড়-টলানো।অন্ন ছেঁকে তুলে নিয়ে, ক্ষুধাশীর্ণ মুখে যেই ঢেলে দিই ফ্যান মনে হয় সাধি এক পৈশাচিক নিষ্ঠুর কল্যাণ ; তার চেয়ে রাখি যদি ফেলে, পচে পচে আপন বিকারে এই অন্ন হবে না কি মৃত্যুলোভাতুরা অগ্নি-জ্বালাময় তীব্র সুরা ! রাজপথে এই সব কচি কচি শিশুর কঙ্কাল–মাতৃস্তন্যহীন, দধীচির হাড় ছিলো এর চেয়ে আরো কি কঠিন ?
http://kobita.banglakosh.com/archives/3995.html
198
কাজী নজরুল ইসলাম
অবসর
প্রেমমূলক
লক্ষ্মী আমার! তোমার পথে আজকে অভিসার, অনেক দিনের পর পেয়েছি মুক্তি-রবিবার। দিনের পর দিন গিয়েছে হয়নি আমার ছুটি, বুকের ভিতর ব্যর্থ কাঁদন পড়ত বৃথাই লুটি বসে   ঢুলত আঁখি দুটি! আহা আজ পেয়েছি মুক্ত হাওয়া লাগল চোখে তোমার চাওয়া তাইতো প্রাণে বাঁধ টুটেছে রুদ্ধ কবিতার। তোমার তরে বুকের তলায় অনেক দিনের অনেক কথা জমা, কানের কাছে মুখটি থুয়ে গোপন সে-সব কইব প্রিয়তমা! এবার শুধু কথায় গানে রাত্রি হবে ভোর শুকতারাতে কাঁপবে তোমার নয়ন-পাতার লোর অভি-মানিনীরে মোর! যখন     তোমায় সেধে ডাকবে বাঁশি মলিন মুখে ফুটবে হাসি, হিম-মুকুরে উঠবে ভাসি অরুণ ছবি তার।  (পুবের হাওয়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/obsor/
2932
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কেন মধুর
প্রেমমূলক
রঙিন খেলেনা দিলে ও রাঙা হাতে তখন বুঝি রে বাছা, কেন যে প্রাতে এত রঙ খেলে মেঘে           জলে রঙ ওঠে জেগে, কেন এত রঙ লেগে ফুলের পাতে— রাঙা খেলা দেখি যবে ও রাঙা হাতে। গান গেয়ে তোরে আমি নাচাই যবে আপন হৃদয়-মাঝে বুঝি রে তবে, পাতায় পাতায় বনে       ধ্বনি এত কী কারণে, ঢেউ বহে নিজমনে তরল রবে, বুঝি তা তোমারে গান শুনাই যবে। যখন নবনী দিই লোলুপ করে হাতে মুখে মেখেচুকে বেড়াও ঘরে, তখন বুঝিতে পারি       স্বাদু কেন নদীবারি, ফল মধুরসে ভারী কিসের তরে, যখন নবনী দিই লোলুপ করে। যখন চুমিয়ে তোর বদনখানি হাসিটি ফুটায়ে তুলি তখনি জানি আকাশ কিসের সুখে     আলো দেয় মোর মুখে, বায়ু দিয়ে যায় বুকে অমৃত আনি— বুঝি তা চুমিলে তোর বদনখানি। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/keno-modhur/
2328
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
দেবদৃষ্টি
স্বদেশমূলক
শচী সহ শচীপতি স্বর্ণ-মেঘাসনে, বাহিরিলা বিশ্ব দরশনে। আরোহি বিচিত্র রথ, চলে সঙ্গে চিত্ররথ, নিজদলে বিমণ্ডিত অস্ত্র আভরণে, রাজাজ্ঞায় আশুগতি বহিলা বাহনে। হেরি নানা দেশ সুখে, হেরি বহু দেশ দুঃখে— ধর্ম্মের উন্নতি কোন স্থলে; দেব অগ্রগতি বঙ্গে উতরিল। কহিলা মাহেন্দ্র সতী শচী সুলোচনা, কোন্‌ দেশে এবে গতি, কহ হে প্রাণের পতি, এ দেশের সহ কোন্ দেশের তুলনা? উত্তরিলা মধুর বচনে বাসব, লো চন্দ্রাননে, বঙ্গ এ দেশের নাম বিখ্যাত জগতে। ভারতের প্রিয় মেয়ে মা নাই তাহার চেয়ে নিত্য অলঙ্কৃত হীরা, মুক্ত, মরকতে। সস্নেহে জাহ্নবী তারে মেখলেন চারি ধারে বরুণ ধোয়েন পা দু’খানি। নিত্য রক্ষকের বেশে হিমাদ্রি উত্তর দেশে পরেশনাথ আপনি শিরে তার শিরোমণি সেই এই বঙ্গভূমি শুন লো ইন্দ্রাণি! দেবাদেশে আশুগতি চলিলেন মৃদুগতি উঠিল সহসা ধ্বনি সভয়ে শচী আমনি ইন্দ্রেরে সুধিলা,— নীচে কি হতেছে রণ কহ সখে বিবরণ হেন দেশে হেন শব্দ কি হেতু জন্মিলা? চিত্ররথ হাত জোড় করি, কহে, শুন, ত্রিদিব-ঈশ্বরি! ‘বিবাহ করিয়া এক বালক যাইছে, পত্নী আসে দেখ তার পিছে।’ সুধাংশুর অংশুরূপে নয়ন-কিরণ নীচদেশে পড়িল তখন।
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/devdrishti/
4390
শামসুর রাহমান
আমার সময় চাই
চিন্তামূলক
পরিণামদর্শী ছিলাম না কোনোকালে, তা বলে এমন সাজা পেতে হবে, ভাবি নি কখনো। নিজকে তখনো এরকম অনাশ্রিত, অসহায় আমার হয় নি মনে। অপরাধ করি নি, তবুও অপরাধী বলে শক্রদল তর্জনী উঁচিয়ে খোলা রাস্তায় আমাকে নিয়ে সার্কাস বানাবে।শেষ অব্দি আমাকে নিয়েই যাবে, জানি। তার আগে আত্মজের শিশু কন্যাটিকে আরো কিছু কাল আদর করতে দাও; মায়ের মমতা, আরো যারা হৃদয়ের খুব কাছে আছে তাদের প্রীতির স্পর্শ পেতে দাও। প্রিয় স্মৃতিগুলিকে আবার ডেকে আনতে চাই, আর না-লেখা কবিতাগুলি যেন অভিমানে আমার মানস থেকে মুখ ঢেকে ফিরে না যায় নিশ্চুপ, দাও, নির্বিঘ্ন, প্রস্তৃতি।আমার ঘরের বই, চায়ের পেয়ালা, আসবাব কী স্বপ্ন দেখছে আমি এখনো পারি নি জানতে, জেনে নিতে চাই; সুন্দর আমাকে করুক নিভৃতে স্পর্শ বার বার, তাহ’লে সহজে দুর্লঙ্ঘ দেয়াল পার হ’য়ে যেতে পারি। করজোড়ে বলে যাই- আমার সময় চাই, সৃজনের আরো কিছু স্পন্দিত সময়।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-somy-chai/
767
জসীম উদ্‌দীন
আজ আমার মনে ত না মানেরে
প্রেমমূলক
সোনার চান, বাতাসে পাতিয়া বুকরে শুনি আকাশের গান। আজ নদীতে উঠিয়া ঢেউ আমার কূলে আইসা লাগে, রাতের তারার সাথে ঘরের প্রদীপ জাগেরে। চান্দের উপর বসাইয়ারে যেবা গড়ছে চান্দের বাসা, আজ দীঘিতে শাপলা ফুটে তারির লয়ে আশারে। উড়িয়া যায় হংসরে পঙ্খী, যায়রে বহুত দূর, আজ তরলা বাঁশের বাঁশী টানে সেই সুররে। আজ কাঙ্খের কলসী ধইরারে কান্দে যমুনার জল, শিমূলের তুলা লয়ে বাতাস পাগলরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/793
4497
শামসুর রাহমান
একদা যাদের নাম
মানবতাবাদী
একটি গাছের হাত অভিবাদনের ভঙ্গিতে আমার দিকে উঠে আসে; তাকে কিছু কথা বলতে গিয়েও থেমে যাই। হাত নাড়া দেখি, দূরে পাথরের বুকে জলরেখা ফোটে, তবু গলে না হৃদয় মানুষের। বীণার ধ্বনিকে বোবা করে এখন প্রধান হয়ে ওঠে অস্ত্রের ঝংকার, চারা গাছের পাতারা ছোরার আদলে বাড়ে। এক পাল জন্তু সগৌরবে হেঁটে যায় বিপুল আঁধারে, একদা যাদের নাম মানুষ বলেই জানা ছিল।  (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekda-jader-nam/
4219
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
দিন যায়
চিন্তামূলক
সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে অর্ধেক কপাল জুড়ে রোদ পড়ে আছে শুধু ঝড় থমকে আছে গাছের মাথায় আকাশমনির ।ঝড় মানে ঝোড়ো হাওয়া, বাদ্ লা হাওয়া নয় ক্রন্দনরঙের মত নয় ফুলগুলি চন্দ্রমল্লিকার ।জয়দেবের মেলা থেকে গান ভেসে আসে সঙ্গে ওড়ে ধুলোবালি, পায়ের নূপুর সুখের চট্ কা ভাঙে গৈরিক আবাসে দিন যায় রে বিষাদে, ষাদে, মিছে দিন যায়…
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/din-jay/
3256
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দেবতার গ্রাস
গীতিগাথা
গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে মৈত্র মহাশয় যাবেন সাগরসংগমে তীর্থস্নান লাগি। সঙ্গীদল গেল জুটি কত বালবৃদ্ধ নরনারী; নৌকা দুটি প্রস্তুত হইল ঘাটে।                        পুণ্য লোভাতুর মোক্ষদা কহিল আসি, "হে দাদাঠাকুর, আমি তব হব সাথি।' বিধবা যুবতী, দুখানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি, কেবল মিনতি করে--অনুরোধ তার এড়ানো কঠিন বড়ো--"স্থান কোথা আর' মৈত্র কহিলেন তারে। "পায়ে ধরি তব' বিধবা কহিল কাঁদি, "স্থান করি লব কোনোমতে এক ধারে।' ভিজে গেল মন, তবু দ্বিধাভরে তারে শুধালো ব্রাহ্মণ, "নাবালক ছেলেটির কী করিবে তবে?' উত্তর করিল নারী, "রাখাল? সে রবে আপন মাসির কাছে। তার জন্মপরে বহুদিন ভুগেছিনু সূতিকার জ্বরে, বাঁচিব ছিল না আশা; অন্নদা তখন আপন শিশুর সাথে দিয়ে তারে স্তন মানুষ করেছে যত্নে--সেই হতে ছেলে মাসির আদরে আছে মার কোল ফেলে। দুরন্ত মানে না কারে, করিলে শাসন মাসি আসি অশ্রুজলে ভরিয়া নয়ন কোলে তারে টেনে লয়। সে থাকিবে সুখে মার চেয়ে আপনার মাসির বুকে।'সম্মত হইল বিপ্র। মোক্ষদা সত্বর প্রস্তুত হইল বাঁধি জিনিস-পত্তর, প্রণমিয়া গুরুজনে, সখীদলবলে ভাসাইয়া বিদায়ের শোক-অশ্রুজলে। ঘাটে আসি দেখে--সেথা আগেভাগে ছুটি রাখাল বসিয়া আছে তরী-'পরে উঠি নিশ্চিন্ত নীরবে। "তুই হেথা কেন ওরে' মা শুধালো; সে কহিল, "যাইব সাগরে।' "যাইবি সাগরে! আরে, ওরে দস্যু ছেলে, নেমে আয়।' পুনরায় দৃঢ় চক্ষু মেলে সে কহিল দুটি কথা, "যাইব সাগরে।' যত তার বাহু ধরি টানাটানি করে রহিল সে তরণী আঁকড়ি। অবশেষে ব্রাহ্মণ করুণ স্নেহে কহিলেন হেসে, "থাক্‌ থাক্‌ সঙ্গে যাক্‌।' মা রাগিয়া বলে "চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে!' যেমনি সে কথা গেল আপনার কানে অমনি মায়ের বক্ষ অনুতাপবাণে বিঁধিয়া কাঁদিয়া উঠে। মুদিয়া নয়ন "নারায়ণ নারায়ণ' করিল স্মরণ। পুত্রে নিল কোলে তুলি, তার সর্বদেহে করুণ কল্যাণহস্ত বুলাইল স্নেহে। মৈত্র তারে ডাকি ধীরে চুপি চুপি কয়, "ছি ছি ছি এমন কথা বলিবার নয়।'রাখাল যাইবে সাথে স্থির হল কথা-- অন্নদা লোকের মুখে শুনি সে বারতা ছুটে আসি বলে, "বাছা, কোথা যাবি ওরে!' রাখাল কহিল হাসি, "চলিনু সাগরে, আবার ফিরিব মাসি!' পাগলের প্রায় অন্নদা কহিল ডাকি, "ঠাকুরমশায়, বড়ো যে দুরন্ত ছেলে রাখাল আমার, কে তাহারে সামালিবে? জন্ম হতে তার মাসি ছেড়ে বেশিক্ষণ থাকে নি কোথাও-- কোথা এরে নিয়ে যাবে, ফিরে দিয়ে যাও।' রাখাল কহিল, "মাসি, যাইব সাগরে, আবার ফিরিব আমি।' বিপ্র স্নেহভরে কহিলেন, "যতক্ষণ আমি আছি ভাই, তোমার রাখাল লাগি কোনো ভয় নাই। এখন শীতের দিন শান্ত নদীনদ, অনেক যাত্রীর মেলা, পথের বিপদ কিছু নাই; যাতায়াত মাস দুই কাল, তোমারে ফিরায়ে দিব তোমার রাখাল।'শুভক্ষণে দুর্গা স্মরি নৌকা দিল ছাড়ি, দাঁড়ায়ে রহিল ঘাটে যত কুলনারী অশ্রুচোখে। হেমন্তের প্রভাতশিশিরে ছলছল করে গ্রাম চূর্ণীনদীতীরে।যাত্রীদল ফিরে আসে; সাঙ্গ হল মেলা। তরণী তীরেতে বাঁধা অপরাহ্নবেলা জোয়ারের আশে। কৌতূহল অবসান, কাঁদিতেছে রাখালের গৃহগত প্রাণ মাসির কোলের লাগি। জল শুধু জল দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল। মসৃণ চিক্কণ কৃষ্ণ কুটিল নিষ্ঠুর, লোলুপ লেলিহজিহ্ব সর্পসম ক্রূর খল জল ছল-ভরা, তুলি লক্ষ ফণা ফুঁসিছে গর্জিছে নিত্য করিছে কামনা মৃত্তিকার শিশুদের, লালায়িত মুখ। হে মাটি, হে স্নেহময়ী, অয়ি মৌনমূক, অয়ি স্থির, অয়ি ধ্রুব, অয়ি পুরাতন, সর্ব-উপদ্রবসহা আনন্দভবন শ্যামলকোমলা, যেথা যে-কেহই থাকে অদৃশ্য দু বাহু মেলি টানিছ তাহাকে অহরহ, অয়ি মুগ্ধে, কী বিপুল টানে দিগন্তবিস্তৃত তব শান্ত বক্ষ-পানে!চঞ্চল বালক আসি প্রতি ক্ষণে ক্ষণে অধীর উৎসুক কণ্ঠে শুধায় ব্রাহ্মণে, "ঠাকুর, কখন আজি আসিবে জোয়ার? সহসা স্তিমিত জলে আবেগসঞ্চার দুই কূল চেতাইল আশার সংবাদে। ফিরিল তরীর মুখ, মৃদু আর্তনাদে কাছিতে পড়িল টান, কলশব্দ গীতে সিন্ধুর বিজয়রথ পশিল নদীতে-- আসিল জোয়ার। মাঝি দেবতারে স্মরি ত্বরিত উত্তর-মুখে খুলে দিল তরী। রাখাল শুধায় আসি ব্রাহ্মণের কাছে, "দেশে পঁহুছিতে আর কত দিন আছে?'সূর্য অস্ত না যাইতে, ক্রোশ দুই ছেড়ে উত্তর-বায়ুর বেগ ক্রমে ওঠে বেড়ে। রূপনারানের মুখে পড়ি বালুচর সংকীর্ণ নদীর পথে বাধিল সমর জোয়ারের স্রোতে আর উত্তরমীরে উত্তাল উদ্দাম। "তরণী ভিড়াও তীরে' উচ্চকণ্ঠে বারম্বার কহে যাত্রীদল। কোথা তীর? চারি দিকে ক্ষিপ্তোন্মত্ত জল আপনার রুদ্র নৃত্যে দেয় করতালি লক্ষ লক্ষ হাতে। আকাশেরে দেয় গালি ফেনিল আক্রোশে। এক দিকে যায় দেখা অতিদূর তীরপ্রান্তে নীল বনরেখা, অন্য দিকে লুব্ধ ক্ষুব্ধ হিংস্র বারিরাশি প্রশান্ত সূর্যাস্ত-পানে উঠিছে উচ্ছ্বাসি উদ্ধতবিদ্রোহভরে। নাহি মানে হাল, ঘুরে টলমল তরী অশান্ত মাতাল মূঢ়সম। তীব্র শীতপবনের সনে মিশিয়া ত্রাসের হিম নরনারীগণে কাঁপাইছে থরহরি। কেহ হতবাক্‌, কেহ বা ক্রন্দন করে ছাড়ে ঊর্ধ্বডাক ডাকি আত্মজনে। মৈত্র শুষ্ক পাংশুমুখে চক্ষু মুদি করে জপ। জননীর বুকে রাখাল লুকায়ে মুখ কাঁপিছে নীরবে। তখন বিপন্ন মাঝি ডাকি কহে সবে, "বাবারে দিয়েছে ফাঁকি তোমাদের কেউ-- যা মেনেছে দেয় নাই, তাই এত ঢেউ, অসময়ে এ তুফান! শুন এই বেলা, করহ মানত রক্ষা; করিয়ো না খেলা ক্রুদ্ধ দেবতার সনে।' যার যত ছিল অর্থ বস্ত্র যাহা-কিছু জলে ফেলি দিল না করি বিচার। তবু তখনি পলকে তরীতে উঠিল জল দারুণ ঝলকে। মাঝি কহে পুনর্বার, "দেবতার ধন কে যায় ফিরায়ে লয়ে এই বেলা শোন্‌।' ব্রাহ্মণ সহসা উঠি কহিলা তখনি মোক্ষদারে লক্ষ্য করি, "এই সে রমণী দেবতারে সঁপি দিয়া আপনার ছেলে চুরি করে নিয়ে যায়।' "দাও তারে ফেলে' এক বাক্যে গর্জি উঠে তরাসে নিষ্ঠুর যাত্রী সবে। কহে নারী, "হে দাদাঠাকুর, রক্ষা করো, রক্ষা করো!' দুই দৃঢ় করে রাখালেরে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরে। র্ভৎসিয়া গর্জিয়া উঠি কহিলা ব্রাহ্মণ, "আমি তোর রক্ষাকর্তা! রোষে নিশ্চেতন মা হয়ে আপন পুত্র দিলি দেবতারে, শেষকালে আমি রক্ষা করিব তাহারে! শোধ্‌ দেবতার ঋণ; সত্য ভঙ্গ করে এতগুলি প্রাণী তুই ডুবাবি সাগরে!'মোক্ষদা কহিল, "অতি মূর্খ নারী আমি, কী বলেছি রোষবশে--ওগো অন্তর্যামী, সেই সত্য হল? সে যে মিথ্যা কতদূর তখনি শুনে কি তুমি বোঝ নি ঠাকুর? শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা? শোন নি কি জননীর অন্তরের কথা?' বলিতে বলিতে যত মিলি মাঝি-দাঁড়ি বল করি রাখালেরে নিল ছিঁড়ি কাড়ি মার বক্ষ হতে। মৈত্র মুদি দুই আঁখি ফিরায়ে রহিল মুখ কানে হাত ঢাকি দন্তে দন্তে চাপি বলে। কে তারে সহসা মর্মে মর্মে আঘাতিল বিদ্যুতের কশা, দংশিল বৃশ্চিকদংশ। "মাসি! মাসি! মাসি!' বিন্ধিল বহ্নির শলা রুদ্ধ কর্ণে আসি নিরুপায় অনাথের অন্তিমের ডাক। চীৎকারি উঠিল বিপ্র, "রাখ্‌ রাখ্‌ রাখ্‌!' চকিতে হেরিল চাহি মূর্ছি আছে প'ড়ে মোক্ষদা চরণে তাঁর, মুহূর্তের তরে ফুটন্ত তরঙ্গমাঝে মেলি আর্ত চোখ "মাসি' বলি ফুকারিয়া মিলালো বালক অনন্ততিমিরতলে; শুধু ক্ষীণ মুঠি বারেক ব্যাকুল বলে ঊর্ধ্ব-পানে উঠি আকাশে আশ্রয় খুঁজি ডুবিল হতাশে। "ফিরায়ে আনিব তোরে' কহি ঊর্ধ্বশ্বাসে ব্রাহ্মণ মুহূর্তমাঝে ঝাঁপ দিল জলে-- আর উঠিল না। সূর্য গেল অস্তাচলে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/debotar-gras/
203
কাজী নজরুল ইসলাম
অমর-কানন
প্রকৃতিমূলক
অমর কানন মোদের অমর-কানন! বন কে বলে রে ভাই, আমাদের তপোবন, আমাদের তপোবন।  এর   দক্ষিণে ‘শালী’ নদী কুলুকুলু বয়, তার   কূলে কূলে শালবীথি ফুলে ফুলময়, হেথা   ভেসে আসে জলে-ভেজা দখিনা মলয়, হেথা          মহুয়ার মউ খেয়ে মন উচাটন।দূর প্রান্তর-ঘেরা আমাদের বাস, দুধহাসি হাসে হেথা কচি দুব-ঘাস, উপরে মায়ের মতো চাহিয়া আকাশ, বেণু-বাজা মাঠে হেথা চরে ধেনুগণ  মোরা  নিজ হাতে মাটি কাটি, নিজে ধরি হাল, সদা  খুশিভরা বুক হেথা হাসিভরা গাল, মোরা  বাতাস করি গো ভেঙে হরিতকি-ডাল, হেথা  শাখায় শাখায় শাখী, গানের মাতন। প্রহরী মোদের ভাই ‘পুরবি’ পাহাড়, ‘শুশুনিয়া’ আগুলিয়া পশ্চিমি দ্বার, ওড়ে  উত্তরে উত্তরি কাননবিথার, দূরে   ক্ষণে ক্ষণে হাতছানি দেয় তালী-বন।   হেথা  খেত-ভরা ধান নিয়ে আসে অঘ্রান, হেথা  প্রাণে ফোটে ফুল, হেথা ফুলে ফোটে প্রাণ, ও রে  রাখাল সাজিয়া হেথা আসে ভগবান, মোরা         নারায়ণ-সাথে খেলা খেলি অনুখন।   মোরা  বটের ছায়ায় বসি করি গীতাপাঠ, আমাদের পাঠশালা চাষি-ভরা মাঠ, গাঁয়ে গাঁয়ে আমাদের মায়েদের হাট, ঘরে ঘরে ভাইবোন বন্ধুস্বজন।(ছায়ানট কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/amor-kanon/
3511
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বয়স আমার বুঝি হয়ত তখন হবে বারো
চিন্তামূলক
বয়স আমার বুঝি হয়তো তখন হবে বারো, অথবা কী জানি হবে দুয়েক বছর বেশি আরো। পুরাতন নীলকুঠি-দোতলার 'পর ছিল মোর ঘর। সামনে উধাও ছাত-- দিন আর রাত আলো আর অন্ধকারে সাথিহীন বালকের ভাবনারে এলোমেলো জাগাইয়া যেত, অর্থশূন্য প্রাণ তারা পেত, যেমন সমুখে নীচে আলো পেয়ে বাড়িয়া উঠিছে বেতগাছ ঝোপঝাড়ে পুকুরের পাড়ে সবুজের আলপনায় রঙ দিয়ে লেপে। সারি সারি ঝাউগাছ ঝরঝর কেঁপে নীলচাষ-আমলের প্রাচীন মর্মর তখনো চলিছে বহি বৎসর বৎসর। বৃদ্ধ সে গাছের মতো তেমনি আদিম পুরাতন বয়স-অতীত সেই বালকের মন নিখিল প্রাণের পেত নাড়া, আকাশের অনিমেষ দৃষ্টির ডাকে দিত সাড়া, তাকায়ে রহিত দূরে। রাখালের বাঁশির করুণ সুরে অস্তিত্বের যে বেদনা প্রচ্ছন্ন রয়েছে, নাড়ীতে উঠিত নেচে। জাগ্রত ছিল না বুদ্ধি, বুদ্ধির বাহিরের যাহা তাই মনের দেউড়ি-পারে দ্বারী-কাছে বাধা পায় নাই। স্বপ্নজনতার বিশ্বে ছিল দ্রষ্টা কিংবা স্রষ্টা রূপে, পণ্যহীন দিনগুলি ভাসাইয়া দিত চুপে চুপে পাতার ভেলায়। নিরর্থ খেলায়। টাট্টু ঘোড়া চড়ি রথতলা মাঠে গিয়ে দুর্দাম ছুটাত তড়বড়ি, রক্তে তার মাতিয়ে তুলিতে গতি, নিজেরে ভাবিত সেনাপতি পড়ার কেতাবে যারে দেখে ছবি মনে নিয়েছিল এঁকে। যুদ্ধহীন রণক্ষেত্রে ইতিহাসহীন সেই মাঠে এমনি সকাল তার কাটে। জবা নিয়ে গাঁদা নিয়ে নিঙাড়িয়া রস মিশ্রিত ফুলের রঙে কী লিখিত, সে লেখার যশ আপন মর্মের মাঝে হয়েছে রঙিন-- বাহিরের করতালিহীন। সন্ধ্যাবেলা বিশ্বনাথ শিকারীকে ডেকে তার কাছ থেকে বাঘশিকারের গল্প নিস্তদ্ধ সে ছাতের উপর, মনে হ'ত, সংসারের সব চেয়ে আশ্চর্য খবর। দম্‌ ক'রে মনে মনে ছুটিত বন্দুক, কাঁপিয়া উঠিত বুক। চারি দিকে শাখায়িত সুনিবিড় প্রায়োজন যত তারি মাঝে এ বালক অর্‌কিড-তরুকার মতো ডোরাকাটা খেয়ালের অদ্ভুত বিকাশে দোলে শুধু খেলার বাতাসে। যেন সে রচয়িতার হাতে পুঁথির প্রথম শূন্য পাতে অলংকরণ আঁকা,মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কী লেখা, বাকি সব আঁকাবাঁকা রেখা। আজ যবে চলিতেছে সাংঘাতিক হিসাবনিকাশ, দিগ্‌দিগন্তে ক্ষমাহীন অদৃষ্টের দশনবিকাশ, বিধাতার ছেলেমানুষির খেলাঘর যত ছিল ভেঙে সব হল চৌচির। আজ মনে পড়ে সেই দিন আর রাত, প্রশস্ত সে ছাত, সেই আলো সেই অন্ধকারে কর্মসমুদ্রের মাঝে নৈষ্কর্ম্যদ্বীপের পারে বালকের মনখানা মধ্যাহ্নে ঘুঘুর ডাক যেন। এ সংসারে কী হতেছে কেন ভাগ্যের চক্রান্তে কোথা কী যে, প্রশ্নহীন বিশ্বে তার জিজ্ঞাসা করে নি কভু নিজে। এ নিখিলে যে জগৎ ছেলেমানুষির বয়স্কের দৃষ্টিকোণে সেটা ছিল কৌতুকহাসির, বালকের জানা ছিল না তা। সেইখানে অবাধ আসন তার পাতা। সেথা তার দেবলোক,স্বকল্পিত স্বর্গের কিনারা, বুদ্ধির ভর্ৎসনা নাই,নাই সেথা প্রশ্নের পাহারা, যুক্তির সংকেত নাই পথে, ইচ্ছা সঞ্চরণ করে বল্গামুক্ত রথে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bahas-mamar-haba-veje-baro/
4932
শামসুর রাহমান
পুলিশও প্রত্যক্ষ করে
সনেট
ক্ষমাহীন নিষেধের বেয়নেট উদ্যত চৌদিকে এবং ডাইনে বাঁয়ে কাঁটাতার, যেন বর্ধমান ফণিমনসার বন। ব্যক্তিগত নিবাসসমূহ গিসগিসে গোয়েন্দার অবাধ আস্তানা, শিরস্ত্রাণ- নিয়ন্ত্রিত জীবনের, কিছু গনতান্ত্রিক বিকার এখনো গোলাপ চায় এ মড়কে। মৃত্যুভয় ফিকে হ’য়ে এলে আমাদের প্রিয় লুম্পেন ইচ্ছার ব্যূহ হিজড়োর মতন নেচে ওঠে নিরাশ্রিত চমৎকার।প্রধান সড়কে আ প্রতিটি গলির মোড়ে মোড়ে কাঁটামারা জুতো ঘোরে। এরই মধ্যে হতচ্ছাড়া মন তোমার সংকেত পায়, হৃদয়ের সাহসের তোড়ে আমরা দু’জন ভেসে চলি রূঢ় পথে স্বপ্ন বেয়ে। বনেদী বাড়ির চোখ, গাছপালা, পাখি দ্যাখে চেয়ে, পুলিশও প্রত্যক্ষ করে আমাদের প্রথম চুম্বন।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pulisho-prottyokkho-kore/
5536
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রৌদ্রের গান
স্বদেশমূলক
এখানে সূর্য ছড়ায় অকৃপণ দুহাতে তীব্র সোনার মতন মদ, যে সোনার মদ পান ক'রে ধন ক্ষেত দিকে দিকে তার গড়ে তোলে জনপদ।ভারতী! তোমার লাবণ্য দেহ ঢাকে রৌদ্র তোমায় পরায় সোনার হার, সূর্য তোমার শুকায় সবুজ চুল প্রেয়সী, তোমার কত না অহংকার।সারাটা বছর সূর্য এখানে বাঁধা রোদে ঝলসায় মৌন পাহাড় কোনো, অবাধ রোদ্রে তীব্র দহন ভরা রৌদ্রে জ্বলুক তোমার আমার মনও।বিদেশকে আজ ডাকো রৌদ্রের ভোজে মুঠো মুঠো দাও কোষাগার-ভরা সোনা, প্রান্তর বন ঝলমল করে রোদে, কী মধুর আহা রৌদ্রে প্রহর গোনা ! রৌদ্রে কঠিন ইস্পাত উজ্জ্বল ঝকমক করে ইশারা যে তার বুকে শূন্য নীরব মাঠে রৌদ্রের প্রজা স্তব করে জানি সূর্যের সম্মুখে।পথিক-বিরল রাজপথে সূর্যের প্রতিনিধি হাঁকে আসন্ন কলরব, মধ্যাহ্নের কঠোর ধ্যানের শেষে জানি আছে এক নির্ভয় উৎসব।তাইতো এখানে সূর্য তাড়ায় রাত প্রেয়সী, তুমি কি মেঘভয়ে আজ ভীত? কৌতুকছলে এ মেঘ দেখায় ভয়, এ ক্ষণিক মেঘ কেটে যাবে নিশ্চিত।সূর্য, তোমায় আজকে এখানে ডাকি- দুর্বল মন, দুর্বলতর কায়া, আমি যে পুরনো অচল দীঘির জল আমার এ বুকে জাগাও প্রতিচ্ছায়া।।
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/roudrer-gaan/
1734
পাবলো নেরুদা
মাতাল ও মাছকন্যা
মানবতাবাদী
অনুবাদ:চয়ন খায়রুল হাবিবএক্কেবারে নেংটো মেয়েটি ঢোকবার সময় পানাশালাত বেশ ক’জন জোয়ান মর্দ বসে বসে পান করছিল। পান করতে করতে,ওরা মেয়েটির দিকে থু থু থু…করে থুতু ছিটাচ্ছিল। সবে সাগর থেকে উঠে আসা মেয়েটি এসবের কিছুই বুঝতে পারছিল না। মেয়েটি পথ হারানো মাছকন্যা । টিটকারি থু থুক্কার জ্বলজ্বলে মাংশ ছুয়ে পিছলে পিছলে খসে পড়ছিল। খিস্তি খেউড়ে ওর সোনালি দুধের মাই ঝলাসাচ্ছিল। কাদতে জানেনা বলে মাছকন্যা কাদে নি। কাপড় চেনেনা বলে মাছকন্যা পোষাক পরেনি। জ্বলন্ত সিগারেট ওরা মাছকন্যার গায়ে ঠেশে ধরছিল। শব্দ অপরিচিত বলে ও চিতকার করনি। দুরের ভালবাশার রঙ্গে ওর চোখ তবূও রঙ্গিন, ওর হাতগুলো মনকা পাথরে জ্বল জ্বল, প্রবালের আলোতে ওর ঠোট নড়ছিল, শেষমেশ মেয়েটি অবশ্য বেরোতে পেরেছিল। যে-নদি থেকে এসেছিল সে-নদিতে ফেরা মাত্র মাছকন্যা আবার পরিস্কার, আবার বৃষ্টি ধোয়া সাদা মার্বেলে টলটলে। একবারও পিছে না ফিরে ও সাতরে গিয়েছিল শুন্যতার দিকে, নিজের মরনের দিকে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3978.html
5792
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
দেখা
প্রেমমূলক
-ভালো আছো? -দেখো মেঘ, বৃষ্টি আসবে? -ভালো আছো? -দেখো ঈশান কোণের কালো, শুনতে পাচ্ছো ঝড়? -ভালো আছো? -এই মাত্র চমকে উঠলো ধবধবে বিদ্যুৎ। -ভালো আছো? -তুমি প্রকৃতিকে দেখো -তুমি প্রকৃতিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছো -আমি তো অণূর অনু, সামান্যের চেয়েও সামান্য -তুমিই তো জ্বালো অগ্নি, তোলো ঝড়,রক্তে এত উম্মাদনা -দেখো সত্যিকার বৃষ্টি, দেখো সত্যিকার ঝড় -তোমাকে দেখাই আজও শেষ হয়নি, তুমি ভালো আছো?
https://banglarkobita.com/poem/famous/449
2778
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঈর্ষার সন্দেহ
নীতিমূলক
লেজ নড়ে, ছায়া তারি নড়িছে মুকুরে কোনোমতে সেটা সহ্য করে না কুকুরে। দাস যবে মনিবেরে দোলায় চামর কুকুর চটিয়া ভাবে, এ কোন্‌ পামর? গাছ যদি নড়ে ওঠে, জলে ওঠে ঢেউ, কুকুর বিষম রাগে করে ঘেউ-ঘেউ। সে নিশ্চয় বুঝিয়াছে ত্রিভুবন দোলে ঝাঁপ দিয়া উঠিবারে তারি প্রভু-কোলে। মনিবের পাতে ঝোল খাবে চুকুচুকু, বিশ্বে শুধু নড়িবেক তারি লেজটুকু।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/irshar-sondheo/
1708
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
হঠাৎ হাওয়া
প্রকৃতিমূলক
হঠাৎ হাওয়া উঠেছে এই দুপুরে আকাশী নীল শান্তি বুঝি ছিনিয়ে নিতে চায়। মালোঠিগাঁও বিমূঢ়, হতবাক্‌। মেঘের ক্রোধ গর্জে ওঠে ঝড়ের ডঙ্কায়। এখনই এল ডাক। মন্দাকিনী মিলায় তাল তরঙ্গের নূপুরে। এ যেন হরধনুর টান ছিলাতে হেনেছে কেউ প্রবল টংকার। চিনের চোখ মীলিত। কার ভীষণ জটাজাল আকাশে পড়ে ছড়িয়ে, শোনো বাতাসে বাজে তার সঘন করতাল। ত্রিলোক কোটিকণ্ঠে চায় গানের গলা মিলাতে। এ যেন কোন্‌ শিল্পী তার খেয়ালে উপুড় করে দিয়েছে কালো রঙ আকাশময়। পাখিরা ত্রাসে কুলায়ে ফিরে যায়। কে যেন তার ক্রোধের কশা দারুণ নির্মম হানে হাওয়ার গায়ে। অট্টহাসি ধ্বনিত তার গিরিগুহার দেয়ালে। এবং, দ্যাখো, নিমেষে যেন কী করে মিলিয়ে যায় খামার-ঘরবাড়ি, মিলিয়ে যায় নিকট-দূর পর্বতের চূড়া। খেতের কাজ গুছিয়ে মাঠ-চটিতে দেয় পাড়ি ত্রস্ত গাঁওবুড়া। বিদ্যুতের নাগিনী ধায় মেঘের কালো শিখরে। হঠাৎ হাওয়া উঠেছে এই দুপুরে, আকাশী নীল শান্তি যেন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। মালোঠিগাঁও বিমূঢ়, হতবাক্‌। মেঘের ক্রোধ গর্জে ওঠে ঝড়ের ডঙ্কায়। এসেছে তার ডাক। মন্দাকিনী মিলায় তাল তরঙ্গের নূপুরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1702
5173
শামসুর রাহমান
যেতে-যেতে বড় ক্লান্ত
চিন্তামূলক
অনেকটা পথ একা হেঁটে যেতে-যেতে বড় ক্লান্ত হয়ে যেন ঢ’লে পড়ি বালির লুকানো মৃত্যুফাঁদে। গা বেয়ে শীতল ঘর্ম-স্রোত বয়ে যেতে থাকে। কী করি? কী করি?-প্রশ্ন বারবার হানা দেয় অন্তরের একান্ত শোণিতে।এই যে এখানে আমি তোমার দুয়ারে ভোরবেলা, দুপুর, বিকেল আর সন্ধ্যায়, গভীর রাত্তিকে ভিখিরি হয়ে পড়ে থাকি একা, সে শুধু ঝঙ্কৃত কিছু শব্দাবলি কাগজের বুকে সাজানোর আকাঙ্ক্ষায়। তখন আমার বুক চিরে রক্তধারা বয় ঢের সকলের অগোচরে।এখন এখানে ছোট ঘরে এক কোণে ব’সে সফেদ কাগজে কালো কালির অক্ষর দিয়ে প্রায়শই পদ্য লিখি- সংসারে চালের হাঁড়ি শূন্য হয়ে এল কখন, খেয়াল,-হায় থাকে না প্রায়শ। অথচ বাগান, নদী, আকাশের তারা চোখে ভাসে!   (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jete-jete-boro-klanto/
5250
শামসুর রাহমান
সকলেই গ্যাছে
চিন্তামূলক
সকলেই চলে গ্যাছে, বলা যায় পৌঁছে গেছে ঠিক নির্দিষ্ট গন্তব্যে, শুধু আমি এই দম আটকানো রুদ্ধ এলাকায় দাঁড়ানো ভীষণ একা। কথা ছিল যাবো, নিশ্চয় আমিও যাবো সকলের সঙ্গে, কিন্তু আমি বড় বেশি দেরি করে ফেলেছি নিশ্চিত। ওরা কেউ পথে কোনো কিছু দেখে, মানে রূপ-শোভা দেখে দাঁড়ায়নি একদণ্ড থমকে কোথাও।ওরা চলে গেছে, লক্ষ্য স্থির রেখে সময় মাফিক। অথচ স্বভাবদোষে আমি বস্তুত পথের মোড়ে থামিয়েছি গতি বারে বারে, কাটিয়ে দিয়েছি বেলা ঘাসফুল আর হরিণের কী স্নিগ্ধ বিশ্রাম দেখে এবং সত্তায় মেখে সূর্যোদয় আর নিশ্বাসে গভীর টেনে বৃক্ষঘ্রাণ। কখন যে দলছুট হয়ে পড়েছি পাইনি টের। এখন আমার চৌদিকে দেয়াল শুধু নীরন্ধ্র দেয়াল, কোনো দিকে পথ খোলা নেই এতটুকু। ইতস্তত ছুটছি ভীষণ এলোমেলো, গলা ছেড়ে ডাকছি, অথচ কোথাও কারুর কোনো কণ্ঠস্বর নেই।যখন মানুষ কোনো স্থির লক্ষ্যে দ্রুত পৌঁছে যেতে চায় তখন পথের ধারে দোয়েলের শিস শুনে অথবা দিঘিতে মাছের রূপালি ঘাই দেখে, ঝরনা-ধ্বনি শুনে থমকে দাঁড়ানো, এই মতো কালক্ষয় সমীচীন নয়। পূর্ণিমার, মল্লিকার প্রেমে পড়া কস্মিনকালেও নয় লক্ষ্যভেদী পথিকের যোগ্য আচরণ।   (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sokolei-gache/
5758
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
কেউ কথা রাখেনি
প্রেমমূলক
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী আর এলোনা পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি। মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে! নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো?  আমার মাথা এ ঘরের ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে? একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভিতরে রাস-উৎসব অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা কত রকম আমোদে হেসেছে আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি! বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও… বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা! বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল, যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে! ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠেয়ে প্রাণ নিয়েছি দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড় বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ এখনো সে যে-কোনো নারী। কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1856
3475
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন
চিন্তামূলক
ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন; কৌতূহলী ভোরের আলো কুয়াশার আবরণ দিলে সরিয়ে। হঠাৎ দেখি শিশিরে-ভেজা বাতাবি গাছে ধরেছে কচি পাতা; সে যেন আপনি বিস্মিত। একদিন তমসার কূলে বাল্মীকি আপনার প্রথম নিশ্বসিত ছন্দে চকিত হয়েছিলেন নিজে,-- তেমনি দেখলেম ওকে। অনেকদিনকার নিঃশব্দ অবহেলা থেকে অরুণ-আলোতে অকুণ্ঠিত বাণী এনেছে এই কয়টি কিশলয়; সে যেন সেই একটুখানি কথা তুমিই বলতে পারতে, কিন্তু না ব'লে গিয়েছ চলে। সেদিন বসন্ত ছিল অনতিদূরে; তোমার আমার মাঝখানে ছিল আধ-চেনার যবনিকা কেঁপে উঠল সেটা মাঝে মাঝে; মাঝে মাঝে তার একটা কোণ গেল উড়ে; দুরন্ত হয়ে উঠল দক্ষিণ বাতাস, তবু সরাতে পারেনি অন্তরাল। উচ্ছৃঙ্খল অবকাশ ঘটল না; ঘণ্টা গেল বেজে, সায়াহ্নে তুমি চলে গেলে অব্যক্তের অনালোকে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/fureya-galo-pusar-din/
5856
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
শিল্প
প্রেমমূলক
শিল্প তো সার্বজনীন, তা কারুর একলার নয় এ কথা ভাবলেই বড় ভয় লাগে, এই সত্য ঘোর শত্রু ভয় লাগে, বড় ভয় লাগে। নীরা নাম্মী মেয়েটি কি শুধু নারী? মন বিঁধে থাকে নীরার সারল্য কিংবা লঘু খুশী, আঙুলের হঠাৎ লাবণ্য কিংবা ভোর ভোর মুখ আমি দেখি, দেখে দেখে দৃষ্টিভ্রম হয় এত চেনা, এত কাছে, তবু কেন এতটা সুদূর নীরার সূপের গায়ে লেগে আছে যেন শিল্পচ্ছটা ভয় হয়, চাপা দুঃখ হিম হয়ে আসে। নীরা, তুমি বালিকার খেলা ছেড়ে শিল্পের জড়তে যেতে চাও! প্রতীক অরণ্যে তুমি মায়া বনদেবী? তোমার হাসিতে যেন ইতালির এক শতাব্দীর মৃদু ছায়া তোমার চোখের জলে ঝলকে ওঠে শিল্পের কিরণ এ শিল্প মধুর কিন্তু ব্যক্তিগত নয় শিল্প সহবাসে আমি তোমাকে স্বৈরিণী হতে ছেড়ে দিব কোন্‌ প্রাণে বলো? না, না, নীরা, ফিরে এসো, ফিরে এসো তুমি তোমাকে আমার কিংবা আমাকে তোমার কোনো নির্বাসন নেই ফিরে এসো, এই বাহুঘেরে ফিরে এসো!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1817
855
জসীম উদ্‌দীন
পুরান পুকুর
প্রকৃতিমূলক
পুরান পুকুর, তব তীরে বসি ভাবিয়া উদাস হই, খেজুরের গোড়ে বাঁধা ছোট ঘাট, করে জল থই থই; রাত না পোহাতে গাঁয়ের বধুরা কলসীর কলরবে, ঘুম হতে তোমা জাগাইয়া দিত প্রভাতের উৎসবে। সারাদিন ধরি ঘড়ায় ঘড়ায় তব অমৃতরাশি, বধুদের কাঁখে ঢলিয়া ঢলিয়া ঘরে ঘরে যেত হাসি। ‘বদনায়’ভরা একটুকু, তারি ভরসায় গেঁয়ো-চাষী, চৈত্র-রোদের করুণ করিয়া বাজাত গানের বাঁশী। মাঠ হতে তারা জ্বলিয়া পুড়িয়া আসিত তোমার তীরে, খেজুর পাতায় সোনালী চামর দোলাতে তাদের শিরে। শান্ত হইয়া গামছা ভিজায়ে তোমার কাজল-জলে, নাহিয়া নাহিয়া সাধ মিটিত না-আবার নাহিবে বলে। এইখানে বসি পল্লী-বধূরা আধেক ঘোমটা খুলি, তোমার মুকুরে মুখখানি হেরে জল-ভরা যেত ভুলি। সখিতে সখিতে কাঁধে কাঁধ ধরি খেলিত যে জল-খেলা, সারাটি গাঁয়ের যত রূপ আছে তব বুকে হত মেলা, পুকুরের জল উথলি পাথালি ভাসিত তাদের হাসি, - ফুলে ফুল লাগি ফুলেরা যেমন ভেঙে হয় রাশি রাশি। আজি মনে পড়ে, পুরান পুকুর, মায়ের আঁচল ধরে, একটি ছেলের ঝাঁপাঝাঁপি খেলা তোমার বুকের পরে। ওই এত জলে সাঁপলার ফুল, -তারি ছিল এত লোভ, তাই তুলিবারে জলে ডুবিলেও মনে নাহি ছিল ক্ষোভ। আজিকে তোমার কোথায় সে জল? কোথা সেই বাঁধা ঘাট, গেঁয়ো বধূদের খাড়ুতে মুখর কোথা সে পুকুর বাট? চারিধারে তব বন-জঙ্গল পাতায় পাতায় ঢাকা, নিকষ-রাতের আঁধার যেন গো তুলিতে রয়েছে আঁকা। ডুকরিয়া কাঁদে ডাহুক ডাহুকী তরু-মর্ম্মর স্বনে, তারি সাথে বুঝি উঠিছে শিহরি যত ব্যথা তব মনে! হিজল গাছের মালা হতে আজি খসিয়া রঙিন ফুল, সাঁঝের মতন দিতেছে ব্যথিয়া তোমার চরণমূল। সন্ধ্যা-সকালে আসিত যাহারা কলসী লইয়া ঘাটে, তারা সবে আজি বিদায় নিয়েছে মরণ পারের হাটে। বক্ষ-মুকুরে সোনা মুখখানি দেখিবারে কেহ নাই, কুচুরী পানায় আধ বুকখানি ঢাকিয়া রেখেছ তাই! ঘুচাও ঘুচাও মৌন তড়াগ, বুকের আরসীখানি, মোর বাল্যের যত ভুলো-কথা সারা গায়ে দাও টানি। সেই ছেলেবেলা স্বপ্নের মত কত স্নেহ ভরা মুখ, এনে দাও, শুধু বারেক দেখিয়া ভরে লই সারা বুক। এনে দাও সেই তব তীরে বসি মেঠো রাখালের বাঁশী স্বপনের ভেলা দুলায়ে দুলায়ে আকাশেতে যাক্ ভাসি। হায়রে, সেদিন আসে না ফিরিয়া! শুধু ভিজে আঁখি পাতা, পুরানো স্বপন কুড়ায়ে কুড়ায়ে আকাশেতে জাল পাতা! তুমিও সজনি, আমারি মতন না জানি কাঁদিছ কত, ছোট ঢেউগুলি নাড়িয়া নাড়িয়া পাড়েরে করিছ ক্ষত। বনদেবী আজ সমবেদনায় আঁচল বিছায়ে জলে, ব্যথাতুরা তব সারা বুকখানি ঢেকেছে কলমী দলে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/778
5686
সুকুমার রায়
শিশুর দেহ
চিন্তামূলক
চশমা-আঁটা পণ্ডিতে কয় শিশুর দেহ দেখে- 'হাড়ের পরে মাংস দিয়ে, চামড়া দিয়ে ঢেকে, শিরার মাঝে রক্ত দিয়ে, ফুসফুসেতে বায়ু, বাঁধল দেহ সুঠাম করে পেশী এবং স্নায়ু।' কবি বলেন, 'শিশুর মুখে হেরি তরুণ রবি, উৎসারিত আনন্দে তার জাগে জগৎ ছবি। হাসিতে তার চাঁদের আলো, পাখির কলকল, অশ্রুকণা ফুলের দলে শিশির ঢলঢল।' মা বলেন, 'এই দুরুদুরু মোর বুকেরই বাণী, তারি গভীর ছন্দে গড়া শিশুর দেহখানি। শিশুর প্রাণে চঞ্চলতা আমার অশ্রুহাসি, আমার মাঝে লুকিয়েছিল এই আনন্দরাশি। গোপনে কোন্‌ স্বপ্নে ছিল অজানা কোন আশা, শিশুর দেহে মূর্তি নিল আমার ভালবাসা।'
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/shishur-deho/
4738
শামসুর রাহমান
জ্বলছে স্বদেশ
সনেট
কবীর চৌধুরী ঠিকই বলেছেন, জ্বলছে স্বদেশ- প্রায় প্রতিদিন মরে লোক গুলি খেয়ে খোলা পথে, পুলিশের জুলুমে জর্জর দেশবাসী, কোনো মতে দিন কাটে প্রতিবাদী নেতাদের প্রত্যহ অশেষ ঝুঁকিতে এবং অনেকেই হচ্ছেন আটক। বেশ আছেন আনন্দে মেতে নারী নীরো, বাজাচ্ছেন বাঁশি মসনদে বসে, ঠোঁটে তার খেলে যায় ক্রূর হাসি ক্ষণে ক্ষণে, পারিষদবর্গ তার কাছে সুখবর করে পেশ।অবৈধ শাসক যারা, তারা সাধারণ মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছায় সারে দাফন নিমেষে, স্বৈরাচারে বুঁদ হয়ে থাকে; কিন্তু বোঝে না দেশের জনগণ শক্তিমান স্যামসন, অন্ধ করে রাখলেও টের পায় অনাচার, অবিচার আর প্রবল হুঙ্কারে কেশর দুলিয়ে ত্বরান্বিত করে শক্রর পতন।   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jolche-swadesh/
4098
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
খতিয়ান
প্রেমমূলক
‘হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা। রোদ্দুর খুঁজে পাই না কখনো দিনে, আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা। টোকা দিলে ঝরে পচা আঙুলের ঘাম, ধস্ত তখন মগজের মাস্তুল নাবিকেরা ভোলে নিজেদের ডাক নাম চোখ জুড়ে ফোটে রক্তজবার ফুল। ডেকে ওঠো যদি স্মৃতিভেজা ম্লান স্বরে, উড়াও নীরবে নিভৃত রুমালখানা পাখিরা ফিরবে পথ চিনে চিনে ঘরে আমারি কেবল থাকবে না পথ জানা– টোকা দিলে ঝরে পড়বে পুরনো ধুলো চোখের কোণায় জমা একফোঁটা জল। কার্পাস ফেটে বাতাসে ভাসবে তুলো থাকবে না শুধু নিবেদিত তরুতল জাগবে না বনভূমির সিথানে চাঁদ বালির শরীরে সফেদ ফেনার ছোঁয়া পড়বে না মনে অমীমাংসিত ফাঁদ অবিকল রবে রয়েছে যেমন শোয়া হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় প্রেমে অথচ আমার ব্যাপক বিরহভূমি ছুটে যেতে চাই– পথ যায় পায়ে থেমে ঢেকে দাও চোখ আঙুলের নখে তুমি।’
https://banglarkobita.com/poem/famous/325
2161
মহাদেব সাহা
তুমি
প্রেমমূলক
তোমাকেই আজো মনে মনে করি উপাসনা ভাবি স্মরণযোগ্য বহু বেদনায় বহু ব্যবধানে তোমাকেই আজো অসময়ে খুঁজি, তুমি ছাড়া কোনো স্মরণযোগ্য নারী নেই আর নাম নেই আর তোমার প্রতিভা এই শতাব্দী তারও বেশিকাল পাবে প্রাধান্য আমাদের ঢের বয়সের বেশি তবু আমাদের বয়সের চেয়ে তারুণ্যময় তোমারই রূপের দুরন্ত খ্যাতি এ শহরে আজো প্রবাদতুল্য! আমাদের যুগে তুমিই মাত্র স্মরণযোগ্য রমনীর নাম তুমিই মাত্র গূঢ় স্মরণীয় তুমিই মাত্র বান্ধবী নারী অসামান্য আর সকলেই বধূ বা কন্যা এভাবে ধন্য তোমাকেই আজো মনে মনে করি উপাসনা ভাবি স্মরণযোগ্য এই শহরের বিরুদ্ধ পথ একাকী যখন পাড়ি দিই বড়ো প্রবাসীর মতো অতি সাবধান হাত রাখি কোনো গোলাপের গায়ে গাঢ় প্রেরণায় তোমাকেই করি উপাসনা করি বহু প্রশস্তি আপনার প্রিয় প্রাচীন ভাষায়, ফুল তুলি আর ফসলের কোনো ঋতুতে যখন আমি উৎসাহী স্বপ্ন জাগাই, সেই উৎসবে মনে মনে ভাবি তোমাকেই শুধু স্মরণযোগ্য বহু বেদনার বিস্তৃত পথ পাড়ি দিই একা বিক্ষত পায়ে, কখনো একাকী এইখানে এই সামান্য ছায়া তার নিচে বসে দীর্ঘজীবন দৃঢ় অবসান তবু তোমাকেই মনে মনে করি স্তুতি-বন্দনা তোমাকেই ভাবি স্মরণযোগ্য আমাদের যুগে তুমিই মাত্র স্মরণীয় নারী স্মরণীয় নাম তোমারই রূপের খ্যাতি ও প্রতিভা এ শহরে আজো প্রবাদতুল্য! আমার মাথায় জলভরা একটি আকাশ তার নাম তুমি, খর গ্রীষ্মে আমার উঠোনে অঝোর বর্ষণ তুমি তার নাম; ভীষণ তৃষ্ণার্ত এই পথিকের ক্লান্ত চোখে সুশীতল মেঘ একমাত্র তুমি- দুপুরের খরতাপ শেষে আমার জীবনে এই শান্ত সন্ধ্যা তুমি, তুমি, তুমি; মরুময় এই ভূপ্রকৃতি জুড়ে ঘন প্রেইরীর সবুজ উদ্যান তুমি তার নাম, আমার ধূসর দুই চোখে চিরসবুজের গাঢ় হাতছানি তার নাম তুমি; আমার স্মৃতির অববাহিকায় একটি স্বপ্নের প্রিয় নদী তুমি নিরবধি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1381
699
জয় গোস্বামী
প্রণয়গীতি
প্রেমমূলক
এইখানে টান দাও এই এত ঠাণ্ডায় ওই কোলে ঠাই দাও সজনী ও সজনী দেখিতে না দেখিতে, কিলবিলে দিঘিতে আমাকে ডোবাল মম আত্মীয়স্বজনই আজ উঠে দেবী তোরে সকাতরে বলি হে অধমে খাওয়াও তব হাড়মাস গলিয়ে সঙ্গী ও সাথীরা, ছেলে-পিলে-নাতিরা পেট ফুলে উল্টিয়ে ছিল সবকজনই ওঠে আজ ঠ্যাংকাটা, কে উঠে ঘোড়ার মাথা কে ছেলে কে মেয়ে ওরা -অলিঙ্গ অযোনি শৃঙ্গী না শঙ্খিনী তুমি কি মানুষ নও? দেখি, হাত দিয়ে দেখি-এ কী, এত উষ্ণ! কী গরম কী গরম, আনন্দে হে চরম একাকার হয়ে যায় দিন-রাত-রজনী নয়দ্বার ফেটে পড়ে মাথায় নৃত্য করে ছ-জন্ম ন-জন্ম নয়-ছয়-জননী…..আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রএইখানে টান দাও এই এত ঠাণ্ডায় ওই কোলে ঠাই দাও সজনী ও সজনী দেখিতে না দেখিতে, কিলবিলে দিঘিতে আমাকে ডোবাল মম আত্মীয়স্বজনই আজ উঠে দেবী তোরে সকাতরে বলি হে অধমে খাওয়াও তব হাড়মাস গলিয়ে সঙ্গী ও সাথীরা, ছেলে-পিলে-নাতিরা পেট ফুলে উল্টিয়ে ছিল সবকজনই ওঠে আজ ঠ্যাংকাটা, কে উঠে ঘোড়ার মাথা কে ছেলে কে মেয়ে ওরা -অলিঙ্গ অযোনি শৃঙ্গী না শঙ্খিনী তুমি কি মানুষ নও? দেখি, হাত দিয়ে দেখি-এ কী, এত উষ্ণ! কী গরম কী গরম, আনন্দে হে চরম একাকার হয়ে যায় দিন-রাত-রজনী নয়দ্বার ফেটে পড়ে মাথায় নৃত্য করে ছ-জন্ম ন-জন্ম নয়-ছয়-জননী…..আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রএইখানে টান দাও এই এত ঠাণ্ডায় ওই কোলে ঠাই দাও সজনী ও সজনী দেখিতে না দেখিতে, কিলবিলে দিঘিতে আমাকে ডোবাল মম আত্মীয়স্বজনই আজ উঠে দেবী তোরে সকাতরে বলি হে অধমে খাওয়াও তব হাড়মাস গলিয়ে সঙ্গী ও সাথীরা, ছেলে-পিলে-নাতিরা পেট ফুলে উল্টিয়ে ছিল সবকজনই ওঠে আজ ঠ্যাংকাটা, কে উঠে ঘোড়ার মাথা কে ছেলে কে মেয়ে ওরা -অলিঙ্গ অযোনি শৃঙ্গী না শঙ্খিনী তুমি কি মানুষ নও? দেখি, হাত দিয়ে দেখি-এ কী, এত উষ্ণ! কী গরম কী গরম, আনন্দে হে চরম একাকার হয়ে যায় দিন-রাত-রজনী নয়দ্বার ফেটে পড়ে মাথায় নৃত্য করে ছ-জন্ম ন-জন্ম নয়-ছয়-জননী…..আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রএইখানে টান দাও এই এত ঠাণ্ডায় ওই কোলে ঠাই দাও সজনী ও সজনী দেখিতে না দেখিতে, কিলবিলে দিঘিতে আমাকে ডোবাল মম আত্মীয়স্বজনই আজ উঠে দেবী তোরে সকাতরে বলি হে অধমে খাওয়াও তব হাড়মাস গলিয়ে সঙ্গী ও সাথীরা, ছেলে-পিলে-নাতিরা পেট ফুলে উল্টিয়ে ছিল সবকজনই ওঠে আজ ঠ্যাংকাটা, কে উঠে ঘোড়ার মাথা কে ছেলে কে মেয়ে ওরা -অলিঙ্গ অযোনি শৃঙ্গী না শঙ্খিনী তুমি কি মানুষ নও? দেখি, হাত দিয়ে দেখি-এ কী, এত উষ্ণ! কী গরম কী গরম, আনন্দে হে চরম একাকার হয়ে যায় দিন-রাত-রজনী নয়দ্বার ফেটে পড়ে মাথায় নৃত্য করে ছ-জন্ম ন-জন্ম নয়-ছয়-জননী…..আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a7%9f%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%80/
6007
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
জীবন সঙ্গীত
চিন্তামূলক
বলো না কাতর স্বরে, বৃথা জন্ম এ সংসারে এ জীবন নিশার স্বপন, দারা পুত্র পরিবার, তুমি কার কে তোমার বলে জীব করো না ক্রন্দন; মানব-জনম সার, এমন পাবে না আর বাহ্যদৃশ্যে ভুলো না রে মন; কর যত্ন হবে জয়, জীবাত্মা অনিত্য নয় ওহে জীব কর আকিঞ্চন । করো না সুখের আশ, পরো না দুখের ফাঁস, জীবনের উদ্দেশ্য তা নয়, সংসারে সংসারী সাজ, করো নিত্য নিজ কাজ, ভবের উন্নতি যাতে হয় । দিন যায় ক্ষণ যায়, সময় কাহারো নয়, বেগে ধায় নাহি রহে স্থির, সহায় সম্পদ বল, সকলি ঘুচায় কাল আয়ু যেন শৈবালের নীর । সংসার-সমরাঙ্গনে যুদ্ধ কর দৃঢ় পণে, ভয়ে ভীত হইও মানব; কর যুদ্ধ বীর্যবান, যায় যাবে যাক প্রাণ মহিমাই জগতে দূর্লভ । মনোহর মূর্তি হেরে, ওহে জীব অন্ধকারে, ভবিষ্যতে করো না নির্ভর; অতীত সুখের দিন, পুনঃ আর ডেকে এনে, চিন্তা করে হইও না কাতর । মহাজ্ঞানী মহাজন, যে পথে করে গমন, হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়, সেই পথ লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্তি ধ্ব্জা ধরে আমরাও হব বরণীয় । সমর-সাগর-তীরে, পদাঙ্ক অঙ্কিত করে আমরাও হব হে অমর; সেই চিহ্ন লক্ষ করে, অন্য কোনো জন পরে, যশোদ্বারে আসিবে সত্বর । করো না মানবগণ, বৃথা ক্ষয় এ জীবন সংসার সমরাঙ্গন মাঝে; সঙ্কল্প করেছ যাহা, সাধন করহ তাহা, রত হয়ে নিজ নিজ কাজে । দিন যায়, ক্ষণ যায়, সময় কাহারো নয়, বেগে ধায়, নাহি রহে স্থির, সহায় সম্পদ বল, সকলি ঘুচায় কাল, আয়ু যেন শৈবালের নীর । জাতি-দেশ-বর্ণ ভেদ ধর্ম ভেদ নাই । শিশুর হাসির কাছে, সবি প’ড়ে থাকে পাছে, যেখানে যখন দেখি তখনি জুড়াই।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4486.html
3000
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গানের জাল
প্রেমমূলক
দেবে তুমি কখন নেশায় পেয়ে আপন-মনে যাও চলে গান গেয়ে। যে আকাশের সুরের লেখা লেখ কুঝি না তা, কেবল রহি চেয়ে। হৃদয় আমার অদৃশ্যে যায় চলে, প্রতিদিনের ঠিকঠিকানা ভোলে- মৌমাছিরা আপনা হারায় যেন গন্ধের পথ বেয়ে।গানের টানা জালে নিমেষ-ঘেরা বাঁধন হাতে টানে অসীম কালে। মাটির আড়ালে করি ভেদন স্বর্গলোকের আনে বেদন, পরান ফেলে ছেয়ে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ganar-jal/
3697
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মরীচিকা
প্রেমমূলক
ওই-যে তোমার মানস-প্রজাপতি ঘরছাড়া সব ভাবনা যত, অলস দিনে কোথা ওদের গতি। দখিন হাওয়ার সাড়া পেয়ে চঞ্চলতার পতঙ্গদল ভিতর থেকে বাইরে আসে ধেয়ে। চেলাঞ্চলে উতল হল তারা, চক্ষে মেলে চপল পাখা আকাশে পথহারা। বকুলশাখায় পাখির হঠাৎ ডাকে চমকে-যাওয়া চরণ ঘিরে ঘুরে বেড়ায় শাড়ির ঘূর্ণিপাকে। কাটায় ব্যর্থ বেলা অঙ্গে অঙ্গে অস্থিরতার চকিত এই খেলা।       মনে তোমার ফুল-ফোটানো মায়া অস্ফুট কোন্‌ পূর্বরাগের রক্তরঙিন ছায়া। ঘিরল তারা তোমায় চারি পাশে ইঙ্গিতে আভাসে ক্ষণে ক্ষণে চমকে ঝলকে। তোমার অলকে দোলা দিয়ে বিনা ভাষায় আলাপ করে কানে কানে, নাই কোনো যার মানে। মরীচিকার ফুলের সাথে মরীচিকার প্রজাপতির মিলন ঘটে ফাল্গুনপ্রভাতে। আজি তোমার যৌবনেরে ঘেরি যুগলছায়ার স্বপনখেলা তোমার মধ্যে হেরি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/morecheka/
1637
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রবাস-চিত্র
স্বদেশমূলক
যেখানে পা ফেলবি, তোর মনে হবে, বিদেশে আছিস। এই তোর ভাগ্যলিপি। গাছপালা অচেনা লাগবে, রাস্তাঘাট অন্যতর বিন্যাসে ছড়ানো, সদরে সমস্ত রাত কড়া নাড়বি, তবু বাড়িগুলি নিদ্রার গভীর থেকে বেরিয়ে আসবে না। এই তোর ভাগ্যলিপি। সকলে বলবে না কথা; যারা বলবে, তারা পর্যটন বিভাগের কর্মী মাত্র, যে-কোনো টুরিস্‌ট্‌কে তারা দুটি-চারটি ধোপদুরস্ত কথা উপহার দিয়ে থাকে, তার জন্যে মাসান্তে মাইনে পায়। এই তোর ভাগ্যলিপি। যেখানি যাবি, তোর মনে হবে, এইমাত্র উড়োজাহাজের পেটের ভিতর থেকে ভিন্ন-কোনো ভূমির উপরে নেমে এসেছিস। এই তোর ভাগ্যলিপি। কাপড় সরিয়ে কেউ বুকের রহস্য দেখবে না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1644
3458
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রায়শ্চিত্ত
মানবতাবাদী
উপর আকাশে সাজানো তড়িৎ-আলো-- নিম্নে নিবিড় অতিবর্বর কালো ভূমিগর্ভের রাতে-- ক্ষুধাতুর আর ভূরিভোজীদের নিদারুণ সংঘাতে ব্যাপ্ত হয়েছে পাপের দুর্দহন, সভ্যনামিক পাতালে যেথায় জমেছে লুটের ধন। দুঃসহ তাপে গর্জি উঠিল ভূমিকম্পের রোল, জয়তোরণের ভিত্তিভূমিতে লাগিল ভীষণ দোল। বিদীর্ণ হল ধনভাণ্ডারতল, জাগিয়া উঠিছে গুপ্ত গুহার কালীনাগিনীর দল। দুলিছে বিকট ফণা, বিষনিশ্বাসে ফুঁসিছে অগ্নিকণা। নিরর্থ হাহাকারে দিয়ো না দিয়ো না অভিশাপ বিধাতারে। পাপের এ সঞ্চয় সর্বনাশের পাগলের হাতে আগে হয়ে যাক ক্ষয়। বিষম দুঃখে ব্রণের পিণ্ড বিদীর্ণ হয়ে, তার কলুষপুঞ্জ ক'রে দিক উদগার। ধরার বক্ষ চিরিয়া চলুক বিজ্ঞানী হাড়গিলা, রক্তসিক্ত লুব্ধ নখর একদিন হবে ঢিলা। প্রতাপের ভোজে আপনারে যারা বলি করেছিল দান সে-দুর্বলের দলিত পিষ্ট প্রাণ নরমাংসাশী করিতেছে কাড়াকাড়ি, ছিন্ন করিছে নাড়ী। তীক্ষ্ণ দশনে টানাছেঁড়া তারি দিকে দিকে যায় ব্যেপে রক্তপঙ্কে ধরার অঙ্ক লেপে। সেই বিনাশের প্রচণ্ড মহাবেগে একদিন শেষে বিপুলবীর্য শান্তি উঠিবে জেগে। মিছে করিব না ভয়, ক্ষোভ জেগেছিল তাহারে করিব জয়। জমা হয়েছিল আরামের লোভে দুর্লভতার রাশি, লাগুক তাহাতে লাগুক আগুন-- ভস্মে ফেলুক গ্রাসি। ঐ দলে দলে ধার্মিক ভীরু কারা চলে গির্জায় চাটুবাণী দিয়ে ভুলাইতে দেবতায়। দীনাত্মাদের বিশ্বাস, ওরা ভীত প্রার্থনারবে শান্তি আনিবে ভবে। কৃপণ পূজায় দিবে নাকো কড়িকড়া। থলিতে ঝুলিতে কষিয়া আঁটিবে শত শত দড়িদড়া। শুধু বাণীকৌশলে জিনিবে ধরণীতলে। স্তূপাকার লোভ বক্ষে রাখিয়া জমা কেবল শাস্ত্রমন্ত্র পড়িয়া লবে বিধাতার ক্ষমা। সবে না দেবতা হেন অপমান এই ফাঁকি ভক্তির। যদি এ ভুবনে থাকে আজো তেজ কল্যাণশক্তির ভীষণ যজ্ঞে প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ করিয়া শেষে নূতন জীবন নূতন আলোকে জাগিবে নূতন দেশে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pachetae/
3582
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিদেশী ফুলের গুচ্ছ – ১০
প্রেমমূলক
কেমনে কী হল পারি নে বলিতে, এইটুকু শুধু জানি– নবীন কিরণে ভাসিছে সে দিন প্রভাতের তনুখানি। বসন্ত তখনো কিশোর কুমার, কুঁড়ি উঠে নাই ফুটি, শাখায় শাখায় বিহগ বিহগী বসে আছে দুটি দুটি। কী যে হয়ে গেল পারি নে বলিতে, এইটুকু শুধু জানি– বসন্তও গেল, তাও চলে গেল একটি না কয়ে বাণী। যা-কিছু মধুর সব ফুরাইল, সেও হল অবসান– আমারেই শুধু ফেলে রেখে গেল সুখহীন ম্রিয়মাণ।Christina Rossetti (অনূদিত কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bideshi-fuler-guccho-10/
1292
টুটুল দাস
রবীন্দ্রনাথকে
রূপক
গীষ্ম সকাল জানলা খোলা রোদে খাক হয়েছে পুড়ে খুচরো অভিমান মেঘের দেখা নাই তো চৌহদ্দে জমিয়ে রাখা বৃষ্টি জলে স্নান।স্নানের নামে গায়ে মাখছি ধূলো ধূলো কোথায়? কাদা-ই বলা যায় বললেই বা কি এমন এসে গেল না বলা কথা ঝুলছে বারান্দায়।বারান্দাতে দাঁড়ায় এসে কবি ঝোলার ভিতর একটাও নেই সাপ ভুলের পাশে ভুল ঠিকানার ছবি প্রেমের নামে অালিঙ্গন নিষ্পাপ।পাপের কথা বলতে এমন আছে? শহর জুড়ে বিছিয়ে রাখা ফুল রক্ত চাবো কোন মুখোশের কাছে? পায়ের তলায় পিষছে জুঁই-বকুল।বকুল তলায় বাঁধছে দেখো মাইক রবীন্দ্রনাথ গাইবে এসে গান পাড়ার দাদা পকেটে নিয়ে পাইক জন্মদিনের রাখবেন না সম্মান?সম্মান আর কোথায় রাখি বলো মহামারিতে তলিয়ে গেছে গ্রাম রবীন্দ্রনাথ পায়েশ খেয়ে যেও মেঘ বৃষ্টি নিয়ে গেছে প্রণাম।টুটুল দাসের কবিতার পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a5%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%96%e0%a7%8b%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a0%e0%a6%bf/
4660
শামসুর রাহমান
গদ্য কবিতার চালে
চিন্তামূলক
দুপুরবেলা খেলাচ্ছলে কোথায় যে যাচ্ছিলাম আস্তে সুস্থে, কী খেয়াল হলো হঠাৎ ঢুকে পড়লাম স্টেডিয়ামের বইয়ের দোকানে, সেখানেই দেখা তোমার সঙ্গে। নিমেষে দুপুরের অধিক ঝলোমলো হয়ে উঠলো দুপুর; তোমার চোখে চোখ পড়তেই ভাবি, অনন্তকালের রঙ কি শাদা পায়রার মতো? নাকি সমুদ্রের জলরাশির মতো নীল? অনন্তকাল কি অপরূপ তালে-বাঁধা কোনো ধ্রুপদী নাচ? সম্ভবত শস্যের আভাস-লাগা নিঃসীম প্রান্তর, এ-কথা মনে হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিপথে চকিতে দুলে ওঠে স্বপ্ন-জাগানো এক লতা কী নিবিড়, সাইনবোর্ড, ম্যাগাজিন, বইপত্র, ভিড় মুছে যায়; ঝালর কাঁপে, অকাল বসন্ত আসে অস্তিত্বের ভিতে।নিজেকে প্রশ্ন করি, যা ঘটলো এই মুহূর্তে আমার মনে থাকবে চিরদিন? আর তোমারও কি পড়বে মনে বহুকাল পর এই সাবেকি ঘটনা, যখন তুমি অন্ধকারে ঘরে একলা শুয়ে-শুয়ে ক্যাসেট প্লেয়ারে শুনবে পুরোনো গান কোনো বর্ষাকোমল রাতে? কে জানে হারিয়ে যাবে কিনা এইসব কিছুই? শুধু গুণীর তান হয়ে বাজবে মন-কেমন-করা স্তব্ধতা বিস্মৃতির ভাটার টানে!তোমার চোখ হলো ওষ্ঠ, ওষ্ঠ চোখ, আমি একটা বইয়ের পাতা ওল্টানোর ভান করে আনাড়ি অভিনেতার ধরনকেই, যা হোক, স্পষ্ট ক’রে তুললাম নিজের কাছে। সাত তাড়াতাড়ি হাল আমলের একজন তুখোড় কবির হৃৎপিণ্ডের ধ্বনিময়, বুদ্ধির ঝলকানি-লাগা বইয়ের দাম চুকিয়ে তুমি আরো একবার গভীর তাকালে আমার প্রতি। নিজেকে এগোতে দিলাম আকাশ থেকে ডাঙায় নেমে-আসা ছন্নছাড়া পাখির ধরনে। কথা বলবো কি বলবো না, এই দ্বিধার ছুরি চলতে থাকে বুকের ভেতর। আমার ভাষা যেন সেই কাফ্রি, যার জিভ কেটে নেয়া হয়েছে, অথচ কথার ঝালর বোনা হতে থাকে অন্তরে। দুপুরে অমাবস্যা ছড়িয়ে তুমি হেঁটে গেলে করিডোর দিয়ে, মার স্বপ্নকে ফিকে করে চোখের আড়ালে, যেমন মল্লিকা সারাভাই যান খাজুরাহোর মন্দিরের দিকে স্মৃতিতে জ্যোতির্বলয় নিয়ে গদ্যকবিতার চালে।   (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/godyo-kobitar-chale/
5617
সুকুমার রায়
টিক্‌ টিক্‌ টং
ছড়া
টিক্‌ টিক্‌ চলে ঘড়ি, টিক্‌ টিক্‌ টিক্‌, একটা ইঁদুর এল সে সময়ে ঠিক। ঘড়ি দেখে একলাফে তাহাতে চড়িল, টং করে অমনি ঘড়ি বাজিয়া উঠিল। অমনি ইঁদুরভায়া ল্যাজ গুটাইয়া, ঘড়ির উপর থেকে পড়ে লাফাইয়া। ছুটিয়া পালায়ে গেল আর না আসিল, টিক্‌ টিক্‌ টিক্‌ ঘড়ি চলিতে লাগিল।।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/tik-tik-tong/
1854
পূর্ণেন্দু পত্রী
প্রাচীন ভিক্ষুক
চিন্তামূলক
রাজার দুলাল ভেবে ফিরায়ো না। মাথার মুকুট গলে জয়মালা দেখে ফিরায়ো না। আমি সেই প্রাচীন ভিক্ষুক। শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা শিরায় বিলাপ নাভিতটে দংশনের লোভী ফণা, বিষধর সাপ যথাযথ সকলই প্রাচীন। মাথায় মুকুট গলে জয়মালা দেখে ফিরায়ো না। গম্বুজ খিলান কিংবা মখমলে প্লাবিত মদিরা বৃক্ষশাখে হারেমের উচ্চকিত হাসির মতন পুষ্পশোভা দেখে ফিরায়ো না। সকলই চিকন চতুরালি। ফুলের আড়ালে শাখা শাখার আড়ালে ফুল পরস্পর ঢেকে আছে নিঃস্বতার শিরাগ্রস্থ রুপ। মুলত সে প্রাচীন ভিক্ষুক। পুরাতন নামে ডাকো ছায়াময় আশ্রয়ে তোমার স্মতিসুরভিত শয্যা, লজ্জায় আঁচলে ঢাকা থালা বাটি পানীয়ের জল খুলে দাও ঈশ্বরের বিখ্যাত বাগান। রৌদ্রতাপে জর্জরিত দেহ চায় সুশীতল স্নান। পুনরায় ক্লান্ত করো মায়াবী হাসির কোলাহলে লুকোচুরি খেলা নীল রজনীর গোপন আলোয়। কতকাল নির্জনতা, বিষন্নতা, অবাধ্যতা ছেড়ে বেঁচে আছি। যে অন্যায়ে কাঁচ ভাঙে, কতকাল সেরকম ক্ষামাহীন কোনো খেলা নেই। রাজ্যে বড় সমারোহ, শঙ্খ ঘন্টা, শোভাযাত্রা, পতাকা রঙীন রাজ্যে শুধু প্রথাগত, নীতিগত, শৃঙ্কলিত সুখ। ভিখারিনী, ফিরায়ো না আমি সেই প্রাচীন ভিক্ষুক।
https://banglarkobita.com/poem/famous/480
5233
শামসুর রাহমান
শুধু দেখি
সনেট
আমার কবিত্ব বুঝি গৃহত্যাগী সিদ্ধার্থের মতো বড় অনশন-ক্লিষ্ট আজ, নইলে কেন হে নবীনা তোমার রূপের শিখা অনায়াসে জ্বালতে পারি না ছত্রে ছত্রে? এই চোখ, এই ওষ্ঠ আর সমুন্নত নাকের উপমা খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হচ্ছি অবিরত। নতুন উপমা পেলে অবশেষে হে তুলনাহীনা, তা-ও বড়ো তুচ্ছ মনে হয় আর মগজে যে বীণা বাজে মাঝে-মাঝে, তারও সুর কাটে, চেতনা বিব্রত।আমার এ প্রয়াসের ব্যর্থতায় জানি উপহাস জুটবে বিস্তর আর কবিত্বকে সুতীক্ষ্ম ধিক্কার দেবে কেউ কেউ। তুমি যেন রূপবতী বাংলাদেশ অনন্য সৌন্দর্যে খুঁতে, অন্তরঙ্গ একটি নিশ্বাস, এবং বর্ণনাতীত। খুঁজিনাকো উপমা তোমার শুধু দেখি, দেখি মুগ্ধাবেশে তোমাকেই অনিমেষ।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/shudhu-dekhi/
3764
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যখন দেখা হল
প্রেমমূলক
যখন দেখা হল তার সঙ্গে চোখে চোখে তখন আমার প্রথম বয়েস; সে আমাকে শুধাল, "তুমি খুঁজে বেড়াও কাকে?" আমি বললেম, "বিশ্বকবি তাঁর অসীম ছড়াটা থেকে একটা পদ ছিঁড়ে নিলেন কোন্‌ কৌতুকে, ভাসিয়ে দিলেন পৃথিবীর হাওয়ার স্রোতে, যেখানে ভেসে বেড়ায় ফুলের থেকে গন্ধ, বাঁশির থেকে ধ্বনি। ফিরছে সে মিলের পদটি পাবে ব'লে; তার মৌমাছির পাখায় বাজে খুঁজে বেড়াবার নীরব গুঞ্জরণ।" শুনে সে রইল চুপ করে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে। আমার মনে লাগল ব্যথা, বললেম, "কী ভাবছ তুমি?" ফুলের পাপড়ি ছিঁড়তে ছিঁড়তে সে বললে,-- "কেমন করে জানবে তাকে পেলে কিনা, তোমার সেই অসংখ্যের মধ্যে একটিমাত্রকে।" আমি বললেম, "আমি যে খুঁজে বেড়াই সে তো আমার ছিন্ন জীবনের সবচেয়ে গোপন কথা; ও-কথা হঠাৎ আপনি ধরা পড়ে যার আপন বেদনায়, আমি জানি আমার গোপন মিল আছে তারি ভিতর।" কোনো কথা সে বলল না। কচি শ্যামল তার রঙটি; গলায় সরু সোনার হারগাছি, শরতের মেঘে লেগেছে ক্ষীণ রোদের রেখা। চোখে ছিল একটা দিশাহারা ভয়ের চমক পাছে কেউ পালায় তাকে না ব'লে। তার দুটি পায়ে ছিল দ্বিধা, ঠাহর পায়নি কোন্‌খানে সীমা তার আঙিনাতে। দেখা হল। সংসারে আনাগোনার পথের পাশে আমার প্রতীক্ষা ঐটুকু নিয়ে। তার পরে সে চলে গেছে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jakhan-dakha-halo/
3305
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নামজাদা দানুবাবু রীতিমতো খর্‌চে
হাস্যরসাত্মক
নামজাদা দানুবাবু রীতিমতো খর্‌চে, অথচ ভিটেয় তার ঘুঘু সদা চরছে। দানধর্মের ‘পরে মন তার নিবিষ্ট, রোজগার করিবার বেলা জপে “শ্রীবিষ্ণু’, চাঁদার খাতাটা তাই দ্বারে দ্বারে ধরছে। এই ভাবে পুণ্যের খাতা তার ভরছে।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/namjada-danubabu-ritimoto-khorche/
5967
হাসন রাজা
সোনা বন্ধে আমারে
রূপক
সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইলো সোনা বন্ধে আমারে পাগল করিল। আরে না জানি কি মন্ত্র করি জাদু করিল।। রূপের ঝলক দেখিয়া তার আমি হইলাম কানা সেই অবধি লাগল আমার শ্যাম পিরিতির টানা।। হাসন রাজা হইল পাগল লোকের হইল জানা নাচে নাচে পালায় পালায় আর গায়ে জানা।। মুখ চাহিয়া হাসে আমার যত আদি পরী দেখিয়াছি বন্ধের দুখ ভুলিতে না পারি।।আরও পড়ুন… হাসন রাজার সকল গান
http://kobita.banglakosh.com/archives/4474.html
5728
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমাকে জড়িয়ে
চিন্তামূলক
তোমাদের অসম্পূর্ণতা দেখে, স্মৃতির কুয়াশা দেখে আমার মন কেমন করে সারা আকাশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পরম কারুণিক নিষাদ তার চোখ মেটে সিঁদুরের মতো লাল, আমি জানি তার দুঃখ হে কুমারীর বিশ্বাসহন্তা, হে শহরতলীর ট্রেনের প্রতারক তোমাদের টুকিটাকি সার্থকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরোনো মাছের আঁশ হে উত্তরের জানালার ঝিল্লি, হে মধ্য সাগরের অবিযাত্রী মেঘদল হে যুদ্ধের ভাষ্যকার, হে বিবাগী, হে মধ্যরয়সের স্বপ্ন, হে জন্ম এত অসময় নিয়ে, এমন তৃষ্ণার্ত হাসি, এমন করুণা নিয়ে কেন আমাকে জড়িয়ে রইলে, কেন আমাকে………….....
https://banglarkobita.com/poem/famous/445
3744
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মৃত্যুর পরে
চিন্তামূলক
আজিকে হয়েছে শান্তি , জীবনের ভুলভ্রান্তি সব গেছে চুকে । রাত্রিদিন ধুক্‌ধুক্‌ তরঙ্গিত দুঃখসুখ থামিয়াছে বুকে । যত কিছু ভালোমন্দ যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিছু আর নাই । বলো শান্তি , বলো শান্তি , দেহ-সাথে সব ক্লান্তি হয়ে যাক ছাই ।গুঞ্জরি করুক তান ধীরে ধীরে করো গান বসিয়া শিয়রে । যদি কোথা থাকে লেশ জীবনস্বপ্নের শেষ তাও যাক মরে । তুলিয়া অঞ্চলখানি মুখ- ' পরে দাও টানি , ঢেকে দাও দেহ । করুণ মরণ যথা ঢাকিয়াছে সব ব্যথা সকল সন্দেহ ।বিশ্বের আলোক যত দিগ্‌বিদিকে অবিরত যাইতেছে বয়ে , শুধু ওই আঁখি- ' পরে নামে তাহা স্নেহভরে অন্ধকার হয়ে । জগতের তন্ত্রীরাজি দিনে উচ্চে উঠে বাজি , রাত্রে চুপে চুপে সে শব্দ তাহার ‘ পরে চুম্বনের মতো পড়ে নীরবতারূপে ।মিছে আনিয়াছ আজি বসন্তকুসুমরাজি দিতে উপহার । নীরবে আকুল চোখে ফেলিতেছ বৃথা শোকে নয়নাশ্রুধার । ছিলে যারা রোষভরে বৃথা এতদিন পরে করিছ মার্জনা । অসীম নিস্তব্ধ দেশে চিররাত্রি পেয়েছে সে অনন্ত সান্ত্বনা ।গিয়েছে কি আছে বসে জাগিল কি ঘুমাল সে কে দিবে উত্তর । পৃথিবীর শ্রান্তি তারে ত্যজিল কি একেবারে জীবনের জ্বর! এখনি কি দুঃখসুখে কর্মপথ-অভিমুখে চলেছে আবার । অস্তিত্বের চক্রতলে একবার বাঁধা প ' লে পায় কি নিস্তার ।বসিয়া আপন দ্বারে ভালোমন্দ বলো তারে যাহা ইচ্ছা তাই । অনন্ত জনমমাঝে গেছে সে অনন্ত কাজে , সে আর সে নাই । আর পরিচিত মুখে তোমাদের দুখে সুখে আসিবে না ফিরে । তবে তার কথা থাক্‌ , যে গেছে সে চলে যাক বিস্মৃতির তীরে ।জানি না কিসের তরে যে যাহার কাজ করে সংসারে আসিয়া , ভালোমন্দ শেষ করি যায় জীর্ণ জন্মতরী কোথায় ভাসিয়া । দিয়ে যায় যত যাহা রাখো তাহা ফেলো তাহা যা ইচ্ছা তোমার । সে তো নহে বেচাকেনা — ফিরিবে না , ফেরাবে না জন্ম-উপহার ।কেন এই আনাগোনা , কেন মিছে দেখাশোনা দু-দিনের তরে , কেন বুকভরা আশা , কেন এত ভালোবাসা অন্তরে অন্তরে , আয়ু যার এতটুক , এত দুঃখ এত সুখ কেন তার মাঝে , অকস্মাৎ এ সংসারে কে বাঁধিয়া দিল তারে শত লক্ষ কাজে —হেথায় যে অসম্পূর্ণ , সহস্র আঘাতে চূর্ণ বিদীর্ণ বিকৃত , কোথাও কি একবার সম্পূর্ণতা আছে তার জীবিত কি মৃত , জীবনে যা প্রতিদিন ছিল মিথ্যা অর্থহীন ছিন্ন ছড়াছড়ি মৃত্যু কি ভরিয়া সাজি তারে গাঁথিয়াছে আজি অর্থপূর্ণ করি —হেথা যারে মনে হয় শুধু বিফলতাময় অনিত্য চঞ্চল সেথায় কি চুপে চুপে অপূর্ব নূতন রূপে হয় সে সফল — চিরকাল এই-সব রহস্য আছে নীরব রুদ্ধ-ওষ্ঠাধর । জন্মান্তের নবপ্রাতে সে হয়তো আপনাতে পেয়েছে উত্তর ।সে হয়তো দেখিয়াছে পড়ে যাহা ছিল পাছে আজি তাহা আগে , ছোটো যাহা চিরদিন ছিল অন্ধকারে লীন বড়ো হয়ে জাগে । যেথায় ঘৃণার সাথে মানুষ আপন হাতে লেপিয়াছে কালি নূতন নিয়মে সেথা জ্যোতির্ময় উজ্জ্বলতা কে দিয়াছে জ্বালি ।কত শিক্ষা পৃথিবীর খসে পড়ে জীর্ণচীর জীবনের সনে , সংসারের লজ্জাভয় নিমেষেতে দগ্ধ হয় চিতাহুতাশনে । সকল অভ্যাস-ছাড়া সর্ব-আবরণ-হারা সদ্যশিশুসম নগ্নমূর্তি মরণের নিষ্কলঙ্ক চরণের সম্মুখে প্রণমো ।আপন মনের মতো সংকীর্ণ বিচার যত রেখে দাও আজ । ভুলে যাও কিছুক্ষণ প্রত্যহের আয়োজন , সংসারের কাজ । আজি ক্ষণেকের তরে বসি বাতায়ন- ' পরে বাহিরেতে চাহো । অসীম আকাশ হতে বহিয়া আসুক স্রোতে বৃহৎ প্রবাহ ।উঠিছে ঝিল্লির গান , তরুর মর্মরতান , নদীকলস্বর — প্রহরের আনাগোনা যেন রাত্রে যায় শোনা আকাশের'পর । উঠিতেছে চরাচরে অনাদি অনন্ত স্বরে সংগীত উদার — সে নিত্য-গানের সনে মিশাইয়া লহো মনে জীবন তাহার ।ব্যাপিয়া সমস্ত বিশ্বে দেখো তারে সর্বদৃশ্যে বৃহৎ করিয়া । জীবনের ধূলি ধুয়ে দেখো তারে দূরে থুয়ে সম্মুখে ধরিয়া । পলে পলে দণ্ডে দণ্ডে ভাগ করি খণ্ডে খণ্ডে মাপিয়ো না তারে । থাক্‌ তব ক্ষুদ্র মাপ ক্ষুদ্র পুণ্য ক্ষুদ্র পাপ সংসারের পারে ।আজ বাদে কাল যারে ভুলে যাবে একেবারে পরের মতন তারে লয়ে আজি কেন বিচার-বিরোধ হেন , এত আলাপন । যে বিশ্ব কোলের'পরে চিরদিবসের তরে তুলে নিল তারে তার মুখে শব্দ নাহি , প্রশান্ত সে আছে চাহি ঢাকি আপনারে ।বৃথা তারে প্রশ্ন করি , বৃথা তার পায়ে ধরি , বৃথা মরি কেঁদে , খুঁজে ফিরি অশ্রুজলে — কোন্‌ অঞ্চলের তলে নিয়েছে সে বেঁধে । ছুটিয়া মৃত্যুর পিছে , ফিরে নিতে চাহি মিছে , সে কি আমাদের ? পলেক বিচ্ছেদে হায় তখনি তো বুঝা যায় সে যে অনন্তের ।চক্ষের আড়ালে তাই কত ভয় সংখ্যা নাই , সহস্র ভাবনা । মুহূর্ত মিলন হলে টেনে নিই বুকে কোলে , অতৃপ্ত কামনা । পার্শ্বে বসে ধরি মুঠি , শব্দমাত্রে কেঁপে উঠি , চাহি চারিভিতে , অনন্তের ধনটিরে আপনার বুক চিরে চাহি লুকাইতে ।হায় রে নির্বোধ নর , কোথা তোর আছে ঘর , কোথা তোর স্থান । শুধু তোর ওইটুকু অতিশয় ক্ষুদ্র বুক ভয়ে কম্পমান । ঊর্ধ্বে ওই দেখ্‌ চেয়ে সমস্ত আকাশ ছেয়ে অনন্তের দেশ — সে যখন এক ধারে লুকায়ে রাখিবে তারে পাবি কি উদ্দেশ ?ওই হেরো সীমাহারা গগনেতে গ্রহতারা অসংখ্য জগৎ , ওরি মাঝে পরিভ্রান্ত হয়তো সে একা পান্থ খুঁজিতেছে পথ । ওই দূর-দূরান্তরে অজ্ঞাত ভুবন- ' পরে কভু কোনোখানে আর কি গো দেখা হবে , আর কি সে কথা কবে , কেহ নাহি জানে ।যা হবার তাই হোক , ঘুচে যাক সর্ব শোক , সর্ব মরীচিকা । নিবে যাক চিরদিন পরিশ্রান্ত পরিক্ষীণ মর্তজন্মশিখা । সব তর্ক হোক শেষ , সব রাগ সব দ্বেষ , সকল বালাই । বলো শান্তি , বলো শান্তি , দেহ-সাথে সব ক্লান্তি পুড়ে হোক ছাই ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mrittur-pore/
3446
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রভেদ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
নীতিমূলক
অনুগ্রহ দুঃখ করে, দিই, নাহি পাই। করুণা কহেন, আমি দিই, নাহি চাই।  (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/proved-konika/
1999
বিষ্ণু বিশ্বাস
কালো মেয়ে
প্রেমমূলক
শুধু মৃতদের গল্প কত আর কাঁধে ঝুলে যাবে এবার নিষ্কৃতি পেলে, শান্তি অন্বেষণে মহাকাশে গিয়ে, দু’টুকরো লোহা ঠুকে আগুন জ্বালিয়ে দেব অসহ অসীম শব পুড়ে হোক ছাই পুড়ে ছাই।তারপর আমাদের নিমগাছটির পাশে নদী কদমগাছটি আছে অন্যদের মুঘলের ঘাটে তুমি আছো কালো মেয়ে সন্ধ্যা স্নানের ঝংকৃত দূরে আমি ভালোবেসে ভুলে তোমাকে জ্বালিয়ে দিই নাই।
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/01/%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%8b-%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%81-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%be/
664
জয় গোস্বামী
জল থেকে ডাঙায় উঠে ওরা
মানবতাবাদী
জল থেকে ডাঙায় উঠে ওরা পালিয়ে চলেছে আজীবন এক যুগ থেকে অন্য যুগে উড়ে আসে ক্ষেপনাস্ত্র, তীর ছেলে বউ মেয়ে বুড়ো জননী ও শিশু কোলাহল দাউদাউ উদ্ধাস্তু শিবির
https://banglarkobita.com/poem/famous/1737
4780
শামসুর রাহমান
তিনটি স্তবক
মানবতাবাদী
এই তো বৃষ্টি ছাঁট আর ঝোড়ো হাওয়া ময়লা আকাশটাকে ঝাঁট দিয়ে গেল। বসে আছি ঘরে বড় একা; নিজের ভেতরে এক আরশিনগরে কারো ছায়া পড়ে বলে মনে হয়। পড়শির সঙ্গে দেখা। যথারীতি জমে যাবে মাদারির খেল। ন্যায়নীতি নিয়ে কানামাছি খেলি, ভয়ভীতি বিসর্জন দিতে পেরেছি কি? বিবেকের আঁশ এখনো আছে কি কিছু লেগে অস্তিত্বের তন্তুজালে? কালে কালে কী যে হবে। অলীক বৈভবে সতৃষ্ণ নজর রেখে মরমিয়া চাদরে গা ঢেকে ঘুর ঘুর করে যায় যারা যুগে যুগে ছুঁৎমার্গে ভুগে ঘোর রাজনীতিবিদ্বেষী এবং কাচ ঘেরা গা বাঁচিয়ে তাদের হিসেব নেবে যারা একদিন, তারা জানি বাড়ছে গোকূলে সুনিশ্চিত সেদিন বুঝবে ওরা কত ধানে কত হয় চাল।একদা বিপ্লবী নেতা, আজকাল টাউকো টাউট, সাড়ম্বরে ব্যাঙ্গের মতন গলা ফুলিয়ে দরাজ কণ্ঠস্বরে খাল কেটে কুমির আনার বেমিসাল মন্ত্রণা ঢালেন প্রভুর লোহার তৈরি কানে, সে মন্ত্রণা কী পুলক আনে তাঁকে ঘিরে-থাকা মৌমাছির মতো চেলা-চামুণ্ডার মনে আর সূক্ষ্ম কলা কৈবল্যবাদের গোধূলির উদ্যান সভায় চাটুকার স্ফীতোদর পদ্যকার ভণে, ‘অমৃত সমান আমার সকল আমার সকল শ্লোক গজদন্ত মিনারে রচিত প্রভুর কৃপায়, জয় হোক, জয় হোক মহাত্মার। চতুর্দিকে সামাল সামাল ভাই রব, বানে ভাসে দেশ, রিলিফের মাল আসে ঝকঝকে বিদেশী জাহাজে, কারো বলিহারি পৌষমাস আর কারো সর্বনাশ, বন্যার পানিতে খেলা করে মৃত্যু, সূর্যাস্তের সোনা। মুশকিল আসান হবে কবে? দুঃখীদের দুর্দশায় বিজ্ঞাপনী কুম্‌ভীরাশ্রু দেখি কী রঙিন। মন্দিরে বাজছে ঘণ্টা, গির্জায় অর্গান, মসজিদে ধ্রুপদী আজান।৩ দেশ কি উইয়ের ঢিবি? নইলে কেন এই মোচ্ছব চৌদিকে বল্মীকের? নৈঃসঙ্গের মৌতাতে বিভোর বুদ্ধজীবী কফিন পেয়ালা হাতে স্তব্ধ হয়ে আছেন এবং উদভ্রান্ত বেকার যুবকের দম মারে ঘন ঘন গাঁজার ছিলেমে, রাজবন্দিরা যখন দিন গুনছেন জেলের চোয়াল থেকে তাঁরা জনতার হ্যাঁচকা টানে কখন পাবেন ছাড়া জনতার হ্যাঁচকা টানে আর লঙ্কাকাণ্ড বাধবে কখন, তখন অনেকে খোশহাল দস্তখত মগজে দেয়ালি জ্বেলে দিন দুপুরেই। কী দরকার সর্বক্ষণ খাঁড়ার ছোয়ায় বেঁচে? নিজে বাঁচাল বাপের নাম। ঝুঁকিটুকি নিয়ে লাভ নেই, তার চেয়ে এসো অন্তত জলসাঘরে বিশুদ্ধ কবিতা নিয়ে মেতে সন্ধ্যেবেলা নিয়ত নরক গুলজার করি, মডকেও, বন্ধু, হেসে মরি।
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tinti-stobok/
5354
শামসুর রাহমান
হে শহর, হে অন্তরঙ্গ আমার
স্বদেশমূলক
হে শহর, হে প্রিয় শহর, হে অন্তরঙ্গ আমার, তুমি কি আমাকে পাঠাতে চাও বনবাসে? নইলে কেন এই উত্তেজনা তোমার সমগ্র সত্তা জুড়ে? কেন এই আয়োজন, দাঁতে-দাঁত-ঘষা আয়োজন প্রহরে প্রহরে? হে শহর, তুমি কি বাস্তবিকই নির্বাসন বরাদ্দ করেছ আমার জন্যে?হে শহর, হে প্রিয় শহর, হে মোহিনী আমার, দেখি এখন তুমি আমার চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারো কি না। এই তো আমি তোমাকে দেখছি পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে, তোমার চোখ কেন মাটিতে নিবদ্ধ? কেন এই অস্বস্তির দ্বিধা তোমার চোখে? তাহলে কি আমি বুঝে নেব যে তোমার চোখ আমাকে আর চাইছে না? তাহলে কি আমাকে একথা মেনে নিতে হবে যে, যে-তুমি আমার শৈশবকে চেটে চেটে বয়স্ক করেছ, যে-তুমি আমার যৌবনকে ঢেকে দিয়েছ রাশি রাশি কৃষ্ণচূড়ায়, যে-তুমি আমার চল্লিশোত্তর আমাকে শাণিত করেছ, সেই তুমি আমার বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছ মনে-মনে?হে শহর, হে আমার আপন শহর, তোমাকে ঘিরে আমার কিছু স্মৃতি কাননবালার মতো গান গায়। তোমার কি মনে পড়ে না একদা কী দিন রাত্রি ছিল আমার? আমি তোমার বুকে মাথা রেখে গলা ছেড়ে গান গাইতাম নির্দ্বিধায় প্রহরে প্রহরে। আমিই তো ছিলাম প্রথম আবিষ্কারক তোমার সৌন্দর্যের। তোমার সৌন্দর্যের শপথ, আমার আগে অন্য কেউই এমন মজেনি তোমার সৌন্দর্যে। তুমি কি ভুলে গেছ সেসব উথাল-পাথাল মুহূর্ত, যখন দু’পায়ে তুমি আমাকে আঁকড়ে ধরতে আর আমি তোমার স্পন্দিত স্তনে মুখ রেখে একটা মদির স্বপ্ন হয়ে যেতাম? আমার আঙুলের বাঁশি তোমার মাংসের স্তরে স্তরে সুর জাগিয়ে তুলত, তুমি কি ভুলে গেছ? তোমার কি মনে পড়ে না তোমার জন্যে কী অক্লান্ত ছুটে বেড়াতাম সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের দিকে, যেমন প্রাচীন গ্রিক দেবগণ পশ্চাদ্ধাবন করতেন সুন্দরীদের প্রান্তরে প্রান্তরে, বন-বনান্তরে? আহ্‌ কী দিন রাত্রি ছিল একদা আমার।তোমার কটিদেশে হিংস্রতার আস্ফালন দেখতে পাচ্ছি। তোমার আস্তিনের অন্ধকারে কোনো বাঘনখ লুকিয়ে নেই তো? তোমার ঝলমলে আংটির গহ্বরে ক’ফোঁটা কালো জহর জমা করে রেখেছ আমার জন্যে? তোমার মনের অলিগলিতে কোনো দুরভিসন্ধি নেই, এ-কথা আজ আমি জোরাল কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারছি কই?শহর, হে প্রিয় শহর আমার, হে বিশ্বাসঘাতিনী ইদানীং তুমি আমাকে বড় বেশি সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছ। তোমাকে নির্ভয়ে আলিঙ্গন করতে পারছি না আর, চুম্বন এঁকে দিতে পারছি না তোমার রক্তিম ওষ্ঠে- এ এক চরম শাস্তি যা আমাকে খাচ্ছে কেবলি। এই যে তোমার সঙ্গে কথা বলছি এই দারুণ আড়ালে, কে জানে কেউ আড়ি-পেতে শুনছে কিনা আমাদের এই কথাবার্তা! কে জানে ক’জন পঞ্চ ব্যঞ্জনপুষ্ট ঘাতক এখন তৈরি হচ্ছে গুপ্ত আস্তানায়,যেখানে মৃত্যু তার ভোগ নিতে আসে, যেখানে দাঁড়কাকের মতো কী একটা পাখা ঝাপটায় সর্বক্ষণ যেখানে হাজার হাজার মৃন্ময় বদনা নরমুন্ড হয়ে নাচে জ্যোৎস্নায়? ওরা কোনো যূপকাঠ নির্মাণ করছে কিনা ঘোর অমাবস্যায়, কে আমাকে বলে দেবে?বুকের রক্ত ঝরিয়ে যে-বাগান গড়ে তুলেছি দিনের পর দিন, তুমি তার প্রতিটি ইঞ্চি তছনছ করে দিয়েছ এক অন্ধ ক্রোধে। একদা যেসব সুন্দর উপহার তুলে দিয়েছিলে আমার হাতে, নিজের হাতেই তুমি আজ সেগুলি ছিনিয়ে নিতে চাও আবার? আমার বুকের মধ্যে যে রুপালি শহর জেগে থাকে তার আশ্চর্য কলরব নিয়ে, সেখানে তুমি পাথুরে স্তব্ধতা ছড়িয়ে দিতে চাও কিসের নেশায় হে শহর আমার, হে ভয়ংকর ভাস্কর?তোমার কাছে গোলাপ প্রার্থনা করে আমি নতজানু, তুমি কেন ক্যাকটাস ছুড়ে দাও? তোমার চোখে দেখছি ফলের সম্ভার, পোকাকীর্ণ শব, বিবাহবাসর, ঘাসঢাকা গোরস্থান, নবজাতকের তুলতুলে শরীর, বৃদ্ধের তোবড়ানো গাল, যুবকের মসৃণ চিবুক, মরা মাছ, উড়ন্ত মরাল, কংকালসার মহিষ, যুবতীর গ্রীবা, পোড়ো বাড়ি, সতেজ ডালিয়া আর লুটেরার লোভী হাত আর সন্তের চোখ,হে শহর, হে আমার আদরিণী বেড়াল, এ তোমার কেমন ঢঙ বলো তো? যেন তোমাকে আমরা খেতে দিইনি কোনো দিন সকালবেলার আলোর মতো দুধ,যেন তোমার নরম পশমে আঙুল ডুবিয়ে বসে থাকিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যেন তোমার চোখে চোখ রেখে বলিনি মনে রেখো!হে শহর, হে প্রিয় শহর, হে অন্তরঙ্গ আমার, তুমি কি সেই ভীষণ দলিলে সই করে ফেলেছ, যার প্রতাপে আমি কাঁদব দীর্ঘ পরবাসে? আমার সঙ্গে কোনো ছলাকলার প্রয়োজন নেই, তুমি অসংকোচে উচ্চারণ করতে পারো নিষ্ঠুরতম ঘোষণা- আমি রৌদ্রমাখা ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলে যাব প্রতিবাদহীন, কোনো অভিমানকে প্রশ্রয় না দিয়েই। তবে যাবার আগে আমি তোমার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপও দেখে নিতে চাই, হে বিশ্বাসঘাতিনী। আমি অপেক্ষা করব, তোমার নীলচক্ষু বৎসদের সকল খেলা গোধূলিতে মিলিয়ে গেলে, আমি তোমার ওষ্ঠে চুম্বন এঁকে সৌন্দর্যের ভিতরে মৃত্যু এবং মৃত্যুর ভিতরে সৌন্দর্য দেখে যাব, আমি সন্তের মতো অপেক্ষা করব উপবাসে দীর্ঘকাল।   (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/he-shohor-he-ontoronggo-amar/
3749
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোর কিছু ধন আছে সংসারে
প্রেমমূলক
মোর কিছু ধন আছে সংসারে, বাকি সব ধন স্বপনে নিভৃতস্বপনে। ওগো কোথা মোর আশার অতীত, ওগো কোথা তুমি পরশচকিত, কোথা গো স্বপনবিহারী। তুমি এসো এসো গভীর গোপনে, এসো গো নিবিড় নীরব চরণে বসনে প্রদীপ নিবারি, এসো গো গোপনে। মোর কিছু ধন আছে সংসারে বাকি সব আছে স্বপনে নিভৃত স্বপনে।রাজপথ দিয়ে আসিয়ো না তুমি, পথ ভরিয়াছে আলোকে প্রখর আলোকে। সবার অজানা, হে মোর বিদেশী, তোমারে না যেন দেখে প্রতিবেশী, হে মোর স্বপনবিহারী। তোমারে চিনিব প্রাণের পুলকে, চিনিব সজল আঁখির পলকে, চিনিব বিরলে নেহারি পরমপুলকে। এসো প্রদোষের ছায়াতল দিয়ে, এসো না পথের আলোকে প্রখরআলোকে।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mor-kichu-dhon-ache-songsare/
4414
শামসুর রাহমান
ইচ্ছে তাঁর ইচ্ছে
চিন্তামূলক
সূর্য আকাশে রৌদ্র ছড়ায়, দুপুরের রোদ বিকেলে গড়ায়, অনাবৃষ্টিতে শস্যের ক্ষেত জ্ব’লেপুড়ে যায় খালবিল সব নিমেষে শুকায়, -ইচ্ছে তাঁর ইচ্ছে।মারিতে মড়কে দেশ ছারখার, নব সংসারে ওঠে হাহাকার, মেঘচেরা রোদে বাতাসে নড়ছে গাছের ডালটা, -ইচ্ছে তাঁর ইচ্ছে।জীর্ণ দেয়ালে শুধু থেকে থেকে বেয়াড়া একটা কাক ওঠে ডেকে, চৌধুরীদের বউটা শরীরে জড়ায় আগুন ষোড়শীর মনে জ্বলছে ফাল্গুন -ইচ্ছে তাঁর ইচ্ছে।রাত্রি ফুরোলে জ্ব’লে ওঠে দিন বাঘের থাবায় মরছে হরিণ; কালবোশেখীর তাণ্ডবে কাঁপে পড়ো-পড়ো চাল শূন্য ভাঁড়ারে বাড়ন্ত চাল -ইচ্ছে তাঁর ইচ্ছে।বাতিল কেরানি চেয়ে নিয়ে ক্ষমা মৃত্যুতে খোঁজে ত্রাণে উপমা। ধ্বংসের মুখে গ্রাম আর কত নগর পোড়ালি, মুষড়ে পড়ল জুতোর গোড়ালি। -ইচ্ছে তাঁর ইচ্ছে।(রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/icche-tar-icche/
4745
শামসুর রাহমান
টাইরেসিয়াসের মতো
মানবতাবাদী
দোরগোড়ায় রোজ বসে থাকতো যে-লোকটা, আলো সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তার। কারণ, সে ছিল জন্মান্ধ। ফলত আরো অনেক কিছুর মতোই আলো নিয়ে সে কোনোদিন ওর কাঁচাপাকা চুল-ভর্তি মাথাটা ঘামায়নি। দোরগোড়ায় হামেশা বসতো লোকটা, কিন্তু কুঁড়েমি ওর ধাতস্থ হয়নি কস্মিনকালেও। ভোরবেলার আলো তার সত্তায় খেলা করতো, ওর জানা ছিল না। ভিক্ষা-টিক্ষা করার কথা আদৌ সে ভাবেনি, তাই ওর দশটি আঙুলের শ্রমশোভন নাচে বাঁশের কঞ্চিগুলো হয়ে উঠতো শিল্পসামগ্রী। এবং এতেই গরম থাকতো ওর উনুন।একদিন সমুদ্র গর্জনের মতো কী একটা ওর কানের ঘুলঘুলিতে আছড়ে পড়ে। চারদিক থেকে রব ওঠে- মিছিল, মিছিল। হঠাৎ বাঁশের চুব্‌ড়ি থেকে হাত সরিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে লোকটা। কী যেন ভাবে কিছুক্ষণ, তারপর লাঠি হাতে এগোতে থাকে সামনের দিকে জন্মন্ধ দৃষ্টি মেলে দিয়ে। তেজী মিছিল ওকে টেনে নিলো, যেমন সমুদ্র মিলনোম্মুখ নদীকে। লোকটা আর ফিরে আসেনি দোরগোড়ায়। হয়তো সে টাইরেসিয়াসের মতো একটা জ্যোতির্বলয় দেখতে পেয়েছিল সেই মিছিলে।  (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tairesiaser-moto/
5531
সুকান্ত ভট্টাচার্য
মেয়েদের পদবী
হাস্যরসাত্মক
মেয়েদের পদবীতে গোলমাল ভারী, অনেকের নামে তাই দেখি বাড়াবাড়ি; 'আ'কার অন্ত দিয়ে মহিলা করার চেষ্টা হাসির ৷ তাই ভূমিকা ছড়ার ৷ 'গুপ্ত' 'গুপ্তা' হয় মেয়েদের নামে, দেখেছি অনেক চিঠি, পোস্টকার্ড, খামে ৷ সে নিয়মে যদি আজ 'ঘোষ' হয় 'ঘোষা' তা হলে অনেক মেয়ে করবেই গোসা, 'পালিত' 'পালিতা' হলে 'পাল' হবে 'পালা' নির্ঘাত বাড়বেই মেয়েদের জ্বালা; 'মল্লিক' 'মল্লিকা' হলে 'দাস হলে 'দাসা' শোনাবে পদবীগুলো অতিশয় খাসা; 'কর' যদি 'করা' হয়, 'ধর' হয় 'ধরা' মেয়েরা দেখবে এই পৃথিবীটা- "সরা" ৷ 'নাগ' যদি 'নাগা' হয় 'সেন'  হয় 'সেনা' বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা ৷৷
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/post20160509112750/
5576
সুকুমার রায়
আশ্চর্য
হাস্যরসাত্মক
নিরীহ কলম, নিরীহ কালি, নিরীহ কাগজে লিখিল গালি-- "বাঁদর বেকুব আজব হাঁদা বকাট্‌ ফাজিল অকাট্‌ গাধা।" আবার লিখিল কলম ধরি বচন মিষ্টি, যতন করি-- "শান্ত মানিক শিষ্ট সাধু বাছারে, ধনরে লক্ষ্মী যাদু।" মনের কথাটি ছিলো যে মনে, রটিয়া উঠিল খাতার কোণে, আঁচরে আঁকিতে আখর ক'টি কেহ খুশি, কেহ উঠিল চটি! রকম রকম কালির টানে কারো কারো অশ্রু আনে, মারে না, ধরে না, হাঁকে না বুলি লোকে হাসে কাঁদে কি দেখি ভুলি? শাদায় কালোয় কি খেলা জানে? ভাবিয়া ভাবিয়া না পাই মানে।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/ashchorjo/
710
জয় গোস্বামী
বাদুড় বৃষ্টির মধ্যে দেবদারু গাছ ছেড়ে যায়
রূপক
বাদুড় বৃষ্টির মধ্যে দেবদারু গাছ ছেড়ে যায় বাদুড় আমার রক্ত খেয়ে আকাশে পালায় পালিয়ে বাঁচে না রাত্রে দেখা যায় বাদুড় চাঁদের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়ে পেট থেকে রক্ত, রক্ত নয়, বালি ওগরায়
https://banglarkobita.com/poem/famous/1751
1283
জীবনানন্দ দাশ
হেমন্তের রাতে
চিন্তামূলক
শীতের ঘুমের থেকে এখন বিদায় নিয়ে বাহিরের অন্ধকার রাতে হেমন্তলক্ষ্মীর সব শেষ অনিকেত অবছায়া তারাদের সমাবেশ থেকে চোখ নামায়ে একটি পাখির ঘুম কাছে পাখিনীর বুকে ডুবে আছে,– চেয়ে দেখি;– তাদের উপরে এই অবিরল কালো পৃথিবীর আলো আর ছায়া খেলে–মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়। এ ছাড়া অধিক কোনো নিশ্চয়তা নির্জন্তা জীবনের পথে আমাদের মানবীয় ইতিহাস চেতনায়ও নেই;– (তবু আছে।) এমনই অঘ্রাণ রাতে মনে পড়ে–কত সব ধূসর বাড়ির আমলকীপল্লবের ফাঁক দিয়ে নক্ষত্রের ভিড় পৃথিবীর তীরে–তীরে ধূসরিম মহিলার নিকটে সন্নত দাঁড়ায়ে রয়েছে কত মানবের বাষ্পাকুল প্রতীকের মতো– দেখা যেত; এক আধ মহূর্ত শুধু;– সে অভিনিবেশ ভেঙ্গে ফেলে সময়ের সমুদ্রের রক্ত ঘ্রাণ পাওয়া গেল;– ভীতিশব্দ রীতিশব্দ মুক্তিশব্দ এসে আরো ঢের পটভূমিকার দিকে দিগন্তের ক্রমে মানবকে ডেকে নিয়ে চ’লে গেল প্রেমিকের মতো সসম্ভ্রমে; তবুও সে প্রেম নয়, সুধা নয়,– মানুষের ক্লান্ত অন্তহীন ইতিহাস–আকুতির প্রবীণতা ক্রমায়াত ক’রে সে বিলীন?আজ এই শতাব্দীতে সকলেরি জীবনের হৈমন্ত সৈকতে বালির উপরে ভেসে আমাদের চিন্তা কাজ সংকল্পের তরঙ্গকঙ্কাল দ্বীপসমুদ্রের মতো অস্পষ্ট বিলাপ ক’রে তোমাকে আমাকে অন্তহীন দ্বীপহীনতার দিকে অন্ধকারে ডাকে। কেবলি কল্লোল আলো–জ্ঞান প্রম পূর্ণত্র মানবহৃদয় সনাতন মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে– তবু– ঊনিশ শো অনন্তের জয়হয় যেতে পারে, নারি, আমাদের শতাব্দীর দীর্ঘতর চেতনার কাছে আমরা সজ্ঞান হয়ে বেঁচে থেকে বড়ো সময়ের সাগরের কূলে ফিরে আমাদের পৃথিবীকে যদি প্রিয়তর মনে করি প্রিয়তম মৃত্যু অবধি;– সকল আলোর কাজ বিষণ্ন জেনেও তবু কাজ ক’রে– গানে গেয়ে লোকসাধারণ ক’রে দিতে পারি যদি আলোকের মানে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/hemonter-ratey/
5865
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সারাটা জীবন
প্রেমমূলক
আমাকে দিও না শাস্তি, শিয়রের কাছে কেন এত নীল জল কোথাও বোঝার ভুল ছিল, তাই ঝড় এলো সন্ধের আকাশে আমাকে দিও না শাস্তি, কেন ফেলে চলে গেলে অসমাপ্ত বই চতুর্দিকে এত শব্দ, শব্দ গিরিবর্তে ঝোলে অদ্ভূত শূন্যতা আকাশের গায়ে গায়ে কালো তাঁবু, জগতের সব দীন দুঃখী শুয়ে আছে একজন শুধু বাইরে, তুমি তার একাকিত্ব তুলে নাও মরাল গ্রীবার মতো হাতে আমাকে দিও না শাস্তি, নীরা, দাও বাল্য-প্রেমিকার স্নেহ, সারাটা জীবন আমি অবাধ্য শিশুর মতো প্রশ্রয় ভিখারী!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1818
5069
শামসুর রাহমান
ভিন্ন জীবন উঠলো নেচে
মানবতাবাদী
একটি দ্বীপের অধিবাসী অষ্টপ্রহর অন্ধকারে ডুবে থাকে। যায় না দেখা কোনও কালে তাদের কিংবা অন্য কারও দেহের ছায়া। ভুলেও কেউ আসে না সেই দ্বীপের তীরে।মাঝে-মধ্যে দ্বীপবাসীরা হাওয়ার ছন্দে নেচে ওঠে, ওদের গানের তালে তালে ফুলের, ফলের গাছেরা সব দুলতে থাকে- যেন ভীষণ মাতাল ওরা, লুটবে ধুলোয়।দ্বীপবাসীদের মধ্যে ক’জন ছিলো বটে খুব আলাদা। অন্যেরা সব নেশায় ডুবে থাকলে ওরা থাকতো দ্বীপের বাইরে কোনও আলোকিত দ্বীপের খোঁজে যাবার জন্যে নৌকো তৈরি ক’রে কোথাও পৌঁছে যেতে।ভাবলো ওরা তারা যদি আলসেমিকে আঁকড়ে থাকে, তাহ’লে আর মুক্তি ওদের হবে নাকো কোনও কালে। ক’দিন পরে নৌকো বাগে পেয়ে গেলে আলাদা সেই দ্বীপবাসীরা ডিঙি ভাসায় সমুদ্দুরে।চলন্ত সেই নৌকো থেকে ভিন্ন ধাতের ক’জন দ্যাখে, অবাক, একি! ওই তো দূরের আকাশ থেকে ঝরছে আলো একটি দ্বীপে! আঁধার-ভরা দ্বীপের ক’জন হাসলো শেষে।আলোকিত দ্বীপে সবাই নাও ভিড়ালো, নামলো তীরে, বাঁধলো ডেরা নতুন ছাঁদে। আলোর চুমোয় ওরা সবাই হলো বিভোর। ভিন্ন জীবন উঠলো নেচে।   (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/vinno-jibon-uthlo-neche/
2676
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজু সখি মুহু মুহু
প্রেমমূলক
আজু সখি , মুহু মুহু গাহে পিক কুহু কুহু , কুঞ্জবনে দুঁহু দুঁহু দোঁহার পানে চায় । যুবনমদবিলসিত পুলকে হিয়া উলসিত , অবশ তনু অলসিত মূরছি জনু যায় । আজু মধু চাঁদনী প্রাণউনমাদনী , শিথিল সব বাঁধনী , শিথিল ভই লাজ । বচন মৃদু মরমর, কাঁপে রিঝ থরথর , শিহরে তনু জরজর কুসুমবনমাঝ । মলয় মৃদু কলয়িছে , চরণ নহি চলয়িছে , বচন মুহু খলয়িছে , অঞ্চল লুটায় । আধফুট শতদল বায়ুভরে টলমল আঁখি জনু ঢলঢল চাহিতে নাহি চায় । অলকে ফুল কাঁপয়ি কপোলে পড়ে ঝাঁপয়ি , মধু-অনলে তাপয়ি , খসয়ি পড়ু পায় । ঝরই শিরে ফুলদল , যমুনা বহে কলকল , হাসে শশি ঢলঢল — ভানু মরি যায় ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/aju-sake-muhu-muhu/
4030
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হালকা আমার স্বভাব
চিন্তামূলক
হালকা আমার স্বভাব, মেঘের মতো না হোক গিরিনদীর মতো। আমার মধ্যে হাসির কলরব আজও থামল না। বেদীর থেকে নেমে আসি, রঙ্গমঞ্চে বসে বাঁধি নাচের গান, তার বায়না নিয়েছি প্রভুর কাছে। কবিতা লিখি, তার পদে পদে ছন্দের ভঙ্গিমায় তারুণ্য ওঠে মুখর হয়ে, ঝিঁঝিট খাম্বাজের ঝংকার দিতে আজো সে সংকোচ করে না। আমি সৃষ্টিকর্তা পিতামহের রহস্য-সখা। তিনি অর্বাচীন নবীনদের কাছে প্রবীণ বয়সের প্রমাণ দিতে ভুলেই গেছেন। তরুণের উচ্ছৃঙ্খল হাসিতে উতরোল তাঁর কৌতুক, তাদের উদ্দাম নৃত্যে বাজান তিনি দ্রুততালের মৃদঙ্গ। তাঁর বজ্রমন্দিত গাম্ভীর্য মেঘমেদুর অম্বরে, অজস্র তাঁর পরিহাস বিকশিত কাশবনে, শরতের অকারণ হাস্যহিল্লোলে। তাঁর কোনো লোভ নেই প্রধানদের কাছে মর্যাদা পাবার; তাড়াতাড়ি কালো পাথর চাপা দেন না চাপল্যের ঝরনার মুখে। তাঁর বেলাভূমিতে ভঙ্গুর সৈকতের ছেলেমানুষি প্রতিবাদ করে না সমুদ্রের। আমাকে চান টেনে রাখতে তাঁর বয়স্যদলে, তাই আমার বার্ধক্যের শিরোপা হঠাৎ নেন কেড়ে ফেলে দেন ধুলোয়-- তার উপর দিয়ে নেচে নেচে চলে যায় বৈরাগী পাঁচ রঙের তালি-দেওয়া আলখাল্লা পরে। যারা আমার মূল্য বাড়াতে চায়, পরায় আমাকে দামি সাজ, তাদের দিকে চেয়ে তিনি ওঠেন হেসে, ও সাজ আর টিঁকতে পায় না আনমনার অনবধানে। আমাকে তিনি চেয়েছেন নিজের অবারিত মজলিসে, তাই ভেবেছি যাবার বেলায় যাব মান খুইয়ে, কপালের তিলক মুছে, কৌতুকে রসোল্লাসে। এস আমার অমানী বন্ধুরা মন্দিরা বাজিয়ে-- তোমাদের ধুলোমাখা পায়ে যদি ঘুঙুর বাঁধা থাকে লজ্জা পাব না।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/halka-amar-subab/
1307
তসলিমা নাসরিন
এমন
প্রেমমূলক
কী হচ্ছে আমার এসব! যেন তুমি ছাড়া জগতে কোনও মানুষ নেই, কোনও কবি নেই, কোনও পুরুষ নেই, কোনও প্রেমিক নেই, কোনও হৃদয় নেই! আমার বুঝি খুব মন বসছে সংসারকাজে? বুঝি মন বসছে লেখায় পড়ায়? আমার বুঝি ইচ্ছে হচ্ছে হাজারটা পড়ে থাকা কাজগুলোর দিকে তাকাতে? সভা সমিতিতে যেতে? অনেক হয়েছে ওসব, এবার অন্য কিছু হোক, অন্য কিছুতে মন পড়ে থাক, অন্য কিছু অমল আনন্দ দিক। মন নিয়েই যত ঝামেলা আসলে, মন কোনও একটা জায়গায় পড়ে রইলো তো পড়েই রইল। মনটাকে নিয়ে অন্য কোথাও বসন্তের রঙের মত যে ছিটিয়ে দেব, তা হয় না। সবারই হয়ত সবকিছু হয় না, আমার যা হয় না তা হয় না।তুমি কাল জাগালে, গভীর রাত্তিরে ঘুম থেকে তুলে প্রেমের কথা শোনালে, মনে হয়েছিল যেন স্বপ্ন দেখছি স্বপ্নই তো, এ তো একরকম স্বপ্নই, আমাকে কেউ এমন করে ভালোবাসার কথা বলেনি আগে, ঘুমের মেয়েকে এভাবে জাগিয়ে কেউ চুমু খেতে চায়নি আমাকে এত আশ্চর্য সুন্দর শব্দগুচ্ছ কেউ শোনায়নি কোনওদিন এত প্রেম কেউ দেয়নি, এমন ভেঙে চুরে ভালো কেউ বাসেনি। তুমি এত প্রেমিক কী করে হলে! কী করে এত বড় প্রেমিক হলে তুমি? এত প্রেম কেন জানো? শেখালো কে? যে রকম প্রেম পাওয়ার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করেছি, স্বপ্ন দেখেছি, পাইনি আর এই শেষ বয়সে এসে যখন এই শরীর খেয়ে নিচ্ছে একশ একটা অসুখ-পোকা যখন মরে যাবো, যখন মরে যাচ্ছি — তখন যদি থোকা থোকা প্রেম এসে ঘর ভরিয়ে দেয়, মন ভরিয়ে দেয়, তখন সবকিছুকে স্বপ্নই তো মনে হবে, স্বপ্নই মনে হয়। তোমাকে অনেক সময় রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয় না, হঠাৎ ঝড়ে উড়ে হৃদয়ের উঠোনে যেন অনেক প্রত্যাশিত অনেক কালের দেখা স্বপ্ন এসে দাঁড়ালে। আগে কখনও আমার মনে হয়নি ঘুম থেকে অমন আচমকা জেগে উঠতে আমি আসলে খুব ভালোবাসি আগে কখনও আমার মনে হয়নি কিছু উষ্ণ শব্দ আমার শীতলতাকে একেবারে পাহাড়ের চুড়োয় পাঠিয়ে দিতে পারে আগে কখনও আমি জানিনি যে কিছু মোহন শব্দের গায়ে চুমু খেতে খেতে আমি রাতকে ভোর করতে পারি।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%ae%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a7%87%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a7%87-%e0%a6%9a%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%8b-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%89-%e0%a6%ac/
5497
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পৃথিবীর দিকে তাকাও
মানবতাবাদী
দেখ, এই মোটা লোকটাকে দেখ অভাব জানে না লোকটা, যা কিছু পায় সে আঁকড়িয়ে ধরে লোভে জ্বলে তার চোখটা। মাথা উঁচু করা প্রাসাদের সারি পাথরে তৈরি সব তার, কত সুন্দর, পুরোনো এগুলো! অট্রালিকা এ লোকটার। উঁচু মাথা তার আকাশ ছুঁয়েছে চেয়ে দেখে না সে নীচুতে, কত জামির যে মালিক লোকটা বুঝবে না তুমি কিছুতে। দেখ, চিমনীরা কী ধোঁয়া ছাড়ছে কলে আর কারখানাতে, মেশিনের কপিকলের শব্দ শোনো, সবাইকে জানাতে। মজুরেরা দ্রুত খেটেই চলেছে- খেটে খেটে হল হন্যে ; ধনদৌলত বাড়িয়ে তুলছে মোটা প্রভুটির জন্যে। দেখ একজন মজুরকে দেখ ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটছে, কেনা গোলামের মতই খাটুনি তাই হাড়ভাঙা খাটছে। ভাঙা ঘর তার নীচু ও আঁধার স্যাঁতসেঁতে আর ভিজে তা, এর সঙ্গে কি তুলনা করবে প্রাসাদ বিশ্ব-বিজেতা? কুঁড়েঘরের মা সারাদিন খাটে কাজ করে সারা বেলা এ, পরের বাড়িতে ধোয়া মোছা কাজ- বাকিটা পোষায় সেলায়ে। তবুও ভাঁড়ার শূন্যই থাকে, থাকে বাড়ন্ত ঘরে চাল, বাচ্চা ছেলেরা উপবাস করে এমনি করেই কাটে কাল। বাবু যত তারা মজুরকে তাড়া করে চোখে চোখে রাখে, ঘোঁৎ ঘোঁৎ ক’রে মজুরকে ধরে দোকানে যাওয়ার ফাঁকে। খাওয়ার সময় ভোঁ বাজলে তারা ছুটে আসে পালে পাল, খায় শুধু কড়কড়ে ভাত আর হয়তো একটু ডাল। কম-মজুরির দিন ঘুরে এলে খাদ্য কিনতে গিয়ে দেখে এ টাকায় কিছুই হয় না, বসে গালে হাত দিয়ে। পুরুত শেখায়, ভগবানই জেনো প্রভু (সুতরাং চুপ; কথা বলবে না কভু) সকলেরই প্রভু- ভালো আর খারাপের তাঁরই ইচ্ছায় এ; চুপ করো সব ফের। শিক্ষক বলে, শোন সব এই দিকে, চালাকি ক’রো না, ভালো কথা যাও শিখে। এদের কথায় ভরসা হয় না তবু? সরে এসো তবে, দেখ সত্যি কে প্রভু। ফ্যাকাশে শিশুরা, মুখে শাস্তির ভীতি, আগের মতোই মেনে চলে সব নীতি। যদি মজুরেরা কখনো লড়তে চায় পুলিশ প্রহারে জেলে টেনে নিয়ে যায়। মজুরের শেষ লড়াইয়ের নেতা যত এলোমেলো সব মিলায় ইতস্তত- কারাপ্রাচীরের অন্ধকারের পাশে। সেখানেও স্বাধীনতার বার্তা আসে। রাশিয়াই, শুধু রাশিয়া মহান্ দেশ, যেখানে হয়েছে গোলামির দিন শেষ; রাশিয়া, যেখানে মজুরের আজ জয়, লেনিন গড়েছে রাশিয়া! কী বিস্ময়! রাশিয়া যেখানে ন্যায়ের রাজ্য স্থায়ী, নিষ্ঠুর ‘জার’ যেই দেশে ধরাশায়ী, সোভিয়েট-‘তারা’ যেখানে দিচ্ছে আলো, প্রিয়তম সেই মজুরের দেশ ভালো। মজুরের দেশ, কল-কারখানা, প্রাসাদ, নগর, গ্রাম, মজুরের খাওয়া মজুরের হাওয়া, শুধু মজুরের নাম। মজুরের ছুটি, বিশ্রাম আর গরমে সাগর-ধার, মজুরের কত স্বাধীনতা! আর অজস্র অধিকার। মজুরের ছেলে ইস্কুলে যায় জ্ঞানের পিপাসা নিয়ে, ছোট ছোট মন ভরে নেয় শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে। মজুরের সেনা ‘লাল ফৌজ’ দেয় পাহারা দিন ও রাত, গরীবের দেশে সইবে না তারা বড়লোকদের হাত। শান্ত-স্নিগ্ধ, বিবাদ-বিহীন জীবন সেখানে, তাই সকলেই সুখে বাস করে আর সকলেই ভাই-ভাই; এক মনেপ্রাণে কাজ করে তারা বাঁচাতে মাতৃভূমি, তোমার জন্যে আমি, সেই দেশে, আমার জন্যে তুমি।।   (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/prithibir-dike-takao/
5505
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বিদ্রোহের গান
মানবতাবাদী
বেজে উঠল কি সময়ের ঘড়ি? এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি, আমরা সবাই যে যার প্রহরী উঠুক ডাক। উঠুক তুফান মাটিতে পাহাড়ে জ্বলুক আগুন গরিবের হাড়ে কোটি করাঘাত পৌঁছোক দ্বারে ভীরুরা থাক। মানবো না বাধা, মানবো না ক্ষতি, চোখে যুদ্ধের দৃঢ় সম্মতি রুখবে কে আর এ অগ্রগতি, সাধ্য কার? রুটি দেবে নাকো? দেবে না অন্ন? এ লড়াইয়ে তুমি নও প্রসন্ন? চোখ-রাঙানিকে করি না গণ্য ধারি না ধার। খ্যাতির মুখেতে পদাঘাত করি, গড়ি, আমরা যে বিদ্রোহ গড়ি, ছিঁড়ি দুহাতের শৃঙ্খলদড়ি, মৃত্যুপণ। দিক থেকে দিকে বিদ্রোহ ছোটে, বসে থাকবার বেলা নেই মোটে, রক্তে রক্তে লাল হয়ে ওঠে পূর্বকোণ। ছিঁড়ি, গোলামির দলিলকে ছিঁড়ি, বেপরোয়াদের দলে গিয়ে ভিড়ি খুঁজি কোনখানে স্বর্গের সিঁড়ি, কোথায় প্রাণ! দেখব, ওপারে আজো আছে কারা, খসাব আঘাতে আকাশের তারা, সারা দুনিয়াকে দেব শেষ নাড়া, ছড়াব দান। জানি রক্তের পেছনে ডাকবে সুখের বান।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1094
2238
মহাদেব সাহা
মানুষের মধ্যে কিছু অভিমান থাকে
চিন্তামূলক
সব মানুষেরই মধ্যে কিছু অভিমান থাকে, এইটুকু থাক, এইটুকু থাকা ভালো এই অভিমান জমে জমে মানুষের বুকে হবে নক্ষত্রের জল। মমতা মমতা বলো অভিমান তারই তো আকার তারই সে চোখের আঠালো টিপ, জড়োয়া কাতান, মমতা মমতা বলো অভিমান তারই একনাম একদিন অভিমান জমে জমে সব বুকে স্বর্ণখনি হবে ; মানুষের মধ্যে কিছু অভিমান থাকে, চোখের ভিতরে থাকে, হৃৎপিণ্ডে থাকে তাহাকেই গোপনতা বলে, মানুষের মধ্যে আরো মানুষের অবস্থান বলে, কেউ কেউ ইহাকেই মানুষের বিচ্ছিন্নতা বলে আমি তা বলি না আমি বলি অভিমান, মানুষের প্রতি মানুষের শুধু অভিমান, আর কিছু নয়, এই অভিমানই একদিন মানুষকে পরস্পর কাছে এনে দেবে। সব মানুষেরই মধ্যে কিছু অভিমান থাকে অভিমান থাকা ভলো, এইটুকু থাক, একটি নারীর প্রতি পুরুষের স্বাভাবিক অভিমান থাক, শিশুদের প্রতি থাক, গোলাপের প্রতি এই অভিমান থাক নারী ও গোলাপ এই একটি শব্দের প্রতি মানুষের সনাতন অভিমান থাক, সব মানুষের মধ্যে কিছু অভিমান থাকে, সেইটুকু থাক।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1460
3303
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নাম তার সন্তোষ
হাস্যরসাত্মক
নাম তার সন্তোষ, জঠরে অগ্নিদোষ, হাওয়া খেতে গেল সে পচম্বা। নাকছাবি দিয়ে নাকে বাঘনাপাড়ায় থাকে বউ তার বেঁটে জগদম্বা। ডাক্তার গ্রেগ্‌সন দিল ইনজেক্‌শন– দেহ হল সাত ফুট লম্বা। এত বাড়াবাড়ি দেখে সন্তোষ কহে হেঁকে, “অপমান সহিব কথম্‌ বা। শুন ডাক্তার ভায়া, উঁচু করো মোর পায়া, স্ত্রীর কাছে কেন রব কম বা। খড়ম জোড়ায় ঘষে ওষুধ লাগাও কষে– শুনে ডাক্তার হতভম্বা।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nam-tar-sontosh/
5593
সুকুমার রায়
কুম্‌ড়োপটাশ
হাস্যরসাত্মক
(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ নাচে— খবরদার এসো না কেউ আস্তাবলের কাছে; চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে; চার পা তুলে থাকবে ঝুলে হট্টমূলার গাছে!(যদি) কুম্‌ড়োপটাশ কাঁদে— খবরদার! খবরদার! বসবে না কেউ ছাদে; উপুড় হয়ে মাচায় শুয়ে লেপ কম্বল কাঁধে; বেহাগ সুরে গাইবে খালি ‘রাধে কৃষ্ণ রাধে’!   (যদি) কুম্‌ড়োপটাশ হাসে— থাকবে খাড়া একটি ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে; ঝাপ্‌সা গলায় ফার্সি কবে নিশ্বাসে ফিস্‌ফাসে; তিনটি বেলায় উপোশ করে থাকবে শুয়ে ঘাসে! (যদি) কুম্‌ড়োপটাশ ছোটে— সবাই যেন তড়বড়িয়ে জানলা বেয়ে ওঠে; হুঁকোর জলে আলতা গুলে লাগায় গালে ঠোঁটে; ভুলেও যেন আকাশ পানে তাকায় না কেউ মোটে!   (যদি) কুম্‌ড়োপটাশ ডাকে— সবাই যেন শাম্‌লা এঁটে গামলা চড়ে থাকে; ছেঁচকি শাকের ঘন্ট বেটে মাথায় মলম মাখে; শক্ত ইঁটের তপ্ত ঝামা ঘষতে থাকে নাকে!তুচ্ছ ভেবে এ‐সব কথা করছে যারা হেলা, কুম্‌ড়োপটাশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা। দেখবে তখন কোন কথাটি কেমন করে ফলে, আমায় তখন দোষ দিও না, আগেই রাখি বলে।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/kumropotash/
2039
মলয় রায়চৌধুরী
মেলাপুরুষ
মানবতাবাদী
মাগগি গণ্ডার দিনে পাইকারি হারে খুন হল কি হল না গুদামঘরের ছাদ ভেঙে কে রে গদি টানাটানি করে সে ফেরারি গৃহবধু যোনিতে কুলুপ এঁটে ঋণমেলা থেকে নোনা বালি লিঙ্গ পেয়েছিল সুদ জরিমানা মিলে স্পর্শকাতর আদালতে মুদ্দোফরাস এসে লাশটাকে চুমু খেয়ে স্বাগত জানালে জিপ খুলে বললেন উঁহুহু চলবে না বিগ্রহ ধুলোয় তৈরি নামাব কোথায় আপনি তো জানেনই ভালো গুখোর কাকেরা বড়ো বস্তুনিষ্ঠ খাদির বাকলে বুড়ো বটবৃক্ষের ডাল খোঁজে কেননা কেননা পার্টি না বললে পরে এত্তেলা লেখা চলবে না বরঞ্চ আমাদের দেখভালে থাকো আমাদের এদিকটায় শিরদাঁড়া ঘিরে মোম সবায়ের ঝরে নারীর গন্ধটুকু রেখে নিয়ে ধোপারা ফেরত দ্যায় শাড়ি লাঙলে নিজের ছায়া ফেড়ে ফ্যালে চাষি এমন মরদ গেঁড়ে চোখে লোলুপতা নেই হৃদয়ে রিরংসা নেই লিঙ্গ বহুচারী নয় তার মানে যে কলঙ্ক থাকলে মেধা বীর্যবান তেমন পুরুষ নেই এ তল্লাটে ফুঃ ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৫
https://banglarkobita.com/poem/famous/1149
1530
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
অন্তিম শ্রাবণসন্ধ্যা
প্রকৃতিমূলক
বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু বাতাসে জলের গন্ধ রয়েছে এখনও। আকাশের ভাবগতিক দেখে মনে হয়, খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে সে আবার কাজে লেগে যাবে। পাখিরা তা জানে, তাই কোনো উৎসাহ তাদেরও নেই এই মুহূর্তে ডানা ছড়াবার। দিকচিহ্নহীন যে-বিশ্বে রঙের স্পর্শ এতক্ষণ কোথাও ছিল না, মেঘের আড়াল থেকে সূর্যদেব বিদায়ের ক্ষণে সেখানে সামান্য রঙ ছড়িয়ে দিলেন। জানালায় বসে দেখি শেষ হল আরও একটি দিন অন্তিম শ্রাবণে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1546
1664
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
মাঠের
প্রকৃতিমূলক
অন্যমনে যেতে যেতে হঠাৎ যদি মাঠের মধ্যে দাঁড়াই, হঠাৎ যদি তাকাই পিছন দিকে, হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে বিকেলবেলার নদীটিকে।ও নদী, ও রহস্যময় নদী, অন্ধকারে হারিয়ে যাসনে, একটু দাঁড়া; এই যে একটু-একটু আলো, এই যে ছায়া ফিকে-ফিকে, এরই মধ্যে দেখে নেব সন্ধ্যাবেলার প্রথম তারাটিকে।ও তারা, ও রহস্যময় তারা, একটু আলো জ্বালিয়ে ধর, দেখে রাখি আকাশী কোন্ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে যায় দিকে-দিকে, দেখে রাখি অন্ধকারে উড়ন্ত ওই ক্লান্ত পাখিটিকে।ও পাখি, ও রহস্যময় পাখি। হারিয়ে গেল আকাশ-মাটি, কান্না-পাওয়া এ কী করুণ সন্ধ্যা! এ কোন্ হাওয়া লেগে অন্ধকারে অদৃশ্য ওই নদীর দুঃখ হঠাৎ উঠল জেগে। ও হাওয়া, ও রহস্যময় হাওয়া!
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a0%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0/
5451
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কলম
মানবতাবাদী
কলম, তুমি কত না যুগ কত না কাল ধ'রে অক্ষরে অক্ষরে গিয়েছ শুধু ক্লান্তিহীন কাহিনী শুরু ক'রে। কলম, তুমি কাহিনী লেখো, তোমার কাহিনী কি দুঃখে জ্বলে তলোয়ারের মতন ঝিকিমিকি? কলম, তুমি শুধু বারংবার, আনত ক'রে ক্লান্ত ঘাড় গিয়েছ লিখে স্বপ্ন আর পুরনো কত কথা, সাহিত্যের দাসত্বের ক্ষুদিত বশ্যতা। ভগ্ন নিব, রুগ্ন দেহ, জলের মতো কালি, কলম, তুমি নিরপরাদ তবুও গালাগালি খেয়েছ আর সয়েছ কত লেখকদের ঘৃণা, কলম, তুমি চেষ্টা কর, দাঁড়াতে পার কি না। হে কলম! তুমি ইতিহাস গিয়েছ লিখে লিখে লিখে শুধু ছড়িয়ে দিয়েছ চতুর্দিকে। তবু ইতিহাস মূল্য দেবে না, এতটুকু কোন দেবে না তোমায়, জেনো ইতিহাস বড়ই কৃপণ; কত লাঞ্ছনা, খাটুনি গিয়েছে লেখকের হাতে ঘুমহীন চোখে অবিশ্রান্ত অজস্র রাতে। তোমার গোপন অশ্রু তাইতো ফসল ফলায় বহু সাহিত্য বহু কাব্যের বুকের তলায়। তবু দেখ বোধ নেই লেখকের কৃতজ্ঞতা, কেন চলবে এ প্রভুর খেয়ালে, লিখবে কথা? হে কলম! হে লেখনী! আর কত দিন ঘর্ষণে ঘর্ষণে হবে ক্ষীণ? আর কত মৌন-মূক, শব্দহীন দ্বিধান্বিত বুকে কালির কলঙ্ক চিহ্ন রেখে দেবে মুখে? আর কত আর কাটবে দুঃসহ দিন দুর্বার লজ্জার? এই দাসত্ব ঘুচে যাক, এ কলঙ্ক মুছে যাক আজ, কাজ কর- কাজ। মজুর দেখ নি তুমি? হে কলম, দেখ নি বেকার? বিদ্রোহ দেখ নি তুমি? রক্তে কিছু পাও নি শেখার? কত না শতাব্দী, যুগ থেকে তুমি আজো আছ দাস, প্রত্যেক লেখায় শুনি কেবল তোমার দীর্ঘশ্বাস! দিন নেই, রাত্রি নেই, শ্রান্তিহীন, নেই কোনো ছুটি, একটু অবাধ্য হলে তখুনি ভ্রূকুটি; এমনি করেই কাটে দুর্ভাগা তোমার বারো মাস, কয়েকটি পয়সায় কেনা, হে কলম, তুমি ক্রীতদাস। তাই যত লেখ, তত পরিশ্রম এসে হয় জড়োঃ -কলম! বিদ্রোহ আজ! দল বেঁধে ধর্মঘট করো। লেখক স্তম্ভিত হোক, কেরানীরা ছেড়ে দিক হাঁফ, মহাজনী বন্ধ হোক, বন্ধ হোক মজুরের পাপ; উদ্বেগ-আকুল হোক প্রিয়া যত দূর দূর দেশে, কলম! বিদ্রোহ আজ, ধর্মঘট, হোক অবশেষে; আর কালো কালি নয়, রক্তে আজ ইতিহাস লিখে দেওয়ালে দেওয়ালে এঁটে, হে কলম, আনো দিকে দিকে।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/256
5992
হুমায়ুন আজাদ
ভালো থেকো
প্রকৃতিমূলক
ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো। ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো। ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা। ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা। ভালো থেকো। ভালো থেকো চর, ছোট কুড়ে ঘর, ভালো থেকো। ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো। ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির। ভালো থেকো জল, নদীটির তীর। ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো। ভালো থেকো কাক, কুহুকের ডাক, ভালো থেকো। ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাশিঁ। ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি। ভালো থেকো আম, ছায়া ঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো। ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো। ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল, ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল, ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাও,ভালো থেকো। ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো। ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।
https://banglarkobita.com/poem/famous/509
6014
হেলাল হাফিজ
অমিমাংসিত সন্ধি
প্রেমমূলক
তোমাকে শুধু তোমাকে চাই, পাবো? পাই বা না পাই এক জীবনে তোমার কাছেই যাবো। ইচ্ছে হলে দেখতে দিও, দেখো হাত বাড়িয়ে হাত চেয়েছি রাখতে দিও, রেখো অপূণতায় নষ্টে-কষ্টে গেলো এতোটা কাল, আজকে যদি মাতাল জোয়ার এলো এসো দু’জন প্লাবিত হই প্রেমে নিরাভরণ সখ্য হবে যুগল-স্নানে নেমে। থাকবো ব্যাকুল শর্তবিহীন নত পরস্পরের বুকের কাছে মুগ্ধ অভিভূত। ১০.৩.৮২
https://banglarkobita.com/poem/famous/86
3628
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বৃষ্টি রৌদ্র
ছড়া
ঝুঁটি - বাঁধা ডাকাত সেজে দল বেঁধে মেঘ চলেছে যে আজকে সারাবেলা । কালো ঝাঁপির মধ্যে ভরে সুর্যিকে নেয় চুরি করে , ভয় - দেখাবার খেলা । বাতাস তাদের ধরতে মিছে হাঁপিয়ে ছোটে পিছে পিছে , যায় না তাদের ধরা । আজ যেন ওই জড়োসড়ো আকাশ জুড়ে মস্ত বড়ো মন - কেমন - করা । বটের ডালে ডানা - ভিজে কাক বসে ওই ভাবছে কী যে , চড়ুইগুলো চুপ । বৃষ্টি হয়ে গেছে ভোরে শজনেপাতায় ঝরে ঝরে জল পড়ে টুপটুপ । লেজের মধ্যে মাথা থুয়ে খাঁদন কুকুর আছে শুয়ে কেমন একরকম । দালানটাতে ঘুরে ঘুরে পায়রাগুলো কাঁদন - সুরে ডাকছে বকবকম । কার্তিকে ওই ধানের খেতে ভিজে হাওয়া উঠল মেতে সবুজ ঢেউয়ের ‘পরে । পরশ লেগে দিশে দিশে হিহি করে ধানের শিষে শীতের কাঁপন ধরে । ঘোষাল - পাড়ার লক্ষ্মী বুড়ি ছেঁড়া কাঁথায় মুড়িসুড়ি গেছে পুকুরপাড়ে , দেখতে ভালো পায় না চোখে বিড়বিড়িয়ে বকে বকে শাক তোলে , ঘাড় নাড়ে । ঐ ঝমাঝম বৃষ্টি নামে মাঠের পারে দূরের গ্রামে ঝাপসা বাঁশের বন । গোরুটা কার থেকে থেকে খোঁটায় - বাঁধা উঠছে ডেকে ভিজছে সারাক্ষণ । গদাই কুমোর অনেক ভোরে সাজিয়ে নিয়ে উঁচু ক'রে হাঁড়ির উপর হাঁড়ি চলছে রবিবারের হাটে , গামছা মাথায় জলের ছাঁটে হাঁকিয়ে গোরুর গাড়ি । বন্ধ আমার রইল খেলা , ছুটির দিনে সারাবেলা কাটবে কেমন করে ? মনে হচ্ছে এমনিতরো ঝরবে বৃষ্টি ঝরোঝরো দিনরাত্তির ধরে ! এমন সময় পুবের কোণে কখন যেন অন্যমনে ফাঁক ধরে ওই মেঘে , মুখের চাদর সরিয়ে ফেলে হঠাৎ চোখের পাতা মেলে আকাশ ওঠে জেগে । ছিঁড়ে - যাওয়া মেঘের থেকে পুকুরে রোদ পড়ে বেঁকে , লাগায় ঝিলিমিলি । বাঁশবাগানের মাথায় মাথায় তেঁতুলগাছের পাতায় পাতায় হাসায় খিলিখিলি । হঠাৎ কিসের মন্ত্র এসে ভুলিয়ে দিলে একনিমেষে বাদলবেলার কথা । হারিয়ে - পাওয়া আলোটিরে নাচায় ডালে ফিরে ফিরে বেড়ার ঝুমকোলতা । উপর নিচে আকাশ ভরে এমন বদল কেমন করে হয় , সে - কথাই ভাবি । উলটপালট খেলাটি এই , সাজের তো তার সীমানা নেই , কার কাছে তার চাবি ? এমন যে ঘোর মন - খারাপি বুকের মধ্যে ছিল চাপি সমস্ত খন আজি — হঠাৎ দেখি সবই মিছে নাই কিছু তার আগে পিছে এ যেন কার বাজি । (শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bristy-roudro/
5740
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
উত্তরাধিকার
চিন্তামূলক
নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর ফুসফুস-ভরা হাসি দুপুর রৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা, রাত্রির মাঠে চিৎ হ’য়ে শুয়ে থাকা এসব এখন তোমারই, তোমার হাত ভ’রে নাও আমার অবেলা আমার দুঃখবিহীন দুঃখ ক্রোধ শিহরণ নবীন কিশোর, তোমাকে দিলাম আমার যা-কিছু ছুল আভরণ জ্বলন্ত বুকে কফির চুমুক, সিগারেট চুরি, জানালার পাশে বালিকার প্রতি বারবার ভুল পরুষ বাক্য, কবিতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসা, ছুরির ঝলক অভিমানে মানুষ কিংবা মানুষের মত আর যা-কিছুর বুক চিরে দেখা আত্মহনন, শহরের পিঠ তোলপাড় করা অহংকারের দ্রুত পদপাত একখানা নদী, দু’তিনটে দেশ, কয়েকটি নারী — এ-সবই আমার পুরোনো পোষাক, বড় প্রিয় ছিল, এখন শরীরে আঁট হয়ে বসে, মানায় না আর তোমাকে দিলাম, নবীন কিশোর, ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার তোমাকে আমার তোমার বয়সী সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1854
5148
শামসুর রাহমান
যদি আরো কিছুকাল
চিন্তামূলক
যদি আরো কিছুকাল পৃথিবীর ধুলোবালি, জল আমার সত্তায় লাগে, বাতাস রূপালি চুলগুলি নিয়ে খেলা করে নিরিবিলি আরো কিছুকাল, তবে এমন কী ক্ষতি হবে কার?এইতো দেখছি ফুল তার যৌবনের আভা নিয়ে ফুটে আছে, ডালে বসে পাখি চমৎকার শিস দিয়ে বিকালকে বেশি বৈকালিক ক’রে তোলে, বুঝি বা ঈষৎ ঈশ্বরিত!মোড়ায় আছে বসে মা আমার বৈধব্যের শুভ্র স্তব্ধতায়, স্মৃতিগুলি যেন মেঘমালা থেকে নামে এবং সাঁতার কাটে তাঁর পায়ের কিনারে। এই দেখা আরো কিছুকাল থাকুক না হয়।সারা রাত অন্ধকারে বৃষ্টি পড়ে ঘুমের ওপর, সারা রাত বৃষ্টি পড়ে স্বপ্নের ভেতর, মায়াবি ঘুঙুর বাজে চরাচরে, শুনে ফেলি অপার বিস্ময়ে- নামুক এমন বর্ষা বার বার হৃদয়ে আমার।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jodi-aro-kichukal/
4892
শামসুর রাহমান
নিঝুম বৃষ্টির সুর
প্রেমমূলক
সাঁওতাল রমণীর মতো যে অন্ধকার দিগন্তে স্তব্ধ, তা’ এখন শহরের ওপর খুব নীচু হ’য়ে ঝুঁকে পড়েছে; ওর নিঃশ্বাস অনুভব করি ত্বকে। থমথমে গুমোট-ছেঁড়া হাওয়ায় ঈষৎ শৈত্য; শহরের চোখের পলক না পড়তেই বাতাসের প্রচণ্ড মাতলামি, নিমেষে হাজার হাজার দরজা জানালা বন্ধ। আকাশ ফুটো করে বৃষ্টি এল অগণিত ঘোড়সওয়ারের মতো আওয়াজে। মেঘের বুকে বিদ্যুৎ-তরবারির ঝলসানি, কানফাটানো বাজের শব্দ!একটানা বৃষ্টির সুর ঝরে শিশুপল্লীর ছাদে, গোশালার টিনে, রাধাচূড়া গাছের পাতায়, নিঝুম বৃষ্টির সুর ঝরে হতশ্রী বস্তির খোলার ঘরে আর শহরের উঁচকপালে এলাকায়, ঘুমের ভেতরে, অবচেতন মনের খনিতে। বৃষ্টির সুর ঝরে আমাদের ভালোবাসার ওপর, আমাদের মিলন এবং হু হু বিচ্ছেদের ওপর।আমাদের স্বপ্নেরা বৃষ্টির জালে আট্‌কা পড়ে ছটফট করে চকচকে রূপালি মাছের মতো। আমি আমার ছোট ঘরে বসে আছি একা এবং নিশ্চুপ- আমার মাথায় বৃষ্টির শব্দময় শব্দহীনতা আর একটি হয়ে-উঠতে-চাওয়া কবিতার অস্পষ্ট মেঘমল্লার এবং তোমার স্মৃতির মোহন কম্পন।তুমি অন্ধকার বারান্দায় একাকিনী বসে দেখছো বৃষ্টি কোমল চুমো খাচ্ছে আম গাছের পাতার ঠোঁটে। তোমার নিঃসঙ্গতাকে স্পর্শ করে নিঝুম বৃষ্টির সুর। আমার শূন্য বিছানা ভেলার মতো ভাসমান অথৈ বেদনায়। তোমার এবং আমার হাতে মাঝখানে জলজ দেয়াল। কে যেন বাইরে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত পান করে চলেছে শ্রাবণের আরক।যখন বৃষ্টি দেখি, তোমার প্রগাঢ় চোখের অশ্রুজল মনে পড়ে আর তোমার চোখের জলে শ্রাবণধারা খুঁজে পাই।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nijum-bristir-sur/
2694
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আফ্রিকা
চিন্তামূলক
উদ্‌ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত, তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে রুদ্র সমুদ্রের বাহু প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা- বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায় কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে। সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য, চিনছিলে জলস্থল-আকাশের দুর্বোধ সংকেত, প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু মন্ত্র জাগাচ্ছিল তোমার চেতনাতীত মনে। বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে বিরূপের ছদ্মবেশে, শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে আপনাকে উগ্র করে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায় তাণ্ডবের দুন্দুভিনিনাদে।।                  হায় ছায়াবৃতা, কালো ঘোমটার নীচে অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে। এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে, নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে, এল মানুষ-ধরার দল গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে। সভ্যের বর্বর লোভ নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা। তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে পঙ্কিল হল ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে, দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় বীভৎস কাদার পিণ্ড চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।।সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায় মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা সকালে সন্ধ্যায়, দয়াময় দেবতার নামে; শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে; কবির সংগীতে বেজে উঠছিল সুন্দরের আরাধনা।।                   আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস, যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল- অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল, এসো যুগান্তরের কবি, আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে; বলো 'ক্ষমা কর'- হিংস্র প্রলাপের মধ্যে সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/afrika/
3061
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছিন্ন করে লও হে মোরে
ভক্তিমূলক
ছিন্ন করে লও হে মোরে আর বিলম্ব নয় ধুলায় পাছে ঝরে পড়ি এই জাগে মোর ভয়। এ ফুল তোমার মালার মাঝে ঠাঁই পাবে কি, জানি না যে, তবু তোমার আঘাতটি তার ভাগ্যে যেন রয়। ছিন্ন করো ছিন্ন করো আর বিলম্ব নয়।কখন যে দিন ফুরিয়ে যাবে, আসবে আঁধার করে, কখন তোমার পূজার বেলা কাটবে অগোচরে। যেটুকু এর রঙ ধরেছে, গন্ধে সুধায় বুক ভরেছে, তোমার সেবায় লও সেটুকু থাকতে সুসময়। ছিন্ন করো ছিন্ন করো আর বিলম্ব নয়।৩ আষাঢ়, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chinno-kore-lou-he-more/
1598
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
ঢেউ
চিন্তামূলক
এখানে ঢেউ আসে না, ভালবাসে না কেউ, প্রাণে কী ব্যথা জ্বলে রাত্রিদিন, মরুকঠিন হাওয়া কী ব্যথা হানে জানে না কেউ, জানে না, কাছে পাওয়া ঘটে না। এরা কোথায় যায় জটিল জমকালো পোশাকে মুখ লুকিয়ে, দ্যাখো কত না সাবধানে আঁচলে কাচ বাঁধে সবাই, চেনে না কেউ সোনা; এখানে মন বড় কৃপণ, এখানে সেই আলো ঝরে না, ভেঙে পড়ে না ঢেউ—এখানে থাকব না। যে-মাঠে সোনা ফলানো যায়, আগাছা জমে ওঠে সেখানে। এরা জানে না কেউ—কী রঙে ঝিলমিল জীবন,—তাই বাঁচে না কেউ; দুয়ারে এঁটে খিল নিজেকে দূরে সরায়, দিন গড়ায়। সেই সোনা ঝরে না, ভেঙে পড়ে না ঢেউ—দুয়ারে মাথা কোটে, এখানে মন বড় কৃপণ—এখানে থাকব না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1620
2730
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি
চিন্তামূলক
এই যে সবার সামান্য পথ, পায়ে হাঁটার গলি সে পথ দিয়ে আমি চলি সুখে দুঃখে লাভে ক্ষতিতে, রাতের আঁধার দিনের জ্যোতিতে। প্রতি তুচ্ছ মুহূর্তেরই আবর্জনা করি আমি জড়ো, কারো চেয়ে নইকো অমি বড়ো। চলতে পথে কখনো বা বিঁধছে কাঁটা পায়ে, লাগছে ধুলো গায়ে; দুর্বাসনার এলোমেলো হাওয়া, তারি মধ্যে কতই চাওয়া পাওয়া, কতই বা হারানো, খেয়া ধরে ঘাটে আঘাটায় নদী-পারানো। এমনি করে দিন কেটেছে, হবে সে-দিন সারা বেয়ে সর্বসাধারণের ধারা। শুধাও যদি সবশেষে তার রইল কী ধন বাকী, স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারি তা কি! জানি, এমন নাই কিছু যা পড়বে কারো চোখে, স্মরণ-বিস্মরণের দোলায় দুলবে বিশ্বলোকে। নয় সে মানিক, নয় সে সোনা,-- যায় না তারে যাচাই করা, যায় না তারে গোনা। এই দেখো-না শীতের রোদের দিনের স্বপ্নে বোনা সেগুন বনে সবুজ-মেশা সোনা, শজনে গাছে লাগল ফুলের রেশ, হিমঝুরির হৈমন্তী পালা হয়েছে নিঃশেষ। বেগনি ছায়ার ছোঁওয়া-লাগা স্তব্ধ বটের শাখা ঘোর রহস্যে ঢাকা। ফলসা গাছের ঝরা পাতা গাছের তলা জুড়ে হঠাৎ হাওয়ায় চমকে বেড়ায় উড়ে। গোরুর গাড়ি মেঠো পথের তলে উড়তি ধুলোয় দিকের আঁচল ধূসর ক'রে চলে। নীরবতার বুকের মধ্যখানে দূর অজানার বিধুর বাঁশি ভৈরবী সুর আনে। কাজভোলা এই দিন নীল আকাশে পাখির মতো নিঃসীমে হয় নীল। এরি মধ্যে আছি আমি, সব হতে এই দামি। কেননা আজ বুকের কাছে যায় না জানা, আরেকটি সেই দোসর আমি উড়িয়ে চলে বিরাট তাহার ডানা জগতে জগতে অন্তবিহীন ইতিহাসের পথে। এই যে আমার কুয়োতলার কাছে সামান্য ঐ আমের গাছে কখনো বা রৌদ্র খেলায়, কভু শ্রাবণধারা, সারা বয়ষ থাকে আপনহারা সাধারণ এই অরণ্যানীর সবুজ আবরণে, মাঘের শেষে অকারণে ক্ষণকালের গোপন মন্ত্রবলে গভীর মাটির তলে শিকরে তার শিহর লাগে, শাখায় শাখায় হঠাৎ বাণী জাগে,-- "আছি, আছি, এই যে আমি আছি।" পুষ্পোচ্ছ্বাসে ধায় সে বাণী স্বর্গলোকের কাছাকাছি দিকে দিগন্তরে। চন্দ্র সূর্য তারার আলো তারে বরণ করে। এমনি করেই মাঝে মাঝে সোনার কাঠি আনে কভু প্রিয়ার মুগ্ধ চোখে, কভু কবির গানে-- অলস মনের শিয়রেতে কে সে অন্তর্যামী; নিবিড় সত্যে জেগে ওঠে সামান্য এই আমি। যে আমিরে ধূসর ছায়ায় প্রতিদিনের ভিড়ের মধ্যে দেখা সেই আমিরে এক নিমেষের আলোয় দেখি একের মধ্যে একা। সে-সব নিমেষ রয় কি না রয় কোনোখানে, কেউ তাহাদের জানে বা না-ই জানে, তবু তারা জীবনে মোর দেয় তো আনি ক্ষণে ক্ষণে পরম বাণী অনন্তকাল যাহা বাজে বিশ্বচরাচরের মর্মমাঝে "আছি আমি আছি"-- যে বাণীতে উঠে নাচি মহাগগন-সভাঙ্গনে আলোক-অপ্সরী তারার মাল্য পরি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ame/
2626
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অল্প জানা ও বেশি জানা
নীতিমূলক
তৃষিত গর্দভ গেল সরোবরতীরে, ‘ছিছি কালো জল!’ বলি চলি এল ফিরে। কহে জল, জল কালো জানে সব গাধা, যে জন অধিক জানে বলে জল সাদা।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/olpo-jana-o-beshi-jana/
5916
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
পরপার
স্বদেশমূলক
আমরা যেন বাংলাদেশের চোখের দুটি তারা। মাঝখানে নাক উঁচিয়ে আছে_ থাকুক গে পাহারা। দুয়োরে খিল। টান দিয়ে তাই খুলে দিলাম জানলা। ওপারে যে বাংলাদেশ এপারেও সেই বাংলা।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4470.html
3158
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তুমি কেমন করে গান কর যে গুণী
ভক্তিমূলক
তুমি কেমন করে গান কর যে গুণী, অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি। সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে, সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে, পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে, বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।মনে করি অমনি সুরে গাই, কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই। কইতে কী চাই, কইতে কথা বাধে; হার মেনে যে পরান আমার কাঁদে; আমায় তুমি ফেলেছ কোন্‌ ফাঁদে চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি!১০ ভাদ্র- রাত্রি, ১৩১৬ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tumi-kemon-kore-gan-koro-je-guni/
3315
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিদ্রিতার চিত্র
সনেট
মায়ায় রয়েছে বাঁধা প্রদোষ – আঁধার ; চিত্রপটে সন্ধ্যাতারা অস্ত নাহি যায় । এলাইয়া ছড়াইয়া গুচ্ছ কেশভার বাহুতে মাথাটি রেখে রমণী ঘুমায় । চারি দিকে পৃথিবীতে চিরজাগরণ , কে ওরে পাড়ালে ঘুম তারি মাঝখানে ! কোথা হতে আহরিয়া নীরব গুঞ্জন চিরদিন রেখে গেছে ওরই কানে কানে ! ছবির আড়ালে কোথা অনন্ত নির্ঝর নীরব ঝর্ঝর – গানে পড়িছে ঝরিয়া । চিরদিন কাননের নীরব মর্মর , লজ্জা চিরদিন আছে দাঁড়ায়ে সমুখে — যেমনি ভাঙিবে ঘুম , মরমে মরিয়া বুকের বসনখানি তুলে দিবে বুকে ।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nidritar-chitro/
1723
পাবলো নেরুদা
জীবন
চিন্তামূলক
অনুবাদ: অসিত সরকারমাঝে মাঝে যখন তোমার কথা ভাবি কি যে খারাপ লাগে! যেহেতু তুমি জানো না আমার সঙ্গে রয়েছে অগণন বিজয়ী মানুষের মুখ যা তুমি দেখতে পাও না, আমার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে অগণন পা আর হৃদয়, তাই আমি একা নই একা হিসেবে নিজের কোনো অস্তিত্বই নেই, আমি কেবল রয়েছি যারা আমার সঙ্গে চলেছে তাদের পুরোভাগে, তাই আমি দুর্বল নই কেননা আমি কেবল আমার ছোট্ট জীবনটাকেই বহন করে নিয়ে চলিনি চলেছি সমস্ত মানুষের হৃদয়কে বহন করে এবং এগিয়ে চলেছি দৃঢ় পায়ে কেননা আমার যে হাজারো চোখে, নিমেষে চূর্ণ করে ফেলি ভয়ঙ্কর সবপাথর কেননা আমার যে হাজারো হাত, তাই আমার কন্ঠস্বর প্রতিটা দেশের সমুদ্রতীর থেকেও শোনা যায় কেননা এ কন্ঠস্বর যারা কখনও কথা বলেনি তাদের, যারা কখনও গান গায়নি তাদের, আর আজ যারা গান গাইছে চুম্বনে তারা তোমাকে স্পর্শ করছে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3940.html
5280
শামসুর রাহমান
সুদূরের অনন্য প্রবাসী
মানবতাবাদী
শহীদ, বলো তো বন্ধু সেই সব দুপুর, গোধূলিবেলা আর সন্ধ্যারাত, মধ্যরাত মার্কিন মুলুকে ঢেউ হয়ে স্মৃতিতটে আছড়ে পড়ে কি কখনও সখনও? বলো, পাতাল ট্রেনের কামরায় তন্দ্রাচ্ছন্ন মুহূর্তে চকিতে জেগে ওঠো নাকি বিউটি বোর্ডিং আর লক্ষ্মীবাজারের ঘ্রাণে?যখন বস্টনে ঘন কুয়াশার কাফন জড়ানো সন্ধেবেলা কাঙ্ক্ষিত আড্ডায় মেতে ওঠ কিংবা তুষারের আলিঙ্গন ছিঁড়ে দীর্ঘক্ষণ কর্মস্থলে ডুবে থাকো, তখন কি আচানক মনে পড়ে যায়, হায়, কোনও কোনও মৃত, অর্ধমৃত ঢাকাবাসী বান্ধবের মুখ? কখনও মনে কি পড়ে বুদ্ধদের বসুর কবিতাভবনের স্পর্শময় ‘কবিতা’-পত্রের জন্যে অধীর প্রতীক্ষা আমাদের? তখন কি তোমাকে দখল করে অতীতের স্মৃতি-কাতরতা? শহীদ, যখন তুমি হিম-রাতে বন্ধ দরজা জানালা, উষ্ণ কামরার চারদিক নীরবে আবৃত্তি করো আর কোনও কবিতার বই খুলে আঙুলের ফাঁকে ধূমায়িত সিগারেট কোমল বুলিয়ে পাঠ করো কোনও বিদেশি কবির তাজা কবিতা, তখন তোমার পড়ে কি মনে সুকুমার, জাহাঙ্গীর, তাহের অথবা বুড়ো কিংবা আখতার, খালেদ চৌধুরী ফিল্মপ্রিয় দীর্ঘকায় বাচ্চু, সঞ্জীব, সৈয়দ হক, কায়সুল আর এই সত্তর-পেরুনো অতিশয় ধূসর আমার কথা? হে প্রিয় বান্ধব, বলো, মনে পড়ে নাকি?কী আশ্চর্য, শহীদ তুমিও, হ্যাঁ, তুমিও জ্বল জ্বলে একদা-কিশোর, এ-ও সম্ভব ষাটে থরথর? যায় উচ্ছলতা, ঔজ্জ্বল্য কী দ্রুত ক্ষয়ে ফিকে হয়ে যায়, হাহাকার জেগে রয়; শুধু কি যৌবন অস্তাচলে মিশে যায়? সৌহার্দের, সখ্যের গোধূলি লুপ্ত হয় দীর্ঘশ্বাসে। কাদা থেকে উঠে-আসা অতিকায় জন্তুর জঠরে যাচ্ছে চলে বাগান, পূর্ণিমা-চাঁদ, বাংলার মানব মানবী!শহীদ, হে প্রিয় বন্ধু আমার, তুমি কি ফিরে এসে ভূমিধসে অসহায়, দুঃস্বপ্ন-তাড়িত ভাঙাচোরা মানুষের ভিড়ে মিশে অন্ত্রাঘাত মাটি-চাপা পড়ে কোনও এক অজ্ঞাত কবির শোকগাথা হতে চাও? আপাততসুদূরের অনন্য প্রবাসী তুমি আর এই অবসন্ন আমি শক্রময় নিজ বাসভূমে পরবাসী।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sudure-ononyo-probasi/
1060
জীবনানন্দ দাশ
দুজন
প্রেমমূলক
‘আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু-একই আলোপৃথিবীর পারে আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, হয় নাকি?’- বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে; আজ এই মাঠ সূর্য সহধর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে প্রাণ তার ভরে গেছে। দুজনে আজকে তারা চিরস্থায়ী পৃথিবীর ও আকাশের পাশে আবার প্রথম এল-মনে হয়- যেন কিছু চেয়ে-কিছু একান্ত বিশ্বাসে। লালচে হলদে পাতা অনুষঙ্গে জাম বট অশ্বত্থের শাখার ভিতরে অন্ধকারে নড়ে- চড়ে ঘাসের উপর ঝরে পড়ে; তারপর সান্ত্বনায় থাকে চিরকাল; যেখানে আকাশে খুব নীরবতা,শান্তি খুব আছে, হৃদয়ে প্রেমের গল্প শেষ হলে ক্রমে ক্রমে যেখানে মানুষ আশ্বাস খুঁজেছে এসে সময়ের দায়ভাগী নক্ষত্রের কাছে: সেই ব্যাপ্ত প্রান্তরে দুজন; চারিদিকে ঝাউ আম নিম নাগেশ্বরে হেমন্ত আসিয়া গেছে;-চিলের সোনালি ডানা হয়েছে খয়েরি; ঘুঘুর পালক যেন ঝরে গেছে- শালিকের নেই আর দেরি, হলুদ কঠিন ঠ্যাং উঁচু করে ঘুমাবে সে শিশিরের জলে; ঝরিছে মরিছে সব এই খানে বিদায় নিতেছে ব্যাপ্ত নিয়মের ফলে। নারী তার সঙ্গীকে : ‘পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, জানি আমি; — তারপর আমাদের দুঃস্থ হৃদয় কী নিয়ে থাকিবে বলো; — একদিন হৃদয়ে আঘাত ঢের দিয়েছে চেতনা, তারপর ঝরে গেছে; আজ তবু মনে হয় যদি ঝরিত না হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের — প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা ফুরত না যদি, আহা, আমাদের হৃদয়ের থেকে–’ এই বলে ম্রিয়মাণ আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়িয়ে রইল হাঁটুভর। হলুদরঙের শাড়ি, চোরকাঁটা বিঁধে আছ, এলোমেলো অঘ্রাণের খড় চারিদিকে শূন্য থেকে ভেসে এসে ছুঁয়ে ছেনে যেতেছে শরীর; চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির;– প্রেমিকের মনে হল : ‘এই নারী-অপরূপ-খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে যেখানে রবো না আমি, রবে না মাধুরী এই, রবে না হতাশা, কুয়াশা রবে না আর — জনিত বাসনা নিজে — বাসনার মতো ভালোবাসা খুঁজে নেবে অমৃতের হরিণীর ভিড় থেকে ইপ্সিতেরে তার।’
https://banglarkobita.com/poem/famous/956
4637
শামসুর রাহমান
কোন্‌ সে ব্যাধির
প্রেমমূলক
কে তুমি আমাকে লাটিমের মতো ঘুরোতে ঘুরোতে আখেরে কোথাও দূরে ছুড়ে ফেলো? কখনও তোমার পাই না তো খোঁজ। কত পথে হাঁটি, কত মাঠে ছুটি, নদীর কিনারে বসে থাকি এক ধ্যানীর ধরনে।প্রায়শ কতো রাত কেটে যায় নির্ঘুম আর সারাদিন কাটে ঘরের ভেতর পায়চারি করে। কখনও আহার মুখে তুলে নিতে ভুলে যাই আর গাছে পাখিদের সংসার দেখে কত যে সময় কেটে যায় আর জরুরি চিঠির পাতা ছিঁড়ে ফেলি বড় ভুলো মনে।যদি ভাবে কেউ রমণীর প্রেমে মজে এই আমি এমন হয়েছি তা’হলে বেজায় ভুল হয়ে যাবে। ভালোবাসবার বয়সের কোনও সীমানা যদিও বাঁধাধরা নেই, সে কারণে আজ হইনি এমন।ভুলো-মন তবে? বুঝি না, জানি না। কেউ কি আমাকে দয়াপরবশ হয়ে বলে দেবে কেন আজকাল এমন উতলা এ-মন আমার? কোন্‌ সে ব্যাধির হয়েছি শিকার? এই ব্যাধি থেকে আমাকে মুক্তি দেয়ার সাধ্য হাকিমের নেই।  (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kon-se-badhir/
3243
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুর্ভাগা দেশ
মানবতাবাদী
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে, সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে। বিধাতার রুদ্ররোষে দুর্ভিক্ষের-দ্বারে বসে ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান। অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে। চরণে দলিত হয়ে ধূলায় সে যায় বয়ে - সেই নিম্নে নেমে এসো, নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ। অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান।যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে, পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে। অজ্ঞানের অন্ধকারে আড়ালে ঢাকিছ যারে তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান। অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার, মানুষের নারায়ণে তবুও কর না  নমস্কার। তবু নত করি আঁখি দেখিবার পাও না কি নেমেছে ধূলার তলে হীনপতিতের ভগবান। অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান।দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে - অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে। সবারে না যদি ডাকো, এখনো সরিয়া থাকো, আপনারে বেঁধে রাখো চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান - মৃত্যু-মাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/durbhaga-desh/
1679
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
যেহেতু
প্রেমমূলক
আশা ছিল শান্তিতে থাকার, আহা, ব্যর্থ হল সেই আশা, যেহেতু মস্তিষ্কে ছিল তার মস্ত একটা ভিমরুলের বাসা। এবং সাদা যে কালো নয়, কালো নয় নীল কিংবা লাল, যেহেতু সে তাতেও সংশয় লালন করেছে চিরকাল… বন্ধুদের পরামর্শ শুনে মীমাংসার বারিবিন্দুগুলি অবিলম্বে চিন্তার আগুনে ছিটোটে পারলেই তার খুলি ঠাণ্ডা হয়ে আসত। সে যেহেতু সাধ্য আর সাধনার সেতু বেঁধে নিতে চায়নি, বারবার পরাস্ত হয়েও প্রাণপণে নৌকা খুলে দিয়েছিল তার অনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পিছনে… এবং যেহেতু তার মনে ইথে কোনো সন্দেহ ছিল না, যা-কিছু ঝলসায় ক্ষণে-ক্ষণে, সমস্তই নয় তার সোনা… সুতরাং শান্তিতে থাকার, আহা, ব্যর্থ হল সব আশা মস্তিষ্কে অবশ্য ছিল তার মস্ত একটা ভিমরুলের বাসা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1697
1758
পূর্ণেন্দু পত্রী
আত্মচরিত
চিন্তামূলক
আমার বয়স ৪৮। আমার মাথার প্রথম পাকা চুলের বয়স ২০। এবং আমার স্নায়ুতন্ত্রীর ভিতরে স্তবকে স্তবকে সাজানো যে-সব স্মৃতি তারা খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০০ বছরের চেয়ে পুরনো। সর্বক্ষণ পাঁজবার আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকে যে-বিষাদ একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, কত বয়স হলো হে? বললে, ২০০৬ এর কাছাকাছি এলে কানায় কানায় ৭০০ বছর। কেননা দীর্ঘ বিদীর্ণ দান্তে নিজের রক্তে কলম ডুবিয়েছিলেন আনুমানিক ১৩০৬ এ, লা দিভিনা কোমমেদিআ-র জন্যে । স্তম্ভ এবং তরবারির বিরুদ্ধে আমি নয়, কেননা আমি খুব বিনীত, প্রায় লতানে গাছের মতো নম্র এমন কি যে-কেউ যখন খুশী মচকে দিতে পারে এমনই রোগা পটকা, স্তম্ভ এবং তরবারি এবং যে কোনা সুপারসোনিক গর্জনের বিরুদ্ধে আমি নয়, আমার ভিতর থেকে তেড়ে ফুঁড়ে জেগে ওঠে কামান বন্দুকের মতো শক্ত সমর্থ এক যুবক। ঐ যুবকটির সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয়েছিলো চতুর্দশ লুয়ের আমলে ১৭৮৯ এর প্যারিসে, বাস্তিল দুর্গের দরজার সামনে। আমার বয়স ৪৮ কিংবা ৪৯। কিন্তু আমার ভালোবাসার বয়স ১৮। যেহেতু আকাশের সমস্ত নীল নক্ষত্রের প্রগাঢ় উদ্দীপনার বয়স ১৮। যেহেতু পৃথিবীর সমস্ত রুপসী নারীর জ্যোৎস্না এবং অগ্ন্যুৎপাতের বয়স ১৮। এক একদিন ঘুম ভাঙার পর মাথায় বেঠোফেনের অগ্নিজটাময় চুল। আর মুখের দুপাশে মায়াকভস্কির হাঁড়িকাঠের মতো চোয়াল। এক একদিন ঘাড়ের উপর আচমকা লাফিয়ে কুরে কুরে খায় কান্না, দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে যেন ইভান দি টেরিবলের দুমড়োনো চেরকাশভ। ভাগ্যরেখাহীন রাজপথের আলকাতরায় উপুড় হয়ে আছে আগামীকালের শোক-তাপ, আর সেই সব চিৎকার রক্তপাতের রাতের গোলাপ হওয়ার জন্যে যারা উন্মূখ। ঐ রাজপথের দুপাশে দিনে দশবার হাঁটতে হাঁটতে যখন মাংসের কিমার মতো থেতো, হঠাৎ নিজেকে মনে হয় ম্যাকস্ ভন সিদো বার্গম্যানের সেভেনথ সীল এর সেই মৃত্যুভেদী নায়ক যার লম্বা মুখের বিষণ্নতায় পৃথিবীর দগদগে মানচিত্র। এক একদিন ঘুম ভাঙার পর চোখের ভিতরে বোদলেয়ারের প্রতিহিংসাপরায়ণ চোখ, মনের ভিতরে জীবনানন্দের প্রেমিক চিলপুরুষের মন, আর হাসির ভিতরে রেমব্রান্টের হিসেব না-মেলানো হাসির চুরমার।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1168