content
stringlengths
0
129k
ইসলামিয়া কলেজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর উপর
সকাল সাতটায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ও তার সঙ্গী নুরুদ্দিন গিয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করতে
বঙ্গবন্ধু যখন পতাকা উত্তোলন করেন তখনও শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক
তবে তিনি চলে আসার পরেও শুরু হয় টালমাটাল পরিস্থিতি
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, "আমি ও নূরুদ্দিন সাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হলাম
পতাকা উত্তোলন করলাম
কেউই আমাদের বাধা দিল না
আমরা চলে আসার পরে পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিল শুনেছিলাম
আমরা কলেজ স্ট্রিট থেকে বউবাজার হয়ে আবার ইসলামিয়া কলেজে ফিরে এলাম
কলেজের দরজা ও হল খুলে দিলাম
আর যদি আধঘন্টা পর বউবাজার হয়ে আসতাম তাহলে আমার আর নূরুদ্দিনের লাশও আর কেউ খুঁজে পেত না
বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজে ফিরে আসার পরেও কিছু ছাত্র রক্তাক্ত অবস্থায় কলেজে প্রবেশ করে
কারো পিঠে ছুরির আঘাত, কারো মাথা ফেটে গেছে
এই পরিস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না বঙ্গবন্ধু
এরপর একের পর এক আক্রমণের খবর আসতে থাকে
বঙ্গবন্ধু নিজেও ছুটে যান আক্রমণ প্রতিহত করতে
বঙ্গবন্ধু লিখছেন-
"আমাদের কাছে খবর এলো, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মসজিদে আক্রমণ হয়েছে
ইসলামিয়া কলেজের দিকে হিন্দুরা এগিয়ে আসছে
কয়েকজন ছাত্রকে ছাত্রীদের কাছে রেখে, আমরা চল্লিশ পঞ্চাশজন ছাত্র প্রায় খালি হাতেই ধর্মতলার মোড় পর্যন্ত গেলাম
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা কাকে বলে এ ধারণাও আমার ভালো ছিল না
দেখি শতশত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মসজিদ আক্রমণ করছে
মৌলভী সাহেব পালিয়ে আসছেন আমাদের দিকে
তার পিছে ছুটে আসছে একদল লোক লাঠি ও তলোয়ার হাতে
পাশেই মুসলমানদের কয়েকটা দোকান ছিল
কয়েকজন লোক কিছু লাঠি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াল
আমাদের মধ্য থেকে কয়েকজন 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' দিতে শুরু করলো
দেখতে দেখতে অনেক লোক জমা হয়ে গেল"
দাঙ্গা পরবর্তী সময়
হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার ভিতর যেসব মুসলিম পরিবার ছিল তারা জীবনের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে দিয়েছিল
মুসলিম লীগের অফিস হয়ে গিয়েছিল রিফিউজি ক্যাম্প
পার্টি অফিসে একটু পরপর কল আসা শুরু করেছিল
সবার একটাই কথা, 'আমাদের বাঁচান
আমরা আটকা পড়েছি
' ইসলামিয়া কলেজের হোস্টেল খুলে দেয়া হয়েছিল জনসাধারণের জন্য
এত বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থান সংকুলান হচ্ছিল না তবুও
বঙ্গবন্ধু তখন ছুটে যান কলকাতা মাদরাসা খোলার জন্য
মাদরাসার দারোয়ান গেট খুলতে গড়িমসি করলে বঙ্গবন্ধু সরাসরি প্রিন্সিপালের কাছে যান
এরপর প্রিন্সিপাল সাহেব নিজেই নির্দেশ দেন দরজা খোলার
আশ্রয়হীন সব মানুষ আশ্রয় নিতে থাকে
শহরের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে পড়া মানুষদের বের করে আনতে চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধু ও তার সাথীরা
১৬ ই আগস্টের পর যখন হোস্টেলগুলোতে আশ্রয় নিয়ে আছে সব মানুষজন তখন নতুন এক সংকট শুরু হলো
হোস্টেলগুলোতে চালম আটা ফুরিয়ে আসছে
এদিকে দোকানপাট সব বন্ধ
লুট হয়ে যাওয়ার ভয়ে কেউ খোলে না
বঙ্গবন্ধু তখন সরাসরি চলে যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির কাছে
তিনি তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী
বঙ্গবন্ধু খাবারের ব্যবস্থা করে সাথীদের সাথে নিয়ে নিজেই ঠেলাগাড়ী ঠেলে খাবার পৌঁছে দেন বিভিন্ন হোস্টেলে
খাবারের ব্যবস্থা করা নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেন-
"এদিকে হোস্টেলগুলিতে চাউল, আটা ফুরিয়ে গিয়েছে
কোন দোকান কেউ খোলে না, লুট হয়ে যাবার ভয়েতে
শহীদ সাহেবের কাছে গেলাম
কি কর যায়? শহীদ সাহেব বললেন, "নবাবজাদা নসরুল্লাহকে (ঢাকা নবাবা হাবিবুল্লাহ সাহেবের ছোট ভাই, খুব অমায়িক লোক ছিলেন, শহীদ সাহেবের ভক্ত ডেপুটি চিফ হুইপ ছিলেন) ভার দিয়েছি, তার সাথে দেখা কর
" আমরা তাঁর কাছে ছুটলাম
তিনি আমাদের নিয়ে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে গেলেন এবং বললেন, "চাউল এখানে রাখা হয়েছে তোমরা নেবার বন্দোবস্ত কর
আমাদের কাছে গাড়ি নাই
মিলিটারি নিয়ে গিয়েছে প্রায় সমস্ত গাড়ি
তবে দেরি করলে পরে গাড়ির বন্দোবস্ত করা যাবে
" আমরা ঠেলাগাড়ি আনলাম, কিন্তু ঠেলবে কে? আমি নূরুদ্দিন ও নূরুল হুদা (এখন ডিআইটির ইঞ্জিনিয়ার) এই তিনজনে ঠেলাগাড়িতে চাউল বোঝাই করে ঠেলতে শুরু করলাম
নূরুদ্দিন সাহেব তো 'তালপাতার সেপাই'- শরীরে একটুও বল নাই
আমরা তিনজনে ঠেলাগাড়ি করে বেকার হোস্টেল, ইলিয়ট হোস্টেলে চাউল পৌঁছে দিলাম
অসম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধু
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক খুরশিদা বেগম বলেন, 'উনি (বঙ্গবন্ধু) মুসলিম লীগের কাজ করছেন সক্রিয় কর্মী হিসেবে
পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে আছেন, আবার তাঁর মন মানসিকতা সবটুকুই অসাম্প্রদায়িক দেখছি
উনি প্রতিদিন সকালে বের হয়ে যাচ্ছেন কিভাবে দাঙ্গা থামানো যায় সে লক্ষ্য নিয়ে
মুসলিম লীগের কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন পাকিস্তান আন্দোলন বাস্তবায়ন করতে
কিন্তু যখন দাঙ্গা শুরু হয়, তখন দাঙ্গা থামানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মাহফুজা খানম বলেন,
"তিনি সবসময় যে কথা বলেছেন যে আগে আমি মানুষ, তারপরে বাঙালী এবং তারপরে মুসলমান
রাজনৈতিক কারণে তাকে মুসলিম লীগের জন্য লড়তে হয়েছিল
কিন্তু মনে প্রাণে তিনি অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন
যে কারণে তিনি দাঙ্গা থামাতে এগিয়ে গেছেন
আক্রান্তদের উদ্ধার করার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেন, " দু'এক জায়গায় উদ্ধার করতে যেয়ে আক্রান্তও হয়েছিলাম
আমরা হিন্দুদেরও উদ্ধার করে হিন্দু মহল্লায় পাঠাতে সাহায্য করেছি
আমার মনে হয়েছে, মানুষ তার মানবতা হারিয়ে পশুতে পরিণত হয়েছে
প্রথম দিন ১৬ই অগাস্ট মুসলমানরা ভীষণভাবে মার খেয়েছে
পরের দুইদিন মুসলমানরা হিন্দুদের ভীষণভাবে মেরেছে
পরে হাসপাতালের হিসাবে দেখা দেখা গিয়েছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, "একদিকে যখন মুসলমানরা আক্রান্ত হচ্ছে হিন্দু দাঙ্গাকারীদের হাতে, তখন তিনি তাদের রক্ষা করতে গিয়েছেন
আবার অন্যদিকে হিন্দুরা যখন আক্রান্ত হচ্ছে মুসলমান দাঙ্গাকারীদের হাতে তখন তিনি হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দাঙ্গার সময় নিজের জীবন বাজি রেখে আক্রান্তদের রক্ষা করেন
কে মুসলমান আর কে হিন্দু সে বিষয়টি বঙ্গবন্ধু বিবেচনা করেননি
তথ্যসূত্র -
১. অসমাপ্ত আত্মজীবনী
২. বিবিসি বাংলা
বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন
.
কাফকা : নৈঃশব্দ্যের রাজ্য থেকে উঠে আসা শব্দের রাজকুমার
: লেখক কুঞ্জ
"আমার এক বন্ধু এক রাতে ফ্রানৎস কাফকা র ছোটগল্পের একটা বই আমাকে পড়তে দিয়েছিলো
আমি 'মেটামরফোসিস'...
/ 20, 2021
যেভাবে গঠিত হয়েছিল মুজিব নগর সরকার
:
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল
গুরুত্বপূর্ণ ছয়জন যাত্রী নিয়ে কলকাতা থেকে একটি গাড়ি যাত্রা শুরু করেছে
গন্তব্য - বৃহত্তর...
/ 13, 2021