content stringlengths 0 129k |
|---|
অন্যদের নিশ্চিহ্ন করে এক বিশ্বাস, এক দৃষ্টিভঙ্গি, এক ধর্ম ও সংস্কার প্রতিষ্ঠা বা সুপ্রিমেসি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ঘৃণ্য তৎপরতা |
নিজের ধর্ম, নিজের বর্ণ, নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস, নিজ কমিউনিটি, নিজপেশা এবং নিজদেশ শ্রেষ্ঠ আর বাকিগুলো অপাঙক্তেয় বা অগ্রহণযোগ্য এমন বিশ্বাসের চেয়ে অশ্লীল মনোভঙ্গি আর কিছু হতে পারে না |
শ্রেষ্ঠত্বের অনুভব ব্যক্তিকে সহিংস করে তোলে, তাকে করে তোলে একরৈখিক |
একরৈখিকতা এক ধরনের প্রতিবন্ধিতা |
কারণ, যুক্তির বিপরীতে যিনি বিশ্বাসের ঘরে বসত গাড়েন তিনি মূলত পার্থিব ও অপার্থিব পুরস্কারের সাধনা করেন |
এ লোভ তাকে হীন করে |
এ হীনতা বা নীচুতা খুব নিম্নস্তরের বিষয় সেটি বোঝার বুদ্ধিবৃক্তিক সক্ষমতা তার থাকে না |
সুকৌশলে সেই শক্তিটা লোপ করে দেয়া হয় |
কড়া বিশ্বাসের রসায়নে মস্তিষ্ক প্রক্ষলিত করা হয় |
এ ধরনের মস্তিষ্ক প্রক্ষালনের বিষয় হিরক রাজার দেশে সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন |
আজ দেশজুড়ে শ্রেষ্ঠ বিশ্বাসের বীজ বোনা হচ্ছে |
যে বীজ বোনা হবে তার তো চারা গজাবে |
এটাই স্বাভাবিক |
সহাবস্থানের জন্য দরকার বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গি |
কী দিয়ে তৈরি হবে দৃষ্টিভঙ্গি |
কার মধ্যে রয়েছে সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের মহৌষধ |
শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গ্রহণোন্মুক্ত এক সংকর সংস্কৃতির মধ্যে |
কিন্তু সেই পথ তো আজ মসৃণ নয় |
নানাভাবে তা সংকুচিত |
প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরে নেই বৈচিত্র্যের কোনো সুগন্ধিচন্দন |
কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ভাষায়- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে গল্পের দানবের মতো |
এর ভেতরের খোলসটা এতো বড় যে মুখ দিয়ে ঢুকে সারা পেট ঘুরে আসলে কোথাও স্পর্শ হবে না |
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও ঠিক এমনই- শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পার হয়ে যাবে কিন্তু শিক্ষা কী সেই বিষয়টি স্পর্শ করবে না |
শিক্ষালয়গুলো হয়ে উঠছে বৈচিত্র্য নির্মাণের পরিবর্তে বিশ্বাস উৎপাদনের কারখানা |
কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় গোটা সামাজিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে বিশ্বাসের পক্ষে |
যেকোনো বিশ্বাসের মূল সমীবদ্ধতা হলো এর ভেতর অন্য বিশ্বাস বাস করতে পারে না, বা শ্রদ্ধান্বিত হতে পারে না |
বিশ্বাস মানেই একক ব্যাপার |
আবার বিশ্বাস মানেই বিভক্তি |
বিশ্বাসের একটি বিশেষ দিক হলো- পিওর বিশ্বাস বলে কিছু নেই |
ব্যক্তি একটি বিশ্বাসের সাধারণ স্কিমে বিশ্বাস করে আবার তার মধ্যে অনেক ধরনের ছোট ছোট ভিন্ন ধরনের বিশ্বাস ও সংস্কার থাকে |
বিশ্বাস মানেই যে এক নিরাপদ শীতল ছায়া তা নয় |
যেমন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য শেষ কথা নয় |
কে কার গ্রুপের অনুসারী পরবর্তী পর্যায়ে তা মুখ্য ওঠে |
একক ধর্মীয় বিশ্বাস শেষ কথা নয় |
এরপর প্রশ্ন আসে কে কোন তরিকা বা মাযহাবের |
বিশ্বাসের ভেতর রয়েছে বিযুক্তির গাঢ় রসদ যা মূলত নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়ার মূল জ্বালানি |
বিশ্বাস মানেই বদ্ধতা |
বিশ্বাস অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনবাদ উৎসাহিত করে |
আর এজন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ ও শ্রীবৃদ্ধিতে তথাকথিত বিশ্বাসীদের বিশেষ তৎপরতা লক্ষ্ করা যায় |
প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সেমিনারে দুঃখ করে বলেছিলেন- যেখানকার প্রেসক্লাবের শ্রী যত সুন্দর সেখানকার সাংবাদিকতার মান তত নিম্ন |
জনগণ আদর্শিক অর্থে যথেষ্ট ধার্মিক না হলেও ধর্মকে কেন্দ্র করে দেখানোর ব্যাপারে সে খুব তৎপর |
ধর্মের আচারসর্বস্ব ব্যাপারকে সে বেশ অগ্রাধিকার দিচ্ছে |
সংস্কৃতি অধ্যয়নের পণ্ডিত জেমস ডাব্লিউ ক্যারে তার -বইতে যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রবণতার ব্যাখ্যা করেছেন |
একে তিনি বলেছেন- যোগাযোগের ট্রান্সমিশন অ্যান্ড রিচুয়ালভিউ |
জনগণ আজ ধর্মের স্পিরিচুয়াল দিকের চেয়ে আচারসর্বস্ব দিকের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে উঠছে, যা তাকে সহিংস হতে প্রণোদনাও জোগাচ্ছে |
বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে যুক্তি |
যুক্তি হলো বহুমাত্রিক ব্যাপার |
যুক্তি মানেই সংযুক্তি |
গ্রহণোন্মুক্ত এক মনোভঙ্গি |
বিশ্বাসের বিপরীতে যুক্তিনির্ভর আধুনিক জনমানস আমরা গড়তে পারিনি |
সমালোচনাত্মক মনোভঙ্গিসম্পূর্ণ জনসমাজ নেই |
বাংলাদেশ বিশ্বাসের ঘনগ্রাম |
বাঙালির সংস্কৃতিতে সব মত ও পথের যে সম্মিলনশক্তি ছিল তা লোকজগায়ক, চিন্তক ও সাধকেরা লালন ও ধারণ করতেন তা ক্ষীণ হতে হতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে |
সবাই মিলে এক বিশ্বাস ও এক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়েছি |
যার মূল প্রেরণা কেবল সংখ্যাধিক্যেরা থাকবে, ছোট সংখ্যা নয় |
মোট জনসংখ্যার ৫-১০ ভাগ ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ভিন্ন ধর্মের |
এ সংখ্যা নিয়ে আজ বড় সংখ্যার ভয়ের শেষ নেই |
অনেকে এ সংখ্যাটিকে মানচিত্র থেকে তুলে দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা বানাতে চায় |
অর্থাৎ একশ হতে চান |
ছোট সংখ্যা বড়র মধ্যে নানারকম অস্বস্তি তৈরি করে |
এর পেছনে রয়েছে বড় সংখ্যার অসম্পূর্ণতার অনুভব |
অর্থাৎ সংখ্যাধ্যিকের ধর্ম, বিশ্বাস এবং ভাষা এবং মূল্যবোধই কেবল বেঁচে থাকবে |
অন্যদের উপস্থিতি তা যত নগণ্য হোক থাকবে না |
বড় সংখ্যারা এভাবে ছোটদের দ্বারা তাড়িত হচ্ছে |
বড় সংখ্যাই মূলত ভীত হয়ে পড়ছে |
ছোট সংখ্যার উপস্থিতি তাকে অস্থির করে তুলছে |
এ বড়করণ সংস্কৃতির আরেক নাম প্রান্তিকীকরণ |
অর্থাৎ ঠেলতে ঠেলতে একেবারে কোণায় চেপে ধরা |
যেখানে সহনশীল শাসন থাকে না কর্তৃত্ববাদী বা লোকরঞ্জনবাদী কাঠামো বিদ্যমান, সেখানে এ ধারা প্রবল হবে এটাই বাস্তবতা |
এমন কর্তৃত্ববাদী কাঠামোয় যেসব প্রতিষ্ঠান ছোটদের গিলে ফেলার অপচর্চাকে মদদ দেয় রাষ্ট্র তার মধ্যে অন্যতম |
রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ ব্যবহার করে স্বার্থবাদী কায়েমি গোষ্ঠী কখনও সজোরে কখনওবা নীরবে ছোটদের খেয়ে ফেলার চেষ্টা করে |
& -এর যৌথ সম্পাদনায় : বইয়ে শুরুর অধ্যায়ে জাস্টিস রানজিনদার সাচারের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন যার বাংলা অর্থ হলো- "একটি রাষ্ট্র কতটুকু সভ্য তা যাচাইয়ের অন্যতম মাপকাঠি হলো সেই রাষ্ট্র ক্ষুদ্রজাতি সত্তাকে কতটুকু বিশ্বাস ও আস্থার সঙ্গে নিতে পারে |
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং জাস্টিস রানজিনদার সাচারের নেতৃত্বে ভারতের মুসলিমদের প্রান্তিকীকরণ চিত্র বোঝার জন্য একটি কমিশন গঠন করেন |
ভারতীয় মুসলিমদের প্রান্তিকীকরণের যে চিত্র কমিশন উন্মোচন করেছে তা কেবল বেদনাদায়ক নয়; নির্মমও বটে |
ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে একটি সম্প্রদায়কে ঠেলতে ঠেলতে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় সাচার কমিশন তা নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরেছে |
সালমান খুরশিদের : বইতেও একইধরনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে |
বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একইচিত্র লক্ষ করা যায় |
কেবল হিন্দু সম্প্রদায় নয়, সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের প্রান্তিকীকরণে তৈরি হয়েছে অনন্য নজির |
গত বছর দুয়েক আগে রাঙ্গামাটিতে এক প্রশিক্ষণে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে |
একজন আদিবাসী নারী প্রশিক্ষণের একপর্যায়ে বললেন, তারা যথেষ্ট সুন্দর নয় |
গণমাধ্যমে তারা যে মডেল দেখছেন তাতে তাদের নিজেদের আর সুন্দর মনে হচ্ছে না |
'আমি যথেষ্ট সুন্দর নেই' এমন বোধ জাগিয়ে তুলে পরিচয়ের ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি করা হচ্ছে যা মূলত সমরূপী সমাজ নির্মাণ প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করবে |
যেখানে কোনো বৈচিত্র্য থাকবে না |
দোকানে সাজানো পণ্যসমাহার দেখে বনরূপা বাজারকে রাজশাহীর সাহেব বাজার মনে হয়েছে |
পণ্য কেবল পণ্য নয় মূল্যবোধের প্রতিনিধি |
জনপরিসরে বড় সংখ্যার অপ্রয়োজনীয় বৃহৎ উপস্থিতিও চোখে পড়ে, সচরাচর পড়ল |
বৃহৎ অথচ অপ্রয়োজনীয় বড়দের এ উপস্থিতি ছোটদের মনে ভয় জাগায় |
একলাকরণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে |
সমকালীন রাজনীতির ইতিহাস হলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণের ইতিহাস |
চার্লস ডারউইন সেই বিখ্যাত উক্তি, অর্থাৎ যোগ্যরাই টিকে থাকবে মানে সংখ্যাধিক্য, শক্তি ও ক্ষমতা টিকে থাকবে; মানে ছোট সংখ্যা, শক্তি ও ক্ষমতাহীনরা টিকে থাকবে না? |
সমকালীন বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডওকিন বলছেন, পরার্থবোধ এ জগৎ-সংসার টিকিয়ে রেখেছে, মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রযোজন, প্রয়োজন সহাবস্থানের যূথবদ্ধ চেতনা |
'লাইফ অব পাই' মুভির শেষ উক্তি ডোন্ট লুজ হোপ অর্থাৎ আশা হারাবেন না |
ছোট সংখ্যা কারো অনুগ্রহে নয়, বেঁচে থাকবে তাদের সৌন্দর্য ও জীবনীশক্তি নিয়ে |
আর তা না হলে পৃথিবীর যে মৌলিক চরিত্র বৈচিত্র্য তা তো পড়বে গভীর সংকটে |
ছোট ও বড় সংখ্যার সহাবস্থানের জন্য মানবিক, জনকল্যাণমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্রের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না |
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক |
সাম্প্রদায়িকতা শ্রেষ্ঠত্ব নিজেকে বড় ভাবা |
শেয়ার করুন |
এ বিভাগের আরো খবর |
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয় |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.