content
stringlengths
0
129k
অনেক সময় দুপুরে খাওয়ার মতো টাকা ছিল না
সায়েন্সে পড়লে অবশ্যই প্রাইভেট পড়তে হয়
আমারও প্রাইভেট পড়তে হতো
কিন্তু আব্বাকে ডিস্টার্ব করতাম না
আমি আমার মতো করে চলতাম
যেহেতু কলেজে যেতে নদী পাড়ি দিতে হতো, রাতে বাসায় পৌঁছাতাম (তখন ফেরির প্রচলন ছিল) সাতটা সাড়ে সাতটায়
তখন অনেক কষ্টকর সময় ছিল
বিশেষ করে এইচএসসির সময়টা
পরে আনোয়ারা থেকে চিটাগাং শহরে চলে আসি
স্টিল মিল এলাকায় থাকতাম
এরপর আস্তে আস্তে প্রাইভেট পড়িয়ে আমি আমার লাইফ আমার মতো করে লিড করি
বলতে পারেন, এটা আমার নিজের তৈরি করা জীবন, যা খুব সহজ ছিল না
বাবা মারা যাওয়ার পর তো পরিবারের হাল আপনাকে ধরতে হয়েছিল?
আমি যখন মাস্টার্সে পড়ি তখন বাবা মারা যান
আমার ছোট ভাইয়ের বয়স মাত্র চার বছর
আরেকজনের বয়স ছয় বছর, আরেকজনের এগারো বছর, আর মেজ ভাইটা তখন কলেজে পড়ে
আল্লাহর রহমতে সবাই শিক্ষিত হয়েছে
দুজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে এবং উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করেছে
এখনো আমরা একসঙ্গে থাকি
পরিবারের সবাই মিলে থাকা, এটার আনন্দটা আলাদা
আমার একটা ছেলে একটা মেয়ে
তাদের নিয়ে ঢাকাতে থাকি
এ জন্য আমাকে ঢাকা-বরিশাল করতে হয়
ঢাকাতে দুটো ফ্যাক্টরি আছে সাভার ও আশুলিয়ায়
বরিশালের বাবুগঞ্জ থেকে এত দূর আসা সহজ ছিল না হয়তো?
আমি আগেই বলেছি, এটা আমার জন্য সহজ ছিল না
আমি যখন গ্রামে পড়ালেখা করতাম, তখন বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে কোনো দিন জুতা পায়ে দিয়ে যেতে পারিনি
জুতাটা হাতেই নিয়ে যাওয়া লাগত
আমার সেই অভিজ্ঞতা আছে
আর আমি অত ভালো ছাত্রও ছিলাম না যে একবারে পাস করে যাব! কারণ প্রাইভেট পড়তে পারতাম না, আলাদা করে শিক্ষক রাখার মতো সামর্থ্য ছিল না
আর গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিল না
কুপি বা হারিকেন জ্বালিয়ে পড়াশোনা করতে হতো
এসএসসির চার মাস আগে স্কুলের ডরমেটরিতে চলে গিয়েছিলাম
সেখানে দশ-পনেরো জনের মতো ছাত্র ছিল
আমি তখন বাবুগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতাম
বরিশাল থেকে কেন ব্যবসা শুরু করলেন?
আমি বরিশাল থেকে শুরু করিনি
প্রথম শুরু করেছিলাম চট্টগ্রাম থেকে
সেখানে পড়াশোনা এবং প্রায় দশ বছর চাকরি করেছি
সেখানে আমার স্থাপনা যেমন- ফ্যাক্টরি, বাসা, জমিজমা আছে
পরে বরিশালে শুরু করি
এদিকে গত ১ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় 'বঙ্গবন্ধু শিল্প-বাণিজ্য পুরস্কার ২০২০' ঘোষণা করে
ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন
প্রতিষ্ঠানটি মাঝারি ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে প্রথম স্থান অধিকার করে
ফরচুন গ্রুপ ইউরোপের প্রায় সবকটি দেশেই সাত-আট বছর ধরে জুতা রপ্তানি করে আসছে
বর্তমানে ঢাকা এবং বরিশাল মিলিয়ে ফরচুনের পাঁচটি আধুনিক জুতা তৈরির কারখানা রয়েছে
যা শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান
জুতা তৈরি করতে সব ধরনের ব্যাকওয়ার্ড ফ্যাক্টরিও রয়েছে ফরচুন গ্রুপের
সেগুলো হলো- এমজে কার্টন ফ্যাক্টরি, এমজে ফোম প্লান্ট, এমজে লেমিনেশন, এমজে কাটিং ডায়িং এবং এমজে এমব্রয়ডারি
ফরচুন মূলত বিভিন্ন ধরনের স্পোর্টস সু তৈরি করে থাকে
বিশ্বের অনেক বড় বড় ব্র্যান্ড তাদের জুতা সংগ্রহ করে
অতি অল্প সময়ে ফরচুন গ্রুপ বিশ্বের অনেক দেশের আস্থা অর্জন করেছে এবং এই অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে
এত বড় প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে তুললেন?
আগেই বলেছি আমার আব্বা ছোটখাটো চাকরি করতেন
তার কাছ থেকে তো কিছু পাইনি
পড়াশোনা অবস্থায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ইমপোর্ট করতাম
তখন কিছু টাকা-পয়সা হয়েছিল
আর প্রথমেই আমি বড় ফ্যাক্টরি শুরু করিনি
ছোট ছোট ফ্যাক্টরি করেছি
এরপরেই কিন্তু জুতা তৈরিতে গিয়েছি
আর চায়নার সাপ্লাইয়াররা আমাকে সহযোগিতা করেছে
যখন বরিশালে শুরু করি তখন সমস্যায় পড়েছি
আমাকে কেউ কাজ শুরু করার জন্য টাকা দিচ্ছিল না
তখন আমার কাছে মেশিন ছিল
কিন্তু কাজ শুরু করতে শ্রমিকদের যে টাকা প্রয়োজন তা কোনো ব্যাংক আমাকে দেয়নি
সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি ব্যাংকে ঘুরেছি
সর্বশেষ ইসলামী ব্যাংকের একজন ভদ্রলোক আমাকে ছোট্ট একটি 'ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল' দিয়েছিলেন
এরপর আস্তে আস্তে অনেক ব্যাংক আমাদের সাপোর্ট দেয়
এরপরই ভালো করতে শুরু করি
ব্যবসা করতে গিয়ে কখনো কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছে কি না?
২০১৪ সালে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের কারণে আমার প্রায় ২৫টি কন্টেইনার পোর্টে আটকা পড়ে
সে সময় আমরা বাস দিয়ে ওয়ার্কারদের আনা-নেওয়া করতাম
আন্দোলনের সময় আমাদের চারটি বাস ও একটি প্রাইভেটকার পুড়িয়ে দেওয়া হয়
এটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে গিয়েছিল
এ সময় ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল
অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে যায়
তখন আমার এখানে এক হাজার লোক কাজ করত
এতে প্রায় ২৫ কোটি টাকার সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলাম
আস্তে আস্তে সেগুলো রিকভারি করেছি
ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় বিষয় সততা, সততা এবং সততা
এর বাইরে কিছু নেই
অঙ্গীকার দিলে তা রাখতে হবে
সততা থাকলে কেউ থামাতে পারবে না
আর সব কাজে কর্মনিষ্ঠা থাকতে হবে
যেমন- চায়নাতে অফিসের কার্যক্রম শুরু করে সকাল নয়টায়
এ জন্য আমাকে সকাল সাতটায় কাজ শুরু করতে হয়
আবার রাত দুইটায় আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে
সকাল সাতটায় নাস্তা করতে করতে কাজ শুরু করি
ঘুমানোর আগ পর্যন্ত রাত দুইটা পর্যন্ত আমাকে কাজ করতে হয়
আমার অনেক বড় টিম থাকলেও 'প্রাইজ কোটেশন' এখনো আমি নিজে দেখি
এমন কোনো স্মৃতি আছে, যা এখনো কষ্ট দেয়...?
এমন অনেক কষ্টের স্মৃতি আছে যা স্মরণ করলে সময় শেষ হবে না
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় আমরা চট্টগ্রামে ব্যাচেলর বাসায় থাকতাম
আমার ছোট ভাইও একটু দুষ্টু
ও (বর্তমানে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার) তখন অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে; আমার সঙ্গে থাকত
তখন ছোট ভাই পুকুরে গিয়ে গোসল করত
একদিন পুকুরের মালিক আমার ছোট ভাইকে চরম পিটিয়েছিল, যা দেখে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম
তখন আমি কাউকে কিছু বলিনি
তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমি কিছু করব বা এখানেই আমি কিছু করে দেখাব
পরে আমি ওই পুকুরের জায়গাতে জমি কিনেছি