content
stringlengths
0
129k
তিনি যে লিঞ্চিওনির বক্তব্যগুলো স্বয়ং আত্মস্থ করেই অনুবাদকর্মটি সম্পাদন করেছেন, তা অনূদিত বইটির প্রাঞ্জল ঝরঝরে গদ্য আর প্রকাশভঙ্গির স্বতঃস্ফূর্ততার দিকে লক্ষ করলেই বোঝা যায়
বইটি সম্পর্কে তিনি তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে :
লেখক এই বইটির নাম দিয়েছেন -" "
তিনি এই 'সিইও' শব্দটি দিয়ে আসলে একজন 'লিডার' কে বুঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন
একজন লিডার যখন তার দায়িত্ব ও ক্ষমতা পেয়ে যান, তখন তিনি নিজেকে একটু আলাদা ভাবতে শুরু করেন
অনেক সময় এই আলাদা ভাবাই তাকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে দাঁড়ায়
যে লিডার তার ফলোয়ারদের কাতারে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভাবতে পারেন না, সে খুব দ্রুতই ফলোয়ারদের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা হারান
গ্রেট লিডার হতে হলে পাঁচটা টেম্পটেশনের উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হয়
...লেখক একটি রূপক গল্পের মাধ্যমে সুন্দরভাবে ঐ টেম্পটেশনগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন
...কিশোর বয়স থেকেই এই টেম্পটেশনগুলো জেনে নিয়ে সেগুলো ওভারকাম করার ক্রমাগত প্রাকটিস করতে থাকলে গ্রেট লিডার হওয়ার পথ কেউ রুখতে পারবে না
(অনুবাদকের কথা : দ্য ফাইভ টেম্পটেশন অব এ সিইও)
লেখক মোট চারটি প্রধান খণ্ডে ভাগ করে তাঁর বক্তব্যগুলোকে গ্রন্থবন্ধ করেছেন
প্রথম খণ্ডে স্থান দিয়েছেন এগারোটি অধ্যায়ের
প্রথম অধ্যায়ে পাঠকের সাথে সাক্ষাৎ মিলবে "এন্ড্রু ও'ব্রেইন", সংক্ষেপে "এন্ড্রু" নামধারী এই গল্পের নায়কের
সে ট্রিনিটি সিস্টেম নামক একটি টেকনোলজি কোম্পানির সিইও
'গত এক বছরের কাজের রিপোর্ট আর জবাবদিহি নিয়ে আগামীকাল তার প্রথম বোর্ড মিটিং'
এ-নিয়ে সে খুবই চিন্তিত
সাধারণত সে অফিস থেকে দেরি করে না-বের হলেও সে আজ অফিস থেকে সবার শেষে বেরিয়েছে; অফিসের হলরুমে হাঁটার সময়ও আজ তার খুব অস্বস্তি বোধ করছিল; বিচলিত মনে সে ভাবছে, কাল সদস্যদের কাছ থেকে তার কতই না নেগেটিভ কথা শুনতে হবে, কেউ হয়তো তার কাঁধ চাপড়ে বাহবাও দেবে না; এক কথায় বলা চলে সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক বছরে তার...
তার তখন মনে পড়ে একটি প্রবাদ, 'যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ'
এভাবেই এগিয়ে চলে গল্পের গতি
পাঠকরাও এন্ড্রু'র সাথে সাথে এগিয়ে যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে দেখা যাবে, যে পথ দিয়ে এন্ড্রু গাড়ি নিয়ে যাত্রা করেছে, সে পথ দিয়ে আর কোনো গাড়ি-ই যাচ্ছে না
যদিও 'মেরামতের জন্য সেই রাস্তাটি বন্ধ থাকবে' এমন নোটিশ এন্ড্রু গত দু'সপ্তাহে বহুবার দেখেছে, তা-সত্ত্বেও আগামীকালের বোর্ড-মিটিংয়ের দুশ্চিন্তায় ভুল করে সেই পথেই সে চলে এসেছে
এন্ড্রু যেন আজ এক উদ্ভ্রান্ত পথিক
সে সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না, কী করবে...! তার এই উদ্ভ্রান্ত দশাকে লেখক উপস্থাপন করেছন এভাবে-
একবার ভাবল, অফিসের কাছে ভালো একটা হোটেলে থাকবে
রাতে জামা কাপড় লন্ড্রি সার্ভিসে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেবে
হোটেলে বসেই মিটিংয়ের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেবে
কিন্তু নাহ্! পরক্ষণেই তার মনে হলো নিজের বাড়িতে গিয়ে অন্তত দু'ঘণ্টা শান্তিতে ঘুমানো দরকার
যদিও এন্ড্রু নিজের বউ বাচ্চাদের সামনে খুব ভাব নিয়ে থাকে, তবুও তার মনে হল- নৈতিক ও মানসিক সাপোর্টের জন্য বউ-বাচ্চাদের সঙ্গ তার একান্ত প্রয়োজন
অতঃপর এন্ড্রু দরকারি কাগজপত্র ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে, কোট হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়
উঠে গিয়ে একটি লোকাল ট্রেনে
সেখানে বিধ্বস্ত এন্ড্রু'র সাথে দেখা হয় ধূসর শার্ট পরিহিত এক বয়স্ক ভদ্রলোকের সাথে
যার নাম- "চার্লি"
চার্লি গল্পের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র
চার্লি একরকম গায়ে পড়েই এন্ড্রুর সাথে গল্প করতে চায়
চার্লিকে প্রথমে বিশ্বাস করতে না-পারলেও পরবর্তীতে চার্লির ইচ্ছাতেই এন্ড্রু তার সাথে কথোপকথন শুরু করে
চার্লি নিজেকে পরিচয় দেয় একজন রেইলরোড কোম্পানির প্রেসিডেন্টের ছেলে হিসেবে
চার্লির সাথে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে তৃতীয় অধ্যায়ে
চতুর্থ অধ্যায়ে এসে দু'জনের মধ্যে গল্পটা জমে ওঠে
চার্লি ও এন্ড্রুর মধ্যকার কথোপকথনের শুরুর অংশটি চমৎকার নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন লেখক
বইটি না-পড়ে সে নাটকীয়তার নাট্যরস আস্বাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়
যা-ই হোক, শুরুর দিকে চার্লিকে এন্ড্রু বিশ্বাস করতেই পারছিলো না
তবুও একটা অবজ্ঞামিশ্রিত সংশয়াচ্ছন্নতার মধ্য দিয়েই চার্লিকে সে তার সমস্যাগুলো বলতে শুরু করে
লেখক এন্ড্রুর মানসিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
...অবশ্য এন্ড্রুর মনের মধ্যে সংশয় কাজ করছিল
সে ভাবল, 'আমি একটা কোম্পানির সিইও
আর আমি আমার সমস্যার কথা এক পাগল বুড়োর কাছে বলতে যাচ্ছি
আমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? মনে তো হয় কিছুটা হলেও খারাপ হয়েছে
এ কারণেই তো তাঁকে এসব কথা বলতে যাচ্ছি
' (পৃ. ৩৫)
আলোচনার প্রারম্ভেই চার্লি বুঝে ফেলে এন্ড্রুর মানসিক বিপর্যস্ত পরিস্থিতির কথা :
চার্লির জবাব, "ও! তাই নাকি! তুমি কি জান, তুমি যে টেম্পটেশনের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছো
ভাবছ, কী করে বুঝলাম? আর তা বুঝা একেবারেই সহজ কাজ
ঐ যে তুমি জানো যে, তোমার দুর্দিন যাচ্ছে, কিন্তু তুমি নাকি তার জন্য দায়ী না
সিইও'দের সাধারণত পাঁচটা টেম্পটেশন থাকে
তুমি কিন্তু ইতোমধ্যে এক বা একাধিক টেম্পটেশনের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছ
" (পৃ. ৩৮)
এরপর চার্লি এক এক করে সিইও'দের পাঁচটি টেম্পটেশন নিয়ে এন্ড্রুর সাথে আলোচনা করে
পঞ্চম অধ্যায়ে আলোচনা করে প্রথম টেম্পটেশন নিয়ে
চার্লি এন্ড্রুর কাছে জানতে চায়, এন্ড্রুর ক্যারিয়ারের সেরা দিন কোনটি, সে-সম্পর্কে
এন্ড্রু দু'সেকেন্ড ভেবেই জানিয়ে দেয়- সে যেদিন সিইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিল, সেটাই ছিল ক্যারিয়ারের সেরা দিন
কিন্তু এখানেই আপত্তি চার্লির
সে এন্ড্রুর বক্তব্যকে 'হাউ ফানি' বলে উড়িয়ে দেয়
সে একের পর এক যুক্তি উপস্থাপন করে জানায়, আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট কখনোই নির্বাচিত হওয়ার দিনকে ক্যারিয়ারের সেরা দিন বলবে না, বলবে- যেদিন সে দেশের জন্য অনেক ভালো কিছু করে দেখাতে পারবে সেই দিনকে; একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের প্রধান কখনো সরকারি অনুদান পাওয়ার দিনকে তার ক্যারিয়ারের সেরা দিন ভাববে না, ভাববে- যেদিন সে অনুদা...
চার্লির ভাষায় :
...মূলত যাঁরা গ্রেট সিইও তাঁরা এসব ব্যাপার নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না
তাঁরা শুধু তাঁদের কাজের মাধ্যমে সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়
তাঁরা চান কোম্পানির আরো উন্নত হোক, নিজের ইগো নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই
এমনিভাবে কীভাবে একজন সিইও নিজের ক্যারিয়ার, পদমর্যাদা, ভাবমূর্তি ও ইগোর কবলে পড়ে প্রথম টেম্পটেশনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েন, তা চার্লি ও এন্ড্রুর সুবিস্তৃত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে নাট্যিক আবহে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক
বইটির ঘটনাপ্রবাহ পড়তে গিয়ে পাঠকদের জন্য সবচেয়ে পরিতৃপ্তির বিষয় হচ্ছে- বর্ণনাগুলোকে কখনো একঘেয়ে বা ক্লান্তিকর মনে হবে না
লেখক মোটেই নিরস তত্ত্বকথা উপস্থাপন করেননি, অত্যন্ত সরসভাবে একেবারে গল্পের ভঙ্গিতে দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে বর্ণনাটি ফুটিয়ে তুলেছেন
ভাষারূপ দিয়েছেন চারপাশের অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির চমৎকারসব বর্ণনা
হঠাৎ করেই ট্রেনের বগিতে আলো চলে যাওয়া, আলো চলে যাওয়ার পরের ভূতুরে পরিবেশ, আবার আলো জ্বলে ওঠার রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির বর্ণনা প্রভৃতি বিষয়গুলো খুবই চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই বইয়ে
বইটির প্রথম খন্ডের 'ছয়'সংখ্যক অধ্যায়ে চার্লি আলোকপাত করে দ্বিতীয় টেম্পটেশন সম্পর্কে
চার্লির মতে, সিইও হিসেবে দায়িত্ব পাওয়াটা কঠিন হলেও সিইও'র কাজগুলো পরিচালনা করা মোটেই জটিল নয়
কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই এন্ড্রু তা মেনে নিতে পারে না
এন্ড্রুর যুক্তি : কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, নতুন নতুন টেকনোলজি, বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক পরিবর্তন, ব্যবসার নিয়ম কানুনের অদল-বদল, সস্তা শ্রমবাজার, ট্যাক্স, ভ্যাট, ঘুষ ইত্যাদি কত ধরনের ব্যাপার স্যাপারের কারণে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক জটিল হয়ে গিয়েছে
চার্লিও নাছোড়বান্দা! এন্ড্রুর এসব যুক্তি মানতে সে পুরোপুরি নারাজ
এভাবেই জমে ওঠে গল্প
এন্ড্রু তার জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অফিসের অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের জবাবদিহিতা আদায় করে নিতে পারেনি, সে টেরিকে সঠিক উপায়ে চাকরিচ্যুত করেনি, যদি তাকে পূর্ব-সতর্কতা ব্যতীত চাকরিচ্যুত করে দেয়া হয় তাহলে এন্ড্রুর কেমন লাগবে- এমনি নানা প্রশ্নে এন্ড্রুকে জর্জরিত করে চার্লি
যুক্তির পর যুক্তি উপস্থাপন করে চার্লি এন্ড্রুকে বুঝিয়ে দেয় যে, সে আসলে নিজের জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে অধস্তনদের কাছ থেকে কাজের সঠিক জবাবদিহিতা আদায় করে নিয়ে পারেনি; আর এটিই হচ্ছে একজন সিইও'র দ্বিতীয় টেম্পটেশন
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর ভাবনাগুলো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একজন সিইও কী করে থাকে, অথচ তার কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয় প্রভৃতি নানা বিষয় এন্ড্রু ও চার্লির কথোপকথনের মধ্যে ফুটে উঠে
তাদের আলোচনায় পাঠকের সামনে বেরিয়ে আসে মজার মজার সব তথ্য
সে-সব নাট্যরসে ভরপুর তথ্যাবলি সত্যি-ই খুব উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয়
পরবর্তী অধ্যায়ে তৃতীয় টেম্পটেশন 'দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতা'সম্পর্কে আলোকপাত করে চার্লি
কেন একজন সিইও স্বল্প তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সঠিক সময়ে দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, তার দুর্বলতাগুলো কী কী, এন্ড্রু-ই বা কী কী ভুল করেছিল, একজন সিইও হিসেবে এন্ড্রুর কী করা উচিত হয়নি বা কী করা উচিত সে-সব সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করে চার্লি
গল্পের শুরুতে চার্লির প্রতি এন্ড্রুর যে বিরক্তি ও সংশয় ছিল, এ-পর্যায়ে এসে তা আর অবশিষ্ট থাকে না
এখন সে নিজের আগ্রহ থেকেই চার্লির কাছে তার সমস্যা তুলে ধরছে, এবং সমাধানের পথ জানতে চাইছে
আর চার্লিও দিয়ে চলছে একের পর এক উপদেশ
একটি দৃষ্টান্ত :
...একজন সিইও'র ' ' এ তিনটি শব্দের বাক্যটি বলার সৎ সাহস থাকতে হবে
শুধু পাশ কাটিয়ে চলে যাবার জন্য বললে হবে না বরং এমনভাবে বলতে হবে, যেন অন্য টিম মেম্বাররা বুঝতে পারে, সেইও সাহেব সত্যিই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন
...একজন সিইও তাঁর সিদ্ধান্ত হতে ভুল প্রমাণিত হলে কখনোই অস্বস্তিতে পড়বেন না
তিনিই 'গ্রেট সিইও' যিনি ওই ধরনের অবস্থায়ও খুবই স্বাভাবিক থাকতে পারেন
তাহলে পরবর্তীতে কোম্পানির মারাত্মক দুর্দিনেও অল্প তথ্যের সাহায্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে সৎ সাহস পাবেন
অষ্টম অধ্যায়ে পাঠকদের সাক্ষাৎ মিলবে আরও তিনজন বৃদ্ধ লোকের সাথে- একজন লম্বু লোক, একজন টেকো লোক ও অপরজন ফিটফাট বাবু
লোকগুলোর নামের দিকে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, তাদের সাথে এন্ড্রু ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কতোটা হাস্যরসাত্মক ও উপভোগ্য হতে পারে
তাদের মধ্যে আলোচনা হয় চতুর্থ টেম্পটেশন নিয়ে
ঘটনার ধারাবাহিকতায় এন্ড্রু জানতে পারে তারা সকলেই এক একজন সিইও ছিলেন; এবং সকলেই কোনো না কোনো টেম্পটেশনে জড়িয়ে পড়েছিলেন