content stringlengths 0 129k |
|---|
তখন তাদের ধ্বংস করে বেহেশতে ফিরে গেলো |
জিনের দল নিশ্চিহ্ন হওয়ায় দুনিয়া খালি পড়ে রইলো |
দোজখ (নরক) সব শুদ্ধ সাতটা |
তার মধ্যে যে দোজখে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশী গোনাগারদের (পাপিদের) রাখা হয়, তার নাম সিজ্জীন |
দুনিয়ার নিচের পাতাল এবং পাতালেরও অনেক নিচে সেই সিজ্জীন দোজখ |
সেখানে দিনরাত শুধু দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে |
এত আগুন হবু সেখানে ভয়ঙ্কর অন্ধকার |
সেই অন্ধকারের মধ্যে আজাযিলের জন্ম হয় |
এই আজাযিল ভাল মানুষের দুশমন |
দুনিয়ার মধ্যে তার মতো পাপি এখন আর কেউ নাই |
সে শুধু নিজে পাপ করে না, প্রলোভন দ্বারা সকলকে পাপের পথে নিয়ে যায় |
কিন্তু চিরকাল সে এমন ছিল না |
তার মতো ধার্মিক এবং সৎ ফেরেশতারা অবধি হতে পারে নি |
সত্যি সত্যি একদিন সে সকল ফেরেশতাদের সরদার ছিলো |
খোদার নিকট তার মরতবা (মর্যাদা) অন্য সব ফেরেশতাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিলো |
আজাযিল জন্মের পরে কিন্তু অন্য জানোয়ারদের মতো বৃথা সময় নষ্ট করেনি |
সে খোদার এবাদতে মশগুল হয়ে পুরা একটি হাজার বছর কাটিয়ে দিয়েছিল |
সমস্ত দোজখে তিল পরিমাণ জায়গাও ছিলো না যেখানে দাঁড়িয়ে খোদার উপাসনা করেনি |
খোদা খুশী হয়ে তাকে সিজ্জীন দোজখ থেকে পাতালে আসবার অনুমতি দিলেন |
কিন্তু এখানে এসেও তার অহঙ্কারের লেশমাত্র দেখা দিলো না |
বরষ্ন খোদাতা'লার এবাদতে আরো অধিক মনোযোগ প্রদান করলো |
দেখতে দেখতে হাজারবছর কেটে গেলো এবং এমন এতটুকু জায়গা ফাঁক রইলো না, যেখানে দাঁড়িয়ে সে খোদার উপাসনা করলো না |
এমনি করে আরো হাজার বছর কেটে গেলো |
খোদা তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দুনিয়ার উপরে নিয়ে এলেন |
কিন্তু এত উন্নতি করেও সে খোদাকে ক্ষণকালের জন্যও ভুললো না |
দিনরাত খোদার এবাদতে মশগুল হয়ে রইলো |
করুনাময় খোদাতা'লা এবার তাকে প্রথম আসমানে তুলে নিলেন |
এমনিভাবে খোদাকে স্তবস্তূতিতে খুশী করে এক ধাপ এক ধাপ করে সে একেবারে আসমানে উঠতে লাগলো |
এক এক আসমানে হাজার বছর করে সাত হাজার বছর ধরে আহার নেই, নিদ্রা নেই, দিনরাত কেবল রোজা আর নামাজ, নামাজ আর রোজা করে সে কাটালো |
কোনো দিকে তার লক্ষ্য নেই, একম মনে এক প্রাণে খোদার উপাসনায় মশগুল হয়ে রইলো |
খোদা তার ওপরে খুব খুশী হয়ে দোজখের না-পাক (অপবিত্র) জানোয়ারকে বেহেশতে আসবার অনুমতি দিলেন |
তাহলে তোমরা দেখছো, না-পাক জানোয়ারও নিজের সাধনার বলে মত উন্নতি করতে পারলো |
কোথায় ছিলো আর কোথায় এলো |
বেহেশতে এসে তার মনে এতটুকু দেমাগ বা এতটুকু অহঙ্কার দেখা দিল না |
ফেরেশতাগণ যখন হাসিখুশী ও আমোদ-প্রমোদে রত থাকতো, তখন আজাযিল খোদার এবাদতে মগ্ন হয়ে থাকতো |
মনে তার সুখ নেই -শান্তি নেই, চোখ দিয়ে কেবল ঝর-ঝর ধারায় পানি পড়তো |
সে খোদার কাছে এই আরজ করতোঃ হে এলাহী আলমিন, তোমার এবাদত বন্দেগী কিছুই করতে পারলাম না |
আমার গোনাহ মাফ করো |
আমি বেহেশত চাই না -আমি চাই তোমাকে |
এইরূপ বেহেশতের আমোদ-আহলাদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সমস্ত অগ্রাহ্য করে সে আরো হাজার বছর খোদার এবাদতে কাটিয়ে দিলো |
এবার খোদাতা'লা তার ওপর অতিশয় সদয় হয়ে ফেরেশতাদের সরদার করে বেহেশতের খাজাঞ্চী করে দিলেন |
হলে কি হবে, তথাপি সে আল্লাহকে এক মুহুর্তের জন্যও ভুললো না |
দিনরাত আল্লাহর নামে মশগুল হয়ে রইল, আর মাঝে মাঝে বেহেশতের মিনারের ওপরে উঠে আল্লাহতা'লার উপাসনার উপকারিতা সম্বন্ধে ফেরেশতাদের উপদেশ দিতে লাগলো |
ফেরেশতাগণ তার জ্ঞান ও বুদ্ধি দেখে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলোঃ আজাযিল খোদার অতিশয় পিয়ারা (প্রিয়) |
যদি আমরা খোদার কাছে কখনো কোন প্রকার বেয়াদবি করে ফেলি, তাহলে তার সুপারিশে আমরা বেঁচে যাবো |
খোদা তার কতা না শুনে পারবেন না |
এমনই করে ফেরেশতাদের মধ্যে মরতবা দিনে দিনে বেড়ে যেতে লাগলো |
কিন্তু যার এত মরতবা তার আশা এখনো মিটলো না |
এখনো খোদার এবাদত ছাড়া আর কোন দিক লক্ষ্য নেই |
নিরালায় বসে কেবল খোদার যিকির করতে লাগলো |
এইরূপে আরো হাজার বছর কেটে গেলো |
সজল নয়নে কেবলই সে খোদার কাছে আরজ করতে লাগলোঃ হে রহমান, তুমি আমাকে দোজখ থেকে বেহেশতে এনেছো |
এখন আমাকে মেহেরবানি করে একবার 'লওহে মহফুযে' তুলে নাও |
খোদা তার আরজ মঞ্জুর করলেন |
সেখানে দিয়েও খোদার নাম ছাড়া অন্য কিছুই মনের মধ্যে সে স্থান দিলো না -দিনরাত খোদার উপাসনায় একেবারে ডুবে রইলো |
একদিন সে দেখতে পেলো 'লওহে-মহফুযের' এক জায়গায় লেখা রয়েছে, "একজন ফেরেশতা ছয় লক্ষ বৎসর খোদার উপাসনা করিবার পরও যদি সে একটিবার খোদার আদেশ অমান্য করে, তা হলে সে চরম দুর্দশাপ্রাপ্ত হবে |
তখন থেকে তার নাম হবে ইবলিশ" |
আজাযিল ভয়ে কাঁপতে লাগলো! তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো |
কোন দিক তার হুঁশ নেই -ধীর স্থিরভাবে পাথরের মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খোদার দরগায় আরজ করতে লাগলো |
এমনিভাবে পাঁচ লক্ষ বছর কেটে গেলো |
একদিন খোদা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন আজাযিল, এখানে কেউ যদি আমার একটি মাত্র আদেশ অমান্য করে, তবে তাকে কি শাস্তি দেওয়া উচিত? |
আজাযিল প্রত্যুত্তর করলোঃ কেউ যদি আপনার আদেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে আপনার দরবার থেকে চিরদিনের জন্য দূর করে দেওয়া উচিত |
খোদা বললেনঃ বেশ কথা |
তুমি এখানে ঐ কথাগুলি লিখে রাখ |
আজাযিল খোদার হুকুম পালন করলো! |
তোমাদের হয়তো স্মরণ আছে, আল্লাহর নির্দেশে আজাযিল জিনবংশ গারত করবার পরে দুনিয়া খালি পড়ে থাকে |
খোদার বোধ হয় খেয়াল হলো যে, তিনি জিনদের বদলে মানুষ দ্বারা দুনিয়া পূর্ণ করবেন |
তিনি সে কথা ফেরেশতাদের বললেন |
তারা জবাব দিলোঃ হে পরোয়ারদিগার, একবার তুমি জিন পয়দা করে ঠকেছো |
তারা কেবল ঝগড়াঝাটি মারামারি করে দিন কাটিয়েছে |
আবার এখন মানুষ সৃষ্টি করে ফ্যাসাদ বাড়িয়ে কি লাভ! আমরা তো তোমার এবাদতে মশগুল আছি |
খোদা হেসে বললেনঃ দেখ ফেরেশতাগণ, আমি কি তোমাদের চেয়ে বেশি বুঝিনা |
এই কথা শুনে তারা খুব লজ্জা পেলো |
তার বিনয়ের সঙ্গে বললোঃ হে রহমানুর রহিম |
তোমার খেয়াল বুঝবার ক্ষমতা কারো নেই |
খোদতা'লা হযরত আদমকে সৃষ্টি করবার ব্যবস্থা করলেন |
তিনি দুনিয়া থেকে একমুষ্টি মাটি নিয়ে হযরত আদমের শরীর সৃষ্টি করবার হুকুম দিলেন এবং দেহের মধ্যে আত্মা প্রবেশ করবার পূর্বে মাটিটুকুকে বেহেশতের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেবার ব্যবস্থা করলেন? |
একদিন আজাযিল ফেরেশতাদের সঙ্গে বেড়াতে বেড়াতে সেখানে এসে হাজিল |
আদমের চেহারা দেখে সে খুব হাসতে লাগলো |
তারপর তাঁকে নিয়ে এমন বিদ্রূপ শুরু করলো যে, ফেরেশতারা তাকে বললোঃ দেখ আজাযিল! খোদা যাকে খলিফারূপে দুনিয়ায় পাঠাবার জন্য পয়দা করেছেন, তাঁকে নিয়ে তোমার এরূপ বেয়াদবি করা উচিত নয় |
ফেরেশতাদের কথায় আজাযিল কিছুমাত্র লজ্জাবোধ করলো না, বরং অবজ্ঞাভরে বললোঃ বলো কি, খোদা এই মাটির ঢেলাকে খলিফারূপে দুনিয়ায় পাঠাবেন! তিনি যদি একে আমার অধীন করে দেন, তাহলে আমি এক্ষুণি একে গলা টিপে মেরে ফেলবো; আর আমাকে যদি এর অধীন করে দেন তবে আমি কিছুতেই মানবো না |
আজাযিলের স্পর্ধা দেখে ফেরেশতারা অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে গেলো |
আজাযিল সেই মাটির মূর্তিটির সুমুখে খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কি চিন্তা করলো, তারপর তার নাক দিয়ে তার শরীরের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টা করলো |
কিন্তু কিছুদূর গিয়ে বড় মুস্কিলে পড়লো |
তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বের হয়ে এসে সেই মূর্তির গায়ে থুথু দিয়ে সেখানে থেকে চলে গেল |
খোদার আদেশে এক শুভ মুহুর্তে হযরত আদমের আত্মা তাঁর শরীরে প্রবেশ করলো |
তারপর তাকে বিচিত্র পোশাকে সজ্জিত করে একটি অনিন্দ-সুন্দর সিংহাসনে বসানো হলো |
এইরূপে নিজের খলিফাকে সৃষ্টি করে খোদাতা'লা ফেরেশতাদের বললেনঃ আমি হযরত আদমকে তোমাদের চেয়ে বড় করে পয়দা করেছি |
তোমরা এসে সেজদা (প্রণাম) করো |
খোদার আদেশ পেয়ে ফেরেশতারা অতিশয় ভক্তিতে ও শ্রদ্ধায় আদম আলাইহিসসালামকে সেজদা করলো |
কিন্তু আজাযিল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো |
সেজদা তো করলোই না -এমন কি মাথা পর্যন্ত নোয়াল না |
ফেরেশতারা আজাযিলের এই স্পর্ধা দেখে তাজ্জব হয়ে গেলো |
খোদা আজাযিলকে বললেনঃ আজাযিল! আমার হুকুমে ফেরেশতাগণ আদমকে সেজদা করলো, কিন্তু তুমি তাকে সেজদা করলে না কেন? |
আজাযিল জবাবা দিলোঃ হে খোদা! আদমকে দুনিয়ার না-পাক মাটি থেকে পয়দা করছো, কিন্তু তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করছো |
আমি তাকে সেজদা করিতে পারি না |
অতিশয় অসন্তুষ্ট হয়ে খোদা বললেনঃ রে মুর্খ, আত্ম-অহঙ্কারে তুই আমার হুকুম অমান্য করেছিস! জানিস তাকে মাটি থেকে পয়দা করবার ব্যবস্থা আমিই করেছি -আমিই তাকে ফেরেশতাদের বড় করেছি, আর আমিই তাকে সেজদা করতে বলেছি |
কিন্তু এত স্পর্ধা তোর কিসে হলো? তুই এতদিন আমার এবাদত করেছিস সেই জন্য কি? কিন্তু তুই-ই না লওহে-মহফুযে' লিখে রেখেছিস লক্ষ লক্ষ বৎসর আমার এবাদতে মশগুল হয়ে থাকলেও আমার একটি মাত্র আদেশ অমান্য করলে সমস্ত এবাদত পণ্ড হয়ে যাবে? তুই আজ থেকে মরদুদ হয়ে গেলি |
তুই আমার দরবার থেকে দূর হয়ে যা |
খোদা এই কথা বলবার সঙ্গে সঙ্গে আজাযিলের চেহারা বিশ্রীরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেলো |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.