content stringlengths 0 129k |
|---|
বেশ কাজ হলো ওতে |
এই দু'মাসে আমি ওকে বোঝাতে পারলাম আমারও কিছু একটা করা দরকার |
তা না হলে মাস্টার্স পাশ করলাম কেন? ওই কষ্টটুকু না করলেও তো এমন আহামরি কোন ক্ষতি হতো না |
আমার স্বামী কি মনে করে আবার নরম হলো |
দু'মাসের ছুটি শেষ করে আবার স্কুলে জয়েন করলাম |
এবারে কিন্তু একটা অদ্ভূত কাণ্ড করে বসলো আমার স্বামী বেচারা |
বলা নেই, কওয়া নেই |
হুট করে একদিন চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে বাসায় মিষ্টি নিয়ে আসলো কেজি দশেক |
আমি ব্যাপারখানা জিজ্ঞেস করতেই বললো, আর বলো না আজকে প্রমোশন হলো আবার |
আর অফিসে যেতে হবে না |
তাই সবাইকে মিষ্টি মুখ করাতে চাই এই আর কি |
আমি আকাশ থেকে পড়লাম, তোমার প্রমোশন হয়েছে অথচ অফিসে যেতে হবে না! তার মানে কি? তুমি কি রিজাইন দিয়ে এসেছ? |
আমার কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো আমার স্বামী বেচারা |
হাসতে হাসতে দম বন্ধ হবার জোগাড় আর কি |
এটা একদম ব্যতিক্রম তার জন্য |
যদিও সে হাসিখুশী থাকে সব সময় |
তারপরও এ রকম পাগলের মত হাসে না কখনো |
এক সময় হাসি থামিয়ে বললো, জানো আমি রিজাইন না করলে হয়তো আগামী মাসে আমাকেই ছাটাই করতো |
কারণ, কোম্পানীর ভীষণ মন্দা যাচ্ছে, সিঙ্গাপুর আর ইউকে'তে দু'দুটো বড় ডিল বাতিল হয়ে গেছে |
এরপর থেকেই হাই প্রোফাইল কয়েকজন অফিসার রেখে মিড রেঞ্জের সেন্ট পারসেন্ট অফিসারকে ছাটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোম্পানী |
এর মাস খানেকের মধ্যেই আত্মকর্মসংস্থানে নেমে পড়ে আমার স্বামী বেচারা |
তেমন কিছু না, একটা কম্পিউটার-ফটোকপি'র দোকান দিয়ে বসে বাসার কাছেই |
শুরু হয় তার নতুন জীবন |
একা একা সামলাতে পারে না বলে এক বন্ধুকে দিয়ে গ্রাম থেকে এক ছেলেকে আনিয়ে নেয় দোকানের জন্য |
একেবারে গেঁয়ো ছেলে |
লুঙ্গি পড়েই দোকান করে প্রথম কয়েকদিন |
নামটাও গেঁয়ো, আবুইল্যা |
আমি তো শুনে হাসতে হাসতেই শেষ |
ওর নাম পাল্টে রাখলাম আব্দুল আলী |
আলী বলেই ডাকতে থাকতে থাকে সবাই |
দোকানেই থাকে, দোকানেই ঘুমায়, ঘরে এসে খেয়ে যায় তিন বেলা |
খাবার ব্যাপারেও তাকে দেখি খুব সাধারণ |
আমার স্কুল বন্ধের দিন তিন বেলাই আমি নিজ হাতে খাবার বেড়ে পর্দা ফাঁক করে খেতে দেই |
ও হাত বাড়িয়ে নেয় |
আর অন্যান্য দিন আমার রান্না করে রেখে যাওয়া খাবার আমার স্বামী আর ও মিলে ড্রইং রুমে নিয়ে খেয়ে নেয় নিজেদের মতো করে |
ও হ্যা, এই ফাঁকে আমার অনুপস্থিতিকালীন সময়টুকু বাচ্চাদের পিছনে ব্যয় করতে শুরু করে আমার স্বামী |
আমিও একটু দুশ্চিন্তামুক্ত হই |
যেদিন আমার ছুটি থাকে, সেদিন সকালের নাস্তা আমি নিজ হাতে বেড়ে দেই |
ছেলেটা একাই খেতে আসে, আর আমার স্বামী দোকানে বসে |
ছেলেটা নাস্তা খেয়ে যাওয়ার পর খেতে আসে আমার স্বামী |
আব্দুল আলী নাস্তা খেতে আসলে জোগাড়যন্ত্র করে পর্দার ওপার থেকে এগিয়ে দেই আমি, আর ও ড্রইং রুমে বসে খেয়ে নেয় |
এ রকম একদিন দু'দিন করতে করতে প্রায় তিন বেলাই আমার স্বামী আর আলী পালা করে খেতে আসতে শুরু করে |
এভাবেই চলছিল ঠিকঠাক মতো সবকিছু |
আমি পর্দার আড়াল থেকেই ওর খাদ্যাভ্যাসের ভালোমন্দ সবকিছুই জেনে ফেলি এক সময় |
পান্তা খেতে ভীষণ পছন্দ তার |
বলে কিনা পান্তা খেলে তার পেট ঠাণ্ডা থাকে |
রুটি বেশি খেলে তার জন্ডিস হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি |
পান্তা পেলে ডিম ভাজি আর কাঁচা মরিচ দিয়ে চটকে ঝাল করে খায় |
আমি আড়াল থেকে দেখি পর্দা ফাঁক করে |
ওর মজা করে খাওয়া দেখে আমিও মাঝে মাঝে টেস্ট করি |
মাঝে মাঝেই ছেলেটার বাড়ীর খোঁজখবর নেই |
তার মা'র কথা জিজ্ঞেস করি |
বাবার কথা জিজ্ঞেস করি |
ওর বাবা থাকে দুবাই, অনেক বছর হলো |
দুয়েক বছরের মধ্যেই চলে আসবে |
ওর বড় ভাই দুটোও বাবার সাথেই দুবাই থাকে |
ওরা সবাই কয়েক বছরের মধ্যে দেশে ফিরে ব্যবসা শুরু করবে এমনই চিন্তা-ভাবনা |
আমি তার কথায়-কাজে মজা পাই |
বেশ ভালো লাগে, মায়া হয় ছেলেটার জন্য |
এরই মধ্যে বছর না ঘুরতেই একবার জন্ডিসও হয়ে যায় তার |
তখন আমার স্বামীই একজন লোক দিয়ে জোর করে তাকে বাড়ীতে পাঠিয়ে দেয় |
মাসখানেক পরে অসুখ থেকে উঠে আবার ঠিকই দৌড়ে চলে আসে ছেলেটা |
এই মাসখানেক কেমন যেন ছন্দপতনের মতো মনে হচ্ছিল আমার সবকিছুতে |
আমার স্বামীর সাথে তো আমার গল্প করাই হতো না, যাও একটা মানুষ ছিল- সেও নেই |
রাত নয়টা না বাজতেই বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে আর আমি বসে বসে অপেক্ষা করতে থাকি আলী'র জন্য |
ও খেতে এলে প্রায় ঘন্টাখানেক লাগিয়ে দেয় |
আমার স্বামী তাতে কিছু মনে করে না |
বরং খুশিই হয় একটু রিলাক্স দিতে পেরেছে বলে |
এই একটু টিভি দেখে, একটু কথা বলে, আবার খায়, খেতে খেতে গল্প বলে, ছেলেমানুষী সব গল্প, দোকানে কাস্টমারদের সাথে আমার স্বামীর মজার মজার কথাবার্তা ইত্যাদি ইত্যাদি |
ততোদিনে আলীর বছর দেড়েক পার হয়ে গেছে আমাদের বাড়ীতে |
সে এখন এই পরিবারেরই সদস্য |
যারা চেনে না, তারা সবাই ওকে আমার কোন তুতো ভাই মনে করে বসে থাকে |
অনেক পরিবর্তন হয়েছে তার |
গেঁয়ো ভাবটি একদমই উবে গেছে, একদম কচি খোকা খোকা ভাবটা কেটে গেছে, কথাবার্তায় অনেক স্মার্ট হয়ে গেছে সে |
আর তার আচার-আচরণও কেমন বদলে গেছে বলে মনে হলো আমার কাছে |
কারণ, হঠাৎ করেই আমি খেয়াল করতে শুরু করলাম পর্দার ফাঁক দিয়ে খাবার এগিয়ে দেয়ার সময় আমার হাতের সাথে তার হাত লেগে যাচ্ছে |
ভাবলাম হয়তো অনিচ্ছাকৃত |
বিষয়টা মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করতেই বুঝলাম ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত |
আমি না বোঝার ভান করে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম |
কিন্তু দিন দিন ব্যাপারটা আরো ঘনিষ্ঠভাবে করতে শুরু করলো সে |
আগে শুধু হাতে হাত ঠেকাতো, কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার আঙ্গুলের ওপর ওর আঙ্গুল ফেলতে শুরু করলো |
এটাকেও আমি স্বাভাবিকভাবে নিতে চেষ্টা করলাম |
আর সত্যি বলতে কি, আমারও একটু একটু করে বিষয়টা ভালো লাগতে শুরু করলো |
মাঝে মাঝে হাতের স্পর্শ না পেলে থমকে যেতাম আমি |
একদিন ঘোর বর্ষার ভেতর রাতের খাবার খেতে এলো সে |
ও যখন ঘরে ঢোকে তখন হালকা বৃষ্টি ছিলো, কিন্তু ঘরে ঢুকতেই শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি |
সেদিন সেই বৃষ্টি থেমেছিলো রাত বারোটার দিকে |
সেদিনই ঘটলো সেই আশ্চর্য ঘটনাটি |
খাবার দেওয়ার পরও অনেকক্ষণ বসে থাকলো, খেলো না |
আমি পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম খাচ্ছে না ছেলেটা, কি যেন ভাবছে নিবিষ্ট মনে |
আমি দরজায় নক করে বললাম, এই আলী খাচ্ছ না কেন? |
ছেলেটি পর্দার দিকে একবার তাকিয়ে অনেকটা আপন মনেই বললো, এমনিই, ভাল্লাগতাছে না |
আমি মিষ্টি ধমক লাগালাম, ভালো না লাগলে চলবে, খাও খাও |
বলে পর্দার এপারে দাঁড়িয়ে রইলাম |
ছেলেটা কেমন যেন ঘোর লাগা কণ্ঠে বললো, শোনেন |
ওর কথা শুনে মনে হলো খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে কিছু |
পর্দার ফাঁকে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলাম, কি বলো? |
বলে কিছু একটা দেওয়ার ভঙ্গি করে হাত বাড়ালো |
আমি সত্যি মনে করে হাত বাড়ালাম |
ছেলেটা বললো, এক হাত না দুই হাত |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.