content
stringlengths
0
129k
যেতে যেতে জিগ্যেস করলাম, কখন ফিরবি? নিতে আসব? রীম অন্যমনস্কভাবে বলল, কখন ফিরব? কি জানি
ঠিক বলতে পারছি না
তা, আধঘন্টা পরে এসো না হয় একবার
রুমীকে একটু যেন কেমন কেমন লাগছে
গতকাল দুপুরে খাওয়ার পর চলে গিয়ে আজই বিকেল পাঁচটার দিকে বাড়ি ফিরেছে
কি এক চাপা উত্তেজনায় ও চনমন করছে
মুখচোখ লালচে
ভেতরে ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে, সেটা চাপতে ওর কষ্ট হচ্ছে
কিন্তু এ নিয়ে কিছু জিগ্যেস করতে সাহস হলো না
ধানমন্ডির ২৮ নম্বর রোডের যে বাড়িটায় ওদের আস্তানা সেটার মালিক দিলারা হাশেম
সে তার স্বামী-সন্তান নিয়ে করাচিতে থাকে
বাড়িটা ভাড়া দিয়েছে রাইকার ল্যাবরেটরিজকে
চুল্লু অর্থাৎ মাসুদ সাদেক ঐ কোম্পানির ফিল্ড ম্যানেজার
বাড়িটা রাইকার ল্যাবরেটরিজ-এর অফিস, তাই অফিস বন্ধের পর দারোয়ান আর নাইটগার্ড ছাড়া আর কেউ ও বাড়িতে থাকে না
রুমীকে নামিয়ে দিয়ে তক্ষুণি বাড়ি ফিরলাম না
আধঘন্টা পরে তাকে নিয়ে আসতে বলেছে
তাহলে ধরে নেওয়া যায় সে রাতে বাড়িতেই থাকবে
সুতরাং কিছু স্পেশাল খাবারের ব্যবস্থা করা যায় আজ
রুমী খেতে ভালোবাসে
ঢাকা ক্লাবে চলে গেলাম
স্মােকড় হিলশা আর টিকেন ক্র্যাম্ব চপ কয়েক প্লেট নিলাম
নিতে নিতে আধঘন্টা কেটে গেল
সুতরাং আবার চলে গেলাম ২৮ নম্বর রোডের বাড়িটায়
গেটের কাছে পৌঁছতেই দেখি একটা ফিয়াট ৬০০ বেরোচ্ছে
আমাকে দেখে গাড়িটা আমার ডানপাশে থামল
চালক হ্যারিস, রুমীর বন্ধু
ওকে দেখে আমিও থামলাম; কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ না করেই জিগ্যেস করলাম, রুমী আছে ভেতরে? হ্যারিসও গাড়ির ভেতর থেকেই বলল, না চাচী, রুমী তো এই পাঁচ মিনিট আগে বেরিয়ে গেল
আমি এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললাম, ও, আচ্ছা, বেস্ট অব লাক
বাড়ি ফিরে এলাম
এখন সমস্ত ব্যাপারটাই অনিশ্চিত হয়ে গেল
রুমী বাডিফিরবে কি ফিরবে না, খাবে কি খাবে না, কিছুই বলা যাচ্ছে না
তবু খাবারগুলো গুছিয়ে রেখে ভাবলাম, ফ্রিজে কিমা রান্না করা আছে, কয়েকটা মোগলাই পরটা বানাই
রুমীর ভীষণ প্রিয়
আজ না আসে, কাল খাবে
আধঘন্টাও কাটে নি, দরজায় ঘন ঘন বেল
বেল টিপে আর যেন ছাড়েই না; শরীফ, জামী ওপরে বাবার কাছে
আমিই রান্নাঘর থেকে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢকুল রুমী, কাজী আর অচেনা একটি অল্প বয়সী ছেলে
মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে
তিনজনেরই মুখ লাল
ঠোট টিপে শান্ত হয়ে রয়েছে, কিন্তু আমার মনে হল ওদের ভেতরে চাপা উল্লাস আর হাসি ফুলে ফুলে উঠছে
রুমী ঢুকেই দরজা বন্ধ করে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে বলল, আম্মা, ওপরে চল, কথা আছে
দোতলায় রুমীর ঘরে এসে সবাই ঢুকলাম
হলে বসা শরীফ আর জামী আমার হাতের ইশারায় পিছুপিছু এল
রুমী চাপা আনন্দ আর উত্তেজনায় ফিসফিস করে বলল, আম্মা, আব্ব, আমরা একটা অ্যাকশান করে এলাম এই মাত্র
সাত-আটটা খানসেনা মেরে এসেছি
আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল, বলিস কিরে?
আনন্দ-ডগমগ গলায় কাজী বলল, হ্যাঁ চাচী, ১৮ নম্বর রোডে
ওখানে একটা বাড়ির সামনে আমরা সবাই গাড়ি থেকে গুলি করে খানসেনা মেরে পাঁচ নম্বর রোড দিয়ে আসছিলাম
মিলিটারি জীপ পিছু নিয়েছিল
রুমী তাই দেখে গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে গুলি চালায়
ওর দুই পাশ থেকে স্বপন, বদিও গুলি করে
জীপ উল্টে সবগুলো মরেছে
রুমী বলল, আম্মা দেখ, আমার ঘাড়ে কাঁধে স্টেন থেকে আগুনের ফুলকি ছুটে কি রকম ফোসকা পড়ে গেছে
রাস্তায় মিলিটারি ধরলে এইটার জন্যই ফেঁসে যাব
রুমীর সার্টের কলার সরিয়ে দেখলাম ঘাড়ে-গলায়-কাধে অনেকগুলো কালো
কালো ছোট ছোট ফোসকা
সার্টও ফুটো ফুটো হয়ে গেছে
জিগ্যেস করলাম কি করে হল?
রুমী বলল, স্টেনগান ফায়ার করার সময় তার গা দিয়ে আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোয়
আমার ঘাড়ের দুপাশ থেকে বদি ভাই, স্বপন ভাই ফায়ার করেছে তো, তাই আগুনের ফুলকিগুলো আমার গায়েই পড়েছে
তারপর হাসতে হাসতে বলল, উঃ
কানে এমন তালা লেগে গেছে, কিছু শুনতে পাচ্ছি না
ডেটল-তুলো দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করতে করতে বললাম, এত অল্প সময়ের মধ্যে কি কাণ্ড? কি করে করলি?
পাশের গলিতে এক বাড়িতে অস্ত্র রেখে এসেছি
এক্ষুণি নিয়ে আসতে হবে
তোমাকে যেতে হবে গাড়ি নিয়ে
মহিলা ড্রাইভার দেখলে ওরা গাড়ি থামাবে না-আশা করা যায়
আমি যাব তোমার সঙ্গে
কাজী ভাই, সেলিম, তোমরা ছাদের ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক
আমরা অস্ত্র নিয়ে আসছি
আম্মা, দুটো ছালা নিয়ে নাও
আব্ব, আমরা যাবার পর পোর্চের বাতি নিভিয়ে রেখ
যদি মেহমান আসে, তাহলে জ্বালিয়ে রেখ
পোর্চে বাতি দেখলে আমরা ঢকুব না
নিচে নেমে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বারেককে বললাম, ভাত আর ডাল চড়াও
স্টোর থেকে দুটো বস্তা বের করে নিলাম
গাড়ি ব্যাক করে রাস্তায় নামলাম
রুমী পেছনে বসল
পাশের গলিটা একেবারে পাশেই
মেইন রোডে উঠে দুটো বাড়ির পরেই
গলিতে ঢোকার মুখে রুমী চাপা স্বরে বলল, একদম গলির শেষ মাথায় চলে যাও
বলাবাহুল্য, এ গলিটাও কানা, আমাদের গলির মতই
আমিও ফিসফিসিয়ে বললাম, শেষ মাথার বাড়িটা হাই সাহেবের যে! ওই বাড়িতে?
ঢুকে দুটো বাড়ির পরে, ডান-হাতি
কিন্তু গাড়িটা শেষ মাথায় নিয়ে আগে দেখব কেউ ফলো করছে কি না
গলির শেষ বাড়িটা ইঞ্জিনিয়ার হাই সাহেবের
গেট খোলা ছিল
গাড়ি ভেতরে ঢোকালাম
হাই সাহেব দোতলায় থাকেন
একতলাটা ভাড়া পোর্চ বেশি বড় নয়
গাড়ি ঢুকিয়ে বের করতে হলে ব্যাক করে রাস্তায় নামতে হয়
আমরা গাড়ি থেকে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে নামলাম
একতলার সামনের দিকের ঘরের জানালার পর্দা
বাতাসে উড়ছে
ভেতরে উজ্জ্বল আলো
খাটে বসে চারজন লোক তাস খেলছে
পাশে চেয়ারে তিন চারজন মহিলা, পুরুষ কথা বলছে
সবাই খেলা আর আড্ডা নিয়ে এমনিই মগ্ন যে মাত্র চার ফুট দূরে বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল, কেউ একবার চোখ তুলেও তাকাল না
আমরা গাড়ি থেকে নেমে গেটের মুখে দাঁড়ালাম
টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে