content stringlengths 0 129k |
|---|
রুমী বলল, তুমি এখানে দাঁড়াও |
আমি হেঁটে গিয়ে দেখে আসি ও বাসায় বাইরের লোক কেউ আছে কি না |
আমি বৃষ্টির ফোঁটা এড়াবার জন্য একতলার ঐ জানালাটার পাশেই দেয়াল ঘেঁষে একবার দাঁড়াই, আবার অস্থির হয়ে গেটের কাছে যাই |
বাতাসে জানালার পর্দা উড়ছে, ভেতরে উজ্জ্বল আলোয় বসে সাত-আটটি নরনারী তাস খেলছে, কলকন্ঠে কথা বলছে, তুমুল হাসিতে ভেঙে পড়ছে, ভয় হচ্ছে এই বুঝি কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে কে, কে? বলে চেঁচিয়ে ওঠে, কিন্তু কেউ একবারও ভুলেও জানালার দিকে তাকাচ্ছে না |
আমার খুব স্বস্তি লাগছে, আবার আশ্চর্যও লাগছে |
এমন দিনকাল, একতলার জানালার বাইরেই গাড়ি থামছে, লোকনামছে, কেউ কেউ আবার সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরাও |
করছে, তারা একবার খেয়ালও করবে না? মনে হচ্ছে আমি অনন্তকাল ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি, লোকগুলোও অনন্তকাল ধরে ঐ রকম হাসি-গল্প-আড্ডা-খেলায় মেতে রয়েছে |
যেন কার অভিশাপে ওরা বিশ্বসংসার ভুলে ওইরকম কলবল করছে |
রুমী ফিরে এসে চুপি চুপি বলল, চল |
আস্তে চালাবে |
গাড়ি ব্যাক করে আবার গলিতে |
নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে এসে রুমী থামতে বলল |
এবার বাঁয়ে গাড়িটা |
আমি গেট ঘেঁষে গলিতেই গাড়ি পার্ক করে গাড়িতে বসে রইলাম |
রুমী বস্তা দুটো নিয়ে ভেতরে চলে গেল |
তার ফিরে আসার সাড়া পেতেই আমি গাড়ি থেকে নেমে পেছনের বুটি খুলে দিলাম |
এ গলি থেকে পাশের গলি-কতটা পথ পোয়া মাইল? তাও হবে কি না সন্দেহ |
কিন্তু বুকে এমন ধুকপুকুনি, হাতে-পায়ে এমন গিট-ছাড়া ভাব, মনে হচ্ছে পঞ্চাশ মাইল চালিয়ে এসেছি |
পোর্চের বাতি নেভাননা |
শরীফ, জামী বুঝিবা দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়েছিল |
গাড়ি থামতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল |
রুমী বুটি খুলল |
সঙ্গে সঙ্গে গেট দিয়েও কে যেন ঢুকল |
আমরা আঁতকে উঠলাম |
কিন্তু না, বাইরের কেউ নয়, মাসুম |
শরীফ, জামী টুক করে বস্তা দুটো তুলে ঘরে ঢুকে গেল |
সিঁড়ি বেয়ে একেবারে ছাদের ঘরে |
এতক্ষণে আমার হাতে-পায়ে জোর ফিরে এসেছে, ধুকপুকুনির বদলে বুকে এখন উত্তেজনার জোয়ার |
বললাম, বের কর তো, দেখি তোদের কি রকম অস্ত্র |
রুমী, কাজী বস্তা খুলে সাবধানে অস্ত্র বের করে জাজিমের ওপর রাখল |
পাঁচটা স্টেনগান, একটা পিস্তল, দুটো হ্যান্ড গ্রেনেড |
জীবনে এই প্রথম দেখলাম |
আমি, শরীফ, জামী, মাসুম-চারজনে হুমড়ি খেয়ে বসে অস্ত্রগুলো হাতে তুলে উল্টেপাল্টে দেখলাম, সেগুলোর গায়ে হাত বুলোলাম, হ্যান্ড গ্রেনেড দুটোও একটু ছুঁয়ে দেখলাম |
রুমীরা এগুলোকে বলে পাইন অ্যাপল আনারস |
যতই আনারস বলুক, এগুলো মোটেই আনারসের মতো নিরীহ নয় |
আমি আবার বলতে যাচ্ছিলাম, বল দেখি কি করে কি করলি কিন্তু শরীফ থামিয়ে দিয়ে বলল, ওসব পরে শুনব |
এগুলো কোথায় লুকিয়ে রাখব, তাই ঠিক কর আগে |
অনেক চিন্তাভাবনা করে ঠিক হলো, নিচের উঠোনে পানির যে বিরাট হাউজটা আছে, সেটার ভেতরে একটা টুল বসিয়ে তার ওপর অস্ত্র রাখা হবে |
হাউজটা চওড়ায় আট ফুট, লম্বায় দশ ফুট, উঁচুতে তিন ফুট |
তার এ মাথার এক কোণে লোহার তৈরি গোল একটা ম্যানহোল, এইটে দিয়ে হাউজটার ভেতরে নামা যায় |
হাউজটা এখন কানায় কানায় ভর্তি |
আমাদের প্যান্ট্রিতে কয়েকটা টুল আছে, সেগুলো সোয়া দুফুট উঁচু |
হাউজের নিচের ট্যাপটা খুলে দেওয়া হল খানিকটা পানি বেরিয়ে যাবার জন্য |
একটা টুল ভেতরে বসালো যেন তার বসার জায়গাটা পানির ওপর জেগে থাকে |
বারেককে কিছু একটা কিনতে রশীদের দোকানে পাঠানো হল |
জামী হাউজের ভেতরে নেমে টুলটা দূরতম কোণে নিয়ে বসাল |
অস্ত্রগুলো ছালা দুটোতে ভরে ভালো করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঐ টুলের ওপর রাখা হল |
যদি রাতে মিলিটারি আসেও, এই পানিভর্তি হাউজের ঢাকনা খুলে তাকায়ও, তাহলে টলটলে পানি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাবে না |
কারণ এখান থেকে উঁকি দিয়েও ওই কোণার টুল দেখা যায় না |
টুল আবিষ্কার করতে হলে কাউকে হাউজের ভেতর নামতে হবে |
একটু পরে কাজী আর সেলিম চলে গেল |
সেলিম ছেলেটিকে এই প্রথম দেখলাম |
শুনলাম, ও শাহীন স্কুলের ছাত্র এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার কথা ছিল |
এপ্রিলেই মেলাঘরে চলে গিয়েছিল |
খাওয়া-দাওয়ার পর রুমীকে ঘিরে আমরা চারজনে বসলাম |
ওদের এই চমকপ্রদ অ্যাকশানের কথা শুনবার জন্য আর তর সইছিল না |
রুমী যা বলল, তা হলো এই : |
ধানমন্ডির বিশনম্বর রাস্তার একটা বাড়িতে চাইনিজ এমব্যাসির কোন বড় কর্তা বাস করে |
সে বাড়ির সামনে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি মিলিটারি পুলিশ পাহারা দেয় |
আঠার নম্বর রোডের একটা বাড়ির সামনেও বেশ সাত-আটজন মিলিটারি পুলিশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় |
অনুমান হয়, ও বাড়িতে কোন ব্রিগেডিয়ার থাকে |
কয়েকদিন থেকেই বদি, আলমের মাথায় চিন্তাটা ঘুরপাক খাচ্ছিল |
গতকাল হঠাৎবদি, আলম, শাহাদত এরা মিলে প্ল্যান অব অ্যাকশান ঠিক করে ফেলে |
২৫ আগস্ট সন্ধ্যা রাতে কয়েকটা অ্যাকশান হবে-বদি, আলম, কাজী, রুমীরা একটা গাড়িতে, হ্যারিস, মুক্তার, জিয়ারা আরেকটা গাড়িতে |
পাঁচ মাস আগে এই ২৫ তারিখের রাতেই বিবেকহীন বর্বর হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল |
বিচ্ছুরা উপলব্ধি করে এই তারিখে এমন কিছু করা দরকার, যাতে সামরিক জান্তা ভালোমত নাড়া খায় |
রুমীরা পিরুলিয়া গ্রামে ওদের ক্যাম্প থেকে দরকারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসে আজকেই দুপুরে |
হ্যারিস আর জাহির গুলশান লেকের ঘাট থেকে রুমীদেরকে দুটো গাড়িতে তুলে ২৮ নম্বর রোডের বাড়িতে নিয়ে যায় |
তারপর বদি, আলম একদিকে, হ্যারিস, মুক্তার অন্যদিকে এই দুদল দুদিকে বেরিয়ে যায় দুটো গাড়ি হাইজ্যাক করতে |
বদি, আলম, ধানমন্ডি চার নম্বর রোড থেকে একটা মাজদা গাড়ি হাইজ্যাক করে |
গাড়িটা ছিল আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের বড় ছেলে মাহবুব আনামের |
হ্যারিসরা একটা ফিয়াট ৬০০ হাইজ্যাক করে ধানমন্ডি ২২ নম্বর রোডের মোড় থেকে |
ঠিক হয় : আলম, বদি, কাজী, রুমী, স্বপন ও সেলিম প্রথমে ধানমন্ডিতে অ্যাকশান |
হ্যারিস, জিয়া, মুক্তার, আনু ও আরো দুটো ছেলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করবে |
আমরা গিয়ে ওদের সঙ্গে জয়েন করবে |
তারপর দুগাড়ি মিলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের গেটে এবং তারপর শহরের অন্যান্য দিকে সুযোগ-সুবিধেমত আরো কিছু অ্যাকশন করবে |
রুমীটা যখন বেরোয়, শাহাদত জিগ্যেস করে, হোয়াট আর ইয়োর টার্গেটস? কোন দিকে যাচ্ছ? আলম জবাব দেয়, ডেস্টিনেশান-আননোন |
টার্গেট মোবাইল |
রুমীরা সন্ধ্যা ৭-২৫ মিনিটে ২৮ নম্বর রোড থেকে বেরিয়ে ৩২ নম্বর দিয়ে পুল পেরিয়ে ডাইনে ও বাঁয়ে ঘুরে ২০ নম্বর রোডে পড়ে |
গাড়ি চালাচ্ছিল আলম, তার বা পাশের প্রথমে সেলিম ও তারপরে কাজী |
পেছনের সিটে মাঝখানে রুমী, তার ডান পাশে (অর্থাৎ আলমের ঠিক পেছনে) স্বপন, বাঁ পাশে বদি |
চাইনিজ ডিপ্লোম্যাটের বাসার সামনে গিয়ে দেখে পুলিশগুলো নেই |
ওরা হতাশ হয় |
আলম বলে তাহলে ১৮ নম্বরে যাই |
১৮ নম্বর রোডে নির্দিষ্ট বাড়ির সামনে গিয়ে দেখে সাত-আটজন মিলিটারি পুলিশ বেশ মৌজ করে গল্প করছে, সিগারেট খাচ্ছে |
আলম বলল, ব্রিগেডিয়ার সাহেব বাড়ি নেই নিশ্চয়, তাই খুব হেলে-বেঁকে আড্ডা দেওয়া হচ্ছে |
অলরাইট বয়েজ, ইউ হ্যাভ থ্রিমিনিটস |
আমি সামনের সাত মসজিদের মোড় থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসছি |
এখন বাড়িটা ডান হাতে রয়েছে |
গাড়ি ঘুরিয়ে আনলে বাড়িটা বাঁয়ে পড়বে |
তাহলে গাড়ির বাঁদিকে বসা কাজী ও বদি সামনের-পেছনের দুই জানালা দিয়ে ফায়ার করতে পারবে |
গাড়ি ঘুরিয়ে আনতে আনতে আলম নির্দেশ দিল কাজী, সেলিম আর বদি গুলি করবে, রুমী ও স্বপন নজর রাখবে, ও তরফ থেকে কেউ অস্ত্র তোলে কি না, তুললে তাদের শেষ করার ভার রুমী আর স্বপনের |
গাড়ি ধীরগতিতে বাড়িটার সামনে দিয়ে যাবার সময় আলমের চাপা গলার কম্যান্ড শোনা গেল : ফায়ার |
অমনি গাড়ির দুই জানলা দিয়ে ঝলকে ঝলকে ছুটে গেল স্টেনগানের গুলি |
দুটো স্টেন থেকে দুই লেভেলে গুলি গেল-বদির স্টেন থেকে ওদের পেটের লেভেলে, কাজীর স্টেন থেকে ওদের বুকের লেভেলে |
সেলিমও কাজীর সামনে দিয়ে বাঁয়ে ঝুঁকে গুলি করল |
পুলিশগুলো গল্পের মৌজে ছিল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধপাধপ পড়ে গেল সাত-আটটা তাগড়া শরীর |
সমস্ত ব্যাপারটা ঘটতে সময় লাগল মাত্র কয়েক সেকেন্ড |
তার পরই গাড়িটা হঠাৎ যেন জেটের গতিতে গিয়ে ঢুকল ২০ নম্বরে, তাদের আগের টার্গেটে |
কিন্তু ওদের কপাল মন্দ |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.