content stringlengths 0 129k |
|---|
চিত্র : আর্নেস্ট হেকেল (১৮৩৪-১৯১৯) |
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইনই শুধু একমাত্র নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানী ছিলেন না যে মানুষের উদ্ভব ও বিবর্তন কোথায় হয়েছে সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করছিলেন |
জার্মানির প্রসিদ্ধ শারীরবিজ্ঞানী আর্নেস্ট হেকেল (১৮৩৪-১৯১৯) ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে মানুষের উদ্ভব ও বিবর্তন কোথায় হয়েছে সে সম্পর্কে পৃথক ভাবনা নিয়ে দৃশ্যপটে হাজির হন |
হেকেল ছিলেন ডারউইনের ভাবশিষ্য |
হেকেল মন্তব্য করেন আফ্রিকার গ্রেট এপদের তুলনায় এশিয়ার গ্রেট এপের (ওরাংওটাং) সাথে আধুনিক মানুষের অ্যানাটমির অভূতপূর্ব মিল রয়েছে |
তাই হয়তো আফ্রিকা নয় বরং এশিয়া হবে হোমিনিড পূর্বপুরুষের জন্মভূমি |
এমন কী আর্নেস্ট হেকেল প্রথম হোমিনিড পূর্বপুরুষ দেখতে কেমন হবে সে সম্পর্কে বর্ণনা করেন এবং এদের জন্য আলাদা জিনাসের নামও প্রস্তাব করেন |
'' (পিথেকানথ্রোপাস) মানে 'এপ-মানব' |
চিত্র : ইয়োজিন ডিবোয়া |
আর্নেস্ট হেকেলের আদি মানুষের বিবর্তন ওপর রচিত " ; " বইটি (১৮৭৩) পাঠ করে ডাচ (নেদারল্যান্ড) নাগরিক ইয়োজিন ডিবোয়া (২৮ জানুয়ারি ১৮৫৮ - ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪০) প্রত্নজীববিদ্যায় যারপরনাই উৎসাহী হয়ে উঠেন |
তখন তিনি সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ |
ডিবোয়া ডারউইনের অরিজিন অব স্পিসিজ বইটি গোগ্রাসে গিলে খেয়েছেন ছাত্রজীবনে |
বয়স তখন তার সবে উনিশ |
আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মেডিকেল স্কুলে মাত্র ভর্তি হয়েছেন |
২৬ বছর বয়সে মেডিকেল স্কুল থেকে ডিগ্রি লাভ করেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন |
শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিলেও ইউজিনের মনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে লালিত-পালিত হচ্ছে ফসিল সংগ্রহের তীব্র ইচ্ছা |
লেখাপড়ার পাট চুকে যাওয়ার পর এই দুর্দান্ত ইচ্ছা যেন উপছে আসতে লাগলো |
শেষমেশ ধৈর্য্য ধরতে না পেরে কিছুদিনের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরি ছেড়ে দিলেন ইয়োজিন |
বউ-বাচ্চা নিয়ে পাড়ি দেয়ার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন ইন্দোনেশিয়াতে |
ইন্দোনেশিয়াতে পাড়ি দেবার কারণ হচ্ছে হেকেলের মতো তিনিও বিশ্বাস করেছিলেন এশিয়াতেই হয়তো পাওয়া যাবে মানুষের আদি পূর্বপুরুষের নমুনা |
ওই সময় ইন্দোনেশিয়া ছিল নেদারল্যান্ডের উপনিবেশ |
নাম ছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিস |
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরির মতো এই নিরাপদ আর সম্মানজনক জীবন ছেড়ে দিয়ে কোথাকার কোন অদৃশ্য ভাঙা হাড়গোড়ের পিছনে ছুটার 'পাগলামি' দেখে স্বাভাবিকভাবেই ডিবোয়ার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশিরা ভড়কে গেলেন |
তারা নানাভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করতে চাইলেন |
কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হল না |
অবশেষে ১৮৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ডিবোয়া স্বপরিবারে চলে আসেন ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে |
স্থানীয় সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসকের চাকুরি জুটে গিয়েছিল তাঁর |
হাসপাতালের চাকুরির ফাঁকে ফাঁকে ফসিলের সন্ধানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন ডিবোয়া |
কিন্তু এতেও তার মন ভরলো না |
ফসিলের সন্ধানে তিনি পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছিলেন না |
রোগী দেখবেন না কি ফসিল খুঁজবেন? কোনো কাজই মন দিয়ে করতে পারছিলেন না |
তাই ডিবোয়া উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানালেন তাঁকে এই দিবাকালীন চাকুরি থেকে অব্যহতি দেয়ার জন্য আর ডাচ সরকারের পূর্ণকালীন প্রত্নজীববিজ্ঞানী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য |
কর্তৃপক্ষ আগে থেকে জানতো ডিবোয়ার কথা |
কিছুটা সদয়ও ছিল তাঁরা |
ফলে অনুমতি মিলে গেল ঝটপট |
ডিবোয়া তখন দুজন পুরকৌশলী ও পঞ্চাশ জনের কর্মীবাহিনী নিয়ে পুরো সুমাত্রা দ্বীপে চিরুনি তল্লাশি শুরু করে দিলেন ফসিলের সন্ধানে |
কিন্তু হাড়ভাঙা এতো পরিশ্রমের ফলাফল শূন্য |
কোনো ফসিলের সন্ধানই তার ভাগ্যে জুটল না |
হতাশ ডিবোয়া একসময় অসুস্থ হয়ে পড়লেন |
অনেকে পরামর্শ দিলেন এই অনিশ্চিত-অর্থহীন এবং প্রায় ব্যর্থ জীবন ছেড়ে পুনরায় নেদারল্যান্ডে ফিরে যাবার জন্য |
ভালোভাবে খেয়ে পড়ে নিরাপদ জীবন যাপন করা যাবে |
কিন্তু ডিবোয়ার একরোখা মনোভাব হলো ফসিল আবিষ্কার না করে তিনি কখনো দেশে ফিরবেন না |
হঠাৎ একদিন ডিবোয়ার কাছে খবর আসলো সুমাত্রার পাশের দ্বীপ জাভায় নদীর তীর ঘেষে একটা এলাকায় নাকি কিছু পুরানো হাড়গোড় পাওয়া যাচ্ছে |
তৎক্ষণাৎ চাঙা হয়ে উঠলেন ডিবোয়া |
আবার সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেন সুমাত্রা ছেড়ে তাকে যেন জাভা দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় |
এবারো অনুমতি মিলে গেল |
আর ডিবোয়া সময় নষ্ট না করে দ্রুত কর্মীবাহিনী নিয়ে জাভার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন |
জাভায় পৌঁছে খবর পেলেন ত্রিনিল নামের একটি গ্রামের পাশ দিয়ে সলো নদীর তীরে নাকি কিছু হাড়গোড় পাওয়া গেছে |
নদীটি প্রায় মৃতপ্রায় |
ডিবোয়ার আর অপেক্ষার তর সইছিল না |
তখন সময়টা ১৮৯১ সালের গ্রীষ্মের শেষের দিক |
ফসিলের সন্ধানে সবাই হইহই করে নেমে পড়ল |
এবারো অনেক খোঁড়াখুড়ি করে মানুষের একটি পেষক দাঁত () ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেল না |
তবে এত সহজে হতদ্যোম হলেন না |
তার মন বলছিল এবার কিছু একটা পাওয়া যাবেই |
তাই ডিবোয়া কার্যক্রম গুটিয়ে নিলেন না |
টানা প্রায় দুই মাস ধরে বিরামহীন পরিশ্রমের পর ডিবোয়ার দল একটি ছোট্ট 'ক্রেনিয়াম' পেল |
সাথে পেল একটি ঊরুর হাড় আর শরীরের কিছু হাড়ের খণ্ডাংশ |
নিচের চোয়াল ছাড়া উপরের করোটি বা খুলিকে ক্রেনিয়াম বলে |
ইয়োজিন ডিবোয়া ওই সময় মানব অ্যানাটমির একজন পুরোদস্তুর বিশেষজ্ঞ ছিলেন |
তাই ক্রেনিয়ামটি দেখে বোঝতে পারলেন এতদিন ধরে তিনি যা খুঁজে চলছেন এবার সেটা তার হাতের মুঠে |
ডিবোয়ার উদ্ধার করা ক্রেনিয়ামটি আধুনিক মানুষের ( ) কোনো করোটি নয় |
করোটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি দেখতে লম্বা তবে এর নিম্নমুখী ব্রেনকেস |
এপদের মত ভ্রূচুড়া বড় ও উঁচু তবে উল্লেখ করার মত এর কোনো কপাল ছিল না |
ক্রেনিয়ামটির আয়তন প্রায় ৮৫০ সিসি (কিউবিক সেন্টিমিটার) |
সে হিসেবে এর মধ্যে মগজ বা ঘিলুর পরিমাণ হবে কমবেশি দুই পাউন্ড এবং আয়তন প্রায় ১০০০ সিসি |
এক পাউন্ডে ৪৫৪ গ্রাম |
তাই এটি আধুনিক মানুষের কোনো করোটি নয় |
আধুনিক মানুষের ক্রেনিয়ামের আয়তন ১৩০০ সিসি |
ব্রেনের ওজন তিন পাউন্ড ও আয়তন ১,৪৫০ সি.সি |
শিম্পাঞ্জির ব্রেনের আয়তন প্রায় ৪০০ সিসি |
অর্থাৎ উদ্ধারকৃত ক্রেনিয়ামটি কোনো শিম্পাঞ্জিরও (এপ) নয় |
আবার ডিবোয়া দেখলেন আধুনিক মানুষের ঊরুর হাড়ের সাথে ফসিলটির ঊরুর হাড়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিল রয়েছে |
অর্থাৎ হাঁটতে পারে এমন দ্বিপদী ব্যক্তির হাড় এটি |
এখন প্রশ্ন দেখা দিল, ফসিলটি কিসের? কোনো এপেরও না, আধুনিক মানুষেরও না |
তাহলে এপ ও মানুষের মধ্যের কোনো জীবের? এটা কি সেই বহুল আলোচিত "মিসিং লিংকে"র ফসিল? এমন অজস্র প্রশ্ন ঘোরপাক খেতে লাগলো ইয়োজিন ডিবোয়ার মনের মধ্যে |
তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন আর্নেস্ট হেকেলের ভবিষ্যদ্বাণী যেন সফল হতে চলছে তাঁর এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে |
ডিবোয়া তাই হেকেলের ঘোষিত নামের সাথে মিল রেখে ফসিলটির নাম দিলেন ' ' |
অর্থাৎ 'সোজা হয়ে হাঁটতে পারে এপ-মানব' |
ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে ফসিলটি পাওয়া গিয়েছে বলে একে 'জাভা-মানব' বলেও ডাকা হতে লাগলো |
পরবর্তীতে ফসিলটির বয়স ডেটিং করে জানা গেল এটি প্রায় ১.৮ মিলিয়ন বছরের পুরানো |
মানে ঐ ফসিলের ব্যক্তিটি আজ থেকে প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগে এ পৃথিবীতে বসবাস করতো |
ডিবোয়ার আবিষ্কার সারা বিশ্বের প্রত্নজীববিজ্ঞানীদের কাছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো |
এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নেতিবাচক আর সংশয়ী বক্তব্য |
যাহোক বছর খানেক বাদে আরো কিছু হোমিনিড ফসিল পাওয়া গেল জাভা দ্বীপসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে |
বর্তমানে বেশিরভাগ নৃবিজ্ঞানী এবং প্রত্নজীববিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন ডিবোয়া'র আবিষ্কৃত ফসিলটি স্বতন্ত্র কোনো জিনাসের (গণ) অন্তর্ভুক্ত নয় এটি আমাদের জিনাসেরই () অন্তর্ভুক্ত |
তবে আলাদা প্রজাতি |
এর বৈজ্ঞানিক নাম |
ডিবোয়ার আবিষ্কৃত ফসিলটি সবচেয়ে প্রাচীন হোমিনিড ফসিল নয় |
এর থেকেও অনেক প্রাচীন হোমিনিড ফসিল বিভিন্ন সময় আবিষ্কৃত হয়েছে |
এমন কী জিনাসের অন্তর্ভুক্ত প্রথম প্রজাতিও নয় এই ফসিলটি |
তবে মূল কথা হচ্ছে আফ্রিকা ও ইউরোপের বাইরে থেকে আবিষ্কৃত প্রথম হোমিনিড ফসিল হচ্ছে ইয়োজিন ডিবোয়ার ফসিল |
ডিবোয়া ভুলভাবে ভেবেছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে হয়তো সবচেয়ে প্রাচীন হোমিনিড ফসিল পাওয়া যাবে |
ডিবোয়ার ভুল কিভাবে সংশোধিত হলো সে আলোচনাতে আমরা পরবর্তীতে যাবো |
সে যাহোক ডিবোয়ার ভাবনায় ভুল থাকলেও তার এই আবিষ্কার মোটেও অগুরুত্বপূর্ণ নয় |
আমাদের হোমো জিনাসের বিবর্তনে এই ফসিলের প্রমাণ যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না |
ডিবোয়ার সময়ে তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি মানুষের বিবর্তন ও পূর্বপুরুষের উদ্ভব সংক্রান্ত অনুকল্পগুলো সরাসরি পরীক্ষার জন্য একটি গবেষণা পরিকল্পনা তৈরি করেন |
ডিবোয়ার দৃষ্টিতে মানুষের বিবর্তনীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য ফসিল-ই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ |
ঊনবিংশ শতাব্দীতে তিনিই একমাত্র বিবর্তনীয় বিজ্ঞানী ডারউইন, হেকেল, হাক্সলি ও অন্যান্যদের মতো শুধু জীবিত প্রাইমেটদের তুলনামূলক অ্যানাটমি পরীক্ষা করেন নি |
মানব-বিবর্তনের অনুকল্প পরীক্ষার জন্য ফসিল সংগ্রহ থেকে এগুলোকে ব্যবহার করেছেন |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.