content
stringlengths
0
129k
আমি কিছুই বলতে পারলাম না তাকে
ঠোঁটের কোণে একটা আলগা হাসি নিয়ে সে শুতে চলে গেল
আমি কিছুক্ষণ বসে রইলাম মাথা নীচু করে
তারপর আলোটা নিভিয়ে কাউচে এসে আধশোয়া হলাম
বারবার গর্ভবতী লরার ছবি আমার চোখের পর্দায় ভেসে উঠছিল
লরার কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার মনে পড়ল সন্ধ্যেবেলা সে গল্প করতে করতে আমাকে কয়েকটা আশ্চর্য কথা বলছিল
তখন আমার কথাগুলো অতটা অদ্ভুতগোছের লাগেনি, মনে হয়েছিল লরা কোনো সাইফাই সিনেমার গল্প বলছে, কিন্তু এখন টের পেলাম কথাগুলো কীরকম আজব
লরা বলেছিল, প্যারিসে কোনো-কোনোদিন তার মন ভীষণ খারাপ থাকত এবং সে রাত্রিবেলা অনিদ্রায় ভুগত
বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে টের পেত তার জীবনটা আসলে একটা আয়নায় দেখা প্রতিবিম্ব
প্রকৃতপক্ষে, সে লরা নয়; লরা নামে একজন নিঃসঙ্গ বায়োলজিস্ট কোনো ভিনগ্রহী ল্যাবরেটরিতে কাজ করে
সেই গ্রহের আকাশ অদ্ভুত সবুজাভ আলোয় ভরে থাকে সারাক্ষণ আর নানারকম আলোজ্বলা উদ্ভিদে সেখানকার রুক্ষ ভূপ্রকৃতির একটা অংশ পরিপূর্ণ
সেই ল্যাবরেটরিতে থাকতে থাকতে মানসিক অবসাদ গ্রাস করে লরাকে এবং সেটা কাটানোর জন্যে লরা কম্পিউটারের সাহায্যে পৃথিবীর কতকগুলো শহরের বাস্তবতা তৈরি করে
দূরের গ্রহে লরা যখন ঘুমিয়ে পড়ত, সে ঘুমের ভেতর হেঁটে বেড়াত পৃথিবীর সেইসব শহরে
সেখানে মায়াবাস্তবতার ভেতরে সে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী এবং এখন সে প্যারিসে থাকে
লরার কথাগুলো চিন্তা করে আমার আশঙ্কা হলো সে গভীর ডিপ্রেশনে ভুগছে
সেইরাতে আমি কাউচে শুয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম যদি লরা ঘুমের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে, কিন্তু সেরাতে আর কিছুই ঘটেনি
পরদিন বেলার দিকে লরাকে আমি গ্রেহাউন্ড বাসস্টেশনে পৌঁছে দিতে গেলাম
বাস ছাড়বার সময় পর্যন্ত আমি লরাকে সঙ্গ দিলাম
আজকে রোদ উঠেছে
লরা চোখে একটা রোদচশমা চাপিয়েছিল
বাসের এঞ্জিন চালু হতে সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, জানলা থেকে হাত নাড়ল এবং আস্তে আস্তে বাসটা বেরিয়ে গেল স্টেশন ছেড়ে
কেন যেন আমার মনে হয়েছিল এবং সত্যিই লরার সঙ্গে সেটাই ছিল আমার শেষবার দেখা
যে অতিকায় গোলকধাঁধার ভেতর আমাদের জীবনগুলো অপচয় হয়, তার বেশিরভাগটাই আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায় শেষপর্যন্ত
ফোনে লরার সাথে কয়েকবার কথা হয়েছিল আমার
সে প্যারিস ফিরে গেছিল
শুনেছিলাম পলের সাথে তার বিয়েটা টিকে যাবে
ওরা ওদের ঝামেলা মিটিয়ে নিতে পেরেছে
আমি তাকে জানিয়েছিলাম নিউইয়র্কে আমার জীবন কেটে যাচ্ছে ভালোই
ক্রমশ আমাদের যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে
হয়তো আমিই ক্রমশ লরার থেকে দূরে সরে যাই; আমাদের যৌথ স্মৃতি, হারানো দেশ, নিখোঁজ মানুষ বা জাহাজডুবির স্মৃতি, যেভাবে ফ্যাকাশে হয়ে যায়, সেরকমভাবেই
চব্বিশ ঘন্টা সাতদিনের ব্যস্ত জীবনে আমার অবসর বিশেষ ছিলনা
সপ্তাহের সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে শুক্রবারের রাতটা আমি কাটাতাম নাইটক্লাবে কিংবা বারে
এবং নিউইয়র্ক ছিল আমার সঙ্গী
এই শহর ছেড়ে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করতনা আমার
সেটা ছিল শীতের শুরু
জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছে সেদিন
আমি বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে দেখছি কিভাবে বাইরের রাস্তাটা ঢেকে যাচ্ছে গুঁড়ো-গুঁড়ো বরফে, এমনসময় মুখ ঘুরিয়ে বারের ভেতরে সাজানো অনুজ্জ্বল আলোগুলোয় আমার চোখে পড়ল উল্টোদিকের টেবিলে বসা লোকটা
একটুক্ষণ লক্ষ্য করে আমি উঠে এগিয়ে গেলাম লোকটার দিকে - পল? সে মুখ তুলে তাকাল এবং চমকে উঠল আমাকে দেখে
তার দুঃখভারাক্রান্ত মুখটা আমার ভেতরে একটা শিহরণের অনুভূতি জাগালো
কোনো দুঃসংবাদ, আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন সাড়া দিল
দুএকটা কথার পরেই আমি লরার খবর জিগ্যেস করলাম
প্রথমে সে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ, বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল আনমনে
ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে আমি জানতে পারলাম লরার কথা
তাদের ছেলে জন্মানোর পর থেকেই লরা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল
আর মাসছয়েক আগে লরা পলকে ছেড়ে চলে গেছে
পলের কাছে তাদের সন্তান রয়ে গেছে
একটা আমূল পরিবর্তন ঘটেছে লরার, পল বলছিল, রাতের পর রাত তাকে দেখতাম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে; আমি তাকে বুঝতে পারতামনা
একদিন সে আমাকে বলেছিল প্যারিসে থাকা আর নিরাপদ নয়
আমি অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম কেন? কেউ আমাদের ওপর নজর রাখছে, সে বলেছিল
এর কিছুদিন পরে গ্রীষ্মের এক রাতে প্যারিসের একটা রেস্তোরাঁয় লরার সঙ্গে আলাপ হয় জঁ-জাক মার্টিনের
নামটা আমার চেনা-চেনা লাগল; তারপরই একটা হিম স্রোত আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল
বেশ কয়েকবছর আগে ল্য মঁদে কাগজে জঁ-জাক মার্টিনের সম্পাদকীয় চিঠি বেরোনো নিয়ে প্যারিসের দৈনিকগুলোয় খুব হইচই হয়েছিল
জঁ-জাক মার্টিন হলোকস্টের ঘটনাকে অস্বীকার করেছিলেন এবং আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি সম্পর্কেও সন্দেহ প্রকাশ করেন
তারপর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয় এবং একসময় ফ্রান্স ছেড়ে তিনি নরওয়ে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন
ল্য পেনের উত্থানের পর ফ্রান্সে অতি দক্ষিণপন্থীদের জমায়েত বেড়েছে, পল পানীয়ের গ্লাসটা নামিয়ে রেখে তিক্তস্বরে বলল, লোকটা নির্ঘাত সেরকম কোনো সংগঠনের আমন্ত্রণে প্যারিসে এসেছিল
বারের ভেতরটা অনেক ফাঁকা আজ; লরা ঐ লোকটার সাথে চলে গেছে? - আমি প্রায় ফিসফিসস্বরে লরার প্রাক্তন স্বামীর কাছে জানতে চাইলাম
তারপর অনেকক্ষণ আমরা কথা বললাম না
টেলিফোন কল আর বিষাদের ছায়া, আমি কল্পনা করলাম লরা ও পলের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব
পুরোনো শতকের উদ্ভট জাতিবিদ্বেষী তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল লরা, যেখানে বলা হয়েছে উষ্ণ আর ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুতে নিকৃষ্ট জাতিগুলির বাস এবং শীতল অক্ষাংশে জাতিগত উৎকর্ষতা লক্ষ্য করা যায়
প্যারিসের রোদ ছেড়ে চলে গেছে লরা জঁ-জাক মার্টিনের সাথে
সেইরাতে পলকে বিদায় জানিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল এত ঠান্ডা আর মরুভূমির মতো প্রকাণ্ড শূন্যতা নিউইয়র্ক শহরে আগে কখনো অনুভব করিনি
বছরখানেক পরে একটি কনফারেন্স উপলক্ষ্যে আমাকে প্যারিস যেতে হয়েছিল
সন্ধ্যেয় ডিনার সেরে হোটেলের লবিতে এক বন্ধুর সাথে গল্প করছি, এমনসময় একজন দীর্ঘকায় প্রৌঢ় লোক সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে ধীরে ধীরে এলিভেটরের দিকে চলে গেল
ঘটনাটা এত আকস্মিকভাবে ঘটে গেল যে আমি অসাড় হয়ে গেছিলাম; তারপরেই আমি লাফিয়ে উঠে এলিভেটরের দিকে দ্রুত পায়ে এগোলাম
এলিভেটরের সামনে তিনজন লোক; সবচেয়ে বাঁদিকে জঁ-জাক মার্টিন
আমার সাথে তার চোখাচুখি হলো
টিং করে ঘন্টি বাজল আর আলো জ্বলে উঠল; এলিভেটরটা এসে দাঁড়ালো, দরজা খুলে গেল ঘড়ঘড় শব্দে
ধাতবকক্ষের ভেতর ফ্লুরোসেন্ট আলো
দুজন লোক বেরিয়ে এল; চারজন লোক ঢুকল
আমি একেবারে পিছনের দিকে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম
জঁ-জাক মার্টিন সামনে
একে একে সবাই বোতাম টিপল
সতর্কচোখে লক্ষ্য করলাম জঁ-জাক মার্টিন টিপলেন পাঁচনম্বর বোতাম
এবার আমার পালা
পাঁচ টিপব? লোকটা সন্দেহ করবে? কিসের জন্যে? আমি নিজেই জানিনা আমি লোকটার পিছু নিয়েছি কেন
দোনামোনা করে হাত বাড়িয়ে সাত টিপে দিলাম
চারতলায় বাকী দুজন নেমে গেল
এলিভেটরে সামনের বাঁ কোণে জঁ-জাক মার্টিন
পিছনে ডান কোণে আমি
কয়েক সেকেন্ড লাগে এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে উঠতে
এবং সেটা কী দীর্ঘ সময়! টিং! এলিভেটরটা থামল
দরজাটা দুদিকে সরে যেতেই জঁ-জাক মার্টিন বেরিয়ে গেলেন
একমুহূর্ত অপেক্ষা করেই পা-টা গলিয়ে দিলাম বন্ধ হয়ে আসা দরজার ফাঁকে
পায়ে আটকে যেতেই দরজাটা আবার খুলে গেল
নরম কার্পেট বিছানো হোটেলের করিডর
ঘোলাটে ছায়াহীন আলোকসজ্জা
মসৃণ দেয়ালে ঝোলানো অয়েলপেন্টিং
মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন জঁ-জাক মার্টিন
হাতদুটো শরীরের দুদিকে ঝোলানো; মাথাটা সামান্য ঝুঁকে আছে
আমি তাঁকে নিঃশব্দে অনুসরণ করছি
নিজের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যখন ইয়েল লকটা খোলার উপক্রম করছেন, আমি তাঁর থেকে হাতপাঁচেক দূরে স্থির হলাম
দরজাটা খুলে গেল, কিন্তু আমার উপস্থিতি টের পেয়ে জঁ-জাক মার্টিন দাঁড়িয়ে রইলেন
তাকালেন আমার দিকে
আমি লরার বন্ধু, আমি বললাম
লোকটার ভ্রূ কুঁচকে উঠল
লরা এখানে নেই, কেজোগলায় বলল, লরা মারা গিয়েছে
গাড়ি দুর্ঘটনায়
অসলোর উত্তরে পাহাড়ী রাস্তায় একা ড্রাইভ করছিল
বরফে চাকা পিছলে খাদে তিনশো মিটার নীচে
তারপর তিনি ঘরে ঢুকে উদ্ধতভাবে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন আমার মুখের ওপর