content
stringlengths
0
129k
উত্তরে কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মহিলা আমার পরিচয় জানতে চাইলেন
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম আমি লরার একজন বন্ধু, তার ব্যাপারে জানতে চাই
একটা দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য
দু-একটা অস্পষ্ট পুরুষকন্ঠে ফিসফাস
তারপর মহিলা আমাকে জানালেন এক্স রেডিও মাসছয়েক আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছে
আমার আশঙ্কা হলো উনি এবার ফোনটা রেখে দেবেন, কিন্তু সামান্য বিরতি দিয়ে উনি আমাকে সান্টা মনিকা পিয়েরের কাছে একটা বারে একজনের সঙ্গে দেখা করতে বললেন, শুক্রবার রাতে
এল.এ.র রাতগুলো মাঝে মাঝে আমার লম্বা এবং অসহ্য লাগত
আমি উঠে জল খেতাম, জানলার সামনে দাঁড়াতাম, বাথরুম যেতাম, তারপর ফিরে এসে আবার ঘুমোনোর উপক্রম করতাম
ঘুম ভেঙে গেলে আমার ঘুম আসেনা
ঘুমের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে আমি ভাবতাম এক্স রেডিওর কথা
কৌতুহলবশত আমি ইন্টারনেট সার্চ করে এক্স রেডিও সম্পর্কে তথ্য বের করার চেষ্টা করতাম
কিন্তু খুব কমই জানতে পেরেছি, তবু দুএকটা অদ্ভুত জিনিস যে আমার চোখে পড়েনি তা নয়
আমি অপেক্ষা করছিলাম শুক্রবার রাতটার জন্যে
কথামতোই আমি সান্টা মনিকার ছোট্টো বারটায় গিয়ে পৌঁছলাম
স্বাভাবিকভাবেই বেশ ভিড়, ভিড় ঠেলে আমি বারটেন্ডারের কাছে অতিকষ্টে পৌঁছে জানতে চাইলাম এনরিকে মার্টিন এখানে কাজ করে কিনা
সে একহাতে পানীয় ঢালতে ঢালতে অন্যহাতে ইশারা করল কোণের টেবিলে সার্ভ করতে থাকা একজন ওয়েটারের দিকে
সেদিকে এগিয়ে আমি 'এনরিকে' বলে ডাকতেই টেবিলে বসা যুবকটি বলল, আমিই
সামান্য হকচকিয়ে গেলাম, কেননা আমার ধারণা হয়েছিল এনরিকে বারটিতে কাজ করে
আমি বসলাম তার সামনে
সে আমাকে সরুচোখে নিরীক্ষণ করতে করতে আচমকা জিগ্যেস করল লরার সাথে আমার কী সম্পর্ক
বারের মিউজিকটা ঢিমে হয়ে এসেছে
নিউইয়র্কে পড়তাম আমরা, আমি বললাম, বন্ধু
হাত বাড়িয়ে সে পানীয়ের গ্লাসটা টেনে নেওয়ার সময় আমার চোখে পড়ল তার কবজিতে ট্যাটুর দাগ
ডিড ইউ ডেট হার? - সে জানতে চাইল
কিছুদিনের জন্যে, আমি উত্তর দিলাম
এবং আমি বুঝতে পারলাম প্রশ্ন করার ভারটা আমাকে নিতে হবে, নইলে এক্ষুণি লরা সম্পর্কে একগাদা জবাব আমাকে দিতে হবে
কিন্তু এনরিকে আনমনে তার কানের দুলে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, আমিও
তৎক্ষণাৎ আমি বুঝতে পারলাম এনরিকে লরার প্রথম বয়ফ্রেন্ড
বারটা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ালাম
সাইকেল চালানোর সরু রাস্তার পাশে জায়গাটা নির্জন এবং ঢেউয়ের আওয়াজ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই
বেশ কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রের ওপর সূর্য অস্ত গ্যাছে; দূরে দিগন্তের কাছে গোলাপি-ধূসর আলো ম্লান দেখাচ্ছে সান্টা মনিকা পিয়েরের উজ্জ্বল নাগরদোলার ব্যাকগ্রাউন্ডে
লরা মরুভূমির সঙ্গে কথা বলত, এনরিকে মুখ খুলল
আমি তার দিকে তাকালাম
মরুভূমিতে অনেক আজব জিনিস ঘটে, সে বলল, এক্স রেডিওয় আমরা ইউএফও নিয়ে একটা সিরিজ করেছিলাম
আমরা মরুভূমির বিভিন্ন জায়গায় যেতাম, যেখানে ইউএফও দেখা গ্যাছে
মরুভূমিতে গেলে লরা পাল্টে যেত; যেন সে চেনা জায়গায় এসেছে
অন্ধকার সমুদ্রটা এমন দেখাচ্ছিল, যেন সেখান থেকে এক্ষুনি লাভক্রাফটের কল্পনার দানব উঠে আসবে
আমি বুঝতে পারছিলাম আমি একজন অন্য লরাকে আবিষ্কার করছি - একজন সুখী লরা বা একজন বিধ্বস্ত লরা, আমি ঠিক জানিনা
সেইরাতে এনরিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি ইউনিভার্সিটি ফিরে এসেছিলাম
সেরাতে ঘুমের ভেতর আমি লরাকে স্বপ্ন দেখলাম; তাকে খুশি দেখাচ্ছিল, তার চুলগুলো হাওয়ায় অল্প অল্প উড়ছিল আর সূর্যাস্তের আলো গড়িয়ে পড়ছিল তার চিবুক বেয়ে
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না জায়গাটা এল.এ., ফ্লোরিডা নাকি প্যারিস, কিন্তু অবশ্যই নিউইয়র্ক নয়
তিনমাস পরে আমি নিউইয়র্কে ফিরে এসেছিলাম
লরা আবার আমার দৈনন্দিন স্মৃতি থেকে মুছে যাচ্ছিল
শহরের ডিপ্রেসিভ রাতগুলোয় ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ত, দূর থেকে পুলিশের সাইরেন ভেসে আসত এবং আমি হয়তো কিছুক্ষণ কোনো লেট নাইট শো দেখতাম
তারপর ইউটিউবে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম
একদিন রাতে লরাকে আমি আরেকবার আচমকা স্বপ্ন দেখলাম
ধূসর মরুভূমির মাঝখানে একটা ভূতুড়ে জনহীন শহর
কাঁটাঝোপে ভর্তি একটা খয়েরি ঢিবির নীচে একটা কালো গাড়ি
গাড়িটার পাশে সে দাঁড়িয়েছিল আর তার সামনে অন্ধকার আকাশজোড়া বিশাল ছায়াপথ
অগুনতি মরা নক্ষত্রের আলো তার অবয়বটুকুকে ফুটিয়ে তুলেছে
আমি তাকে পিছন থেকে দেখেই চিনতে পারলাম
এর কয়েকমাস পরে হঠাৎ প্যারিস থেকে লরার একটা ফোন পেলাম আমি
শুরুতে আমরা আমাদের বদলে যাওয়া জীবন নিয়ে বকবক করলাম
এল.এ.র কথা আমি তাকে জানালাম না
তারপর একসময় আমি বুঝতে পারলাম লরার জীবনে কতকগুলো সমস্যা তৈরি হয়েছে
পলের সাথে তার বিভিন্ন কারণে ঝগড়া হয়েছে, তাদের বিয়েটা হয়তো ভেঙে যাবে
আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না তারা বিচ্ছেদের আবেদন জানিয়েছে কিনা
আমি নিউইয়র্ক আসছি, সে বলল
তার কথা শেষ হয়ে গেছে নাকি সে আরও কিছু বলবে বুঝতে না পেরে আমি চুপ করে রইলাম
ফ্লাইটের ধকল সামলানোর জন্যে, লরা আমাকে জিগ্যেস করল, সে আমার এখানে একটা রাত কাটিয়ে তার কোনো আত্মীয়ের কাছে চলে যেতে পারে কিনা
নিশ্চয়ই; পাছে সে কোনো হোটেলে ওঠার কথা চিন্তা করে, এই ভেবে তাকে আমি দ্রুত জানালাম আমি তাকে এয়ারপোর্টে আনতে যাব
তারপর আমরা নানারকম কথা বলে রেখে দিলাম
লরার ফ্লাইট নামার নির্ধারিত সময় ভোরবেলা আর সেটা ছিল একটা বিশ্রী বাদলার দিন
ইন্টারস্টেট ২৭৮ ধরে আমি লাগার্ডিয়া পৌঁছলাম
অ্যারাইভ্যালের সামনে একনজরেই আমি লরাকে খুঁজে পেলাম
বেল্ট থেকে তার লাগেজ সংগ্রহ করে সে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ
তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল
প্রথমেই চোখে পড়ল লরা গর্ভবতী
সে আমাকে দেখে হাসল
আমরা দুএকটা কথা বলে গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম
গাড়িতে তার ব্যাগটা তুলে আমরা ড্রাইভ করে বেরিয়ে এলাম পার্কিং লট ছেড়ে
লরা আমার পাশে বসেছিল সিটবেল্ট বেঁধে
লাগার্ডিয়া থেকে বেরোনোর সময় মারাত্মক জ্যামে পড়লাম আমরা
ট্রাফিক এগোচ্ছিল শম্বুক গতিতে
জলে ভেজা রাস্তা আর মেঘ-থমথমে সমস্ত আকাশ অন্ধকার, এই পরিস্থিতিতে গাড়িগুলো ব্যাকলাইট জ্বেলে এক পা এগিয়েই শ্লথ হয়ে পড়ছিল
উইন্ডস্ক্রিন থেকে ওয়াইপার ঝাপসা স্ট্রীটলাইট-মাখা জলের দানাগুলো ক্রমাগত ঝেড়ে ফেলছিল
আমার হঠাৎ মনে হলো এই জঘন্য আবহাওয়া-সমেত নিউইয়র্ক শহর লরার কাছে একটা দুঃস্বপ্ন
উল্টোদিক থেকে আসা অন্য লেনের গাড়িগুলোর আলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাদের আর একটার পর একটা ফ্লাইওভার পেরিয়ে আমরা গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছিলাম
অবশেষে যখন আমরা ম্যানহ্যাটানে এসে ঢুকলাম, তখন আকাশ অনেকটা ফর্সা হয়ে গেছে, কিন্তু সকাল আটটার আকাশ তখনও দেখাচ্ছিল ভোর চারটের মতন
লরা সেদিনটা বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছিল
আমি তাকে একবার ডাকতে গিয়ে দেখলাম সে বাচ্চা মেয়ের মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে
আমি রুমহিটারটা একটু বাড়িয়ে দিলাম
সন্ধ্যেবেলা আমরা বসে বসে গল্প করছিলাম
সামনে টেলিভিশন চলছিল
বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে
আমি তাকে তার বইটা দেখিয়েছিলাম
সে শুধু মিটিমিটি হেসেছিল
রাতে খাওয়ার পর হঠাৎ লরা আমাকে বলল প্যারিসে থাকার সময় সে আমার ব্লগ পড়ত এবং তার ভালো লাগত
শুনে আমি সেই মুহূর্তেই স্থির এবং নিশ্চল হয়ে গেলাম
যদিও লরা নির্দিষ্ট কোনো পোস্টের কথা উল্লেখ করেনি, তবু আমি জানি ও ঠিক কিসের কথা বলছিল
একটা পুরোনো লেখা, যেটা আমি লিখেছিলাম লরার সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার কিছুদিন পরে
একটা মেয়ের গল্প (এবং কেউ যদি লরাকে চেনে, তার বুঝতে অসুবিধে হবেনা মেয়েটা লরা)
মেয়েটা নিউইয়র্ক শহরকে অপছন্দ করত আর তুষারাচ্ছন্ন আবহাওয়া তাকে অসম্ভব কষ্ট দিত, কাহিনীর টানে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে তাকে আমি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কানাডার উত্তরে ইয়েলোনাইফ শহরে, একা
তার জীবন ঢেকে গিয়েছিল অদ্ভুত শূন্যতায়
ইয়েলোনাইফের দীর্ঘ ও ক্রূর শীতকাল তাকে আটকে ফেলেছিল একটা শক্তপোক্ত কারাগারে
মেরুজ্যোতি-উজ্জ্বল আকাশের নীচে আশ্চর্য বিষাদে সে আক্রান্ত হয় এবং একদিন সে নিখোঁজ হয়ে যায় ইয়েলোনাইফ থেকে
আমি কোনো ব্যাখ্যা দেবনা কেন আমি এরকম একটা গল্প লিখেছিলাম
হয়তো আমি লরাকে কল্পনা করতে চেয়েছিলাম একাকিত্বের ভেতর হারিয়ে যাওয়া অবস্থায়
অথবা অন্য কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণও থাকতে পারে, আমি নিশ্চিত নই
কিন্তু লরা লেখাটা পড়েছে, এটা বোঝামাত্র একধরনের অপরাধবোধে আমার মন ছেয়ে গেল