content stringlengths 0 129k |
|---|
রসের কথায় পরে আসছি |
আমি মোটেও বিশেষজ্ঞ নই, আর্ট কলেজের ছাত্রও ছিলাম না কোনও কালে |
বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে নিজের মগজে যতটুকু বুঝেছি সেইটাকে কম কথায় বলব |
ছোট্ট বেলা থেকে বই পড়ার অভ্যেস আমার |
পড়ার বইয়ের ওপর অত ভালোবাসা ছিল না যতটা ছিল বাইরের অন্য বইয়ের ওপর |
অবশ্য রবিঠাকুরের সহজ পাঠের কথা আলাদা |
কারণ, তাঁর অসাধারণ সহজ লেখার সঙ্গে নন্দলাল বসুর অসামান্য ছবি |
ছোটবেলায় সবার প্রিয় বই সহজ পাঠ |
আমার ছবি আঁকার উৎসাহও ওই ছবি দেখে |
একটু বড়ো হওয়ার পর হাতে পেলাম নতুন পর্যায়ের সন্দেশ পত্রিকা |
সহজ পাঠের পরে সন্দেশে সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ছবি দেখে নতুন করে মুগ্ধ হলাম |
তাঁর শেকড় যে ওই শান্তিনিকেতনে - এ বয়সেই দিব্যি টের পাওয়া গেল |
লেখার ধরনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কতরকম যে ছবি! আঁকার যে কত রকমফের হতে পারে! কোনোটা তুলিতে জলরংয়ে আঁকা, কোনোটা কালিকলমে |
এত রকমফেরের একটাই কারণ, তাঁকে আঁকতে হয়েছে নানাধরনের লেখার সঙ্গে যাদের ছবির ইমেজ আলাদা আলাদা রকমের |
তাঁর মনে যে বিভিন্ন ধারাগুলো একই সঙ্গে বয়ে যায় বেশ বোঝা গেল |
সকাল সাতটায় চান করে এসে বসেছেন |
চশমা খুলে হাতে ধরা |
ডাঁটির কোণটা দাঁতে ধরা |
খালি চোখে জানালা দিয়ে চেয়ে আছেন বাইরে |
মনটা কোথায় আছে বুঝে পাওয়া দায় |
কানের কাছে বাজছে কখনও বিটোফেন, মোজার্ট বা সালিয়াপিন |
কোলে রাখা বোর্ডের গায়ে সাদাকালো রেখার সঙ্গে তুলির ডগা ঠিকঠাক পয়েন্ট করতে করতে অজান্তেই তৈরি হওয়া অপূর্ব টেক্সচার |
এবার কাগজ কলম নিয়ে স্বরলিপির নোটেশন লেখা হতে হতে দেখলাম ছুঁচলো ঠোঁটে শিস দিয়ে সুর করছেন গুপির গানের |
চারটি লাইন তৈরি হতে খাতার ওপর কলম রেখে বোর্ডে কার্ট্রিজ কাগজের টুকরোয় তুলি ঠেকালেন |
দশ মিনিটে হয়ে গেল একটা হেড পিস! তলায় নাম লিখে নামিয়ে রাখলেন পাশে |
এবার উঠে এল আধখানা লেখা কোনও গল্প |
কলমের পেছনটা কামড়ে দু'মিনিটে লেখা হয়ে গেল শেষ তিনটে পাতা |
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আমার দিকে ফিরলেন, 'কই, কী আঁকলে দেখি |
' মন দিয়ে আমার আঁকা ছবিটা দেখে বোধহয় খুশি হয়েছেন, 'তুমি তুলিতেই আঁকতে বেশি ভালোবাসো, না? ভালো |
কিন্তু কঠিন তুলিতে আঁকা |
' গল্পের মতো করে বললেন নন্দলাল বসু, বিনোদ বিহারীরা কেমন যত্ন করে তুলির পয়েন্ট ঠিক করতেন, কীভাবে তুলি ধরে রাখতেন |
গল্প লিখতে লিখতে ফোন বাজল |
রিসিভার তুলে কথা বলছেন, কলম থামালেন না একবারও |
বুঝলাম, একাগ্রতা থাকলে মনটাকেও ভাগ করে ফেলা যায় |
সময় হাতে রেখে কাজ করা যায় ঠিকঠাক |
আসল ব্যাপার হল মনটা, আর সময়ের মাপ |
একেবারে ছোটবেলা থেকে তাঁর মৃত্যু অবধি অনেকদিনের অনেক দেখা, অনেক শেখা ছোটো মাপে বলা মুশকিল |
মোদ্দা কথা, মনের সবদিক নিয়েই শিল্প, সবাইকে নিয়েই শিল্পী |
ছবি আঁকা আলাদা কিছু নয় |
মানিকদার তো একই |
অফসেট ছাপার যুগ নয় সেটা |
তুলি কলম আর সাদাকালো রংই সম্বল |
মানিকদার আঁকা সাদাকালো ছবি রং ধরাত মনে |
হাফটোন বা কোয়ার্টার টোনে পারতপক্ষে আঁকতেন না, দরকারে স্ক্রিন ব্যবহার করতে নীল রং দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন কোথায় কী ধরনের স্ক্রিন চান |
ব্লক তৈরি করার সময় সুবিধে হত বুঝতে |
ঘন কালো কালিতে রেখার জালে ছায়া আঁকতেন |
সেই অদ্ভুত টেক্সচারে ছবিতে নতুন ডাইমেনশন আসত |
এই জালি টেক্সচার আঁকার শিক্ষা পেয়েছিলেন পারিবারিক সূত্রে |
উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমার রায়ের আঁকা ছবি দেখলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে |
বেশি খরচে হাফটোন ব্লক বানাবার ঝামেলা, বাসাতেই এই জাল ব্যবহারের সৃষ্টি |
কেন জানি না, হাফটোনের চাইতে এই ইকড়ি মিকড়ি মনে দাগ কাটত অনেক বেশি |
সরু দাগ, মোটা দাগ আর আরবি হরফের টানে বা বাংলা পটের মতো কতরকমভাবে যে এঁকেছেন - বলার নয় |
কালো সলিড ফিগারের ছবি আছে অনেক |
তুলিতে বানটেন ব্রাশ, ড্রাই ব্রাশ, সেমি কন্টেন্ড ব্রাশ |
অর্থাৎ যেমন দরকার, তেমন দাগ দিয়ে যাওয়া |
মাত্রা যেন হাতের মুঠোয়! টেক্সচারের জন্যে কতরকম পরীক্ষানিরীক্ষা! |
মোটা স্টেনসিল ব্রাশ দিয়েও আঁকতে দেখেছি |
ফ্ল্যাট তুলি বা কলমে এঁকেছেন |
ছবি ধরে ধরে বলতে গেলে মহাভারত লেখা যায়, আমি তার পক্ষপাতী নই এখানে |
আমি শুধু আঁকিয়ে মানুষটায় কথা বলব |
সহজ সরল মানুষটার ওপরকার গম্ভীর ছদ্মবেশের তলায় মানিকদা ছিলেন শিশুর মতো সন্ধানী |
সবকিছু জানার এত আগ্রহ আর কারও দেখেছি বলে মনে পড়ে না |
মানিকদার ছোটবেলার অনেক গল্প শুনেছি |
চার-পাঁচ বছর বয়সে পেনসিলে বড়ো বড়ো হরফে লেখা পোস্টকার্ড দেখিয়েছিলেন নলিনীদি |
সেখানে কত কী লেখা! নতুন দেখা কোনও পাখি, খেলনা বা বই থেকে শেখা শব্দের কথা লেখা ছিল |
বাংলা-ইংরেজিতে লেখার অভ্যেস তখন থেকেই |
সেই পোস্টকার্ডেই ছবি আঁকা থাকত |
পঁচানব্বই বছর পার করে সেই বিবর্ণ পোস্টকার্ডের ছবি এখন বড়ো হতে হতে আকাশ ছুঁয়েছে |
যেকোনও বড়ো মাপের প্রতিভাবান মানুষ তাঁর বুকের ভেতর সবুজ সতেজ শিশু-মনটিকে লালন করেন |
তাঁদের দেখার চোখের বিস্ফার শিশুর মতো, কালের দিগন্ত ধরা পড়ে যায় আনায়াসে |
রসের কথায় আসি |
আগেই বলেছি, রসবোধ আসে পারিবারিক সূত্রে, আর বেশিরভাগটাই জন্মগত |
উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার হয়ে সত্যজিতে সেই রসবোধ সঞ্চারিত তো বটেই, পরিবারটির সকলেরই রসবোধ অসাধারণ |
এঁদের সকলের কল্পনার উত্তরাধিকার সত্যজিতের |
মূলত শিশুসাহিত্যে জড়িয়ে থাকা পরিবারটিতে ছবির ব্যবহার ছিল খুবই |
তাছাড়া মুদ্রণ বিজ্ঞানের চুড়োয় মানুষগুলো লেখার সঙ্গে কেমন ছবি যাবে, কীভাবে তা ছাপা হবে - এ নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে ছিলেন |
যৌথ পরিবারটি উত্তর কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিট থেকে গড়পাড়ের বাড়িতে এসে ওঠার পর উপেন্দ্রকিশোর ছাপাখানা বসালেন একতলায় |
হাসিখুশি মানুষগুলো সবাই নানারকম সৃষ্টি মূলক কাজে ব্যস্ত থাকেন |
খেলা, গান, নাটক লেগেই আছে |
১৯১৩ সালে সন্দেশ পত্রিকা বার হওয়ার পর লেখা আর ছবি আঁকার বান ডেকে গেল |
বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ, পুরাণ, মজার গল্প, খেলার কথা, বিজ্ঞানের ওপর আন্তর্জাতিক মানের প্রবন্ধ, জীবজন্তুর গল্প, শিকারের গল্প, মজাদার নাটক, উদ্ভট ছড়া, রূপকথা - কী নেই! নানারকম রসের ছড়াছড়ি |
বাড়িটা সবসময় যেন হাসত |
সত্যজিৎ সব পেলেন উত্তরাধিকার সূত্রে |
অবশ্য সব রস ছোটোদের ভালো লাগার কথা নয়, দরকারও নেই তেমন |
বাদ গেল শৃঙ্গার, করুণ, ভয়ানক, বীভৎস, দাস্য রস |
জায়গা পেল উদ্ভট রস |
এ রসের তুলনা নেই |
বাংলায় কেউ লেখেওনি এর আজ্ঞে |
প্রথম এবং প্রধান স্রষ্টা সুকুমার |
সত্যজিতের আবছা মনে ছিল তাঁর বাবাকে |
তবে পড়তে শেখার পর চিনেছিলেন তাঁকে |
লেখা তো বটেই, এঁর ছবি আঁকাও কঠিন |
আঁকলেন ব্রহ্মনারায়ণ খাঁর ইঞ্জিন পোশাক, দাড়ির বেহালা, বেড়ালের হারমোনিয়াম গোছের আশ্চর্য ছবি |
মাথায় রইল সুকুমারের আঁকা কুমড়ো পটাশ, প্যাঁচার বিচার সভা |
উদ্ভট রস বা অ্যাবসার্ডিটির ওপরে যুক্তিহীন সংজ্ঞা, সত্য থাকে গুপ্ত |
ট্যাঁশ-গরু গরু নয় আসলেতে পাখি সে, |
যার খুশী দেখে এসো হারুদের আপিসে |
এ নিয়ে বলার কী থাকতে পারে? আশা করি ট্যাঁশ মানে সকলের জানা আছে |
বিশেষত সে হারুদের আপিসে চাকরি করে বলে শোনা গেছে |
অথবা সেই মহামন্ত্র - |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.