content
stringlengths
0
129k
হ্লদে সবুজ ওরাং ওটাং
ইটপাটকেল চিৎপটাং
গন্ধগোকুল হিজিবিজি
নো অ্যাডমিশন ভেরি বিজি
মুশকিল আসান উড়ে মালি
ধর্মতলা কর্মখালি
উদ্ভট রসের বহু লেখা আর ছবি মানিকদা দিয়ে গেছেন
সুকুমারের মতো রায় পরিবারের আরও অনেকেই লিখে গেছেন, মানিকদা তার জন্যেও বহু ছবি এঁকেছেন
পুরাণের ছবি আঁকার সময় যে দেশের গল্প, আঁকা হতে হবে সে দেশের ধারায়
উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন এই ধারার প্রবর্তক
যে দেশের ছবিই হোক, তার মানুষগুলোর ছবি, পোশাকআশাক, অস্ত্র আর শরীরের ভঙ্গি সহ নিখুঁত হতে হবে, তবেই সে গল্প বিশ্বাসযোগ্য হবে - এই বিশ্বাসে ছবি আঁকতেন মানিকদা
অনুবাদ গল্পের ছবিতেও তাই
ভূতের ছবির মধ্যে অদ্ভুত রস
ভয় দেখানোর ইচ্ছে নেই ছোটোদের, তাই খানিকটা মজা করে আঁকা
গুপি গাইন বাঘা বাইন সিনেমার জন্যে ভূতের রাজা আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের যে ছবি আঁকা আছে খেরো খাতায় তার জুড়ি নেই
ইতিহাসের ছোঁয়া লাগা সেসব ভালোবাসার ভূতেরা লড়াই করলেও বীর রসের বদলে হাস্যরস আর অদ্ভুত রসই ফুটে উঠেছে
ভারেঙ্গার ভূত বা মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্রের জল থেকে উঠে আসা দৈত্যের ছবিতেও তাই
হাতে তলোয়ার ঢাল নিয়ে আগাডোম বাঘাডোম আর ঘোড়াডোমের চমৎকার ছবি সরু তুলির চটজলদি টানে আঁকা বীর রসের আদর্শ ছবি
বাংলা পটের টান, শান্তিনিকেতনের প্রভাব স্পষ্ট
বিনোদ বিহারী-নন্দলালের কাছে শিক্ষানবিশির ফল
জটায়ুর, অর্থাৎ লালমোহন গাঙ্গুলির নেপালি জপমন্ত্র বা প্রে হুইল হাতে অন্তুর নাচ অসাধারণ
ফেলুদার কুংফুও তাই
মানিকদার আঁকার চরিত্রই কিছু না কিছু করছে, মুখের অভিব্যক্তিও নিখুঁত
অ্যাকশন থাকলেও চূড়ান্ত ঘটনাগুলোর ছবি ইচ্ছে করেই কম আঁকতেন, ওটা পাঠকের কল্পনার জন্যে ছেড়ে দিতেন
কোনও স্টাইলাইজেশন ছাড়া সহজ লাইনের ছবিই সংখ্যায় বেশি
যেমন নিজের লেখা গল্প ফেলুদা, শঙ্কুর উপন্যাস বা অন্য সন্দেশী লেখকদের লেখা গল্পগুলোয় আঁকা ছবি
এতেও প্রত্যেকটা চরিত্রের শরীর, মুখের ভাব, পোশাক, যন্ত্রপাতি - এমনকি রিভলভারটি পর্যন্ত নিখুঁত
আমাদের চেনা পরিবেশের চেনা মানুষ সবাই
জীবজন্তুর ছবিও বেশিরভাগই যথাযথ
তবে গল্পের বৈশিষ্ট্যে বাঘ, বেড়াল, কুকুর আঁকাতে তুলি চলত পটের ঢংয়ে
মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্রের জন্যে বিভিন ঢংয়ের ছবি
মিশরীয় থেকে বাংলার পট বা সহজ রেখার ছবি
হাফটোন আর কোয়ার্টার টোনে অল্প ছবির মধ্যে উপেন্দ্রকিশোরের দুঃখীরাম, ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি, আনন্দমেলার পুজো সংখ্যার ছবি, বঙ্কুবাবুর বন্ধু ইত্যাদি
খুব বেশি নেই
কারণ বেশিরভাগ ছবি সন্দেশের জন্যে আঁকা, যা ছাপা হত নিকৃষ্ট নিউজপ্রিন্টে, হাফটোন তাতে ফুটতই না ভালো
পঞ্চুলাল (পিনোচ্চিও) উপন্যাসের সরু তুলির টানে অনবদ্য ছবিগুলো স্টাইলাইজড
দাড়ির সমুদ্রে পঞ্চুর দোল খাওয়া বা মেলার দৃশ্য ভোলা যায় না
কার্টুন ছবি বলতে বহু চেনা মানুষের মুখের ক্যারিকেচার
অসামান্য ছবি
গোটা দু-তিন কমিকস এঁকেছিলেন বড়ো মাপের সন্দেশের কভারের জন্যে
সেগুলোও কার্টুনধর্মী ছবি, কোনও ডায়ালগ নেই
আশ্চর্যরকমের গ্রাফিক্সের নমুনা হল জমাট কালো ফিগারের ছবিগুলো
উপেন্দ্রকিশোরের মজার গল্প শেয়ালের ঘি খাওয়ার ছবি যেন কথা বলে
লাঠি হাতে পূজারি জালায় লাঠিপেটা করছে, কালো জালার মধ্যে সাদা রংয়ে আঁকা শেয়াল লুকিয়ে
জালার মধ্যে থাকলে শেয়ালকে দেখতে পারার কথা না, কিন্তু একটুও রসালো না করে শেয়ালকে দেখানো গেল
চটজলদি টানে প্রায় কলম না তুলে আঁকা কবিতার ছবিগুলো সন্দেশের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে
কলমের নিবে বেশি কালি নিয়ে আলতো হাতে আঁকা
আঁকতে গিয়ে থামার জো নেই, কালির ফোঁটা পড়ে ছবি নষ্ট হবে
সংক্ষিপ্ত লাইনে আঁকা, বাড়তি লাইন নেই কোথাও
ক্যামেরার অবস্থান পালটালে যেমন ডাইমেনশন বদলে যায়, দরকারে মানিকদা ডাইমেনশন বা পরিমিতি পালটেছেন
'মিস্টার ককলিঙের কাঁকড়া' অনুবাদ গল্পে বিশাল যান্ত্রিক কাঁকড়ার দাঁড়ায় ধরা ককলিঙের দেহের ছবি লো অ্যাঙ্গেলে যেন ক্যামেরায় ধরা ভয়ানক ছবি
একে বলা যেতে পারে ভয়ানক রসের কালজয়ী ছবি
'কৈলাসে কেলেঙ্কারি'র টপ অ্যাঙ্গেলে দেখা ছবিটিও সেরা ছবি
ইলোরার কৈলাস মন্দিরের অসাধারণ স্থাপত্য বড়ো থেকে ছোটো হয়ে নিচে নেমে গেছে
পাশের পাহাড়ের পাথুরে গা আর মন্দিরের মাঝের গলিতে ছোট্ট দেখাচ্ছে পড়ে থাকা মৃতদেহটা
বোধহয় এইরকম ছবি আঁকতে পেরেই মানিকদা বলেছিলেন, 'এইসব ছবি এঁকে আমি একটা সিনেমা তৈরি আনন্দ পাই
জীবজন্তুর ছবির মধ্যে লাইনে আঁকা কয়েকটি ছবি মনে পড়ছে
দীপালি চৌধুরীর আফ্রিকার চিঠি, হাতি শিকারের ছবি, বাঘের ছবি
তাঁর মাস্টারপিসের মধ্যে রাখব 'দৈত্যের কেটলি' গল্পের ছবি, 'হাঁস' গল্পের বড়ো সাঁওতালটির ছবি, গুগাবাবার জঙ্গলের ধারে ভূতের রাজার গানবাজনা শোনাবার ছবি, পঞ্চুলাল, শিব আর রাক্ষস, বৃহচ্চঞ্চু, মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্র, গল্প-উপন্যাসগুলোর ছবি
কাকে ফেলে কাকে রাখি, তাঁর সব ছবিই আগামী দিনে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে
কল্পনায় কত কী দেখে লোকে
তাতে খানিক বাস্তব আর খানিকটা বিজ্ঞানের ফোড়ন দিয়ে তৈরি হল কল্পবিজ্ঞান
বিদেশে এসেছে অনেকদিন আগে, বাংলায় এসেই পেয়ে গেল পাক্কা আসন
কল্পবিজ্ঞান আগেও কি ছিল না? ভারতবর্ষ এক আজব জায়গা
রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ ঘাঁটলে কল্পবিজ্ঞানের শেকড় খুঁজে পাবে
সুকুমার রায়, সুবিনয় রায়, লীলা মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্রের পর সত্যজিৎ রায়, অদ্রীশ বর্ধন কল্পবিজ্ঞান নিয়ে কম লেখেননি
কারও লেখায় কল্পনা বেশি, বিজ্ঞান কম
কারও বা বিজ্ঞান বেশি, কল্পনা কম
হাঁসজারু মজার হতে পারে, যদিও খুঁজতে যাওয়া বৃথা
মনে রাখতে হবে কল্পবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বললে অসুবিধে আছে
বরং কল্পনাটাই বেশি আনন্দ দেয়
সত্যজিতের ছবি নিয়ে বলছি, তাই প্রফেসর শঙ্কু আসবে আলোচনায়
'ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি' থেকে আশ্চর্য এক দুনিয়ার খোঁজ পেল কিশোরকিশোরীরা
'স্বপ্নদ্বীপ' উপন্যাসের ছবিগুলো অবিস্মরণীয়
___ সূক্ষ্ম টানে আর সলিড কালো জলে অসামান্য কাজ
কল্পনার আগল খুলে শঙ্কুর আশ্চর্য ব্যোমযান আর অচেনা অপার্থিব গাছপালা, যাদের খাদ্য প্রতিভাবান মানুষের মগজ
বিজ্ঞানের যুক্তি বাদ দিয়ে কল্পনার যাত্রা বহুদূর
বড়োদের সাহিত্যে বিজ্ঞান নির্ভর গল্প-উপন্যাস অবশ্যই আছে, দরকারও আছে
কল্পবিজ্ঞান নাম দিলে বিজ্ঞান গৌণ, কল্পনার অবাধ বিস্তারটাই কাম্য
মানিকদারও এই মত ছিল বলে জানি
বিজ্ঞাপন চিত্র, বইয়ের কভার মানিকদার হাতের সেরা কাজগুলোই পেয়েছে
নানান বইয়ের বা পত্রিকার ভেতরকার ইলাস্ট্রেশন প্রচুর আছে
তাতে সন্দেশের মতো এত রকমফের নেই
সন্দেশ পত্রিকা তাঁর নিজের, সেখানে তিনিই রাজা
ছোটো মাপে এত বড়ো বিষয় নিয়ে লেখা সম্ভব নয়
ভবিষ্যতে গবেষণা করার মতো এত ভালো বিষয় আর কি আছে? সে কাজটা ঠিকঠাক করতে পারলে কেন ইলাস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে তাঁর পাশে দাঁড়াবার মতো কেউ নেই
শুধু এদেশে নয়, গোটা পৃথিবীতেই নেই
কারণ, ইমেজ ড্রয়িং কথাটাই ভালো করে মাথায় আসেনি কারও
বেশিরভাগ শিল্পীই নিজস্ব একটা ঢংয়ে এঁকে গেছেন, লেখা যেমনই হোক
মানিকদা করেছেন ইমেজ ড্রয়িং
লেখক পরিচিতি
*সত্যজিৎ রায় কৃত ইলাসট্রেশনগুলি লেখকের সৌজন্যে প্রাপ্ত
তাঁকে অশেষ কৃতজ্ঞতা
শেয়ার করুন
:
লোড হচ্ছে...
4 ক্রোড়পত্র স্মরণে সত্যজিৎ মানিকদার কথা শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য্য বর্ষা ২০২০
উপাসনা বলেছেন:
জুন 15, 2020; 1:04 পুর্বাহ্ন এ