content
stringlengths
0
129k
'চাঁদ অমাবস্যা হলে চলে যায় পাও-তলে দক্ষিণ কনিষ্ঠ আঙুল ভিতরে'
অমাবস্যা এখানে রজঃপ্রবৃত্তির কাল
যে কালে সাধক চন্দ্র পরিক্রমা শুরু করেন
সঙ্গিনীর পদনখে (পাও তলে দক্ষিণ কনিষ্ঠ আঙুলে ভিতরে), প্রতিপদে চাঁদ অবস্থান করে পাতালে
পাতাল' এখানে অষ্টম চন্দ্রের যোনি
দ্বিতীয়াতে পায়ের উপরে
তৃতীয়াতে গেছে
চতুর্থীতে হাঁটু
চাঁদ এভাবে সঙ্গিনীর প্রত্যঙ্গ গুলোকে ছুঁয়ে দিচ্ছে
চাঁদ হল চন্দ্র সাধক
যার চন্দ্ররূপী নাড়ি, চন্দ্র চক্র সব জেগে গেছে
সিদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হয়ে উঠেছে
পূর্ণিমার চাঁদ
সাধকের প্রেমময়তা
জ্ঞান ও বোধিচর্চার গুরুকেন্দ্রিক ভাব-উপলব্ধি
আর্জান শাহের আরেকটি পদে পাই-'আগে পড়গা ইস্কুলে প্রথম যে স্বরে অ-এর স্বর যেও না ভুলে
/ অ-এতে অন্ধকার ছিল স্বর বেয়ে আলো করিল/ একা চন্দ্র টলে গেল পক্ষ গেল মিলে
' 'চন্দ্র টলা' মানে গুরু নির্দেশিত সাধনার ভিতটুক নড়ে যাওয়া
'টলা' মানে হল শুক্র বা বীর্য স্খলিত হয়ে যাওয়া সাধিকার যোনির ভেতর
বাউল 'অটল মানুষ' হওয়ার কথা সব সময়ে বলে থাকেন
'অটল মানুষ' হল ঈশ্বরতুল্য মানুষ
মূর্তিময়তায় সাধারণত বাউলের বিশ্বাস নেই
'ঈশ্বরতুল্য মানুষ' হল 'বস্তুরক্ষার মানুষ'
শুক্র সঞ্চয়ের মানুষ
শুক্রের অধগতি না আসা হল 'অটল মানুষের' সাধনলব্ধ ফল
সাধক বাউল দেহমিলনে সাধক শরীরকে উধ্বগতি দিয়ে বস্তুরক্ষা করে থাকেন
বাউল সাধনাতেও বস্তু বিসর্জন একেবারে নিষিদ্ধ
বাউল বলে রজঃপ্রকাশের তিনটি দিনে সঙ্গিনীর শরীরে কোনওরূপ কাম থাকে না
তার জন্যই সাধনে শুক্র স্খলিত হয় না
'প্রেমজন্ম' হয়
সন্তান জন্ম হয় না
এই জন্ম সিদ্ধ সাধকের জন্ম
বাউল বলেন কামগায়ত্রী থাকে সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রে
......দেহসাধক বলেন শরীরে সপ্তপাতাল আছে
যোগক্রিয়ায় সেসব স্থানে অনায়াসে বিচরণ করা যায় দেহসাধক বলেন পায়ের অধোভাগ অতল, ঊর্ধ্বভাগ বিতল ('পাদাধস্তুবতলং বিদ্যাং তদৃধ্বং বিতলং তথা )
জানু দুটোতে সুতল এবং সন্ধিস্থলে তল (জানুনোঃ সুতলঞ্জৈব তলং চ সন্ধিরষ্ক্রকে
') গুদমধ্যে তলাতল, লিঙ্গমূলে রসাতল(তলাতলং গুদ মধ্যে লিঙ্গমূলে রসাতলম
) পায়ের অগ্রভাগে ও কোমরের কটির সংযোগস্থলে পাতাল ('পাতালং কটিসন্ধৌ চ পাদাদৌ লক্ষয়ে বুধঃ
সাধক যোগে এই সাত পাতালকে দর্শন করে থাকেন
যাকে বিজ্ঞান বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একেকটি স্তর বা উপাদান হিসাবে দেখছে
দেহসাধক এগুলোকে সব দেহ উপাদান হিসাবেও চিহ্নিত করেছেন
শরীরে সাতটি লোকের কথাও বলে থাকেন সাধক
নাভিদেশে ভূলোক আর হৃদয়ে ভূর্বলোকের অবস্থান
('ভূর্লোকো
নাভিদেশেতু ভুবলোকস্তথা হৃদি
স্বর্লোক থাকে কণ্ঠদেশে, চোখে মহর্লোক
('স্বর্লোকঃ কণ্ঠদেশে তু মহর্লোকশ্চ চক্ষুষি
') চোখের উপরে দ্রুদ্বয়ে জনলোক বাউল সাধক এই সন্ধিস্থলকে আরশিনগর বলে থাকেন
আর ললাটে থাকে তপোলোক ('জনলোকস্তদৃধ্বঞ্জ তপোলোকা ললাটকে
মস্তকে, সহস্রারে সত্যলোক
অনেকে একে মহাযোনিও বলে থাকেন ('সত্যলোকো মহাযোনী ভূবনানি চতুর্দশ
') সহস্রারেই ব্রহ্মরন্ধ্রের অধিষ্ঠান
বিন্দুধারণ এখানেই সুসম্পন্ন হয়ে থাকে সাধকের
সপ্তলোক ও সপ্তপাতালের সমষ্টিকে দেহসাধক বলেন চতুর্দল ভুবন
বাউল সাধক আবার চোদ্দকে পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়, পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও চতুর্ভুজের যোগফল হিসাবে দেখেন
সপ্তপর্বতের কথাও বলে থাকেন
দেহের ত্রিকোনে থাকে মেরুপৰ্বত
উর্ধকোণে মন্দর পর্বত ('ত্রিকোণে চ হিতো মেরুরূৰ্ব্বকোণে চ মন্দরঃ
) কৈলাস বিষ্ণুস্তদূর্পে চ সপ্তৈতে কুলপর্বতাঃ
উধ্বভাগে বিন্ধ্য ও বিষ্ণুপর্বত
শাক্তানন্দ তরঙ্গিনী'তে এই ছটি পর্বত আছে
মৎস্যপুরাণ ও বিষ্ণুপুরাণে সাতটি পর্বতের উল্লেখ পাই
তবে নামে কিছুটা পরিবর্তন আছে
মহেন্দ্র, মলয়, সহ্য, শক্তিমান, ঋক ও পরিবার-এই হল সপ্তপর্বত
শরীরস্থ সাতটি দ্বীপের কথাও বলেন সাধক
অস্থিতে জম্বুদ্বীপ, মাংসে থাকে কুশদ্বীপ ('অস্থিস্থানে মহেশানি! জম্বুদ্বীপো ব্যবস্থিত
মাংসেষু চ কুশদ্বীপঃ ক্রৌঞ্চদ্বীপঃ শিরাসু চ
') শিরাতে ক্রৌঞ্চদ্বীপের অবস্থান
রক্তে থাকে শাকদ্বীপ ('শাকদ্বীপঃ স্থিতো রক্তে প্রাণিনাং সর্বসিন্ধযু
তার উপরে সন্ধিদেশে থাকে শাল্মলি দ্বীপ ('তদূর্ধ্বং শাল্মলিদ্বীপঃ ক্ষশ্চ লোমসঞ্চয়ে
লোমপূর্ণ স্থানে থাকে প্লক্ষদ্বীপ
আর নাভিতে থাকে পুষ্কর দ্বীপ('নাভৌ চ পুষ্করদ্বীপঃ সাগ্ৰাস্তদনস্তরম্
সাতটি সাগরও থাকে দেহে
মূত্রে লবণসাগর আর শুক্রে ক্ষীরোদসাগর (লবণোদস্তথা মূত্রে শুক্রে ক্ষীরোদসাগরঃ
') মজ্জায় থাকে দধিসাগর, তার উপরে চর্মে ঘৃত সাগর ( 'মজ্জা দধিসমুদ্রশ্চ তদূর্ধ্বং ঘৃতসাগরঃ
বসা বা চর্বি / মেদে থাকে জলসাগর আর কোমরে / কটিদেশে বা রক্তে থাকে ইক্ষুসাগর ('বসাপঃ সাগরঃ প্রোক্ত ইক্ষু স্যাৎ কটিশোণিতম্
শোণিতে থাকে সুরাসাগর (শোণিতেষু সুরাসিন্ধঃ কথিতাঃ সপ্তসাগরাঃ
সাধক এই সাত সাগরের কথা বলে থাকেন
বাউল সাধক দেহে সাত রসের কথা বলে থাকেন
আবার সাতদিনের যে রজঃধারার নাম করেন তাও অনেকটা সাগরস্থ সাতনামের ধারেপাশে চলে আসে
.......রাধাশ্যাম বলছেন দেহতত্ত্ব না জানলে বাউল সাধন কখনও কোনওভাবেই সার্থক আকার নিতে পারে না
কেননা মানবদেহতেই মূলতত্ত্বের বাস
দেহকে ঘিরে থাকে উপলব্ধ-সত্তা
বাউল বলেন আত্মা
আত্মা তাঁদের কাছে ভগবান স্বরূপ
বাউল তো কল্পিত মূর্তির ভগবানে বিশ্বাস রাখেন না সাধারণত বাউলের ভগবান আত্মা
এই প্রাণস্পন্দ যুগল দেহসাধনা থেকে উঠে আসা স্পন্দ
'ভগবান' কথাটিই কিন্তু যথেষ্ট যুগল-দ্যোতক
'ভগ' কথার অর্থরূপ গর্ত
'বাণ' হল লিঙ্গ
বাউলও গুহ্যপ্রতীকে বাণকে লিঙ্গই বলেন
নতুন কোনো আলাদা অর্থের প্রতীকরূপ বাণকে তিনি দেখেন না
যা সচরাচর তারা করে থাকেন
তবে যেটা মনে হয় তাঁদের সব প্রতীককল্পেরই একটা সদর্থক ভাবনা থাকে
ভেবেচিন্তেই বাউল সমাজ প্রতীককল্পগুলোকে তৈরি করেছেন
এখানেও সদর্থক অর্থেই তাঁদের ভেতর ভাবনা কাজ করেছে
প্রতীককে তারা অনুভূতিদেশের আলো দিয়েছেন
দিয়েছেন রক্তশব্দ, সমুদ্রশব্দ সব
যার জন্য প্রতীক প্রাণবন্ত তরঙ্গ তুলছে বাউলেরই গানে
চন্দ্র তাঁদের এমনি এমনি কি বাঁ নাক আর সূর্য ডান নাক হয়ে উঠেছে? মোটেই না