content
stringlengths
0
129k
যেটা বলতে চাইছি তা হল: চৌষট্টির রূপক, প্রতীকী আবেগ-ইচ্ছা-অনুভূতি ব্যক্ত যে কুক্ষিগত আচরণ
তা অতি আবশ্যিক উপাচার
কখনও তা সুখদায়ক কামাচারের কখনও বা তা সাধিত অনুশাসনে আচ্ছন্ন দেহাচারের
আটটি ভাবের উল্লেখ আমরা পাই দেহসাধনায়-স্তম্ভ, স্বেদ, রোমাঞ্চ, স্বরভঙ্গ, বেপথু, বৈবর্ণ, মূৰ্ছা ও অশ্রু
অষ্টশক্তির কথাও বলে থাকেন সাধক
অণিমা, লঘিমা, ব্যাপ্তি, প্রকাম্য, মহিমা, ঈশিত্ব, বশিত্ব, কামবসায়িত
অষ্টপাশের কথাও বলে থাকেন সাধক বাউল-ঘৃণা, লজ্জা, শঙ্কা, ভয়, জিগীষা, জাতি, কুল, মান
এই অষ্টরূপকে কিন্তু আমরা কামশাস্ত্রেও দেখে থাকি
সেখানে ললাট, অলক, কপোল, নয়ন, বক্ষ, স্তন, ওষ্ঠ ও মুখের মধ্যে চুম্বনের উল্লেখ আছে
চৌষট্টিকলার একটি রূপ নখচ্ছেদ্য
তাকেও আবার আটটি স্থানে রাখা হয়েছে-বগল,স্তন, গলদেশ, পৃষ্ঠদেশ, জঘন, কটির একদেশ, কটির পুরোভাগ, নিতম্ব-এই আট স্থানে নায়কের নখক্ষত সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে
বাউল কিন্তু অষ্টম ইন্দু বা অষ্টম চন্দ্ৰস্পর্শের কথা বলে থাকেন
তাহলে এই আটের ব্যবহার দু'ধারায় আছে
সুখদায়ক কামাচারেও রয়েছে আটের বহুরূপী প্রতিফলন
আবার সাধনাচারের আট চেতনাসম্পৃক্ত এক অধ্যায়
এই চেতনা কামকে প্রেমে সমুজ্জ্বল ও ঋদ্ধ করে নিয়ে আত্মাকে সংগৃহীত পরমাত্মার সঙ্গেই মিলিয়ে দেওয়া
বাউল সাধনে এ যেন এক শৌর্য প্রদর্শন
তন্ত্র তথা সমস্ত যুগল দেহসাধনার সম্মিলিত চেতনা, আশা, উদ্বেগ, প্রেরণা, প্রতিজ্ঞা, প্রার্থনা-এগুলো সবই দাউ দাউ আদর্শের গহন শিখা
শিবশঙ্কর গানে 'ত্রিবেণী সংহতি'কে তিন রতির উর্ধ্বাঙ্গই দিয়েছেন
তিন রতি, তিন নদীরূপী স্রোতধারা, বাউল প্রতীকের 'রূপ সায়রের তিনধারা'
প্রথম দিনের মিলনে বাউল বলেন গুণের মানুষ উঠে আসবে
এই গুণ তমগুণ
দ্বিতীয় দিনে রসের মানুষ
তৃতীয় দিনে সহজ মানুষ
বাউল বলেছেন: 'যখন নদী হয় উথলা তিনজন মেয়ের লীলাখেলা
' কীভাবে হয় এই লীলাখেলা?
চৈতন্যচরিতামৃতে বাউলের তিন রতিকে তিন বাঞ্ছা হিসাবে দেখা হয়েছে
বলা হয়েছে: 'তিন বাঞ্ছ পুণ্য করি রস আস্বাদন
/ আলিঙ্গনে ভাব পুণ্য কান্তিতে চুম্বন
/ সিঙ্গারে প্রেমরস বাঞ্ছিতপূরণ
/ পিরিতি আনন্দময় চিন্ময় কেবল
/ সেইভাবে বস হইয়া করে সম্বল
/ নিজরূপে স্বয়ং রূপে এক রূপ হয়
/ এক দেহ সে জানিহ নিশ্চয়/ নিজরূপে সঅং রূপ এক দেহ হয়
গোলোক বৃন্দাবন বলি অতএব কয়
' বাউলের এই লীলাখেলাতে প্রথম চারচন্দ্র ভেদ করতে হয়
সঙ্গিনীর রজ গুরু যোগাড় করে রাখেন
তা সাধক বাউলকে পান করতে হয়
কেউ বলেন সঙ্গিনী নিজে তা পান করেন
আবার কেউ বলেন না, সঙ্গিনীর কাজ তা নয়
পান করে থাকেন কেবল সাধক বাউল, যথেষ্ট মতভেদ আছে এই ক্রিয়াকরণে
এই পান ক্রিয়াকে তাঁরা বলেন গ্রহণ
অর্থাৎ শরীরের জিনিস শরীরেতে ফিরিয়ে নেওয়া
এটাই তাঁদের ভেদ
চার চন্দ্রের একচন্দ্র ভেদ
তারপর মূত্র যতবার হবে তা নারকেল মালা বা পাত্রে ধরে আবার শরীরে ফিরিয়ে আনা
মল হাতের তালুতে ফেটে খাওয়া আর বাকিটা শরীরে মাখা
এই চারচন্দ্র ভেদকে বাউল ব্রহ্মচর্যদশা বলেন
এরপরই মিলন দশা আসে
তবে ব্রহ্মচর্যে কতদিন পর রসরতির মিলন হবে তা নিয়েও যথেষ্ট মত পার্থক্য আছে
কেউ এক মাস, ছ মাস, দশ বা বারো মাসের কালক্ষেপের কথা বলেন
তবে সেই অপেক্ষা-যোগ এখন এতখানি সময় পর্যন্ত মানা হয় কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে
কেননা বাউলকে তো এখন তাড়াতাড়ি সিদ্ধ স্তরে পৌঁছতে হবে
তবে না তাঁর পসার জমবে
ভক্তশিষ্য তৈরি হবে
খ্যাতি রটবে
যেটা মনে হয় চারচন্দ্র ভেদ একটা নিমিত্তকরণ
আসলে যে করণকার্য তা তো নাড়ির
ইড়া নাড়ির, পিঙ্গলা নাড়ির, সুষুম্না নাড়ির
শরীরের বাইরের বায়ুকে প্রথমে বাঁ নাক দিয়ে টেনে কিছুক্ষণ সেই বায়ু বাঁ নাকে রেখে তাকে আবার ডান নাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়
বায়ু যখন টেনে অভ্যন্তর পূরণ করা হয় তখন তা পূরক
এতে উদর জলপূর্ণ কলসির মতো বায়ু জমা থাকে তাই তা কুম্ভক আর যখন তা ডান নাক দিয়ে বের করে দেওয়া হয় তখন তা রেচক
এই যোগশিক্ষাই বাউল সাধককে ক্রিয়াকরণে আসলে সাহায্য করে
মিলনে এর সাহায্যেই বাউল মূলাধারের শুক্রকে ব্রহ্মরন্ধ্রে উঠিয়ে নিতে পারেন
তাই চারচন্দ্র ভেদ না হয় হল কিন্তু শ্বাসক্রিয়া ঠিকঠাক না হলে শুধু চারচন্দ্র ভেদ, ব্রহ্মচর্যের দীক্ষার কি মূল্য আছে? আসল হল শরীর গঠন
তা ভেদে হয় ঠিক কিন্তু সেই ভেদ বায়ুভেদ বায়ুকেই বশ করেন সাধক
তবে বাউল 'দমের কাজ' করার কথা সব সময়ই বলেন
শিবশঙ্কর আমাকে বলেছিলেন, দম হল দমন রিপুকে, রতিকে দমন
.....দেহ মিলনের সময় মদন, মাদন, শোষণ, স্তম্ভন, সম্মোহন-এই পঞ্চবাণের ক্রিয়ার কথা বলে থাকেন বাউল সাধক
লালনের গানে আমরা পাই - 'পঞ্চবাণের ছিলা কেটে/ প্রেম যজ স্বরূপের হাটে
সিরাজসাঁই বলে রে, লালন, / বৈদিক বাণে করিস নে রণ, / বাণ হারায়ে পড়বি তখন রণ-খোলাতে হুবড়ি খেয়ে
'বৈদিক বাণ' কী? দেহমিলনের সময় কামই কামের একান্ত পরিনাম
কামকে উপভোগ্য স্তরে নিয়ে যাবার জন্যই নরনারী নানা প্রত্যঙ্গে নানারূপ ক্রিয়াকরণে মেতে ওঠেন
কেননা কামকে তাঁরা চুড়ান্ত রূপে ভোগ করতে চান
তার জন্যই কামশাস্ত্রে যৌনমিলনের প্রস্তুতিস্বরূপ নানা আলিঙ্গন, চুম্বন, দেহে নখচিহ্নের স্মরণীক অধ্যায়, দন্তক্ষতের রূপকল্প, ভঙ্গি বা আসন, শীৎকার ধ্বনির নানা রূপের কৌশলক্রিয়ার কথা লেখা হয়েছে
যাতে কাম, সম্ভোগক্রিয়া একেবারে উত্তেজক অধ্যায়ে চলে আসে
নরনারী তৃপ্তি লাভ করেন
বাস্তবিক এই তৃপ্তি
রিপুর উত্তেজনা থেকেই এই আকর্ষণ, মিলন
যে মিলনে তৃপ্তির সাথে সন্তান জন্মেরো এক বিধিবদ্ধ অধ্যায় আছে
তাই বলা ভালো, এই কাম-প্রবর্তিত দেহ-মিলন এবং এতে সন্তান সৃষ্টিই হল বৈদিক বাণ
লালনের গানে এই বাণকৌশলের ইঙ্গিত রয়েছে
বাউল বলেন, বিশ্বাস রাখেন যে, এই পঞ্চবাণের যে ক্রিয়া তাতে রয়েছে কেবল চূড়ান্ত সম্ভোগক্রিয়ায় কামকে উপভোগ
এই কাম ভোগমূলক
লালনের পদে, গুরু সিরাজ সাঁই তাই লালনকে বলছেনেই পঞ্চবাণের ছিলা কেটে ফেলতে হবে
দেহকে কামক্রিয়ার ভেতর না রেখে দেহকে ব্যবহার করতে হবে স্বরূপতত্ত্বকে জানার জন্য
তার জন্যই বাউল সাধক দেহ থেকে কামকে তুলে ফেলে প্রেমে রূপান্তরিত করে ফেলেন
ঠিক যেমন দুধ থেকে সর তুলে মাখন বা ঘি বানানো হয়
কীভাবে বাউল সাধক এই পঞ্চবাণের ছিলা কেটে ফেলেন?
পঞ্চবাণের প্রথম যেটি মদন, বাউল বলেন সেটি কামরতির প্রথম সিঁড়ি
এই সিঁড়ি তিনি টপকে যান কীভাবে? অমাবস্যায় প্রথম মিলনে সঙ্গিনীর দেহের স্পর্শকাতর প্রত্যঙ্গগুলোকে তিনি স্পর্শ করে সঙ্গিনীর শরীরে কামের বাণকে আরো যেন শানিয়ে দেন
উত্তেজনা বৃদ্ধি করে দেন সঙ্গিনীর শরীরে
এই স্পর্শ করনখে, পদনখে, গলায়, অধরে, জিহ্বায়, ললাটে বাউল বলেন সাড়ে চব্বিশ চন্দ্ৰস্পর্শর কথা
করনখে দশ, পদনখে দশ, দুই গলায় দুই, অধরে এক, জিহ্বার এক, ললাটে দেড়
মূলত দৃষ্টিস্পর্শর কথা তাঁরা বলে থাকেন
কীভাবে হয়ে থাকে এই চক্ষুস্পর্শ
আমাদের শরীরস্থ সুষুম্না নাড়ি মূলাধার চক্র থেকে উৎপন্ন হয়ে নাভিমণ্ডলের যে ডিম্বাকৃতি নাড়িচক্র আছে, তার ঠিক মাঝখান দিয়ে উঠে গিয়ে সহস্রার চক্রের ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত চলে গিয়েছে
সুষুম্না নাড়ির বাঁ দিকে রয়েছে ইড়া নাড়ি
দক্ষিণ বা ডানদিকে রয়েছে পিঙ্গলা নাড়ি
এই দুই নাড়ি দু'দিক থেকে উঠে স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত ও বিশুদ্ধ চক্রকে ধনুকাকারে বেষ্টন করে আছে