content
stringlengths
0
129k
আসলে এই বিশেষণ, সম্বোধন, মান্যতা, যথাযোগ্য প্রাপ্য স্বীকৃতি সব ছিল এখনকার কারও রচনা নয়
বেশির ভাগটাই সাধক পদকর্তাদের
.....শাস্ত্রে বলছে-'ন তপস্তপ ইত্যাহুর্ব্রহ্মচর্য্যঃ তপোত্তমম্
/ উৰ্দ্ধরেতা ভবেদ্‌ যস্তু স দেবো ন তু মানুসঃ
' ব্রহ্মচর্য অর্থাৎ বীর্যধারণই সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট তপস্যা
যে ব্যক্তি এই তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে উৰ্দ্ধরেতা হয়েছেন, তিনিই মানুষ নামের প্রকৃত দেবতা
বাউল যাকে 'বিন্দুধারণ' বলেছেন
যোগও তাই বলছে-'যোগিনস্তস্য সিদ্ধিঃ স্যাৎ সততং বিন্দুধারণাৎ
সব সময় বিন্দুধারণ করলে যোগীগনের সিদ্ধিলাভ হয়
বীর্য সঞ্চিত হলে মস্তিষ্কে প্রবল শক্তি সঞ্চিত হয়-এই মহতী শক্তির বলে একাগ্রতা সাধন সম্ভবপর হয়
সন্ন্যাসীর মূলমন্ত্র আসক্তিমোচন
তাই নারী আসক্তি তার থাকবে না একেবারে
দেহসাধনা একক ক্রিয়াকরণের
লোকায়ত দেহসাধনার মতো কখনও যুগলের নয়
লোকায়ত সাধকরা সম্ভোগ সুখ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না কিন্তু কখনও
শুধু 'বিন্দুধারণ' পদ্ধতিটিকে রপ্ত করেছেন
নারী আসক্তি তাঁদের রয়েছেই
যুগল সাধনার সৃষ্টিকল্পে আমাদের তাই মনে হয় বেশ বুঝেশুনে পরিকল্পিতরূপে এই ক্রিয়াকরণকে ভাবা হয়েছে
তবে এর পেছনে কারণ আছে
চর্যাপদের সময়কেই যদি আমরা মান্য দেহসাধনার নিদর্শন রূপে সামনে এনে দেখি, তবে দেখব সিদ্ধাচার্যরা সবাই কিন্তু গৃহী
বাউলরাও গৃহী
তাঁদের গৃহ হয়তো আখড়া অভিধার
তান্ত্রিকদের বরং সেই অর্থে গৃহ নেই
তবে এদেরও তো এখন ডেরা আছে
বাউল দেহসাধনা আখড়ায় সম্পন্ন হয়
তান্ত্রিক শরীরসাধনা
অমাবস্যাতে হয়
শ্মশানে ভৈরবীচক্র বসে
সন্ন্যাসীরা যুগলতত্ত্বের ধারেপাশে যান না
ত্যাগই তাঁদের প্রধান কর্ম
তাঁদের মতে ত্যাগের সাধনা না করলে ব্ৰহ্মচিন্তা নিস্ফল
কামিনী কাঞ্চন তাই সেখানে একেবারে নিষেধ
বিন্দুধারণ' সেখানে কেবল বীর্যকে শুক্রকে উধ্বগমনে নিয়ে গিয়ে অতল আনন্দ লাভ করা
....খ্যাপার এই গানের প্রথম শব্দ দুটোর প্রতীকী রহস্য ভেদ করে নিয়েছি আমরা
তা নারীর যোনিতে কীভাবে ফুটছে এই তিনরঙা ফুল? অনেক বাউলকে নারীর যোনিকে 'গুপ্ত বৃন্দাবন'ও বলতে শুনেছি
বৃন্দাবনে যেমন রাধার রসধারা ঝরে, তেমনি নারীর যোনিতে রজঃপ্রবাহ ঘটে
-তিন দিনের এই স্রোতধারা গো
তিন দিনে তিন রঙ ধরে
লাল হয় প্রথম দিন, দ্বিতীয়তে নীল, তৃতীয় দিনে সাদা রঙ তার
অনেকে আবার চার রঙের কথাও বলেন
তিনদিন হল রজঃপ্রবাহের সূচনা দিন থেকে নিবৃত্তির দিন
প্রতিমাসেই এদিন, তিনদিন ঘুরে ফিরে আসে
এজন্য প্রচলিত এক কথাও আছে 'মাসিক'
এ নিয়ে কমল দাসের একখানা গানও আছে-'মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী/ মাসে মাসে জোয়ার আসে ত্রিবেণী সংহতি
/ যখন নদী হয় উথলা তিনজন মেয়ের লীলাখেলা/ একজন কালা একজন ধলা একজনা লালমতী
দেহসাধক নারীর রজঃপ্রবাহের তিন দিনের 'মহাযোগ' এ শরীর যুগলের মিলনকে মনে করে থাকেন রাধাকৃষ্ণের যুগলতত্ত্ব
ত্রিগুণময়ী রাধা সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যার বিবৃতি আমরা 'কথামৃত'তে পাই ৩০শে অক্টোবর ১৮৮৫ তারিখে শ্যামপুকুর বাটির কথোপকথনে-'বৈষ্ণবশাস্ত্রে আছে কামরাধা, প্রেমরাধা, নিত্যরাধা
কামরাধা চন্দ্রাবলী
প্রেমরাধা বৃন্দাবনে লীলা করেছিলেন
নিত্যরাধা নন্দঘোষ দেখেছিলেন গোপাল কোলে
... নিত্যরাধার স্বরূপ-যেখানে নেতি নেতি বিচার বন্ধ হয়ে যায়
নিত্য রাধাকৃষ্ণ, আর লীলা রাধাকৃষ্ণ
যেমন সূর্য আর রশ্মি
নিত্য সূর্যের স্বরূপ, লীলা রশ্মির স্বরূপ
ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব যেটা বলতে চেয়েছেন তা হল শ্রীরাধাতত্ত্ব তিনটি স্তরের
চন্দ্রাবলী হলেন আমাদের কামনা-বাসনা, মান-অভিমানের প্রতীকী রূপ
কামধারা তাঁরই প্রতিদ্বন্দ্বী
চন্দ্রাবলীকে কৃষ্ণের সখি না ধরে জ্যোৎস্নারূপও ধরে নিতে পারি
এই রূপ তেজস্ক্রিয়াকে পরিহার করছে
সূর্যের আলোর পরক্ষতা রয়েছে চাঁদের মধ্যে
চাঁদ সূর্যের আলোতে আলোকিত হয়েও কমনীয়তা বজায় রেখেছে
চাঁদ বাঁ চন্দ্রাবলী তাই প্রেমসংগ্রামের রূপ
সূর্যকে এখানে কাম হিসাবে ধরছি
কাম প্রেমে রূপান্তরিত হচ্ছে যেন
প্রেমরাধা কী? প্রেমরাধা হল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক
যার কোনো চাওয়া নেই, পাওয়া নেই, কেবল সমর্পণ আছে
চৈতন্য তো সেই ভাবরসেই কৃষ্ণের উপাসনা করেছিলেন
.....খ্যাপার গানে রয়েছে 'এক বঁকে তিন ফুল ফুটেছে, লাল, নীল, পীত জরদ সাদা / এক ফুলে সুরসিক বসে, আর এক ফুলে রয় রাধা
' ফুল যে রজঃস্রাব তা এতক্ষণে আমরা বুঝে গেছি
'এক ফুলে সুরসিক বসে আছেন-সাধক মিলনে ব্যাপৃত আছেন
আর এক ফুলে রাধা' আছেন-পরমা প্রকৃতি, সঙ্গিনী, রাধাস্বরূপিনী সেই নারী দেহ, যে দেহের রূপ-উপমায় সাধক বলছেন-'আর মরি কি ফুলের লীলা'
এই লীলারূপে অংশ নিচ্ছেন তো স্বয়ং সাধক
যার জন্যই 'ফুলের মাঝে নন্দলালা'
যিনি 'ভাঁড় ভেঙে ননী' খাচ্ছেন আর বাঁশি বাজিয়ে বলছেন-'রাধা রাধা' বাঁশি হল গিয়ে নারী দেহ
'ভাঁড়' ভাঙা হল যোনির ভেতর প্রবেশ
সাধনলিঙ্গ যোনির মধ্যে অবস্থান করছে
'ভাঁড় ভেঙে ননী' খাচ্ছেন
ননী' হল কামকে প্রেমরূপে আস্বাদন করে নেওয়া
রাধা এখানে রামকৃষ্ণদেবের সেই 'কামরাধা' থেকে 'প্রেমরাধা'তে পরিণত হচ্ছেন
খ্যাপা বলছেন-'সে ফুল আছে থির পবনে, রসিকে তার সন্ধান জানে, / বায়ু বরুণ নাই যেখানে, ফুলেই খায় ফলের মাথা
.....এ কোন কারিকর,গড়লে এ ঘর, একটা রূপের নিশান
নয় দরজা ষোলতালা, দ্বাদশে বাতি ঘোষণা
সপ্ত তালায়, সপ্ত সিন্ধু, ষড়দলে দীনবন্ধু,
শতদলে প্রাণগোবিন্দ, দ্বিদলে রূপ সাধনা
এক ধারায় নয় তিন ধারানন, তিনগুণে তার তিন সাধনা,
ওই নব রসে রসিক বসে, স্বরূপ নিয়ে করে রূপ ঘোষণা
আর কেউ বা শুনে, কেউ বা দেখে, কেউ করে ভাই প্রবঞ্চনা
কেউ দেখে শুনে চুপটি করে, করে নিত্যলীলার রটনা
জরা মৃত্যুর নয় সে অধীন, প্রতি নব নব জানা,
কৈশরা কিশোরী রূপে, ক্ষ্যাপা করেরে রূপের সাধনা
কানাই বাউল কথকতার ঢঙ্গে এ গানের ব্যাখ্যা করছিলেন সে আসরে
সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে নিজস্ব চিন্তাধারাকে মিলিয়ে এ গানকে বুঝবার চেষ্টা করব আমরা
ঘর এখানে দেহভাণ্ড
বাউল বলেছিলেন, দেহবাড়ি, নারীদেহবাড়ি
আমরা বলব প্রবোধের বেড়া
যা ভাঙতে চাইছেন সাধক
ঘরের নয় দরজা হল শরীরে নয়টি প্রত্যঙ্গ
বাউল সাধক একে 'নবদ্বার'ও বলে থাকেন
এই প্রত্যঙ্গগুলো হল দুই কান, দুই চোখ, দুই নাক, মুখবিবর, পায়ু ও উপস্থ
উপস্থ বললে সঠিক পরিষ্কার হল না