content
stringlengths
0
129k
তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর ফেলে যাওয়া স্মৃতিগুলো এভাবেই কষ্ট দেয় রুম্পাকে
একসময় নানার আবদারে, অনুরোধে কতকিছুই এই ক্যানভাসে আঁকত রুম্পা
বিশেষ করে মন খারাপ থাকলে এটা ওষুধের মত কাজ করত
কিন্তু আজ সেই স্মৃতি রোমন্থন করে রুম্পা যেন ততটাই কষ্ট পাচ্ছে
-এই এই দুষ্ট মেয়ে...খেয়ে নে বলছি
এত দৌড়াদৌড়ি করিস না বাবা
এই যে থাম
এই মেয়েটা আমাকে পাগল করে দিবে
-(হাসতে হাসতে) নানাভাই দৌড়াতে পারে না
-এই এই, আমার সাথে মজা করা হচ্ছে! হুম? এত দুষ্টুমি করলে কিন্তু ঐ রাজপুত্র টগবগ ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসে তোকে নিয়ে যাবে
এইতো আমি এখনই ফোন করছি
(ফ্লোরে পা দিয়ে আঘাত করে) আমি কোথাও যাব না
আমি তোমার কাছেই থাকব
-আমার কাছে থাকতে হলে কিন্তু লক্ষ্মী মেয়ের মত খেতে হবে
রুম্পার বয়স যখন দুই কি তিন এভাবেই রুম্পার নানা সারা ঘর রুম্পার পিছুপিছু ছুটতেন খাবারের প্লেট নিয়ে
টগবগ ঘোড়া আর রাজপুত্রের কথা বললেই রুম্পা ঠাণ্ডা হয়ে যেত
যদিও বড় হওয়ার পর এ নিয়ে রুম্পা মনে মনে অনেক হাসত
'কেউ যদি আমার মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পারত...নানাভাইয়ের মত যে আর কেউ নয়...'- ভাবতে ভাবতে আবারও বারান্দায় আসে রুম্পা
উদাস মনে রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে থাকে
প্রতিদিন বিকালে নানাকে নিয়ে সংসদ ভবনের ওদিকটাতে হাঁটতে যেত রুম্পা
একদিন এক ঘটনা ঘটল
এর পর থেকে নানাভাই ওকে প্রায়ই খেপাত 'বোকি রুম্পা' বলে
তখন রুম্পার বয়স সবেমাত্র চার পেরিয়েছে
শরীফ সাহেব বাদাম কিনছেন আর রুম্পা তাঁর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে
-নানাভাই দেখ, বেলুন
-কোথায় বেলুন?
-ঐ যে বেলুন...সাদা বেলুন, গোলাপি বেলুন
-আহা! ওগুলো তো বেলুন না
ওগুলো তো হাওয়াই মিঠাই
একি? আমার নানুভাই দেখি হাওয়াই মিঠাই চিনে না
-এগুলো কেমন খেতে?
চকলেটের মত
এই ভাই, এদিকে আসেন তো
আমার রুম্পামনিকে হাওয়াই মিঠাই দেন
(মিঠাই রুম্পার হাতে দেয়ার পর) বলতো কেমন খেতে?
আমার ক্যাটবুরি এর চেয়ে অনেক মজা
(রুম্পা কে ক্যাটবুরি বলত)
-কি বলে বোকা মেয়েটা? আজ থেকে তোর নাম হয়ে গেল 'বোকি রুম্পা'
-নানাভাই, না...
আজ এসব কথা মনে করে রুম্পার নিজের উপরই খুব ঈর্ষা ও ক্ষোভ হচ্ছে
এমনি সুন্দর কিছু মুহূর্ত তার শৈশব জুড়ে ছিল
এখন তাই যেন তার নিদারুণ যন্ত্রণার কারণ হচ্ছে
রুম্পা আর নিজেকে সামলাতে পারছে
মাথা ভারি হয়ে আসছে
এদিকে আকাশ জুড়ে কেবল মেঘ আর মেঘ
'সন্ধ্যাতারা কি আজও দেখতে পারব না?'- অস্থির হয়ে উঠে রুম্পা
আবারও অতীতে হারিয়ে যায় সে
-নানাভাই, দেখ কি এঁকেছি
-বাহ! এ তো দেখি বেলুন
-না! এগুলো হাওয়াই মিঠাই
-ও! বোকি রুম্পা দেখি হাওয়াই মিঠাই চিনে
-(বিরক্ত হয়ে)আহ! নানাভাই
তুমি এমন কর কেন আমার সাথে? (কিছুক্ষণ নীরবতা) নানাভাই, কি হয়েছে তোমার? আকাশে কি দেখ?
-দেখি নারে নানুভাই
-আ আ...আমি এখন অনেক বড়
আমি স্কুলে যাই
বাক্য লিখতে পারি, পড়তেও পারি
-ইশ! আমার নানুভাই যে পাকাবুড়ি হয়ে গেছে
আরেহ! ঐ যে সাদা চুলও দেখি বেরিয়েছে...
-আ আ আ...নানাভাই তুমি শুধু দুষ্টুমি কর! বলনা কি খুঁজ?
-আচ্ছা বলছি
আমি সন্ধ্যাতারা খুঁজি
-এটা আবার কি?
-এটা একটা তারা
সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশের এক কোণে দেখা যায়
যখন কাউকে মনে পড়ে তখন আমি ওটাকে খুঁজি
-কাকে মনে পড়ে?
-এই যেমন ধর...আমি যখন মরে যাব তখন তুই আমাকে মনে করবি, সেরকম একটা ব্যাপার
-ধুর, নানাভাই! কি বল? তুমি মরবে কেন? (জড়িয়ে ধরে) আমি তোমার কাছেই থাকব সবসময়
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রুম্পা ঘরের ভেতর আসে
মেঘলা আকাশ, মেঘলা মন
ঘড়ির টিকটিক শব্দও অসহ্য লাগছে
বিছানায় শুয়ে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকে রুম্পা
চোখের পাতা একবার খুলছে, একবার বন্ধ হচ্ছে, একবার খুলছে, একবার বন্ধ হচ্ছে
উপরের সিলিংটা ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসছে
দৃষ্টির সীমানায় কেমন যেন মেঘ জমা হচ্ছে
হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দ
শব্দের আকস্মিকতায় কর্নিয়া প্রসারিত হল
চারদিকে নিকষ কাল অন্ধকার
লোডশেডিং?! উঠে দাঁড়াল রুম্পা
ফ্লোরের উপর হারিকেন পড়ে আছে
'হারিকেন আসল কোথা থেকে? এটা জ্বালালোই বা কে?'-ভাবতে ভাবতে রুম্পা হারিকেনটা তুলে নেয়
নিজের রুমটাও ঠিকমত চিনতে পারছে না রুম্পা
এ কি? এটা যে রুম্পার রুম নয়
একটা শূন্য, ফাঁকা হলরুম
কেন জানি রুম্পার ভয় করছে না, কিন্তু অদ্ভুত লাগছে
-রুম্পা...রুম্পামনি...এই যে আমি এদিকে
-কে? নানাভাই?
-এই যে এদিকে...
হারিকেনের আলোতে নানাভাইকে চিনতে রুম্পার এতটুকুও দেরি হল না
-নানাভাই তুমি? তুমি তো...
-আমি তো কি?
-না মানে...বুঝতে পারছি না
-না না, কাছে আছিস না
-আলোতে বড্ড কষ্ট হয়
-ওহ! আচ্ছা, তাহলে আলো কমিয়ে দেই
-না সেটার দরকার নেই
কেবল কাছে না আসলেই হল
-এমন করছ কেন নানাভাই?
-আলোতে আমাকে দেখলে কষ্ট পাবি, তাই কাছে আসতে বারণ করছি