content
stringlengths
0
129k
দশ হাজার শব্দ মত লিখেও ছিলাম
কিন্তু লেখা খুব একটা আগাচ্ছিল না
এর মধ্যে নহলী প্রকাশনীতে একটা প্রতিযোগিতায় টিকে পান্ডুলিপি জমা দেয়ার সুযোগ পেলাম
মানসম্মত হলে বই করবে প্রকাশনীর খরচে
তবে জমা দিতে হবে তিন মাসের মধ্যে
তখনও আমি "আঙ্গারীঘাট" লেখা শুরু করিনি
অনেকের সাথে পরামর্শ করি
যারা আমার থ্রিলারের লেখাটুকু পড়েছিলেন তাঁরা বললেন, ওটা শেষ করেন, ভালো হচ্ছে
কিন্তু আমার মন টানছিল না
মোটামুটি রিস্ক নিয়ে "আঙ্গারীঘাট" লেখা শুরু করলাম
সারাদিন সময় পাই না
সব কাজ সেরে রাতে বাচ্চা ঘুমালে লেখা শুরু করতাম
তিনমাসের জায়গায় চার মাস লেগেছিল কাজটা শেষ করতে
তারপর পান্ডুলিপি জমা দিলাম
জমা দেয়ার মাস দুয়েক পর বই হয়ে এসেছে
বেটা রিডিংয়ের মত রষকষহীন ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে
নহলীর অফিসে যেতে হয়েছে দুইবার
পুরো পরিবার নিয়ে গিয়ে কাজ করেছি ওখানে
এর মধ্যেও এই বইয়ের অসংখ্য প্রচ্ছদ করানো হয়েছে
এমনকি স্বনামধন্য প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষের করা প্রচ্ছদও বাতিল হয়েছে
মন খারাপ হয়েছে
তবে শেষ পর্যন্ত আঙ্গারীঘাট আমার প্রথম উপন্যাস হিসেবে বইয়ের রুপ পেয়েছে
প্রিঅর্ডারেই প্রায় একশ মত অর্ডার এসেছিল
নবীন লেখক হিসেবে তা আমাকে আপ্লুত করেছে
স্বপ্নকে বাস্তবে রুপান্তরিত করার উপলব্ধি দিয়েছে
সত্যি বলতে এই আঙ্গারীঘাট আমার আশার চেয়েও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে
আমাকে পাঠক বিভিন্নভাবে তাঁদের মুগ্ধতার কথা জানিয়েছে
লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলো?
আমি খুব ছোটবেলা থেকেই খুব গল্পপাগল মানুষ
আমার গল্পের ক্ষুধা না মেটাতে পেরে মা আমাকে মোটামুটি চার বছর বয়সে বাংলা পড়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন
তারপর গল্পের বই ধরিয়ে দিলেন
এই বিভিন্ন ধরণের বই পড়তে পড়তেই আমার লেখার আগ্রহ তৈরি হলো
মনে হলো এই যে আমার চারপাশে এত রকমের মানুষ
একেকটা মানুষের একেকরকম গল্প
এদের কথা তো আমি লিখতে পারি
এদের গল্প গুলো যদি আমি লিখি তাহলে মানুষ এদের সম্পর্কে জানতে আমার লেখা পড়বে
আমাকে লেখক হিসেবে সম্মান করবে, ভালোবাসবে! লেখক মানেই আমার কাছে ছিল প্রচণ্ড সম্মানীয় মানুষ
যিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখেন
বইয়ের পাতায় আস্তো একটা পৃথিবী গড়েন, যেখানকার পাত্র-পাত্রী সবাই লেখকের কলমের আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে
লেখক হয়ে ওঠেন সেই পৃথিবীর ইশ্বর
আমার এমন পৃথিবীর ইশ্বর হতে ইচ্ছা করতো
সেখান থেকেই মূলত লেখালেখি করার ইচ্ছা আমার
আমি খুব ছোট বেলায় কবিতা লিখতাম
বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতাম
মাঝেমধ্যে ছাপাও হতো
যদিও সেগুলো ছেলেমানুষী ভরা লেখা
কলেজে ভর্তি হবার পর পড়াশোনার প্রচুর চাপ পড়ে গেল
তার মধ্যেও লিখতাম
আমি সাইন্সে ছিলাম
কিন্তু বাংলা, ইংরেজি ক্লাস সব গ্রুপের ছেলেমেয়েদের একসাথে হতো
বাংলা ক্লাসে একদিন রফিকুর রশীদ রিজভী স্যার জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা পড়েছো?"
আমি উঠে দাঁড়ালাম
বঙ্কিমচন্দ্রের কি কি লেখা পড়েছি জানতে চাইলেন
বলার পর উনি খুবই আশ্চর্য হয়ে আমার পরীক্ষা নেবার মত করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিভিন্ন উপন্যাস সম্পর্কে জানতে চাইলেন
মিনিট দশেক প্রশ্ন-উত্তর চলার পর উনি বললেন," তুমি সাইন্স পড়ছো কেন? তোমার আত্মা ডুবে আছে সাহিত্যে
বাংলা পড়ো, খুব ভালো কিছু করতে পারবে
আমাদের গাংনী ডিগ্রী কলেজের ছেলেরা কবিদের নিয়ে একটা সংগঠন করেছিল
তাতে সভাপতি ছিলেন রফিকুর রশীদ রিজভী স্যার
উনি খুব ভালো লিখেন
অনেক প্রকাশিত বই উনার
ভারিক্কি ধরনের লেখা লিখেন
স্যার সেই সংগঠনে আমাকে ডেকে নিলেন
লেখা পাঠ শেষে বলতেন,"এই মেয়েকে চিনে রাখো
একদিন খুব নাম করবে এই মেয়ে
ষোল,-সতেরো বছরের আমি আমার মধ্যে অন্যরকম একজনকে যেন দেখতাম
মনে হতো আমাকে লেখক হতেই হবে!
ক্লাসের পড়ার চেয়ে সাহিত্য আমার আরও প্রিয় হয়ে গেল
ফলাফল এইচএসসি ফাইনালে গিয়ে পেলাম
ভয়াবহ বিপর্যয়
মন ভেঙ্গে গেল
সব বাদ দিয়ে ক্লাসের পড়াশোনায় মনোযোগী হলাম
বই পড়া হয়, পড়ার নেশা আমার যায় না কিন্তু লেখাটা যেন আর হয় না
মোটামুটি এরপর দশবছর আমি কিছু লিখিনি
এর মধ্যে লেখাপড়া শেষ করেছি এবং নিজেকে তৈরি করেছি
অতঃপর লেখালেখি শুরু করেছি
কতটুকু লেখা হয় জানি না
তবে চেষ্টা করছি, প্রতিনিয়ত শিখছি
তবে লেখার ইচ্ছাটা আবার পুরো মাত্রায় ফিরে এসেছে
লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই
বর্তমানে আমার লেখালেখির প্রায় পুরোটাই অনলাইনভিত্তিক
মানে লেখা, প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ, ওদের পান্ডুলিপি পাঠানো সবকিছুই অনলাইনে হয়
একমাত্র বইমেলা ছাড়া কোনো পাঠকের সাথে আমার সরাসরি যোগাযোগ হয় না
ইনবক্সে কমেন্টে তো অনেকেই অনেক কিছু লিখে চমকে দেন
তাঁদের ভালো লাগার কথা বলেন
সেগুলো ভালো লাগে
তবে আমার গ্রামের একটা মজার ঘটনা বলি
আঙ্গারীঘাট বের হবার পর আমাদের এলাকার স্কুল মানে যে হাইস্কুলে লেখাপড়া করেছি সেখানকার বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীরা আঙ্গারীঘাট ত্রিশ কপি কিনে নিয়েছিল
স্কুলে একটা অনুষ্ঠান ছিল
বিশিষ্ট মেহমানদের উপহার দেয়া হয়েছিল সেই বই
তাদের মধ্যে একজন বইটা পড়েছেন
স্থানীয় বিশিষ্ট প্রভাবশালী নেতা
আমরা ছোটবেলা থেকেই উনাদের খুব বড় মাপের মানুষ হিসাবেই চিনতাম
বইটা পড়ে তারপর লেখক পরিচিতিতে গিয়ে দেখেন আমি তাদের এলাকার মেয়ে
আমার আব্বা-মাকে খুব ভালোভাবে চেনেন
উনার এত ভালো লেগেছে যে সেদিনই আমার আব্বার দোকানে গিয়ে দেখা করেছেন
আমার খুব প্রশংসা করেছেন
আব্বার কাছ থেকে ফোন দিয়ে আমার সাথে কথা বলেছেন
সত্যি বলতে বিষয়টা আমার খুব ভালো লেগেছে
এটুকু তো আমার লেখালেখির জন্যই হয়েছে
আর একটা মজার কথা বলি আঙ্গারীঘাট লেখার পর এই নদীটা নিয়ে কেউ কোনো কথা আমার সাথে বলতে গেলেই বলেন," তোমার আঙ্গারীঘাট "