content
stringlengths
0
129k
বেডরুমে ঢুকে ভ্যানিটি ব্যাগটা নিলেন
কিছু টাকা-পয়সা, টুকিটাকি, টুথব্রাশ, চিরুণী নিলেন
দু'তিনটে শাড়ি-কাপড়
ব্যাগ নিয়ে বাইরে যাবার সময় কাজের মেয়েকে বললেন, "দরজা বন্ধ করে দে
সাহেব ছাড়া আর কেউ এলে দরজা খুলবি না
আর সাহেব আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বলবি- চলে গেছি"
"কোথায় যাচ্ছেন?" - ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো কাজের মেয়ে
আর কথা বা বাড়িয়ে বেরিয়ে এলেন
একটা রিক্সা নিলেন
এবার মনে হলো কোথায় যাবেন? মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন
এই ঢাকা শহরেই থাকে তারা
কিন্তু সেখানে গেলে মেয়েকে ছোট করা হবে
"তোমাকে আমি উচিত শিক্ষা দেব সামাদ চৌধুরি"
দাঁত কিড়মিড় করলেন রাফেয়া
"বুড়ো ভাম
তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, আর এখন তুমি আমাকে বলো চলে যেতে!"
কিন্তু যাবেন কোথায়? বাবার বাড়িতে অনেকদিন যান না
ভাই-বোনেরা যার যার সংসারে
ঈদে-চাঁদে সবাই আসে, দেখা করে
ওদের কাছে তো হুট করে যাওয়া যায় না
"খোকার কাছেই যাবো"
মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন
পরমুহূর্তে ভয় করে উঠলো- একাকী সেই চট্টগ্রাম কীভাবে যাবেন? একা তো যান নি কখনো
"কই যাইবেন?"
রিক্সায় উঠে রিক্সাওয়ালাকে বলা হয়নি কোথায় যাবেন
"স্টেশনে চলো
কমলাপুর স্টেশন"
স্টেশনে এসেই শুনতে পেলেন ঘোষণা
চট্টগ্রামগামী ট্রেন এক্ষুনি ছাড়বে
কমলাপুর স্টেশনটা বেশ লম্বা
রিক্সাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলেন
শরীর আর আগের মত নেই
পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে
অর্ধশতাব্দী বয়স
চলার সেই ছন্দ কোথায় হারিয়ে গেছে
মানুষ কত তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যায়
রাফেয়া বেগমও বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন
আর তাইতো সামাদ সাহেবের এত অবহেলা
অথচ অল্প বয়সে রাফেয়া একটু অভিমান করলেই কতো সাধাসাধি! থাক ঐ চ্যাপ্টার
রাফেয়া ঐ লোকের কথা আর ভাববেন না
শত্রু, শত্রু!
তাড়াহুড়ো করে সামনে যে কম্পার্টমেন্ট পেলেন তাতেই চড়ে বসলেন
এটা একটা সেকেন্ড ক্লাস কামরা
জানালার পাশের একটা সিটে বসে পড়লেন রাফেয়া
সামনের সিটে একটা অল্পবয়সী ছেলে সকালের কাগজ পড়ছে
কব্জিতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকালেন
আটটা পাঁচ মাত্র
তাহলে কোন
ভোরবেলা উঠে ঝগড়া শুরু করলেন তাঁরা
নামাজ পড়ে সকালের চা দিতে গিয়েই বিপত্তি
মনে পড়লো গত রাতেও সামাদ সাহেব বলছিলেন আজ সকালে গিয়ে দালালকে নিয়ে বাড়িওয়ালার কাছে যাবেন
যত তাড়াতাড়ি পারেন বায়না করে নিতে চান
জায়গাটা খুব পছন্দ হয়েছে তাঁর
তারপর শুয়ে শুয়ে আনমনেই আউড়েছেন- "ধন নয়, মান নয়, এতটুকু বাসা"
"থাকো তুমি তোমার বাসায়"- আপন মনেই মুখ ঝামটে উঠলেন
ব্যাগটা রেখে স্থির হয়ে বসলেন
কিছুক্ষণের মধ্যেই যাত্রীদের সুন্দর ভ্রমণের শুভ কামনা করে ট্রেন ছাড়লো
অকারণে বুকটা চিন্‌-চিন্‌ করে উঠল
মানুষটা বাইরে থেকে এসে হতভম্ব হয়ে যাবে
জীবনে কোনদিন রাগ করে আলাদা ঘরে ঘুমুতে পর্যন্ত দেয়নি
কত তোয়াজ, কত তোষামোদ করেছে
ভালোই হলো
বেশি বাড়াবাড়ির আগে একটু শিক্ষা দেয়া হলো
"যেতে বলেছে, চলে এসেছি
আমার অভাব কী? আমার ছেলে আছে
আমি এখন থেকে আমার ছেলের কাছে থাকবো
তোমার স্বপ্নপুরীতে তুমিই থাকো" গজগজ করলেন মনে মনে
ট্রেন ঢাকা শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে এসেছে
গ্রাম শুরু হয়েছে
খোলা মাঠ, সবুজ প্রান্তর, মাঝে মাঝে হলুদ সর্ষে ক্ষেত
আঁকা বাঁকা খাল- এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল মনে
মনে পড়লো বছর খানেক আগে যখন চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন সে সময়ের কথা
ছেলে প্রথম বাসা পেয়েছে, বাবা-মা কে নিয়ে যাচ্ছে
ফার্স্টক্লাস রিজার্ভেশন
কত তত্ত্ব-তালাশ
দু'জনের মনে সে কী আনন্দ!
একমাত্র ছেলে তাদের- সুদীপ্ত
মানুষ হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
পাশ করার পরপরই চাকরি পেয়েছে
বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানি
বিদেশে ট্রেনিং নিয়ে এসেছে
সারা রাস্তা মা-বাবা-ছেলে কি হাসি-গল্প
দু'পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাওয়া
তখন তারা বলেছিলেন, বছরে অন্তঃত একবার আসবেন
কিন্তু কই! বছর গড়িয়ে দেড় বছর হতে চললো
আজ এটা, কাল এটা করে আর যাওয়া হয়নি
চট্টগ্রামে গিয়ে তো মনটা আরো ভরে গিয়েছিল
পাহাড়ের উপর কী সুন্দর বাংলো
যে ক'দিন ছিলেন রাফেয়া যেন তাঁর হারানো কৈশোর ফিরে পেয়েছিলেন
বাবা-ছেলে দু'জনে মিলে তাঁর যত্ন করেছে
সামাদ সাহেব ছেলেকে বলেছিলেন, "তোর মা'র খুব শখ ছিল বাইরে বেড়াতে যাবার
আমি নিতে পারিনি
তুই তবু একটা শখ পূরণ করলি"
সেদিন নিজেকে কি যে সুখী মনে হয়েছিলো
আর আজ কত দুঃখী
রিটায়ার করার পর থেকেই সামাদ সাহেবের মেজাজটা কেমন চড়ে গিয়েছে
আগে সারাদিন বাইরে থাকতো
টের পাওয়া যেতো না
এখন ঘরে থেকে কেবলই এটা-ওটা নিয়ে দোষ ধরা
আচ্ছা, চায়ে চিনি একটু বেশি হলো