content
stringlengths
0
129k
এটা এমন কী! তোমার ডায়বেটিস নেই
রাফেয়া প্রথম প্রথম একটু সামাল দিয়েছেন
কাজের মেয়েটাকেও বকাঝকা করেন সামান্যতেই
কত বুঝিয়েছেন, "ওটা আমার ডিপার্টমেন্ট
কাজের লোক চলে গেলে তখন আমার কষ্ট হবে
শুধু বাঁধা বুয়া দিয়ে কাজ চলে না
তাছাড়া ওরা এসব কথা ফ্ল্যাটে চালাচালি করে'"
কী বাজে ব্যাপার
অথচ মেজাজ কি তাঁরও কম? বরং চিরদিন তাঁর মেজাজই সহ্য করেছে ছেলে-মেয়ে-বাবা
সংসারের কর্ত্রী যখন থেকে তখন থেকেই তাঁকে ভয় করে সবাই
আর আজ কিনা- রাগে গা রি রি করে উঠলো
"দেখি আপনার টিকেটটা"
এই রে! তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে উঠেছেন
টিকেটের কথা মনেও ছিল না
হতভম্ব হয়ে রইলেন রাফেয়া
লজ্জায় কান-মাথা গরম হয়ে উঠলো
কোন রকমে তোতলাতে তোতলাতে বললেন, "আমি মানে আমি খুব তাড়াতাড়ি উঠেছি তো, টিকেট করা হয়নি"
টিকেট চেকার কী যেন ভাবলেন
সামনের ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো- "কোথায় যাবেন খালাম্মা?"
"চট্টগ্রামে
আমার ছেলের কাছে"
ছেলেটি চেকারকে অনুরোধ করলো একটা টিকেট দিতে
টিকেট চেকার ভালো করে একবার দেখলেন
এতক্ষণে নিজের উপর বিশ্বাস ফিরে এসেছে রাফেয়ার
বেশ গড় গড় করে স্বামী-পুত্রের পরিচয় দিলেন
টিকেট যে নিজে কখনো করেন নি তাও কথায় কথায় বুঝিয়ে দিলেন
টিকেট চেকার টাকা নিয়ে টিকেট দিলেন
জরিমানা নিলেন দশ টাকা
আরো বেশি নিলেও কিছু করার ছিল না
এটাও হয়তো চেকারের পকেটেই যাবে
সুযোগ পেলে সরকারের ঘরে ক'জন জমা দেয়
দেশের যা হাল-চাল
ভৈরব ব্রিজের উপর দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে
আকুল হয়ে মুখ বাড়ালেন
এত ভালো লাগে নদী দেখতে
নদীর পাড়ে হলুদ সর্ষেক্ষেত, মনে হয় শাড়ির হলুদ আঁচল
অনেক আগে বিভূতিভূষণের উপন্যাসে পড়েছিলেন বিহারের ফুলকিয়া বইহারের সর্ষে ক্ষেতের বর্ণনা
অপূর্ব লেগেছিল
বইটা আজো তাই সবচেয়ে প্রিয়
আসলে প্রকৃতির মতো সুন্দর পৃথিবীতে আর কিছুই নেই
অথচ একটা জীবন শুধুই হাঁড়ি ঠেললেন
কিছুই দেখলেন না জীবনে
রাগটা আবার চিন্-চিন্‌ করে উঠলো রাফেয়া বেগমের মাথায়
গাড়ির দুলুনিতে ঘুম এসে গিয়েছিল
হঠাৎ শুনলেন ছেলেটি ডাকছে- "খালাম্মা, চট্টগ্রাম এসে গেছে"
ধড়মড় করে উঠলেন
কাপড়-চোপড় সামলে ব্যাগটা নিলেন
স্টেশনের বাইরে প্রচন্ড ভীড়
প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, রিক্সা
একটা রিক্সায় উঠে বসলেন রাফেয়া বেগম
"কোথায় যাইবেন?"
তাই তো, কোথায় যাবেন? ঠিকানা তো আনা হয়নি
রিক্সাওয়ালাকে বোঝাতে চাইলেন তিনি- পাহাড়ের উপর খুব সুন্দর বাংলো বাড়ি
তার চারপাশে ছোট ছোট আরো অনেক পাহাড়
রিক্সাওয়ালা বোকার মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো- "আমি তো চিনি না"
তারপর আবার বললো- "আপনি তো চেনেন
দেখাই দিবেন"
"যা হয় ইনসাফ দিবেন"
রিক্সাওয়ালার কথা শুনে ভাল লাগলো
গতবার যেখান দিয়ে গেছেন সেখান দিয়ে নিয়ে গেলে নিশ্চয় চিনতে পারবেন
পাহাড়ের কাছ দিয়ে যাচ্ছে দেখে জিজ্ঞেস করলেন- "এটা কোন্ জায়গা?"
"টাইগার পাস"
"এ না, এই পাহাড় না
তুমি অন্য জায়গায় চলো"
বেলা পড়ে আসছে
প্রায় দেড়-দু'ঘন্টা তাঁকে নিয়ে ঘুরে রিক্সাওয়ালাও বিরক্ত
এবার বুদ্ধিমানের মত প্রস্তাব দিলো রিক্সাওয়ালা- "চলেন আপনারে থানায় লইয়া যাই"
ভীষণ কান্না পাচ্ছে
রাগের মাথায় কী কেলেংকারী করে বসলেন
এখন কি সত্যি সত্যিই থানায় যাবেন? ছোটভাই এস-পি
এই বয়সে রাগ করে থানায় গেছেন শুনলে কী কান্ডই না হবে
এদিকে সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে
কোথায় যাবেন? এছাড়া তো আর উপায় দেখছেন না
শেষ পর্যন্ত রিক্সাওয়ালাকে বললেন- "চলো থানায়"
থানায় এসে পরিচয় দিলেন ভাইয়ের, এবং ছেলেরও
বাংলাদেশে এটাতে যত কাজ হয়, অন্যকিছুতে ততটা হয় না
তাঁকে বসিয়ে ওরাই ঠিকানা নিয়ে যোগাযোগ করলো
খোকাকে পাওয়া গেল
এক্ষুণি এসে পড়বে
কী ভাববে সুদীপ্ত
হয়তো রাগ করবে
বলবে, "বুড়ো বয়সে তুমি লোক হাসাচ্ছ?" তাহলে কী করবেন? এত বয়স হলো তবু কারো ধমক সহ্য করতে পারেন না
আদর করে হাজারটা কাজ করাও, আপত্তি নেই
কিন্তু ধমকাবে কেন? ঐ মানুষটা সাত সকালে ওভাবে না ধমকালে কি তিনি আসতেন? আবার রাগটা শরীরে চনমন করে উঠলো
চমকে ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলেন সুদীপ্ত এগিয়ে আসছে
আর স্থির থাকা যায় না
দু'হাত বাড়িয়ে ছুটে গিয়ে ছোট্ট শিশুটির মত ছেলের বুকে আশ্রয় নিলেন
আর তখনই দু'চোখ ভাসিয়ে কান্না
সারাদিনের জমাট রাগ-অভিমান গলে গলে পানি
"মা, তুমি কী যে ছেলেমানুষ" ছেলের কন্ঠ স্নেহার্দ্র
"তোর বাবা অমন করে বললো কেন?"
"কিন্তু বাবার কী দশা জানো? দুপুর পর্যন্ত মনে করেছে তুমি রাগ করে কাছে-পিঠে কোথাও গেছ
দুপুরের পর থেকে সবাইকে ফোন করে অস্থির
এ পর্যন্ত আমাকেই চার-পাঁচবার ফোন করেছে
আমি অনেক বুঝিয়ে ঢাকায় থাকতে বলেছি
তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল তুমি আমার কাছেই আসবে
আচ্ছা মা, এত রাগ করলে চলে? তুমি যদি হারিয়ে যেতে আমাদের কী হতো?"
"খুব ভালো হতো
তোর বাবার শান্তি হতো"
"হ্যাঁ, তোমাকে বলেছে